| 19 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস এই দিনে

বড়দিনের গল্প

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

যিশু খ্রিষ্ট ঠিক কখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তথাপি যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট দিনে উদযাপন করা হয়। কিন্তু এ দিনটি কী ভাবে নির্দিষ্ট করা হল , তা জানতে হলে আমাদের প্রায় ১৬০০ বছর পেছনে যেতে হবে।
খ্রিস্ট ধর্মের কথা বললে রোমের কথা আমাদের সামনে আসবেই। চতুর্থ শতাব্দীতে রোমে সর্বপ্রথম ২৫ ডিসেম্বর দিনটি যিশুর জন্মদিন হিসেবে ধরে নিয়ে যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উদযাপন করা হয়। আর সে সময় থেকেই ওই দিনটিতে পৃথিবীর সর্বত্রই এ উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। যিশু খ্রিস্টের জন্মোসব বড়দিন উৎসব হিসেবে খ্যাত। এ সময়ে অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসে এ উৎসব অনুষ্ঠানের একটি কারণ হল, মানুষের ঘরে এ সময়ে অভাব অনটন থাকে না। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে কিন্তু যিশুর জন্মদিবস উদযাপিত হত ৬ জানুয়ারি। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে যিশুর জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বরেই উদযাপিত হত। এ উৎসবের সূচনা হয় ২৪ ডিসেম্বর মধ্য রাতে। বড়দিনের অনুষ্ঠান খ্রিষ্টানদের কাছে খুবই প্রিয়। এ উৎসবের ধর্মীয় দিকও রয়েছে, মানবিক তথা সামাজিক দিকও আছে। আর তা হল পারস্পরিক মিলন, উপহার আদান-প্রদান, আনুষ্ঠানিক প্রীতিভোজ ইত্যাদি। বড়দিনের দুটি উল্লেখযোগ্য দিক হল ‘দেবদূত সান্টাক্লজ’ এবং ‘খ্রিস্টমাস ট্রি’। বড়দিনের উৎসবের সঙ্গে ‘খ্রিস্টমাস ট্রি’ সম্বন্ধে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। যেমন রোমে এক দম্পতি বসবাস করত। তাঁরা কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করত। এ দম্পতি ছিল যিশুভক্ত এবং দয়ালু। একদিন রাতে একটি শিশু ঠান্ডায় কম্পনরত অবস্থায় তাঁদের ঘরে এসে উপস্থিত হয়। এ দম্পতি শিশুটিকে খুব আদর যত্ন করে ঘরের ভিতরে নিয়ে নিজেদের খাবার ভাগ করে দেয় এবং নিজেদের বিছানায় শুতে দেয়। নিজেরা অন্য এক কাঠের বিছানায় শুতে যায়। পরদিন ভোরবেলা তারা দেখতে পায়-শিশুটি দেবদূতের স্বর্ণোজ্জ্বল পোশাক গায়ে দিয়ে বসে রয়েছে। শিশুটি নিজেকে যিশু বলে পরিচয় দেয়। তিনি দম্পতিকে একটি গাছের ডাল দিয়ে বলেন, এ ডালটি মাটিতে পুঁতে রাখার জন্য। প্রতি খ্রিস্টমাসে তা একটি আপেলের গাছরূপে দেখা দেবে এবং সে গাছে থাকবে অজস্র সোনালী বর্ণের আপেল। দম্পতি সে অনুযায়ী তা করে এবং অনুরূপ ফল পাওয়ায় তাঁরা গাছটির নাম রাখে ‘খ্রিস্টমাস ট্রি’।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ইউরোপের কোনও কোনও অঞ্চলে ৬ জানুয়ারী যিশুর জন্মদিন উদযাপিত হত। এ ৬ জানুয়ারী ‘সেন্ট নিকোলাস ডে’ হিসেবেও খ্যাত। নিকোলাস ছিলেন একজন বিশপ। তুরস্কের মায়রা নামের শহরে একটি গির্জার বিশপ। চতুর্থ শতাব্দীর এ নিকোলাস ছিলেন খুব দয়ালু এবং পরোপকারী। জনশ্রুতি অনুসারে এ নিকোলাস দরিদ্র লোকের ঘরে গোপনে নানা উপহার রেখে আসতেন। প্রাচ্যের বিশপ নিকোলাস নামে পশ্চিমে জনপ্রিয়তা লাভ করে জার্মানিতেও।অবশ্য এর মূলে যার অবদান রয়েছে তিনি হলেন রানি থিওফানো। থিওফানো ছিলেন জার্মানির রাজার দ্বিতীয় অটোর রানি। দ্বিতীয় অটোর এ রানি ছিলেন ইউরোপের পূর্ব প্রান্তের মেয়ে।
আমেরিকা আবিস্কারের পর বিভিন্ন দেশের মানুষ এসে সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তাঁদের মধ্যে ওলন্দাজ নামে এক ব্যক্তিও ছিলেন। তাঁরা নিকোলাসকে Sister Klass বলতেন। এ একটি গরীব ছেলে। কিছু পাইন গাছ এনে গির্জার মালিক বলল গির্জার কাছে তা রোপন করার জন্য। ছেলেটি সে গাছটির জন্য কিছু পয়সা চাইল। মালি গাছটি পছন্দ না হলেও ছেলেটিকে দেখে তার খুব ভাল লাগে এবং কষ্ট হয়। তাই গাছটি কিনে মালি গির্জার কাছে একটি জায়গায় রোপন করে। ‘খ্রিস্টমাস ইভ’র ভোরবেলা গির্জার পুরোহিত দেখতে পান রাতের মধ্যে একটি গাছ বড় হয়ে গির্জার চূড়া অতিক্রম করে গেছে। গাছটি থেকে তারার আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। এ গাছটিকে খ্রিস্টমাস ট্রি বলে গণ্য করা হয়। এ গাছটি সম্বন্ধে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীনকালে রোমে ‘মাহুর-নালিয়া’ নামের একটি উৎসব পালন করা হত। এ উৎসবে সবুজ গাছকে নানা রঙের আলোয় সাজিয়ে তোলা হয়। স্থানীয় মানুষগুলোর বিশ্বাস, এ গাছটি হলো স্বর্গের উদ্যানের (Eden) Tree of life)। এ গাছটি ক্রমশ : বড়দিনের উৎসবের সঙ্গে সংযোজিত হতে থাকে। এ গাছটি কৃত্রিম ফুল,ফল এবং তারার আলোকে সুসজ্জিত। খ্রিষ্টানদের মতে এ গাছটি পৃথিবীর মানুষের আলোক প্রদর্শনকারী যিশুর প্রতীক। রোমে বড়দিনের উৎসবে এ গাছটির ব্যাপক প্রচলন হয়ে পড়ে এবং তা জার্মানি পর্যন্ত প্রসারিত হয়। বড়দিনের উৎসবে এ গাছটির প্রবর্তন করেন মার্টিন লুথার, Sister Klass মানুষের মুখে মুখে ‘সান্টাক্লজ’ বলে খ্যাত। সান্টাক্লজ ‘ফাদার খ্রিস্টমাস’ বলেও খ্যাত। তিনি ‘রেইন ডিয়ারে’ টানা শ্লেজ গাড়িতে ওঠে ঘুরতেন। ‘রেইন ডিয়ার’ এক প্রকার হরিণ। অবশ্য হল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের মানুষের ধারণা ভিন্ন। তাঁদের মতে সান্টাক্লজের বাহন হল সাদা ঘোড়া। সেজন্য এ দুই দেশের শিশুরা সে ঘোড়ার আহারের জন্য কাঠের জুতার মধ্যে খড় ভরে রাখে। এ কাজটি করে ৫ জানুয়ারি রাতে। পরদিন ৬ জানুয়ারি ‘সান্টাক্লজ ডে’। সান্টাক্লজের পোশাক লাল। তাতে সাদা বর্ডার থাকে। সমস্ত মুখে সাদা দাড়ি। খুবই আমোদ প্রিয় এ বৃদ্ধ। পৃথিবীর সব দেশের শিশুদের খুবই প্রিয় এ সান্টাক্লজ।
ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বড়দিনের উৎসবে শোভাযাত্রা হয়। এ শোভাযাত্রায় সান্টাক্লজের মূর্তি থাকে। মধ্যযুগে ৬ জানুয়ারি জার্মানি এবং ইংল্যান্ডে রয় বিশপ নামে একটি অনুষ্ঠান হত। এ অনুষ্ঠানে একটি ছোট শিশুকে বিশপরূপে সজ্জিত করা হত। তাকে নিয়ে হত শোভাযাত্রা। এখনও জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডে বড়দিনের শোভাযাত্রায় সান্টাক্লজ থাকে বিশপের পোশাকে। জার্মানিতে একজনকে সান্টাক্লজ সাজানো হয়। তাঁর সঙ্গে থাকে ১২ জন সঙ্গী। এঁদের নিয়ে সাজানো সান্টাক্লজ মানুষের ঘরে ঘরে যায়। সঙ্গীদের পকেটে থাকে খড়ের মোজা, মুখে নানা জীবজন্তুর মুখোশ। সুইজারল্যান্ডে বড়দিনের উৎসবের মিছিল অর্থাৎ শোভাযাত্রা ভিন্ন। এ শোভাযাত্রার প্রথমে একজন শিঙাধ্বনি দিয়ে আগে আগে যায়। তারপর থাকে দুজন দৈত্য।এ দুই দৈত্যের হাতে থাকে চাবুক। তারপর থাকে শিং থাকা একটি মূর্তি। তারপর থাকে ছাগলের বেশে একজন মানুষ। তারপর সান্টাক্লজের ভৃত্য। এ ভৃত্য দুষ্ট ছেলে মেয়েকে ভয় দেখায় বস্তায় ঢুকিয়ে নিয়ে যাবে বলে। একেবারে শেষে থাকে সান্টাক্লজ নিজে। সান্টাক্লজ পূর্বোক্ত দৈত্য তথা অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করে এবং শিশুদের জন্য নানা উপহার আনে। এ সান্টাক্লজ কবি সাহিত্যিকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু’জনের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁরা হলেন ওয়াশিংটন আরভিং এবং ক্লিমেন্ট সি মোর। ১৮০৯ সালে লেখা এক রচনায় আরভিং সান্টাক্লজের উল্লেখ করে বলেন, সান্টাক্লজ দেখতে নাদুস নুদুস। মুখে হাসি, গোলাকৃতি। মাথায় একটি টুপি। ক্লিমেন্ট সি মোরের একটি বিখ্যাত কবিতা -A Visit From St. Nicolas. এ থেকে বোঝা যায় কবি সাহিত্যিকদের কাছেও সান্টাক্লজ ছিলেন আকর্ষণীয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত