প্লামকেক এবং

টি-এস্টেটে ম্যানেজারের চাকরি নিয়েছে সুমন। সেখানে পৌঁছানোর পরদিন থেকেই শুরু হয়ে গেল অদ্ভূত সব ঘটনা। ভূত নিয়ে অহেতুক সংস্কার বা ভীতি নেই তার। কর্মস্থলের প্রথম সন্ধ্যে। হেমন্তের হিমঝরা কৃষ্ণপক্ষ। 
চা বাগান যেন রোদের আলোয় এক মায়াবী সবুজের আদিগন্ত হাতছানি আর ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে কেমন ছমছমে। অপর্যাপ্ত চা গাছ কখনও নেমে গেছে পাহাড়ের নততলে। কখনও উঠে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। 
দূর থেকে একটা ব্লাইন্ডিং সাদা আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। লনের ওপর ছাতার নীচে কয়েকটা ফাইবারের চেয়ার পাতা। সেদিকেই আসছে আলোটা। অন্ধকার হাইওয়ে দিয়ে ট্রাকের হেডলাইট চোখের ওপর পড়লে যেমন অনুভূতি হয়। পরক্ষণেই ফিসফিশ সব আওয়াজ। কারা যেন কথা বলছে অনর্গল। খুব জোরে নয় আবার খুব মৃদু স্বরেও নয়। কিন্তু বলে চলেছে একনাগাড়ে। ধারে কাছে কোনো জনমানব নেই, পাখপাখালী তখনো জাগেনি তবে কিসের শব্দ? মন দিয়ে শব্দ শুনতে গিয়ে সেই সাদা আলো অদৃশ্য হয়েছে ইতিমধ্যে।  কিছু পরেই ডোরবেলের টুংটাং। গৌরীশংকর দাঁড়িয়ে। বেরিয়ে পড়ল ওরা ওরিয়েন্টেশনে। 
স্যার একটা কথা, মাথায় রাখবেন, এখানে অনেক অদ্ভূত সব ঘটনা আপনার চোখে পড়বে। তাই সাবধান করলাম। কেমন অদ্ভূত শুনি? 
সব জানবেন ধীরে ধীরে।   
পরদিন ভোরে চা-বাগানের সূর্য জাগতে অনেক বাকী। হাঁটতে হাঁটতে গৌরীশংকর বলল, টি-এস্টেটের এক বহু পুরোনো ম্যানেজার এখানে  মারা গেছিলেন। উনি নাকি সাদা আলোর একটা টর্চ নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়িয়ে বাগান পরিদর্শণ করতেন। প্রিয় বাগানের মায়া বুঝি কাটাতে পারেন না। ঘুরেফিরে আসেন প্রায়ই। 
ঐ দেখুন, এটা হল ব্রিটিশ আমলের কুঠিবাড়ি। ঐ দিকে সার্ভেন্টস কোয়ার্টার। ফোরথ ক্লাস স্টাফেরা তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে থাকে সব সময়। আর এ পাশটায় সিকিউরিটিদের ঘর। আমি থাকি আপনার ঠিক নীচে। তবে জানেন স্যার- এরা কারোর কোনো ক্ষতি করেনি আজ অবধি। 
– এরা মানে? এরা ক’জন আছে এখানে? আপনি তো দেখছি এঁদের নাড়ি-নক্ষত্র সব জানেন। 
সুমনের মায়ের ফোন। পরশু  কালীপুজো। আগামীকাল ভূত চতুর্দশী। ঘরের সামনে দুটো মোমবাতি জ্বেলে দিস। বুঝলি? সুমনের বুকটা ধক্‌ করে উঠল। ভূত চতুর্দশী? এইদিনে বাড়িতে সকলকে মা চোদ্দশাক খাওয়াবেন ঘাড় ধরে।সন্ধ্যেবেলায় চোদ্দপ্রদীপ জ্বালাবেন বাড়ীর সব দরজায়। এবার যেন ভূত চতুর্দশী শব্দ যুগল সুমনকে কিছু সময়ের জন্য আচ্ছন্ন করে। মা ফোন রাখতেই সুমনের চোখ গেছিল চা-বাগানের দিকে। আবার সেই সাদা আলোটা। যেন কেউ টর্চ ফেলছে দূর থেকে। জোরালো সেই আলো। কারা যেন ফুল ছিঁড়তে এসেছে। সুমন সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে এল। 
ঐ দেখুন, ঐ সুন্দর ফুল ভর্তি ক্যামেলিয়া গাছের ওপর থেকে ফুল গুলো বেছে বেছে তুলে নিচ্ছিল ওরা। আমি ঠিক দেখেছি।  ফুল তোলা তো মানা এখানে, তাই না? 
অমন সকলেই দেখেছে এর আগে স্যার। 
এবার সুমন বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই নাকে আসতে লাগল টাটকা বেক করা কেক-বিস্কিটের সুস্বাদু মিষ্টি গন্ধ। আশেপাশে কোনো বসতি নেই।  নিশ্চয় এস্টেটের কিচেনে নিজস্ব বেকারিতে বেক করা হচ্ছে। সান্ধ্য চা- কফির সঙ্গে  জমে যাবে হট কেক । এই ভেবে আবার নীচে এল সুমন। ততক্ষণে সব গন্ধ উধাও। তবে কেন এমন গন্ধ পেল সে?  
ব্রিটিশ আমলে টি-এস্টেটের নিজস্ব বেকারী আছে নাকি?   
জানতাম, আপনি ঠিক এই প্রশ্নটাই করবেন । 
না, না এখানে বেকারী ছিল তবে আর সেখানে কেক, বিস্কুট তৈরী হয়না। সেটা তালা বন্ধ পড়েই থাকে।  
সুমন বলল, বুঝেছি, তার মানে ব্রিটিশ আমলের ঐ বেকারীতে এক মেমসাহেব যিনি প্রতিদিন ঠিক ঐ সময়ে কেক, বিস্কিট বেক করতেন ওনার অতৃপ্ত আত্মা এখনো আমাদের কেকের গন্ধ শুঁকিয়েই ছাড়েন? 
– শুনুন তবে, গৌরীশঙ্কর জানায়, স্কটল্যান্ডের এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করত রোজিদের পরিবার। জ্যাক এবং মেরির একমাত্র কন্যা রোজি মাত্র ন’বছর বয়সে এক পেডোফিলিক অভদ্র লোকের কামনার স্বীকার হয়।  অভদ্র লোকটি নাকি তাদের গ্রামের সব ছোট ছোট বাচ্ছা ছেলেমেয়েদের সাইকেল চালানো শেখানোর নাম করে ইস্টার, ক্রিসমাস ইত্যাদির রঙ্গীন গিফটের লোভ দেখিয়ে নিয়ে যেত দূরে। এক ভিন্নরুচির স্বীকার হয়ে নিষ্পাপ শিশুদের সঙ্গে যাবতীয় নোংরা সব কাজ করত। রোজি মারা গেল তার যৌন বিকৃতির স্বীকার হয়ে। জ্যাক সেই অভদ্র লোকটাকে একদিন ঠান্ডা মাথায় খুন করে পালিয়ে গেলেন স্ত্রী মেরিকে নিয়ে। 
ঘুরতে ঘুরতে ইন্ডিয়ায় এসে দার্জিলিংয়ের এই চা বাগানে কাজ নিলেন। মেরি হল এই বাগানের মধ্যে বেকারীর ম্যানেজার। জ্যাকের হাতে গড়া এই চা বাগানের প্রতিটি চা গাছ। হর্টিকালচারে একটা ডিপ্লোমা ছিল জ্যাকের তাই চাকরীটাও জুটে গেছিল চটপট আর সাদা চামড়া বলে তারা ব্রিটিশ শাসিত দার্জিলিংয়ের চা বাগানে স্থায়ী পদও পেয়ে গেছিল। স্বামী স্ত্রী সাময়িক ভাবে ভুলে গেল একমাত্র রোজির শোক। আর হিমালয়ের মোহে পড়ে এই চা বাগানে এসে মেরির গর্ভের দ্বিতীয় কন্যা ডেইজি জন্ম নিল এখানেই। রোজি তার মায়ের হাতের প্লাম কেক খেতে বড্ড ভালবাসত। সে চলে যাবার পর মেরী আর বানাত না প্লাম কেক। 
পাহাড়ের কোলে, চা বাগানের সবুজে তাদের কন্যা ডেইজি ফুলের মত প্রতিপলে, অণুপলে বাড়তে লাগল। পাহাড়ি ঝোরার মত হেসে কলকল করে বেড়াত। তাদের প্রথমা কন্যা রোজি নাকি ডেইজি হয়েই আবার ফিরে এসেছিল আর তাই এই চা-বাগানের ওপর জ্যাক এবং মেরীর ছিল বিশাল দায়বদ্ধতা ।
