শামসুর রাহমানের কবিতা

স্বাধীনতা তুমি

স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান। স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা- স্বাধীনতা তুমি শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা স্বাধীনতা তুমি পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল। স্বাধীনতা তুমি ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি। স্বাধীনতা তুমি রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার। স্বাধীনতা তুমি মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী। স্বাধীনতা তুমি অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক। স্বাধীনতা তুমি বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ। স্বাধীনতা তুমি চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ। স্বাধীনতা তুমি কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা। স্বাধীনতা তুমি শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন। স্বাধীনতা তুমি উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন। স্বাধীনতা তুমি বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ। স্বাধীনতা তুমি বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার। স্বাধীনতা তুমি গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল, হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম। স্বাধীনতা তুমি খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা, খুকীর অমন তুলতুলে গালে রৌদ্রের খেলা। স্বাধীনতা তুমি বাগানের ঘর, কোকিলের গান, বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা, যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আসাদের শার্ট

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায় ।

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষতায় বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে ।

ডালীম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর- শেভিত মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট শহরের প্রধান সড়কে কারখানার চিমনি-চূড়োয় গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে উড়ছে, উড়ছে অবিরাম আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে, চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায় ।

আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক ; আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ? আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো, সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর। তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো দানবের মত চিৎকার করতে করতে তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, ছাত্রাবাস বস্তি উজাড হলো। রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র। তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম। তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাডায় প্রভূর বাস্তুভিটার ভগ্নস্তূপে দাঁডিয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর। তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, অবুঝ শিশু হামাগুডি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ? আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ? স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুডো উদাস দাওয়ায় ব’সে আছেন – তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নডছে চুল। স্বাধীনতা, তোমার জন্যে মোল্লাবাডির এক বিধবা দাঁডিয়ে আছে নডবডে খুঁটি ধ’রে দগ্ধ ঘরের।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে বসে আছে পথের ধারে। তোমার জন্যে, সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক, কেষ্ট দাস, জেলেপাডার সবচেয়ে সাহসী লোকটা, মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি, গাজী গাজী ব’লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝডে রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস এখন পোকার দখলে আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুডে বেডানো সেই তেজী তরুণ যার পদভারে একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে – সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে, মতুন নিশান উডিয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক এই বাংলায় তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আমার অসমাপ্ত কবিতা

আকাশের কয়েকটি কোঁকড়ানো মেঘ পাড়ার নার্সারির কচি ঘাস
চিবিয়ে খাচ্ছে। ওদের চোখে তৃপ্তির কুয়াশা আর গোলাপগুলি
ঈষৎ লাজনম্র আর ভয়কাতর। এখানে তোমার দৃষ্টি পড়েনি ক’দিন।
আকাশ থেকে এক অতিকায় পাখি এসে নামলে, তুমি তার জঠর থেকে
বেরিয়ে আসবে হাওয়ায় আঁচল উড়িয়ে। মনের চোখে দেখব তোমাকে।
তুমি কি এলে বহু যুগের স্মৃতি জড়িয়ে তোমার সত্তায়? তোমার চোখে যেন
সুদূরতার ছায়ানিঝুম আত্মপ্রকাশ। জানলার শার্সি ধরে সেই কবে থেকে
দাঁড়িয়ে আছি। ঘণ্টা দেড়েক আগে বৃষ্টি এক পশলা চুমো ঝরিয়ে
গেছে আশেপাশে দরদালানে, গলিতে, নার্সারিতে। কয়েকটি কোঁকড়ানো মেঘ,
যেগুলি চরছিল নার্সারিতে, চিবোচ্ছিল কচি ঘাস, এখন উধাও। তুমি তোমার
ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়েছ মধ্যরাত্রির শয্যায়। আমার বাসনাগুলি পুরুষ
মৌমাছি হয়ে উঠছে তোমার ক্লান্ত যৌবনের মৌচাক ঘিরে, তুমি না
জেনেই ঘুমিয়ে পড়বে।

এখন আমার অসমাপ্ত কবিতা তোমাকে ভাবছে কয়েকটি সড়ক, বইয়ের
দোকান, ট্রাফিক-লাইট, মসজিদ, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান
আর সিনেমা হলের ওপার থেকে। আমার অসমাপ্ত কবিতার রঙিন মাছগুলি
ডুবসাঁতার দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে তোমার মেহগলি কাঠের খাটের কিনারে
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কোমল নিদ্রায় তোমার শরীর অন্যায়বিহীন আর
কী নির্মল। অন্য কোনও পুরুষের স্পর্শের কালো কখনও তোমার শরীরে
ছড়িয়েছে কি না, এ নিয়ে আমার অসমাপ্ত কবিতা এখন তেমন ভাবিত নয়।
সে এখন গাঢ় অনুরাগে এই নিঝুম প্রহরে তোমার অধরে, গালে, স্তনযুগলে
আর নাভিমূলে মন্দিরে পুরোহিতের মতো প্রসাদ-রেণু ছিটিয়ে দিচ্ছে অবিরল।
রাত্রির টাইম-পিসে এই মুহূর্তে কটা বাজে, খেয়াল নেই। তোমার ঘুম, একটি
রাতজাগা পাখি, হাওয়ো-মাতাল গাছ, জনহীন গলি, এতিমখানার অন্ধ নীরবতা
আমার মধ্যে কী এক অস্থিরতা ডেকে আনে। অন্ধকারের আড়ালে ঢাকা-পড়া
নক্ষত্র আর ভাসমান মেঘের গলা জড়িয়ে আমার অসমাপ্ত কবিতা গন্তব্যের
প্রায় সীমান্তে পৌঁছে যায়। দ্রুত হতে থাকে বুকের স্পন্দন। এই যাত্রা কে জানে
কোথায় থামবে? কোনও পুরানো কবরস্তানে নাকি নতুন কোনও পুষ্পল উদ্যানে?

(মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

একজন কবি দেখছেন

কচ্ছপের উদোম পেটের মতো বিন্যস্ত টেবিলে
একটি গোলাপ নম্র শুয়ে আছে খাতাটির বুকে
সেই কবে থেকে, মনে হয় দান্তের নির্বাসনের
কাল থেকে। আজ কোন্‌ আর্সেনিক আর কীট মিলে
কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে? একজন কবি ধুঁকে ধুঁকে
দেখছেন পারমাণবিক দহন বির্বাপণের
আয়োজন নেই কোনো; ক্রুদ্ধ এরোস্পেস খাবে গিলে
সভ্যতার হাড়গোড়, অনন্তর হিশেব নিকেশ যাবে চুকে।

চূর্ণ এরোড্রোম আর হাইরাইজ বিল্ডিং-এর
স্তূপ থেকে না-মানুষ, না-জন্তু বেরিয়ে ইতস্তত
চরে বুঝি হারানো স্মৃতির মোহে শারদ জ্যোৎস্নায়।
সেসব প্রাণীর রূঢ় পদতলে গীতবিতানের
পোড়া পাতা পিষ্ট হয় আর স্তনের ক্ষতের মতো
দগদগে নক্ষত্রেরা উপহাসে মেতে মদ খায়!

(তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

একটি পুরনো ফটোগ্রাফ দেখে

যখন পুনেরো বছরের তটে তোমার শরীর
তরঙ্গিত নিরিবিলি সেই তোমাকেই দেখলাম-
রয়েছ দাঁড়িয়ে একা নাগরিক নিসর্গের মাঝে
নিস্তব্ধ রমনা পার্কে শীতের দুপুরে। রোদ, হাওয়া
নীরবে খাচ্ছিল চুমো তোমাকে নিবিড়। নীল শাড়ি,
তোমার প্রথম শাড়ি, আসন্ন প্রখর যৌবনের
সঙ্কেতে কেমন মদালসা। তুমি যেন সদ্য স্নান
সেরে স্নিগ্ধতার সরোবরে মৃদু নিচ্ছিলে বিশ্রাম।

নিষ্প্রভ রঙিন ফটোগ্রাফে প্রস্ফুটিত তরুণীর
প্রেমের অনলে পুড়ি প্রথম দৃষ্টিতে। রূপ তার
চিরদিন থাকবে অম্লান, সময়ের স্পর্শহীন।
অধর,স্তনাগ্র, চোখ, গ্রীবা, ঊরু, নিতম্ব দেখছে
গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন অবিরাম; সে স্বপ্নের অভ্র-গুঁড়ো
এখন আমার কবিতায় অলৌকিক স্পন্দমান।

(তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

ওডেলিস্ক

সে রাতে তুমিই ছিলে ঘরের মিয়ানো অন্ধকারে
বিছানায় উন্মোচিত। তোমার বিশদ
ডাগর নগ্নতা আমি আকুল আঁজলা ভ’রে পান
ক’রে বারবার
মৃত্যুকে তফাৎ যাও বলবার দীপ্র অহংকার
অর্জন করেছিলাম। নিপোশাক তোমার শরীর
জ্যোৎস্না-কমান ধোয়া মসজিদের মতো
তখন বস্তুত
আমার চোখের নিচে। স্তনপল্লী জ্বলে,
যেমন সন্তের জ্যোতিশ্চক্র অবলীলাক্রমে আর
তৃষ্ণাতুর ওষ্ঠ রেখে নাভির লেগুনে
ভেবেছি তোমার
সুদূর প্রপিতামহী কেউ এমনি সাবলীল নগ্নতায় ভেসে
কারুর চোখের আভা করেছে দাবি।

তোমার শরীর
কোথাও নিরালা পথ, মসৃণ অথবা তরঙ্গিত,
কোথাও বা সুরভিত ঝোপ, আমার ওষ্ঠ-পথিক
ক্রমাগত আঁকে পদচিহ্ন সবখানে। কে জানতো
এমন পুরোনো গাঢ়, প্রায় আর্তনাদের মতোই
ডাক, শিখাময় ডাক মাংসের আড়ালে থাকে, থাকে
লুকোনো এমন বিস্ফোরণ!

সেই নিরঞ্জন রাতে আমার তামাম নিঃসঙ্গতা
ঈষৎ স্পন্দিত
নগ্নতার দিকে হাত দিয়েছিলো বাড়িয়ে এবং
তোমার সপ্রাণ চুললগ্ন বেলফুল
কী কৌশলে আমার বয়স নিয়েছিল চুরি ক’রে।
আমার সকল রোমকূপ পল রবসনী সুরে
সে মুহূর্তে গীতপরায়ণ-আমি তোমার দিকেই ছুটে যাই,
যেমন ওড়ার বাসনায় ছটফতে পাখি আকাশের নীলে,
যেমন লাঙল নগ্ন ফসলাভিলাষী রিক্ত মাঠে।

প্রেমিক সেকেলে শব্দ, তবু আমি তাই ইদানীং।
তুমি নরকের দ্বার, ত্রিলোকে রটায় অনেকেই,
আমি সেই দ্বারে নতজানু, নির্গ্রন্থ পুরুষ এক
স্বর্গের প্রকৃত সংজ্ঞা অভিধা ইত্যাদি
প্রবল ভাসিয়ে দিই আমার স্বকীয় শোণিতের কোলাহলে।

(আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

কাল সারারাত

কাল সারারাত আমি কবিতার সঙ্গে অতিশয়
লুত্‌কা লত্‌কা করে কাটিয়ে দিয়েছি। বাতি জ্বেলে
দেখেছি উত্তুঙ্গ স্তন, নাভিমূল শ্রোণী; লজ্জা ফেলে
স্খলিত শাড়ির মতো কবিতা আমাকে, মনে হয়,
অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ করে নিয়েছিলো কাল। মন জয়
করতে পেরে তার চতুর্দশপদী আর ভিলানেলে
আনন্দ পেয়েছি ঢের। হৃদয়ের তন্তুজাল ঠেলে
এখনো কবিতা এসে আমাকে করছে ছন্দোময়

একটি কি দুটি নয়, বহু কবিতায় আজ ভোরে
আমার পকেট ভর্তি, যেন নিয়ে উৎসবী আবেগ
ঘরের ভেতরে, বারান্দায় আমার হৃদয় নাচে।
এসব কবিতা আমি কণ্ঠস্বরে কিছু রাঙা মেঘ
ঢেলে দিয়ে তোমাকে শোনাতে চাই আজ প্রাণ ভরে
এক্ষুনি সবার আগে, অথচ তুমিই নেই কাছে।

(মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

কুয়াশায় নিমীলিত

নিজের ঘরের দেয়ালের কানে চাপা কণ্ঠস্বরে
প্রার্থী হই অতিশয় দীন কোনো ব্যক্তির মতন।
কী-যে চাই তার কাছে নতজানু যখন তখন
ব্যর্থতার খোয়ারি-ঠেকানো যত কাঙাল প্রহরে
জানি না, কেবল হৃদয়ের চোখ থেকে রক্ত ঝরে।
দুবাহু এগিয়ে যায় দেয়ালের দিকে, মায়াবন
ইট-বালি ফুড়ে জেগে ওঠে, তোমার যুগল স্তন
স্বপ্নিল চোখের মতো উন্মীলিত সিমেন্টের স্তরে।

তোমার স্তনাভা দেয়ালের কাছে নিয়ত আমাকে
নিয়ে যায়, বিশেষত মধ্যরাতে। কখনো কখনো,
মনে হয়, দেয়াল তোমার শরীরের দীপ্ত ত্বক।
অন্ধতার চেয়েও অধিক তমসায় স্বপ্ন থাকে
পড়ে ঘরময়, যেন ভাঙা বাবুইয়ের বাসা, ঘন
কুয়াশায় নিমীলিত আকাঙ্ক্ষার সমাধি-ফলক।

(মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

নখ

নিজের হাতের দিকে হঠাৎ তাকাই, নখগুলো
অতিশয় তাড়াতাড়ি বর্ধমান রিরংসার মতো
অহর্নিশ; আমি কি দূরের কোনো অসভ্য মানব,
ক্ষৌরর্কম জানা নেই যার? এইসব নখ নিয়ে
বড়ই বিব্রত থাকি। শহরের প্রধান সুন্দরী
কাছে এলে তার স্তনে, তলপেটে দাগ ক’রে দিই,
এরকম ইচ্ছে বাঁদরের মতো চুলকোচ্ছে মাথা
কিছুকাল ধ’রে; আপাতত কবিতাকে খুঁটে-খুঁটে

মর্ষকামী সুখ পাই। দেখি তার চতুর্দিকে ঘাস
গজিয়ে উঠেছে দীর্ঘ ছাঁদে, ফড়িং গভীর ক্ষতে
দ্যায় সুড়সুড়ি; তার চেয়ে ভালো নিজেকেই আজ
খাম্‌চে-খুম্‌চে ছিঁড়ে খুঁড়ে খুব খুঁতময় মুখ নিয়ে
ব’সে থাকা পেকামাকড়ের মাঝে, লোভী ভ্যাম্পায়ার
মহানন্দে শুষে নেয় প্রতারিত কবির প্রতিভা।

(খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

বিচ্ছেদ

একটি গোলাপ স্বপ্নে মোহন ভাস্কর ফরহাদ
দেখেছিলো, ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরেও তার ঘ্রাণ
নিবিড় থাকতো জেগে সর্বক্ষণ, এবং নিষ্প্রাণ
পাথর দেখাতো তাকে গাঢ় স্বপ্ন একটি নিখাদ
প্রতিমার; সে প্রতিমা নিজে এক নতুন বিষাদ
হয়ে দীপ্ত ভাস্করের সত্তাময় বলে অফুরান
কথা, ছেনী হাতে ফরহাদ শোনে নহরের গান
কান পেতে; সেই গানে নেই কোনো মিলন সংবাদ।

আমারও জীবনে আজো মিলনের মুহূর্ত আসেনি।
আমার দৃষ্টিতে তার স্তন যুগল হয়নি উন্মোচিত,
সুস্মিত অধর তার অন্তরালে থাকে চিরদিন,
আমার দোতারা তার শরীর-মেঘনাকে কল্লোলিত
করবে কি কোনোদিন? হবে না বিস্রস্ত তার বেণী?
বিচ্ছেদ-মরুর জ্বালা বাড়ে চরাচরে সীমাহীন।

(মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

সপ্তাহ

গোলাপ পায়রা আর প্রজাপতিদের ভিড়ে ছিলে
তুমি সোমবার সুখী, এবং মঙ্গলবার ঘাসে
শুয়েছিলে একাকিনী পুরাতন কবরের পাশে,
বুধবার, কী আশ্চর্য, বহুদূরে আকাশের নীলে
তোমার দোলনা দুলছিলো; তুমি আর আমি মিলে
কটেজে খেয়েছি চুমো বারংবার বৃহস্পতিবার।
শুক্রবার দেখেছি তোমার চোখ, শ্রোণী, স্তনভার
স্তব্ধ ব্যাঙ্ক-কারিডরে, শনিবার হাঁসময় ঝিলে।

রবিবার? তোমার সান্নিধ্য, হায় যায় বনবাসে
রবিবারে বারে বারে। তবে কি দেখি না প্রিয়তনা
তোমাকে তখন? রাজহাঁসের মতন স্পীডবোটে
তুমি, হল্‌দে-কালো শাড়ি-পরা; দেখি, চুল সুবাতাসে
ওড়ে কী উদ্দাম, মাছের ঝিলিক মনে হয় জমা;
সত্তাতটে নিয়ত তোমার দীপ্র উপস্থিতি ফোটে।

(মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

স্বর্গের বর্ণিল স্মৃতি

এই তো দাঁড়ানো তুমি সম্মুখে আবার একাকিনী
চোখে নিয়ে শতাব্দীর অস্তরাগ। মনে হয়, সাত
সুমুদ্দুর তের নদী পেরিয়ে এসেছো, রিনিঝিনি
রক্ত বাজে আমার শিরায়। জ্যোৎস্নাময় মধ্যরাত
তোমার শরীর, স্মিত ত্বকে বাংলাদেশের গ্রীষ্মের
মোহন দহন প্রাথমিক এবং তোমার ঠোঁট

যেন তরমুজ-ফালি তৃষ্ণার্তের কাছে। এ দৃশ্যের
বর্ণনা কী করে দিই? পারতেন নক্ষত্রের কোট-
পরা কোনো চিত্রকর ভালোবেসে আঁকতে তোমাকে,
পারতেন সহজেই ফর্ম ভেঙে পিকাসো মার্তিস
নব্য কোনো ফর্মে অমরতা দিতে তোমার সত্তাকে।
গোপনে তোমাকে দেখে দেবতাও দেয় দীর্ঘ শিস।

আমার স্বপ্নের অন্তরঙ্গ সবুজ উপত্যকায়
তোমার যৌবন শত নীলকণ্ঠী পাখি সৃষ্টি করে,
যে-যৌবন গুণীর তানের মতো ঢেউ দিয়ে যায়
নিসর্গের জায়মান আনাচে কানাচে। বায়ুস্তরে
বিদ্যুল্লতা, জ্বলজ্বলে নগ্নতাকে ঢাকবার ছলে
রাখো হাত যোনিতে এবং সামুদ্রিক উদ্ভিদের

ঘ্রাণ জেগে থাকে বাহমূলে, দুটি শ্বেতপদ্ম জ্বলে
বুকে নির্নিমেষ, বুঝি তুমি হাতের মুঠোয় ফের
রহস্য রেখেছো পুরে, আমার গহন অন্তস্তলে
শামুক, পাথর, শঙ্খ এবং সোনালি মাছ মাতে
বন্দনায় তোমার নিদ্রিত নগ্নতার ছায়াবীথি
গড়ে ওঠে তোমার আমার মধ্যে ঢেউয়ের আঘাতে।

এমন নীরব তুমি, যেন কোনো ভাষা জানা নেই
এখনো তোমার, শুধু এক সুর উভিন্ন সত্তার
বাঁকে বাঁকে বয়ে যায়। হে আমার নতুন অতিথি,
ফেনা থেকে উঠে-আসা, আমার হৃদয় তোমাতেই
নিজস্ব আশ্রয় খোঁজে। জলবিন্দুময় স্তনভার
আমার চৈতন্যে আনে হৃত স্বর্গের বর্ণিল স্মৃতি!

(অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত