পরকীয়া

ট্রেনের টিকেট করতে তৃণাই নিষেধ করেছিল। কিন্তু শেষ অবধি কোনোও বাসেরও টিকেট না পেয়ে তৃণা আর প্রান্তর উঠে বসে একটা মালগাড়িতে। তৃণার এমন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম। বাংলাদেশ থেকে তৃণা এসেছে একটা সেমিনারে। সেখান থেকে যাবে বাঁকুড়া। কিন্তু রাস্তা হারানোর ভীতি তার বরাবর। কোনোমতেই শিয়ালদা থেকে একা ট্রেনে উঠে বসতে সে রাজি নয়। অঞ্জন দত্ত তাকে শিয়ালদা থেকে ট্রেনে করে বাকুড়া যাবার পুরো টাইম টেবিলটাই পাঠালেন ই-মেইল করে। তবু তার ভীতি গেলনা। গেল বছরও পুরুলিয়ার যাবার জন্য খুব অনুরোধ করেছিল মন্ডল। কলকাতা থেকে একা পুরুলিয়া যাবার সাহস তার সেদিনও হয়নি। বাকুড়া আরও দূরের পথ। প্রায় ৫/৬ ঘন্টার ভ্রমণ। অগত্যা তাকে বাঁকুড়া নিয়ে যাবার জন্য প্রান্তর এসেছে। এটা ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি সময়। ঢাকার চেয়ে কলকাতার উষ্ণতা আরও বেশি। রাত প্রায় দশটার গাড়ি ধরবে ওরা। প্রান্তর হোটেলের লবিতে বসে ছিল। তৃণা উপরে নিজের রূমে এসে ঝটপট একটা শাওয়ার নিয়ে নিল। বরাবরই খুব ক্লান্ত হলে তৃণা শাওয়ার নেয়। ভীষন মাথাব্যথা কিংবা অস্থিরতা কিংবা খুব গরম লাগলে এই তার প্রশান্তির একমাত্র উপায়। সারাদিনে দুতিনবার তার শাওয়ার নেয়া হয়ে যায়। আজও সারাদিনের ক্লান্তিটা সেরে নিয়ে ঝটপট নামছিল নিচে। কী ভেবে গায়ের লাল রঙের শালটাও হোটেলের সোফাটাতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভোঁ দৌড়। এতটা তপ্ত এখানকার ওয়েদার। তাই শালটা শুধু শুধু বয়ে বেড়ানোর দরকার কি! ভুলটা ছিল এখানেই। খুব তাড়াহুড়ো। কলেজস্ট্রীট থেকে যেতে হবে এক্সপ্লানেড। এক্সপ্লানেড থেকে পশ্চিমবঙ্গের সব জায়গার বাস পাওয়া যায়। সেখান থেকে বাঁকুড়ার গাড়ি ধরবে ওরা। রাতের শেষ গাড়ি ধরতে হবে। গাড়িটা না আবার মিস হয়ে যায়। প্রান্তরের কোনো বিকার নেই। লবিতে বসে দৈনিক পত্রিকা পড়ছে। তৃণা নেমে আসতে পত্রিকাটা রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতের ছোট ল্যাগেজটা প্রায় জোর করেই ও তৃণার হাত থেকে নিয়ে নেয়। কলেজ স্ট্রীটের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ির জন্য। তৃণা একটু এগিয়ে যখন ট্যাক্সি দেখছে পেছন থেকে প্রান্তর ডেকে ওঠে

ও ম্যাডাম। ও ম্যাডাম… এদিকে আসুন।  

তৃণা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটা ইন্টারসিটি এসে দাঁড়িয়েছে ওর সামনে। প্রান্তরের ও ম্যাডাম ও ম্যাডাম ডাক শুনে বেশ হাসি পায় ওর। হাসতে হাসতে ঝটপট ওদিকে ছুট লাগায়। তৃণার হাসিতে প্রান্তরের কোনো বিকার নেই। সে বেশ মনোযোগে তৃণার ল্যাগেজ আর তৃণাকে গাড়িতে উঠতে সাহায্য করে।

প্রচুর মালপত্র ঠাসা হচ্ছে বিশাল সাইজের একটা পুরোনো আমলের মালগাড়িতে। মালপত্রের মাঝখানে দুজন মানুষ ওরা যেন ডুবে যেতে চলেছে। কিন্তু কেন যেন খুব এনজয় করছে তৃণা। আজকাল কী যে স্বভাব হয়েছে ওর। সবকিছুই কেমন আনন্দ নিয়ে দেখতে শিখে গেছে সে।  অঞ্জন দত্ত বারবার ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করছেন। কেন ওকে এভাবে বাসে করে আনতে গেলে প্রান্তর!

আরে! আমি কী করবো বলুন দাদা। ম্যাডামই তো বাসে আসতে চাইলো । উফ, ট্রেনে কত আরাম করে আসতে পারতো। ও আমাদের অতিথি। এটা তুমি বুঝবেনা?

অঞ্জনদার ফোনটা রেখে খুব অস্থির দেখায় প্রান্তরকে। খুব লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় মাথা হেট করে আছে রীতিমতো। তৃণা তাকে লজ্জা থেকে বের করে আনে

‘বাদ দিন তো এসব। কিসে এলাম গেলাম কি এসে যায় অত! ট্রেনে সময় ধরে যেতে হতো। হয়তো মিসও হয়ে যেত আজ। তাছাড়া আমার ভীষন মোশন সিক্নেস আছে। বাসে উঠলেই ভমিটিং ট্যান্ডেন্সি হয়। তবু তো  এখানে বেশ ভালোই আছি দেখছি।’ প্রান্তর আশ্বস্ত হয়। জানতে চায়, ঠিক বলছেন তো ম্যাডাম?’

হুম। এই মালপত্রে বোঝাই গাড়িটার ভেতর নিজেকে ইঁদুরের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে গাদা গাদা কাগজের ভতের ডুবে যেতে যেতে দুটো ইঁদূর আমরা। মুখটা কোনোমতে বের করে ইতি উতি তাকাচ্ছি।। হা হা হা! হাসিতে প্রাণ খুলে দেয় তৃণা। আবার বলে, কেমন থ্রিলিং থ্রিলিং লাগছে আমার। সত্যি! অন্য রকম অভিজ্ঞতা। আমি এনজয় করছি।’

এই বাসের সিটগুলো বেশ বড়। তাছাড়া ভারতের গাড়িগুলোর বডি খুব শক্ত। ভেতরে জায়গাও অনেক বেশি। ইন্টারসিটিগুলোই তেমন। আর এতো আন্ত-জেলা বাস।

– আচ্ছা। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজতে চলল। আমি ঘুমোবো। তাহলে আপনি ঘুমোন। আমি পড়ালেখা করি।

– আচ্ছা। 

বলেই তৃণা সিটের পেছনে মাথাটা হেলিয়ে দেয়। ঘুম এসে যায় তার। সারাদিন খুব দৌড়েছে। ক্লান্তিতে অবশ শরীর খুব সহজেই ঘুমে সমর্পিত হয় আর প্রান্তর হাতের ফোনে নেট অন করে। ঘন্টা খানেকের মাথায় পিঠে কেমন একটা শিরশিরে অনুভব করে কেঁপে ওঠে তৃণা। ঘুম ভেঙে যায় তার। নিজের মনেই বলে ওঠে

– কে খুললো জানালা?’

বলে আধো আলোতে পেছনে তাকিয়ে দেখবার চেষ্টা করে কোন জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। না একটাও জানালা খোলা নেই তবু ভীষন ঠান্ডা। কী সর্বনাশ! এমনই ঠান্ডা নাকি বাইরে! ইশ্ শেষ মুহূতে শালটা ফেলে এলো। শীতের কাপড়ও তো নেই সাথে। গুটিশুটি মেরে ঘুমোনোর চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু না, আর পারা যাচ্ছেনা। ঠান্ডাটা এতক্ষণ পিঠে কাঁপন তুলছিল। এবার যেন বর্শা নিক্ষেপ করছে। একেবারে হাড় মাংশ ভেদ করে ঢুকে পড়ছে মারাত্মক বিষ নিয়ে হৃদপিন্ডে। প্রান্তর গভীর মনোযোগে কিছু একটা পড়ে চলেছে, তবু তৃণা তাকে ডাকে

– আচ্ছা, কি করি বলুনতো?

– কি হলো ম্যাডাম?

– খুব ঠান্ডা লাগছে। আমিতো শীতের কাপড় আনিনি। ভাবছি ঠান্ডাতে জ্বরটর না এসে যায়। শেষে আামাকে নিয়ে কি জানি কি ভেজালে পড়তে হয় আপনাদের।

– আরে ম্যাডাম এটা কোনো ব্যাপার হলো? আমার জ্যাকেটটা নিন।

বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়ে উপরের বাংকার থেকে জ্যাকেটটা নামায়। তৃণার দিকে এগিয়ে ধরে

– নিন, পরে নিন এটা।

বুঝতে পারে প্রান্তরের কাছে জীবন কত সহজ। কত সহজে ও সমাধান করে দেয় সব। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হলে কি হতো তাই ভাবে তৃণা। তৃণার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা প্রথম। কোনো অচেনা পুরুষের নয় শুধু খুব চেনা কোনো পুরুষেরও কাপড় কোনোদিন এভাবে পড়েছে কি না মনে করবার চেষ্টা করে তবু কিছু করার নেই। পুরুষ পুরুষ গন্ধ আসছে জ্যাকেটটা থেকে,  ঠিক এমন নয়। তার মনে হচ্ছে একটা বুনো গন্ধ! তবু কিছু করার নেই। হাত বাড়ায়। অদ্ভুত মমতায় প্রান্তর তৃণাকে জ্যাকেটটা পরতে সাহায্য করে। সেটা অনুভব করতে পারে তৃণা। বুকের ভেতর একটা  ঈশদুষ্ণ রোমাঞ্চও কেন যে অনুভব করে কে জানে। আর সেটা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। প্রান্তরের বিকার নেই। সে আবার মগ্ন হয়ে পড়ে নেটে কার যেন একটা অটোবায়োগ্রাফি পড়াতে। রাত মধ্য ছুটে চলেছে গাড়ি..জয়পুরের গভীর জঙ্গল ধরে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঢুকে পড়বে বিষ্ণুপুরের ভেতর। ঠান্ডা বাড়তে বাড়তে হিম হয়ে আসে। ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় সব। নিশ্চিন্তে পরম আরামে প্রান্তরের জ্যাকেট গায়ে ঘুমিয়ে আছে তৃণা। বেশ আরাম। মনে হয় যেন একটা থারমাল পরে রয়েছে। আহা। প্রান্তর কি করবে এবার? ভীষণ ঠান্ডায় জমে যাবার জোগাড় তার। ডাকবে তৃণাকে? মায়া লাগে ওর ঘুমিয়ে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে। কিছুই উপায় বুঝে উঠতে পারেনা। এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু একটা উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কেন যে জ্যাকেটটা ওই বিদেশিনীকে দিতে গেছিল। ধুর ছাই আর তো পারা যাচ্ছে না

হঠাৎ আচমকা গায়ের ওড়নাটাতে টান আর ডাক শুনে ধড়মড় করে জেগে ওঠে তৃণা। হা করে তাকিয়ে আছে সে প্রান্তরের দিকে। প্রান্তরের দু হাতে ধরা তৃণার ওড়নার আঁচল। আর  ডেকে চলেছে

– ও ম্যাডাম।

– ও ম্যাডাম…একটু উঠুন না। আপনার ওড়নাটাই আমাকে দিন না। লাফ দিয়ে উঠে বসে তৃণা।

-কি হয়েছে, কি হয়েছে বলুন?

– আরে ঠান্ডায় আমি যে জমে গেছি। কপালটা অন্তত ঢাকি!

এই প্রথম তৃণা তাকিয়ে দেখলো সত্যিই প্রান্তরের মাথার সামনের দিকে চুল কম। যদিও টাক বলা যায়না। গায়ে সারাদিনের ব্যবহৃত একটি পাতলা শার্ট। কিন্ত এই মুহূর্তে জ্যাকেটটা ও কোনো অবস্থাতেই ছাড়বে না। অত মানবতা দেখাতে গেলে বরং ওদেরকেই বিপদে ফেলতে হবে। জ্বর এসে গেলে একটা ঝক্কিতে পড়বে তাকে নিয়ে সবাই। তারচয়ে বরং যাক বাবা ওড়নাটা নিয়ে যাক

– নিন, নিন না। কোনো অসুবিধে নেই।

প্রান্তর ছোঁ মেরে তৃণার বুকের উপর আলগোছে পরে থাকা ওড়ানাটা নিয়ে কপালে প্যাঁচাতে শুরু করে। কোনো সঙ্কোচ করেনা। একজন নারীর বুকের উপর থেকে ওড়না টেনে নেওয়ার বিষয়টা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কত ভয়ঙ্কর এটা মনে পড়ে তৃণার। সেই যে ‘সানসেট ল’ মুভমেন্টের সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ছেলেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্ত্বরে মেয়েদের মিছিলে গায়ের ওড়না টেনে নিয়েছিল, যে মিছিলে তৃণা নিজেও  ছিল। সে কথা মনে পড়ে যায় তৃণার। আচ্ছা, তৃণার জায়গায় অন্য কোনো বাংলাদেশি মেয়ে হলে কী বিষয়টা অত সহজে নিতে পারতো! কি সব ভাবছে… ততক্ষণে গাড়ি ঢুকে পড়েছে বিষ্ণুপুরে। খ্রিষ্টীয় সাত শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ শাসনের আগ অবধি প্রায় এক হাজার বছর সময় ধরে হিন্দু মল্ল রাজবংশের উত্থান পতনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে বিষ্ণুপুরের ইতিহাস। এই আধো আলো আধো ছায়া, গাড়ি ভর্তি মালামালের মাঝখানে এক উদ্ভট কিন্তু প্রশান্ত পরিবেশে তৃণার কমলা রঙের ওড়নায় গাড় নীলের পাড়ে প্যাঁচিয়ে বানানো পাগড়িতে অসাধারণ দেখায় প্রান্তরকে।

‘আহা, ইনিই কি বিষ্ণপুরের জমিদারপুত্র! কোন বংশ? এই কি সেই উত্তর ভারতের ক্ষত্রিয় বংশদ্ভুত যোদ্ধা!’

ইতিহাস ঘেটে পড়া তৃণার একের পর এক মনে পড়তে থাকে মল্ল রাজবংশের কথা কাহিনী জয় পরাজয়ের যাতনা গৌরবের গাথাগুলো। বখতিয়ার খিলজি যখন হিন্দু রাজাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন বাংলার শাসন, তখনো বিষ্ণুপুরে কোনো আঁচ লাগেনি। বাংলার মুসলিম শাসকরা আসলে এই গহন অরণ্য ঘেরা রাজ্য সম্পর্কে জানতেনই না। পরে মুঘোল রাজশক্তি বিষ্ণুপুরের রাজদের কাছে খাজনা দাবি করলেও তারা সেটা দিয়ে দিতেন। মুর্শিদাবাদের রাজারাও বিষ্ণুপুরের ক্ষত্রিয়দের বাগে আনতে পারেননি। আরও পরে র্বধমান রাজাদের শক্তিবৃদ্ধি হবার পর শুরু হয় বিষ্ণুপুর রাজবংশের ক্ষয় লয় অধোগতি পরাজয়। তৃণার মনে হতে লাগে এ বোধ করি সেই পরাজিত ক্ষত্রিয় রাজ পরিবারের জরার্জীণ এক যোদ্ধা। এত সহজ আর সাধারণের ভেতর মাথায় পাগড়িটা লাগনোর সাথে সাথে বের হয়ে পড়েছে এর প্রাচিন রূপ। গাড়ির গতি বাড়ছে। ছুটে চলেছে প্রচন্ড বেগে বিষ্ণুপুরের অরণ্য রাজ্যের মাঝখান দিয়ে। গায়ে কালো জ্যাকেট তৃণা আর মাথায় কমলা ওড়নার পাগড়ি পরা প্রান্তর যখন নেমেছে তখন ভোর তিনটা কি সাড়ে তিনটা হবে। ঘন অন্ধকার আর কুয়াশায় ঢাকা বাঁকুড়ার রাস্তাঘাট। দুজনকে ভুতুরে ভুতুরে দেখাচ্ছে। সেন দাদার গাড়ি নষ্ট। তিনি এসেছেন বাইক নিয়ে। তাই দেখে আবার তৃণার কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। বাইকের পেছনে উঠে বসে তৃণা। বাইক ছুটতে শুরু করে। আর সেনদার ঘাড়ে রাখা তৃণার হাত ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। তৃণা মনে মনে ভাবে দাদা না জানি কী ভাবছেন। এই বুঝি গাড়ি থামিয়ে বলে উঠেন

– ডাকছিলে তুমি আমায়?’

কিন্তু না। একবারের জন্যও তিনি থামেননি। পিঠে ঠক্ ঠক্ কড়া নাড়ার মাঝখান দিয়েই ছুটে চলেছে বাইক তার বাড়ির উদ্দেশ্যে…।

৩.

সেন বৌদি অসাধারণ একজন নারী। কত যে মধুমাখা কথা তার। বিশাল বড় ড্রইংরুম। লাগোয়া ডাইনিং। বাংলাদেশের মতো বাড়িঘর সব। খুব আদর করেন তৃণাকে। প্রায় ভোর হতে চলা এই রাতে জেগে ওঠে তার কন্যা রিয়াও। কি দরকার ছিল এই শেষ রাতে ওদেরকে জাগানোর। মানুষগুলোও একদম বাংলাদেশের মানুষের মতো। আথিথেয়তায় আদরে সম্ভাষণে। তবু কোনো ধরণের আথিথেয়তার সুযোগ না দিয়ে তৃণা ঘুমিয়ে পড়ে। টানা দু’ঘন্টার ঘুম সেরে সেন বৌদির নিজের হাতে বানানো লুচি আলুর দম মিষ্টি আর নানা ধরণের খাবার খেয়ে বের হয়ে পড়ে। কথা ছিল কাজ শেষ করে খুব ঘুরবে ওরা। জরুরি কাজটা সেরে বিষ্ণুপুর আসবে বাসুদেব কে কথা দিয়েছিল। তারপর বিষ্ণুপুর ঘুরে বিকেলের ট্রেন ধরে কলকাতা ফিরে আসবে আবার। কিন্তু মাঝপথে কি এক কাজের কথা মনে পড়ে গেল প্রান্তরের। সে দুপুরেই ব্যাক করবে। তাই অঞ্জন দত্তকে তৃণার দায়িত্ব দিয়ে সে দুপুর বেলা রওনা হতে চায়। তৃণাও কম যায়না। সে এসেছে প্রান্তরের সাথে। যাবেও প্রান্তরের সাথে। এবারের মতো বিষ্ণুপুর বেড়ানো বাদ পরে রইল। ঝড়োগতির গাড়িতে চড়ে র্দূগাপুর যখন নামলো তখন মোটে দুপুর সাড়ে তিনটা বাজে। কলকাতার গাড়ি ছাড়বে বিকেল সাড়ে চারটেতে। কি আর করা! প্রান্তর তৃণাকে নিয়ে একটা পার্কের ভেতর ঢোকে। কফি নিয়ে আসে  দুকাপ। ঝকঝকে বিকেল। আকাশে পরিষকার সাদা সাদা মেঘ। পায়ের নিচে সবুজ ঘাস। একটা বাঁধাই বেঞ্চে বসে ওরা;

– আচ্ছা বলুন, সংসারে কে কে আছে আপনার?

– আমি একাই।

প্রান্তরের সরল স্বাভাবিক প্রশ্ন

– স্বামী সন্তান?

– আমি একা থাকি। দুটো ছেলে আমার। ওর বাবা দেয়নি। সাথে নিয়ে চলে গেছে। জানিনা কোথায় থাকে। কেমন আছে। কত বড় হয়েছে। কিছু জানিনা।

-কতদিন?

– এই বছর পাঁচ হবে।

-ওহ। দুঃখিত।

-কেন? দুঃখিত কেন?

হঠাৎ তৃণা তেতে ওঠে। গলায় ঝাঁঝ। প্রান্তর কিছু বুঝে উঠতে পারেনা

– না, মানে…ইয়ে…

তৃণা আবারও বলতে শুরু করে

দুঃখ ছাড়া কী জীবনে আর কিছু নেই? ছেলে মায়ের কাছে নেই, তাতেই দুঃখ। স্বামী নেই, সংসার নেই, তাতেই দুঃখ? বেশ। ভালো।’

আচমকা ছোট্ট ঝড়ে উড়ে যাওয়া বাতাসে ধূলি উড়ে যায়। প্রান্তর কী আঁচ করতে পেরেছে তৃণার বুকের ভেতরে অগ্নিগিরি? স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। খন্ডঝড়ে উড়ে যাওয়া বালি আবার ফিরে আসে, গড়ে তোলে ছ্ট্টো বালিয়ারি। আচমকা আবেগ সামলাতে না পেরে লজ্জাবোধ করে তৃণা।

– সরি। কিছু মনে করবেন না। আপনার কথা বলুন।

– আমি আছি বিন্দাস।

– সেতো দেখতেই পাচ্ছি।

– একটা সরকারী চাকরী করি। ফুড ডির্পাটমেন্টের ইন্সপেকশন আমার কাজ। মাস কাবারে বেতন পাই। তার অর্ধেক ঘাড়ে ধরে বৌ এসে নিয়ে চলে যায়। ছেলেরাও তার দিদার বাড়িতে ভালোই আছে।

– তো বউ সাথে নেই?

– নাহ। এভাবে কতদিন চলছে।

– দু বছর হতে চলল, ম্যাডাম।

কথা বাড়েনা আর। তৃণা একটু হাঁটে। পার্কের ঘাসগুলো খুব চেনা লাগে তার। বাংলাদেশের ঘাসের মতো নরম। তুলতুলে। প্রান্তরের ডাক শুনে পেছন তাকায়

– ও ম্যাডাম… ও ম্যাডাম…আসুন আসুন। গাড়ির সময়  হলো যে…।

গাড়িতে উঠে বসে। হালকা বাতাসে উড়ছে তৃণার চুল। শাড়ির আঁচল। তৃণা বার বার আঁচল সরিয়ে পেরে উঠছেনা বাতাসের সাথে

– জানালাটা টেনে দিনতো।

– ঠান্ডা লাগছে?

– আরে নাহ।

আবার গতকালের মতো জ্যাকেটটা ধার চাইতে এবার ওর লজ্জাই লাগবে। তাছাড়া দুপুরের রোদে ঠান্ডার তেজ কম হলেও বাতাসের ছাট বেশ কাঁপাচ্ছে। প্রান্তর উঠে জানালাটা লাগিয়ে দেয়। তৃণা গুটিশুটি মেরে আঁচল টেনে ঘুমোতে লাগে। প্রান্তর নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকে তৃণার দিকে। ভাবে, কত সহজে ঘুমিয়ে পড়ে তৃণা। কত সহজে হাসে ও। কত সহজে বলে দুঃখের কথা। যে নারীর দুটো সন্তান পিতা ছিনিয়ে নেয় সৃষ্টিতো তার হাতেই সম্ভব। হঠাৎ আগুণে তো জ্বলে উঠবে সে। যে বেদনার ক্ষরণ প্রতিনিয়ত পোড়ায় তাকেই তো কালো অক্ষরেও করে তোলা যায় অপরূপ। হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে সব। দুঃখকে হাসির আড়ালে কী অসাধারণ র‌্যাপআপ করেছে তৃণা। তাই ভাবে মনে মনে। তাই বুঝি তৃণার লেখায় এত মায়া। এত দহন। এত গভীরতা। ছড়িয়ে পড়ে হৃদয় থেকে হৃদয়ে। এক্সপ্লানেড থেকে গাড়িতে উঠেছে অবধি প্রান্তর পড়ে চলেছিল তৃণারই জীবনীটুকু। চোখের কোমল উপত্যাকায় লম্বা বাঁকানো আইল্যাশ প্রায়ই ওর চশমার কাঁচে লেগে যায়। তৃণার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে এই সব ভাবছে প্রান্তর। গভীর ঘুমে তৃণার মাথাটা বারবার বাড়ি খাচ্ছে জানালার কাঁচে। আস্তে করে মাথাটা নিজের কাঁধে ঘুরিয়ে নেয় সে। টের পায়না তৃণা। কেমন বিড়ালের মতো ওর ঘাড়ে মাথাটা গুঁজে দিয়ে নিশ্চিন্তে  ঘুমোতে লাগে। তৃণার ঘাড়ের পেছনে ফেলে রাখা হাতে আস্তে করে জড়িয়ে নেয় নিজের বুকের সাথে। ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে আগামীকাল তৃণা বাংলাদেশে চলে যাবে…।

৫.

কলেজস্ট্রীটের মোড়ে অত ভোরে গাড়ি পাওয়া মুশকিল। তাছাড়া অত ভোরে জাগতে পারবে কি পারবে না এই ভেবে দু’বার করে প্রান্তর তৃণাকে  ডেকে তুলেছে ফোনে কল করে। হিন্দুস্তানী হোটেলের হেল্পিং বয়গুলো খুব একটা বাংলা বোঝেনা। তার দু’বার করে কলেজস্ট্রীটের মোড় ঘুরে এসেছে। কোনো খালি ট্যাক্সিই পায়নি। তাই আধো কুয়াশায় ভিজে তৃণাই রাস্তায় বের হয়ে পড়ে। ব্যারাকপুর থেকে অত সকালে এদিকে আসা সম্ভব নয় প্রান্তরের। এটা সে জানে। যখন গাড়ি পেল তখন তার ফ্লাইটের মোটে এক ঘন্টা দেরী। রির্পোট করার কথা দু ঘন্টা আগে। কিছু করবার নেই। পড়িমড়ি করে যখন ঢুকতে যাবে লাউঞ্জে তখনই তৃণার সামনে দাঁড়িয়ে প্রান্তর। বিস্ময়ে হতবাক চেয়ে থাকে খানিক। মাথায় জড়ানো তার সেই নীলপেড়ে কমলা ওড়না।

‘অদ্ভুত মানুষতো আপনি ম্যাডাম। ওড়নাটা ফেলেই চলেছেন বাংলাদেশে? বলছিলেন এটা আপনার নতুন কেনা ড্রেসের ওড়না। বাংলাদেশের মেয়েরা নাকি বুকের কাপড় ছাড়া চলেনা। আমিতো তাই দৌড়তে দৌড়তে এলাম।’

তৃণা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে প্রান্তরের দিকে।

‘কী মুসকিল হয়েছে জানেন তো? ট্যাক্সি যাও পেলাম একটা। সে যাবে তার ছেলেকে স্কুলে নামাতে। তারপর এখানে আসবে। বললাম তাই চলুন দাদা। তারপর ট্যাক্সি ড্রাইভারের ছেলেকে স্কুলে রেখে তবেই এলাম।’

প্রান্তরের কথা শুনতে শুনতে তৃণার চোখের কোণে টলটল করে ওঠে কিছু হীরের কনা। প্লেন ফ্লাই করবার আর সময় বিশেষ বাকি নেই। এবার ঢুকে না পড়লেই নয়। তৃণার চোখের ওই জলের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা প্রান্তর। কিছু বুঝে উঠবার আগেই দুহাতের তালুতে মুখটা ধরে তৃণার কপালে একটা চুমু খায় প্রান্তর। খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে নিজেই। তৃণার ল্যাগেজটা হাতে নিতে নিতে বলে

– চলো ম্যাডাম..বহুত দেরী হয়ে গেল।

তৃণা কথা বলতে পারেনা। মানুষ অত সহজ হতে পারে! প্রান্তরকে জড়িয়ে ধরে দুহাতে।

– আপনি অত সহজ?

– ম্যাডাম…এ খাঁটি ভারতীয়। মিশেল পাবে না একেবারেই।

সমাজ সংসার কয়েক সেকেন্ডের জন্য তুচ্ছ হয়ে পড়ে দুজনের কাছে।  এই দুরন্ত আলোতে পৃথিবীর সকল হানাহানি তুচ্ছতা আর সাম্প্রদায়িকতাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে তৃণা ঠোঁট রাখে প্রান্তরের ঠোঁটৈ। খানিক বিভোর সময়, স্তব্ধ প্রহর। লোকজন তাকিয়ে দেখছে… একজন মুসলিম একজন সনাতন ব্রাহ্মণ গভীর বেদনায় মিলে মিশে একাকার। লয় হয়ে গেছে যেখানে এসে পৃথিবীর সকল জটিল কুচক্র।

চোখে জল আসে তৃণার। দুহাতের তালুতে চোখ মুছে ছুটতে শুরু করে। পেছনে শুনতে পায় সেই আদি অনন্তের ডাক।

– ও ম্যাডাম… ও ম্যাডাম..আমি তোমাকে দেখতে বাংলাদেশে আসছি খুব শীঘ্রই…।

 

 

 

One thought on “পরকীয়া

  1. অসাধারণ এক অনুভূতি অনুভব করলাম! বার কয়েক পড়ে প্রায় মুখস্ত হয়ে গেলো। চারদিকে শুধু জল আর জল। অথৈ জল! যেন নূহের প্লাবন! জলই শুধু জাগে। জাগি না আমি, জাগে না ভালবাসা। যমুনাবতী হলো আমার নদীনালা।। ভালোবাসা অফুরা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত