| 2 মার্চ 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা কবিতা: তৃতীয় বিশ্ব । যশোধরা রায়চৌধুরী

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
 
 
 
 
অনাথ আহত পশু, এই বুঝি তোমার নিয়তি
কালো ছেলে হাত পাতে, বলে আজ দুদিন খাইনি
তুমিও অসহ রাগে ছিঁড়ে ফেল সমাজদর্পণ
কোথাও ত সব এক, মানুষের কাজল বরণ
কোথাও ত সব এক, হাসিমুখ, সেও চিরতরে
গাড়ির দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে নওলকিশোর
ভিক্ষা নয় , কাজ চাই, তার চাই নিরাপত্তা শুধু
রাতের শয়নে নষ্ট উপরওয়ালার লোভী হাতে
 
মর্দিত বালকদেরও কিছু বৃষ্টি কিছু রোদ দিও
ফালি ফালি ফ্লাইওভার উড়ে গেলে, নিচু দেশভূমি
 
 
 
 
বসন্তকুঞ্জের পারে ধওলা কুঁয়া , আরো দূরে দূরে
বাদামি জ্যাকেট পরা বালকেরা হাডুডু খেলেছে
রাতে ঘুম নেই আর সম্ভ্রান্ত হিটার পড়ে আছে
পাশে ফেলা তোয়ালেতে কার যেন মনোরোষ লেগে
উল্টে আছে ন্যাতাকানি, ধূসর কম্বলে ঘষে গিয়ে
বালিশের ভাঁজে ভাঁজে লেগে আছে বিষণ্ণ খাম্বাজ
 
অর্থহীন অর্থনীতি, টিভি খুলে বাক্যের বিন্যাস
দেখে দেখে অতিরিক্ত ক্লান্ত হলে স্মার্টফোনে গান
আরো বেশি ক্লান্ত হলে আজানুলম্বিত ডিটেক্টিভ
গল্প পড়ে চা খেয়ে কেটে যাবে ল্যাদখোর দিন
 
আজ এক শনিবার, কোন এক অন্য শনিবারে
সভ্যতার ক্রোড়ভূমি মাতৃভূমি মরুভূমিদেশে
তোমার সকাল ফুটবে, তুমি ফুটবে অনন্ত আকাশে
ওই খানে নীল নদ, ওই খানে হু হু করে হাওয়া।
 
 
 
 
তারপর একদিন তোমাদের সময় হয়েছে
তোমরা ত ভাল পার প্রিয়মিথ্যা বলে পাশ ফেরা
তারপর একদিন ছোট ছোট বোতলের জলে
এক ঢোঁক পিপাসার, মিটে গেলে ভুলে যেও তাকে
 
ওদিকে খরার দেশ। ওদিকে মরুর দেশ বটে
এক কূপ খননের বাজেটের ভেতরে বাজেটে
অন্য অনেকগুলি মৃত কূপ ডুবে গিয়েছিল
কালোঘাঘরার মেয়ে শুধু রুদালির মত কাঁদে
মাথায় কলসিখানি মাটি দিয়ে আর তৈরি নয়
কোথায় কে পটারির ক্লাস নেয়, কারা যেন আত্মহত্যা করে
সে কোন পটুয়া আর সে কোন মেধাবী কুমোরের
চাকা ঘোরে চাকা ঘোরে , বিষণ্ণ এবং একাকী
মাটির কলসি আর তৈয়ার হবে না সহজে
লাল নীল প্লাস্টিকের জালা ভরে জল নিয়ে ফেরে
পুরনো গল্পের মত ঘাঘরা চোলি ওড়নায় ঢাকা
একদল মেয়েবৌ… তাদের নিষিদ্ধ গল্প বলি…
 
 
 
জাহাজে ফেরার হব, মৃত এক সমুদ্রের পরে
এই নীল বাতায়ন, জলের ফোকর , খুব সাদা
রোদ্দুর ওখানে পড়ে, সেই রোদ ঝকঝক করে
সেই আলো মুখে পড়ে মেয়েদের, প্যালেস্তিনিয়
হয়ত এর ভাই বন্ধু হয়ত এর হৃদয়ের ভ্রাতা
কোমরে তাবিজ বাঁধা – উঁহু , না না বিস্ফোরক বল
কোমরের বোমা ফেটে বাহান্ন টুকরো হয়ে গেছে
ছড়িয়ে গিয়েছে গোটা অধিকৃত জমি মাঠ জুড়ে
 
ইস্রায়েল জানে তার অতিদ্রুত মিসাইলের আগে
কোন বালকের কোন শক্তি নেই। তবু তারা বাঁধে
কোমরে বিস্ফোরক। তবু তারা মরে যায় রোজ।
বোনেরা তাদের মুখে হিজাব পরেছে, মনে মনে
বিরুদ্ধ বাতাস ঠেলা কী দরাজ স্বাধীনতাকামী
চলে গেছে সরকারি প্রকল্পের অনুদান ঠেলে
মৃত সাগরের ঢেউয়ে, জাহাজে ফেরারি হতে চেয়ে
 
 
 
 
 
 
এ ভিখিরিপনা আমি আজকাল স্পষ্ট চিনে নিই
বুকের ভেতরে দগ্ধ ছোট ছোট খুপরিতে বসে
কোলাহল করে সেই হাভাতেরা, প্রতিদিন রতিরোমন্থন
বাহিরে শীতল হাওয়া, বাহিরে শীতের আয়োজন
হাত পায়ে খড়ি ওঠে, আদ্দিসের বিশুষ্ক বাতাসে
এইখানে অক্সিজেন কিছু কম… উচ্চতাবশত
কালো আলখাল্লা পরা বৃদ্ধ এক জটিল ভিখারি
এইখানে বড় বড় দর্পিত পায়ে হাঁটে চলে
নতুন বিদেশি দেখে তেড়ে যায়, হাত বাড়ায় রোজ
পায় দুটি মুদ্রা যদি, হাসিমুখে টোল খায় তার
 
দুচোখে বিষাদ আর অসীম সমুদ্রের নীল
মাথার ঝাঁকড়া চুলে যুগযুগান্তের মাখা ধুলো
অনন্ত সময় ধরে ঢালুপথে ওঠানামা করে
পায়ের চটিটি তার ছেঁড়া টায়ারের ফালি গড়া
 
এইখানে মৃদু এক গুঞ্জরন শুনেছি আমিও
আফ্রিকার সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন , ভারতীয় বলে
আমাদের ডাক পড়ে , উন্নয়ন ব্যাখ্যা করে আসি
উঁচু মহল্লায়, শীত কনফারেন্স রুমেও ঢুকেছে…
 
দূরে দূরে সোমালিয়া, গাড়ি যায় আর্মারড গাড়ি
বন্দুকবিহারী শ্যাম , বাঁকাচোখে আমাকেও মাপে
কেননা গায়ের রং কালো, আর দুচোখে বিস্ময়
তৃতীয় বিশ্বের হয়ে আমিও যে লজ্জা পাই বড়…
 
 
 
সাত সমুদ্রের সোনা জমা হল এ বন্দরে এসে
এইখানে যাবতীয় লুন্ঠিত সম্পদগুলি খালাস হয়েছে
এইখানে দালালের ঘোরাফেরা, প্রাচীন স্তাবক
হাত তুলে দাঁড়ায় আর রক্ষিদল মেপে থাবড়ে দেখে
 
এইখানে ছুঁড়ে ছুঁড়ে সুটকেস ফেলা হয় রেকে
সুটকেস গুটিগুটি বেল্টে চেপে প্লেনে চড়ে রোজ
এইখানে কালো কালো ছেলেরা কী মনোযোগ দিয়ে
ভুল করে ছাপ দিতে, এর ঘাড়ে ওর বাক্স চড়ে…
এই বন্দরের কাছে পাহাড়ের সারি আছে আর
আকাশ ছড়িয়ে আছে সাদা হয়ে আকাশে আকাশে
প্লেন আর বন্দরের মধ্যবর্তী টুকরো ফাঁকাটুকু
ফেরিবাসে, ব্যবসায়ী, ভারতীয়, মাড়োয়াড়ি প্রভু
শ্রেষ্ঠী আর চোরাচালানির মধ্যে আড়চোখে কথোপকথন
ফোন কানে উঠে আসে, দ্রুত আর নিবিষ্ট আলাপে
এইখানে রফা হয় পৃথিবীর পশরার দাম…
দরাদরি হয়ে গেলে ফোনখানি সুইচ অফ করে
আকাশ -না -দেখতে পাওয়া লোকজন প্লেনে বসে পড়ে
একমাত্র আমি দেখি নীল মাধবের এই দেশে
নীলচে পাহাড়… আমি পৃথিবীর অন্তিম কেরানি।
 
 
 
প্রভুর সকাশে এসে প্রতিজন মাথা হেঁট করে
এভাবেই প্রতিদিন মন্দিরে প্রবেশ করি, প্রিয়
এই গুহা, এ মন্দির যদিচ যাদুর কারাগার
এইখানে বন্দি ছিল সাধু এক, তেরোটি বছর
 
খোরবিরাপ, এই সেই ধূসর পাথরে গড়া মোহ
আরমেনিয়ার দেশে রূপকথা অবলীলে হাঁটে
রুটি ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেওয়া ছোট ফুটো দিয়ে সাধুটিকে
কল্পচোখে দেখতে পাই, অন্ধকার গুহাটিকে ঘিরে
গল্প জমে , অন্ধ সাধু তেরো বছরের দৃষ্টি দিয়ে
শতকে শতকে শুধু ঈশ্বরের মহিমাকীর্তনে
কাজে লাগে… বহু দিন ধর্ম শুধু প্রাণ নিয়ে গেল
এ ধর্মে ও ধর্মে যুদ্ধ… শুধু তার ইতিহাসখানি
ধূসর পাথর জুড়ে অনায়াসে বিস্তৃত রয়েছে…
 
 
 
নশ্বরতা তুমি বল, আমি বলি মহিমাকীর্তন
সুদূর সাগরে গিয়ে চিকচিকে বালিধুলো দেখি
গরিব সিরিয় বধূ, ছেলেটিকে লেলিয়ে দিয়েছে
মাটিতে প্যাকিং কেস পেতে তার উন্মন বসাটি
দেখে বড় মায়া হয়, জানি তার দেশ চলে গেছে
এই উচ্ছেদের পাশে নিজের কাতর মায়াহীন
অবয়ব বড় বেশি আহ্লাদি, ফালতু মনে হয়।
 
হাতে বড় রুটি তার… রুমালি রুটির মত বড়
ছেলেটির চক্ষু ভরা জল আর কালচে পিঁচুটি
কিছু দূরে তার দেশে বড় বড় বাড়ি ভেঙে চুরে
শুধুমাত্র কিছুখানি বালি আর ঘেঁষ রয়ে গেছে
অনেক বালক মরে মিশে গেছে সেই খন্ডহরে
এ বালক তবু জানি বেঁচে আছে, মায়ের সকাশে…
 
 
রুটি ছুঁড়ে দিয়ে যাই… অপরাধ বোধ হাল্কা করি…
তৃতীয় বিশ্বের কাছে উচ্ছেদ, শরণার্থী, মৃত্যুর মিছিল, সবই চেনা…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত