যা আছে তা একটা অপেক্ষা

আর লিখতে ইচ্ছে করে না । লিখতে লিখতে বয়স বেড়ে চলে । আঙুল ব্যথা করে । লিখতে ইচ্ছে করে না আর । না কবিতা , না অণুগল্প , না চিঠি । উপন্যাস তো নয়- ই । ডায়রি লিখি না কতকাল । কেবল কিছু ঘটনা , কিছু আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা , ছোট ছোট যন্ত্রনা , কিছু বেদনা , অযুত- নিযুত অপমান-কোলাজ গল্পের মোড়কে লেখা যেতে পারে । তাতেও আর আগ্রহ পাই না । কী হবে এত লিখে ! সেই ‘৯৪ সাল থেকে লিখছি । লিখতে লিখতে বুঝেছি নতুন কিছুই আর বলতে পারছি না । নতুন কিছুই লিখতে পারছি না । তাহলে কেন বৃথা এই পন্ডশ্রম ? আজকাল খুব ক্লান্ত লাগে ।
চারপাশে যখন দেখি বড় বড় লেখকরা কত ভালো লিখছে । নিত্য – নতুন ভাবনা ভাবছে । আমি পারছি না । আমার ভেতর খুব শূন্য হয়ে আছে । ফাঁকা । ফাঁপা । একজন ‘ হলো ম্যান ‘– শূন্য মানুষ । ভেতর ফাঁকা হয়ে গেলে কী আর লেখা যায় ? বোধের শূন্যতা , অন্তরের শূন্যতা বৃহৎ বা মহৎ কোনো সৃষ্টির জন্ম দিতে পারে না । সাময়িক শূন্যতা বা সাময়িক বিষাদ ভালো , চিরকালীন বিষাদ ভালো নয় ।
ভালো মানুষ না হলে ভালো লেখক হওয়া যায় না বলেই আমার বিশ্বাস ছিল । দেখেছি ব্যক্তিগত জীবনে অনেক খারাপ মানুষ ভালো লেখক । যদিও এইটে জীবনের একটা দিক । ভালো লেখক হবার জন্য ভালো মানুষ হতে হবে একথা কে বললে ? তবে আমার বিশ্বাস , আমার চিন্তা , আমার আদর্শ কী দিন দিন তবে ভুল প্রমান হচ্ছে ! এতটাই ভুল কিছু লিখতে সাহস হয় না । সমাজে ও বর্তমান সময়ে একটা বিরাট পরিবর্তন আসছে । সে পরিবর্তন আমি ভেতর থেকে যখন মেনে নিতে পারছি না , তখন লেখা কীভাবে হবে ! চরিত্রগুলির ওপর বিশ্লেষণ সঠিক হবে কেমন করে ? এসব ভাবি– ভাবতে হচ্ছে । সময়টাই যে এমন । ভালো লেখক না হলেও চলবে , ভালো মানুষ হতে হবে আগে — এই বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারি না আজো ।তাকে ভেতরে ভেতরে লালন করি ।
ভেতরে ভেতরে পোকায় কাটছে । ভেতরে ভেতরে একটা রাগী নদী ফুঁসছে । একটা ভাঙনের উৎসব চলছে । এই ভাঙন কী লেখার ক্ষতি করছে না ?
দু’জনে
নদীর কাছে বসবো
এমন-ই কথা ছিল
দু’জনে
নদীর কাছে বসবো
নদীর তীরে বালি , ঢেউ
                  শুকনো বটফল
দু’জনে
নদীর কাছে বসবো
এমন-ই কথা ছিল ,
                    কথা ছিল…(দু’জনে)
ভালো লিখতে গেলে নদীর কাছে যেতে হবে । সবুজ দীর্ঘ মাঠ । মাঠের ভিতর সরু একটা রাস্তা । রাস্তার শেষে গুমটি দোকান । এক কাপ লিকার চা একটা বিস্কুট । চলতে চলতে সমুদ্রের কাছে যেতে হবে । গিয়ে বসতে হবে একাকী নির্জনে । সমস্যা এই , আজকাল নির্জনতা কোথাও নেই । সর্বত্র-ই কোলাহল । কেবল আনন্দ উদ্ যাপন , ভোগের উদযাপন । আমার নিজস্ব কোনো উদযাপন নেই , তাকিয়ে থাকা ছাড়া । আজকাল বড়ো ক্লান্ত লাগে । কেবল একটা দূরের ডাক শুনতে পাই । একটা ‘ এসো এসো ‘ মগ্ন করা ডাক । কে ডাকে বুঝিনা । তবু শুনি । আর ভেতরে মস্ত একটা চুপ , মস্ত একটা খিদে , মস্ত একটা না-ঘুম শহর আমাকে গিলতে আসে । আমি বেদনায় বেদনায় আবিষ্ট থেকে আবিষ্টতর হয়ে পৌঁছে যাই প্রেতপুরীতে । অন্ধকারে চোখ জ্বালা করে । ঘুমুতে চাই অথচ কে যেন জাগিয়ে রাখে ? সারারাত জাগিয়ে রাখে ।  সে কী পরম ? সে কী লীলাময় ? মাঝরাতে আমার এই একলা প্রেতপুরীর বাইরে হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামে । শুনি একটা কুকুর ক্রমাগত কাঁদতে থাকে । আমার সমস্ত শরীর বৃষ্টি হয়ে উঠতে চায় । আমি ছুটে বাইরে চলে যাই ।  ভিজি । খুব ভিজি । ভিজতে ভিজতে কান্না পায় । নিজেকেই খুব গাল দিই । অথচ আমার শরীরটা শুয়ে থাকে বিছানায় । তাহলে কে গিয়ে ভেজে ?  কে গাল দেয় ? কার কান্না পায় ?
এই দুই আমিকে নিয়ে ভারী বিড়ম্বনা হয়েছে আমার । দেখি অন্ধকার একটু একটু করে  কেটে যাচ্ছে– আলো ফুটছে– ভোরের আলো । এখন শিউলি ফোটার সময় । এখন ছাতিম ফোটার সময় । এই তো সেদিন ছাতিমের গন্ধ পেয়েছিলাম  । এক টুকরো গন্ধ । মৃত্যুর পরেও যেন এই রকম গন্ধ পাই । যেখানে যেতে চাই তা নৈঃশব্দ্যের মন্দির । এত কোলাহল ভালো লাগে না । এই ফেসবুক , ফোন , টুংটাং এস এম এস — এইসব ব্যস্ততা পেরিয়ে যেখানে যেতে চাই সেখানে কেউ চিনবে না আমায় । আমিও চিনব না কাউকে । শুধু নদী — শুধু ঢেউ— শুধু পাহাড় চাই আমার ।
সত্যি বলছি , লিখতে আর ভালোই লাগে না । আসলে সব লেখাই ভেতরে ভেতরে কেউ লিখে ফেলেছে সেই কবে ! আমার নতুন করে কিছুই আর লেখার নেই । যা আছে তা একটা অপেক্ষা…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত