| 14 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

উৎসব সংখ্যা সিনেমা: কিয়ারোস্তামি ও জীবনানন্দের ধূসর জগত

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

আত্মহত্যার অভিসন্দর্ভ ও দুটি মৃত্যুর ব্যক্তিগত পাঠঃ কিয়ারোস্তামি ও জীবনানন্দের ধূসর জগত


ক্লান্তি, অবসাদ, মৃত্যু সমার্থক নয় জেনে

ঘুম থেকে উঠি রোজ।

দাঁত মেজে চা খেয়ে যে সকাল শুরু হয়

কিয়ারোস্তামি এগিয়ে এসে উঁকি দেন

বদীকে রেখে যান আমার ঘুমের পাশে।

মৃত্যুকে সমার্থক জেনে জড়িয়ে ধরি,

দূরে সাইরেন বেজে ওঠে, মানুষের পদধ্বনি শোনা যায়।

বদী আমার হাত ছেড়ে শূন্যে হারিয়ে যায়

অসম্পূর্ণপড়েথাকেআত্মহত্যারঅভিসন্ধর্ভ।

তবুও পৃথিবীর কারখানায় সমান্তরালে

মানুষ ডুবে যায়

হেমলক আর চেরির স্বাদে।

 

অদ্ভুত বিপন্নতায় আমরা ডুবে আছি সবাই। সেই বিপন্নতার মুঠি খুলে, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আমরা প্রতিদিন পাশবালিশ জড়িয়ে ঘুমে ডুবে থাকি হয়তো, তবুও কেউ কেউ সেই ঘুমের মধ্যে ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে দেন, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলেন,“এইতো এখানেই জীবন, এখানেই জীবনের প্রচুর সম্ভাবনা।“ আব্বাস কিয়ারোস্তামি এভাবেই জীবনের সমান্তরালে মৃত্যু অথবা মৃত্যুর সমান্তরালে জীবনের ছবি এঁকে যান। কিয়ারোস্তমির ‘টেস্ট অফ চেরি’র ( ১৯৯৭) মিঃ বদী আমাকে এভাবেই আচ্ছন্ন করে রাখেন। আরো একজন আছেন যিনি আমার সমস্ত চেতনাকে বিপন্ন বিস্ময় থেকে ছেঁকে তুলেছেন, তিনি জীবনানন্দ দাশ। শুরুতেই একটি স্বীকারোক্তি করে নেওয়া ভাল, আমার এ লেখাটি আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অফ চেরি’ আর জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’এর একটি সরল ব্যক্তিগত পাঠের প্রয়াস। মৃত্যু আর জীবনের মধ্যে যে একটি ধূসর আস্তরণ আছে সেটার পরতে পরতে আমাদের পদযাত্রার সংক্ষিপ্ত ভ্রমণকাহিনি আমার এ লেখা।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


একজোড়া পলকহীন চোখ কী যেন খুঁজে ফিরছে। খুঁজতে খুঁজতে সে চলেছে লোকালয় ছেড়ে, সমতল ছেড়ে পাহাড়িএবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে অসীম শূন্যতার দিকে। জীবনের বহমান স্রোতের ভেতর দিয়ে লোকটি চলে একা একা জীবনের বিপরীতে। ‘টেস্ট অফ চেরি’র মিঃ বদী এভাবেই ইরানের তেহরান শহরে খুঁজে ফিরছেন একজন মানুষ যে কিনা তার মৃত্যুকে নিশ্চিত করবে। বদী আত্মহত্যা করতে চায়, ঘুমের ওষুধ খেয়ে একটি মৃতপ্রায় চেরি গাছের গর্তে সে শুয়ে থাকবে, কেবল তার একটি লোক প্রয়োজন যে কিনা কয়েক মুঠো মাটি দিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করবে -ব্যাস এইটুকুই হল এ সিনেমার বিষয়।ইরানি নবতরঙ্গের অন্যতম নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি সিনেমায় গল্প বলতে পছন্দ করেননা বরং তিনি পর্দার আলো অন্ধকারের ভেতর দিয়ে কিছু সূক্ষ্ম অনুভূতি ছেড়ে যান, কিছু দার্শনিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন দর্শককে। সেই প্রশ্ন থেকেই আমাদের মনে আসে, কিয়ারোস্তামি কি সত্যিই আত্মহত্যার কথা বলতে চেয়েছেন,নাকি জীবনের? সিনেমার শেষ দৃশ্য আমাদের জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্বে ফেলে দেয় যেমনটা করেন জীবনানন্দের আট বছর আগের একদিনের যুবকটি। এক গাছা দড়ি হাতে সত্যিই কি সেদিন সে গিয়েছিল মৃত্যুর কাছে, নাকি আমাদেরকে সেই পথ ধরে নিয়ে যেতে চান আমাদের পিতামহীর কাছে, পিতামহীর মতো বুড়ো হবার বাসনার কাছে? প্রশ্ন থেকে যায় বা প্রশ্ন রেখে দিতে চান কিয়ারোস্তামি আর জীবনানন্দ।

সিনেমায় বদী আত্মহত্যা করতে চান কিন্তু কেন করতে চান সে উত্তর নেই। তবে সে উত্তর আছে সময়ের কাছে, ইতিহাসের কাছে। ইরানের ভয়াবহ ধর্মকেন্দ্রিক মৌলবাদী সমাজব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিপীড়ন আর সর্বব্যাপ্ত ইরান যুদ্ধের ভয়াবহতায় মৃত্যুপুরীর পরিণাম -এ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে সিনেমাটির সাবটেক্সটের মধ্যে। ‘আট বছর আগের একদিন’এ যুবকটি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়েছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্তিত্ব সংকটের বিপন্নতার বোধেজারিত হয়ে। একটি পরিপূর্ণ ঐহিক অস্তিত্বের নিরর্থক অনুবর্তনের ক্লান্তিতে, অসার অজ্ঞান বেদনার ভারে দীর্ণ মানুষটি খুঁজেছিল লাশকাটা ঘরের নির্লিপ্ত নিদ্রা। সিনেমায় বদীও কি তাই চেয়েছিল? সিনেমার শুরুতেই দেখি বদী লোকালয় ছেড়ে ধীরে ধীরে শূন্যতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। গাড়ির ভেতরে টাইট ফ্রেমের ভেতরে বদীকে দেখে আমাদেরও হাঁসফাঁস লাগে, বদীকে যেন এই জনজীবনের কোলাহল থেকে কিয়ারোস্তামি আরো একা, নিঃসঙ্গ করে দিতে চান। কালিঝুলি মাখা কতগুলো মুখ গাড়ির কাছে এসে ভিড় করে। তারা কাজ চায়, টিকে থাকতে চায়, জীবনের অপ্রতিরোধ্য দুঃসহ নৃশংসতারকাছেহার মানতে রাজি নয়। অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক বদীর জীবনে তো সে নৃশংসতা নেই! তবে কেন সে আত্মঘাতী হতে চলেছে? কিংবা কিছু দূরে এগিয়ে গেলে আমরা দেখতে পাই শিশুর হাসিমুখ, সে হাসিমুখও বদীর চোখের নিষ্পলক চাহনির পরিবর্তন এনে দিতে পারেনা। সে পাহাড়ি রুক্ষতার দিকে ধাবিত হয়। দর্শক হিসবে আমাদের মনে জাগে-

“নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ- নয় সবখানি;

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-

আরো এক বিপন্ন বিস্ময়

আমাদের রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে

ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;”

কী সেই বিপন্ন বিস্ময় যা বদীকে ক্লান্ত করে, ধাবিত করে মৃত্যুর দিকে?রুক্ষ প্রকৃতির ভেতর দিয়ে জীবনস্রোতের বিপরীত দিকে যাচ্ছে বদী আর খুঁজছে এমন একজনমানুষকে, যে তার আত্মহত্যাকে নিশ্চিত করতে পারে। কিয়ারোস্তামি এই পুরো সিনেমা জুড়ে আত্মহত্যার যে অভিসন্দর্ভটি আমাদের সামনে তুলে আনেন তাকে কয়েকটি পর্যায়ে আমরা ভাগ করে নিতে পারি। প্রথমত, তরুণ যুবক কুর্দি সৈন্য ও বদীর কথোপকথন, দ্বিতীয়ত আফগান সেমিনারি ও বদী, তৃতীয়ত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে চাকরিরত বাঘেরি ও বদীর আলাপ, সর্বশেষ সিনেমার ক্যামেরার দূরত্বকে ঘুচিয়ে সাবজেক্টিভ হয়ে ওঠার প্রয়াস, জীবনের কাছাকাছি থাকার প্রয়াস, নির্মাণ আর নির্মাণশৈলীর বাস্তবতাকে অতিক্রম করে চেরির সৌন্দর্য আস্বাদনেরপ্রয়াস।

টুকরো টুকরো বেশ কিছু প্রতীক, ইমেজের কোলাজ ব্যবহার করে কিয়ারোস্তামি ছবি তুলে যান পুরো সিনেমা জুড়ে। সিনেমার শুরুতেই একেবারে নীরবতা আর তার মধ্যে বদী বসে আছে টাইট ফ্রেমের মধ্যে- এই ইমেজ যেন বদীর বন্দীত্বকে সমর্থন করছে। বদী গাড়ি ছুটিয়ে চলছে জীবনের দিকে নয় মৃত্যুর দিকে। এ গাড়ি তার আত্মহননের সঙ্গী। লোকালয়ের বিপরীতে আছে ধূ ধূ বালিময় পাহাড়ি প্রান্তর, শিশুর হাসিমুখের বিপ্রতীপে বদীর মুখের নিস্পন্দ নিস্পৃহ মৃত্যুরেখা। এই শিশুরা একটি পরিত্যক্ত ভাঙা গাড়ি যার চলমানতা নেই। সেই গাড়িতে বসেও তারাজীবনকে আলিঙ্গন করতে চাইছে, তাদের মাঝে কোলাহল আছে, হাসি আছে আর আছে জীবনের চলমানতার বিপ্রতীপে বদীর চলমান গাড়ি যেন স্থবিরতার দিকেই তাকে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বদী নিস্তব্ধ, তার মধ্যে কোন শব্দ নেই, জীবনের কোলাহল নেই অথচ দৃশ্যের বাইরে কিয়ারোস্তামি কোলাহল জুড়ে দিয়েছেন। সে কোলাহল মৃত্যুর বিপ্রতীপে জীবনের কোলাহল। সিনেমার এক পর্যায়ে বদীর গাড়ির চাকা একটা গর্তে আটকে গেলে একদল শ্রমিক আশপাশ থেকে এগিয়ে এসে গাড়িটি তুলে দেয়। গাড়িতে ফ্রেমবন্দী বদীর মুখের বিপ্রতীপে কাট করে কিয়ারোস্তামি থুরথুরে এক বৃদ্ধের হাসিমুখে স্থাপন করে দেন আর সেই সঙ্গেসিনেমার পর্দা জুড়ে এপর্যন্তযে ধূসরতা ছিল তার বিপরীতে অনেকখানি রঙের বিচ্ছুরণ,অনেকখানি নীল আকাশ, অনেকটা সবুজ প্রান্তর দেখা যায়। জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার শূন্য করে দিয়েও এই বৃদ্ধের মুখে মৃত্যুর লেশমাত্র নেই অথচ বদী! বদীও কি যুবকের মতো – ‘একগাছা দড়ি হাতে গিয়েছিল একা একা;/ যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে’? কিন্তু গাড়ি থেকে ক্যামেরার চোখ ঘুরিয়ে সিনেমার প্রায় শেষের দিকে কিয়ারোস্তামি আমাদেরকে দোয়েলের, ফড়িঙের জীবনে উঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেন। হয়তো বদী সে প্রাণের সন্ধান পেতেও পারে কিন্তু নির্মাতা আমাদেরকে তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেননা কেননা জীবনের কতটুকু আর ব্যাখ্যা করা যায়! তার থেকে অনেক বেশি থেকে যায় ব্যাখ্যাতীত।

এখন আসা যাক কিয়ারোস্তামি আত্মহত্যার যে তিনটি অভিসন্দর্ভ নির্মাণ করেছেন সে আলোচনায়। প্রথমত, একটি তরুণ কুর্দি সৈনিকের কাছে বদী সাহায্য প্রার্থনা করে। তার সাথে সখ্যতা গড়তে চায়, তাকে ব্যারাকে পৌঁছে দেবে জানিয়ে গাড়িতে তোলে। এই প্রথম আমরা জানতে পারি বদী নিজেও সৈনিক ছিল। কুর্দিরা অনেক সাহসী হয় আর যুদ্ধে তো কত মানুষকে মারতে হয়, এসব কথা বলে বদী অবশেষে সেই চেরি গাছের গর্তে এসে পৌঁছায় আর যুবক কুর্দি সৈনিকটিকে জানায় তার কাজ হবে সকাল ৬টায় এসে কয়েকদলা মাটি ফেলে যাওয়া এই গর্তে। তরুণ সৈন্যটি ভয় পেয়ে বিশাল প্রান্তর ধরে তার ব্যারাকের দিকে পালায়। এই আলোচনায় একটি দিক উন্মোচিত হয়েছে- যুদ্ধের ভয়বহতা, যুদ্ধে কত মানুষের প্রাণনাশ হয় আর বিপরীতে বদী ইচ্ছামৃত্যুর আকাঙ্ক্ষায় ঘুরে ফিরছে। এ যেন ইরান যুদ্ধের ভয়বহতাকে কিয়ারোস্তামি পরিহাস করছেন। দ্বিতীয় অভিসন্দর্ভটি উন্মোচিত হয় আফগান যুবক এক সেমিনারির সাথে আলাপে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ যেন বদীর ইচ্ছামৃত্যুর গোলকধাঁধাঁর প্রতীক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ নীরবতা, টপ এঙ্গেল শটে কখনো পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ ধরে উঁচুতে আবার নীচুতে বদী ছুটে চলেছে। এই দৃশ্যকল্পের ভেতর দিয়ে কিয়ারোস্তামি বদীকে আরো নিঃসঙ্গ, আরো দোদুল্যমান করে তুলেছেন। আফগান সেমিনারি যুবকটির সাথে কথোপকথনের মূল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হয় কোরানের ব্যাখ্যা। আফগান যুবকটি দারিদ্র্যপীড়িত, তার বাবা মা অনেক কষ্টে তাকে আফগান থেকে ইরানে পাঠিয়েছেন কোরান শিক্ষার জন্য, সেই শিক্ষা নিয়ে সে বড় আলেম হয়ে বাবা মায়ের দুঃখ মোচন করবে। বদী তাকে সাহায্য করার জন্য অর্থের লোভ দেখায়। বদী জানায় একদিন তো সবাই মাটিতে মিশে যাবে আর এক্ষেত্রে সে শুধু তার মৃত লাশে মাটি ফেলবে- ব্যস এইটুকু কাজ। কিন্তু ছেলেটি জানায় আত্মহত্যা এবং হত্যা দুই মহাপাপ, কোরানে এমনটাই ব্যখ্যা আছে। বদী জানায়,“তুমিতো আর আমাকে হত্যা করছোনা। আমার জীবনের আর কোন অর্থ নেই, আমি আর কারো কাছেই জীবনের অর্থ নিয়ে দাঁড়াতে পারছিনা তাই মৃত্যুই আমার কাম্য।“ যুবক এবার স্পষ্ট আর দৃঢ় কণ্ঠে জানায়, “আমাদের বারোজন ইমাম নিষেধ করে গেছেন হত্যা করতে, হাদীসেও পরামর্শ নেই আর কোরানে এর নিষেধাজ্ঞা আছে।“কুর্দি ও আফগান দুই যুবক দারিদ্র্যপীড়িত আর বদী তাদের দুইলক্ষ ইরানি মুদ্রা দেওয়ার প্রস্তাব সত্ত্বেও তারা মানুষ হত্যায় সহায়তা করতে নারাজ। এই অভিসন্দর্ভে একদিকে আছে কোরানের ব্যাখ্যা, যা জীবনের অর্থহীনতার কোন হাল দিতে পারেনি বদীর কাছে। অন্যদিকে আছেপৃথিবীতে এত এত মৃত্যু, যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে জীবনের অনিশ্চয়তাবোধ। চূড়ান্ত বিপ্রতীপতা তৈরি হয় যখন আফগান যুবকটি বদীকে ডিমের সুঘ্রাণের কথা বলে খেয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ডিমের ঘ্রাণ এখানে জীবনের ঘ্রাণ, পৃথিবীর গন্ধ, বেঁচে থাকার চিহ্ন বহন করে। একদিকে জীবন আর একদিকে মৃত্যু। সিনেমার স্ক্রিন ভেদ করে সে ঘ্রাণ যেন আমাদের নাকে এসে লাগে। আমরা যেন আরেকটু পৃথিবীর গায়ে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম করে বসতে চাই কিন্তু বদী আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের দ্ব্যর্থবোধকতার কথা। এছাড়া ইরাক-ইরান-আফগানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভয়াবহতার পরিহাস যেন সাবটেক্সটে ফল্গুধারার মতো বহমান আছে এই সিনেমার ন্যারেটিভে।

তৃতীয় অভিসন্দর্ভে যাওয়ার আগে একটি বিষয় আলোচনা করা দরকার। সিনেমার শেষ পর্যন্ত আমরা জানিনা বদী মারা গেছেন কিনা তবে বদীর মৃত্যুর চূড়ান্ত দৃশ্যকল্প এঁকেছেন কয়েকটি প্রতীকী ইমেজের ভেতর দিয়ে। বিশাল বিস্তৃত পাহাড়ি ভূমিতে পাথর ভাঙার কাজ চলছে বিশাল বিশাল ক্রেনের সাহায্যে, বিকট ঘর্ঘর শব্দ তার। সে শব্দে ঢেকে যাচ্ছে জীবনের কোলাহল, ধুলোয় ডুবে যাচ্ছে বদীর অবয়ব। যেন বদী কবরের অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, মৃত্যুর স্বাদ যেন সে উপলব্ধি করে ফেলেছে। বদী নির্বিকার আর নিথর। সে নিস্তব্ধতাভেদ করে চলে যায় একটা জেট বিমান। বদীর ব্যাখ্যাতীত মুখাবয়ব আমাদেরকে শংকিত করে, উদ্বেলিত করে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


বদী এবার দেখা পায় ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে চাকরি করা এক বৃদ্ধের, নাম তার বাঘেরি। যার কাজ পশুপাখির পেটে খড় ঠেসে অবিকল জীবন্তপ্রায় প্রাণী তৈরি করা। বাঘেরি প্রথম জীবনে রাজনৈতিক কারণে জেল খেটেছেন আর তার পরেই এই কাজটা নিয়েছেন।জীবন আর মৃত্যুর মাঝে জীবন নিয়েই তার কাজ। এই পর্বে কিয়ারোস্তামি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে উন্মোচন করেন- তাহলো প্রকৃতি, প্রকৃতির সত্য, জীবনকে একটি বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপে দেখার সত্য। এই বৃদ্ধ বাঘেরিও একদিন দড়ি হাতে আত্মহত্যা করতে গাছের ডালে ঝুল দিয়েছিল প্রায় কিন্তু প্রকৃতি তার আত্মহত্যাকে অনুমোদন দেয়নি। মুলবেরি ফুলের সুগন্ধ তাকে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে, বাঘেরি জীবনে ফিরে এসেছে। সে মজা করে এও জানায়যে কিছু মুলবেরি সে তার স্ত্রীর জন্যও নিয়ে আসে। এখানে আমাদের মনে পড়ে যায় আদিম নারী-পুরুষের সেই প্রথম অভিযাত্রার কথা, মাইথোপিয়ার সংযোজনে জীবনের আরো কিছু প্রশ্ন রেখে যান কিয়ারোস্তামি। এই অভিসন্দর্ভ জুড়ে পর্দায় এই প্রথম আমরা প্রচুর রঙ, সবুজ প্রান্তর আর জীবনদায়িনী জলের দেখা পাই। বাঘেরি যেন ওরাকলের মতো বলে চলেছে। বদী এবার নিশ্চুপ, এবার সে পাল্টা কোন যুক্তি দিচ্ছেনা। ভয়েসওভারে বাঘেরির বয়ান আর বিস্তৃত প্রকৃতি যেন জীবনের পুরোটা জুড়ে ভর করেছে। বাঘেরির ছোট্ট একটা সংলাপ “একটু ঘুরে যাও, জায়গাটা সুন্দর” – যেন বলতে চাচ্ছে,“জীবনে একটু ঘুরে দাঁড়াও, দেখো জীবন কত সুন্দর, প্রকৃতি কত সুন্দর।“ প্রকৃতি যেন এখানে কথা বলে চলছে। প্রকৃতি থেকে জীবনীশক্তি নিয়েই বাঘেরি সংসার প্রকৃতিতে ফিরেছে। আত্মহত্যার যে বিভ্রম তার শুশ্রূষা প্রকৃতিই করেছে। আমাদের এখানে মনে পড়ে যায় প্রবল আত্মঘাতী এক যুবকের কথা, লাশকাটা ঘরে শুয়ে যে যুবক গভীর নিদ্রা যেতে চেয়েছিল। প্রকৃতির প্রবল জীবনোচ্ছলতার কলরোলের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর বিপরীতে অবস্থান করে প্রাকৃত জিজীবিষার জয় ঘোষণা করে। শেষকালে তাই সে উচ্চারণ করতে পারে, “হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?/ আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো-বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেবো/ কালীদহে বেনোজলে পার;/ আমরা দুজনে মিলে শূন্য ক’রে চ’লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।”

এইখানে এসে জীবনানন্দ আর কিয়ারোস্তামি মিলে মিশে যানতাদের ধূসর জগতে। সিনেমার শেষ দৃশ্যের আগের দৃশ্যে বদী শুয়ে আছে অন্ধকার গর্তে, দু একবার বিদ্যুৎ চমকে তার মুখটা অন্ধকার থেকে ভেসে উঠছে, কয়েকটি মৃতপ্রায় গাছের পাতা এসে তার মুখে পড়ছে। এরপর সব অন্ধকার। পর্দা জুড়ে থমথমে অন্ধকার। এই অন্ধকার আমাদের ছুড়ে দেয় জীবনের অনুল্লেখিত ব্যাখ্যাতীত এক উচ্চতায়।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


আর তার কিছুক্ষণ পরেই সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখতে পাই কিয়ারোস্তামি ক্যামেরা হাতে, এতক্ষণের আত্মহত্যা দ্বারা তাড়িত বদী সিগারেট হাতে এগিয়ে এসে কিয়ারোস্তামিকে সিগারেট দিচ্ছে। সবুজ ভেলভেটের ঘাসে বিস্তীর্ণপাহাড়ি প্রান্তর, একদল সৈনিক মার্চ করতে করতে এসে একটি ফুলে ভরা চেরি গাছের সামনে এসে কেউ দাঁড়াল, কেউ বসে পড়ল, তাদের হাতে ফুল,তারা ক্যামেরায় তাকিয়ে ফুল দোলাচ্ছে। ফুলে ফুলে ভরা চেরি গাছের সৌন্দর্য পুরো সিনেমায় একবারও দেখা যায়না, কেবল এইখানে এসে আমরা পুস্পশোভিত চেরি গাছের দেখা পাই। চেরির স্বাদ যেন সেই জীবন-অমৃত, যার সন্ধানে আমাদের সমস্ত জীবন কেটে যায়। পুরো সিনেমা জুড়ে দম আটকে যাওয়া রুদ্ধশ্বাস, বদীর নিস্পৃহ, নিষ্পলক মৃত্যু দ্বারা তাড়িত চাহনি এতক্ষন আমাদের শ্বাস রোধ করে রেখেছিল, সেসব ভেদ করে আমরাও যেন বলে উঠি–‘আমরা দুজন মিলে শূন্য করে চলে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।‘ পুরো সিনেমা জুড়ে অবজেক্টিভ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তা যেন এই শেষে সাবজেক্টিভ নোটে রূপান্তরিত হল। ইরানের মৃত্যুপুরী কিংবা সভ্যতার চরম নৃশংসতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এমন করে জীবনের গান গাইতে পারেন ধূসর জগতের দুই কবি কিয়ারোস্তামি আর জীবনানন্দ।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত