প্রথম আগুন…

Reading Time: 2 minutes 
মনোনীতা চক্রবর্তীর পাপাই কমলেন্দু চক্রবর্তী।

চোখ-খোলার পর থেকেই অনেক কিছুর সাথে-সাথে দেখেছি প্রচুর আলো।ঠিক যেমন দেখেছি,অন্ধকারের ঝুমঝুম। তখন জানতাম না ‘উষ্ণতা’ বা ‘উত্তাপ’ শব্দটা কী আসলে। মা রোজ রান্না করতেন, তখন গুল-কয়লার উনোন। আমাদের রান্নাঘর লাগোয়া বড়-বারান্দার একটা চুপ-কোণে। রোজ ভাতের তুমুল গন্ধে আমার ছোট্ট দুনিয়া মানে আট’শ স্কোয়ারফুটের কোয়ার্টার যেন মোহিনীঅট্টমে নেচে উঠত। সকালে ভাত বসবার আগে উনুন-ধরাবার একটা পদ্ধতি ছিল। অবশ্য এখন সেসব আমাদের প্রজন্ম ভাবতেইই পারে না। যাইহোক, উনোন-এর পুরো ধোঁয়ায় ছেয়ে যেত সারাবাড়ি। জল ছলছল দু’চোখ। ঘরের ভেতর দিক থেকে সব দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হত। কিন্তু, তারপরও কিছু জল চোখের পাড়ায় কম-বেশি থাকতোই। আশ্চর্য, ধোঁয়ার নীচের জ্বলে ছারখার হওয়া আগুনের সংসারের দিকে কখনও চোখই যায়নি! জানি,ওটা গরম কিছু।মায়ের-পাপাইয়ের বারণ ওদিকে যেতে।ব্যস… আমি আমার প্রথম-পৃথিবীর কথাই বলছি,আমাদের ঘর। আমি রোজ মাকে সন্ধে দিতে দেখেছি। পুজোতে মোম বা প্রদীপ-ধুনো-ধূপ দিতে দেখেছি।কিন্তু উজ্জ্বল আলোটুকুই শুধু দেখেছি।আগুনটুকু নয়। আমার পাপাইকে দিনের ভেতর অসংখ্যবার দু’ঠোঁটের ফাঁকে হলুদ ঝিকমিক আর ধোঁয়া নিয়ে খেলতে দেখেছি। মাঝেমধ্যে টুকরো-ফিল্টারের শেষটান এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজেও দিয়েছি। অসম্ভব প্রিয় ধোঁয়ায় নিজেকে রানিও মনে হয়েছে। কিন্তু ধোঁয়াটাই শুধু দেখেছি। আসলে, ‘আগুন’ আমার কাছে শুধুমাত্র একটা শব্দ ছিল। হ্যারিকেন-এর আলো হঠাৎ লোডশেডিং-এ সংখ্যাহীনবার আমার মায়ের মুখ দেখিয়েছে,স্পর্শ চিনিয়েছে।আমার হিম-শরীর, অন্ধ-অন্ধকার থেকে বাঁচিয়েছে। আমি হ্যারিকেনের সলতে কেন আলো হল তা দেখিনি। অথচ, আমি দেশলাই চিনি।আমি লাইটার চিনি। তারপর পেরিয়েছি অসংখ্য মাইলফলক।ডাকনাম তখন ঘরবন্দি-ই। ভালোনামে আমার পৃথিবী হাঁটছে-দৌড়োচ্ছে-বদলাচ্ছে।আমিও ওই হলুদ-উড়ানে রোজ ভাসি, কিন্তু ওই পর্যন্তই।

এবার আমার শব্দরা বেসামাল হবে। আমার টাইপ-করা এই যে আঙুল তা ভয়ংকর বেয়াদপি করবে।কাপালিকের মতো নির্মম হবে।সমস্ত ‘উত্তাপ’ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে যাবে। অজানা সেই ডাকনামের আমি উষ্ণতাকে ‘তীব্র দহন’-এ চোবাব। নিসর্গ ভারী রমনীয়।ঝুমঝুম অন্ধকার। পাশে বহতা-নদী। ছড়ানো-ছিটানো দেউল। 

ধূপ-সুগন্ধী-ঘি-মধু আদিবাসী-নৃত্যের মতো সারিবদ্ধ আমার চারপাশে।আমার ডাকনাম-ভালোনাম মিলেমিশে একাকার।আমি লাবণ্য আঁকছি। সাজানো বিছানা। বিছানার ওপর বিছানা।মাঝে আমার বাধ্য পৃথিবী। উলটে শুয়ে আছে। আমার হাতে শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে কারা যেন ধরিয়ে দিয়েছে পাটকাঠির মশাল। আমাকে সেই মশাল ছোঁয়াতে হবে তাঁর মুখে। তাও একাধিকবার। আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছেন রবীন্দ্রনাথ…আমার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে-করতে আমি বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলাম ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে..’ চোখের সামনে দাউ-দাউ জ্বলে উঠলো আমার পৃথিবী— আমার বাবা,আমার পাপাই! কী দামাল সেই রাক্ষুসে আগুন! আমার পাপাইকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল! আমি শুধু পুড়লাম।ছাই হলাম না। প্রকাণ্ড গোল-গোল ধোঁয়ার নীচের যে-গল্পটা, সেটা সেদিন খুব ভালোভাবে বুঝলাম। তাবৎ আগুনের ঘর-সংসার দেখলাম। সেই-ই আমার দ্যাখা প্রথম আগুন…

আমার বাবা!            

.

One thought on “প্রথম আগুন…

  • আপনার কলমে আটপৌরে যাপন, স্নিগ্ধ, মায়াময় প্রেম, অবিরাম স্রোতের মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
    কুর্ণিশ মনোনীতা চক্রব।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>