| 29 মে 2024
Categories
গল্প সম্পাদকের পছন্দ সাহিত্য

সেলিনা হোসেনের গল্প ‘মেলায় যাওয়া’

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ই জুন। রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রামে। বাবার নাম এ কে মোশাররফ হোসেন এবং মায়ের নাম মরিয়মন্নেসা বকুল। সাত ভাইবোনের মধ্যে সেলিনা হোসেন হচ্ছেন চতুর্থ।

সেলিনা হোসেন বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে ২০০৪ সালে চাকরি জীবন থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান। তিনি একাধারে উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনা করছেন। শিশু সাহিত্য এবং গবেষণায়ও রেখেছেন অনন্য স্বাক্ষর।

উপন্যাস, ছোট গল্পের সংকলন, শিশুতোষ গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও সম্পাদনা মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। তার অনবদ্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যে রয়েছে, ভূমি ও কুসুম, পূর্ণ ছবির মগ্নতা, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, হাঙ্গর নদী গ্রেনেড, পোকা মাকড়ের ঘরবসতি, যাপিত জীবন, নীল ময়ূরের যৌবন, কাঁটাতারে প্রজাপতি, কাঠ কয়লার ছবি, নুন পান্তার গড়াগড়ি ও অন্যান্য। তার উপন্যাস ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ এ নামেই চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ও গল্পে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সুখ-দুঃখের উপাখ্যান হয়ে উঠেছে তার লেখনিতে।

তার রচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গণমানুষের সংগ্রাম হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। যা মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ধারণা দেয়। তিনি বাঙালি জীবনের সমাজ-সংকট ও সম্ভাবনার চিত্র , ছিটমহলের মানুষের জীবন, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে উপন্যাসে রূপ দিয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম নিয়েও তিনি তৈরি করেছেন অনবদ্য উপন্যাস।

কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ড. মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ এবং শিশু সাহিত্যে অবদানের জন্য এ বছর আনন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৫ লাভ করেন। ২০১০ সালে কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।


মেলায় যাওয়া

তখন রাত গভীর। অকার বারান্দায় একা বসে থাকে মাসুদা। চেয়ারে মাথা হেলান দিয়ে রাখে। অকারে ওকে পষ্ট দেখা যায় না। শুধু একটি আবরণের ছায়াচিত্র বারান্দায় স্থির হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে নড়ে এবং শূন্যতার সঙ্গে পাল্লা দেয়। আসলে মাসুদার দিনগুলো অকারের ফুটোয় ঢুকে গেছে।
দেয়াল ঘড়িতে তিনটে বাজে। ঘড়িটা কোথায় আসে এই মুহূর্তে মাসুদার তা মনে আসে না। শুধু শব্দ শুনতে পায়। শব্দ মাসুদাকে চমকে দেয়। ও চারদিকে তাকায়। রেলিংয়ের গায়ে লতিয়ে থাকা নীল অপরাজিতার লতাটা ছাড়া ও আর কিছু দেখতে পায় না। দিনের আলোতেও ও তেমন কিছু দেখতে পায় না। দূরের কোনো কিছু দেখার অভ্যাস ওর নেই। ছোটবেলা থেকেই দেখা না দেখার ভেতর দিয়ে ও বড় হয়েছে। বাকি রাতটুকু ওর একরকম না ঘুমিয়েই কেটে যায়। ঘুম না এলে বিছানাকে ওর বিছানাই মনে হয় না। তোষটাকে নারকেলের ছোবড়া, বালিশটা তুলোর পুঁটুলি এবং খাটটাকে নৌকার পাটাতনের মতো লাগে। একষট্টি বছর বয়সে এসে ও বালিকার বোঝা অনুভব করে নিজের ভেতরে।
ভোর হলে রুটিন বাঁধা জীবনের কথা মনে হয় ওর। রাতের সবটুকু অকারেই সেঁধিয়ে থাকে। দিনের বেলায় ও অন্য মাসুদা­ চুলচেরা খতিয়ে দেখা ওর দিনের বেশিরভাগ সময় কেড়ে নেয়। ও পা ঝুলিয়ে খাটে বসে থাকে। তারপর বাথরুমে যায়। আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে। ওর ঠিক মনে আছে যে আজ নিচতলার ভাড়াটিয়া মনসুর আলী আর তার স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। ওকে চাবি বুঝিয়ে দেবে। নাস্তা খেয়ে নিচতলায় নামতে হবে ওকে। খায়রুন রান্নাঘরে পরোটা বেলছে। পরোটা খেতে ভালোবাসে মাসুদা। পরোটা আর আলু ভাজি। কোনদিন ডিমের ওমলেট কিংবা সুজির হালুয়া। নাস্তা খেতে খেতে ও নিচের দু’জন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। ওরা বোধহয় যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে গেছে। ওর অপেক্ষা করছে। করুক, ও নিজেকে বলে। নিজের সঙ্গে কথা বলতে ও ভালোবাসে। ওর একমাত্র ছেলে সিহাব ঢাকায় পড়াশোনা করে। ছেলেটা চলে যাওয়ার পর থেকেই ওর এই অভ্যাস গড়ে উঠেছে। চা খেতে খেতে ও নিজেকে বলে, তোমরা দাঁড়িয়ে থাকো মনসুর আলী। আমি তোমাদের সুখী চেহারা দেখার জন্য বাজপাখির মতো উড়ে আসবো।
বাজপাখির মতো যাবে কেন মাসুদা?
কারণ ওই সুখী চেহারা খামচে দিতে চাই।
তুমি কি ভীষণ হিংসুক?
যার জীবনে না পাওয়ার কষ্ট থাকে। সে তো হিংসুক হবেই।
এর জন্য তোমার লজ্জা হয় না?
জানি না।
তোমার নিয়তি তুমি নিজেই বানিয়েছো মাসুদা।
থাক, উপদেশ দিও না।
মাসুদা চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেয়। খায়রুন কাছেই দাঁড়িয়েছিল। নাস্তা দিয়ে ও নিচে গিয়েছিল। চা শেষ হলে বলে, নিচতলার খালাআম্মা­
মাসুদা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে, থামো। আমি নিচে যাচ্ছি। নিচতলার ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, তা আমি জানি। আমি গেলে ওরা আমাকে ঘরের চাবি বুঝিয়ে দেবে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মাসুদা দেখতে পায় মধ্যবয়সী স্বামী-স্ত্রী গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। দু’জনের মুখেই মৃদু হাসির রেশ যেন তারা অলৌকিক কিছু একটা পেয়ে তার মধ্যে মগ্ন হয়ে আছে। মাসুদার মনে হয় যখনই ও ওদেরকে দেখতে পেয়েছে তখনই মনে হয়েছে ওরা দু’জনে দু’জনের মধ্যে নিমগ্ন। অন্য কাজের ফাঁকেও ওদের মধ্যে একটা যোগসূত্র দেখা যায়­ এটা যে কি মাসুদা তা ধরতে পারে না। সম্পর্কের এই দিকটি ওর জানা নেই। শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বাইশ বছর ঘর করার পরও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গভীরতা জমে ওঠেনি। দুজনে দূরে দূরেই থেকেছে। একমাত্র ছেলেও তাদের সম্পর্ককে জোড়া দিতে পারেনি। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপই মাসুদার চেনা, তবুও পা ফেলতে ভয় করে ওর। মনে হয় কতগুলো পাথর ডিঙিয়ে একটি অচেনা রাস্তা পার হতে হচ্ছে ওকে। সিঁড়ির দু’তিন ধাপ নামতেই নিশাত নিচ থেকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, কেমন আছেন মাসুদা আপা?
এই তো। আছি একরকম। দিন কেটে যায়।
আপনার কি শরীর খারাপ?
রাতে ঘুমুতে পারিনি। অনেক রাত পযন্ত জেগেছিলাম।
মনসুর আলী কণ্ঠে আফসোসের ধ্বনি উঠিয়ে বলে, আমাদের জন্য আপনাকে উঠতে হলো। নাইলে আরও কিছুক্ষণ ঘুমুতে পারতেন।
মাসুদা বিষণí হয়ে থাকে। জোর করে হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে। নিশাত চাবিটা ওর হাতে দিলে মাসুদা চাবি নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, আপনারা আমার বাড়িতে ছিলেন। আমার দিনগুলো ভালো কাটছিলো।
নিশাত হাসতে হাসতে বলে, আবার নতুন ভাড়াটিয়া পাবেন। আমাদের চেয়েও ভালো পাবেন। আপনার দিনগুলো ভালো কাটবে। অন্যরকমও হতে পারে।
মাসুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কে জানে তেমন ভাগ্য কি আমার হবে।
মনসুর ভীষণ সহানুভতির সঙ্গে বলে, আমাদেরই সামনে শাহাবুদ্দিন সাহেবের মৃত্যু হলো। আমরা ভুলবো না তাকে। যাক, আমরা যাচ্ছি। আপনি ভালো থাকুন। নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন।
তাছাড়া তাড়াতাড়ি ভাড়াটিয়া ঠিক করবেন। এতবড় বাড়িতে একা একা থাকা আপনার ঠিক হবে না। আপনার ছেলের পড়ালেখা শেষ হতে তো এখনো চার বছর।
মাসুদা অন্যমনস্ক হয়ে চাবি নাড়াচাড়া করে। নিশাতের কথার উত্তর দেয় না। ওরা চলে যায়। রিকশায় ওঠে। ওদের মালপত্র আগেই চলে গেছে। একসময় রাস্তার বাঁকে ওদের রিকশা আড়াল হয়ে যায়। মাসুদার ভীষণ মন খারাপ হয়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ওর আবার ভয় করতে শুরু করে। শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে যে সম্পর্কটা কোনো মাধুর্য-সৌন্দর্য তৈরি করেনি সেই ব্যবস্খার মধ্যেই জীবনটা কাটিয়ে দিল ও? ভয়টা ওখানেই। তাহলে কি সম্পর্কটা খুবই অনৈতিক ছিল? ছেলেটার জন্মের মধ্যেও তো প্রেম নেই! শুধু পরিচয় আছে। ও কার সন্তান এই পরিচয়।
মাসুদা সিঁড়িতে দু’পা উঠে নিজেকেই প্রশ্ন করে, সম্পর্কহীন জীবনের বাইরে আমার পরিচয় কি? কোথায় আমার আইডেনটিটি? ওর এবার রাগ হয়। নিজের জীবনকে ও অর্থবহ করতে পারেনি। শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তৈরি হওয়া সামাজিক বনের ফিতেটা ছিঁড়ে ফেলে ও নিজের মতো করে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে পারেনি। সেই সাহস ওর ছিল না।
ও এখন সুখী মানুষ দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। হিংসে করে। ভেতরে পুড়ে যায়। নিজেকে কীট ভাবে এবং ব্যর্থতার দায় নিজের ওপর চাপিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে। ও আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। ওর পিঠের ওপর চাবির গোছা টুনটুন বাজে। সেই শব্দ ওর শাহাবুদ্দিনের কণ্ঠের মতো লাগে। শাহাবুদ্দিন বেঁচে থাকতে প্রতিবাদ করতে পারেনি। এখন ওর ভেতরে ক্ষমতার þৃহা তড়পায়। ভাঙচুর করে ফেলতে ইচ্ছে করে এবং সে রকম ইচ্ছে থেকেই ও চাবির গোছাটা আঁচল থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে। সেটা গিয়ে ঘরের সামনের দরজার গায়ে ধাক্কা খেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সেই শব্দটাও শাহাবুদ্দিনের কর্কশ কণ্ঠস্বরের মতো ওর বাইশ বছরের বিবাহিত জীবনের মধ্যে ঝনঝন করে। মাসুদা দুপদাপ পা ফেলে ওপরে ওঠে। চাবির গোছাটা তুলে নিয়ে বিছানার ওপর ছুড়ে মারে।
নিজেকেই বলে, যার ওপর ঝাড়ার কথা তার ওপর ঝাড়তে পারেনি, এখন নিজের গায়ের ঝাল তুমি কার ওপর ঝাড়ছো মাসুদা?
নিজের ওপর। পারিনি কেন সেই ব্যর্থতার জন্য।
পারোনি ও জন্য কে তুমি একটি নিরাপদ জীবন চেয়েছিলে। শাহাবুদ্দিন তোমাকে এই বাড়িটি লিখে দিয়ে গেছে। ছেলের নামে দেয়নি।
দিলেই বা কি হতো? ছেলেতো আমারও।
তাতে বাড়িটার ওপরে তোমার অধিকার জন্মাতো না। ছেলের সঙ্গে বিরোধ হলে সে যদি তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিত, তখন?
মাসুদা চুপ করে থাকে? উত্তর খুঁজে পায় না।
মাসুদা তখন তোমার কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকতো না। তুমি নিজের বোঝা টানার মতো যোগ্য নও। যোগ্য হওয়ার চেষ্টাও করোনি। অবহেলায় জীবন কাটিয়েছো।
অবহেলায় নয়, নির্যাতনে, পীড়নে।
হা-হা করে হাসে অন্য মাসুদা। বলে, তুমি নির্যাতনেও যখন ঘর ছাড়নি তখনই বোঝা যায় যে তোমার মেরুদণ্ড নেই। তুমি ভীরু। চ্যালেঞ্জ নিতে পারো না। চ্যালেঞ্জ করতেও পারো না। সুতরাং এখনকার আচরণ আর তোমাকে মানায় না মাসুদা। যত পারো নিজের ভেতর কুঁকড়ে থাকো।
কিন্তু আমার না পাওয়ার অতৃপ্তি আমাকে মরমে মারে। আমার ভালোবাসাহীনতার অতৃপ্তি, দৈহিক সুখের অতৃপ্তি আমাকে ছেঁচড়ায়। আমার ভীষণ কষ্ট হয়।
স্তব্ধ হয়ে থাকে চারপাশ। কোথাও কোনো শব্দ নেই। কারো কণ্ঠস্বরও শোনা যায় না। শুধু খায়রুন মৃদু স্বরে ডাকে, খালাআম্মা।
মাসুদা বিস্মিত দৃষ্টিতে খায়রুনকে দেখে। ওর মনে হয় এই মুহূর্তে ও নিজে খায়রুন। এক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে শাহাবুদ্দিনের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। টেবিলজুড়ে শাহাবুদ্দিনের ব্যবসার কাগজপত্র। এ টেবিল ধরা আমার জন্য নিষিদ্ধ, এমনকি ধুলোবালি ঝেড়ে দেওয়াও নিষেধ করা আছে। ওর উপস্খিতি টের পেয়ে শাহাবুদ্দিন চোখ তোলে। আবার কাগজের ওপর চোখ নামায়। মাসুদা আস্তে করে বলে, লেবুর শরবত।
শাহাবুদ্দিনের গম্ভীর কণ্ঠ, রাখো।
মাসুদা গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
শাহাবুদ্দিন খেঁকিয়ে বলে, কি হলো রাখতে বললাম না।
মাসুদা গলার স্বর উঁচু করেই বলে, কোথায় রাখবো। সব জায়গায় তো তোমার কাগজ। কাগজ ধরলে তো তুমি রাগ করো। টেবিল মুছতে দাও না।
শাহাবুদ্দিন মাথা না তুলেই বলে, তোমার কাজ রান্নাঘরে। আমার ব্যবসার কাগজপত্র গোছানোর কাজ তোমার না।
যার যা কাজ সে সেই কাজ করবে।
হাতের কলমটা টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে, গ্লাসটা টেবিলের ওই কোনায় রাখো। কাগজটা বাম দিকে সরাও।
মাসুদা গ্লাসটা শব্দ করে টেবিলের ওপর রাখে। বেশ জোরেই শব্দ হয়।
শাহাবুদ্দিনের গম্ভীর কণ্ঠ, মেজাজ করছো কেন?
মাসুদা সশব্দে চেয়ার টেনে বসে।
বসলে যে? এখানে তো তোমার কোনো কাজ নেই।
তোমার কাছে আমার কাজই বা কি অকাজই বা কি তা আমি বুঝি না। আমার তো মানসিক চাহিদা আছে। তা নিয়ে তুমি কিছু ভাবো না। ভাবলেও আমি জানতে পারি না।
ভাবি না মানে? তোমাকে আমি বাপের টিনের বাড়ি থেকে তুলে এনে দালানে রেখেছি। হাজার হাজার টাকা দেই। খাওয়া দাওয়ার অভাব নেই। চাইলে শাড়ি গয়না কিনতে পারো। সিনেমা দেখতে পারো। আর কি ভাববো?
আমার তো একটা মন আছে। আমি ভালোবাসা চাই। আদর-সোহাগ চাই। আমি আরও অনেক কিছু চাই যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
যা পেয়েছো তা নিয়েই খুশি থাকো। বেশি চাইলেই দেয়া যায় না।
সেদিন অট্টহাসিতে ভেঙে পড়েছিল শাহাবুদ্দিন। যেন এর চেয়ে আজব কথা ও আর কখনো শোনেনি­ ঐ অদ্ভুত, এত অবাস্তব কথা। এই মুহূর্তে ওর মনে হয় শাহাবুদ্দিনের কাছে ও খায়রুনই ছিল­ খায়রুন যেমন ওর কাছে আছে রান্নাঘরের কাজের লোক হিসেবে। ও তখন খায়রুনকে বলে, খায়রুন চলো আমরা দু’জনের নাম বদল করে ফেলি।
খালাআম্মা, আপনের কথা আমি বুঝতে পারি নাই।
আমি বলেছি আমরা আমাদের নাম বদল করতে পারি। আজ থেকে তুমি মাসুদা আর আমি খায়রুন।
ছি: ছি: খালাআম্মা কি যে কন!
খায়রুন দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে চলে যায়। মাসুদা ধীর পায়ে শোবার ঘরে আসে। মনে হয় অসুস্খ শাহাবুদ্দিন জানালার ধারের চেয়ারটায় বসে আছে। সামনের টেবিলে পা ওঠানো। পায়ের কাছে খবরের কাগজ, ওষুধের শিশি, হরলিক্সের গ্লাস। ও শাহাবুদ্দিনসহ পুরো চিত্রটি দেখে বেরিয়ে আসে। দরজায় দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আবার তাকায়। বুঝতে পারে শাহাবুদ্দিনের ভ্রূক্ষেপ নেই। ও বারান্দার কোনায় এসে দাঁড়ায়। আকাশ দেখে। ঝকঝকে নীল আকাশ দেখে নি:সঙ্গতায় বিষণí হয়ে থাকে। ঘরে ঢুকে এক টুকরো কাগজ আনে। পাখি বানিয়ে দূরে ছুড়ে দেয়। আবার ফিরে আসে ঘরের দরজায়।
শাহাবুদ্দিন নির্বিকার সিগারেট টানছিল। মাসুদাকে দেখে মুখ ঘোরায়।
কিছু বলবে?
মাসুদা না সূচক মাথা নাড়ে।
এত অস্খিরতা কেন? শাহাবুদ্দিন পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করে। বলে, আমি বিরক্ত বোধ করছি।
তোমার বিরক্তিতে আমার কিছু এসে যায় না।
শাহাবুদ্দিন কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মাসুদার মনে হয় লোকটা অসুস্খ না হলে ওকে একটা কড়া কথা শোনাতো। ইদানীং লোকটি সেই জোর হারিয়েছে। মাসুদা সেদিন বেশ স্বস্তি বোধ করছিল। লোকটি ক্ষমতাহীন হচ্ছে এই আনন্দ ও উপভোগ করেছিল।
শুনতে পায় খায়রুন ওকে আবার ডাকছে।
খালাআম্মা আইজ কি রান্না করুম।
তোমার যা খুশি। আমাকে জিজ্ঞেস করো না। আমার কিছু ভালো লাগছে না।
খালু মারা যাওয়ার পরে আপনে খাওয়া-দাওয়া ছাইড়া দিছেন।
মাসুদা ওর দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, কে বলেছে তোমাকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছি? কেন খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেবো? কেন ছাড়াবো? একটা আজব লোক ছিল। আমার জন্য কোনো মায়া দেখায়নি। বিয়ের বাইশ বছর আমি প্রায়ই একা একা দেখেছি। ওর জন্য আমার কোনো মন খারাপ নেই।
খায়রুন খানিকটা অবাক হয়, খানিকটা বিভ্রান্ত হয়। তারপর একটা পথ খুঁজে বের করার জন্য আগ্রহ নিয়ে বলে, আইজকে আমি আপনেরে মেলা ভর্তা খাওয়ামু খালাআম্মা।
মাসুদা হাসতে হাসতে উড়িয়ে দেয় জীবনের আড়াল রাখা জায়গাটুকু। বলে, খুব ভালো। আমিতো ভর্তা মাখিয়ে ভাত খেতে ভালোবাসি।
খালু এইসব খাইতেন না। তিনি ছিলেন মাছ-গোসের লোক। মাগো খালু খাইতেও পারতেন। খালু নাই, আমার রান্নাবাড়াও নাই।
খিলখিলিয়ে হাসে খায়রুন। মাসুদার মনে হয় খায়রুনের মধ্যেও মুক্তির আনন্দ আছে। লোকটার জন্য করা ভারী কাজ থেকে মুক্তির আনন্দ। আশ্চর্য! মাসুদার এমন অভিজ্ঞতা হবে ও নিজেও তা ভাবেনি। কত ধরনের মুক্তির আনন্দ যে হতে পারে। একজন আর একজনকে কতভাবে পীড়ন করে। খায়রুনের কথায় মাসুদার বুকের ভার কমতে থাকে।
সাত দিনের মাথায় নতুন ভাড়াটিয়া আসে বাড়িতে। তরুণ দম্পতি। মাস দু’য়েক আগে বিয়ে হয়েছে। চাকরি সূত্রে এই শহরে এসেছে। মাসুদার ছেলেমেয়ে দুটিকে খুব পছন্দ হয়। ওরা উচ্ছল-চঞ্চল, তড়বড়িয়ে কথা বলে, অকারণে হাসে। প্রাণখোলা। মাসুদার সঙ্গে কথা বলে দু’জনে সিঁড়ি দিয়ে আসার সময় খসরু বলে, বাড়িটা বেশ নিরিবিলি।
লিপিও খুশির স্বরে বলে, আমাদের নতুন সংসার। আমরা যেমন খুশি তেমন করে থাকতে পারবো।
খসরু কৌতুকের স্বরে বলে, যেমন খুশি তেমন বলতে কী বোঝাতে চাও?
লিপিও কম যায় না। সপ্রতিভ ভাবে বলে, কি বোঝাতে চাই বুঝে নাও তুমি। সব কথা বলে দিলে কি রোমান্স থাকে।
খসরুর হাসি থামে না।
রহস্য করছো? ঠিক আছে। রোমান্সটুকু ধরেই রাখো। তবে বোঝা আমার হয়ে গেছে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে ওদের হাসি-কথা শোনে মাসুদা। ভাবে, এমন প্রাণখোলা হাসি এই বাড়িতে কখনো শোনেনি ও। ওর অস্খির লাগে। প্রাণবন্ত হাসির উচ্ছ্বাসে ও দু’হাতে কান চেপে ধরে।
যতদিন যায় মাসুদার ভেতরটায় উথাল-পাতাল শুরু হয়। খসরু আর লিপির এমন খোলামেলা, এমন আপন-করা সম্পর্ক মাসুদার ভেতরটা এলোমেলো করে দেয়। এ যেন এক অচেনা জগত­ খুলে গেছে হাজার দরজা­ ঢুকে যাচ্ছে আলো-বাতাস-মেঘ-বৃষ্টি। মাসুদার মনে হয় সবকিছু ওর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ও বুঝি সামলাতে পারছে না।
একদিন ফুলের টবে পানি দেয়ার সময় মাসুদা শুনতে পায় দু’জনের কণ্ঠে গান; আমার পরানো যাহা চায়, তুমি তাই গো। ও কান খাড়া করে শোনে। এমন শোনা ওর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। মাঝে মাঝে নিচের বারান্দা থেকে ওদের কথা পষ্ট শুনতে পেলে ও দাঁড়িয়ে পড়ে। আজও তাই হলো। এক লাইন গান গেয়ে খসরু বলে, লিপি দেখো এ বাড়ি কার ছিল, অর্থাৎ মরহুম শাহাবুদ্দিন, তিনি বোধহয় খুব রসকষহীন লোক ছিলেন।
লিপি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কেন তোমার এমন কথা মনে হচ্ছে?
তিনি বোধহয় ব্যবসা-ট্যাবসা একটু বেশি বুঝতেন­ অর্থাৎ ভালোবাসার চেয়ে। প্রেম বলে কোনো শব্দ আছে কিনা এসব বোধহয় তিনি জানতেন না।
কেন এসব কথা বলছো?
খালাআম্মাকে দেখে। তার পুরো অবয়বে বৈধব্যের মাধুর্য নেই। নি:সঙ্গতায় তীব্রতা আছে। স্বামীর সাহচর্য পাননি বলে আমার মনে হয়েছে। তিনি খুবই বিধ্বস্ত মানুষ।
দার্শনিকের মতো কথা বলছো দেখছি।
ঠিক বুঝেছি কিনা বলো।
মনে হয় বুঝেছো। কিন্তু বৈধব্যের মাধুর্য কি বলতো?
খসরু হাসতে হাসতে বলে, শুনে ভয় পাচ্ছ?
বাজে কথা বলো না। ঠিক ঠিক উত্তর দাও।
খসরু লিপির মাথায় হাত রেখে বলে, ধরো একজন নারীর স্বামীতো মারা যেতেই পারে, তাই না?
লিপি কথা না বলে ঘাড় নাড়ায়।
খসরু এক মুহূর্ত ভাবে। তারপর জোর দিয়ে বলে, আমার বাবা মারা যাবার পরে মাকে তো দেখেছিলাম। তাকে এমন বিপর্যস্ত দেখিনি। এমন অতৃপ্ত, ক্লান্ত। খালাআম্মাকে দেখে মনে হয় সংসারটা তার কাছে শুধু একটা যুদ্ধ ছিল।
খসরুর ব্যাখ্যা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় লিপি। ওর কেমন ভয় করে। ওর জীবনটা ঠিকঠাক মতো চলবে তো? মাসুদার মুখটা মনে করলে ওর মনে হয় খসরু বোধহয় ঠিকই বলেছে। সবটুকু যদি নাও হয় তবু কাছাকাছি ঠিক। মাসুদার জীবনে একটি বিশাল অপ্রাপ্তির ফোঁকর আছে।
পরদিন দু’জনে সেজেগুঁজে সারাদিন বেড়াবে বলে বের হয়।
যাবার আগে মাসুদার কাছে বাড়ির চাবিটা রেখে যেতে আসে।
খালাআম্মা আমরা বাইরে যাচ্ছি। আপনার কাছে চাবিটা রেখে যেতে চাই।
মাসুদা মুগ্ধ চোখে দু’জনকে দেখে। তাকিয়েই থাকে। লিপি খসরুর দিকে তাকায়। ওদের কাছে মাসুদা অপরিচিত হয়ে ওঠে। ওরা বিব্রত হয়।
খালা আম্মা
মাসুদা লিপির ডাকে সাড়া দেয় না।
খালা আম্মা
খসরুর ডাকে চমকে ওঠে মাসুদা। মৃদু হেসে বলে, তোমাদের খুব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে­ মনে হচ্ছে তোমরা বুঝি আকাশ থেকে উড়ে এসে নেমোছো।
দুজনে হো-হো করে হাসে।
মাসুদা ভুরু কুঁচকে তাকায়।
আমি এমন কি বলেছি। তোমরা হাসলে যে?
আপনি কবিতার মতো করে বলেছেন। আমরা সারাদিন ফিরবো না। দু’জনে নৌকা নিয়ে নদীতে ঘুরবো। বাইরে খাবো। আজ আমরা যা খুশি তা করবো। আসি খালাআম্মা।
দু’জনে বেরিয়ে যায়। মাসুদা রেলিংয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ওদের দেখে। ওর মাথাটা কেমন করে।
সারাদিন ওর খারাপ যায়। রাতে বারান্দায় একা বসে থাকে। দেয়াল ঘড়িতে তিনটে বাজার শব্দ। কবে যে শাহাবুদ্দিন ঘড়িটা কিনেছিল। কয় বছর হবে? ও মনে করতে পারছে না। শুধু মনে হয় তিনটে বাজার শব্দ ঘুরে ঘুরে বাজতেই থাকে। এর বাইরে চারদিকে আর কোথাও শব্দ নেই। ও ভয় পায়। যদি আকস্মিকভাবে বেজে ওঠে খসরু আর লিপির শব্দ? তাহলে পুরো জীবনের নি:সঙ্গতার সরষে ক্ষেতে বজ্রপাত হবে। এমন কিছু এ মুহূর্তে চায় না। উঠে পায়চারি করে। বুঝতে পারে ওর চারপাশে অকারের রামরাজত্ব কঠিন এবং নিরেট। সেই মুহূর্তে ওর সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয় যে ওদেরকে চলে যেতে বলবে। এ বাড়িতে ওরা থাকলে ওর গোছানো জীবনের বাকিটুকু ছেঁড়া তুলোর মতো টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে উড়বে। ওর আর নতুন জায়গা তৈরি করার ইচ্ছে নেই। ও ঘুরেফিরে আবার চেয়ারে এসে বসলে ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ প্রবল হয়ে উঠতে শোনে।
ওদেরকে বাড়ি ছাড়ার কথা বলতেই খসরু বলে, আমিও আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম খালাআম্মা যে, আমি অফিস থেকে একটি ছোট কোয়ার্টার পেয়েছি। সামনের মাসে উঠে যাবো। একটা দিন আপনার সঙ্গেই কাটাবো।
লিপির আব্দারে কণ্ঠ, আপনি আমাদের না করবেন না। মাস শেষ হতে যে ক’টা দিন শুধু সে ক’টা দিনই তো দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যাবে।
মাসুদা ঘাড় নাড়ে। নিজেকে বলে, এদের সঙ্গে তারা যাবে না। এরা অনেক কিছু পারে। মাসুদা ওদের মতো পারেনি। নিজের না-পারাটা মাঝে মাঝে এমন প্রবল হয়ে ওঠে যে ওর তখন ভয় লাগে। ভয়ে কুঁকড়ে যায়। যেতে যেতে লিপি বলে, খালাআম্মা আমি আপনাকে একদিন রান্না করে খাওয়াবো। আপনি কি খেতে ভালোবাসেন, বলবেন। আমার মনে হয় আমি ভালোই রান্না করি।
আবার দু’জনের বাঁধভাঙা কলকল হাসি। ছিঁড়তে থাকে মাসুদার অনাগত জীবনের বাকিটুকু। ওরা চলে যেতেই দু’হাতে কান চেপে বিছানায় বসলেই আজ প্রবল কান্না ওকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মাসুদার মনে হয় এখন কান্নারই উপযুক্ত সময়­ কাঁদতে ওর ভালো লাগছে, কাঁদতে কাঁদতে ও ঘুমিয়ে পড়েথ­ সেই ছোটবেলার মতো, যখন কিছু না পেয়ে কেঁদেছে, বকুনি খেয়ে কেঁদেছে কিংবা কিছু করতে না পারার কারণে চিৎকার করে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলেছে।
ক’দিন পরই লিপি একগাদা বেলি ফুল নিয়ে খুব ভোরে দরজায় কড়া নাড়ে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের গে মোহিত হয়ে যায় মাসুদা।
শুভ নববর্ষ খালাআম্মা। আজ পয়লা বৈশাখ।
ও হ্যাঁ, তাই তো।
মাসুদা ফুলগুলো নিতে নিতে দেখতে পায় লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরা লিপির খোঁপায় বেলি ফুলের মালা জড়ানো।
এত ভোরে কোথায় যাচ্ছো?
দু’জনে একবেলা ঘুরবো। বৈশাখী মেলার, নাচ-গানের অনুষ্ঠানে। বৈশাখী ঝড়ের মতো ঘোরা খালাআম্মা। ফেরার সময় আপনার জন্য কদমা, নাড়, বাঁশের বাঁশি নিয়ে আসবো। ছোটবেলার মতো বাঁশি বাজাবেন আপনি। আর রাতে আমাদের সঙ্গে যাবেন। খিচুড়ি আর সরষে ইলিশ। ঠিক আছে তো?
আসি। খসরু রাস্তার। রিকশা দাঁড় করাতে গেছে।
ছটফটিয়ে চলে যায় লিপি। রেখে যায় ফুলের সুবাস। সাদা-লাল রঙ। সরষে ইলিশের ঘ্রাণ। মাসুদা অভিভতের মতো ভাবে, জীবন এত সুন্দর! ওরা এখানে না থাকলে এতকিছু ওর জানাই হতো না। আরেক পৃথিবীর পর্দাটা এভাবে উঠে যাবে ভাবেইনি কখনো­ সেই ফাঁক-ফোকরে না দখিনা বাতাস ঢুকবে ভাবেনি­ এই বোধ যন্ত্রণার সুঁচিমুখ কাঁটা হবে ভাবেনি কখনো। মাসুদা ফুলের গ নিতে নিতে অবসন্নবোধ করে। তারপর একটি একটি বেলি ফুল ঘরের নানা জায়গায় ছড়াতে থাকে। কত পয়লা বৈশাখ পার হয়ে গেছে তার হিসেব করে। শাহাবুদ্দিন কখনো এসব দিন মনে করেনি। ও নিজেও না। একটি দিনের আনন্দ এবং আয়োজন অন্যরকম হয় এই বোধের ভেতর ঢুকে মাসুদা শহরটায় ঘুরবে বলে বের হতে চায়। আবার পিছিয়ে পড়ে। তার তো নতুন শাড়ি নেই, লাল পাড়ের সাদা রঙের শাড়ি। কখনো উৎসবের কথা ভেবে শাড়ি কেনা হয়নি।
খায়রুন কাছে এসে ডাকে, খালাআম্মা। ফুল কে দিল আপনেরে?
লিপি। ও আজ পরির মতো সেজেছিল।
সাজবো না, আজ তো পয়লা বৈশাখ। আমারে ছুটি দিবেন। আমি মেলায় যামু।
হ। প্রত্যেক বছরই আমি মেলায় যাই। মেলায় গেলে­
তোমার কি লাল পেড়ে সাদা শাড়ি আছে।
নাই। ওইসব বড়লোকের সাজগোজ। আমার যা আছে তাই পরমু।
মাসুদা খায়রুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। শাড়ি নেই তো কি হয়েছে, খায়রুনের মন তৈরি আছে। ও উৎসবে মাততে পারে। তাহলে খায়রুনের জীবনে কি কোনো ঘাটতি নেই? ওর জীবনের সব জায়গাটি কি পূর্ণ। মাসুদা নিজেকে সামলায়। বুঝতে পারেনি। খায়রুন গরিব। দারিদ্র্য আছে। কিন্তু খায়রুন পূর্ণ মানুষ। ও জীবনের নানাকিছুই বোঝে। গর্তগুলো বোজাতে জানে। তাই তো খায়রুনের বেঁচে থাকা নিরানন্দ নয়।
খালা আম্মা আজ আমি ঘর ঝাড় দিমু না।
কেন?
আপনে যে ফুল ছিটাইলেন তার লাগি। ফুলের গায়ে আজ ঝাড় লাগামু না। যেমুন আছে তেমুন থাকুক।
মাসুদার সামনে আবার একটি ধাক্কা। আবার খায়রুনের পূর্ণ মানুষের চিত্র দেখা। ও ধীর পায়ে সরে যায়। নিজেকে সামলানোর জন্য বাথরুমে গিয়ে ঢোকে।
দ্রুতহাতে লুচি ভেজে, হালুয়া বানিয়ে টেবিলে দিয়ে বলে, আপনে খান। আমি অহন মেলায় যামু। দুপুরের আগেই আইসা পড়ম। আপনে ভাববেন না খালা আম্মা।
মাসুদা আস্তে করে বলে, যাও।
লুচি আর হালুয়া খেতে খেতে দেখতে পায় খায়রুন তুলে রাখা একটি ছাপার শাড়ি পরেছে। কপালে লাল রঙের টিপ পরেছে। পায়ে পঞ্জের স্যান্ডেল। মাসুদার মনে হয় মধ্যবয়সী খায়রুনকেও আজ পরীর মতো লাগছে। ও চলে গেলে মাসুদা দরজা ব করে না। হুড়হুড়িয়ে বাতাস ঢোকে। ফুলগুলো এমাথা-ওমাথায় গড়িয়ে যায়।
দুপুরের অনেক আগে হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে আসে খায়রুন। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, খালা আম্মাগো সর্ব্বনাশ­
কি হয়েছে?
খসরু ভাই আর লিপি আপা শ্যাষ।
মানে?
ওনারা দুইজনে মেলায় মুখোস কিনতাছিল। তখনই বোমাডা ফুটছে। দুইজনেই টুকরা টুকরা হইয়া গেছে। খালা আম্মাগো­
তুমি ঠিক দেখেছো?
হ, দেইখাইতো আসছি। আমিও তো মেলায় আছিলাম। এর একটু দূরে।
বোমা ফাটালো কে?
কে আবার, জঙ্গিরা। মানুষেরা কইলো, ইসলামী জঙ্গিরা।
মাসুদা হাঁ করে তাকিয়ে থেকে খায়রুনের হাত ধরে বলে, চলো। আমি মেলায় যাবো।
মেলায় যাইবেন?
ওরা তো এই শহরে চাকরি করতে এসেছিল। এখানে তো ওদের কেউ নেই। আমাকেই তো যেতে হবে ওদের কাছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত