পরিবেশ সচেতনতা সাদামাঠা ভাবনা, বিন্দু বিন্দু জল

০) গ্রহ তো একটাই। সেটা নীল। আমাদের দ্বিতীয় কোনো চাঁদ বা নীড় নেই। আমাদের বাঁচা মরা সব এক সূত্রে বাঁধা। আমাদের ওপর এখন নির্ভর করছে। আমরা সকলে এক ধাতুর মানুষ না। সবাই এক রকম কাজ আর চিন্তা করি না। এক স্বভাবের নই। গ্রহ আর জীবনকে তবু ভালোবাসি। সকলেই। দু একটা কথা মনে হল, তাই বলছি স্বগতভাবেই।

১) পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে আমার মত সাধারণ লোক প্রেরণা পেয়েছিলাম প্রথমত বাইরে থাকতে – পড়াশুনো করার সময়। একটা সামান্য কাগজ রিসাইকেল করা না করা নিয়ে একদিন এক ছাত্র আমাকে খোঁটা দিলেন। খুব মৃদু ও মার্জিত। সেদিন রিসাইকেলিং শব্দটা জানলাম। আমরা অবশ্য দেশে খবরের কাগজ থেকে খাতাপত্র সব রিসাইকেল করতাম আগে। ভাষাটা জানা ছিল না। আর বাইরের দেশে কাগজ জাতীয়কে মণ্ড বানিয়ে নতুন কিছু বানানো হয় এই সব দেখলাম।

পরে একদল ছেলেমেয়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম গানের সূত্রে। তাঁরা নিজেদের মধ্য পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক ব্যবহার না করা, বা জীবনধারণের পূর্ণ সচেতনতার জায়গা থেকে low consumption, সাদামাঠা প্রাকৃতিক জীবন ধারণ করা, ভিগান খাবার খাওয়ার জন্য একটু বেশি খরচ আর অরগ্যানিক ফার্ম থেকে খাবার কেনার জন্য একটু বেশি চিন্তা এবং উদ্যোগ – এগুলো করছিল। তারা সকলে গরীব ছিল। আমি বুঝলাম যাদের একটা প্রাচুর্যময় দেশে বসে অভাব সইতে হয়, তাঁদের মধ্যে এরাও আছে।

২) আমিও ফার্মারস মার্কেট আর সাস্টেনেব্ল বাজারঘাট করা শুরু করলাম। দেখলাম সেই সব বাজার অর্থনৈতিক ভাবে আমাদের আওতার বাইরে নয়। যারা খদ্দের আমাদের মতো তারাও অনেকে ছাত্রছাত্রী আর তারা আমাদের মতোই জীবন ভালোবাসেন, আর কেউ সন্ন্যাসী নন।

কিছু না বুঝেও তাদের সাত্ত্বিকতা (এটা আমার মতো আমি বুঝি, এর সঙ্গে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের যোগ নেই) আমাদের প্রভাবিত করতে থাকে।

৩) ছোটো ছোটো ব্যাপারে সচেতন থাকার চেষ্টা করছিল তারা, ফলাও না করেই, আর সেটা দুনিয়ার সাস্টেনেবিলিটির ব্যাপারে আহরিত নতুন নতুন জানাশোনা, গবেষণা, উদ্ঘাটন আর সেইসঙ্গে দুর্ভাবনা, আর কর্তব্যবোধ থেকে। আমি দেখে দেখে শিখতে শুরু করলাম।

অজ্ঞানের মত অনেক কাজ প্রথম দিকে করেছি যদিও পরে সেগুলো আর করতে থাকতে পারিনি, এমনো হয়েছে। যদিও সবসময় পেরে উঠিনি, তবু আন্তরিকতার একটা জায়গা ছিল সব সময়।

৪) নিজের চাকরিতে প্রথম ঢুকে আমরা বাড়ি কিনিনি একবারে, কিনলেও ছোটোখাটো কিছু কেনা হত নিশ্চয়ই, low maintenance, low consumption – বিদ্যুৎ কম যাবে এই ভেবে।
নিজের মতো, বাথরুম আর কিচেনে জল কম খরচ করা, গাড়ি না কেনা (দেশে ফিরে অনেক সমস্যার মধ্যে পড়েও), এসি না কেনা, পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহার প্রায় না করা, মাংস মাছ কম খাওয়া বা কেনা, আর পুরোনো বই খেলনা জামা দ্রব্যাদি রিসাইকেল করা এই সব করতে চেষ্টা করতাম আর কি। ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল।

বিশেষজ্ঞদের সোশাল মিডিয়ায় অনুসরণ করতে গিয়ে শুনলাম, যে পরিবেশ সচেতনতার অংশ হিসেবে এই ছোটো ছোটো ধাপ আর lower consumption, সচেতন দৃষ্টি একটা লং টার্ম পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

৫) বাজারে পলিথিন ব্যবহার করে না, disposable plastics ব্যবহার করবেন না বলে নিজের একটা কাপ নিয়ে ঘোরেন চায়ের দোকানে, এই জাতীয় পরিবেশসচেতন মানুষ এখনো এখানে তেমন একটা দেখা যায় না, যা আমি কিছু কিছু দেখেছি ছাত্রবেলায়। বাজারে গেলে পলিথিন নেবো না, এটা দোকানদাররা বুঝতে পারেন না। ফলে সাধারণের মধ্যে যে সচেতনতা তেমন একটা নেই এই ব্যাপারে সেটা আমার মনে হয়েছে

৬) কয়লা এখন বিশ্বে এক তামাদি জ্বালানি যা বেশ কিছু দেশে ব্যবহার হওয়া বন্ধ হচ্ছে। তেল আর কয়লার বিকল্প তৈরি না করলে একটা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আর জলবায়ু এক সঙ্গে টিকবে না। এবার রাজশাহীতে গিয়ে অনেকগুলো সৌর প্যানেলে রাস্তা আলোকিত করছে দেখলাম, চীনে তো এক দেশ সমান সৌর প্যানেল লাগিয়েছে দেখলাম, আর বনায়ন হচ্ছে মারাত্মক হারে। এরা যদিও প্রাকৃতিক বন তৈরি করতে পারছে না, তবু কিছু অম্লজানের সাপ্লাই বাড়ছে। হাই রাইজ দালান শিশুদের কাছ থেকে খেলার মাঠ বা গাছ কেড়ে নিচ্ছে না। আরো জানার ইচ্ছে আছে।

৭) কয়লা আর তেলের বিকল্প জ্বালানী, বৃষ্টির জলের সঞ্চয়ের মাধ্যমে ঘরের কাজ চালানো, নিজের সবজি নিজেরা উৎপাদন, জ্বালানিমুক্ত নানা রকমের বিকল্প মেশিন আর গ্যাজেট, আর sustainable দালানকোঠা, রাস্তা আর গৃহের যে নানা রকমের মডেল হয়েছে – যা সোচ্চার কোনো রূপ না নিলেও মানুষকে প্রেরণা দিয়েছে, সেই খবরগুলো আমরা অনুসরণ করতে থেকেছি।

৮) বিলাসবহুল জায়গা থেকে উপকরণ কমিয়ে সহজ জীবনে রূপান্তরিত মানুষের কাহিনী অনুসরণ করেছি সোশাল মিডিয়াতে। কারো কারো বিশাল বাড়ি ছিল, তাঁরা এখন মোবাইল বাড়িতে থাকে, এতটুকু জায়গা। সেই এক বাড়িতে সৌর প্যানেল দিয়ে তাঁদের সমস্ত জ্বালানির কাজ হয়ে যায়।

ব্যতিক্রমী অনেক ব্যক্তিদের দেখলাম, যারা minimalistic আর সচেতন। তাঁরা অবশ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে কী করেন সেটা জানান, কিন্তু অন্যদের ব্যাপারে রায় দেন না। এই শ্রদ্ধাশীল নীরব কাজটুকু প্রেরণা দেয়।

৯) দেশে (বা বিদেশে) প্লাস্টিকের বদলে প্রথম যেদিন বড়ো হারে পাটের (বা শ্যাওলার) অনুরূপ ব্যাগ চালু হবার নমুনা দেখেছিলাম খুব উত্তেজিত হয়েছিলাম।

১০) সুইডেনে আবর্জনা রিসাইকেল করে যে জ্বালানি বানানো হয় এটা জেনেছিলাম। এটাও জেনেছিলাম যে আমাদের আবর্জনা কিনে নেবার একটা প্রস্তাব তারা করে কিন্তু আমরা রাজী হইনি রাষ্ট্রীয়ভাবে।

১১) গাছের টব এনে এই শহরে আনাড়ি হাতে গাছ লাগানো আর শিশুকে নিয়ে পালার চেষ্টা করেছি, প্রথম দিকে সফলও হয়েছি। মাঝেমাঝেই শহর ছাড়তে হয় তখন গাছ দেখাশুনো করার লোক তাদের দায়িত্ব পালন করেনি – গাছ কিছু মরেই গেছে সেভাবে।

কিছুদিন আগে উল্লম্ব বাগান বা ভারটিকেল গার্ডেনের ধারণা ব্যবহার করে ব্রাজিল তার রাজধানীতে দূষণ কমিয়েছে, আর আশা ছিল এরকম যে বড়ো নগরে এমন উল্লম্ব বাগান আমাদের ফ্লাইওভারে বা দালানে করতে হবে।

১২) অতিরিক্ত জামাকাপড় জুতো বা দ্রব্য কেনার ব্যাপারে আমার একটা ইন্সটিঙ্কটিভ মনোগত বিরোধ কাজ করে, অনেকে সেটা কিপ্টেমি বা ইকোনমিকাল কিছু একটা ভাবলেও মনে হয় সেটা ওই দ্রব্যগুলো তৈরি করার পেছনে যে অসীম প্রাকৃতিক রিসোর্সের ব্যবহার আছে, সেটা মনে রেখেই।

একটা জামা বা শাড়ি বা আসবাব বা মেশিন নির্মিত উপকরণ বানাতে অনেক সময় জটিল প্রক্রিয়া লাগে – অনেক রসদ যায়, প্রাকৃতিক ক্ষতি হয়। একটার বেশি দুইটা বাড়ি কারো দরকার না থাকলেও রিয়েল এস্টেটের ব্যাপারটা কেমন মারাত্মক আগ্রাসী ব্যবসা সেটা আমরা জানি।

আসবাব, জামা, দ্রব্য বা যন্ত্র উৎপাদনের ভিডিও আমরা এখন কিছু পাই যা আমাদের উৎপাদনের প্রক্রিয়াগুলোকে চেনায়, ধাপে ধাপে। প্রকৃতি আর পরিবেশের অপব্যবহার যে হয় না সেটা আশা করি আমরা কেউ মনে করি না প্রত্যেক ক্ষেত্রে।

১৩) টের পেয়েছি মানুষ হিসেবে ভোগ করতে হয় এবং করতে ইচ্ছে করে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত লোভ বা ভোগের পেছনে প্রকৃতির যে ক্ষয়ক্ষতি সেই প্রক্রিয়াটা ভালো করে জানার ফলে অনেকেই আর ততটা ভোগ করতে চান না, বাই চয়েস। তারা কেউ সন্ন্যাসী না। খুব সাদামাঠা উৎকর্ণ আর আন্তরিক লোকজন।

লাইফ স্টাইলের জায়গায় সাধারণ সচেতনতা, যার সঙ্গে আছে কর্তব্যবোধ বিবেক আর নম্রতা, এগুলো গরীব পরিবারেই দেখেছি।

এরা মূলস্রোতের মানুষ না হলেও এরা সংখ্যায় নেহাত কম না। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে অরগ্যানিক (রাসায়নিক ওষুধ আর রাসায়নিক সার বাদ দিয়ে একটা সুস্থ পরিবেশে ফারমিং করা) দুধ ডিম আর মাংসের হার বেড়ে গিয়েছিল বলে দাম কমে গিয়েছিল সেটা আমরা টের পেতে থাকি।

১৪) হয়ত মিছিল আর সভাসমিতি করেই ব্যাপারটা হয়নি, কিন্তু প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবনে একটা শুভ সচেতনতার সূচনা আর সঙ্গত ব্যবহারিক প্রয়োগ – দেখেছিলাম, যেটা প্রচারমূলক নয়, আন্তরিক বলে আরেকজনকে সহজে স্পর্শ করে।

১৫) মনে পড়ল ক্যাম্পাসে আমাদের মা কাকী চাচীদের কারো কারো হাতে সবুজের আর গাছের সমারোহ। শুধু বাগান পালতে শিখলে আমরা কেমন থাকতাম? একটু সবুজকে প্রতিদিন লালন করতে পারলে? আরেকটা কথা মনে পড়ল, ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে পেছন দিকের যে সবজি বাগান মা করেছিলেন, সেখানে প্রতি দিন অরগ্যানিক ওয়েস্ট একটা গর্তের মধ্যে ফেলা হত। আবর্জনা নষ্ট হত না। ঠিক রিসাইকেল হয়ে যেত। নতুন বাগান আর গাছ জন্ম নিত।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত