| 20 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প : ভাত । তুষ্টি ভট্টাচার্য 

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

  ‘ও বাবা! কত্ত বড় গঙ্গা গো এখানে! আমাদের গাঁ থেকে ট্রেনে করে শেওড়াফুলির নিস্তারিণী কালীবাড়ি দেখতে গিয়ে সেবার যখন আমরা গঙ্গায় চান করলুম, তখনও তো গঙ্গা অত বড় ছিলনি! এখন কি ওখানেও এমনই চওড়া হয়ে গেছে গঙ্গার পেট? এখানে তো ওপার দেখাই যাচ্চেনি গো!’

   কিশোর আকাশের বালক ভাঙা ভাঙা গলায় বিস্ময় চুঁইয়ে পড়ছে। সুবল ওকে এক হাত দিয়ে পিঠে একটা আদরের থাবড়া মারল। আর মিটি মিটি হাসতে হাসতে ছেলের বিস্ময় উপভোগ করতে লাগল। এই ফারাক্কার নতুন ব্রিজ তৈরির কাজে ঠিকাদারের সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে এসেছে এবার সুবল। গত দুবার এসেছিল এখানে পুরনো ব্রিজ রিপেয়ার করতে। এবারে অবশ্য নতুন ব্রিজ। পয়সাকড়িও আমদানি হবে বেশি। ব্যাটা সাথ্‌ দিলে তো ডবল রোজগার। তবে ছেলেটাকে সঙ্গে আনতে অনেক কাঠখড় পোয়াতে হয়েছিল ওর। একে তো আকাশ স্কুলে যেতে চায় না আজকাল, পড়াশুনোয় মন নেই। আদারে-বাদারে ঘুরে বেড়ায়। নেশাভাঙ করছে কিনা কে জানে! এই বয়সেই তো ছেলেরা নেশার পাল্লায় পড়ে। পনেরো বছর বয়স হলে কী হবে, ছেলেটার চেহারা বেশ বড়সর হয়ে গেছে। শক্ত সমর্থও। গ্রামের কয়েকটা ছেলে মিলে কুস্তির আখড়ায় যেত রোজ একসময়ে। সেই থেকেই এমন তাগড়াই হয়েছে ও। যাক, যাক, বাপের নজর লেগে যাবে! অকারণে ছেলেটার গায়ে থু থু করে দিল সুবল। আর তখনই মনে পড়ল ওর মায়ের কথা।

  সে বেটি তো কিছুতেই ছেলেকে কাছছাড়া করতে চাইছিল না। মা ন্যাওটা ছেলে আকাশ। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে, অনেক কান্নাকাটি হওয়ার পর অবশ্য রাজি হয়েছে ও। তবে শর্ত একটাই। পনেরো দিন বাদে ফিরতে হবে। তখন আকাশ যদি কাজে যেতে না চায়, না যাবে। যেতে চাইলে তো কথাই নেই। তারকেশ্বরের মলয়পুর গ্রাম থেকে ওরা ছাড়া আর একজন এসেছে এই ঠিকাদারের সঙ্গে। বাকি লোকেরা মুর্শিদাবাদের। মুসলমান ওরা। সে হোক গে! হিঁদু মোছলমান দিয়ে কি ধুয়ে জল খাবে সুবল? কাজ করবে পয়সা নেবে! এই বিশাল ব্রিজ তৈরি দেখতে দেখতে, কাজ করতে করতে আকাশের নেশা লেগে গেছে। নতুন জীবন পেয়ে সে টগবগ করে ফুটছে। রোজ দুবেলা ওরা নিজেদের ভাত, সবজি ফুটিয়ে নেয়। রাতে মুরগি রান্না করে সুবল। ওর রান্নার হাত আছে। ওদের গ্রামে যত ফিস্টি হত, সবখানে সুবলের ডাক পড়ত রান্নার জন্য। মোট পনেরো-বিশ জন হিঁদু একসঙ্গে রান্না করে খায় ওরা। রোজই ফিস্টির মেজাজ পায়। দুপুরে অবশ্য কাজের ফাঁকে কোনরকমে খেয়ে নেওয়া। রাতে রুটি, মাংস আর বোতল খুলে বসে ওরা। কেউ কেউ অবশ্য ছোঁয় না ওসব। আকাশও বাপের কাছে বসে থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে বোতলগুলো দেখে। ওর চোখ জ্বলজ্বল করে তখন, সুবল লক্ষ্য করেছে। মনে মনে ভাবে, এখনই আস্কারা দেব না ওকে এসবে। আরেকটু বড় হোক, ভালভাবে রোজগেরে হোক, সব শিখেপড়ে নিক আগে…তারপর তো যা আছে কপালে!

    সেদিন রাতে ফিস্টি জমছিল না ওদের। মোদিজি ভাষণ দিয়েছেন… কী নাকি এক রোগ এসেছে চারদিকে। সারা দেশ বন্ধ করে দেওয়া হবে শুনছে ওরা। বারবার হাত ধুতে আর নাকমুখ ঢেকে রাখতে বলেছেন। এই নিয়ে খুব আলোচনা চলছে ওদের। কেউ বলছে, ওসব বড়লোকদের কথা। আমাদের কিছু হবে না। কাজ না করলে খাব কী? আরেকদল বলছে, যদি ট্রেনবাস বন্ধ করে দেয়, তাহলে ঘরে ফিরব কী করে? মুর্শিদাবাদের লোকেরা কাজ করবে বলে এখানেই থেকে যাবে ঠিক করল, শেষ পর্যন্ত। ট্রেন বন্ধ হলেও ওরা পায়ে হেঁটে ফিরে যাবে এখান থেকে। কিছু লোক ফিরে গেল। সুবলও ভাবছিল ফিরে যাওয়াই ভালো। একে তো ছেলেকে নিয়ে এসেছে, ওর কিছু হলে, ওর মায়ের কাছে মুখ দেখানো যাবে না। কিন্তু আকাশ বেঁকে বসল। ওর নতুন রক্তের তেজ, নতুন রোজগারের স্বাদ পেয়ে বাঘের মতো ফুটছে। ও কিছুতেই যাবে না এখান থেকে। ‘ওই মিস্ত্রীরা যখন রয়েছে, আমরাও থাকব! কিচ্ছু হবে না। কদিন আর ট্রেন বন্ধ থাকবে?’ আকাশের কথা ফেলতে পারল না সুবল। থেকেই গেল।

  ঠিক তিনদিন বাদ থেকে বাকি লোকেদের প্রায় সবাই ফিরে যেতে লাগল। সুবল এবার ভয় পেয়ে গেছে। আকাশকে বলল, ‘আর দেরি করা ঠিক হবে না। চল, কাল ভোরের ট্রেনেই উঠে বসি’। ভোর ভোর স্টেশনে গিয়ে দেখে থিকথিক করছে ভিড়। ট্রেন এলো বটে, কিন্তু ওরা উঠতেই পারল না সেই ট্রেনে। ওদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ওরা। স্টেশনে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে গেল সুবলের। আকাশের কনুইয়ের ছাল উঠেছে। থুতু লাগাতে লাগাতে সুবল ভাবছিল, এবার তাহলে কী করব? যেন আকাশের দিকেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। একটু আগেই মাইকে বলল, আর নাকি কোন ট্রেন যাবে না। আজ থেকে ট্রেন বন্ধ থাকবে। আকাশ মর্ম বোঝেনি হয়ত ব্যাপারটার। বাপকে বলল, ‘চল হাঁটা দিই’। ‘কিন্তু কোনদিকে হাঁটব রে? রাস্তাই তো চিনি না’। আবার আকাশের বুদ্ধির প্রশংসা করল মনে মনে সুবল। ও বলল, ‘বাবা এই ট্রেনই তো আমাদের বাড়ি নিয়ে যেত। চল এই লাইন ধরেই হাঁটি। একদিন না একদিন ঠিক পৌঁছে যাব’।

   শুরু হল হাঁটা। স্টেশনের দোকানে রুটি, তরকারি খেয়ে নিয়েছিল পেট ভরে দুজনে। লাইন ধরে আরও দুচারজনকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছিল প্রথম প্রথম। বেলা গড়িয়ে সূর্য মাথার ওপরে উঠেছে যেই, আর কাউকে দেখা পাওয়া গেল না লাইনের ওপর। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে দুজনেরই। সঙ্গের বোতলের জল প্রায় শেষ। আকাশকে বারণ করেছে ওই জলে হাত দিতে। এদিকে ওর মুখটাও শুকিয়ে এসেছে, দেখে বুকের ভেতরটা টনটন করছে সুবলের। আহারে! কীই বা বয়স! কেন যে কাজে নিয়ে এলো ওকে! এমন বাপ সে যে তেষ্টার জলটুকুও দিতে পারছে না ছেলেকে! চোখে জল এলো আচমকা। গলা বুজে এসেছে…কোনরকমে শরীরটাকে টেনে টেনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ও। আকাশ ভাবছে, এই রাত্তিরটা পার করলেই ঠিক পৌঁছে যাব কোনো না কোনো জায়গায়। এখানে তো ধুধু ফাঁকা, ন্যাড়া ক্ষেত দেখা যাচ্ছে কিছু, আর টাঁড় এলাকা। কাল নিশ্চই বসতি পাব। রাত হয়ে গেছে অনেক। আর শরীর চলছে না। দুজনেই বসে পড়েছে লাইনের ওপর। একসময়ে পোকামাকড়ের কামড় খেতে খেতে শুয়েই পড়ল লাইনের ওপর ওরা দুজনে। আর ক্লান্তি এমন জিনিস যে, এরই মধ্যে হাল্কা ফুরফুরে হাওয়ায় চোখ বুজেও এলো। চারিদিকে শুনশান, কেউ কোথাও নেই, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার কান ফাটানো চিৎকার আর কয়েকটা জোনাকির ওদের শরীর লক্ষ্য করে ধেয়ে আসছে। ওরাও মনে হয় অবাক হয়ে গেছে এমন দুটো জানোয়ারকে এভাবে লাইনে শুয়ে থাকতে দেখে।

  পাখির ডাকে চোখ মেলল সুবল। ছেলেকেও ডেকে তুললো। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা। তবু তো যেতে হবে। নিদেনপক্ষে একটু জল না হলে আর চলবে না। আবার শুরু হল হাঁটা। একটু এগোতেই কিছু বাড়িঘরের আভাস পাওয়া গেল। আনন্দে দুজনের চোখ চকচক করছে তখন। কেউ কাউকে কিচ্ছু বলল না, হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল ওরা। একটু এগোতেই একটা টিউবওয়েল দেখতে পেল। লাইনের ধার দিয়ে নেমে দৌড়ে সেদিকে গেল ওরা। তারপর কতক্ষণ যে জল খেল, ঘাড়ে মুখে জল ঢালল, আকাশ তো কলের নিচে বসেই পড়ল চান করবে বলে। এরই মধ্যে বেলা বেড়েছে, লোকজনের ঘুম ভেঙেছে। জল আনতে এসে কয়েকজন ওদের দেখে রেরে করে তেড়ে এলো আচমকা। সুবল আর আকাশ ততক্ষণে ভয় পেয়ে গেছে বেশ। অনেকভাবে নিজেদের পরিস্থিতি ওদের বোঝাতে চেষ্টা করল। তবুও ওরা কিছুতেই বুঝল না। জেরার পর জেরায় অস্থির হয়ে সুবল কেঁদে ফেলল আচমকা। আকাশ বাবাকে দেখে নির্বাক…আর এই সুযোগে একদল লোক ওদের বেধড়ক মারতে শুরু করল। প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ার মুখে ওদের আবার লাইনে তুলে দিল লোকগুলো। কোনরকমে টলতে টলতে, ব্যথায় কালশিটে ঠোঁট, মুখ, গা-হাত-পা নেড়ে ওরা এটুকু বুঝল, এই লাইনই ওদের বাঁচাতে পারে এই মুহূর্তে। প্রাণের দায়ে ব্যথা, যন্ত্রণা উপেক্ষা করে ওরা ছুটতে শুরু করল আবার লাইন ধরে। বেশ কিছুটা ওইভাবে এসে দুজনেই পড়ে গেল লাইনের ওপর। অচেতন অবস্থায় পড়ে থেকে কিছুক্ষণ পরে ধাতস্থ হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল ওরা। আর এবারে পেয়ে গেল একটা স্টেশনের দেখা। আর স্টেশনে উঠেই জিআরপির সামনে পড়ল। ওদের ওই অবস্থায় দেখে লোকদুটো ওদের ঘরে এনে বসালো। মুড়ি আর চা খাওয়ালো। এরপর একটা কাপড়ে শুকনো চিঁড়ে বেঁধে দিল যত্ন করে। আর দুটো বড় বোতলে জলও এনে দিল। এইসময়ে ওদের যেন ঈশ্বরের রূপে পাঠিয়েছে কেউ। সুবল ভাবছিল, মিছেই পুলিশের নামে বদনাম করে লোকজন। ওদের কথামতো লাইন ধরে হাঁটতে থাকল আবারও। ওরা বলে দিয়েছিল, আর একদিন হাঁটলেই মুর্শিদাবাদ এসে যাবে। সেখান থেকে যেন ওরা কোনভাবে বাড়ি ফিরে যায়। বাংলায় না ঢুকলে ওদের আবারও মার খেতে হবে!

  একে তো হাঁটার পরিশ্রম, তায় প্রতি মুহূর্তে মার খাওয়ার ভয় ওদের তাড়া করতে করতে এবারে পৌঁছে দিল বাংলায়। একদিন চিঁড়ে ভিজিয়ে পেট ভর্তি করা গেছিল কোনমতে। আর সামান্য কিছু চিঁড়ে বেঁচে ছিল,যা গামছায় বেঁধে কোমরে জড়িয়ে রেখেছিল সুবল। কিন্ত গ্রামে ঢুকতেই মারের ভয়ে সিঁটিয়ে রইল সুবল। ছেলেকে বলল, ‘দেখ, এরাও যে আমাদের মারবে না, এমন ভরসা পাই কী করে? এখন এই ভোর ভোর বরং সামনের ইস্কুল বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। তারপর নাহয় হাওয়া বুঝে বের হব। এখনও আমার মাজায় বড্ড ব্যথা! এরপর যদি আবার মারে, কোমর ভেঙে শুয়ে পড়তে হবে’। আকাশও ওর ঠোঁটের কসে হাত দিয়ে দেখে নিল একবার। এখনও টনটন করছে ওখানটা। ফুলে আছে বিশ্রী ভাবে। এই চেহারায় এরা যদি আবার চোরছ্যাঁচড় ভেবে পেটায়, আর রক্ষে নেই! প্রথমে তো বাইরে থেকে ওই রোগ আনছে বলে সন্দেহ করবেই, তারপর আবার যদি চোর বদনাম দেয়……তারচেয়ে বাপের কথা শুনে চলাই ভালো। ওরা চুপচাপ স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। গেটে তালা ছিল ঠিকই, কিন্তু একটা ছোট পাল্লা অর্ধেক ফাঁক করা ছিল, সেখান দিয়েই দুজনে সেঁধিয়ে গেল। কিন্তু স্কুলের বারান্দায় গিয়ে দেখে, সব ঘরেই তালা বন্ধ। তাহলে উপায়? সামনেই তো দারোয়ানের ঘর। সে ব্যাটা দেখলেই তো রাষ্ট্র করে দেবে। হঠাতই এবার আকাশের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। বাবাকে বলল, ‘ওই দোতলার বারান্দায় উঠে পড়ি চল। ওখান থেকে ভেতরে যাওয়ার কোন উপায় নিশ্চই মিলবে। তুমি বরং এখানে দাঁড়াও আড়াল করে। আমি ওপরে চড়ে দেখে আসি। তারপর নাহয় তুমি উঠবে’।

   ছেলেটা দেখতে দেখতে জোয়ান মদ্দা হয়ে উঠছে। হাতপায়ের গড়ন দেখলে সুবলের নিজের যৌবনকালের কথা মনে পড়ে। ছেলেটা চোখের নিমেষে উঠে পড়েছে দোতলায়। ভেতরে গিয়ে দেখে এসে হাত নেড়ে সুবলকে ওপরে উঠে আসার ইঙ্গিত করল। বারান্দা থেকে ক্লাসঘরে যাওয়ার ছিটকিনি কোনরকমে খুলে ফেলেছিল এরই মধ্যে আকাশ। ঘর থেকে ভেতরের বারান্দায় গিয়েই চোখে পড়ল সার সার জলের কল। আর কিছুটা দূরেই বাথরুম/পায়খানা। দুজনেই আজ ভালো করে স্নান করল, বাকি চিঁড়ের কিছুটা ভিজিয়ে পেট ভরালো। তারপর ক্লাসঘরে ফ্যান চালিয়ে দুজনে মরার মতো ঘুমিয়ে পড়ল নিশ্চিন্তে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল সেদিন ওরা নিজেরাও জানে না বোধহয়। ক্লাসরুমের ঘড়িতে দেখল আটটা বাজে। বাইরে উঁকি দিয়ে দেখল, সামনের রাস্তা দিয়ে কিছু লোকজন যাওয়াআসা করছে। তাই ভয়ে আর লাইট জ্বালালো না। এভাবেই কেটে গেল পরের দিনটাও। এদিকে চিঁড়ে শেষ। আকাশ কয়েকবার বলল, ‘চল না বাবা! আমরা নেমে গিয়ে গাঁয়ের লোকেদের সঙ্গে কথা বলি। এরা তো বাঙালি, দেখে ভালো মানুষই মনে হচ্ছে’। কিন্তু সুবল কিছুতেই সাহস পাচ্ছিল না। তৃতীয় দিন খালি পেটে জল খেয়ে বমি করল আকাশ। সুবলেরও পেটে পাক দিচ্ছিল। দিশেহারা হয়ে চুপচাপ বসেছিল ওরা। আকাশ বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে ও। নির্ঘুম রাতে কয়েকবার ওকে ঠেলা দিল গায়ে সুবল। আলো ফুটলে জোর করে ওর চোখেমুখে জল দিল। গামছা ভিজিয়ে এনে ওর মুখে জল দিল চিপে চিপে। আকাশ যেন এবার একটু ধাতস্থ হয়েছে, উঠে বসল। সুবল বলল, ‘আর কটা দিন যাক বাপ আমার! আমি ঠিক তোকে খাবার জোগাড় করে দেব, এখান থেকে নিয়ে যাব তোকে। আমরা নিজেদের গাঁয়ে ফিরব। এখনই এলিয়ে পড়িস না মানিক আমার!’ বাপের কথায় আকাশের যেন একটু মনের জোর ফিরল। ফিকে হেসে বাপকে বলল, ‘বাড়ি গিয়ে আমরা একথালা ভাত খাব, না বাবা?’ বুক ফেটে জল এলো সুবলের, ওই অবস্থাতেই বলল, ‘হ্যাঁ বাপ!’ ভাতের গন্ধটা কেমন ভাবতে চেষ্টা করল সুবল। আর ঠিক সেই সময়েই কোথা থেকে যেন ভাত ফোটার গন্ধ ভেসে এলো। মনে হয় স্কুলের দারোয়ানের ঘর থেকে। আচমকা খিদেয় চনচন করে উঠল পেটের নাড়ি।

  পঞ্চমদিন কিন্তু আকাশকে আর সোজা করা গেল না। ওর নিস্তেজ দেহটা দেখে মনে হচ্ছিল, আর বুঝি ওকে বাঁচানো যাবে না! অনেকবার জলের ঝাপ্টা দিল ওর চোখেমুখে। এবার সত্যিই ভয় পেল সুবল। ছেলেটা মরে গেল?? আর সে কিনা মারের ভয়ে লুকিয়ে বসে আছে? এক দৌড়ে দোতলার বারান্দা থেকে নিচে ঝাঁপ দিল সুবল। ওর হাহাকার আর চিৎকার শুনে কয়েকজন সামনে আসায়, সুবল আরও চেঁচিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকল, ‘নে নে মেরে ফেল আমাকে। আমার ছেলেটা মরে যাচ্ছে আর আমি কিনা এমন বাপ যে মারের ভয়ে লুকিয়ে বসে আছি!’

   এরপরের ঘটনা খুব সাধারণ। গ্রামের লোকেরা সকলে মিলে ওই স্কুল বাড়িতেই আকাশ আর সুবলকে ভাত খাওয়াতে বসল। তার আগে অবশ্য ওদের নতুন লুংগি, প্যান্ট পরতে দিয়েছে। আসনপিঁড়ি হয়ে বসে আছে বাপব্যাটা। সামনে ভাতের থালায় গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, পাশে ডাল আর সবজি। সামান্য এই আয়োজন দেখে চোখ মুছল সুবল গামছায়। আকাশ ডুকরে কেঁদে উঠল ওই অবস্থায়। সামনের একজন তখন লকডাউনের নিয়ম মেনে আকাশের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘খেয়ে নে বাপ! সামনে ভাত নিয়ে চোখের জল ফেলতে নেই’। আকাশ আর সুবলকে এরপরের দিন নিজেদের গ্রামে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু চিঁড়ে, মুড়ি, জল আর সামান্য কিছু টাকা ওরাই চাঁদা তুলে দিয়েছিল। এই গ্রামের মানুষগুলোর চেষ্টায় আকাশ আর সুবল কিন্তু গ্রামে ফিরে গেছিল সুস্থ অবস্থাতেই। না, ওরা করোনা পজিটিভ ছিল না, এটাও ছিল ওদের সৌভাগ্য।

 (সত্যি ঘটনা অবলম্বনে এই গল্প। চরিত্র এবং স্থানের নাম কল্পিত।)

2 thoughts on “ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প : ভাত । তুষ্টি ভট্টাচার্য 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত