ভাষা আন্দোলনের আরেক অধ্যায় ‘শিলচর’

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বুকে তরুণ তাজা প্রাণের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা জানা থাকলেও ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় তৎকালীন অবিভক্ত কাছাড় জেলার শিলচরে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য যে আন্দোলন  সে ঘটনার কথা আমাদের অনেকের হয়তো জানা নেই। বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সেই লড়াইয়ে পুরুষের পাশাপাশি একজন নারীও সেদিন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। তার নাম কমলা ভট্টাচার্য। ১৬ বছর বয়সী এ তরুণীই হল সমগ্র বাঙালি নারী সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী পৃথিবীর সর্বপ্রথম শহীদ নারী ভাষাসৈনিক।

এত কিছুর পরও রহস্যাবৃতই রয়ে গেল’ ৬১-এর ভাষা আন্দোলন। ভারতের আসামে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ ১১ জনের মৃত্যুরহস্য উন্মোচনে ভারত সরকারের অনীহা একরকম গা-সওয়াই হয়ে গেছে আসামের বাঙালিদের। তাই ১৯ মে এখনো ক্যালেন্ডারের একটি দিনমাত্র, বেশি কিছু নয়। শুধু শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক প্রদান আর গুরুগম্ভীর আলোচনার মাধ্যমেই শহীদদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে শিলচরের মানুষ। এর বাইরে ১৯ মে নিয়ে শিলচরেরই তেমন আগ্রহ চোখে পড়ে না।

আসাম মূলত দুই নদের অববাহিকা অঞ্চলে বিভক্ত। ব্রহ্মপুত্র ও বরাক। দুই নদের অববাহিকা অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি ভৌগোলিক অবস্থানেও বিস্তর ফারাক। ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয় ছাড়াও বাংলাদেশ দিয়ে ঘেরা বরাক। অসমিয়া নয়, এখানে সবাই কথা বলেন বাংলায়। খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিও বাঙালিদের মতোই।

বরাকের বাঙালিরা প্রথম থেকেই সংখ্যালঘু অসমিয়াদের দাদাগিরির শিকার। ১৯৬০ সালে অসম প্রদেশ কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় গোটা রাজ্যে শুধু অসমিয়া ভাষাই সরকারি স্বীকৃতি পাবে। প্রতিবেশী পূর্ব পাকিস্তানে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনায় সমৃদ্ধ বরাকের বাঙালিরা প্রতিবাদে শামিল হন। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে গোটা বরাকজুড়ে শুরু হয় আন্দোলন। এই আন্দোলনকে গুরুত্ব না দিয়ে কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমল প্রসাদ চালিহা ১০ অক্টোবর বিধানসভায় বিল আনেন একমাত্র অসমিয়া ভাষার সরকারি স্বীকৃতির।

অসমিয়াদের তীব্র বাঙালিবিদ্বেষের প্রতিবাদে ঝড় ওঠে বরাক উপত্যকায়। শুরু হয় গণ-আন্দোলন।’ ৬১-এর ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় কাছাড় গণসংগ্রাম কমিটি। বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন পায় নতুন গতি। ১৪ এপ্রিল বরাকের কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে পালিত হয় সংকল্প দিবস। ১৩ এপ্রিল গণসংগ্রাম কমিটির নেতা রবীন্দ্রনাথ সেন ১৯ মে ১২ ঘণ্টার হরতালের ডাক দেন।

বাঙালির আন্দোলনের তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আসাম সরকারের দমন-পীড়নও। পুলিশ, আধা-সেনা নামিয়ে আন্দোলন দমানোর সব রকম চেষ্টা শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়-এই অজুহাতে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ১৯ মের আগে থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীতে ছেয়ে যায় বরাক উপত্যকা। ১২ মে থেকেই সেনা কমান্ডে পরিচালিত আসাম রাইফেলস জওয়ানেরা শুরু করেন ফ্ল্যাগ মার্চ। ১৮ মে গ্রেপ্তার হন রবীন্দ্রনাথ সেন, নলিনীকান্ত দাশ, বিধুভূষণ চৌধুরীসহ ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা।

অবশেষে আসে ১৯ মের কালো দিন। সকাল থেকেই সত্যাগ্রহীরা অহিংসভাবে হরতাল পালন করছিলেন। তিন জেলাতেই পিকেটারদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিলচরের তারাপুর রেলস্টেশনেও শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল অবরোধ। ভারতীয় সময় বেলা ২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বিনা প্ররোচনায় নিরাপত্তারক্ষীরা ১৭ রাউন্ড গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন নয়জন ভাষাসৈনিক। পরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। জখম হন আরও একজন। বায়ান্নর পর’ ৬১, মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিলেন বাঙালি। শহীদ হলেন, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আরও ২৪ বছর বেঁচে ছিলেন কৃষ্ণকান্ত বিশ্বাস। এই আন্দোলনের পর বাংলা ভাষা বরাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

কিন্তু ওইটুকুই। ২০১১ সালে, ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদ কমলা ভট্টাচার্য মূর্তি স্থাপন কমিটির পক্ষ থেকে গোপা দত্ত আইচ ছোটেলাল শেঠ ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণে কমলার একটি ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন। ২০১৬ সালে আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনে নিহতরা রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা প্রাপ্ত হন। শহীদদের সম্মানে শিলচর রেল স্টেশনটির নামকরণ করা হয় ভাষা শহীদ স্টেশন।
আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালিরা আজও বঞ্চিত। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য ছোট ছোট জনগোষ্ঠী পৃথক রাজ্য পেলেও বরাক থেকে দাবিটুকুও উঠছে না সেভাবে। জনসংখ্যার নিরিখে বরাক যদি পৃথক রাজ্য হয়, তবে সেটা হবে উত্তর-পূর্ব ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য। বর্তমানে এই অঞ্চলের আট রাজ্যের মধ্যে ৩৮ লাখের ত্রিপুরা দ্বিতীয় বৃহত্তম। বরাকের লোকসংখ্যা ৪২ লাখেরও বেশি।

একুশে ফ্রেব্রুয়ারির মতোই ১৯ মে বাঙালিদের চেতনাকে জাগ্রত করে। প্রতি বছরই ভাষা শহীদদের স্মরণ করা হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, সেদিন যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গেও। ১৯ মে-র মত এমন একটি মহান ঘটনা স্মরণ করা এবং ভাষাসৈনিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। শুধু ২১ ফেব্রুয়ারির দিনটিকে ঘিরে বাংলা ভাষার চর্চা বা আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। সারা বছর এ ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ বা ভাষাভিত্তিক কর্মকাণ্ড খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না।  ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ‘শহীদ দিবসে’ও আমরা তাদের সেই মহান আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করতে পারি। বাঙালি হিসেবে সেটাই হবে তাদের পবিত্র আত্মার প্রতি আমাদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করা।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত