তরু দত্ত বিস্মৃত এক বাঙালি কবি

আজ ৩০ আগষ্ট, ১৯ দশকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছাড়াও অপর যে বাঙালি কবি ও লেখক ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন, সেই বিস্মৃত এক বাঙালি কবি,  তরু দত্তের প্রয়াণ দিবস। ইরাবতী পরিবার তাঁকে স্মরণ করছে বিনম্র শ্রদ্ধায়।


ইতিহাস আমায় বরাবর টানে। মনে পড়ে ছোটবেলায় প্রায়ই  কোচবিহার রাজবাড়ী গিয়ে বসে থাকতাম।বাবা রাজবাড়ীর ইতিহাস বলতো আমার মনে হতো আমি যেন চরিত্র ও ঘটনাগুলোকে চোখের সামনে দেখছি।আজো কোন ঐতিহাসিক জায়গায় গেলে আমার যেন ঘোর লাগে।আফসোস হয়, ইশ!সেই সময়টায় যদি যেতে পারতাম।তারপরই একটা ঘোরের ভেতর ঢুকে যাই।

অনেক জায়গার মতো কলকাতা তাই আমার কাছে ঘোরের শহর। কলকাতায় প্রায়ই যেটা করি পুরোনো রাস্তা,বাড়ীঘর চষে বেড়াই।সেদিনও ঘুরতে ঘুরতে মানিকতলায়। জয়ন্ত কয়েকদিন ধরেই বলছিলো মানিকতলা খৃষ্টান সমাধিস্থলে যাবে। ও প্রায়ই সেখানে যায়,ওর নাকি দারুন লাগে সমাধিস্থলের নীরবতা ও পরিবেশ আমার সায় ছিলো না।আমার খুব ইচ্ছা মানিকচন্দ্র বোসের বাড়ীটা খুঁজে দেখবো। যিনি বাংলার নবাব আলীবর্দি খাঁ-র দেহরক্ষী ছিলেন এবং তার নামেই মানিকতলা। যদিও কেউ কেউ বলে মানিকরাম বোস নয় মানিকতলা নাম হয়েছে মানিক পীরের নামে। সে যাই হোক,মানিক বোসের বাড়ী দেখার খুব ইচ্ছে,কথাগুলো বলতেই জয়ন্ত তার দিল দরীয়া হাসি দিয়ে বললো,চল তো সমাধিতেই যাই। তুই ও তোর আত্মীয়কে দেখে আসবি। সেখানেও তো ইতিহাস আছে!

-আত্মীয় মানে?

-চল দেখবি।

-না তুই আগে বল,আমার কেউ খ্রিষ্টান হয়েছে তো কখনো শুনিনি!

-বা রে,তুই না বলিস পৃথিবীর যত দত্ত পদবির মানুষ সব তোর আত্মীয়,তিনিও দত্ত এবং কবি। আমি এত জানতাম না।মাস কয়েক আগে নিখিলেশ বলছিলো বিস্মৃত এক বাঙালি কবি,চির নিদ্রায় শুয়ে আছে দেখ।তখনই নিখিলেশই বলছিলো।

-নিখিলেশ আমাদের বন্ধু,দারুন কবিতা লিখতো। প্রচুর পড়ালেখা।এস এফ আই করতো,পার্টি বলতে নিবেদিত প্রাণ।মাধ্যমিক,উচ্চমাধ্যমিকে বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ছাত্র,কিন্তু তারপর যে কি হলো,ছেলেটা হারিয়ে গেলো,এখন মানিকতলা বাজারে কি যেন করে।

-কি রে শুনছিস?

-জয়ন্তের কথায় ভাবনা ছিঁড়ে যায়।

-নিখিলেশ বলছিলো,এই কবি মাত্র ২১টি বসন্ত পেয়েছিলেন তাঁর কাব্য প্রতিভাকে বিকশিত করতে। একাধারে ইংরেজি ও ফরাসি সাহিত্যে এমন প্রতিভাময়ী কবি বাংলার সাহিত্য জগত পেয়েছিল কিনা গবেষণার বিষয়। এমনকি জার্মান ভাষাও তাঁর অজানা ছিল না। এই তরুণী কবি ১৮৬৯-১৮৭৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপে বসবাস করার সময় ফ্রান্সের নীসের এক পাঁসিয়ঁনাতে ও কেমব্রিজে পড়াশোনা করেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হাইয়ার লেকচার স ফর উইমেন’ এ যোগদান করেছিলো। সিডনির স্যাসেক্স কলেজে রেভারেন্ড জন মার্টিনের মেয়ের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের সূত্রে দেশে ফিরেও পত্রালাপ চলত। সপরিবারে দেশে ফিরে কলকাতায় সংস্কৃত পড়তে শুরু করে।

যাবার আগ্রহ বাড়লো। গেলাম,গিয়ে দেখি অযত্নে অবহেলায় পাথরের স্মৃতি ফলকটি প্রায় মাটিতে মিশে যেতে বসেছে। অনেক কষ্টে আবিষ্কার করলাম তরু দত্ত নামটি।

 

০১

নিখিলেশ দুটি বই পাঠালো শ্রীমতী আরভের: তরু দত্ত, অনুবাদ–পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় আর  ঘুমের দরজা ঠেলে: চিন্ময় গুহ। সেইদিন তরু দত্ত কে? কি করে গেছেন কিচ্ছু জানিনা বলে নিখিলেশকে খুঁজে  এনেছিলাম,নিখিলেশ খুব জোঁতসই গালি দিয়ে বলেছিলো,কবিতা লিখিস না ছিঁড়িস? সাহিত্যসভা,কবিতা উৎসব করে করে তো বিশ্বজয় করে ফেলছিস আর তরু দত্তদের স্মৃতিফলকটি যত্ন করার কেউ নেই। বড় বড় লেকচার আর আত্মপ্রচার এই তো তোদের কবি ও কবিতা জ্ঞান। মনে মনে ভাবছিলাম কথাটা মিথ্যে না। আরো কি কি বলতে বলতে নিখিলেশ পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করলো।

জয়ন্ত নেভিকাটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিতেই আরো কিছু খিস্তি আউরে নিয়ে নিখিলেশ বললো-

মৃত্যুর আগে তরু দত্ত (৪মার্চ, ১৮৫৬ –৩০আগস্ট, ১৮৭৭) ফরাসি ও ইংরেজি কবিতার পাশে তাঁর ছাপা দুটো উপন্যাস দেখে যাননি৷ ‘শ্রীমতি দ্যারভ্যারের দীনপুঞ্জি’ (Le Journal de Mademoiselle d’Arvers) কে বলা হয়, প্রথম ভারতীয় সাহিত্যিকের লেখা ফরাসি ভাষায় উপন্যাস আর বিয়াঙ্কা, এক তরুণী স্প্যানিশ পরিচারিকার কাহিনী (Bianca, or the Young Spanish Maiden )কে বলা হয় ইংরেজিতে লেখা প্রথম ভারতীয় নারী সাহিত্যিকের কাজের নিদর্শন। তরু দত্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক অভিনব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তাঁর লেখায়। ভাবে ভারতীয়, মননে ফরাসি আর লেখনীতে ব্রিটিশ কলাকৃতির এক অভিনব অনুভব পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। তরু দত্তের ফরাসি ভাষার প্রতি দখল প্রভাবিত করেছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর মতো ব্যক্তিত্বকেও৷তরু ও তার বোন অরু মিলে ১৮৭৬ সালে বেশকিছু ফরাসি কবিতা অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজিতে৷ ভবানীপুর সাপ্তাহিক সংবাদ প্রেস থেকে সেগুলো বই হয়ে প্রকাশও হয়েছিল৷

০২

পিতার নাম গোবিন্দচন্দ্র ও মা ক্ষেত্রমণি দত্ত । তরু দত্তের পুরো নাম – তরুলতা দত্ত। রামবাগানের দত্ত বংশের এই পরিবারটি ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। তরু দত্ত ক্ষয়রোগে মারা গিয়েছিলেন ১৮৭৭ সালে৷ ২১ বছর বয়সে৷ তাঁর ‘আওয়ার ক্যাসুরিনা ট্রি’ কবিতা এতটাই বিখ্যাত যে সেটা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে চর্চা চলে এখনও৷ তাঁর কলকাতার রামবাগান বা বাগমারির কোনও প্রাসাদোপম বাড়ির ক্যাসুরিনা গাছ নিয়ে চমৎকার কবিতা লিখেছিলেন সেই অকালপ্রয়ত কবি। ‘আওয়ার ক্যাসুয়ারিনা ট্রি’ কবিতাটি অ্যানসিয়েন্ট ব্যালেড গ্রন্থের শেষে তাঁর ‘বিবিধ কবিতা’ অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তরুর কবিতাগুলোর মধ্যে এই কবিতাটিকে সবচেয়ে অধিক দৃষ্টিগ্রাহ্য বিবেচিত করা হয়েছে এবং এর অতীত স্মৃতিবিধুরতা এবং মহিমান্বিত সৌন্দর্যের ‘অন্তর্দৃষ্টির’ জন্য ই.জি টমাস কবিতাটির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, ‘এটি নিশ্চিতভাবে একজন বিদেশির রচিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি কবিতা।’ এগার লাইনের পাঁচটি পঙিক্ত নিয়ে কবিতাটি রচিত হয়েছে।প্রথম পঙিক্ততে গাছটির বাস্তব বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, যাতে অজগরের মতো লতাপাতার বিশাল গলবস্ত্র গায়ে জড়ানো একটি দৈত্যের ছবি কল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তী পঙিক্ততে দিনের বিভিন্ন সময়ে গাছটি দেখে বর্ণনাকারী যে আনন্দ পান, তার বর্ণনা রয়েছে। তৃতীয় পঙিক্ততে রয়েছে মধুময় অতীত স্মৃতির মুহূর্তগুলো, বিশেষত ভাই আর বোনের সাথে কাটানো ছোটবেলার দিনগুলো। সর্বশেষ পঙিক্ততে রয়েছে জন কিটস-এর ‘ওড টু অ্যা নাইটিংগেল’-এর মতো গাছটির অনন্ত জীবনের জন্য শ্রদ্ধা।

 ০৩

নিখিলেশের পাঠানো বইগুলো পড়ে শেষ করলাম আজই। এই কয়টা দিন যেন আমি তরু দত্ত ছাড়া কোথাও ছিলাম না। আমি যেন দেখতে পাচ্ছিলাম অরু-তরু দুই বোন তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে বিদ্যাশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে যাচ্ছে। এরপরে তরু ফ্রান্সে। ১৮৬৯ সাল, দিদি অরু দত্তের সঙ্গে ফ্রান্স, ইটালি ও ইংল্যান্ড ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। তরু দত্তের পিতা মেয়েদের সুশিক্ষা, উন্নত রুচি ও মানস গঠনের জন্য দুই মেয়েকে ইউরোপে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি আবাসিক স্কুলে। এখানেই তরুর ফরাসি ভাষা শিক্ষার শুরু। তিনি যে শুধু ফরাসি ভাষা শিখে ছিলেন তা নয়, তাঁর স্বল্প জীবনে তিনি ফরাসি সৌজন্য, শিষ্টাচার ও আভিজাত্য অনুসরণ করেছিলেন। তাই তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, ‘তরু দত্তের রক্ত ছিল বাংলা, মন ইংরেজি আর অন্তর ফ্রেঞ্চ।’

আমি দেখতে পাচ্ছিলাম ১৮৭১-এ জার্মানির কাছে ফ্রান্সের পরাজয়ে ব্যথিত তরু দত্ত তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন—‘আমি অবিচলিতভাবে ফরাসি’। শিশুকাল থেকে ফরাসি চর্চা করে এই ভাষায় তাঁর একটি অধিকার জন্মেছিল। কয়েক বছর ফ্রান্সে থেকে তিনি ইংল্যান্ডে চলে আসেন। তিনি ইংরেজিতেও সমান দক্ষ ছিলেন। আসলে তরু দত্ত কেবল ইংরেজি ভাষাতেই কবিতা, গান ও গীতিকা রচনা করতেন। তিনি বেশকিছু ছোট কবিতা লিখেছেন ইংরেজি ভাষায়। তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম তাকে পরিণত করে এক জাতীয় সম্পদে। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় উত্তমরূপে শিক্ষা লাভ করে, ১৮৭৩ সাল তরু দত্ত ফিরে আসছেন কলকাতায়।

০৪

১৮৭৩ সালে তিনি যখন কলকাতায় ফিরে এলেন তখন তাঁর বাবার অনুপ্রেরণায় ফ্রান্স থেকে বই আনিয়ে পড়াশোনা করতেন। এই সময় তিনি ফরাসি ভাষা থেকে দেড় শ কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সেই সংকলনের নাম দেওয়া হয় A Sheaf gleaned in French Fields,যা ১৮৭৬ সালে তা প্রকাশিত হয়। এর পরের বছরেই ৩০ আগস্ট মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।মনটা হুহু করে উঠে।

১৮৭৬ সালে (A Sheaf Gleaned in French Fields) ‘অ্যা শিফ গ্লিন্ড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ বইটির প্রথম সংস্করণ ভবানিপুরের সাপ্তাহিক সংবাদ প্রেস প্রকাশ করে। এটি ১৮ শতকের শেষভাগের এবং ১৯ শতকের প্রথমদিকের আশি জন ফরাসি কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদের একটি সংকলন। এতে ভিক্টর হুগো, সেইন্ট বিউভ, গথার এবং আরো অনেকের কবিতা ছিল। কবিতাগুলোর অনুবাদের সাথে বিস্তারিত টীকাও তিনি সংযুক্ত করেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০০৭ এই অসামান্য কীর্তির জন্য ফরাসি সরকার তরু দত্তকে ফ্রাংকোফনি উত্সবে সম্মানিত করেছিলেন। তবে নিম্নমানের কাগজে ছাপা বইটি পাঠকসমাজের তেমন মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। ভারতে অনেকেই বিশ্বাস করেননি যে এটা একজন ভারতীয় নারীর রচনা। অনেকেই মনে করতেন এটা কোনো আ্যাংলো-ইন্ডিয়ান লোকের রচনা, যিনি বিখ্যাত হওয়ার আশায় নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন। আর যে পরিস্থিতিতে বইটি ছাপা হয়েছিল, তাতে ফরাসি এবং ইংরেজ পাঠকসমাজেও এর তেমন কদর হয়নি।

সৌভাগ্যবশত বইটি ফ্রান্সের কবি ও ঔপন্যাসিক এম. আন্দ্রে থিউরিয়েটের নজরে আসে এবং তিনি এর একটি ইতিবাচক সমালোচনা করেন। ১৮৭৭ সালে বইটি লন্ডনের এক্সামিনার পত্রিকার সম্পাদক প্রফেসার ডব্লিউ মিন্টোর হাতে পড়ে, তিনি বইটির একটি সমালোচনা প্রকাশের জন্য কবি ও সমালোচক স্যার এডমুন্ড উইলিয়াম গোসের (১৮৪৯-১৯২৮) হাতে তুলে দেন। বইটির চেহারা দেখে গোস প্রথমে এটা ওয়েস্ট বাস্কেটে ছুড়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন, তবে যখন এর কবিতাগুলো পড়লেন, তখন তিনি রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ফলে বইটির একটি প্রশংসামূলক সমালোচনা করেন, যা পরে ‘ক্রিটিকেল কিটক্যাট’ (১৮৯৬) শিরোনামের একটি সমালোচনামূলক পুস্তকে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।

উইলিয়াম গোসের মতে, গীতিধর্মী বৈশিষ্ট্যের চেয়েও, তরুর রচনার অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিকটি হচ্ছে, এটি উনিশ শতকের একজন ভারতীয় নারীর কাছ থেকে এসেছে। তিনি এই সত্যটির প্রশংসা করে বলেন যে, বিভিন্ন ভাষায় তরুর উল্লেখযোগ্য জ্ঞান ছিল, অথচ তিনি সেইসব দেশের অধিবাসী ছিলেন না। তিনি আরো একটি সত্য তুলে ধরেন যে, তরু তাঁর কাজে নিজস্ব মধুর স্বভাব বজায় রেখে গেছেন, কার্যকরভাবে তাঁর আবেগ তুলে ধরলেও কখনো অতি নাটকীয়তার প্রশ্রয় দেননি।

 

০৫

তরু দত্ত বেশকিছু মৌলিক কবিতা লিখেছেন। মৌলিক কবিতাগুলো ছোট। তবে মানবজীবনের নানা সমস্যার কথা তিনি বর্ণনা করেছেন এসব কবিতায়। নারীর স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বাসী তরু পৌরাণিক ভারতের সাবিত্রীকে খুব পছন্দ করেছিলেন।

মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় তাঁর ফরাসি ভাষায় রচিত উপন্যাস ‘লা জার্নাল’ ও ইংরেজিতে লেখা ‘বিয়াঙ্কা’র পাণ্ডুলিপি। পাশাপাশি খুঁজে পাওয়া যায় ‘এনসিয়েন্ট ব্যালাডস’ ও ‘লিজেন্ডস অব হিন্দুস্তান’ নামে দুটি কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি। তাঁর বাবা গোবিন্দচন্দ্র বইগুলো প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ‘লা জার্নাল’ অনুবাদ করে বসুমতি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫৬ সালে বই আকারেও প্রকাশিত হয়। ভূমিকা লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

০৬

আজ  ৩০ আগষ্ট মানিকতলা এসেছি,নিখিলেশ কে তার বইগুলো দেবো বলে। গত কয়েকদিনের ঘোর চোখে মুখে। বইগুলো দিয়ে ফিরেই যাবো নিখিলেশ পেছন থেকে খিস্তি করলো।

-আজ ত্রিশ আগষ্ট,এসেইছিস যখন একটা ফুল অন্তত দিয়ে যা শালা,কবি!দেখনদারীতে হারিয়ে গেছিস। মনে রাখিস মনের ভেতর একজন সন্ন্যাসী না থাকলে সাহিত্য হয় না। তোরা সব শালা ভেকধারী,তাই তোদের সৃষ্টি নেই যা আছে সব উপর উপর।

নিখিলেশকে কি বলা উচিত বুঝতে পারছিনা। ওকে কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। ঝোলা হাতরে ওর হাতে এই কয়দিন ধরে কাটাছেঁড়া করা অনুবাদের কাগজটা হাতে দিয়ে বাসে উঠে পরলাম। মুখে এসে পড়েছে শেষ বিকালের ছায়া,চোখ জুড়ে ঘড়ি টাওয়ার।

SONNET 

A sea of foliage girds our garden round, 
But not a sea of dull unvaried green, 
Sharp contrasts of all colors here are seen; 
The light-green graceful tamarinds abound 
Amid the mango clumps of green profound, 
And palms arise, like pillars gray, between; 
And o’er the quiet pools the seemuls lean, 
Red–red, and startling like a trumpet’s sound. 
But nothing can be lovelier than the ranges 
Of bamboos to the eastward, when the moon 
Looks through their gaps, and the white lotus changes 
Into a cup of silver. One might swoon 
Drunken with beauty then, or gaze and gaze 
On a primeval Eden, in amaze.

আমাদের বাগানকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে পাতার ভিড়ে ঢেউয়ের সাগর ,

তবে সে সাগর নয় বৈচিত্র্যবিহীন সবুজের চোখ, একঘেয়ে নীরস বিস্তার, 

এ-বাগানে সকল রঙের তীব্র বৈপরীত্য দেখতে পাবে তুমি; 
আমগাছেদের গভীর সবুজ এখানে ওখানে 
উপচে পড়া হালকা সবুজ তেঁতুল গাছের শোভা

আর এর মাঝে মাঝে ধূসর স্তম্ভের মতো তাল গাছের সাড়া

শিমুল গাছেরা পুকুরের শান্ত জলে নুয়ে আছে ফুলে ভরা
লালে লাল, যেন চমক জাগানো তুর্যধ্বনি উঠেছে নিঃস্বরা।  

তবে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না সারি সারি

পুবদিকের সেই বাঁশঝাড়, আর যখন চাঁদ

এর ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়, আর শাদাপদ্ম রঙ বদলে

হয়ে যায় রুপোর পেয়ালা। যেন কেউ লাগাম ছেঁড়া 
বেহেড মাতাল হবে এ-সৌন্দর্য দেখে,কিংবা তাকিয়েই থাকবে শুধু 
দেখবে আর দেখবে এক আদিম স্বর্গের দিকে বিপুল বিস্ময়ে। 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত