| 20 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

উৎসব সংখ্যা ভ্রমণ: ইতিহাসের সেই আনন্দনগরী মান্ডু । তড়িৎ সাধু

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট
আমরা কয়েক দিনের জন্যে ইন্দোর এসেছি আত্মীয় বাড়ি। মুখ্য উদ্দেশ্য বেড়ানো।আজকের গন্তব্য মান্ডবগড় বা মান্ডু। মধ্যপ্রদেশের একটি লুপ্তপ্রায় সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক নগরী। ব্রেকফাস্ট সেরে সারাদিনের খাবার দাবার এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে সকাল ন’টা নাগাদ আত্মীয়টীর সুদৃশ্য সিডান গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম । ইন্দোর থেকে মান্ডুর দূরত্ব প্রায় ১০০ কিমি । ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি আকাশ একটু মেঘলাই । গাড়ি যতক্ষণ সমতলের মধ্য দিয়ে ছুটছিল ততক্ষণ আবহাওয়া মোটামুটি ভালোই ছিল। গাড়ির ভিতরের বাতানুকূল পরিবেশে, সয়াবিন আর ভুট্টার সবুজ ক্ষেতের বুক চিরে গাড়ি ছুটছিল চার গলির মসৃণ হাইওয়ে উপর দিয়ে। দেখতে দেখতে মান্ডুর অনুচ্চ পাহাড়ি পথ এসে পড়লো। মান্ডু পৌঁছানোর আগে স্থানটির কিছু পরিচিতি আবশ্যক মনে করে মোবাইল ফোনে গুগুল চালু করে বাকি সকলের অবগতির জন্য পড়তে শুরু করলাম। “নর্মদার উত্তরে মালওয়া মালভূমি অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ ফুট উঁচুতে বিন্ধ্যপর্বতমালার বর্ধিত অংশে এর অবস্থান। দশম ও একাদশ শতকে হিন্দু রাজবংশ পারমারদের রাজত্বকালে দুর্গ রাজধানী রূপে গড়ে উঠেছিল এই পাহাড়ি জনপদ। ত্রয়োদশ শতকের শেষ ভাগে স্থানটি মালওয়া সুলতানের অধীনে আসে। প্রমোদপ্রিয় সুলতানদের অর্থের প্রাচুর্য ছিল ,গড়ে উঠেছিল নানান ধরনের বিশাল বিশাল আট্টালিকা, জল সংরক্ষণের ও সরবরাহের ব্যাবস্থাদি। মান্ডু হয়ে ওঠে সাদিয়াবাদ বা আনান্দ নগরী। 
 
ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়কালে মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মান্ডু অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী নগরী রূপে গড়ে উঠেছিল। বাঁকের মুখে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে আমার আত্মীয়টির সম্ভবত ধৈর্য চ্যুতি ঘটলো, বলে উঠলেন আরে মান্ডুর আসল গল্পই তো শুরু হোল না এখনো। বাজ বাহাদুর, রূপমতীর কথা ছাড়া মান্ডুর দিনই শুরু হয় না।পাহাড়ি উতরাই আঁকাবাঁকা পথ, আর পথের সঙ্গী দুপাশের গাছপালা লতা, গুল্ম, বৃক্ষ মিলিয়ে নিজেদের মত করে বেড়ে ওঠা জঙ্গল। উপরি এলো ঘন কুয়াশা আর ঝিপঝিপে বৃষ্টি। বহুদিন দার্জিলিঙে থাকার সুবাদে এই রকমের আবহাওয়ার সঙ্গে পরিচিত। আমার আত্মীয়টি গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলে উঠলেন ‘আহা হা চমৎকার’। বিস্মিত হলাম। দার্জিলিঙে থাকা কালীন সকালে উঠে এমন আবহাওয়া দেখলে মেজাজ খিঁচড়ে যেত । ওনার মুখেই শুনলাম বছরের এই সময়টায় মাঝে মাঝে এই রকম আবহাওয়া থাকে। আর এখানে এই পরিবেশের আস্বাদ গ্রহণ করার জন্যই এই সময় পর্যটকদের ভিড় জমে। যস্মিন দেশে যদাচার ।
 
ঘন কুয়াশার ভিতর দিয়ে ফগ লাইট জ্বালিয়ে গাড়ী উঠছে, ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি সুরু হল । কয়েক মুহূর্ত পরেই আমরা মান্ডু এসে পড়লাম । ছাতা মাথায় গাইড এসে হাজির, দর দস্তুর করা গেলো না বিশেষ কারন দ্বিতীয় কোন গাইড কে ধারে কাছে দেখা গেলো না। ব্যাপারটা বোঝা গেলো। সম্ভবত নিজেদের মধ্যে এটাই আলিখিত চুক্তি। গাইড কে গাড়িতে তুলে নিয়ে আমাদের মান্ডু দর্শন শুরু হোল। আমার আত্মীয়টির কথার গুরুত্ব বুঝতে পারলাম। গাইড প্রথমেই আমাদের নিয়ে এল রানি রূপমতী মহল। গাড়ি থেকে নেমে ঘন কুয়াশায় ঢাকা মহলের সামনে দাঁড়াতেই গাইডের কথা শুরু হয়ে গেলো। ইতিহাস আর জনশ্রুতির সংমিশ্রণে গাঁথা চিত্তাকর্ষক কাহিনী।
 
রূপমতী মহলের সেই ছাদ যেখান থেকে নর্মদা দর্শন করতেন রূপমতী
 
মহলে ঢুকতেই আসামান্যা সুন্দরী রূপমতী আর তার প্রেমিক রাজা বাজবাহাদুর আমাদের আছন্ন করে ফেলল। হাল্কা গোলাপী পাথরে তৈরি রূপমতীর মহল। এর অসাধারণ গঠনশৈলী ও স্থাপত্য কৌশল আমাদের মুগ্ধ করলো। গাইড বলে চলেছে, ‘ধরমপুর গ্রামের এক রাজপুত জামিদারের কন্যা রূপমতী, অসামান্যা সুন্দরী, মা নর্মদার একনিষ্ঠ ভক্ত। মা নর্মদাকে দর্শন না করে অন্নজল গ্রহণ করেন না। ধরমপুর গ্রামের নাগেশ্বর মন্দিরে একদিন রূপমতী যখন সঙ্গীত চর্চায় মগ্ন তখন রাজা বাজ বাহাদুর শিকার করতে করতে গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অপূর্ব সেই কণ্ঠস্বর অনুসরণ করতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল রূপমতীর সঙ্গে। শুধু কণ্ঠই নয় রাজা মুগ্ধ হলেন তাঁর রূপেও। রূপমতীর বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং রূপমতীকে রানির আসনে বসাতে নিয়ে এলেন মান্ডু। ঠাঁই হোল এই মহলে। আদতে সৈন্য বাহিনীর আবাসস্থাল ও পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত এই ভবন হয়ে উঠল রূপমতী মহল। রূপমতীর মান্ডু আসবার শর্ত আনুসারে তাঁর প্রাসাদ শিখর থেকে নর্মদা দর্শনের ব্যাবস্থাও হোল। স্নানের জন্য তৈরি হোল রেওয়া কুণ্ড, যার জলে স্নান করলে নর্মদা স্নানের পুণ্য হয়। বহু গুণের অধিকারিণী রানী রূপমতীর আরও একটি গুণ তাঁর কবিতা। পার্সি ভাষায় লেখা তাঁর রচিত এই কবিতাগুলি পরবর্তীকালে ইংরাজি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ‘শুনতে শুনতে হারিয়ে গিয়েছিলাম ধরম পুরের সেই প্রাণোচ্ছল গ্রাম্য বালিকার রাণী হয়ে ওঠার গল্পে। প্রায় অন্ধকার অতি সঙ্কীর্ণ খিলানের খাড়া সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে বাস্তবে ফিরলাম। এসে পড়লাম দ্বিতল বিশিষ্ট রুপমতী মহলের ছাদে,স্নান শেষে যেখান থেকে রাান নর্মদা দর্শন করে জলগ্রহণ করতেন। ঘন কুয়াশায় ঢাকা নর্মদা উপত্যকার, কিছুই দৃষ্টিগোচর হোল না। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে ছাদের আবছা আলোয় কিছুক্ষণ পদচারনা করতে করতে ফিরে গেলাম বহুযুগ আগের সেই সময়কালে। আবার কথা শুরু হোল ‘রানি মর্যাদা পেলেও বাজ বাহাদুরের সঙ্গে রূপমতীর বিয়ে হয়নি কোনোদিন। বাজ বাহাদুর রূপমতীর সঙ্গীত সাধনা আর প্রেম কাহিনী তখন মান্ডুর আকাশে বাতাসে। তাঁর সুমধুর সঙ্গীতের আকর্ষণে সঙ্গীতজ্ঞ তানসেন স্বয়ং এসেছিলেন এই মান্ডুতে। তবে বাজ বাহাদুর রূপমতীর সুখ সময়ের স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র তিন বৎসর। সঙ্গীতজ্ঞা বিদুষী রূপমতীর সৌন্দর্যের সৌরভ দিল্লীর মসনদে পৌঁছুলে সম্রাট আকবরের নির্দেশে সেনাপতি আধম খান মান্ডু আক্রমণ করেন। শিল্প ও সুন্দরের উপাসক বাজ বাহাদুরের দুর্বল সৈন্যদল সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারল না। রাজা পরাজিত হয়ে পলিয়ে বাঁচলেন আর রূপমতী সন্মান বাঁচাতে বিষ পান করে আত্মহত্যা করলেন। আবশ্য বাজ বাহাদুরও বাঁচেন নি বেশিদিন। স্থানীয় অঙ্গ রাজাদের সহায়তায় বাজ বাহাদুর মান্ডু পুনর্দখল করলেও কিছুদিনের মধ্যেই আকবরের সেনাপতি আবদুল্লা খানের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। বাজ বাহাদুর রূপমতী কে নিয়ে গল্পগাথা আজও ছড়িয়ে আছে এখানকার স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে। সারংপুর সাজাপুরে কালিসিন্ধ নদীর তীরে বাজ বাহাদুর মকবারাতে পাশাপাশি কবরে শায়িত রয়েছে বাজ বাহাদুর ও রূপমতী। গাইডের কথা শুনতে শুনতে রূপমতীর মহল থেকে বেরিয়ে এলাম। পরের গন্তব্য যাওয়ার জন্য গাড়ীতে ওঠার আগে রাস্তার ধারের অস্থায়ী দোকানে নানান ধরনের স্থানীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে বাওয়াব ফল বিক্রি হতে দেখলাম। মনে পড়ল মান্ডু ঢুকবার সময় রাস্তার ধারে ফল সমেত একটা বড় বাওয়াব গাছ চোখে পড়েছিল । একটা ফল কিনে নিজের সংগ্রহে রাখলাম। এরা এটাকে ইমলি বলে স্বাদ তেঁতুলের মতোই।
 
গাড়ি সামান্য পথ ঘুরে বাজ বাহাদুরের প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াল। অট্টালিকাটি রূপমতীর মহলের তুলনায় কম আভিজাত্য পূর্ণ বলেই মনে হোল। প্রবেশপথের বাম দিকে লাগানো ফলক থেকে জানা যায় যে রেওয়া কুন্ডর পূর্ব দিকে অবস্থিত এই অট্টালিকাটি সুলতান নাসিরুদ্দিন কর্তৃক ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয়েছিল।প্রাসাদের কেন্দ্রস্থলে চতুষ্কোণ জলাধারকে বেষ্টন করে রয়েছে প্রশস্ত চত্বর। অট্টালিকার একদিকে খিলান পরিবৃত রূপমতী ও বাজ বাহাদুরের সঙ্গীত চর্চার স্থান, যে স্থান থেকে উৎসারিত সুর তরঙ্গ প্রস্তরময় স্তম্ভ এবং খিলানের খাঁজে ধাক্কা খেয়ে বর্ধিত হয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ বিদগ্ধ শ্রোতাদের কানে পৌঁছে যেত। স্মৃতি বিজড়িত সেই স্থানে বসে দু লাইন গাইবার ইচ্ছে সম্বরণ করতে পারলাম না। বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে রেকর্ড করা অংশটুকু শুনে গাইডের কথার যথার্থতা উপলব্ধি করেছিলাম। বাজ বাহাদুরের রাজত্বকাল মাত্র ছয় বৎসর কিন্তু তাদের সংগীত আনুরাগ ও প্রেম যে কালোত্তীর্ণ গাইডের কথায় তারই আভাস পেলাম। ঝির ঝিরে বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া শুরু হোল,বাজ বাহাদুর রূপমতীর ক্ষণস্থায়ী অপূর্ণ প্রেম দীর্ঘশ্বাস রূপে আমার কাছে ধরা দিল। রবীন্দ্রনাথের মেঘদূত কবিতার শেষ ক’টী ছত্র আওড়াতে আওড়াতে ছাতা মাথায় বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম।
 
পরের গন্তব্য জামি মসজিদ। রাস্তার দু পাশে মুখোমুখি দুটি সৌধ এক দিকে জামি মাসজিদ ও হুসেং শাহ্‌র সমাধি অপরদিকে আশরাফী মহল ও টাওয়ার অফ ভিক্টরি বা বিজয় স্তম্ভ। জামি মসজিদের বিশাল প্রবেশপথ দিয়ে ভিতরে ঢোকার পরে প্রশস্থ চত্বর, এবং সারি সারি আগনিত স্তম্ভ সমন্বিত বিশাল আলিন্দ পরিবৃত মসজিদ আভ্যন্তর। গাইডের গল্প অনুসারে এটি আদতে বিচারসভার জন্য তৈরি হয়েছিল পরবর্তীকালে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। মসজিদ কে পাশে রেখে ভিতরে প্রবেশ করি, শ্বেত পাথরের তৈরি হুসাং শাহ্‌র বিশাল সমাধি মন্দির। জনশ্রুতি অনুসারে হুসাং শাহ্‌ নিজের ও পরিবারের কবর দেওয়ার জন্য যদিও এটি নির্মাণ করেছিলেন কিন্তু এর ভিতরে কাউকে কবর দেওয়া হয় নি। সত্যতা যাচাই করার কোন আগ্রহ অনুভব করি নি। জামি মসজিদের প্রস্তর ফলক থেকে জানতে পারলাম হুসাং শাহ্‌র আমলে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে মোহম্মদ খিলজির সময়কালে ১৪৪০ খ্রি শেষ হয় এবং তাজমহলের স্থপতি উস্তাদ হামিদ ১৬৫৯ খ্রি এই পবিত্র স্থানটি দর্শন করেন। রাস্তার অপর পাড়ে আশরাফই মহলের সুউচ্চ সিঁড়ি উঠে গেছে। আশরাফই মহল নির্মিত হয়েছিল মাদ্রাসা রূপে হুসেং শাহ্‌র সময়কালে। মহম্মদ খিলজি এর উত্তর পশ্চিম অংশে একটি সাত তলা উঁচু বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। সিঁড়ির মাথায় প্রবেশ পথের শেষ প্রান্তে রয়েছে শ্বেত পাথরের গম্বুজ।এর মাথার অংশ ভেঙে গেছে,আর মহলটিও সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বিজয়স্তম্ভেরও অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ এখন আর বিশেষ কিছু নাই। গাইড কে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গাড়ি ছাড়ল। জমাট কুয়াশা একটু হাল্কা হোল বুঝি, সামনে রাস্তার বাঁ দিক ঘেঁষে একটা মস্ত পেট মোটা বাওয়াব গাছের কাছে, গাড়ি থামল। আমরা ইকো পয়েন্টে এসে গেছি। দুরে দেখা যাচ্ছে দাই কা মহল অর্থাৎ রাজবাড়ির আঁতুড় ঘর। রাজবাড়ির নতুন অতিথি ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র বিনা তারে শুধু মাত্র প্রতিধ্বনির মাধ্যমে কি ভাবে মান্ডুর কোন নির্দিষ্ট স্থানে খবর পাঠানো হতো তার মহড়া হোল ইকো পয়েন্ট থেকে। একই ভাবে শত্রু আক্রমণ বা অবস্থানের কথাও সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া যেত এই ইকো পয়েন্ট থেকেই।
 
এবার গন্তব্য জাহাজ মহল ও তৎসংলগ্ন প্রাসাদ সমষ্টি। কিছু দুরে গাড়ি পার্ক করে রয়্যাল এনক্লেভের গেট।এই ঘেরাটোপের মধ্যে জাহাজ মহল ছাড়াও রয়েছে হিন্দোলা মহল, তাভেলি মহল, চম্পা বাউলি ইত্যাদি ।খিলজি সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি এই প্রাসাদোপম অট্টালিকাগুলি তৎকালীন স্থাপত্য শৈলীর অপূর্ব নিদর্শন। মনে হোল প্রকৃতই আনন্দনগরী পৌঁছুলাম। সুলতান গিয়াসুদ্দিন খিলজির সময় নির্মিত হয়েছিল জাহাজ মহল। এর সামনে ও পিছনে বড় বড় দুটি কৃত্রিম জলাশয়, কাপুর তালাও ও মুঞ্জ তালাও। সরোবরে প্রাসাদের প্রতিফলন ভাসমান জাহাজের রূপ নেয় । কমলা রঙের পাথরে তৈরি দ্বিতল এই প্রাসাদটি আবশ্য দ্রষ্টব্যের তালিকায় পড়ে। দ্বিতল প্রাসাদটির উপরের তলে জল সরবরাহের ব্যাবস্থাটি বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৬০০ নারীর হারেম ছিল এই প্রাসাদে। লম্বা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গিয়ে ঘুরে ভিতরের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে পূর্ব দিকের প্রবেশ পথ দিয়ে বাইরে এলাম। জাহাজ মহলের ঠিক উলটো দিকে, অর্থাৎ গেট দিয়ে ঢুকে ডান হাতে পড়বে তাভেলি মহল। এটির নিচের তলে ঘোড়ার আস্তাবল এবং উপরিতলে রক্ষীদের বাসস্থান ছিল। বর্তমানে মিউজিয়াম রয়েছে এখানে। বৃষ্টি সম্পূর্ণ থেমে গিয়েছে, কুয়াশার আস্তরণ অন্তর্হিত আমরা পায়ে পায়ে এসে পড়লাম জাহাজ মহলের পশ্চিমে হিন্দোলা মহলে। এটিও গিয়াসুদ্দিন খিলজির সময়ে তৈরি হয়েছিল । ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পার্শ্ব প্রাচীরগুলির জন্য এটিকে দোলনার মতো দেখতে, সেই কারনেই হিন্দোলা মহল। এটির উপর ছাত নির্মিত হয় নি। এটি কনফারেন্স হল রূপে ব্যবহৃত হতো। হিন্দোলা মহলের পশ্চিম দিকে রয়েছে আরও কিছু প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। আছে জল সরবরাহের জন্য চম্পা বাউলি, স্নানের জায়গা হামাম। চম্পা বাউলি কূপের জলে সুগন্ধি মেশানো হতো এবং সেই জল স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো। ছিল গরম ও ঠাণ্ডা জল সরবরাহের ব্যবস্থা। না দেখলে বোঝানো যাবে না প্রাসাদের অভ্যন্তরে জল
 
জাহাজ মহল
 
সরবরাহের ব্যবস্থাটি কতখানি মুন্সিয়ানার দাবী রাখে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম, মুঞ্জ তালাউ এর কিনারা বরাবর। এখান থেকে জাহাজ মহলটির পিছন দিকটি পুরোপুরি দেখা যায়। স্থানটি হারেমের নারীদের বাসস্থান রূপে চিহ্নিত ছিল। দীঘির জলের উপর দিয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাসে প্রখর গ্রীষ্মেও ঘরগুলিকে ঠাণ্ডা রাখত।গাইড তার গল্প শেষ করে বিদায় নিলো, রেশ রয়ে গেল আমাদের মনের ভিতর । পড়ন্ত বিকালে আনন্দনগরীর প্রস্তরময় সৌধগুলি যেন এক নিমেষে জীবন্ত হয়ে উঠলো, হারেমের রহস্যময় আধো অন্ধকার পরিবেশ ছেড়ে বাইরে বের হয়ে এলাম। কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছে হচ্ছিল সেই স্থপতিদের যারা বহুযুগ আগে পাথরের উপর পাথর বসিয়ে বসিয়ে নির্মাণ করেছিল আরামদায়ক এই সৌধগুলি। কালের স্রোতে অধিকাংশই এখন ধ্বংস প্রাপ্ত, পাথরে কান পাতলে হয়ত শোনা যাবে আনন্দ নগরীর সেই উচ্ছল যৌবনময় অধ্যায়ের কাহিনী। তবুও মান্ডুর ইতিহাসের ওঠাপড়া সব কিছু ছাপিয়ে আজও বার বার ফিরে আসে বাজ বাহাদুর রূপমতীর গল্পগাথা।
 
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত