প্রথম প্রেম

এ হল সেই সত্তরের দশকের শেষদিকের কথা। যখন নকশাল আমলের শেষে কলকাতা সবে শান্ত হয়েছে। ধরা যাক পাত্রপাত্রীর নাম গীতশ্রী ওরফে গীতু আর শ্যামল ওরফে কেষ্ট। গীতু সবে মফস্বল থেকে এসেছে কলকাতায়। বাসা বেঁধেছে বরানগরে। বয়সটা বারো কি তেরো। মনটা কাঁচা, স্বপ্নে ভরপূর আর চোখে অপার বিস্ময়। দেহে সবে কলি ফুটেছে। মুখখানি ঢলঢলে। নীলরঙা স্কার্ট আর সাদা ব্লাউস পরনে, একমাথা চুলে দু’বিনুনী ঝুলিয়ে স্কুলে যায় সে রোজ। কলকাতার পথঘাট একেবারে চেনে না বলে বাবা রিক্সা ঠিক করে দিয়েছেন। ঠিক দশটায় রিক্সা এসে দাঁড়ায়। গীতু রিক্সায় উঠে চলে যায়। কোনদিকে তাকায় না কিন্তু অনেক চোখ যে তাকে দেখছে তা ভালোই অনুভব করে গীতু। একটু একটু লজ্জা আর গর্বও হয় বৈকি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরে ঘুরে দেখাটা বাড়ে ।

এমন সময় একদিন ঘন বর্ষাকাল। রিক্সার সামনে প্লাস্টিকের পর্দা ফেলে চলেছে গীতু। বৃষ্টির ছাঁট চারিদিক থেকে বিব্রত করে তুলেছে। এমন সময় পাড়ার মোড় ঘুরতেই ঠক করে পায়ের কাছে কি এসে পড়লো! চমকে উঠে পায়ের কাছ থেকে একটা গোলাপী ছোট্ট খাম তুলে নিলো গীতু। খামের মধ্যে সাদা কাগজে বেশ বড়োসড়ো একখানা চিঠি! খুলে তো গীতুর চক্ষু চড়কগাছ! প্রেমপত্র! এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে হয় নি! স্কুল প্রায় এসে গেছে। কোনরকমে চিঠির একটা কোণা খুলে পড়ে গীতু!

গীতু,
আমি তোমার পাশের পাশের বাড়িতে থাকি । আমার নাম শ্যামল। ডাক নাম কেষ্ট! তোমাকে সকাল বিকাল দেখি! তুমি একবারও তো তাকাও না! তুমি যখন ছাদে ভাইয়ের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলো, আমিও তো ছাদে থাকি, তুমি দেখো নি? তুমি কি মিষ্টি দেখতে! তুমি আমার ববি! কিছু ভালো লাগে না তোমাকে দেখতে না পেলে!
(তারপর আরো চার পাঁচ পাতা প্রলাপ শেষে)
তুমি আমার চিঠির উত্তর দেবে কিন্তু । মোড় ঘোরার পর আমি দাঁড়িয়ে থাকবো।

ইতি
তোমার কেষ্ট

গীতু অনুভব করে ওর কান দুটো থেকে আগুন বেরোচ্ছে! গালগুলো গরম! নির্ঘাত লাল হয়ে গেছে! ও এখন কি করে এই চিঠি নিয়ে? ছেলেটা কে? ওর নাম জানলো কি করে! স্কুলের ব্যাগে রাখবে? না না যদি বই খাতা বার করতে গিয়ে পড়ে যায় হঠাৎ! এই চিঠি নিয়ে বাড়ি যাবে! মা জানতে পারলে পিঠের ছাল ছাড়িয়ে নেবে। ধুর ফেলে দিলেই হয়! আপাতত থাক ব্যাগে। সেদিন আর ক্লাসে মন বসলো না। বন্ধুদের বলি বলি করেও বলা হলো না। ফেরার পথে চিঠিটা ব্যাগ থেকে বার করে ফেলে দেবে ঠিক করলো গীতু। দিলোও ফেলে! যেই মাটিতে পড়েছে, তাড়াতাড়ি রিক্সাওয়ালাকে বললো “একটু তুলে দাও তো – একটা কাগজ পড়েছে।“ রিক্সাওয়ালা সন্দেহজনক চোখে তাকিয়ে তুলে দিলো চিঠিটা। ব্যাগে ঢুকিয়ে বাড়ি নিয়ে এলো গীতু। বাড়ি ফিরে দেখে মা দিবানিদ্রা দিচ্ছেন। গুটি গুটি ব্যাগ থেকে চিঠি বার করে নিজের ঘরে গিয়ে পড়তে শুরু করলো। ছেলেটার মুখটা মনে করার চেষ্টা করলো। কই? খেয়াল করে নি তো! চিঠিটা নিষিদ্ধ ফলের মতো ব্যাগেই রইলো ।

বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলো গীতু । হঠাৎ দেখে দুটো বারান্দা ওপাশ থেকে একটা ছেলে ইজি চেয়ারে বসে এক দৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! পাশের পাশের বাড়ি মানে তো ওটাই! তাহলে কি – বুকটা ধড়াস করে ওঠে। ঘাড় বাঁকিয়ে আড় চোখে যতটা পারে দেখে নেয় ছেলেটাকে । এমন সময় মা এসে পাশে দাঁড়ায়। যথারীতি মায়ের চোখও চলে যায় ওইদিকে। তাড়াতাড়ি সরে আসে গীতু । খানিক পরে আবার এসে দাঁড়ায় আর দেখতে পায় ছেলেটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাতে একটা ক্যান নিয়ে কোথায় যাচ্ছে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে। চোখটা যতদূর সম্ভব দূরের দিকে পাঠিয়ে তাকিয়ে থাকে গীতু। একবার নীচের দিকে তাকাতেই দেখে ছেলেটা হাঁটছে একেবারে চোখ কপালে তুলে। অর্থাৎ ওর চোখ মাটির দিকে না থেকে ওদের বারান্দার দিকে। ব্যাস, এই কেষ্ট হতে বাধ্য। ইশ কি বিশ্রী নাম! কেষ্ট! ছিঃ! চিঠিটা কালই ফেলে দিতে হবে। ভেবে ঘরে চলে আসে। সন্ধেবেলা পড়তে বসে বইয়ের আড়ালে আবার সেই চিঠি! কি যে নিষিদ্ধ আকর্ষণ।

পরদিন স্কুলে যাওয়ার পথে চিঠিটা ময়লার গাদায় ফেলে দিয়ে শান্তি! কয়েকদিন আর কিছু ঘটলো না।
রবিবার ভাইয়ের সঙ্গে নেট টানিয়ে ছাদে ব্যাডমিন্টন খেলছিলো গীতু। দেখে পাশের পাশের ছাদে উঠে এসেছে কেষ্ট। ঈশারায় চিঠি লেখার ভঙ্গী করে চলেছে আর খুব প্রশংসা করছে ওর স্পোর্টস ফ্রকের। আড় চোখে দেখতে দেখতে প্রায়ই শট রিটার্ন দিতে ভুলে যাচ্ছিলো গীতু আর ভাই বিরক্ত হয়ে তাকাচ্ছিলো ওর দিকে। সেদিন রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে চুপিচুপি আলো জ্বাললো গীতু। নাহ! চিঠিটার একটা উত্তর লিখে ফেলতেই হচ্ছে । জাস্ট বলে দেবে ওর এই সব ভালো লাগে না। আর যেন কখনো চিঠি না লেখে, ব্যাস। কিন্তু তারপরেই ছেলেটার মুখটা মন পড়ে। বেশ হ্যান্ডসাম! সত্যিই কি ওকে ভালো লাগে ছেলেটার? নিশ্চয়ই কোন কাজকর্ম নেই। তাই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আচ্ছা, দেখাই যাক না একটু মজা করে!
খাতা থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে লিখতে বসে গীতু । কিছুতেই শুরু করতে পারে না। কি লিখবে? কেষ্ট? না না, শ্যামল? শেষে শুধু লিখলো
হেলো,
আপনার চিঠি পেয়ে ভালো লাগলো। আপনাকে ছাদে দেখলাম। আমারো আপনাকে ভালো লাগে। কিন্তু চিঠি লিখবেন না। বাড়িতে কেউ দেখতে পেলে মুশকিল হবে। খালি বারান্দায় বা ছাদে ঈশারায় কথা হতে পারে। আপনি কি পড়েন? না চাকরী করেন?

ইতি
গীতু

পরদিন ঠিক সেই মোড় ঘোরার মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। হাত বাড়িয়ে চিঠিটা দেওয়ার সময় মনে হলো রিক্সাওয়ালা দেখতে পেলো না তো! সারাদিন একটা উত্তেজনার মধ্যে কাটলো। এই প্রথম এমন চিঠি লিখলো ও। কি করে যে লিখে ফেললো!
দু তিনদিন পর আবার রিক্সায় চিঠি এসে পড়লো। এবার আরো সহজে তুলে নিলো গীতু।

গীতালি,
তুমি খুব সরল বাচ্চা মেয়ে। তুমি কি জানো প্রেমে পড়ার কতো জ্বালা? তোমার মন চঞ্চল হয়ে পড়বে। শুধু আমার কথা মনে পড়বে। পড়াশোনার ক্ষতি হলে মেনে নিতে হবে। তবে বুঝবো তুমি আমাকে ভালোবাস। চিঠিতে কি সব কথা হয়? চলো গঙ্গার ঘাটে দেখা করি!

ইতি
তোমার কেষ্ট

গীতু বারান্দা থেকে ঈশারায় হাত পা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো দেখা করা সম্ভব না। ও পড়াশোনায় ভালো। সত্যি এই কদিন পড়াশোনা হচ্ছে না একেবারে। মনটা চঞ্চল হয়ে পড়েছে। এই করতে করতে পুজো এসে গেলো। দেখা গেলো কেষ্টদের বাড়িতে দুর্গা পুজো হয়। কেষ্টর বাবা এসে নিমন্ত্রণ করে গেলেন। অষ্টমীর দিন ওদের বাড়িতে ভোগ খাওয়ার নিমন্ত্রণ। সেদিন সেজেগুজে শাড়ি পরে, চুল খুলে গীতু মায়ের সঙ্গে ওদের বাড়ি যাবার জন্য বেরলো। ওদের বাড়িতে শ্যামল একটা সুন্দর সাদা পাঞ্জাবী পাজামা পরে ওদের আপ্যায়ন করলো। তারপর প্রচন্ড ঢাক ঢোল অঞ্জলির ভিড়ে কয়েকবার চোখাচোখির বেশী কিছু হয়নি। হঠাৎ ওর মা এগিয়ে এসে বললেন “নমস্কার পরিচয় করিয়ে দিই। এই আমার বড় ছেলে আর বৌ আর এ আমার ছোট ছেলে। আর ঐ মেয়েটি, যে ঐ কোণে দাঁড়িয়ে ও আমার হবু ছোট বৌ। এরা আমার মেয়ে জামাই। মা কথা বলতে লাগলো। গীতশ্রীর কানে আর কিচ্ছু ঢুকছে না তখন একজনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পরও ওর সঙ্গে প্রেমের খেলা করছিলো ছেলেটা! এই প্রথম জগত চিনতে শিখলো গীতু । রাত্রে কেন যেন প্রচন্ড অপমানে চোখে জল এসে গেলো। একটা কাগজ নিয়ে শেষ চিঠি লিখলো – কোন সম্বোধন ছাড়াই।
“আপনি আর কখনো আমাকে বিরক্ত করবেন না। আমার পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। কোন চিঠি দেবেন না।

ইতি
গীতশ্রী

এরপরও কেষ্ট রিক্সার পিছন পিছন স্কুল অবধি এসেছিলো একদিন কিন্তু গীতশ্রী ফিরেও তাকায় নি।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত