অচেনা সিঙ্গি ও নতুনগ্রাম

মার্চ শুরুর এক বসন্তের ভোরে গাড়ি নিয়ে আমরা রওনা দিলাম সিঙ্গির দিকে। এই গ্রামের কথা প্রথম পড়ি অনেকদিন আগে রবিবাসরীয়র একটি লেখায়। সেখানেই  জানতে পারি মহাকবি কাশীরাম দাসই প্রথম বাংলা ভাষায় মহাভারতের ভাবানুবাদ করেছিলেন বাংলার এক ছোট্ট গ্রাম সিঙ্গিতে বসে। সেই সময় সিঙ্গি ছিল জাহাঙ্গীরাবাদের অন্তর্গত ইন্দ্রানী পরগনার একটি গ্রাম। সে প্রায় চারশ বছর আগের ঘটনা। বর্তমানে সিঙ্গি পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত। মহাকবি আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর জন্মভিটে, কেশেগড়ে পুকুর(মহাকবি এই পুকুরে স্নান করতেন বলে তাঁর নামেই এই পুকুরের নাম, স্থানীয় মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী) এখনও আছে ! এই পর্যন্ত জেনেই ঔসুক্য জাগে খুব। 

এরপর ‘ভ্রমণ” এ পড়ি সম্রাটদা মানে সম্রাট ব্যানার্জীর “শান্তিনিকেতন হোমস্টে” র কথা। এই সিঙ্গিতেই। সাথে আরো জানতে পারি সম্রাটদা ও সুদেষ্ণাদি পরম যত্নে রাখেন অতিথিদের, তাদের রান্নাঘরের বিষমুক্ত খাবার ও পরম আতিথেয়তা এখন বেশ খানিকটা সর্বজনবিদিত। সম্রাটদার নিজের মা-বাবা, পরিবার ও জন্মস্থানের প্রতি অদম্য ভালবাসা ও একাত্মতার আন্তরিক ফসল সবুজের কোলে এই ‘শান্তিনিকেতন হোমস্টে’।

জিপিএস এ লোকেশান সম্রাট দা আগেই পাঠিয়েছিল। অর্ধেক রাস্তা পার হতে না হতেই দাদার ফোন। ঠিক রাস্তায় আছি জেনে দুই পক্ষই নিশ্চিন্ত হলাম। ‘শান্তিনিকেতন হোমস্টের’ গেট দিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই ক্লান্তিনাশক লেবুজল হাতে দাঁড়িয়ে একজন, সাথে সম্রাটদা। বললো, ‘ তোর নাম টিনটিন,  আমি ক্যাপ্টেন হ্যাডক’। দুটি বড় গ্লাস ও একটি ছোট। পরম তৃপ্তিতে খেলাম তিনজনেই। গরম লুচি তরকারি আর পেঁয়াজ ফুলের মধু সহযোগে প্রাতরাশ হল। ছোটু দা,  যিনি রান্নাঘর এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে সম্রাটদার দক্ষিণ হস্ত দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ালেন। 

তারপর আমাদের গন্তব্য হল শ্রীবাটি ও জগদানন্দপুর।সম্রাটদা নিজে নিয়ে গেল।

পাশের গ্রাম শ্রীবাটির অতি প্রাচীন তিনটি টেরাকোটার মন্দিরে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের  সুনিপুণ কাজ দেখার মতো।সমগ্র ইতিহাস খুব সুন্দর করে  বলল সম্রাটদা।

 জগদানন্দপুরের মন্দিরটি দেখে আমার মনে পড়ে গেল তাজমহল দেখার কথা। মসজিদের আদলে একটি গেট। ঢোকার পর মন্দির দৃশ্যমান। বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না। 

এই দুটি জায়গা দেখানোর সময়ে সম্রাটদার ইতিহাসের জ্ঞান, বাচনভঙ্গির একাগ্রতা ও মাটির প্রতি টান ভীষণ ভাবে চোখে পড়ল। মনে দাগও কাটল। 

পেঁয়াজের চাষ আর একটা বিলে বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি দেখে ফেরার পথ ধরলাম আমরা। টিনটিন একবার বলল, “খিদে পেয়েছে” আর সম্রাটদার entropy বেড়ে গেল। ‘বাচ্চা মানুষ, তাড়াতাড়ি বাড়ি চল’।


আমাদের ঘরের সামনের ছাদ, শান্তিনিকেতন হোমস্টে, সিঙ্গি।

‘শান্তিনিকেতন ‘ এর তিনতলার যে ঘরটিতে আমরা ছিলাম, তার নাম ‘পোস্ত’। ছোটুদা এসে ঘানির সরষের তেল দিয়ে গেল। সামনের খোলা ছাদে বেশ কিছুক্ষণ টিনটিন দৌড়াদৌড়ি করে স্নান সেরে আমরা নামলাম নীচে। 

দুপুরে ভাত, আলুভাজা, ডাল, পোস্ত, ধনেপাতার চাটনি আর কচি পাঁঠা দিয়ে যা চব্য-চষ্য হল তা আর বলার নয়। শেষে অদ্ভুত সুন্দর একটি লস্যি ছিল, অনেকটা সেই উত্তর ভারতীয় ‘ছাস’ type।

অল্প বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আবার ডাক পড়ল নীচে।

রহিম চাচা তাঁর গরুর গাড়ি নিয়ে হাজির। সিঙ্গি গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাবেন। সূর্য তখন নিস্তেজ হতে শুরু করেছে। ঘরে ফেরার তোড়জোড় চলছে পাখিদের। আমরা তিনমূর্তি চড়ে বসলাম গরুর গাড়িতে। প্রায় এক ঘণ্টার সফরে সবচেয়ে মন কাড়ল শ্রী কাশিরাম দাসের জন্মভিটে। যদিও ভগ্নদশা, তাও শুনলাম সরকারি উদ্যোগে তা পুনর্নির্মান করার কথা ভাবা হচ্ছে।


কাশীরাম দাসের জন্মভিটা

‘শান্তিনিকেতন’ এ ফিরলাম যখন আকাশে তখন অস্তরাগের দিগন্ত-যাপন। ছাদে পাতা চেয়ার টেবিলে বসে দেখলাম সামনেই দুই মাছরাঙার একান্ত প্রেমালাপ। আবার মনে করিয়ে দিল ওরা এ যে বসন্ত। 

আবেশে জড়ানো মুহূর্তের মাঝে আমি আবার পাড়ি দিলাম ঋজুদার সাথে ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে। এ প্রসঙ্গে বলি এখানকার কোন ঘরে টি ভি নেই, বদলে  দেওয়ালে বানানো ছোট্ট তাকে রয়েছে একাধিক বই…নীললোহিত, সমরেশ, ষষ্ঠীপদ ইত্যাদি। এই প্রথম ঋজুদা কে পেলাম…. অভিযানে…..

প্রত্যেকটি বই ই আমার অত্যন্ত পছন্দের ছিল। শুনলাম নিয়মিত বইগুলি বদল করে দাদা, সযত্নে।

বিকেলে আবার ছোটুদা দিয়ে গেল চপ- মুড়ি ও দুর্দান্ত লাল চা। সন্ধ্যেবেলা সচক্ষে দেখলাম এখানে এনারা কিভাবে সম্পূর্ণ নিজেদের চেষ্টায় বাদামতেল বানাচ্ছেন…একটি ছোট যন্ত্রের সাহায্যে। 

এর মাঝে সম্রাটদা বললো, ‘ একবার ছাদে যাও, ভাল লাগবে’। 

এলাম তিনজনে ছাদে। এবং নিমেষে কথা হারালাম। শেষ কবে আকাশে এত তারা, তারামণ্ডল ও ছায়াপথ দেখেছি মনে পড়ল না। সৌমিত্র টিনটিন কে বেশ কিছু তারামণ্ডল চেনাতে লাগল। আর আমি ট্যাঙ্কে ওঠার সিঁড়িতে বসে শুনতে লাগলাম সামনের নিকষ কালো নিস্তব্ধতার সাথে কয়েক কোটি আলোকবর্ষ দূরের সপ্তর্ষিমণ্ডলের সঙ্গোপন কথোপকথন। ‘তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা কে জানে, কি আবেশে দিশেহারা’….

রাতে বিশেষ কথা বললাম না। চিকেন-রুটি,  আপ্যায়ন সব ছিল….  কিন্তু সেই আবেশ থেকে আমি তখনও বেরোতে পারিনি। 

রাতে অনেকক্ষণ জেগে ঋজুদার সাথে অভিযান শেষ করলাম। ঘর থেকেও দৃশ্যমান ‘তারা ভরা আকাশ’।। ঘুম নামল বেশ রাতে…আবেশে। 

সকালে সোনারোদ মেখে ও নরম রুটি, আলু তরকারি ও মধু সহযোগে আহার শেষে আমাদের গন্তব্য হল কাঠের পুতুল তৈরীর ‘নতুনগ্রাম’।  বিশেষ কাজের জন্য সম্রাটদা আজ আমাদের সঙ্গ দিতে অপারগ হলেন। কিন্তু জি পি এস এ লোকেশান দিলেন। পৌঁছেছিলাম নির্বিঘ্নে। সবুজ ধানক্ষেত ও আমবাগানের ছায়া ঘেরা অসম্ভব সুন্দর মেঠো পথ।  

কাঠ পুতুলের গ্রাম এই নতুনগ্রাম।

কিছু বছর আগেও তেমনভাবে প্রচারের আলোয় ছিল না এই গ্রাম, মসৃণ ছিল না কাঠ পুতুল যাওয়ার পথ। তবে বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে নতুনগ্রাম এখন অনেকাংশেই মানুষের কাছে পরিচিত।


কাঠের গণেশ, নতুনগ্রাম

নতুনগ্রাম প্রধানত কাঠপুতুল তৈরির জন্যই প্রসিদ্ধ ও বহুল প্রচারিত। তবে কাঠপুতুলের মধ্যে আজও সবচেয়ে নজরকাড়া হলো রকমারি কাঠের পেঁচা। মূলত জনা ৪০ পরিবারের বাস এই গ্রামে এবং প্রত্যেক পরিবারেরই প্রধান জীবিকা ও বেঁচে থাকার রসদ হলো এই কাঠপুতুল, যা এখন জাতীয় স্তরের দ্রষ্টব্য শিল্পবস্তু।পুরুষদের সাথে সমানভাবে গ্রামের মহিলারাও এই কর্মযজ্ঞে সামিল হয়ে থাকেন।

পেঁচার সঙ্গেই তৈরি হয়ে থাকে কাঠের সেই বিখ্যাত রাজা-রানী, বর-বউ পুতুল, দেব-দেবীর মূর্তি আর ঘর সাজানোর আসবাপত্র। মূলত এই সমস্ত জিনিসগুলি পিপুল কাঠ, আমড়া কাঠ, গামার কাঠ, নিম কাঠ খোদাই করেই তৈরি হয়ে থাকে। কারিগরের যন্ত্রপাতি বলতে বিভিন্ন পদের বাটালি, লোহার শলাকা, হাতুড়ি, ছোট ছেনি, করাত ও হাতের নিপুণ দক্ষতা।

তবে কাঠপুতুল তৈরির কিছু নির্দিষ্ট পর্যায় রয়েছে। প্রথমে কাঠের টুকরোর ওপর পুতুলের নকশাটি এঁকে নেওয়া হয়; তারপর শিল্পী তাঁর হাতের দক্ষতায় সেই কাঠ খোদাই করে ফুটিয়ে তোলেন পুতুলের অবয়বটি। এরপর সেটির ওপর মাটির প্রলেপ লাগিয়ে তা শুকিয়ে নেওয়া হয়, তারপর পুনরায় সেটিতে খড়িমাটি, ময়দা, জল ও আঠার প্রলেপ দিয়ে রোদে শুকোতে দেওয়া হয়। এই প্রলেপের ফলে পুতুলগুলির উপরিভাগ মসৃণ হয়। সবশেষে রং করার পালা। সুক্ষ তুলি ও হাতের কারুকাজে পুতুলগুলির গায়ে নির্দিষ্ট নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। বহুকাল আগে পেঁচাগুলির ডানা গুলি তৈরি করা হত মাটি দিয়ে কিন্তু এখন সম্পূর্ণ পেঁচাটি কাঠের তৈরি করা হয়।

একসময় দিল্লির দরবারে হাজির হয় বাংলার এই লোক-শিল্পের নমুনা। রাষ্ট্রপতির বিচারে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পনিদর্শন হিসাবে পুরস্কৃত হয় তা। ১৯৬৬ সালে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষণ পুরস্কৃত করেন শম্ভুনাথ ভাস্কর কে।

বর্তমানে বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলা, সরকারি উদ্যোগ এর ফলে বাংলার এই নিজস্ব লোক-শিল্প পরিচিতিপাচ্ছে দেশকালের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। আজও নতুনগ্রামের পুতুল পাড়াকে সবাই একডাকে চেনে। সময় বদলেছে, তবে প্রয়োজন আরও বদলের। এই সমস্ত শিল্পীদের প্রয়োজন আরও অনেক বেশি পরিচিতি, যাতে তাঁরা নিজেদের জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে বাংলার এই বৈচিত্র্যময় শিল্পকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে পারেন।।

নতুনগ্রামের আনাচে কানাচে কাঠের পুতুলরা প্রাণ পায়, কথা বলে রাধাকৃষ্ণ, লক্ষ্মী প্যাঁচা,  গণেশ, দূর্গা বা মুখোশ দম্পতি। বাংলা নাটক ডট কমের উদ্যোগে এদের এখানে মেলা হয়, কিছু হাতের কাজ পাড়ি দেয় সাগরপাড়ে। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, সৃষ্টিশীল গ্রাম। মনের আয়নায় ছবি রইল। 

ফিরে এলাম রোদের আদর মাখা একই রাস্তা দিয়ে। একটি শাল-সেগুন ঘেরা জায়গায় কিছু ফটো হল। মুরগির সুস্বাদু একটি পদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল জানি। আর আমি ঝাল খাই না বলে, সব ক’টি পদ আমার মনের মতো করেই রান্না হয়েছিল।


কাঠের প্যাঁচা

যাই হোক, বিদায়বেলায় মন খারাপ হল খুব। কংক্রিটের জঙ্গলে থেকে আর শহুরে রুটিনের চক্রবূহ্যে দিনের পর দিন কাটিয়ে মন সত্যি ই এক অপার প্রসন্নতায় আচ্ছন্ন হয়েছিল। ফেরার পথে সারা গাড়ি এই কথাই ভাবছিলাম। টিনটিন কে বাইরে কোন অচেনা লোকের সাথে এত খুশী দেখিনি। কান ফিসফিস করছিল কথাগুলো  ‘নিজের বাড়ি মনে করে থাকো, যখন ইচ্ছা চলে এস’ বা ” বাড়ি পৌঁছেই প্রথম ফোন কিন্তু আমাকে করবে”। গাড়ি যখন দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ের কাছে মনে হল হোমস্টের পাশের ছোট্ট দোলনাটা যেন নিশ্চয়ই শেষবেলার সূর্যকে দেখছে। দেখা হবে শিগগীর আবার। 

 অনেক জায়গা দেখা আমাদের হয়তো বাদ রয়ে গেছে, একদিনে পেরে ওঠা যায় নি, তাই আবার আসবই।

শহুরে একঘেঁয়েমি থেকে ক্ষণিকের বিরতি নিয়ে একবার এই গ্রাম্য পরিবেশে ছোট্ট হোমস্টেটির সঙ্গ নিতে পারেন, কথা দিলাম মনে আসবেই ‘ আমি চাই ফিরে যেতে সেই গাঁয়ে’…….

ছবিঃ সৌমিত্র মৌলিক ও সম্রাট ব্যানার্জী

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত