উৎসব সংখ্যা প্রবন্ধ: প্রিয়দর্শিনীর সুখনীড় শান্তিনিকেতন
শান্তিনিকেতনে নিজের কক্ষে বসে চিঠি লিখছেন গুরুদেব। তাঁর প্রিয় ছাত্রী প্রিয়দর্শিনী চলে যাবেন। উপায় নেই। একটি চিঠির প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন কবিগুরু। শান্তিনিকেতন ও প্রিয়দর্শিনীর আলাপের বয়স তখন সবেমাত্র এক বছর। সখ্য গড়ে উঠছে তাঁদের। প্রথমদিকে কিছু অসুবিধা হলেও পরের দিকে প্রিয়দর্শিনীর কাছে শান্তিনিকেতন হয়ে উঠেছিল শান্তির নীড়। সময়টা ১৯৩৬ সাল। রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি চিঠি এসে পৌঁছয় ১০ই এপ্রিল। অসহায় বাবার আর্তি “যেহেতু এই সময় আমি ওঁর সঙ্গে থাকতে পারছি না, তাই ইন্দিরার ওঁর সঙ্গে থাকাটা খুবই জরুরী। আমি সত্যিই খুব ভাগ্যবান যে ওঁর জীবনের এই সময়ে শান্তিনিকেতনকে ও শিক্ষার স্থান হিসেবে পেয়েছে।” জওহরলাল নেহরুর চিঠি। ইন্দিরা নেহরুর মা কমলা নেহরু অসুস্থ। এই চিঠি কবিগুরুর হাতে আসার পর থেকেই বিষন্ন হয়ে পড়েন তিনি। আশ্রমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া মেয়েটার সঙ্গে বাঁধন আলগা করতে হবে। মেয়েটার মা অসুস্থ। তাই এই চিঠির প্রত্যুত্তরে মে মাসের কবিগুরু ভারাক্রান্ত মন নিয়ে লিখেছিলেন “অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা ইন্দিরা কে বিদায় জানাবো। ইন্দিরা এই শান্তিনিকেতনের অন্যতম সম্পদ।” তখন চলে যেতে হয় ইন্দিরাকে। তখনো তিনি ইন্দিরা নেহরু। কিন্তু শান্তিনিকেতনের সঙ্গে বাঁধন কি সত্যিই হালকা হয়েছিল? জওহরলাল নেহরু বারবার ইন্দিরা গান্ধীর জীবনে শান্তিনিকেতনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি আত্মজীবনীতে ইন্দিরা নিজেও শান্তিনিকেতনের প্রতি তার নিবিড় ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছেন।
১৯৩৪ সালের জানুয়ারি মাসে এলাহাবাদ থেকে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর ও স্ত্রী কমলা নেহরু তাঁদের ষোড়শী কন্যাকে নিয়ে আসেন শান্তিনিকেতনে। যে শান্তিনিকেতন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশ্রয়স্থল। কবি তাঁকে ডাকতেন প্রিয়দর্শিনী নামে। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে শান্তিনিকেতন প্রসঙ্গে বলেছেন “আমাদের উত্তরাধিকার প্রাপ্তি, অন্বেষণ করা এবং এটা দিয়ে আমাদের প্রকৃত স্থান ক্রয় করা উচিত।” শাল ও আম্রকানন সম্বলিত শান্তিনিকেতন প্রথম দিন থেকেই ইন্দিরার জীবনে বিশেষ জায়গা দখল করে রেখেছিল।
মা-বাবার হাত ধরে যখন প্রথম শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছন ইন্দিরা, তখন থেকেই তাঁর অবাক হওয়ার পালা শুরু। ছাত্র-ছাত্রী শ্রেণীকক্ষবিহীন পাঠের জায়গা দেখে অবাক হন। প্রথম দিন দেখেন গাছের নীচে ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিস্মিত ও মুগ্ধ হন তিনি। শান্তিনিকেতন তাঁর কাছে ধীরে ধীরে অন্তরের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। যদিও এই পথটা তেমন একটা সুগম ছিল না। প্রথমবার এসেই ইন্দিরার কিছু অস্বস্তি তৈরি হয়। ছাত্রী আবাসে ব্যবস্থা ছিল না পাখার। খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু অসুবিধা ছিল। কিন্তু বাবার আদেশে ইন্দিরা সেই ব্যবস্থার সঙ্গে ধীরে ধীরে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতন তাঁর কাছে আস্ত একটা পৃথিবী হয়ে ওঠে। যে দুনিয়া সংগীত ও শিল্পকলায় ভরা। নিজের বাড়িতে অতিরিক্ত যত্ন, আহ্লাদ, অতিথি সমাগমসম্বলিত জীবন থেকে বেরিয়ে একটা নিঃসঙ্গ কিন্তু মুক্তির পৃথিবীর তিনি খুঁজে পান।
পন্ডিত জওহরলাল নেহরু পাঠ্যক্রম আলোচনার জন্য শান্তিনিকেতনের শিক্ষকদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি জানতেন আত্ম-চেতনা গড়ে তোলার স্থান ছিল শান্তিনিকেতন। জওহরলাল নেহরু চেয়েছিলেন ইন্দিরা শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞান পড়ুক। তিনি এবং কমলা নেহরু অনুভব করেছিলেন শান্তিনিকেতনের ভিন্নধারার পাঠ ইন্দিরাকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। স্বাধীন সত্তা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
প্রথমদিকে এখানকার কঠিন, নিরাভরণ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না ইন্দিরা। অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তিনি লিখেছেন “আমি কখনো মেয়েদের মাঝে তাদের মত হালকা ধরনের জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমায় অভ্যস্ত হতে হয়েছে।” শান্তিনিকেতনে এক বছরের সময়কাল থেকে ‘দীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ইন্দিরা নেহরু অন্য ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে সব উৎসবে ধীরে ধীরে যোগদান করা শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন ঋতু-কেন্দ্রিক আচার অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করতেন, চারাগাছ রোপণ করতেন। কয়েক মাসের মধ্যেই অসুবিধার গণ্ডি টপকে সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন ইন্দিরা। পরবর্তীতে তিনি বলেন “আমি আমার জীবনে প্রথমবারের জন্য একটি নীরব স্থানে ছিলাম। ঋতুসমূহের সঙ্গে সঙ্গতি সাধন, সচেতন থাকা, তাদের প্রবাহ ও নিরন্তর পরিবর্তন পরম্পরার মধ্যে বাস করা, শব্দ, বর্ণ, ও স্পর্শ উপভোগ করেছি।” তাঁর সংবেদনশীল মনোভাব গড়ে ওঠার পেছনে শান্তিনিকেতনের সময়কালটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেছেন। সময় পেলেই শান্তিনিকেতনের মাটিতে খালি পায়ে পদচারনা করতেন। গান্ধীজীর পরামর্শ মেনে ইন্দিরাও বিশ্বাস করতেন পৃথিবীর স্পর্শ পাওয়ার জন্য সর্বোত্তম উপায় খালি পায়ে হাঁটা।
শান্তিনিকেতনে ইন্দিরার সব চেয়ে প্রিয় উৎসব ছিল বসন্ত পঞ্চমী। বসন্তকালীন এই উৎসবের হলুদ রং বড় প্রিয় ছিল তাঁর। এই উৎসবের প্রতীক আম্রকুঞ্জ ইন্দিরাকে প্রকৃতিকে আরো ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করতেন তিনি। কবিগুরুর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে মুগ্ধ হয়েছেন ইন্দিরা। পরবর্তীকালে নিজের আত্মজীবনীতে ইন্দিরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে মুগ্ধ হয়েছেন ইন্দিরা। লক্ষ্যে অবিচল থেকে কাজ করার শিক্ষা তিনি কবিগুরুর থেকেই পেয়েছিলেন।
শান্তিনিকেতনের সঙ্গে প্রিয়দর্শিনীর আত্মীয়তা একমুখী এবং মসৃণ পথ ধরে গঠিত হয়নি। সবেমাত্র তিনি শান্তিনিকেতনকে আপন করে নিতে শুরু করেছেন, এমন সময় আবার মায়ের অসুস্থতার খবর আসে এলাহাবাদ থেকে। মায়ের সঙ্গে এলাহাবাদে কিছু সময় কাটানোর পর ইন্দিরা বুঝতে পারেন মায়ের একাকীত্ব। তিনি নিজেও শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন। তবুও মায়ের সংকটে তিনি পাশে থেকেছেন। কমলাও মেয়েকে কাছে পেয়ে সেসময় তাঁর ব্যথা উগরে দিয়েছিলেন। জহরলাল নেহরু তখন জেলে। পারিবারিক অসুস্থতার কারণে বাড়ি ফিরে অসুস্থ, নিস্তেজ ইন্দিরাকে দেখে তিনি আশাহত হন। ইন্দিরার ওপর রেগে গিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের শিক্ষায় একটু একটু করে বদলে যাওয়া ইন্দিরা তখন সংবেদনশীল। মা একটু সুস্থ হতেই ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে। তাঁর অন্তরাত্মা বাবার প্রতি অভিমানী। শান্তিনিকেতনে আসার পথে বর্ধমান স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে তিনি বাবাকে চিঠি লেখেন ”বাড়িতে কী ঘটে তুমি কি সে সম্বন্ধে কিছু জানো? যখন মা খুব দুরবস্থায় ছিল তখন বাড়ি ছিল জনাকীর্ণ। কিন্তু তাঁদের কেউ তাঁকে দেখতে যায়নি অথবা কিছুক্ষণ তাঁর পাশে বসেনি। যখন মা যন্ত্রণাকাতর ছিল তাঁকে সাহায্য করতে কেউ ছিল না।” মেয়ের এই অভিমানী চিঠির উত্তর কিন্তু জহরলাল নেহরু দেননি।
অপরাধী মন নিয়ে ইন্দিরা আবার তাঁর শান্তির নীড়ে ফিরে আসেন। অশান্ত মন মায়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। পরে তিনি লেখেন “আমার জীবনের বাস্তবতা এতই কঠিন যে আমার স্বীয় অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন।” সেই সময়টায় মানসিক সংকটাপন্ন ইন্দিরা শান্তিনিকেতনকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরেন। তিনি দুঃস্বপ্ন দেখেন, একটি বিরাট সমুদ্রের অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন। এ সময় বাবার চিঠির উত্তর তিনি লিখেছিলেন প্লেটোর দর্শনের বই পড়তে চান। বই ধীরে ধীরে ইন্দিরার অশান্ত মনকে শান্ত করে। তিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রমকে কোলাহল, রাজনীতি থেকে দূর আঙিনায় থাকা নতুন জগৎ হিসেবে আবিষ্কার করেন।
এই শান্তিনিকেতনেই তাঁর দেখা হয় ফ্রাংক ওবারডর্ফের সঙ্গে। ১৯৩৩ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। সাংস্কৃতিক , সংবেদনশীল মনোভাবাপন্ন জার্মান এই মানুষটি ইন্দিরাকে ফরাসি ভাষা শিখিয়েছিলেন। লাজুক অথচ গভীর এই নারীকে পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন তিনি। ইন্দিরাও তাঁর সঙ্গে হতাশা, দুঃখ, যন্ত্রণা ভাগ করে নিতে শুরু করেন। পরে এই বন্ধুত্ব বিবাহের মতো সম্পর্কে পৌঁছবার দিকে এগলেও ইন্দিরার তাতে সম্মতি ছিল না। তিনি লিখেছেন “আমি শুধু কাঁদি আর কাঁদি। কারণ বিয়ের ধারণায় আমি এতই আতঙ্কিত ছিলাম যে কাউকেই বিবাহ করার ব্যাপারে আমার সম্মতি ছিল না।” নিজেকে আবেগ বর্জিত বলেও মনে হয়েছিল তাঁর। সে সময় স্বাধীনতা সংগ্রাম, যুদ্ধ তার অন্তরে দ্বন্দ্ব, সংঘাতের জন্ম দেয়।
শান্তিনিকেতন ইন্দিরাকে অনুভবী করেছিল। মানসিক সংকটের সময়গুলোয় তিনি সৃজনশীল উদ্যোগে নানা কাজ করতে শুরু করেন। এ সময় নন্দলাল বসুর সংস্পর্শেও আসেন ইন্দিরা। নৃত্য, থিয়েটার অভিমুখী হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক চিত্রাঙ্গদা তাঁর ভেতর গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলে। চিত্রাঙ্গদার অন্তর্দৃষ্টি তার ভেতর সূক্ষ্ম বোধ তৈরি করেছিল। অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার প্রেম, দ্বন্দ্ব সাক্ষাৎ, সংকট, ইন্দিরার জীবনকে প্রভাবিত করে। এই কাহিনীটি তাঁর মনে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল। নারী স্বাধীনতার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী এই কাহিনীর কথা বারবার উল্লেখ করতেন।
শান্তিনিকেতনের একমাত্র ছাত্রী নিবাস শ্রীসদনে ইন্দিরা যখন থাকতে এসেছিলেন তখন তিনি লাজুক, অন্তর্মুখী। সহপাঠীনিরা তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন ধীরে ধীরে। ইন্দিরাও হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অশোকা সিংহ, জয়া আপ্পাস্বামী সোমা যোশী, সুশীলা বাদকারের মত আরো অনেকে প্রথম দিকে কঠিন থাকলেও পরে ইন্দিরার গুণমুগ্ধ হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নিতেন ইন্দিরা। প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের কাছে বাংলা শিখতেন। প্রতি বুধবার মন্দিরের উপাসনায় যোগ দিতেন তিনি। কোপাই নদীর তীর বড় প্রিয় ছিল তাঁর। শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে ইন্দিরার শিক্ষামূলক বাঁশবেড়িয়া ভ্রমণ উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্দিরা ও রামকিঙ্কর বেইজ সহ তিরিশজনের একটি দল নিয়ে নন্দলাল বসু বাঁশবেড়িয়ার জমিদারের পুরোনো বাড়ির উঠোনে গিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক হংসেশ্বরী মন্দিরের সামনে তাঁবু খাটিয়ে চলতে থাকে শিক্ষা প্রদান।
১৯৩৬ সালে দুঃখের সঙ্গে ইন্দিরাকে বিদায় দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু শান্তি নিকেতনের সঙ্গে অকৃত্রিম প্রণয়বন্ধন আজীবন থেকে যায়। কবির জীবদ্দশায় তিনি আরো কয়েকবার শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। ১৯৩৭ সালে বাংলা নববর্ষের দিন চিনা ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাবার প্রতিনিধি হিসেবে এবং ১৯৩৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি হিন্দি ভবনের উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে।
১৯৬৭ সাল ও ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধী সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে ভাষণ দেন। জওহরলাল নেহরু শান্তিনিকেতনের সমাবর্তনে ছেলেকেও নিয়ে আসতেন। একবার ইন্দিরার দেরী হওয়ায় তিনি বাবার বেশ খানিকক্ষণ পরে মঞ্চে পৌঁছন। তাঁর পুরনো সহপাঠিনীরা তাঁকে এগিয়ে দিতে চাইলেও ইন্দিরা কিন্তু সেদিন এগিয়ে যাননি। বাবার বেশ খানিকক্ষণ পরে বাবার বকুনি খেয়েই মঞ্চে উঠেছিলেন। ১৯৬৭ সালের সমাবর্তনের ভাষণে তিনি ব্যথিত হৃদয়ে বলেছিলেন “বাংলাদেশে এখন যা ঘটছে তাতে আমি অত্যন্ত ব্যথিত। শঙ্কিতও হয়েছে বলব। আজকের এই পরিবেশে এজাতীয় অনুভব না হওয়ারই কথা। কিন্তু আমরা যে অত্যন্ত উত্তেজিত।” ১৯৬৯সালের সমাবর্তনের ভাষণেও তাঁর আবেগ ছিল স্পষ্ট। শান্তিনিকেতনের জীবন-ধারণ শিক্ষা নিয়ে তিনি বলেছিলেন “এবং স্রোতধারাই তো নদী নয়, নদীতীরও নদীতে নদী করে তোলে।”
১৯৮৩ সালে শেষ বার শান্তিনিকেতনের সমাবর্তনে এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কিশোরী, লাজুক স্বভাবের ইন্দিরা নেহরু তখন ইন্দিরা গান্ধী। পরিপূর্ণ নারী। ভারতবর্ষের চিন্তাবিদ। শাসনব্যবস্থার উচ্চপদস্থ। তাঁর হাঁটা চলায় আভিজাত্য ভরপুর। তবুও সেই দিন ও শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে নগ্ন পায়ে পদচারণা করেছিলেন তিনি। আমলকির ডাল, আম্রকুঞ্জের কোণে কোণে ইন্দিরা খুঁজে পেতেন সুখনীড়। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি তাঁর মুগ্ধ দৃষ্টি, সস্নেহ কথোপকথন ছিল ইন্দিরার সুখী গৃহকোণ। শান্তিনিকেতন তাঁর কাছে এমনটাই থেকেছে বরাবর। আশ্রমবাসীর কাছে কবিগুরু প্রিয়দর্শিনী ও ঘরের মেয়ে ‘ইন্দিরাদি’ হয়েই থেকেছেন। আচার্য হিসেবে শেষ ভাষণে তিনি বলেছিলেন ” এই শান্তিপূর্ণ আবহাওয়ায় এটা ভাবা খুবই কঠিন যে দেশে কতটা চিন্তার আবহ ,সংঘাত এবং তিক্ততার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘৃণার পৃথিবীর কথা এমন সুন্দর জায়গায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করাও কঠিন।” কবিগুরুর প্রিয়দর্শিনীর অন্তরে শান্তিনিকেতন যেমন এক টুকরো সুখের নীড় হয়েই রয়ে গেছে তেমনই শান্তিনিকেতনের কাছেও তিনি প্রকৃত অর্থে প্রিয়দর্শনী হয়েই থেকেছেন।
তথ্যসূত্র:- ১.ইন্দিরা গান্ধী, অটোবায়োগ্রাফি, পুপুল জয়কার (অনুবাদ: লিয়াকত আলী খান)
২. আমি ইন্দিরা গান্ধী:- বরুণ সেনগুপ্ত
৩. দেশ পয়লা ডিসেম্বর ১৯৮৪র বিশেষ ইন্দিরা গান্ধী স্মরণসংখ্যা
৪. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯শে নভেম্বর ২০১৭
৫. www.bongodorshon.com

হাওড়া-নিবাসী।আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান বিভাগে কর্মরত। শব্দের সঙ্গে আত্মার টান সেই কিশোরীবেলা থেকেই। তারপর শব্দেরা কখনো বন্ধুর মত, কখনো অভিভাবকের মত পাশে থেকেছে। কখনো অভিমান করে মুখ ফেরায়। আবার ভাব জমে। এভাবেই সাধনা চলেছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। গীটার আর প্রকৃতিও মনের বড় কাছের।