এখানেই ঐ স্কটিশ দম্পতি তাদের ছোট্ট বাংলোটিতে প্রায়শই প্ল্যানচেট করতেন। তাঁরা তাদের প্রথমা কন্যা রোজির আত্মাটিকে আদর করে ডাক দিতেন ইহলোকে। তাদের মৃত মেয়ের সাথে কথা চলত। 
ডেইজি তখন বছর দশেকের। তার কোমল, পেলব হাতে ভর করে রোজির আত্মাকে নামিয়ে আনতেই যত বিপদ হল। যেইমাত্র রোজি এসে ডেইজির আত্মায় ভর করল, ডেইজি মূর্ছা গিয়ে প্রাণ হারাল সেখানেই। অমন তো আকছার হয় প্ল্যানচেটের সময়।  তবে ডেইজির হয়ত জ্ঞান ফিরতে পারত কিন্তু ডেইজি পড়ে যাবার পরেই সেই ধাক্কায় পাশেই টেবিলে রাখা মোমবাতি পড়ে গিয়ে টেবিল ক্লথে আগুণ লাগা থেকে শুরু করে সব তছনছ হয়ে গেল নিমেষেই। ডেইজি পুড়েই মারা গিয়েছিল। বহুদিন পরে সেদিনই কিচেনে এক মস্ত প্লাম কেক বানিয়েছিল মেরী। ডেইজিকে বলা হয়েছিল প্ল্যানচেট চলাকালীন ছটফট করলে পরলোক থেকে দিদি আসবেনা আর কথাও বলবেনা । প্ল্যানচেট হয়ে গেলে তারপর প্লাম কেক খাবে তারা দুই বোন। ঘরেতেই ম্যান্টেল পিসের ওপর রাখা ছিল ঢাকা চাপা দেওয়া মেরীর হাতে তৈরী রোজির প্রিয় প্লামকেক। পাশে রাখা ছিল ছুরি। মেরী  বুঝেছিল ডেইজি বাঁচবে না। 
তাই জ্যাক লোকজনকে ডেকে ডেইজিকে নিয়ে হাসপাতাল চলে যেতেই মেয়ের শোকে নিজের হাতের শিরা ঐ ছুরি দিয়ে কেটে মেরী মারা গেছিল সেখানেই। জ্যাক  স্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছিল মেয়েটার কাছে, হাসপাতালে। ফিরে আসতেই দেখল ঘরের বাইরে রক্তের স্রোত। মৃত স্ত্রীকে উদ্ধার করল বটে কিন্তু নিজেও গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল। সে বুঝেইছিল রোজির মত ডেইজিও আর কোনোদিনো ফিরে আসবেনা তাদের কাছে । বাগানের ক্যামেলিয়া গাছটি নিজের হাতে পুঁতেছিল জ্যাক। 
এবার বুঝলেন তো স্যার? ঐ বেকারীর কেকের টাটকা গন্ধ? 
– আর ঐ চোখ ধাঁধানো সাদা আলোটা? 
রোজ রাতে জ্যাক আসে এখানে। মেরী আর ডেইজিকে খুঁজতে। হয়তোবা খুঁজেও পায় ওদের বাংলোর আশেপাশেই। কে জানে ওরা হয়তো এখনো ওদের আধিভৌতিক অনুভূতিগুলো নিয়েই আজন্মকাল থেকে যাবে এই চা-বাগানে।  
কার সঙ্গে কথা বলছিলেন স্যার? সিকিউরিটি তারকনাথ এসে জানতে চাইলে সুমন জানায়, কেন? গৌরীশঙ্করবাবু!
– উনি তো গেলবার আগের ম্যানেজারের সঙ্গে প্ল্যানচেট করতে গিয়ে মারা গেছেন স্যার।   
– মানে? 
– তেনাদের সেদিন প্ল্যানচেটে নামিয়ে আনার প্ল্যান হয়েছিল। 
ভূত চতুর্দশীর রাতে মোমবাতির আলো জ্বলছিল বাগানের প্রতিটি আনাচে-কানাচে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সুমন। হঠাত একটা দমকা হাওয়া এসে সব বাতিগুলোকে একসঙ্গে  নিমেষের মধ্যে নিভিয়ে দিল। 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত