উৎসব সংখ্যা ভ্রমণ: মেঘ পাহাড়ের ডাকে । ক্ষমা মাহমুদ

Reading Time: 12 minutes

সেই কোন কৈশোরে ফেলুদা’র গোয়েন্দা গল্পগুলোতে ডুবে থাকা সময়ে ‘গ্যাংটকে গন্ডগোল’ পড়ে শহরটার একটা কাল্পনিক ছবি মনের মধ্যে গেথে গিয়েছিল আর মনের মধ্যে সেটা সুপ্ত এক বাসনা হয়ে ছিল যদি কোনদিন দেখা হয় গন্ডগোলের সেই শহরটার সাথে!

বড় হয়ে নানা জায়গা ঘোরাঘুরি শুরু করলেও গ্যাংটক যার রাজধানী সেই সিকিম যাওয়া নিয়ে একেবারে নিরাশাজনক তথ্যই পেয়েছি সব সময়।সিকিম নামটা যেন নিষিদ্ধ ফলের আবরনে মোড়ানো ছিল অনেকদিন ধরে, বিশেষ করে বাংলাদেশীদের জন্য, পরিচয় লুকিয়ে যেতে হতো। যতবার শিলিগুড়ি হয়ে নেপাল, দার্জিলিংসহ এদিক ওদিক গিয়েছি, সবসময়ই একে তাকে জিজ্ঞাসা করতাম, সিকিম কিভাবে যাওয়া যায়? উত্তর পেয়েছি, ‘একটু সমস্যা আছে তবে হয়ে যাবে ম্যানেজ,’ কিন্তু কেন জানি এই ম্যানেজ করাতে মন সায় দিতোনা, বাংলাদেশী হিসাবে নিয়ম কানুন মেনেই যেতে চাইতাম। শিলিগুড়ি থেকে হামেশাই টাটাসুমো জিপ গাড়িগুলোকে বাক্স-প্যাটরা মাথার উপর বেঁধে নিয়ে সিকিমের দিকে যেতে দেখে মনটা উদাস হয়ে যেতো। চলে যাওয়া গাড়িগুলোর পেছনে চোখ দুটো লেগে থাকতো যতক্ষণ দেখা যায়, যেন তাতেই সেই যাদুর শহরের দেখা পাওয়া যাবে!


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

তো সেই সিকিমে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা শেষ অব্দি করেই ফেললাম। হালে সেখানে যাওয়াটা সহজ হয়েছে বলেই বাংলাদেশী হিসাবে বুক ফুলিয়ে আমরাও সিকিম যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিলাম কোনরকম ম্যানেজের মধ্যে আর না গিয়ে। আমাদের সাত, আট জনের একটা ‘ঘোরা দল’ আছে, সময় সুযোগ একসাথে মিললেই আমরা ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে পড়ি। তো অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গ্যাংটকে আমরা যাচ্ছি সেটা চূড়ান্ত হলো। প্ল্যান অনুযায়ী কয়েকটা ট্রাভেল এজেন্সীর সাথে কথা বলে একটাকে চূড়ান্ত করলাম।সিকিম যেতে ট্রাভেল এজেন্সীর কোনই প্রয়োজন নেই সেটা আমরা জানতাম কিন্তু তবুও কোন ঝুঁকি নিতে চাইনি কারণ সিকিম একটা সংরক্ষিত রাজ্য এবং সেখানে ঢোকার আগে থেকে শুরু করে নানা জায়গায় নানা অনুমতির প্রয়োজন হয় যেগুলো সম্পর্কে আমাদের খুব পরিষ্কার ধারণা ছিলনা, মূলত সেই শংকাতেই ট্রাভেল এজেন্সীর দারস্থ হওয়া, যাতে সব ব্যবস্থা ওরা করে দেয় আর আমরা নিজেরা চিন্তা মুক্ত হয়ে ঘুরতে পারি। অবশেষে সব আয়োজন শেষে আমরা আটজনের এক নারীদল, এক শুভক্ষণে যাত্রা শুরু করিলাম গ্যাংটক অভিমুখে।

রাতের বেলা শ্যামলী পরিবহনের গাড়িতে উঠে ভোর নাগাদ রংপুরের বুড়ীমারি বর্ডারে পৌছে সেখানকার যাবতীয় কাজকর্ম শেষ করে দুপুর নাগাদ পৌছে গেলাম শিলিগুড়ির সেন্ট্রাল হোটেলে; যতবার শিলিগুড়ি আসি এখানেই ডেরা বাধি, এবারও আমাদের সিকিম যাওয়ার গাড়ি এখানে ঠিক করা আছে, লম্বা বাস যাত্রার ধকলটা একটু হাল্কা করতে এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গ্যাংটক যাওয়ার গাড়িতে উঠে যাবো। শিলিগুড়িতে পৌছতে আমাদের একটু দেরী হওয়ায় ড্রাইভাররা তাড়া দিলো যেন তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়ি কারণ রাত আটটার আগে রাংপো নামে একটা জায়গা থেকে আমাদের সিকিম ঢোকার অনুমতিপত্র নিতে না পারলে এদিন আর আমরা সিকিমে ঢুকতে পারবোনা।

শিলিগুড়ি থেকে ঘন্টা তিনেক লাগে রাংপো পৌছাতে এবং সেই রাস্তা যে কি অপরূপ, যে দেখেছে সেই শুধু জানে। সমতল শিলিগুড়ির রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আধাঘন্টা পরেই শুরু হয় ঘন সবুজ গাছপালাতে ঢাকা আঁকাবাঁকা অপূর্ব পাহাড়ী রাস্তা! সেই পথে কিছুদূর চলার পর রাস্তা দুইদিকে ভাগ হয়ে একদিক দিয়ে সিকিম আর একদিক গেলে দার্জিলিং। এই পথ দিয়ে চলতে চলতে সত্যিই মনে হয়, এই পথ যেন না শেষ হয়…

সিকিম অর্থ নতুন জায়গা বা নতুন বাড়ী। ভারতের উত্তরপূর্বে হিমালয়ের কোল জুড়ে অসাধারণ স্বর্গীয় সৌন্দর্য ছড়িয়ে বসে আছে এই রাজ্য যা বাংলাদেশ থেকে খুবই কাছে। ভৌগলিক দিক থেকে সিকিম খুবই গুরুত্বপূর্ণ, উত্তরে তিব্বত, পূর্বে ভূটান আর পশ্চিমে নেপাল চারপাশে ঘিরে রেখেছে এই রাজ্যেকে যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ বাস করে এবং ইংরেজী, নেপালি, ভূটিয়া, শেরপাসহ প্রচলিত আছে ১১টি ভাষা। লেপচারা এখানে প্রাচীনতম জাতি। ১৭০০ শতকে নামগিয়েল রাজবংশ এই অঞ্চল একটি রাজ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। সিকিম বরাবর স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল কিন্তু নানা রাজনৈতিক চড়াই উৎরাই পার হয়ে অবশেষে ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম প্রদেশ হিসেবে এর অন্তর্ভুক্তি ঘটে। ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে সিকিমের লোকসংখ্যা সবচেয়ে কম, মাত্র সাড়ে ছয় লক্ষ। বাংলাদেশ সিকিমের থেকে প্রায় বিশগুণ বড়। এর অর্থনীতি মূলত কৃষি ও পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। সিকিমকে বলা যেতে পারে সম্পূর্ণরূপে একটি অরগ্যানিক স্টেট, এখানে চাষাবাদে কোন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়না। সিকিম তার অসাধারণ ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজংঘার অবস্থান এখানেই।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


গ্যাংটকে ঢোকার আগে অনুমতির জন্যে রাংপোতে গাড়ি থামিয়ে সকলের পাসপোর্ট নিয়ে আমরা দুজন গেলাম ছোট একটা ঘর মত জায়গায় যেখানে এই অনুমতি দেয়ার কাজগুলো চলছিল। একদম শেষ মুহূর্তের একটু আগে পৌছেছিলাম বলে খুবই ভয়ে ছিলাম যে অনুমতি পাওয়া যাবে কিনা নাহলে সেদিনের মত আর গ্যাংটকে ঢোকা যাবেনা। কিন্তু একেবারেই ঝামেলাহীন ভাবে সব কাজ হয়ে গেল এবং যারা দায়িত্বে ছিল তারা খুবই আন্তরিকতা এবং দক্ষতার সাথে কাজগুলো স্বল্পতম সময়ের মধ্যে করে দিয়েছিলো। পারমিটের কাগজ হাতে পাওয়ার পর আমাদের যে কি শান্তি আর উল্লাস! উড়তে উড়তে গাড়ীতে এসে বসলাম, আর কোনো বাঁধা নেই! গ্যাংটকের পথে রাতের অন্ধকার চিরে চিরে পাহাড়ী পথ ধরে ছুটলো আমাদের গাড়ি। সেই মুহূর্তে আমাদের আনন্দের যে অনুভূতি ছিল তা কখনও ভুলবো না। একটা গোটা চাঁদও সারাটা পথ তার চিকচিকে রূপালি আলো ছড়াতে ছড়াতে আমাদের সাথে সাথে চলতে লাগলো। চাঁদের আলোয় আমরা কয়েকজন মেয়ে চলেছি সম্পূর্ণ অচেনা পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে বেয়ে। বেশ অনেকক্ষণ চলার পর আমরা গাড়ী থেকে আর না নেমে পারলাম না। এক জায়গায় গাড়ী থামিয়ে চাঁদের রূপালী আলোয় ভেসে যেতে যেতে রাতের পাহাড়ী প্রকৃতির মাঝে দাড়িয়ে গল্প করতে করতে আবার যেন অনুভব করলাম, পৃথিবীটা বড় সুন্দর, আর বেঁচে থাকা আরো সুন্দর! আরো বেশ কিছুটা পথ চলে অবশেষে গ্যাংটক, যার অর্থ পাহাড়চূড়া, সেই স্বপ্নের আলো ঝলমলে শহরে এসে আমরা প্রবেশ করলাম ।

সাধারণত গ্যাংটকে এসে সবাই এম জি মার্গের কাছাকাছি কোন হোটেলে ওঠে কারণ গাড়ী ভাড়া করা, যেকোন দিকে ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি নেওয়া, কেনাকাটার সুবিধা সবকিছু এখানেই, শহরের প্রাণকেন্দ্র যাকে বলে। আমাদের হোটেলটা এখান থেকে একটু দূরে, শহরের এক প্রান্তে। পরে যখন আরো নানাদিকে ঘুরেছি তখন বুঝতে পেরেছি,ভালো লোকেশনের হোটেলে থাকাটাও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেখান থেকে পুরো শহরের নৈসর্গিক দৃশ্য সুন্দর ভাবে দেখা যায় আর যা আনন্দের মাত্রাটাও বহূগুণ বাড়িয়ে দেয় নিঃসন্দেহে। আমাদের হোটেলটা সুন্দর ছিল কিন্তু রুমের সাথে বারান্দা ছিলনা। আমি একটু বারান্দা বিলাসী মানুষ। সারাদিন ঘুরে ফিরে এসে রাতের বেলায় ব্যালকনিতে দাড়িয়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা বা গরম কফি খেতে খেতে পাহাড়ী রাতের ঠান্ডা হাওয়ায় একটু আয়েশ করে শহরটা উপভোগই যদি না করতে পারি তাহলে আর কি হলো!

যাহোক পরের দিন সকাল শুরু হলো অপরূপ গ্যাংটক শহরের নানা জায়গায় ঘোরাঘুরির মধ্যে দিয়ে। শৈল শহরগুলো আমার কাছে মোটামুটি একই ধাঁচের মনে হয়; ব্রিটিশরা মোটামুটি সব একই ছাঁচে তৈরী করেছিলো শহর গুলো, সিমলা, দার্জিলিং, শিলং অন্তত যেগুলোতে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সাধারণত শহরগুলোর প্রাণকেন্দ্রে একটা বড় মল থাকে, প্রকৃতির কোলে কিন্তু নাগরিক চেহারার বিশাল খোলামেলা একটা প্রাণবন্ত পরিবেশ। কেনাকাটার ফাঁকে দুদন্ড বসে জিরিয়ে নেবার জন্যে দুপাশে বিস্তর জায়গা। জমজমাট দোকানপাট কিন্তু উপচানো ভিড় নেই কোথাও, আরাম করে ঘুরে ঘুরে দেখেশুনে মনমতো কেনাকাটা করা যায়, খাবার ঘরগুলো থেকে বাতাসে ভেসে আসা সুগন্ধ টেনে নিয়ে যেতে চায় সেদিকে, সিন্দাবাদের সাইরেনের মত কুহকী বাঁশি বাজিয়ে! সে প্রলোভন জয় করা মুশকিলই বটে!

গ্যাংটকের মহাত্মা গান্ধী বা সংক্ষেপে এমজি মার্গ সেরকমই বা বলা যায় আরো একটু পরিপাটি আর চিত্তহরণকারী একটা জায়গা। সুন্দর বাধাই করা রাস্তার দুপাশ ‘যেখানে কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়’, সেখানে বসে বসেই ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দেয়া যায় সেইসব দৃশ্য দেখে দেখে। গোটা মল জুড়ে বসার বেঞ্চগুলো যেন ডেকে ডেকে আমন্ত্রণ জানাতে থাকে,সেগুলোর পাশে মাটিতে কিংবা বিশাল সব দৃষ্টিনন্দন টবে ডালপালা মেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রঙবেরঙের ফুলগাছ। মানুষের আসা যাওয়া, কলকাকলী, বিকিকিনি সব মিলিয়ে জায়গাটাকে এমন মনোমুগ্ধকর করে রেখেছে যে একবার সেখানে বসে পড়লে আর উঠতে ইচ্ছা হয়না, মনে হয় বসে বসে দেখতেই থাকি। বিশ্বখ্যাত দার্জিলিং আর সিকিমের নিজস্ব নানারকমের নাম করা সব চায়ের দোকান আছে এখানে, অত্যন্ত সুদৃশ্য মোড়কে সেসব বিক্রী হয়, পরে যা বন্ধু, আত্মীয়দের জন্যে কিনেছিলাম। এইখানে ধূমপান আর আবর্জনা ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, সেই অকাজের জন্যে ১০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

পথ চলতে চলতে পাহাড়ী মানুষজনের সহজ, সরল, পায়ে হাঁটা জীবনের চেহারা দেখতে খুব ভালো লাগে, মুগ্ধ হতে হয়। অন্যান্য পাহাড়ী শহরের মত হলেও গ্যাংটকের কেমন যেন একটু অন্যরকম বৈশিষ্ট আছে, ভূটানের সাথে বরং অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। পুরো শহর ঢুড়েও একটা পলিথিন পাওয়া যাবেনা, খুব পরিচ্ছন্ন।

সকালে প্রথমেই আমরা একটা প্ল্যান্ট কনসারভেটরিতে গিয়ে নানারকমের ফুল আর অর্কিডের রাজ্যে কিছুক্ষণের জন্যে একেবারে হারিয়ে গেলাম। একটা বিশাল লাল ক্যামেলিয়া গাছের কথা কখনও ভুলবোনা, পুরো গাছভর্তি হয়ে লাল ফুলগুলো ফুঁটে ছিল!


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


ফুল যারা ভালোবাসে তারা সেখানে সুপার গ্লুর মত সেটে থাকবে অনেকক্ষণ ধরে কোনো সন্দেহ নেই,আমাদেরও তাই হয়েছিল, ছবি তুলে যেন মনই ভরছিল না! অসংখ্য নাম না জানা ফুলের বাহার এখানে। আমাদের সারথীদের বেঁধে দেওয়া সময়েরও বেশ খানিকটা পরে আমরা এখান থেকে বের হতে পেরেছি।

পরের গন্তব্য বনঝাকরি ওয়াটার ফলস পার্ক, শহরের এক প্রান্তে কলকল করে ধেয়ে আসা এক উচ্ছ্বল ঝর্ণাকে কেন্দ্র করে এখানে পর্যটকদের জন্য একটা বিনোদন কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছে যা পুরোটাই সৌরশক্তিতে চলে। তবে পুরো জায়গার প্রাকৃতিক পরিবেশটা বজায় রয়েছে বলে কৃত্রিম বলে মনে হয়না। ঝাকরি শব্দের অর্থ দৈবশক্তির অধিকারী বনদেবতা বা ওঝা যে ব্যথার উপশম করে অসুখ সারিয়ে তুলতে পারে। নেপালি মতে দুজন এমন দেবতা রয়েছে পুরুষ বনঝাকরি আর মহিলা বনঝাকরি। আমার এসব মিথ বা গল্প শুনতে সবসময়ই ভালো লাগে।

অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে পা দুটোকে যথেষ্ট পেরেশানিতে ফেলে উঠে গেলুম তাশি ভিউ পয়েন্টে। পুরো একটা চত্বর। গ্যাংটক শহরের অবশ্য দর্শনীয় আর একটা জায়গা। যদি মেঘমুক্ত আকাশ থাকে তাহলে কাঞ্চনজংঘা এখান থেকে খুব সুন্দর দেখা যায়, সেটাই এ জায়গার মূল আকর্ষণ। তবে ভাগ্য আমাদের প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলনা, আকাশের মুখ ভার ছিল তাই এখান থেকে কাঞ্চনজংঘা দর্শনে বঞ্চিত হলাম। তাসি ভিউ পয়েন্টের উঁচু জায়গা থেকে পাহাড়ী শহরটাকে যত দেখি ততই মনে মনে গুনগুনিয়ে উঠি ‘এলেম নতুন দেশে…..’

চত্বরে কিছু দোকানপাট বিভিন্ন জিনিসের পসরা বসিয়েছে। খুব শখ করে বেছে বেছে সিকিমের ঐতিহ্যবাহী কিছু মালা, মগ আর মুখোশ কিনে ফেললাম স্যুভেনির হিসাবে।ঘোরার পাশাপাশি যেখানে ঘুরছি সে জায়গার নিজস্ব জিনিসপাতি সংগ্রহ করতে আমি ভালোবাসি, যখন ফিরে যাই কাছের মানুষদের হাতে সেই জায়গার কোন স্মৃতি তুলে দিতে খুব ভালো লাগে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


বেশ খানিকটা সময় এখানে ঘুরে ফিরে আবার সেই গুচ্ছের সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতেই একেবারে রাস্তার ধারেই দেখি গরম গরম মমসহ (মম যে আমার কত প্রিয়!) আরো নানারকম সবজী পাকোড়া ভাজা চলছে। এতক্ষণ ধরে ঘোরাঘুরি করে সবাই বেশ ক্ষুধার্ত তাই একটুও দেরী না করে খাবারের আর্জি পেশ করে দিলাম। বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা, যারা বানিয়ে দিচ্ছেন তাদের সাথে খোশগল্প করতে করতে তাদের জীবনটা বুঝতে চেষ্টা করি যদিও এই কিঞ্চিত সময়ের মধ্যে কিইবা বোঝা যায় তবুও যেটুকু জানতে পারি জানা তো হয়, আর তার ফাঁকেই এসে যায় একটার পর একটা মুখরোচক পদ।কবজি ডুবিয়ে খেলাম, অসাধারণ সেই রাস্তার ধারের খাবারগুলোর স্বাদ, উমমমম! তাবোড় তাবোড় নাক উচুঁ রেঁস্তোরার খাওয়াও এর কাছে নস্যি মনে হলো! এখনও নাকে মুখে লেগে আছে, পাহাড়ী মানুষের হাতে তৈরী সেসব স্ট্রীট ফুডের জিভে জল আনা স্বাদ আর গন্ধ! একেবারে লা জওয়াব!

নানারকমের মৌসুমী ফলের চাটও ছিল সাথে। ফলগুলো ছোট ছোট টুকরো করে কেটে একটু বিটলবণ আর ওদের স্থানীয় একরকম মশলা ছিটিয়ে দিয়ে তৈরী করে দেয়। ঘুরে বেড়ানোর ফাকে এই ফলফলাদির লোভনীয় পরিবেশন খুবই রিফ্রেশিং! বিদেশে যেখানেই গেছি, রাস্তাঘাটে ঘোরার সময় এই ধরণের খাবার আমার ভীষণ প্রিয়, যে শহরে পর্যটকরা ঘুরবে সেখানে রাস্তাঘাটে খাবারের এমন সহজলভ্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশনা ভীষণই জরুরী মনে হয়, টুরিস্টরা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যেখানে সেখানে এগুলো খেয়ে ক্লান্তি দূর করে এনার্জি রিলোড করে আবার ঘুরতে থাকবে তবেই না ঘোরার আরাম! পয়সা আর সময় দুটোরই সাশ্রয়।

যাহোক তাশি ভিউ পয়েন্ট দেখা শেষ করে গ্যাংটকের ক্যাবল কার বা রোপওয়েতে উঠে পুরো শহরটা অনেক উপর থেকে আর একবার দেখে ফেললাম। রোপওয়েতে ওঠার অভিজ্ঞতা সবসময়ই অসাধারণ আমার কাছে, পাখি পাখি মনে হয় নিজেকে। হাল্কা বৃষ্টি হচ্ছিলো, বলে রাখি, বৃষ্টি এখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার, যখন তখন কাউকে কোন কিছু বলার ধার না ধেরে সে হাজির হয়। আবহাওয়া এখানে একেবারেই জীবনের মত অনিশ্চিত যার সাথে প্রতিনিয়ত তাল মিলিয়ে চলতে হয়। রোপওয়ে থেকে নামতে নামতে সন্ধ্যার ঘন্টা বাজলো। আমরাও সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত যদিও মুখে সেটা কেউই স্বীকার করিনা। গ্যাংটকে প্রথম দিন যথেষ্টই মনের রসদ যুগিয়েছে আমাদের, রাতের খাওয়া দাওয়া গল্পগুজব সেরে ঘুমাতে গেলাম পরের দিন যে সুন্দর জায়গাটা দেখতে যাবো সেটার কথা ভাবতে ভাবতে।

ঘুরতে বের হয়ে আমরা সময় নিয়ে খুব তাড়াহুড়ো করিনা, চেষ্টা করি ধীরে সুস্থে সময়টা তারিয়ে তারিয়ে অনুভব আর উপভোগ করে কাটাতে। তবে মাঝে মাঝে কোথাও পৌছাতে যেহেতু একটা সময়রে ব্যাপার থাকে সেটাও অবশ্যই মাথায় রাখতে হয় বৈকি! মূল উদ্দেশ্য তো নতুন একটা জায়গা দেখা আর তাকে নিজের চোখে, নিজের মত করে আবিষ্কার করা! নতুন কোন জায়গা দেখার উত্তেজনা যারা ঘুরতে পছন্দ করেন তাঁরাই শুধু জানেন।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


সিকিমের যেকোন জায়গায় যাওয়াটা মোটামুটি নিয়তি নির্ভর। আবহাওয়া নিয়ে সবসময় একটা উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়, কোন জায়গায় না পৌছানো পর্যন্ত বলা যাবেনা সেখানে পৌছেছি, যেকোন সময় যেকোন জায়গায় পাহাড় ধবসে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, সেকারণে ওরাও বলে কপাল ভালো থাকলে দেখতে পাবেন, একদম প্রকৃতির খেয়াল খুশীর উপর নির্ভরশীল জীবন। আমাদের গাড়ীর চালকেরাও এই বিষয়ে বারবারই আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে আবহাওয়া যেকোন সময় খারাপ হয়ে গিয়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে সুতরাং দেরী না করে তাড়াতাড়ি রওনা দেয়া উচিত। তো সারথীদের কথা মেনে ২য় দিন সকাল নটার মধ্যেই আমরা দলে বলে সাংগু লেকের উদ্দেশ্য রওনা হয়ে গেলাম।

সিকিম মূলত: ৪টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত; পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ। যে কোন দিকে যাওয়ার আগে আলাদা করে সেই দিকে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়। এ কারণে আমরা ছবি আর পাসপোর্টের কপি ড্রাইভারদের কাছে দিয়ে রাখি, রওনা দেয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাজ গুলো তারাই সেরে রাখে।

গ্যাংটক থেকে সাংগুর দূরত্ব ৪০ কিলো, গ্যাংটকের উচ্চতা সাড়ে ৫ হাজার ফিট হলেও সাংগুর উচ্চতা সাড়ে ১২ হাজার ফিট। সাংগু(এত সুন্দর একটা জায়গার নামটা আর একটু সুন্দর হলে কি হতো!) পৌছাতে সময় লাগে ২/৩ ঘন্টা, আমাদের লেগেছে তার থেকে বেশী কারণ আমরা রাস্তায় ইচ্ছামত থামি, চা টা খাই। আবহাওয়া কি যে ভালো! ডিসেম্বর মাস, তখনও ঠান্ডা অত বেশী না।অপূর্ব পাহাড়ী পথ পেরিয়ে চলেছি, শুধু পথ চলা আর পথ চলা। পুরোটা রাস্তা চারদিক যেন মেঘের রাজ্যে আর সেই মেঘের মধ্য দিয়ে মাইলের পর মাইল আমরা ছুটে চলছি তো চলছিই, পেজা তুলার মত মেঘ, মনে হয় হাত বাড়ালেই ছুয়ে ফেলবো তাদের, কি যে অপরূপ! স্বর্গ দূরে কোথাও সেটা কে বলেছে! রাস্তায় চলতে চলতে কখনও এমনভাবে বাঁক বদল হয় যে হঠাৎ মনে হয় এবার গাড়ীটা বুঝি সোজা মেঘের মধ্যে ঢুকেই গেল! খাড়া আর সংকীর্ণ রাস্তার সাথে প্রতি পদে পদেই মেঘেদের চলতে থাকে এমনই জমজমাট রোমান্স।

রাস্তার একপাশে পাথরের কর্কশতা আর এক পাশে ঘন সবুজ গাছপালার পরিখা আর উপরে মেঘ, একটু এদিক ওদিক হলেই মেঘের ফাঁক গলে ঐ পরিখাতে পপাত ধরণীতল! তবে সেই ভয় আমাদের একটুও ছিলনা কারণ আমাদের সারথী ছিল আঠারো বিশ বছরের অকুতোভয় এক পাহাড়ী যুবা। ভয়ংকর এই পাহাড়ী পথে এমন অসাধারণ একজন চালক আমাদের ঘোরার আনন্দ বহূগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল কোন সন্দেহ নেই। এমনিতে চুপচাপ কিন্তু কখনও কখনও আমাদের গল্প গুজবে যোগ দিয়ে, উইটি কথাবার্তার যোগান দিয়ে আমাদের দীর্ঘ চলার পথ ক্ষণে ক্ষণে খুবই আনন্দময় করে তুলেছিল সে, কখনও ভুলবোনা এই অসীম সাহসী বাচ্চা ছেলেটাকে।

পুরোটা রাস্তা ধরেই চলার পথে কিছুদূর পরপর জানা অজানা রকমারী ফুলের বাহার, নানা রং আর বর্ণের ফুলে ভর্তি পুরো সিকিম রাজ্য, চোখ ফেরানো যায়না, প্রকৃতি এখানকার মানুষকে ভালোবেসে অকাতরে বিলিয়েছে তার সৌন্দর্য।



কিছুদূর যেতে একটা ঝর্ণাও পেয়ে গেলাম পাহাড়ী রাস্তার মধ্যে, যত্র তত্র ঝর্ণারা এদেশে ‘আপনমনে পাগলপারা…’ অবিরাম ধেয়ে চলার শেষ নেই যেন, চপলা তরুণীর মত এখানে সেখানে ফাঁক ফোকর দিয়ে অন্তহীন বয়েই চলেছে। আমরা চলতে চলতে একটু থামি, পাহাড়ের ধারে বসে সেই কলকল শব্দের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে ছবি তুলি যদিও জানি যা দেখছি সেই সৌন্দর্য ছবিতে ফুটিয়ে তোলে কার সাধ্যি!

গ্যাংটক থেকে বের হয়ে বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে এসে প্রথম বরফ দেখতে পেলাম, রাস্তার একধারে পাহাড়ের গায়ে গায়ে বরফ জমে আছে, সবাই চেচিয়ে উঠলাম বরফ দেখার খুশীতে! ‘শুভ্র তুষার বড় সুন্দর বড় পবিত্র!’ তবে বরফের শুভ্র সৌন্দর্যের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে বিপদের হাতছানি! বেশী বরফ পড়লে রাস্তার অবস্থা খারাপ হয়ে ভ্রমণের ইতি হয়ে যেতে পারে আমাদের। তাপমাত্রা ঋতুভেদে মাইনাস পাঁচ থেকে পঁচিশের মধ্যে ওঠানামা করে কোথাও কোথাও, আর সুউচচ পর্বত শিখরে সেটা মাইনাস চল্লিশে নেমে যায়। সিকিম সংরক্ষিত এলাকা তাই চলতে চলতে হরহামেশা‌ই সেনাবাহিনীর গাড়ি ও শক্ত সমর্থ জওয়ানদের দেখতে পাওয়া যায়, বরফে ঢাকা রাস্তাঘাট মেরামতসহ নানা কাজ নিয়ে তারা ব্যস্ত।

অনেক নীচে থেকে পেচিয়ে পেচিয়ে আমরা উপরে উঠছিই, গন্তব্য সাংগু লেক। লেকের কাছাকাছি আসতেই দম বন্ধ হবার যোগাড় পুরো জায়গাটার অবর্ণনীয় ঐশ্বরিক সৌন্দর্যে। দুপুর একটার মধ্যে আমরা পৌছে গেছি সাংগু লেক। গাড়ী থেকে নামতেই হিমশীতল বাতাস আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। চারদিকে পর্যটক আছে ভালোই তবে ‌ভীড়ভাট্টা বেশী নয়। সার দিয়ে অনেকগুলো ইয়াক দাড়িয়ে আছে, খুব ঠান্ডা প্রাণী, গরুর মত মায়াময় চোখে তাকিয়ে থাকে। কেউ চাইলেই গাঁটের পয়সা খরচ করে ইয়াকের পিঠে উঠে গোটা এলাকাটা ঘুরে আসতে পারে তবে আমরা আর সে পথ মাড়ালাম না বরং পায়ে হেঁটেই লেকের আশপাশ ঘুরতে শুরু করি।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


বেশী শীতের সময় সাংগু লেক একদম বরফ হয়ে থাকে, আমরা খুব সুন্দর সময়ে এসেছি, প্রচন্ড ঠান্ডা আছে কিন্তু লেকের পান্না রং সবুজ পানি একদম টলটল করছে, চারপাশ হাল্কা কুয়াশাতে ঢাকা, পুরো জায়গাটা যেন এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের আকর। জীবনে বহূবার প্রকৃতির এই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের কাছে নতজানু হয়েছি! প্রকৃতির চেয়ে সুন্দর পৃথিবীতে কিছু নেই আমার কাছে।

লেকের চারপাশটা বেশ সময় নিয়ে ঘুরে ফিরে ক্যাবল কারে করে উপরে উঠে গেলাম! সাংগু রোপওয়েটি এশিয়ার উচ্চতম। মাত্র দশ মিনিটে সাড়ে বারো হাজার ফিট সাংগু থেকে রোপওয়েতে করে আরো দুই হাজার ফিট মানে সাড়ে চৌদ্দ হাজার ফিট উপরে উঠে এসে প্রচন্ড ঠান্ডা যে জায়গায় পৌঁছলাম শেষ বিকেলের আলোয় সেই জায়গা চাক্ষুষ করা মানে কল্পনাতীত এক সৌন্দর্যের সাক্ষী হওয়া। উপরে উঠতে উঠতে নীচের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি এতক্ষণ কিভাবে সাপের মত একে বেকে নীচের রাস্তাগুলো পার হয়ে উপরে উঠে এসেছি। এখান থেকে নীচের সব রাস্তাঘাট, পাহাড় পর্বত খেলনার মত ছোট ছোট দেখাচ্ছে, টুরিস্ট ভর্তি গাড়ীগুলো ছোট বাচ্চাদের খেলনা গাড়ীর মত বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে এতক্ষণ আমরা যেভাবে এসেছি। অপূর্ব প্যানোরামিক দৃশ্য!


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


উপরে প্রচন্ড ঠান্ডায় আমাদের জমে যাওয়ার মত অবস্থা। একটা জায়গায় রেডিমেড কফির আয়োজন রয়েছে, আমরা হাতে কফি নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি রূপালি শুভ্র সৌন্দর্য দেখি ধ্যানস্থ হয়ে। সময়টা দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি কিন্তু মনে হচ্ছে ভোরের অপার্থিব আলো ছড়িয়ে আছে আকাশজুড়ে, আসলে সময়ের হিসেব এখানে হারিয়ে গেছে, চোখ ফেরানোর ক্ষমতা নেই, নড়ার ক্ষমতা তো নেইই। ৮,৫৩৪ মিটার উঁচু ভারতের সর্বোচ্চ আর পৃথিবীর মধ্যে ৩য় সর্বোচ্চ এই পর্বতচূড়ার মোহনীয় রূপে ডুবে গিয়ে, ঠান্ডায় জমে যেতে যেতেও ছবি তুলতে ভুললাম না! কে জানে জীবনে আর কখনও এমন সময় আসবে কিনা। চারপাশের অপার্থিব সৌন্দর্যে বিমোহিত আমরা কয়েকজন নারী সেই সৌন্দর্য উপভোগ করি তারিয়ে তারিয়ে! প্রায় এক টা সময় পার হয়ে গেছে এখানে, রোপওয়ের লোকজনের তাড়াতে আমাদের স্বর্গচুত্যি ঘটলো!

ক্যাবলকারে করে নীচে নেমে একটা সুন্দর ক্যাফেটারিয়া দেখে সবার মুখ হাসি হাসি হয়ে গেল। চোখ বুজে আগে মম আর গরম কফি অর্ডার করলাম। মম এখানে আমাদের দেশের পুরির মত সবজায়গাতে সহজলভ্য। সেই ফাকে আবার ঘুরে ফিরে সবকিছু দেখা। কিছুক্ষণর মধ্যেই ধোঁয়া ওঠা মম আর তার সাথে ওদের মুখরোচক ঝাল সস আর গরম কফি চলে এলো। আহারপর্ব শেষে গাড়ীতে উঠে বসি, দিন থাকতে থাকতে ভয়ংকর সুন্দর রাস্তাগুলো পার হয়ে যেতে হবে। মন এখান থেকে ফিরতে চায়না, তবু ফিরতে হয়। সেই পেচিয়ে পেচিয়ে আবার নামতে লাগলাম নীচে… চোখে না দেখলে এই সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করা বৃথা চেষ্টা ! গ্যাংটক শহরে ফিরতে ফিরতে রাত, অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে হোটেলে ফিরেছি সেদিন। পরের দিন যাওয়ার কথা জগত বিখ্যাত এক জায়গায়।

উত্তর সিকিমের নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে যে কত কিছু শুনেছি আর দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। এই কদিন সিকিমের নানা জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি আর মনে মনে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করেছি কখন যাবো ইয়ুমথাং ভ্যালির বরফ ঢাকা পাহাড় দেখতে! কিন্তু বিধিবাম। সকালে আমাদের চালক জানালো আবহাওয়া খারাপ থাকায় উত্তর সিকিম যাওয়ার অনুমতি ঐদিন দেয়া হচ্ছেনা। অবিশ্বাস্য এই খবরে অনেকক্ষণ অসম্ভব ভারাক্রান্ত মনে বসে থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দিনটা হোটেলে বসে নষ্ট না করে আমরা বরং অন্যকোন দিকে ঘোরার পরিকল্পনা করি কারণ সিকিমের যেদিকেই যাই না কেন প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে আছ। বের হয়ে পড়লাম যেদিক দুচোখ যায় সেদিক, বলা যায় অনির্দ্দিষ্ট গন্তব্যে এবং সত্যিই সেই পরিকল্পনাহীন ভ্রমণ ছিল তুলনাহীন!

যেখানেই যাচ্ছি, থামছি, নামছি, ভালোলাগছে। খুবই আরামদায়ক আবহাওয়া, প্রাণ জুড়ানো ঠান্ডা কিন্তু আকাশে ঝকঝকে রোদ, মাঝে মাঝে মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে পাহাড়গুলো। পাহাড়েরা গায়ে গা গা লাগিয়ে হেলান দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে আয়েশ করে, গায়ে সবুজ চাদর বিছিয়ে। পথ বেয়ে চলতে চলতে কোথাও কোথাও দেখা হয়ে যায় সিকিমের প্রধান নদী তিস্তার সাথে, সিকিমে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পেরিয়ে নীলফামারী জেলা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে সে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


সিকিমের নানান পথ জুড়ে সাথে সাথে সংগী হয়ে চলে তিস্তা নদী। কত কবি, সাহিত্যিক তিস্তা নদীর মনকাড়া রূপ আর সৌন্দর্যের কত বর্ণনাই না দিয়েছেন! পথের বাকে বাকে সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়া বৃথা চেষ্টা। পুরো রাস্তার এই সৌন্দর্য কিছুটা হলেও ভুলিয়ে দিলো উত্তর সিকিম দেখতে না পাওয়ার দুঃখ।

সিকিম পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ। সিকিমের পাহাড়ে পর্বতে ঘুরতে ঘুরতে বারবার মনে হয়েছে প্রকৃতি কত বিশাল আর আমরা তুচ্ছ মানুষ তার কাছে কতই না ক্ষুদ্র! যতটুকুই ঘুরতে পেরেছি তাতে মন ভরেছে পুরোটাই তবে যে জায়গার কথা অনেক শুনেছি সেই উত্তর সিকিম ঘুরতে না পারার প্রচন্ড আফসোস নিয়ে ফিরেছি। তবে আশা আছে আবার যাবো সেই মনকাড়া পার্বত্য ভূমিতে, ইয়ুমথাং ভ্যালির স্বর্গীয় সৌন্দর্যে স্নান সেরে ফিরবো নিশ্চয়ই, সে গল্প তবে আরেকদিন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>