প্রবুদ্ধসুন্দর কর-এর একগুচ্ছ

Reading Time: 3 minutes
১. এই পরিত্যক্ত টানেলটিই তোর বাবা পাপ ও পুণ্যকে যে সমান্তরাল রেখে মৃত রেললাইন হয়ে শুয়ে থাকত এই আশায়, কখনও কোনও একদিন তোর তীব্র আলো এই হিম অন্ধকার চিরে আমার দুঃসহ নশ্বরতা ঝলসে দিয়ে বাঁক নেবে লঙ্গরাঙ্গাজাও স্টেশনের দিকে। ২. যে-ধ্বংসের আর কোনও অবশেষ নেই সেই শূন্যতাই তোর বাবা আগুনের শুশ্রূষার পর  ছাই ও ধোঁয়ার রেখা ক্রমশ বিলীন হলে উত্তরাধিকারসূত্রে যে রিক্ততা জেগে উঠবে তাকে তুই তিল হরিতকীসহ তিতিক্ষার জলে ধুয়ে দিস।
   
সিসমোগ্রাফ চুল সরিয়ে, কানের খুব কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে উঠেছিলাম, শরীর ভূকম্পপ্রবণ অস্থির ইঁদুর ছুটে বেড়াচ্ছে ভেতরে বিপথের দিকে ছুটে যাচ্ছে ত্রস্ত, এলোমেলো, পিঁপড়ের সারি মধ্যরাতের স্তব্ধতা চিরে ডেকে উঠছে কামার্ত কুকুর। প্ররোচিত হয়ে, জানতে চেয়েছিলে খুব অ্যাঙ্গারা ও গন্ডোয়ানাল্যান্ড তবে কি দু-পাশে সরে যাবে আবারও কি জেগে উঠবে টেথিস সমুদ্র সমগ্র পৌরুষ ও লাভার উদগীরণ নিয়ে কি পর্বতশৃঙ্গ লীন হবে? সম্মতিসূচক চোখে তাকিয়ে বলেছিলাম, হবে যদি তোমার ভূমিকা হয় এক সিসমোগ্রাফের যাতে অনুভূত হয় কত রিখটার স্কেল তীব্রতায় এই প্রবণতা আছড়ে পড়েছিল।
 
বসন্তরাস সূর্যাস্তের লালিমা শরীরে মেখে ডেকেছিল শঙ্খিনী রমণী বৃক্ষাদিরূঢ় মুদ্রায় আমাকে জড়িয়ে ধরে গেঁথে নিয়েছিল যেন উন্মাদ আশ্রম ভেঙে ফাঁড়িপথে আমি পালিয়ে এসেছি দংশন, চুম্বন, ছেদন, স্তম্ভন আর উষ্ণ শ্বাসাঘাতে সেও ডুবে গিয়ে ভেসে উঠেছিল দরজাখোলা তীব্র স্নায়ুর জোয়ারে যেন সে শঙ্খিনী নয়, মৃগপুরুষের নিচে ক্ষুধার্ত বাঘিনি মুহূর্তে গড়িয়ে গেল বিপরীত বিহারের অন্ধকার খাদে প্রায়োপবেশনশেষে তার যোনির ব্যাদান গ্রাস করেছিল হরিণের অস্থিরতা, অম্লস্বাদু রক্তমাংস ও আশৃঙ্গখুর বেলকুঁড়ি স্তন থেকে বিচ্ছুরিত বাদামি আলোয় অপরূপ সর্বনাশ রচনার আগে, কেঁপে উঠে রাগমোচন ও লাভা উদগীরণের আগে, মৃগের উদ্যত শিশ্নে শঙ্খিনীর উলু ত্রিসন্ধ্যা লেলিয়ে দিয়েছিল আচ্ছন্ন রাত্রির দিকে, রুদ্ধশ্বাস মৃগটিও জিহ্বায় ফুটিয়েছিল শঙ্খিনীর লেলিহ পলাশ।
   
বনরুই ত্রিপুরার পাহাড়ে জঙ্গলে কখনো সখনো বনরুই নামে একটি প্রাণীর দেখা পাওয়া যায়। ছোটোখাটো গড়নের এই প্রাণীটি নিরীহ হিসেবেই পরিচিত। দাঁতহীন ছোট্ট মুখ, সারা গায়ে রুই মাছের পাতির মতো বড়ো বড়ো গোল গোল আঁশ আছে বলেই হয়তো এর নাম বনরুই। ধারালো আঁশের এই প্রাণী বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে মুহূর্তেই শরীরটিকে গুটিয়ে গড়িয়ে যেতে পারে। অন্ধকার পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে, হেডলাইটের আলোয় হঠাৎই বনরুই চোখে পড়ে গেলে, সদ্য ডিম ফুটে বেরুনো প্রাগৈতিহাসিক ডায়নোসরের বাচ্চা বলে মনে হতে পারে। পিপীলিকাভুক হওয়ার কারণে, সম্ভবত, ভূকম্পনের আগে বনরুইয়ের অস্থিরতা লক্ষ করা যায়। কারো কারো বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে কুশিয়ারা-ব্রহ্মপুত্র-বরাক নদীর একাকার জলোচ্ছ্বাস গোটা উত্তরপূর্বকে তলিয়ে নেওয়ার আগে একমাত্র বনরুই-ই টের পাবে মহাপ্লাবনের আসন্ন সঙ্কেত। এ পর্যন্ত শুনে আপনারা বলে উঠবেন, আরে এ তো প্যাঙ্গোলিন! ঠিকই ধরেছেন, প্যাঙ্গোলিনই বনরুই; বিলুপ্তির সম্ভাবনা ছাড়া যার সঙ্গে আর কোনও সাদৃশ্য আমার নেই।   আলো সন্ধ্যা নেমে এলে সমূহ মনোবেদনা নিয়ে জ্বলে ওঠে একটি নক্ষত্র বিষাদস্পৃষ্ট তোমার মুখ কোনও একদিন যদি স্পষ্ট হয়ে ওঠে বোঝা যাবে, সেই নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে, সামান্য আগে।
  হে ৎলাংসাং ট্যুরিস্টের ছদ্মবেশে তোমাদের দেশে বেড়াতে এসেছি। এ পাহাড়ে জলের অভাব, তাই, সমতল থেকে আনা ব্যাগভর্তি স্বাস্থ্যসচেতন মিনারেল।   মাথা কুটে মরে গেলেও পাহাড়ে একফোঁটা মদ পাওয়া যাবে না কোথাও, আগে থেকে জেনে তূণভর্তি রয়্যাল চ্যালেঞ্জ। শুনেছি, শরীর নিয়ে তোমাদের ট্যাবু নেই কোনও তোমাদের ফর্সা শরীরেই হবে কমলা উৎসব উত্তেজনা ও রোমাঞ্চে তাই পার্সের পকেটে ডটেড ফিয়েস্তা। রাত যত ঘন হয়ে আসে, সাংকেতিক টর্চের ফোকাস যেন পাহাড়ে পাহাড়ে ফিসফিস সম্প্রচার করে আমরা ত্রিপুরার কেউ নই, আইজল-ই আমাদের রাজধানী সাবধান, সমতল থেকে ছদ্মবেশীরা এসেছে। ডিনারের আগে গির্জা থেকে ভেসে আসে চাপা কোলাহলসহ গিটার ও ড্রামের অস্ফুট গোঙানির ধ্বনি অ্যালকোহল নয়, ক্রুশবিদ্ধ যিশুরক্ত যেন মাদকতাময় পাপ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে জুডাস ইসক্যারিওট আমার শিরায়। হে ৎলাংস্লাং, আগুন-দেখা পাথর, তোমাকেই ছুঁয়ে আত্মপ্রোটেস্ট্যান্ট হয়ে অনুতপ্ত আর্দ্র চোখে, হাঁটু গেড়ে, মনেপ্রাণে চাই    
বাংলাভাষা
শিয়রের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাভাষা তাকে কি বলব,অন্ধ আর আলোর সংশয় প্রাণের ভেতর রোপিত মৃত্যুর ছল তাকে কি বলব,শুধু আলো নয় অনুভূতিদেশ থেকে কখনো কখনো অন্ধকারও আসে?
           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>