পথবাতির ইতিকথা

দামু মুখোপাধ্যায়

 

ছোটবেলায় লোডশেডিং কবলিত সন্ধ্যায় পড়তে বসে পেল্লাই হাই উঠলেই ধমক খেতে হত, “ছিঃ, লজ্জা করে না! জানো, বিদ্যাসাগর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পড়াশোনা করতেন? আর তুমি…!”

মহাজীবনের সঙ্গে এই অযাচিত তুলনা কোন যুক্তিতে, সে প্রশ্ন করার সাহস তখন ছিল না। সাহস ছিল না এটা শুধোনোরও যে ওঁর আমলে ফি সন্ধেয় গড়ে কতক্ষণ লোডশেডিং হত। আর ছোট্ট মাথায় এই প্যাঁচালো জিজ্ঞাসা তো কিছুতেই আসেনি যে তাঁর ভোগান্তির জন্য ভাগ্যদেবীর হাতযশ থাকলেও, আমার হেনস্থার পেছনে দুশো ভাগ হাত রয়েছে শহরের বিদ্যুৎ দফতরের। যাক সে দুর্ভোগের কথা। কিন্তু বড় হয়েও জানতে ইচ্ছে করে ঘটনাটা কতটা সত্যি আর কতটা ওই ‘ইয়ে’।

 

কলকাতা কর্পোরেশনের পুরনো নথি ঘেঁটে দেখা গেল, ঈশ্বরচন্দ্রের শৈশবে ইলেকট্রিক তো ছাড়, গ্যাসের আলোর কৌলীন্যও জোটেনি মহানগরীর কপালে। তা হলে রাস্তায় আলো কি জ্বলতই না? জ্বলত। আর তা ছিল কেরোসিনের বাতি। কিন্তু তার আগে? উনিশ শতকের গোড়ার দিকে শহরের রাস্তায় ছিল না পথবাতি। সন্ধ্যা নামতেই দরজায় কুলুপ আঁটতেন বাসিন্দারা। ঘরের ভেতর  জ্বলত রেড়ির তেলের প্রদীপ। রাতবিরেতে বাইরে বেরোনোর দরকার পড়লে জ্বালিয়ে নেওয়া হত পাটকাঠির ডগায় মশাল। ওই শতকের মাঝামাঝি কলকাতার রাস্তায় কেরোসিনের আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করে পুরসভা। রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, “… কেরোসিনের আলো পরে যখন এল তার তেজ দেখে আমরা অবাক।” তবে রাস্তায় উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা থাকলেও, বাড়িতে কিন্তু তখনও মহাবিক্রমে রাজত্ব করছে রেড়ির তেলের প্রদীপ বা সেজ। তাই প্রতি পাড়াতেই ছিল একটা রেড়ির তেলের কল বা দোকান।

কলকাতায় গ্যাসবাতির প্রচলন হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। তবে তার আগেই, ১৮০৭ সালের ১৬ অগাস্ট লন্ডনের রাস্তায় জ্বলে ওঠে গ্যাসের আলো। ১৮২২ সালের ৩০ মার্চ তখনকার এক বাংলা দৈনিকের খবরে জানা যায়, “ইংলণ্ড দেশে নল দ্বারা এক  কল সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার দ্বারা বায়ু নির্গত হইয়া অন্ধকার রাত্রিতে আলো হয়। … অনুমান হয় লটারির অধ্যক্ষরাও লটারির উপস্বত্ব হইতে কলিকাতার রাস্তাতে ঐরূপ আলো করিবেন।”

সংবাদপত্রের ‘অনুমান’ সত্যি হতে লেগে গেল আরও পঞ্চাশ বছর। ১৮৫৭ সালের ৬ জুলাই কলকাতার রাস্তায় পুরসভার লটারির টাকাতেই প্রথম জ্বলল গ্যাসবাতি। হুতোম লিখেছেন, সন্ধ্যা হলেই পুরসভার মুটে বগলে মই নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটত পথে পথে আলো জ্বালতে। মই বেয়ে ল্যাম্পপোস্টে উঠে প্রথমে ন্যাকড়া বুলিয়ে পরিষ্কার করত আলোর শেডের কাচ। তারপর চাবি ঘুরিয়ে চালু করত গ্যাস। সব শেষে দেশলাই জ্বালিয়ে ধরাত বাতি। আলো জ্বালানো-নেভানোর সময় নিয়ে প্রচণ্ড কড়াকড়ি ছিল পুরসভার। ১৯০৮ সালের কর্পোরেশন অফ ক্যালকাটা-র অ্যালম্যানাকে দস্তুরমতো ঘণ্টা-মিনিট উল্লেখ করে বছরভর প্রতি দিনের বাতি জ্বালানো ও নেভানোর নির্ঘণ্ট বেঁধে দেওয়া হয়েছে। (উদাহরণ- ডিসেম্বর মাসের ১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত আলো জ্বালানোর সময় বিকেল ৫টা বেজে ৫০ মিনিট। আলো নেভানোর সময় ভোর ৫টা বেজে ৩৫ মিনিট। আবার ওই মাসেরই ১৬ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত আলো জ্বালানোর সময় বিকেল ৫টা বেজে ৪৩ মিনিট। আলো নেভানোর সময় ভোর ৫টা বেজে ৪৫ মিনিট।) বলা বাহুল্য, সাহেবি আমলে এর নড়চড় বড় একটা হত না।

আলো জ্বালাতে ব্যবহার হত কয়লার গ্যাস। জোগান দিত ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানি। পাইপলাইনের সাহায্যে পরবর্তীকালে সেই গ্যাসের আলো ঢুকে পড়ে শহরের উচ্চবিত্ত বাড়িতেও। শোনা যায়, এর পথিকৃত্ শোভাবাজার রাজবাড়ি। আর গ্যাসবাতি দিয়ে অভিজাত হগ মার্কেট সাজানো হয় ১৯০৪ সালের ১ মে থেকে ১৯১১ সালের ৩০ এপ্রিল সময়কালে।

শহরের রাস্তায় গ্যাসবাতির একচ্ছত্র আধিপত্যে ভাগ বসাতে বৈদ্যুতিক আলোর বিকাশ ১৮৮৯ সালে। কলকাতায় প্রথম যে রাস্তা বিজলিবাতির আলোর স্পর্শ পায় তা হল হ্যারিসন রোড, অধুনা মহাত্মা গাঁধী রোড। গোটা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে লেগে যায় তিন বছর। ১৮৯২ সালে হ্যারিসন রোড জুড়ে আলোর বন্যা বয়ে যায়। সৌজন্যে কিলবার্ণ অ্যান্ড কোম্পানি। তবে এরও আগে ১৮৭৯ সালের ২৪ মে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজধানীতে প্রথম বিজলিবাতির প্রদর্শন করেন পি. ডব্লিউ. ফ্লুরি অ্যান্ড  কোম্পানি। তার মাত্র দু বছর পরেই ৩০ জুন ১৮৮১ ম্যাকিনন অ্যান্ড ম্যাকেঞ্জি কোম্পানির গার্ডেনরিচের সুতোকলে ৩৬টা ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বালিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় দেশি সংস্থা দে শীল অ্যান্ড কোম্পানি।

১৮৯৫ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক লাইটিং অ্যাক্ট পাশ করে তদানীন্তন বাংলার সরকার। ১৮৯৭-এর ৭ জানুয়ারি ২১ বছরের জন্য শহরকে আলোকিত করার লাইসেন্স মঞ্জুর হয় ইন্ডিয়ান ইলেকট্রিক কোম্পানি লিমিটেডের এজেন্ট কিলবার্ণ অ্যান্ড কোম্পানির নামে। উলিশ শতককে বিদায় জানিয়ে শুরু হয় বিংশ শতকের গর্বিত আত্মপ্রকাশ।

ভিক্টোরীয় যুগের গ্যাসবাতি জ্বলত পেটা লোহার কারুকাজ করা পোস্ট বা ব্র্যাকেট থেকে। বিজলি বাতির আদি যুগে রাস্তার পাশের এই পোস্টগুলোই ব্যবহার হত আলো জ্বালাতে। তবে কাচের মনোহারি আস্তরণ বাতিল করে এনামেলের শেড থেকে ঝুলত নগ্ন বাল্ব। ক্রমে ইতিহাসের পাতাতেই ঠাঁই হয় সুদৃশ্য পোস্টগুলোর। তাদের জায়গা নেয় আখাম্বা লোহার খুঁটি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে আলোর রকমও। বাল্ব থেকে ফ্লুওরোসেন্ট টিউবলাইট। তারপর একে একে মার্কারি ভেপার, সোডিয়াম ভেপার হয়ে হালের বিতর্কিত ত্রিফলা বা ট্রাইডেন্ট স্ট্রিটলাইট।

গ্যাসপোস্টের মাদকতা না থাকলেও বেশ কিছু মজার ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি নিয়ে। ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় ফি সন্ধ্যায় কলকাতায় হত ব্ল্যাকআউট। সরকারি নির্দেশে আলকাতরা মাখানো টিনের ঘেরাটোপে ঢেকে দেওয়া হয় শহরের তামাম রাস্তার আলো। আসলে শত্রুপক্ষের বিমান হানার আশঙ্কাতেই এই সাবধানতা।

কোলকাতার রাস্তায় পথবাতি

আর ১৯৫৫ সালের হিট বাংলা ছবি উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন অভিনীত সবার উপরে’তে তো কাহিনির মোড়ই ঘুরে যায় পথবাতির সুবাদে। মিথ্যা মামলায় খুনি সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটতে হয় নায়কের বাবাকে। রাস্তার আলোয় তাঁকে দেখে ফেলার দাবি জানান জনৈক সাক্ষী। সন্ধ্যা ৭টার সময় আসামীকে না কি ঘটনাস্থল থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। নায়ক মিউনিসিপ্যালিটির নথি ঘেঁটে প্রমাণ করেন শুক্লপক্ষের রাত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পরে, অর্থাৎ ৮টার সময় সে রাতে জ্বলেছিল পথবাতি। অতএব ধরা পড়ে যায় সাক্ষীর মিথ্যাচার।

সিনেমার গল্পের পেছনে রয়েছে নির্জলা সত্যি। ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক জানান, চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য জ্যোত্স্না রাতে একটু দেরিতেই রাস্তার আলো জ্বালানোর নিদান দিয়েছিল পুরসভা। একই কথা জানান মধুপুরে সে যুগে ছুটি কাটাতে যাওয়া এক কলকাতাবাসী। তাঁর বয়ান অনুযায়ী, শুক্লপক্ষের রাতে স্বাস্থ্যাবাসেও মিউনিসিপ্যালিটির নির্দেশে জ্বলত না পথবাতি।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত