২০২০ সালে নোবেলজয়ী কবি লুইস এলিজাবেথ গ্লাক ও তাঁর কাব্যভাবনা

লুইস এলিজাবেথ গ্লাক এর ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তিতে মনটা সেই সকাল থেকেই আনন্দে ভাসছে। প্রতি বছরই কেউ না কেউ সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন কিন্তু লুইস গ্লাক এর নোবেলে প্রাপ্তির আনন্দটুকু একটু অন্যরকম! কারণ তিনি হলেন একজন নিউইয়র্কার। আমি যে শহরে বসবাস করি সেই শহরেই তাঁর জন্ম। ১৯৪৩ সালে এপ্রিলের ২২ তারিখ তিনি জন্ম গ্রহণ করেন নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে। লুইস গ্লাক পড়াশুনা করেন সারাহ লরেন্স কলেজ এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর কবিতায় দোল খায় মানুষের আত্মায় স্পর্শকাতর সম্পর্ক, একাকীত্ব, পারিবারিক বন্ধন, জীবনের আনন্দ, বেদনা, বিয়ে, মৃত্যু আবার স্বপ্ন। তাঁকে বলা হয়, “ বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবিতার স্রষ্ঠা।” ২০২০ সালে তাঁর নোবেল প্রাপ্তি নিশ্চয়ই অবাক করা কোন ঘটনা নয়।

মোট ১২টি গ্রন্থের প্রণেতা গ্লাক। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ “Faithful and Virtuous Nigh” ২০১২ সালে তিনি ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড ভুষিত হয়েছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে তাঁর প্রবন্ধ সংকলন American Originality এবং অন্যান্য গ্রন্থের জন্যে তিনি লসএনজেলস টাইমস এর পুরস্কারে ভুষিত হন। গ্লাকের কবিতার নিজস্ব একটি শক্তি আছে। সেই শক্তিটি হল তিনি পাঠককে তার কবিতা আত্মিকভাবে শুষে নেন। পাঠক কবিতাটি পড়ে নিজেই নিজেকে নতুনভাবে আবিস্কার করেন। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা “Firstborn” থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তাঁর সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ পর্যন্ত তিনি কবিতার উপাদানে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা, মিথ এবং স্বপ্নকে তুলে এনেছেন। গ্লাকের কাব্যগ্রন্থ Firstborn, The House on Marshland, The Garden (1976), Descending Figure (1980), The Triumph of Achilles (1985), Ararat (1990) এবং পুলিৎজার প্রাপ্ত গ্রন্থ The Wild Iris (1992)। প্রতিটা গ্রন্থেরই নিজস্ব একটি ভাষা এবং শিল্পসত্তা আছে। কবি তাঁর পাঠককে একটি বিস্তৃতি খোলা প্রান্তরে নিয়ে হাটেন, তাদের সঙ্গে সুখদুখের কথা বলেন, পাঠকের আত্মার খোজখবর নেন এবং মনের গভীরতম বেদনাকে জাগিয়ে তোলেন। এটিই লুইস গ্লাক এর সবচেয়ে শক্তিশালি কাজ। যে লেখক তাঁর পাঠকের আত্মায় টোকা দিতে পারেন, পাঠককে লেখার ভেতর চুম্বকের মত টেনে ধরে রাখতে পারেন তিনিইতো সত্যিকারর লেখক! লুইস গ্লাক ঠিক তাই। গ্লিক এর আরেকটি বিশেষত্ব হল পান্ডিত্ব নয় বরং সহজ ভাষায় জীবনকে অন্যের নাকের সামনে দুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। যে বিষয়গুলো আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিদিনের গল্প, যে বিষয়গুলো আমাদের প্রতিদিনের স্বপ্ন, আমাদের আত্মায় যা খুব সহজ সরলভাবে ধরা দেয় গ্লিক সেই গল্পকে কবিতার ভাষায় সহজভাবে উপস্থাপন করেন। এটি তাঁর ক্ষমতা। গ্লাকের The Triumph of Achilles গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করতে যেয়ে বিশিষ্ট লেখক এবং সমালোচক ওয়েনডি লেজার ওয়াশিংটন পোষ্টে লিখেছেন, “ গ্লাকের ভাষা খুব সাবলিল, সাধারণ বক্তৃতার মত। কিন্তু তার কবিতার ভাষায় রয়েছে গভীর অদৃশ্য এক সূতোর টান!”

গ্লাকের কবিতায় বেজে উঠে বিচ্ছেদ এবং সেখানে শোনা যায় স্বপ্নভংগে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ঝড়ো পাতার শব্দ। সে কারণে কেউ কেউ তাঁর কবিতায় আবিস্কার করেন সমাজের অন্ধকারচ্ছন্ন দিকটিকেও। মানুষের মানবিকতা, নৈতিকতাও উঠে আসে সেখানে। বর্তমান এই কঠিন বিশ্বে মানুষের আত্মাও বিভিন্নভাবে কুলষিত। ভালোবাসা, নৈতিকতারে বিচ্ছেদে মানুষ এখন জর্জরিত। জীবনের এই দিকগুলোকে তিনি খুব দক্ষ হাতে তার কবিতায় তুলে এনেছেন এবং ভিন্ন একটি রূপ দিয়েছেন।

১৯৯২ সালে গ্লাক The Wild Iris গ্রন্থটির জন্যে পুলিৎজার পুরস্কারে ভুষিত হন। The Wild Iris গ্রন্থটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। সেখানে প্রথম ভাগে রয়েছে কল্পনার একটি বাগান। যে বাগানে ফুলগুলো কথা বলছে বাগানের মালিক অর্থাৎ কবির সঙ্গে। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে বাগানের মালিক অর্থাৎ কবির নিজস্ব আলাপ এবং তৃতীয় পর্বে রয়েছে ঈশ্বরের বন্দনা। তিনটি ভাগ একত্র করলে মনে হয় যেন একটি পরিপূর্ণ জীবন ভ্রমন। যে ভ্রমনে অনেক প্রশ্ন থাকে, অনেক অজানা পথের আবিস্কার ঘটে আবার অনেক চেনা পথও অচেনাও হয়ে যায়। এ যেন ঘন কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া আবার সমতলের দেখা পাওয়া। এই হারিয়ে যাওয়া এবং খুজে পাওয়ার ভেতর আত্মিক সংযোগ ঘটে। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত তাঁর Meadowlands কাব্যগ্রন্থটি এদিক থেকে ভিন্ন স্বাদের। পুরো গ্রন্থটিই গ্রিক এবং রোমান মিথকে ব্যাবহার করে লেখা। গ্রন্থটির পাতায় পাতায় রয়েছে ওডেসিয়াস এবং পেনেলোপ এর কন্ঠস্বর। ১৯৯৯ সালে গ্লিক লিখেন আরেকটু ভিন্নস্বাদের কাব্যগ্রন্থ। নাম Vita Nova। এই গ্রন্থটি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পুরস্কার বোলিনজেন লাভ করে। গ্রন্থটি সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হল, “ গ্রন্থটি খুব তাড়াতাড়ি করে লেখা। যখন শরু হয়েছিল মনে হয় এটি দিন দিন বাড়ছেই। তার মানে হল ঘুমনোর সময় নেই, না, ঘুমনোর সময় নেই।” বিয়ে, বিয়ে বিচ্ছেদ, সংসার, স্বপ্ব, স্বপ্নভংগ কত বিষয় নিয়ে এই গ্রন্থ। ২০০১ সালে প্রকাশিত হয় The Seven Ages । এই কাব্যগ্রন্থটিও পৌরনিক গল্প এবং থিমের উপর লিখিত। কবির নিজস্ব ভাবনা, স্মৃতিচারণ আবার একই সঙ্গে সেখানে মিথের অসাধারণ মিশ্রন কাব্যমোদিদের জন্যে বাড়তি এক পাওনা। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগন্থ Averno । গ্রন্থটি দেবী পারসোফনির অবয়ব এবং ভাবনাকে ধারণ করে লেখা। গ্রন্থের মুল সর হল মা এবং মেয়ের মধ্যে সম্পর্ক। এই সম্পর্ক আত্মিক, ভালোবাসার। মিথের ডানায় চড়ে কবি বর্তমান সময়ের পারসোফনিকে খোজার চেষ্টা করেছেন। এই খোঁজ করতে তাকে নিয়ে হয়েছে কল্পনার আশ্রয়।চিত্রকল্প এবং মেটাফরের খেলায় মেতেছেন লেখক। কবি এখানে আত্মা এবং শরীরকে বিযুক্ত করে একটি সত্তা আবিস্কারের চেষ্টায় মত্ত হয়েছেন। ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় কবির বিখ্যাত এক কাব্যগ্রন্থ A Village Life । মূলত কবির নিজের জীবনের ছবিটাকে এই গ্রন্থে বিমূর্তভাবে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। এখানে ভিলেজ বলতে তিনি একটি সময় এবং সভ্যতাকে টেনে এনেছেন। এবং দেখিয়েছেন কীভাবে সেই সভ্যতার ইতি ঘটছে। কীভাবে সেই সময়কে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় Glück’s selected Poems 1962-2012 । ১৯৬২ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত লেখা তাঁর নির্বাচিত কবিতা এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। সন্দেহ নেই গ্রন্থটি সবদিক থেকে আরো বেশি পরিপূর্ণ। নিউ রিপাবলিক এর ভাষায়, “গ্রন্থটি যেন পানি কীভাবে আগুনে রূপ নেয় এরই প্রতিভার স্বাক্ষর এই গ্রন্থ।”
২০০৩ সালে লুইস গ্লাক আমেরিকার ১২তম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিবেচিত হন। যদিও ভালো করেই জানি পুরস্কারে কি আসে যায! কিন্তু তিনি তাঁর জীবনে কাজের স্বীকৃতি হিশেবে প্রচুর সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। লেনন সাহিত্য পুরস্কার, সারা টিসডেল স্মৃতি পুরস্কার, এমআইটি মেডেল, ওয়ালেন্স স্টিভেন পুরস্কার, ন্যাশনাল হিউমিনিটিস পুরস্কার, আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস এন্ড লেটার্স প্রদত্ত কবিতায় স্বর্ণপদক, পুলিৎজার এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে সাহিত্যে কবিতায় নোবেল পুরস্কার।
কবি বর্তমানে ম্যসেচুসেটস এর কেমব্রিজে বসবাস করছেন।
সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁকে অভিনন্দন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত