নীহার লিখনের কবিতাগুচ্ছ

আজ ০৩ অক্টোবর কবি নীহার লিখনের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


স্পর্শের কড়িকাঠ

ভাড়া করা বিলাপের হৃদয় নিয়ে আমূল বিবর্তনের একটা ইন্টারফেসে কাতরতা উপভোগের এই পৃথিবীতে, তুমি যেন আগের চেয়ে আরো বেশি নন্দন চোখে মুখে হাজির রাখো, যেন আরো বেশি মানবিক বুলবুলিটা, তুলতুল করছো সজল, বৃষ্টি থামার পরে অতৃপ্ত মেঘের নিচে গাইছো ফাপা জংলি ফলের ঝোপে মরমের গান; বেভুলা প্রেমিক আমি মনে রাখি নাই, কখনোই, কোনোখানেরই কোনো একটা গুপ্ত হত্যার খবর

স্নায়ুতে আমার নেই তেমন আষাঢ়, উল্টানো কাছিম এক পড়ে আছি আকাশের দিকে, বুক ইটের ভাটার মতো, লোকালয় ভুলে বহুদূরে ছাড়ছি ধোঁয়া; বিনুনিতে গেঁথে নিয়ে আমার নদীটা, চোখের সামনে এসে মেলছো নাড়ান, যেন এক নিথর আয়নাটায় খুঁটে নিচ্ছো মুখের আদল, কারণ আর কিছুই না, জানো তুমি সবই

পোষা প্রাণীদের শিং মূলত স্পর্শের কড়িকাঠ, পাহার খোঁড়ে না

 

আবছায়া ডানার পাখি

বাতাসার মতো এক নদীমৌনতায় ভেবেছি দু’পাশটা চিরদিন ঢালুই থাকে জীবনের, যার সামান্য দূরেই থাকে সুন্দর; সন্ধ্যা বাছুরের খিল খিল, যেন ফিরে যাচ্ছে মা-র সাথে ধুলা উড়িয়ে

আরো দুটো অর্থের পাড়, যেন ভীষণ অনর্থে বেঁচে আছে দৃষ্টির মতো, চোখহীন, জোৎস্নায় অন্যের রূপের ভিতর যেন আবছায়া ডানার পাখি, ছায়া নেই যার

বিধৌত নিকশ গাছের বুড়া ডাল আমাদের মন, যার চামড়া স্বভাবতই ভুলে যায় সব শিরা উত্তাপ, যার ভোর ও দুপুর নিক্তিতে থেকে যায় আধুলির মতো, ময়লা ঢেকে ফেলে পুনর্জীবনের সব সাধ, তবু কোনো আনমনা ফুড়ুতের পাখি এসে বুক জুড়ে ছড়িয়ে বসলে মনে হয়, অর্থের বাইরেই সব সুন্দর, যেন কোনো শিস দেয়া মাছের চিহ্নের অপেক্ষায় থাকাই জীবন, এঁদো কোনো ডোবাটির জলে

 

এমনই বোধহয়

হলুদ কোটার এক মেশিন ঘরের পাশে গলিটার রাস্তার মতো, শিরায় আমার অবিরত, একটা গন্ধে থেকে যায় কেউ, নিয়ত বদলে যাওয়া ভুগোল জুড়ে, ছবি হয়ে রয়ে যায় একটা প্রাচীন রঙ, শুকিয়ে যাওয়া কোনো রক্তের মতো; কালশিটে দেহের প্রদীপ, শলতের জায়গায় কালো হয়ে থাকে এক ক্ষত, বয়সী গাছের বিদগ্ধ চামড়ায় জমা অলক্ষ্যে অজস্র ফার্ন, ঝিরিঝিরি বাতাসের নিরিবিলি দুলদুলে মোচড়ে উঠছে এক চিনচিনে বিদল সময়, বিস্মরণের ঝোপে দেশজ পাখি, দুপুরের অবসাদ, মিশে যায় গ্রীষ্মে, সব কথা, সব অনুনয়

এমনই বোধহয়, দূরাগত দিনে হাতরানো এক দিন থাকে মানুষের, গন্ধ ও দাগের

এমনই বোধহয়, বিগ্রহে হাত পেতে পুড়ে যায় ধুপ, বৃষ্টির মাঠ থেকে চিরদিন সরে যায় জল

 

পৃথিবী

‘দূরে কোনো সাশ্রয়ী পোতাশ্রয় থাকলে চলে যেতাম’

কবে থেকেই এমন ভাবনা নিয়ে ঘুম ভাঙে অযুত ক্লেদের; একটা শ্যাওলাঘন জেটির কলজে পোড়া জাহাজ, ফেনায়িত দুপুর যেন করাতের দাঁত লবণ ছিটানো জলে; চিড়ে যাচ্ছে আমার পিঠ জীবনের সমস্ত ভার নিয়ে, কেউ পেটে বসে বাজাচ্ছে সেঁতার, পেয়ালাতে যেনো বর্ণিল সব সম্পাত তুলছে সরাব, ঝলকের নারী, কুঠুরিতে সাদাকালো রঙ নিয়ে দেখছি দ্রাঘিমা ও অক্ষের যতি, এক লক্ষ্মীপ্যাঁচা; বিশালতার জীবনে কেবলই জমেছে মস, সামান্য বেপথু বাতাসেই উড়ে গেছে হিরামন পাখি

‘দূরে কোন ঝাউ গাছ পেলে থেমে যেতাম’

এমন ইচ্ছা নিয়ে কতোদিন ভেবেছি হৃদয়, আঙুরের মতো করে সুউচ্চ সব দালানের ঝারবাতি রেখেছি সরিয়ে কতো মোহনীয় রাতে, শরীরের আগড় যেমন পুড়িয়ে নিভে যায় সুগন্ধি কাঠি, তারপরও, এসব ধোঁয়া ও ছাই কারও মনোবাসনার সব মুরতির গান গেয়ে গ্যাছেই বিশালে

পৃথিবী, ও লীলাবতী সুডৌল নারী, ব্রোথেল থেকে তোমারও মুক্তি নেই জেনো! যেমন আমিও পাই না কোনো পোতাশ্রয় আর সেই ঝাউগাছ

 

কাঠঠোকরা

একটা কাঠঠোকরাকে দেখি কাঠফাটা রোদে কোনো গাছের দেহ ঠুকে যাচ্ছে, প্রতিদিন একটা রুটিনে

তার পাখায় বেশকিছু রং, ঝিরিঝিরি এক অরণ্য, এবং তার ঠোঁটেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম এক ধরনের মুক্তি; সমস্ত দুপুর সে ঠোকরে ঠোকরে এক সংগীত ছড়িয়ে দিতো, মনেও পৌছে দিতো যেনো এক থুম, যেন সে শেখাতে আসে কিভাবে কোন ক্ষয়িষ্ণু শরীরকে ছাপিয়ে ডিঙাতে হয় সমূহ শারীরবৃত্তিয় শোক

প্রতিদিন কাঠফাটা রোদ ও নীরবতায় বাজিয়ে গাছ আবার সে চলে যেতো; অসমাপ্ত পৃথিবীকে পুনরায় পৃথিবীতে রেখে

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত