Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Putul khēlār rājanīti nāsarina khandakāra

নারী: পুতুল খেলার রাজনীতি | নাসরিন খন্দকার

Reading Time: 25 minutes

১. শুরুর কথা আমার ছোটবেলার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে পুতুল খেলা। শুধু আমি কেন, পুতুলখেলা মধ্যবিত্ত প্রায় সকল মেয়েরই শৈশবের অপরিহার্য অংশ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত পুতুলের বিয়ে আর সংসার সাজানোর প্রয়োজনে। তবে এই খেলা কিন্তু সীমিত ছিল মেয়ে বন্ধুদের মধ্যেই। ছেলে বন্ধুদের অবজ্ঞা কে পাত্তা না দিয়েই তখন আমরা খেলতাম। বিয়ে, সংসার সাজানো ইত্যাদি মেয়েলি জগতের বিশিষ্ট গুলো পুতুলখেলার মধ্য দিয়ে দারুন মাধু্ুু্র্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হত। মেয়ে পুতুলের প্রধান কাজ ছিল রান্না বান্না করা, ছোট বাচ্চা পুতুলের যত্ন নেয়া, খাওয়ানো, গোসল করনা ইত্যাদি। পুতুল খেলায় আছন্ন হয়ে মনে হত বিয়ে হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় ও আনন্দময় ঘটনা। মায়ের বানান জামার উচ্ছিষ্ট কাপড় থেকে বানান হতো পুতুল। আঙ্গুলের সমান এই পুতুলের চুল তৈরি হতো কালো সুতো আর হাত তৈরি হতো কাঠিতে বা সুতো পেঁচিয়ে। জুতার বা শাড়ির প্যাকেট কেটে তৈরি হতো ঘর, আসবাব। নারীপুরুষের পার্থক্য তৈরি করা হতো চুলের দীর্ঘ আর পোশাক দিয়ে। গায়ের রঙ নিয়ে তেমন কোন মাথা ব্যাথা ছিল না, হাল্কা রঙের হলেই হতো, যাতে করে চোখ মুখ আকা যায়। আমার খেলার সঙ্গীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো, কে কত ভাল পুতুল বানাতে পারে তা নিয়ে। পুতুলগুলোর ভিন্নতা এর স্রষ্টার দক্ষতার আর সৃজনশীলতা প্রকাশ করা হতো। কিন্তু মজার বিষয়ে হল, আমার নানির বানানো চমৎকার পুতুল আমাকে এবং আমার বান্ধবীদের অভিভুত করলেও অত বড় পুতুলের সঙ্গী সাথি, আসবাব, ইত্যাদি তৈরির ঝক্কির কারণে কখনও তা পুতুলখেলায় অংশ পায়নি। তবে এ বাদেও কিনতে পাওয়া যেত কলসি মাথায় কাঠের নারী পুতুল, যার হাত পা দৃশ্যমান ছিল না। একই রকমের ঝাক্কি ছিল তাকে নিয়ে খেলতেও। বড় হয়ে উঠতে উঠতে আরও নানা রকমের পুতুল দেখার বা তা নিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা হয়। তবে সবার প্রথম যখন প্রায় এক হাত লম্বা, চোখ পিট পিট বিদেশি পুতুল দেখি এক বন্ধুর হাতে, ঈর্ষা আর বিস্ময়ে অভিভুত হয়ে গিয়েছিলাম। সেটি ছিল প্রথম পুতুলের রূপে হাতে পাওয়া চেনা স্বদেশী মানুষের বাইরের অচেনা শ্বেতাঙ্গ মানুষের প্রতিনিধি। কিন্তু আজ যখন ছোটবেলায় স্মৃতির দিকে তাকাই, তখন কেন যেন মধুর স্মৃতিকাতরতায় মন ভরে যায় না। বরং প্রশ্ন আসে, কেন এই ধরনের খেলা মেয়ে শিশুদের মধ্যে এতো জনপ্রিয় ? এটি কি একভাবে খেলাচ্ছলে মেয়েলিপনা শিখিয়ে দেয়ার পন্থা ? নারীর যে গৃহী ভূমিকা ( যেমন বাচ্চা পালা, রান্না বান্না করা ইত্যাদি), তাকে স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক এবং সর্বজনীন বিষয়ে হিসেবে মেয়ে শিশুদেরকে ছিনিয়ে দেওয়ার মোক্ষম হাতিয়ার কি এই পুতুলখেলা ? এর মাধ্যমে একভাবে কি নারী জীবনের ভবিতব্য হিসেবে বিয়ে ও মাতৃত্বের মতো সামাজিক নির্মাণকে স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক করে তোলা হচ্ছে না ? এই খেলাগুলোতে কেন ছেলে শিশুরে অংশ নিত না ? কেনই বা অবজ্ঞা করত ? এর কারণ কি এই যে, একদম শৈশব থেকেই তারা তাদের চারপাশের মতাদর্শ থেকে জেনে নিয়েছে পুতুলখেলার মেয়েলি জগত পুরুষালি জগতের তুলনায় হেয় ? তারা কি একভাবে তখনই পরিবার থেকে, চারপাশের মানুষ থেকে বুঝে নিতে শুরু করেছে যে, বাবা হচ্ছে সংসারের প্রধান, মা তার অধস্তন ? নারী পুরুষের সামাজিক ভূমিকাগত পার্থক্যের সঙ্গে এর মধ্যকার ক্ষমতা সম্পর্কও কি ওদের কাছে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ? শৈশবে শিশুর চোখ দিয়ে তখন আমারা নারী পুরুষ চিনেছি। তাদের পৃথক ভূমিকা চিনেছি বাবা ( সংসারের প্রধান ) রোজগার করে আর মা রান্না করে, ঘর সামলায়। বুঝে নিয়েছে বিয়ের পর মেয়েকে “বউ” হতে হয়, “মা” হতে হয়। সেই সঙ্গে সঙ্গে তাদের মর্যাদাও কিভাবে ভিন্ন হয়ে যায়; এইসব কিছুই যেন কত স্বাভাবিক, প্রশ্নহীন, সর্বজনীন। আর এই সব জানাশোনা দিয়ে তৈরি করেছি পুতুলের জগত্। নিজের অজান্তেই পুতুলখেলার মধ্য দিয়ে নিজের কাছে নারী-পুরুষের এই পৃথক সামাজিক পরিচিতি আরে স্বাভাবিক হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, তখনও বাজার তেমনভাবে চিনিনি। বাজার তেমনভাবে পুতুলখেলার জগতে ঢুকতে পারেনি। সুন্দর পুতুল পাওয়ার রাস্তা ছিল পুতুল বানানোর দক্ষতা, ক্রয়ক্ষমতা নয়। আর এখন বাচ্চার খেলনার যোগান দিতে গিয়ে দেখি সে সব হাতে গড়া বৈচিত্রময় পুতুলের দিন আর নেই খেলনার দোকানে সারি সারি সাজানো পুতুল। এবং অনিবার্যভাবে পুতুলগুলো সব একই ধরনের। দেশীয় কুটির শিল্পের দোকানে কাঠের বা কাপড়ের, শাড়ি বা পাঞ্জাবি পরা পুতুল পাওয়া গেলেও সেগুলো প্রধানত ব্যবহৃত হয় ঘর সাজানোতে, খেলনা হিসেবে নয়। আর খেলনার দোকানের প্রায় সব পুতুলই শেতাঙ্গ, সোনালি চুলের। বেশীরভাগই সাইজে আঝ হাত। এগুলো আমরা ছোটবেলায় আঙুল সমান পুতুলের চেয়ে বড় হলেও পুতুলখেলার জগত্ নিৰ্মাণে কোনও ঝক্কি নেই। টাকা থাকলেই হয়। আধহাত সমান এই পুতুলগুলোর জামা, জুতা, হাতব্যাগ, বাড়ি ঘর, গাড়ি সবই বাজারে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।এযুগের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের বাচ্চাদের পুতুলখেলায় তাই “বাজার” আর ক্রয়ক্ষমতাই মুখ্য। আর পয়সা খরচ করে আমরা এখন নারী-পুরুষের ভিন্নতার মতাদর্শ কিনি। বুঝতে পারি খেলনা ইন্ডাস্ট্রি দারুণ দক্ষতার সঙ্গে পুতুলখেলাকে নিয়ে শিশুদের যাবতীয় স্বপ্ন প্রয়োজন বুঝে নিয়েছে। এখন মধ্যবিত্ত ঘরে আর পুতুল বানানোর দক্ষতার প্রয়োজন নেই। সুন্দর পুতুল ইধিকারের প্রতিযোগিতাটা তাই আর দক্ষতার নয়, ক্রয়ক্ষমতার। এখনকার বাচ্চারা পুতুলখেলার মধ্য দিয়ে নারী পুরুষের ভিন্ন অবস্থান যেমন চিনেছে, তেমনি চিনে নিয়েছে বাজার। একইভাবে বাজার কি আরও শক্তপোক্তভাবে নিমাঁণ করে দিচ্ছে না নারী পুরুষের বিভাজিত শৈশবকে? মেয়ে বাচ্চার মা হওয়ার সুবাদে প্রায়ই শুনি আমার বাচ্চা দেখতে নাকি একদম পুতুলের মত। বাচ্চার চেহারা নিয়ে পুতুলের উপমাকে প্রশংসা ভেবে তাত্ক্ষণিকভাবে বেশ ভালোই লাগে অথচ চলতি কথা “পুতুল” বিশেষণ হিসেবে অনেকসময়ই পরাধীন অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যে মানুষের কোনও ক্রিয়াশীলতা নেই, স্বাধীন ইচ্ছে অনিচ্ছে নেই, তাকে রুপক অর্থে অনেক সময় পুতুল বলা হয় (যেমন: পুতুল সরকার ইত্যাদি)। ফর্সা, গোলগাল বাচ্চা মেয়েদেরও চেহারার প্রশংসায় যে পুতুলের উপমা দেয়া হচ্ছে সেই পুতুল কিন্তু আমাদের শৈশবের উচ্ছিষ্ট কাপড়ের পুতুল না। সেই চোফ পিটি-পিট করা, স্বর্ণকেশী, শেতাঙ্গ, বাচ্চা পুতুলের মতোই কোনও পুতুলের উপমা দেওয়া হয়। পুতুল তো ব্যবহৃত হয় মানুষের খেলনা হিসেবে। তাই মনে প্রশ্ন আসে, মেয়েদের চেহার নিয়ে পুতুলের উপমা কেন ভালো লাগে? বেশ ধাক্কা খাই যখন এই ভালো লাগার কারণ বুঝতে যাই। নারীর পরাধীনতা কি এতই প্রতিষ্ঠিত যে প্রাণহীন পুতুলের উপমায় অপমানিত না হয়ে গর্বিত হই? নাকি পরাধীনতার বোধকে ছাপিয়ে যায় চেহারার প্রশংসা? নারীর জন্য তাহলে কি চেহারা-সুরতই সব? আবার যদি শুধু চেহারার কথাই ধরি, যে চেহারার তুলনা করা হচ্ছে, সেই শেতাঙ্গ, স্বর্ণকেশী চেহারা অর্জন করা তো আমার কালো চুল আর কালো চোখের মেয়ের সামনে এক অ-সম্ভব সৌন্দর্য্যের আদর্শ তুলে ধরা হয়? আপনাতেই? নাকি এই আদর্শ তৈরির পেছনে অন্য কোন বিষয় জড়িত? আমার বাচ্চাকে যে উপমা দেয়া হয়, তা বাচ্চা পুতুলের; যদিও শ্বেতাঙ্গ এ বং স্বর্ণকেশী। কিন্তু লক্ষ করেছি, আজকাল বাজার ছেয়ে যাওয়া আধহাত লম্বা পুতুলগুলো বাচ্চা পুতুল নয়; অস্বস্তিকর রকমের প্রবল প্রাপ্তবয়স্ক বিশালবক্ষা অথচ অতিচিকন শরীরে এই পুতুল গুলো কিন্তু বিশেষভাবে এই জমনার পুতুল। আর এই ধরনের পুতুলের পথিকৃত বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান এক পুতুল; নাম তার বারবাব মিলিসেন্ট রবাটস ওরফে বারবি।বাচ্ছার জন্য খেলনা কিনতে গেলে দোকানিরাই প্রস্তাব করে বারবি কিন্তে।কিনতে না চাইলে উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুটে দেন, “কেন মেয়ে বাচ্চার জন্য তো বারবিই আদর্শ”। বারবি পুতুল এত চিকন কেন? কেনই বারবি এত বিশালবক্ষ? এই শরীর তো অস্বাভাবিক, আমরা চারপাশে এমন নারী শরীর তো দেখি না।এই অদ্ভুত শরীর নিয়ে কিভাবে এটি মেয়েদের আদশ প্রতিনিধি হয়ে উঠল?তাহলে কি বারবির শরীর এমন এক আদর্শ শরীরের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমনটি নারিরা কখনও হতে পারবে না, তবু হতে চাইবে, এই অসম্ভব শরীরী আদর্শ কখন কিভাবে তৈরি হয়েছিল? পুতুল বা পুতুল খেলাকে নিয়ে এই সব টুকরো টুকরো ভাবনা/ প্রশ্ন থেকে বেশ বুঝতে পারি, পুতুলখেলার মধ্য দিয়ে বাচ্চার সামাজিকীকরণ, এই সামাজিকীকরণ বাজারে অনুপ্রবেশ, সৌন্দয্যের আদর্শ হিসেবে শ্বেতাঙ্গ পুতুলের আবিভাব, আদর্শ হয়ে উঠে অতিচিকন শরীরে পুতুলের দাপট ইত্যাদি কোনো স্বাভাবিক বা স্বতস্ফুর্ত প্রক্রিয়া নয়। প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ক্ষমতার সম্পর্ক, রাজনীতি পুতুল বা পুতুলখেলাকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্নগুলো আমাকে পুতুলখেলার রাজনীতি অনুসন্ধানে কৌতূহলী করে তুলে। আর এই কৌতূহলের পিছনে আগুনে ঘি ঢালে বারবি পুতুলের আধিপত্য। বারবি পুতুল নিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা না থাকলেও বারবি কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অনেকের কাছেই পরিচিত একটি শব্দ।এখানে উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগে দৈনিক সমকালে বারবির পঞ্চাশ বছর উদযাপন উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপা হয়।বারবি শব্দটি যেহেতু পুতুল সংগ্রহকারী গণ্ডি ছাড়িয়ে এক প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তুত করতে পেরেছে, তাতেই বোঝা যায় এটি পুতুলের অধিক কিছু। এটি আপাত অর্থে কোনো জীবন্ত সত্তা নয়, তবু একটি বহু আকাখংকিত আদর্শ।এটি কাল্পনিক চরিত্থ হলেও বাস্তব জগতে এর দাপট বাস্তব সত্তার থেকেও বেশি। সেই সঙ্গে বারবি আরও অনেক কিছু। বারবির এই “আরও অনেক কিছু” দিক জানতে পারি জ্যাকলিন উরল এবং অ্যালান সোয়েডলুড-এর প্রবন্ধ “the Anthropometry of barbire: unsettling ideals of the feminie body in popular culture” পড়ে। জানতে পারি বারবি পুতুলের জন্মকথা, এর বিস্তৃতি ও প্রবল প্রতাপের সঙ্গে টিকে থাকার ইতিহাস।বুঝতে পারি জন্ম-বিস্তৃতির ইতিহাস বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে অবিচ্ছেদ্য। এ প্রবন্ধে আমি উরলা ও সোয়েডলুন্ড, সেই সঙ্গে আরও নানা নারীবাদী ও সমাজতাত্ত্বিকদের আলোচনার সূত্র ধরে বারবির নানামুখী বিশ্লেষণ হাজির করব।আলোচনায় আসবে পুতুলখেলার মেয়েলিজগতকে আরোও বেশি মেয়েলি করে তোলা বারবির গোলাপি ইমেজ।সেই সাথে হাজির করব বারবির অতিচিকন শরিরের বিশ্লেষণ ও এর প্রভাব। যেখানে আসবে বাস্তবে নারীর শরীরের ওপর বারবির চিকন শরীরের নিপীড়ন।তুলে ধরব বারবির ভোগবাদের খেলা, যেখানে আলোচিত হবে বারবিকে কেন্দ্র করে নিরন্তর কেনাকাটার জগত।সবশেষে আলোচিত হবে বহুসাংস্তৃতিক রাজনীতির খেলার বহুরুপী বারবির বিস্তৃতি। এখানে বলে রাখছি উল্লেখিত প্রসঙ্গ গুলো আবার পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্তঃ একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি আলোচনা সম্ভব নয়। ২. পুতুল/নারীর আদর্শ মেয়েলি পরিচিতিঃ আমাদের দেশে খেলনার দোকানে গোলাপি রঙের প্রাধান্য নিয়ে থরে থরে সাজানো থাকে যে বারবিরুপী পুতুলগুলো, সেগুলো দেখলে প্রায় সবাই এদের সম্পকে একটি সাধারন সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারবে।তা হলো সারা অস্তিত্ত্ব জুড়ে এরা ব্যাপকভাবে মেয়েলি। বারবি মৃলত বাজারে আসে একজন ফ্যাশন মডেলের চরিত্র। এর পর একে-একে ব্যালেরিনা, নার্স, বিমানবালা ইত্যাদি পেশাতে বাজারে আস্তে থাকে।বারবি পেশজীবী হলেও পেশাগুলো মেয়েলি, নারীর জন্য মানান্সই, কোমল ও নান্দনিক। আর এভাবেই বারবি তার একশত ভাগ নারী চরিত্র বজায় রাখে যে চরিত্রে পুরুষালি কোনো ব্যাপার নেই। আর একারণেই বারবি শব্দটি বিশেষণ হিসেবে বিশেষ ধরনের নারী চরিত্র বোঝাতে অনেক সময় ব্যবহ্রিত হয়।কেমন সেই নারী চরিত্র? শরীর ও রুপসরবস্ব বুদ্ধিবৃত্তিহীন ,অ-রাজনৈতিক। চলতি কথাবার্তায় হেয় অর্থে ‘মেয়েলিপনা’ যা যা প্রকাশ করে ঠিক তাই। কিন্তু মেয়েলিত্ব প্রকাশের রঙ এমন ব্যাপকভাবে গোলাপি কেন? গোলাপি রঙ কি তাহলে মেয়েলিত্বের রঙ হয়ে ওঠে? কিন্তু কিভাবে? বাচ্ছার জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে দেখলাম কাপড়, খেলনা আসবাব থেকে শুরু করে বাচ্ছার যাবতীয় জিনিস প্রধানত দুই রঙের পাওয়া যায়; গোলাপি এবং নীল। নবজাতকের প্রথম দিন থেকেই যথাথ লিঙ্গীয় পরিচিতি দিয়ে তাকে যাতে প্রকাশ করা হয় তার সুব্যবস্থা বাজার করে রেখেছে। সে জন্য দোকানিরা আগে ভাগে জেনে নেয় বাচ্ছা ছেলে না মেয়ে; যাতে সে অনুযায়ী পণ্য বের করতে পারে। এক মাসের মাথায় আমি আবিস্কার করলাম আমার মেয়ে যত উপহার পেয়েছে তার প্রায় সবটাতেই গোলাপি রঙের প্রাধান্য।নীল ও গোলাপির এই লিঙ্গীয় বৈপরীত্যমূলক অর্থ পশ্চিমা ধ্যান-ধারণায় ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত।এটা আমদের এই অঞ্জলের না।বাচ্ছার কাথা-কাপড় বা জামা বানাতে গিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা কিন্তু রঙচঙে কাপড়কেই পছন্দ করতেন যাতে সহজে মলিন না হয়।যদিও ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে ম্যাড়ম্যাড়া/প্যানসে রঙ ভদ্র ও অভিজাত হিসেবে শ্রেণীগত সমাদার পায়। তবু ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের দেশের নারী পুরুষ কে প্রায় উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরতে দেখা যায়। তবে পশ্চিমের প্রভাবে আমরাও আজকাল জেনে নিচ্ছি মেয়েলিত্বের রঙ গোলাপি আর নীল হছে পুরুষালি। তাই তো বারবি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ম্যাটেল এর যে ফ্রোরে বারবি ব্র্যান্ডের অফিস, সে ফ্রোরের আসবাব বা রঙ অন্য আর পাচটা অফিসের মতো হলেও এর চলতি নাম হচ্ছে ‘পিক্ম ফ্রোর’।শুধু রঙ দিয়েই না, বারবি পোশাক, রুপ, সাজগোজ, পাটি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে এক মেয়েলি জগতে বিরাজ করে। বারবি তার অস্তিত্বের পুরোটা দিয়েই এই মেয়েলিপনার একটি সীমিত গণ্ডি ঠিক করে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সেই সীমা মেনে চলে।সেইসঙ্গে এই সীমিত জগতকেসর্বজনীন করে তোলার চেষ্টা Capture1করে।বারবির আবিস্কারক রুথ হ্যান্ডালার গর্বিত স্বরে মেয়ে শিশুদের ওপর বারবির প্রভাব সম্পকে বলেন, ‘অভিভাবকরা জানায় যে তারা এর আগে তাদের মেয়েদেরকে এত সুন্দরভাবে সজ্জিত করতে পারেনি, পারেনি জিনস প্যান্ট ছেড়ে ড্রেসের মধ্যে ঢোকাতে; চুল ধোয়াতে বা গলা পরিষ্কার করাতে পারেনি। এমন সময় বারবি আসে পরিষ্কার মুখ ও চুল নিয়ে ফ্যাশনেবল পোশাক, ম্যাচিং হাতমোজা আর জিতা পরে। বারবি এই গোলাপি নারীত্বের আদর্শ প্রতিনিধি। আমরা ছোটবেলায় বিয়ে, সংসার ইত্যাদি নিয়ে পুতুলের যে মেয়েলি জগত সাজাতাম বারবি যুগে এসে দেখতে পাই এই জগতে আরও শক্তিশালীভাবে নারী পুরুষের পৃথক সামাজিক পরিচিতি তৈরি করে দিচ্ছে মেয়ে বাচ্ছার সামাজিকীকরণ আমাদের কালে প্রধান শিক্ষক ছিল পরিবার।কিন্তু এই যুগে দেখি বাজারি পুঁজিবাদ আরও দক্ষভাবে, আধুনিকরূপে লিঙ্গীয় পার্থক্যকে শিখিয়ে দিচ্ছে। গত পঞ্ঝাশ বছরে সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্যেও একই রকম মেয়েলি ইমেজ নিয়ে বারবি যে টিকে আছে, সেটা কিন্তু সহজ কথা নয়। এর রহস্য হচ্ছে, যুগের সঙ্গে যথাথভাবে তাল মেলাতে পারার দক্ষতা।তাই বারবি অতি মেয়েলি ইমেজ সবসময়ই, সব পরিবেশেই মানিয়ে নেয়; এমনকি নারীবাদী সমালোচনা মোকাবিলা করেও বেশ শক্তিশালী হয়ে টিকে থাকে।পঞ্চাশ বছর ধরে বারবি বাণিজ্যের এই সফলতার মূলে আছে ম্যাটেলের চতুর মার্কেটিং দল, যারা বিস্তূত গবেষণার মাধ্যমে পরিবর্তনশীল সমাজকে বুঝে নিয়ে বারবির নিরন্তর পরিবর্তন সম্ভব করে তোলে। এভাবেই বারবি নারীর গোলাপি ইমেজকে সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশেও ধরে রাখে। ১৯৫৯-এ জন্মানো ফ্যাশন মডেল বারবি পেশা পুরো ষাটের দশক জুড়ে ঘুরেফিরে বিমানবালা, ব্যালেরিনা, শিক্ষিকা, নার্স ইত্যাদি মেয়েলি পেশা’ তেই সীমিত ছিল।এর মধ্যে বারবি যতবারই বাজারে এসেছে, পোশাক আর অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে এই সব প্রথাগত মেয়েলি পেশাতেই নিজের পরিচিতির সীমা ধরে রেখেছে।কিন্তু সত্তরে দশকে শক্তিশালি নারীবাদি আন্দোলন সামাজিক পরিস্থিতি বদলে দেয়। এসময় নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাবে গণমাধ্যম ও পপুলার সংস্কৃতিতে নারীর লিঙ্গীয় পরিবেশন সমালোচনার মুখে পড়ে।খেলনার ইন্ডাস্ট্রিতেও এই প্রভাব এসে পড়ে। বারবির প্রবল লিঙ্গীয় ইমেজ অভিভাবকদের তরফ থেকে বেশ সমালোচিত হয়।এর বিক্রিবাট্টা কমে যায়। ব্যবসা সামাল দিতে এর কারখানা চলে যায় সস্তা শ্রমের তৃতীয় বিশ্বের দেশ তাইওয়ানে।হাওয়া বুঝে ম্যাটেল দ্রুত পরিস্থিতি সামলে উঠতে বারবিকে বৈচিত্রময় পেশার জম্ন দিতে থাকে। সত্তর দশকের নারীবাদী আন্দোলন বারবিকে নবজন্ম দেয়। ডাক্তার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ইত্যাদি চ্যালেঞ্জিং পেশার বারবি উৎপাদিত হতে থাকে। সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বারবির পরিচিতি বদলের কয়েকটি উদাহরণঃ ১। ১৯৭২-এ স্কুলে মেয়ে শিক্ষাথীদের জন্য ছেলেদের সমান খেলাধুলার সুবিধা দেওয়ার বিধান হলে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন বারবি জন্ম নেয় ২।যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদে পা দেওয়ার হুজুগে আর সোভিয়েত নারী ভ্যালেন্টিনা তেরেসকোভার চন্দ্রভ্রমণের জবাবে রুপালি স্পেসস্যুট পরে প্রথম নারী নভোচারী বারবি বাজারে আসে। ৩।উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বারবি আমেরিকার মরুভূমির সামরিক সৈনিক(১৯৮৯,১৯৯২), বিমানবাহিনী (১৯৯০,১৯৯৩) ও নৌবাহিনীর (১৯৯১)সৈনিকরুপে উৎপাদিত হয়। ৪.১৯৯৭ সালে বারবির হুইলচেয়ারে বসা প্রতিবন্দ্বী বন্ধু বেকি উৎপাদিত হয়। বারবির ড্রিম হাউস-এ সেই হুইলচেয়ার ঢুকতেনা পারার সমালোচনা হলে, সেই স্বপ্ন-বাড়িও আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এরকম অজস্র উদাহরণ বারবির পঞ্ঝাশ বছরের জীবনচক্রে খুঁজে পাওয়া যাবে। বারবি পুতুলের প্রস্তুতকারী কোম্পানি ম্যাটেল ঘোষণা দেয় বারবির পেশা আধুনিক নারী পেশার প্রতিচ্ছবি।এসব থেকে মনে হতে পারে যে, ম্যাটেল বারবিকে লিঙ্গীয় প্রশ্নে সংবেদনশীল করে তুলতে চেয়েছে।কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ম্যাটেলের সাবেক মার্কেটিং ম্যানেজার বেভারলি কেনেডি ১৯৮৭ সালে মিজ পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, নভোচারি বা ডাক্তার বারবি বাজারে ভালো চলেনি এবং এ ধরনের পোশাক রাখা হয়েছে বারবির প্রগতিশীল চেহারা দেখানোর স্বাথেই। বলা বাহুল্য, বারবির সমালোচনা ঠেকাতে প্রগতিশীল রূপে তাকে প্রকাশ করা হলেও ঝলমলে গ্ল্যামার আর গোলাপি নারীত্বেই বারবির মূল উপজীব্য। তাই সুন্দরী প্রতিযোগিতার নারীবাদী প্রতিরোধ সত্ত্বেও ডাক্তার, অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ান ইত্যাদি চ্যালেঞ্জিং পেশার পাশাপাশি মিস আমেরিকা মুকুটধারী বারবি অস্তিত্বশীল থাকে। নভোচারী বারবির সঙ্গে একই সালে আসে স্লাম্বার বারবি,যার সঙ্গে সরব্রাহকৃত পুস্তিকাতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও যথার্থ গৃহসজ্জার উপদেশ দেয়া হয়। একই সালে বের হয়া নভোচারী বারবি আর স্লাম্বার বারবি সহাবস্থান যেন নারিবাদী চাপ আর যৌনবাদী (sexist) চাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য করে।

2

১৯৬৩ সালে একটি রিপোর্টে দেখা যায় গড়ে বাওরবির চৌষট্টিটি পোশাকের মধ্যে কেবল একটি পেশাকেন্দ্রিক। উপরন্তু, বারবির পেশা একটি নতুন পোশাক ছাড়া আর কিছুই নয়। ছোট্ট মেয়েটি যদি বড় হয়ে দেশের রাষ্টপতি হতে চায়,তাহলে সে বড়জোর বারবির জন্য আর একটি পোশাক-রাষ্ট্রপতির ও তার জন্য আরো যা যা প্রয়োজন তার ক্রেতা হবে। প্রসিডেন্টের পোশাক পরুক আর এ্যারোবিক ইনস্ট্রাকট্রের পোশাক পরুক, বারবির শরীর কিন্তু একই রকম লাস্যময়ী। চরিত্রও তাই, একই রকম মেয়েলি। বারবির বহুমুখী পোশাকী পেশা তাই একভাবে বারবির গোলাপি নারীত্বকে আরোও গ্রহনযোগ্য করে তোলার তরিকা ছাড়া কিছু নয়। বারবিকেন্দ্রিক জগতে বারবির স্বাধীন চলাফেরা, যে কোনো পেশায় সফল হিসেবে বারবির পরিচিতিকে বারবি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ও এর সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে নারীর জন্য ইতিবাচক ইমেজ হিসেবে তুলে ধরার তাগিদ দেখা যায়। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো, নানা বৈচিত্রময় পেশায় বারবির জন্ম হলেও বারবির মূল জগত কিন্তু সাজগোজ, পোশাক ইত্যাদির মধ্যেই সীমিত। আর বারে বারে যে নারী আয়নায় মেকাপ ঠিক আছে কি-না, সে কোনো স্বাধিন সত্তার প্রতীক হতে পারে না। সে আর কিছুই নয়, নিজ দেহের নজরদারিতে বন্দী। ৩. পুতুল/নারীর আদর্শ শরীর বারবির মেয়েলি জগতের আরেক আশ্চর্য। বারবির এই অস্বাভাবিক চিকন শরীর এ যুগের নারী শরীরী আদর্শের সেরা আইকন। কিন্তু মানব বৈচিত্র না ভিন্নতা যেখানে বাস্তবতা, একটি নির্দিষ্ট দৈহিক আদর্শ আর যাই হোক নিরপেক্ষ হতে পারে না। তাহলে কখন, কিভাবে, কেন এবং কাদের কাছে একটি বিশেষ মানব শরীরের কাঠামো আদর্শ হিসেবে নির্মিত হয়? কিংবা সরাসরিভাবে বলা যায়, কিভাবে বারবির নির্দিষ্ট গড়নের শরীর জাতি-শ্রেণী নির্বিশেষে নারীর জন্য ‘আদর্শ’ হিসেবে তৈরি হয়? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার । ৩.১ আদর্শ শরীর: চল্লিশ দশকের নরমা উরলা এবং সোয়েডলুন্ডের আলোচনা থেকে জানতে পারি, ৪০ দশকে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামঝি সময়ে মার্কিন জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে । সেই সঙ্গে বর্ণবাদী চিন্তার পক্ষে যায় এমন বৈজ্ঞানিক প্রমান হাজির করার তাগিদও কাজ করে। বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠতে থাকে, মার্কিনিদের কি বিশেষ কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য আছে ? ইউরপীয় পূর্বপুরুষদের থেকে কি এরা দুর্বল? অথবা শারিরিকভাবে বড়সড়? যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এদের শরীর কতটা ফিট? ১৯৪৫ সালে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেশ ঘটা করে আদর্শ জাতীয় চরিত্র নির্ধারণ করা হয়। সারা যুক্তরাষ্ট্র জুরে হাজারো “দেশীয় সাদা আমেরিকান“ যুবদেহের তথ্য নিয়ে তৈরি হয় পুরুষ “নরম্যান“ ও নারী “নরমা“ । নরমার উচ্চতা নির্ধারিত হয় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি আর কোমরের মাপ একত্রিশ ইঞ্চি । নরমার শরীর যুদ্ধোওর আমেরিকার প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথার্থ ছিল; সে শরীর ফিট, শক্তিশালী এবং সন্তান জন্মদানের উর্বর ক্ষেত্র । তাই নরমাকে সেই সময় আদর্শ বা কাম্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কেননা যুদ্ধবিধ্বস্ত আমেরিকার প্রয়োজন ছিল উর্বর ও শক্তিশালী উৎপাদকের। ক্লিভল্যান্ড যাদুঘর, একটি স্থানীয় দৈনিক, YWCA এবং আরও কয়েকটি সংগঠন মিলে ওহাইয়োর নারীদের জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে “নরমা“ ব্যাপক পরিচিতি পায়। সেই প্রতিযোগিতার ব্যানার ছিল “Are you Norma, Typical Women?“। তিন দিনের মধ্যে প্রায় চার হাজার নারী তাদের শরীরের মাপ জমা দিয়েছিল প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শ গড় নারী শরীরের স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়। আদর্শ নারী শরীর নরমা ছিল পুনরুৎপাদনের জন্য যথার্থ শক্তিশালী ও আকৃতিতে বড়সড় । কিন্ত পরবর্তী দশকগুলতে বিজ্ঞাপন , বিনোদন শিল্প এবং ভোগবাদের কল্যাণে নারী শরীরের আকৃতি বদলে যেতে থাকে । নারী শরীর তখন আর সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্র নয়, বিবেচিত হতে থাকে সৌন্দর্য্য, যৌনতা আর ফ্যাশানের মাপকাঠি দিয়ে। নারীর শারীরিক ফিটনেসের চাইতে বেশি গুরত্বপুর্ন হয়ে দাঁড়ায় সুন্দরী ও সেক্সি হয়ে ওঠা। সেই সময় থেকে ভোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একদিনের যুক্তরাষ্ট্রের গড় নারী শরীর ক্রমশ মোটা হতে থাকে, অন্যদিকে আশ্চর্যজনকভাবে আদর্শ শরীরের মান্দন্ড হতে থাকে চিকন থেকে চিকনতর। যুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে টেলিভিশনের ব্যবহার জনপ্রিয় হতে থাকে। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত নারী মডেলের চিকন শরীর সবচেয়ে কার্যকরীভাবে নতুন নারী শরীরের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে থাকে। টেলিভিশন তখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরের ভেতরে ভোগের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে দেয়া যাদুমন্ত্রের মতো। নারী, টিএনজ এবং শিশু এসব বিজ্ঞাপনের টার্গেট-এ পরিণত হয়। একসময়ের আদর্শ শরীর ‘নরমা’র ইমেজ ঢাকা পড়ে যায় বিলবোর্ড আর টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের চিকন নারী শরীরের আড়ালে। বিজ্ঞাপনের ফ্যাশন মডেল টেলিভিশনের মাধ্যমে ঘরের ভেতরে ঢুকে যেন বলতে থাকে; যত পারো খাও কিন্তু ছিপছিপে থাকো, মোটা হয়ো না। ফ্যাশনেবল, সেক্সি পোশাক পড়ো কিন্তু বিশ্বস্ত স্ত্রী, ‘ভালো’ মেয়ে হয়ে থাকো। ত্যাগী বা পরিশ্রমী নারী নয়, প্রয়োজন পড়ে ভোগী নারী যে কিনা আবার পুরুষের ভোগের উপকরণ। কর্মঠ, ত্যাগী নারী আদর্শ রূপান্তরিত হয় ভোগী, বিলাসী ও যৌন আবেনময়ী নারী আদর্শে। শক্তিশালী নারী শরীর নয়, কাম্য হয়ে ওঠে চিকন-দুবলা-পলকা নারী শরীর। পুরুষের উপর নির্ভরশীল এই পলকা নারী শরীর পুরুষালি কামনায় আদর্শ ও নারীত্বের সঙ্গে মানানসই হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। আর আজকে চারদিকের হাজার হাজার নারী চিকন নারী শরীর প্রদর্শনের তলে নরমা এতটাই আড়ালে পড়ে গেছে যে, এই প্রবন্ধের জন্য অজস্রবার নানা সূত্র ঘেঁটেও এক সময়ের সেই মার্কিন আদর্শ নারী শরীরের প্রতিনিধি নরমার একটি ছবিও কোথাও খুঁজে পাইনি। কিন্তু তেমন একটা কসরত না করেই পেয়েছি এই আমলের আদর্শ চিকন ও সেক্সি শরীরের যথার্থ প্রতিনিধি বারবির অজস্র ছবি। ৩.২ আদর্শ শরীরঃ বারবি যুগ, ১৯৫৯ থেকে বর্তমান ১৯৫৯-এ খেলনা প্রস্তুতকারী কোম্পানি ম্যাটেলের হাতে জন্মায় বারবি। নিজের কন্যাশিশুকে বাচ্চা পুতুল নয় বরং বড়দের মতো পুতুল বানিয়ে তা নিয়ে খেলতে দেখেন ম্যাটেলের অন্যতম কর্ণধার রুথ হ্যান্ডলার। এ থেকেই শিশুর শৈশবের প্রতিনিধি বাচ্চা পুতুল নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্ক পুতুল দিয়ে শিশুর ভবিষ্যত স্বপ্নকেও পুতুলখেলার মধ্য দিয়ে গড়ার বুদ্ধি পান। এটিই বারবি পুতুলের বহুল প্রচলিত জন্ম ইতিহাস। আপাতত নিরীহ এই জন্মকাহিনী মুদ্রার একপিঠ, অপর পিঠে আছে আরেক কাহিনী। ইউরোপে বেড়াতে গিয়ে জার্মানি থেকে রুথ নিয়ে আসেন পূর্ণবয়স্ক নারী শরীরের অধিকারী পুতুল ‘বিল্ড লিলি’। জার্মান জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড ‘বিল্ড’৮ এ প্রকাশিত এক কার্টুন চরিত্রের অনুকরণে এই পুতুলটি তৈরি। কার্টুন চরিত্র লিলি যুদ্ধোত্তর ইউরোপের পরিবর্তিত সমাজে, যৌনবাদী(sexist) পুরুষের জগতে একটি জনপ্রিয় নারী চরিত্র হয়ে ওঠে। ধনী বসের সেক্রেটারি লিলি উচ্চাবিলাষী। এই উচ্চাবিলাষী অর্জনের পথ হিসেবে সে ব্যবহার করে তার নারীত্ব ও যৌনতাকে। লিলি পুতুল প্রাথমিকভাবে অ্যাডাল্ট শপে পুরুষের যৌন উপকরণ হিসেবে বিক্রি হতো। পরবর্তীকালে বাচ্চার খেলনা হিসেবে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। দূরদর্শী রুথ এই লিলির মধ্যেই ব্যবসায় বাজিমাত করার সম্ভাবনা দেখতে পান। মজার ব্যাপার হলো, লিলির অনুকরণে নতুন পুতুল বারবি তৈরির জন্য ম্যাটেল কোম্পানি যুদ্ধাস্ত্র নক্সাবিদ জ্যাক রায়ানকে তলব করে। ইয় জ্যাক রায়ান অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেথেশুন-এর নক্সাবিদ ছিলেন। তিনি পেন্টাগনের হয়ে স্নায়ুযুদ্ধের সময় হুক ও স্প্যারো মিসাইলের নক্সা প্রস্তুত করেন। কিন্তু পুতুল তৈরিতে জ্যাক রায়ান কেন? কারণ, তিনি যুদ্ধাস্ত্রের মত ভয়ানক জিনিসকে পেলব চেহারায় ঢেকে দেওয়ার দক্ষতা প্রমাণ করে বেশ বিখ্যাত হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধাস্ত্র নক্সাবিদের হাতে তৈরি হয় বারবি। রায়ানের সেই দক্ষ হাতে যৌন উপকরন লিলি পুতুলের পুনর্জন্ম হয় মেয়েশিশুর খেলার পুতুল বারবি রূপে। পেলব প্লাস্টিক দেহের অধিকারী বারবি জন্মালো কখন? যে বছর স্নায়ুযুদ্ধের বহুল আলোচিত নিক্সন ও ক্রুশ্চেভ-এর রান্নাঘর ‘বিতর্ক’ হয় সে বছরেই, ১৯৫৯ সালে। বিতর্কিত ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়নে, বিশেষত গৃহস্থালী সামগ্রীর উদ্ভাবনে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের তুলনামূলক দক্ষতা নিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পড়ে এমন একটি আদর্শ শহুরে রান্নাঘরের নক্সাতে বিতর্কের স্টেজটি তৈরি হয়। অনেক কম শ্রম লাগে এমন গৃহস্থালী সামগ্রী যেমন ওয়াশিং মেশিন, ডিশওয়াশার, সেই সঙ্গে নানারকম বলাসী দ্রব্য, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার, পেপসি কোলা, লিপ্সটিক, হাই হিল ইত্যাদি সেখানে মজুদ ছিল। আমেরিকার পুঁজিবাদী বাজারের সুফল বার্তা পৌঁছানোই এই নক্সার উদ্দেশ্য ছিল। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের তরফ থেকে এসব বিলাসী দ্রব্যের পরিবর্তে গুরুত্ব দেয়া হয় জীবনধারনের জন্য দরকারি জিনিসপত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনের উপর। মজার বিষয় হলো, বিতর্কের একটি পর্যায়ে তৎকালীন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী ক্রুশ্চেভ জানতে চান, মুখে খাবার তোলে দিতে পারে এমন কোনো পণ্য মার্কিন বাজারে এসেছে কি না! এর উত্তরে তৎকালীন মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট নিক্সন জানান, দুই তরফের প্রতিযোগিতাটি প্রযুক্তিগত, অন্তত অস্ত্রের নয়। স্নায়ুযুদ্ধকালীন পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যকার প্রতিযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে এই সভা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা এটি ছিল সম্মুখ-যুদ্ধের একধরনের আপাত শান্তিময় বিকল্প। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্কিন পণ্য ও আদর্শ রান্নাঘরের প্রতীকের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নব্য মার্কিনি মতাদর্শ। যে মতাদর্শ যুদ্ধের বিকৃত অভিজ্ঞতা, নিউক্লিয়ার অস্ত্রের হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি ও রাজনৈতিক সচেতনতা ভুলিয়ে দিয়ে বিলাসে ডুবে যাওয়াকে উসকে দেয়। একই বার্তা নিয়ে সেবছরই মিসাইলসদৃশ স্তন নিয়ে বারবি হাজির হয় মার্কিন বাজারে। বারবি সম্মুখযুদ্ধের মিসাইল নয়। বরং স্নায়ুযুদ্ধের ‘সুন্দরী’ পণ্যরূপী হাতিয়ার। ৩.৩ বারবির শরীরতত্ত্ব আনুপাতিক হারে মানব শরীরের ছয় ভাগের এক ভাগ হচ্ছে বারবির শরীরের মাপ। ফলে উচ্চতার ও প্রশস্ততার দিক থেকে বারবিকে ছয় গুণ বড় করলে মানব শরীরের আকারে একে পাওয়া যাবে। এতে করে বারবির উচ্চতা দাঁড়ায় পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি। শরীরের মাপ দাঁড়ায় ৩৬”-১৯”-৩৩”। বারবির একটি জনপ্রিয়তম প্যাকেজে সে হাজির হয় একটি ওজন মাপক যন্ত্র নিয়ে যাতে বারবির ওজন দেওয়া থাকে ১১০ পাউন্ড। মাসিকের জন্য যে পরিমাণ চর্বি নারীর শরীরে থাকা প্রয়োজন, পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতা ও একশ দশ পাউন্ড ওজনের নারীর তার থেকে কুড়ি ভাগ চর্বি কম। মাসিকের জন্য প্রয়োজনীয় চর্বি বার্বির শরীরে না থকলেও যাথার্থ যৌনাবেদনময়ী হওয়ার জন্য তার রয়েছে অস্বাভাবিক বিশাল স্তন যা কোনভাবেই তার শরীরের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এটি বলতে পারি যে, বার্বির মতো শরীর যদি কোনো নারীর হয়, সে সন্তানধারণে বা জন্মদানে সমর্থ না হলেও যৌনবাদী পুরুষের কামনায় কাঙ্খিত। পরবর্তীতে নারী শরীরের যৌবনাবেদন শ্রেফ শরীরের মাপে নয়, ভঙ্গিতেও ফুটে ওঠে। এর হাত-পা যেভাবেই রাখা হোক না কেন, এক বিশেষ ভঙ্গিমা বজায় থাকে। এই ভঙ্গিমা একজন মডেলের ভঙ্গিমা, যে কিনা ক্যামেরার সামনে বা ফ্যাশন শো’তে শরীরের দর্শনীয় অংশগুলোকে বেশ দক্ষতার সঙ্গে মেলে ধরতে পারে। এই দক্ষতা না থাকলে ফ্যাশন ফটোগ্রাফার বা ট্রেনাররা মডেলকে ছবি তোলার ঠিক আগমুহূর্তে জোরে শ্বাস নিয়ে ধরে রাখতে শিখিয়ে দেয়। বার্বি পুতুল সেই ট্রেনারের মতো করেই খুব ছোটবেলাতেই বাচ্চা মেয়েদের শিখিয়ে দেয় কিভাবে মোহনীয় ভঙ্গিতা স্তন উচু করে দাঁড়ালে বিশ্বজয় করা যায়। এই যুগে একজন নারী কোন ভঙ্গিতে দাঁড়াল, বসল বা তাকাল তাকে সেক্সি বলে, সেক্সি হলে যে কত কিছু অর্জন করা যায়, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বিজ্ঞাপন ও বিনোদন শিল্প অতি গুরুত্ব দিয়ে শিখিয়ে দিচ্ছে। আর বাচ্চা মেয়েদের এই শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় শিক্ষক বার্বি। ম্যাটেলের বার্বি ব্রান্ডের জেনারেল ম্যানেজার ডিকিনসন গর্বিত স্বরে জানান, বার্বি গবেষণা দল অন্যান্য অনেক উপাদানের মতো মেয়ে বাচ্চাদের জন্মদিনের ভিডিও বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করে যে, বার্বির কল্যাণে মেয়েশিশুর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার ভঙ্গি পাল্টে গেছে। তার ভাষায় এই দাড়াবার ভঙ্গি “কিছুটা এ্যাগ্রেসিভ, কিছুটা সেক্সি।” বার্বির কল্যাণে খুব ছোটবেলাতেই শরীরের এই যৌনবাদী ভাষা শিশুর মস্তিষ্কে ঢুকে যায়। ৩.৪ বাস্তব নারীর শরীরত্ত্ব বার্বি নিয়ে খেলতে খেলতে কিশোরীরা এর সঙ্গে এক ধরণের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ছোট্ট মেয়েটির বন্ধু বা বড় বোনের মতো করে বার্বি নিজের মতো হয়ে উঠতে চাওয়ার স্বপ্ন বুনে দেয়। বার্বির বিজ্ঞাপনের গান “আমি শুধু তোমার মতো হতে চাই” (“I want to be just like you”) একে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে শিশুদের সামনে উস্থাপন করে: বার্বি হওয়ার স্বপ্ন বাচ্চা মেয়েদের মননে ঢুকে যায়। তার ওপরে আবার বার্বির মতো পোশাকের (Barbie look alike clothes) বাণিজ্য এবং বার্বির মতো হয়ে উঠতে চাওয়ার স্বপ্নের উপকরণের যোগানদার হিসেবে কাজ করে। ৩.৪.১ বাস্তবের বার্বি: সিন্ডি জ্যাকসন বার্বি হয়ে উঠতে চাওয়ার তীব্র স্বপ্নের চলতি নাম “বার্বি সিন্ড্রম” যার সার্থক উদাহরণ সিন্ডি জ্যাকসন। বার্বি শরীরের আদর্শে নিজেকে সঁপে দিয়ে তাকে অন্ধভাবে অনুকরন করতে গিয়ে চৌদ্দ বছর ধরে একত্রিশবার প্লাস্টিক সার্জারি করেন তিনি। আর এভাবেই ছোটবেলার প্লাস্টিক পুতুল বারবি হয়ে ওঠার স্বপ্ন পূরণ করে সিন্ডি গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, সিন্ডি জাক্সন তার নিরন্তর প্লাস্টিক সার্জারিকে ব্যাখ্যা করেন নিজ শরীরকে ইচ্ছামত আকার দেওয়ার “স্বাধীনতা” হিসেবে। তাহলে কি নারীর নিজ পছন্দ অনুযায়ী শরীরের আকার দিতে পারা একভাবে প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসা? ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক? বারবির মতো হয়ে উঠবার। বারবির মতো হয়ে উঠবার ইচ্ছেটা তাহলে স্বাধীন, সমাজবিচ্ছিন্ন ইচ্ছা? শক্তিশালী নারীবাদী বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বলতে পারি, ব্যক্তি স্বাধীনতার, কসমেটিক সার্জারি ভীষণ রকম সামাজিক চাহিদা মতো শরীর উতপাদনের তরিকা ছাড়া কিছুই নয়। সার্জারি করে যে শরীর নারীরা পেতে চান, সেই চাওয়াটি আপনা থেকে স্বাধীনভাবে তৈরি হয় না। সেখানে পুরুষ বা নারীর পুরুষতান্ত্রিক নজরদারি (surveillance) অনুসারে নারী শরীরের পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আদর্শ নারীর ওপর আরোপ করা হয়। আর তাই সমাজবিশ্লেষক জিয়াউদ্দিন সরদারের মতো গত শতকের নারী যদি বন্দি হয় রান্নাঘরের বন্দীশালায়, এই শতকের নারী বন্দী তার নিজ দেহের কারাগারে। 3

৩.৪.২ বাস্তবের নারীঃ না খাওয়ার বিপত্তি বারবি হয়ে ওঠার মোহ সিন্ডিকে বিখ্যাত করলেও এই মোহের সাধারণ শিকারের কাহিনি কিন্তু ভয়াবহ। কেননা, বারবির প্রথম উপদেশ, “খেয়ো না”। বারবির একটি জনপ্রিয়তম প্যাকাজ ওজন কমানর গাইড নিয়ে বারবি হাজির হয়। সেই গাইডে স্পষ্টভাবে স্রেফ না খাওয়ার উপদেশ দেয়া হয়। বারবির মতো চিকন শরীরের অধিকারী হতে গিয়ে অগুন্তি কিশোরী না খাওয়ার বিপর্যয়ের (caring disorder) শিকার হয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই যার শেষ পরিণাম মৃত্যু। সমসাময়িক ফ্যাশন – বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রি ও পশ্চিমা দর্শন মিথোলজি – মানসিকতা বিশ্লেষণ করে তাই একে চিকন দেহের স্বৈরতন্ত্র (tyranny of slenderness) হিসেবে চিহ্নিত করেন নারীববাদী কিম শারনিন। আর বার্বি এদিক দিয়ে সবচেয়ে কার্যকরী নিপীড়ক। বার্বি রক্ত মাংশের মানবী নয়, প্লাষ্টিক পুতুল বলেই এই অসম্ভব মানসিক যন্ত্রণা থেকে নিজেকে বহাল তবিয়তে রেখেছে। তার পঞ্চাশ বছর ধরে অসংখ্য রুপে সবচেয়ে কার্যকরীভাবে অতিচিকন হওয়ার বিকৃত লক্ষ্যকে গাধার মুলা করে ঝুলিয়ে রেখেছে। বার্বি আবিষ্কারক রুথ হ্যান্ডলারের নাতনি স্টেসি হ্যান্ডলার তার প্রকাশিত বই “দ্যা বডি বারডেন: লিভিং ইন দ্যা শ্যাডো অফ বার্বি-তে তার না খাওয়া বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে বার্বি ও তার দাদিকে দায়ী করেন।যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যে কোনো মানসিক রোগে যে গড় মৃত্যু হার, না খাওয়ার বিপর্যয়ে কিশোরী মৃত্যুর হার তার চাইতে কয়েক গুণ বেশী। আর এই ধরণের মানসিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ সামাজিকভাবে অতি চিকন দেহের আদর্শ। বার্বি যার যথার্থ উদাহরণ। অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়া না খাওয়ার বিপত্তির দুটি প্রধান রোগ। অ্যানোরেক্সিক নারী খাওয়াদাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দেয় অথবা শুধু পানি খেয়ে থাকে (water diet)। আর বুলেমিক নারী এক বৈঠকে কয়েকগুণ বেশী খাবার খেয়ে পরক্ষণেই স্বেচ্ছায় বমি করে সব খাবার উগরে দেয়। আমেরিকার ন্যাশনাল ইটিং ডিসঅর্ডার এ্যাসেসিয়েশন থেকে প্রকাশিত এক তথ্যে (২০০৫) দেখানো হয়, এক দশকে “ডায়েট” কেন্দ্রিক মানসিক বৈকল্যে হাসপাতালে ভর্তির হার বেড়েছে শতকরা আশিভাগ। সেই সঙ্গে আরো বেশী অল্প বয়সী বালিকা এর শিকারে পরিণত হচ্ছে। অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া ও অন্যান্য না খাওয়ার বিপত্তী যে কতটা ব্যাপক ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে তা কিছু তথ্যাকারে দেওয়া যায়- * যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত অর্ধেক টিনএজ মেয়ে স্রেফ না খেয়ে বমি করে ওজন কমানোর চেষ্টা করে। * যুক্তরাষ্ট্রের কিশোরীদের মধ্যে শতকরা একভাগ নারী অ্যানোরেক্সিক, কলেজগামী নারীর মধ্যে শতকরা চার ভাগ বলিমিক। * বারো থেকে চব্বিশ বছর বয়সী নারীর মধ্যে অ্যানোরেক্সিয়ায় মৃত্যুহার অন্যান্য কারণে মৃত্যুহারের থেকে বারো গুণ বেশি। * বিনা চিকিত্সায় শতকরা কুড়ি ভাগ না খাওয়ার বিপর্যয়ের পরিণাম মৃত্যু। আর চিকিত্সা সত্ত্বেও মারা যায় শতকরা একভাগ।

4

বহু নামীদামি হলিউড তারকা এই রোগের শিকার। প্রখ্যাত ব্যান্ড কারপেন্টার – এর গায়িকা ক্যারন কারপেন্টারের মৃত্যু (১৯৮৩) অ্যানোরেক্সিয়ার ভয়াবহতা প্রথম প্রকাশ করে। আরো পরে প্রিন্সেস ডায়ানা ডায়েট কেন্দ্রিক মানসিক বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেন যা আশির দশকের শেষদিকে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এর পর থেকে পঞ্চাশেরও বেশি জনপ্রিয় পশ্চিমা তারকা না খাওয়ার বিপত্তির কথা স্বীকার করেন। “ডায়েট” শব্দটি ততদিনে পশ্চিমা এবং আধা-পশ্চিমা প্রায়-সকল নারীর জীবনে একটি অপরিহার্য নিয়ন্ত্রক হয়ে দাড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে অ্যানোরেক্সিন নারীর “ওয়াটার ডায়েট” এর ব্যাবধান কিন্তু আসলে খুবই সূক্ষ্ম। কেননা, মেদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যকর ডায়েট বলুন আর ওয়াটার ডায়েট বলুন, কার্যকরী হলে সবই বৈধ যেভাবে হোক, মেদ তো কমাতেই হবে। কিন্তু কেন মেদ কমাতে হবে? কেন বারবি এতো চিকন? কেনই বা এই যুগে চিকন শরীর এত কাম্য? বিয়ের পাত্রী বলুন আর সিনেমার নায়িকা বলুন, একটা সময় তো আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবান, ভরা শরীরের নারীরাই সুন্দরী হিসেবে বিবেচিত হতো তাহলে কেন চিকন হওয়ার ইঁদুর দৌড়ের সাম্প্রতিক এই প্রবণতা? যত দোষ নন্দ ঘোষ; এখন মেদই যেন সব সমস্যার মূল। এর কারণ কি? বিভিন্ন নারীবাদীদের বিশ্লেষণ থেকে জানতে পারি যে, পশ্চিমা শরীর-মন, প্রকৃতি-সংস্কৃতি, যন্ত্র-জীবন ইত্যাদি বৈপরিত্যের সীমানার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিকতা ও পুরুষতন্ত্র। আধুনিক পশ্চিমা দর্শনে নারীকে প্রকৃতির রহস্যময়তা আর পুরুষকে সংস্কৃতির যৌক্তিকতার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। নারী তাই নিয়ন্ত্রণের উপাদান আর পুরুষ নিয়ন্ত্রণকারী। এই পরিপ্রেক্ষিতে নিজ শরীরে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইচ্ছেমতো আকার-আকৃতি দেওয়া শরীরে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নকল অঙ্গ প্রতিস্থাপন, প্রকৃতি-সংস্কৃতির সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বলা হয় বার্বির শরীর অতিরিক্ত চিকন হলেও এটি ফিটনেস এর আদর্শ এক মজবুত শরীর। বার্বি সেক্সি কিন্তু অবলা নয়, শক্তিশালীও স্বাধীন। কেননা নিরন্তর ভোগের হাতছানিকে অবজ্ঞা করে তার চিকন শরীর প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণের গৌরপ প্রকাশ করে। তাহলে মন/শরীরের বা প্রকৃতি/সংস্কৃতির প্রথাগত এই বৈপরিত্যের সীমা ভাঙলে কি ভাঙা সম্বব হতে পারে এর ওপর দাঁড়ানো পুরুষতন্ত্রকেও? কিন্তু আমরা তো দেখি পুজিবাদ ও পুরুষতন্ত্র এ ধরণের শক্তিশালী নারীবাদী চিন্তাভাবনাকে ভিন্ন খাতে বিশ্লেষণ করে পকেটে ভরে ফেলে। যেভাবে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার দোহাই দিয়ে, তেমনিভাবে মেদমুক্তিকে নারীমুক্তির সমার্থক করে তুলে নারীর ওপরে লিঙ্গীয় শরীরের আদর্শ মুলা ঝোলানো হয়। মেদকে তাই নারীবাদী ইস্যু হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সত্তরের দশকে আলোড়ন তোলেন মনোবিশ্লেষক ওরবাক। তিনি মেদকেন্দ্রিক মোহাচ্ছন্নতার মূলে চিহ্নিত করেন পুরুষালি জাগতের নারী আদর্শকে। তাই বলতে পারি সব সমস্যার মূলে মেদকে চিহ্নিত করার কারণে ক্ষমতায়ন বা ব্যক্তি স্বাধীনতা নয়, পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে স্বীকৃত এবং গুরুত্ব পাওয়ার আকাঙ্খা। অতিচিকন হওয়ার এই আদর্শ, বর্তমানের দ্বন্দ্বময় পুঁজিবাদী অথিনীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্ন হলো, বর্তমানের পুঁজিবাদের দ্বন্দময় রুপটি তাহলে কেমন? বার্বির যেমন একবার হাতছানি দেয় পিত্জা পার্টির আহবান নিয়ে, তো আরেকবার হাজির হয় ওজন মাপার যন্ত্র আর না খাওয়ার উপদেশ নিয়ে, ঠিক তেমন। পুঁজিবাদী বাণিজ্যের কল্যাণে আমাদের হাতের কাছে হাজারো জাঙ্ক ফুডের হাতছানি। অন্যদিকে তা খেয়ে মোটা হলেও সমস্যা নেই, চর্বি কমানোর হাজারো পণ্য মজুদ। তাই মেদ এখন শুধু নারীবারী ইস্যু নয়, অনেক বড় বাণিজ্যিক ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রে বাত্সরিক অন্তত আটত্রিশ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা পরিচালিত হয় স্রেফ মেদকে পুঁজি করে। বার্বির চিকন শরীরের আদর্শ এবং এর ভয়াবহ প্রভাবের কারণ এটি যে সমালোচনার মুখে পড়েনি, তা কিন্তু নয়। বরং বার্বি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত পুতুল। ক্রমবর্ধমান না খাওয়ার বিপত্তিতে বার্বির শরীররী আদর্শের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। না খাওয়ার এই বিপত্তির প্রভাবক হিসেবে বার্বিকে দায়ী করা হলে বার্বি উত্পাদকের তরফের যুক্তি হলো; বার্বির দেহ অতি চিকন হলেও তা কিন্তু অ্যানোরেক্সিক নারীর মতো নয়। অ্যানোরেক্সিক শরীর তো যৈন বিরুদ্ধ, কঙ্কালসার, নারী শরীরের সাধারণ কঙ্খিত আকারকে তো একভাবে চ্যালঞ্জ করে। বিপরীতে বার্বি অতি যৌন আবেদনময়ী। বার্বি পেলপ নারী শরীরের কাঙ্খিত আকারের আদর্শ। তবে বার্বি পক্ষের এত শত যুক্তিতে যখন কাজ হয় না, তখন ম্যাটেল কোম্পানি বার্বির আকারকে কিছুটা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। 5প্রতিকূল পরিবেশে মানিয়ে নিতে ১৯৯৭ সালে বার্বির দেহের আকার পরিবর্তন করা হয়। সমালোচনা মোকাবেলায় বার্বির কোমরকে আরেকটু প্রশস্ত করা হয়। ম্যাটেল থেকে এর যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এই নতুন শরীর বর্তমানের ফ্যাশন ডিজাইনের সঙ্গে অধিকতর মানানসই। আসল কথা হল, যেদিকে বৃষ্টি পড়ে সেদিকে ছাতাটি ধরতে পারে বলেই বার্বির প্রবল প্রতাপের সঙ্গে টিকে আছে। বার্বি শরীরের পরিবর্তিত ইমেজ ও এর বিশ্লেষণ আপাত ভিন্ন মনে হলেও শেষমেষ তা আমাদের একটি সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। আর তা হলো এটি একুশ শতকের পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারীর সবচেয়ে কাঙ্খিত শরীর। ৪. ভোগবাদের খেলা বার্বি একটি আইকন; একটি বিশেষ চিহ্ন। এই চিহ্নের অর্থ বুঝতে হবে বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদ ভোগবাদের পরিপ্রেক্ষিতে। পঞ্চাশ বছর ধরে বার্বি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পুতুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে মফস্বলের যে কোনো মুদি দোকানে দামি পুতুল বার্বি না পাওয়ার গেলেও এর নকল বা ইমেজযুক্ত পেন্সিল, শার্পনার, স্টিকার ইত্যাদি পণ্য পাওয়া যাবে। বার্বি এই সময়ের ভোগের প্রতীক। এর বিস্তৃতি বিশ্বজোড়া। প্রতি সেকেন্ডে গোটা বিশ্বের কোনো না কোনো স্থানে দুইটি বার্বি পুতুল বিক্রি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার বেশি বিক্রি হওয়া বার্বি প্রতি বছরে ম্যাটেলকে এনে দেয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলার। বার্বি কেনার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এটি কেনা মানে কেবল একটি পুতুল কেনা নয়, একে নিয়ে খেলতে গেলে কিনতে হয় এর জগতকেও। যেটি বার্বিকে নিয়ে খেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বার্বি বাণিজ্য বুঝতে গেলে আমাদের উল্টেপাল্টে দেখতে হবে ভোগবাদের জগতে বার্বি কেনাকাটার বিস্তৃত পরিসরকে। বার্বির কেনাকাটার পরিসরকে আমি এখানে দুইভাগে দেখছি। প্রথমত আসবে স্ট্যাটাস আইকন বার্বি কেনার অর্থ। যেখানে এই বিশেষ পণ্যটি বিশেষ অর্থ নিয়ে শ্রেণীগত মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, ভোগবাদী সমাজের যথার্থ প্রতিনিধি হিসেবে বার্বিকে নিজস্ব ক্রেতা চরিত্র যা পণ্য ও ক্রেতার মধ্যকার পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে দেয়; আর তুলে ধরব বার্বির ভোগবাদী চরিত্র যা ক্রেতার মানসিকতাকে আচ্ছন্ন করে তোলে। ৪.১ বারবি: মেয়েদের স্ট্যাটাস আইকন বার্বি পুতুল স্ট্যাটাসের প্রতীক, পশ্চিমা ধনী দেশে তো বটেই, তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশেও। বার্বির মালিকানা মেয়েশিশুর জন্য স্রেফ সুন্দর একটি পুতুল নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনার খেলনা নয়। বার্বির মালিকানা শ্রেণীগত গৌরবের বিষয়। বাংলাদেশের বর্তমান মধ্যবিত্ত – উচ্চবিত্ত এমন কোনো মেয়েশিশু পাওয়া মুশকিল, যে বার্বির সঙ্গে পরিচিত নয়। কার কয়টা বার্বি আছে? বার্বির সঙ্গী – সাথী, আসবাব, পোশাক, ইত্যাদি কয়টা করে আছে? বার্বির নতুন সংস্কারণের তথ্য কার সবচেয়ে বেশি আয়ত্বে? এই সব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করে দেয় কোন শিশু কত বেশী স্মার্ট, কত বেশী স্ট্যাটাস তার। কেনা কাটার এই যুগে আমরা কি কিনি তা দিয়েই প্রকাশিত হয় আমরা কে, আমরা কী এবং আমরা কোথা থেকে এসেছি। মার্ক্সের মতো করে পণ্যকে আজ আর কেবল “ব্যবহার মুল্য” ও “বিনিময় মুল্য” দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। পণ্য একটি চিহ্ন, যার রহস্যময় অর্থ নিহিত থাকে এর বিজ্ঞাপনে। আমরা শুধু পণ্য কিনি না কিনি তার অন্তনিহিত অর্থকেও। আর এভাবেই বিজ্ঞাপন শিল্প শিশুদের সামনে একেক রকম খেলনার একেক অর্থ তৈরি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছত সত্তর বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রি শিশুদের পরিচিতি ও স্বপ্ন তৈরি করে দেয়। বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যে শৈশব হচ্ছে সবচেয়ে বড় বেচাকেনার পণ্য।ভোক্তা হিসেবে শিশুরাই এখন সবচেয়ে বড় টার্গেট। বারবি ব্যান্ডের জেনারেল ম্যানেজারের ভাষায় সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন বয়সি মেয়েশিশুদের মনোস্তান্ত্বিক তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে ম্যাটেলের। ম্যাটেল বাচ্চাদের জন্য তৈরি করেছে কিছু গবেষণাগার যেখানে তাদেরকে দ্বিমুখী আয়না দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়।ত্রিশ জনের একটি মনোস্তাত্ত্বিক দল রয়েছে ম্যাটেলের, যারা প্রতি বছর এক লাখ শিশুর পছন্দ অপছন্দের খাবার, টিভি প্রোগ্রাম, কম্পিটার গেমস ইত্যাদি বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেয়। সমাজ যদি মানব মন গঠি করে, যদি শৈশবে বোধ হওয়ার কালে তৈরি হয় মানসিকতা তাহলে ভোগের এই যুগে ঠিক সেই সময়টায় পুঁজিবাদী ভোগবাদের টার্গেট পরিণত হয়। লক্ষ্য হচ্ছে সেই মানব শিশুকে সারাজীবনের জন্য ভোগের অধীন করে রাখা। তার ভোগী মানসিকতা সারাজীবনের জন্য নিশ্চিত করা। ব্র্যান্ড দ্বারা পরিচিতি গঠনের পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাণিজ্যের এই জগতে কথা বলতে শিখার আগেই শিশুরা টার্গেট হয়ে উঠে। যুক্তরাষ্ঠ্রের বাচ্চারা জন্মের আঠারো মাসের মধ্যেই পণ্যের লোগো চিনে যায়। দুই বছরে পা দেওয়ার আগেই লোগো নাম দেখে তার পণ্য কিনতে চায়, তিন থেকে সাড়েতিন বছরে এসে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ব্র্যান্ডের নেম তাদের নিজ পরিচিতি প্রকাশ করে ( তারা স্মার্ট cool, ইত্যাদি) আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের বাচ্চারা এর থেকে দূরে আছে। বাস্তবতা কিন্তু তা নয়। বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার প্রধানতম একটা উপায় হলো, প্রান্তে বসেই পশ্চিমা হয়ে যাওয়া। আসল কথা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দা হয়েও তুমি যদি ইউরোপ আমেরিকার ব্র্যান্ডের পোশাক পরে তাদের মতো উচ্চারণে ইংরেজিতে কথা বলতে পারো, তাদের মতো জীবনযাপণ করতে পারো, তাহলে তুমি অভাগা দেশের নাগরিক নও, বিশ্বনাগরিকের মর্যাদা পেতে পারো। সে জন্য কি প্রয়োজন? সহজ পথ হচ্ছে প্রথম বিশ্বের পণ্যের ও সংস্কৃতির ক্রেতা হয়ে যাওয়া। তাই বারবির অসংখ্য কমদামি নকল পুতুল সৌন্দর্য, ফ্যাশন, ভোগ অ যথাথ নারিত্বের প্রতীক বারবির সমকক্ষ হতে পারে না।অসংখ্য নকল সত্ত্বেও একমাত্র বারবিই মেয়েশিশুর যথাথ শ্রেণীগত ও লিঙ্গীয় পরিচিতির নির্ধারক হয়ে যায়। আর তা নিয়ে সে দখল করে নেয় শিশুর স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের পরিচিতি। ৪.২ বারবিঃ ভোগবাদী সমাজের আইকন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত সামাজিক প্রেক্ষাপতে সমাজ গবেষক থেকে শুরু করে অপরাধ বিজ্ঞানী বা বাজার বিশ্লেষক সকলের মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয় “তিন এজ”। এই প্রেক্ষাপটে বারবির ভূমিকা বেশ দ্বন্দ্বময়। তাই একদম শুরুতে ডোরাকাটা সুইমসুট পরা বারবি কন্যা শিশুর অভিভাবকের দৃষ্টি দেখতে বেশ কিছুটা উগ্র হলেও খুব দ্রুত তাকে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত “ভালো” মেয়ে হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়। টিনএজারদের সদ্যপ্রাপ্ত যৌনমুক্তির রাশ টেনে ধরে বারবির এই পরিবর্তিত ইমেজ মধ্যবিত্ত মূল্যবোধকে একভাবে আবার প্রতিষ্ঠা করে। সে সময়কার জনপ্রিয় কিশোর পত্রিকা।, টিভি শো, বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র মধ্যবিত্ত “ভালো” টিনএজারদের বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণীর বখে যাওয়া “খারাপ” টিনএজার পরিবেশনের মাধ্যমে স্রেনি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে তুলতে কাজ করে গেছে। তাই সেক্স নয়, সেক্সি হয়ে ওঠাই বারবির মুল বিনোদন যা পূরণের স্থান হচ্ছে শপিং সেন্টার। বারবি “ভালো” মেয়ে হয়ে ওঠে, যে শ্রমিক শ্রেণীর বখাটে টিনএজারদের মতো যৌন সম্পর্ক না হয়ে, পুলকিত হয় অসীম কেনাকাটায়।

6

বারবির প্রধান ভালবাসা কেনাকাটা । ফ্যাশন মডেল কি শিক্ষক, অলিম্পিক এথলেট কি ডাক্তার, পেশা যাই হক না কেন, বাসনা বারবির একটিই, টা হল কেনাকাটা। ১৯৯২ সালে ‘টিন টক বারবি’র বাক্যের ঝুড়িতে অন্তর্ভুক্ত থাকে ‘will we ever have clothes?’ I love shoping. Wanna have a pizza party. এবং “Maths class is tough,” । স্নায়ুযুদ্ধের সন্তান বারবি ভোগকে জিবনের সবচেয়ে আনন্দময় বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। বারবি বুদ্ধি করে ভোগবাদের দালালি করে; পুঁজিবাদের জন্য যা প্রয়োজন, তার সব ই করে যায়। ম্যাটেল বহু যত্নে বারবির কেনাকাটার এই প্রীতি জিইয়ে রেখেছে। বারবির কেনাকাটার জন্য গোটা একটি মলের যোগানদারও ম্যাটেল। আর এখন ‘গেইম গার্ল বারবি নামে যেসব কম্পিউটার গেইমস পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বারবি কেনাকাটা করতে থাকে শপিং সেন্টারে। এই খেলায় জয়ী হওয়ার জন্য শুধু কেনাকাটায় পারদর্শিতা প্রয়োজন। গুরত্বপূর্ণ হলো, বারবি পন্য ও ক্রেতার পার্থক্যকে ঝাপসা করে দেয়। কেননা বারবি কেনা মানে কেবল একটি পন্য কেনা নয়, একজন ক্রেতা কেনা, যার নিরন্তর চাহিদা মেটাতে হয় বারবি মালিককে। একটি বারবি কিনে এ সংক্রান্ত কেনাকাটা শেষ হয়ে যায় না। বরং একটি বারবি কেনার মানে হচ্ছে কেনাকাটা ও ভোগের জগতে প্রথম পা ফেলা। যেমন করে একজন ক্রেতা একটি বড় শপিং মল এ প্রথম পা ফেলে ঠিক তেমনি। যুক্তরাষ্ট্রের একজন আদর্শ ভোগী কিশোরীর যা যা থাকতে পারে, তার সবই বারবির জন্য বাজারে আছে। পোশাকের সঙ্গে মানানসই স্যান্ডেল, হাতব্যাগ, শোবার ঘরের আসবাব থেকে শুরু করে বাহন, বারবির যাবতীয় প্রয়োজন পুরন করার ক্ষুদে উপকরন দোকানে প্রস্তুত। প্রয়োজনগুলো তৈরি করে দেয় বিজ্ঞাপন, মেটায় বারবি মালিকের বাবা-মা। শুধু বস্তুগত প্রয়োজন নয়, বারবির মনের চাহিদা মেটানোরও সুব্যবস্থা আছে। ৫০ বছরে বারবিকে সঙ্গ দেয়ার জন্য উৎপাদিত হয়েছে এক ভাই পাচ বনের পরিবার, তিয়াত্তরটি বন্ধু-বান্ধব, দুইজন কাজিন, গুরত্বপূর্ণ বন্ধুর পরিবার ও তাদের বন্ধু-বান্ধব, চল্লিশেরও বেশি পোষা পশুপাখি এবং একমাত্র কেন (বারবি তো ভাল মেয়ে তাই তার ছেলে বন্ধু একটিই! এবং সেই একই ছেলে)। প্রতি বছর বারবি নতুন রুপে, নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হয়, তৈরি হয় তার নতুন নতুন চাহিদা। বারবিচক্রে পরলে ফুরায় না এর মালিকের ক্রয়ের বাসনা। সযত্নে বারতে থাকে ও বেড়ে উঠে শিশুর ভোগী মানসিকতা। বারবির উদ্দেশ্য নাকি ছোট্ট মেয়েদের স্বপ্ন দেখানো। বলা বাহুল্য, এই স্বপ্ন শুদু ভোগী ও ভোগের উপকরন হয়ে উঠার স্বপ্ন, উৎপাদনশীল কিছু হয়ে উঠার নয়। ৫. যত সংস্কৃতি তত বারবি বারবি এজুগের বহুসংস্কৃতিবাদী রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। ১৯৬৭ সালে বর্ণবাদের অভিযোগের সমালচনার মুখ বন্ধ করতে বাজারে ছাড়া হয় বারবির কাল বান্ধবী ‘কালারড ফ্রান্সি’। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বর্ণবাদী দাঙ্গা ঘটে, মারটিন লুথার কিং কে হত্যা করা হয়। ব্যবসা সফল না হওয়ায় পরের বছর আসে আরেক কাল বান্ধবী ‘ক্রিস্টি’। এটাও বাজারে খুব একটা চলে না। ১৯৮০ সালে এসে অবশেষে ম্যাটেল সিদ্ধান্ত নেয় আফ্রিকান স্টাইলের চুলসহ কালো বারবি ছাড়ার, জদিও শক্তিশালী মার্কেটিং এর অভাবে নাকি এটাও বাজারে তেমন চলে নি। আশির দশকে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কালো ও অন্যান্য জাতিসত্তার ফ্যাশন মডেলের জনপ্রিয়তা এবং বহুসংস্কৃতিবাদী হাওা বুঝে শুধু কালো নয়, নানা জাতিসত্তার নারীরূপে বারবিকে জন্ম দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ম্যাটেল। জাতে কালো মধ্যবিত্ত শ্রেণীতেও বারবির বাজার বিস্তৃতি ঘটে। বাজারে ছাড়া হয় স্প্যানিশ বারবি, জ্যামাইকান বারবি, মালয়েশিয়ান বারবি, ভারতের শাড়িপড়া বারবি। উপরন্ত, বারবির বন্ধু বান্ধবের তালিকায় নানা জাতিসত্তার পুতুল আস্তে থাকে। ৩৫ এতে বহুসংস্কৃতিবাদীহিসেবে সুনামও কুড়ানো গেল আবার বারবির বাজার বিস্তৃতিও হল। বহুসংস্কৃতিবাদী বারবি এভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারে। বারবির বিজ্ঞাপনে হরহামেশাই দেখানো হয় বারবি নিয়ে খেলনারত এশিয়ান, হিস্পানিক বা আফ্রিকান আমেরিকান মেয়েশিশুকে। ম্যাটেলের প্রোডাক্ট ম্যানেজার এবং বারবির প্রধান ফ্যাশন ডিজাইনার দুজনেই কৃষ্ণাঙ্গ নারী; উভয়েই কালো মেয়েদের আত্মমর্যাদাশীল করে তোলার উপায় নিয়ে লেখা বই ‘Different and Wonderful: Raising Black Children in a Race-Conscious Society’ এর লেখক পাওয়েল হপসনকে কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কালো মেয়েদের জন্যে কনসালটেন্টের মতে, ম্যাটেল শুদু গায়ের রঙ দিয়ে নয়, নতুন আকারে ভিন্ন নামে কালো বারবির জন্ম দেয়। ম্যাটেল দাবি করে এর শরীরের কাঠামোও অনেকটা আফ্রিকান আমেরিকানদের কাছাকাছি। জদিও শ্বেতাঙ্গ বারবির চেয়ে নিম্নাঙ্গ আর বেশি চিকন করা ছাড়া এর কোন গুনগত পরিবর্তন করা হয় নি। ৩৬ এই ভিন্নতা দিয়ে বারবির বিকৃত জওনবাদি শরীরের কোন হেরফের তো হয়ই না, বরং বেশি বিকৃত করে কালো বারবিকে উপস্থাপন করা হয়। কালো শিশুদের ভোক্তা বানানর লক্ষ্যে বড় জত্ন করে বর্ণ ও জাতিতাত্তিক ভিন্নতাকে পন্য করে তুলে দানব খেলনা কোম্পানি ম্যাটেল। প্রস্ন আসে তাহলে কি এই বৈচিত্রের মধ্য দিয়ে বারবি শ্বেতাঙ্গ সুন্দরীর আদর্শ থেকে সরে আসে? না, মোটেই নয়। কেননা এতসব বৈচিত্রময় বারবির ভিন্নতা

7

কিন্তু শুধু গায়ের রঙ আর পোশাকে, আর কিছুতেই নয়। তুলনামুলকভাবে অপেক্ষাকৃত খাটো পুরব ও দক্ষিন এশিয় মানুষদের প্রতিনিধি বারবিও সেই একই রকম লম্বা, ছিপছিপে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোখের রঙও নীল। সব বারবিই মূল ফ্যাশন মডেল শ্বেতাঙ্গ বারবির পোশাক অদলবদল করতে পারে। সব ভিন্নতা মেয়েলি সৌন্দর্যের একটি ছোট পরিসরের মধ্যেই সীমিত। এরা সবাই পশ্চিমা অধিপতি আদর্শ ও মূল্যবোধ অনুসরণ করা মেয়েলি। বহুসাংস্কৃতিক ভিন্নতা এখানে স্রেফ বাণিজ্যিক লাভের বিষয়, বেচাকেনার পন্য মাত্র। আসলে ভিন্নতার প্রতি সহনশীলতার বাণী নিয়ে সাম্প্রতিককালের যে বহুসংস্কৃতিবাদের আগমন তা কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষনের দাবীদার। কেননা মানব সমাজের ইতিহাসে বহু সংস্কৃতির শান্তিময় সহঅবস্থানের উদাহরন নতুন নয়। পৃথিবীর নানা সমাজের মতো ভারতীয় উপমহাদেশে এবং আমাদের এই বাংলা অঞ্চলেই অতীতে ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন ভাষা নিয়ে সহাবস্থানের নজির আছে। ৩৭ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে নতুনভাবে বহুসংস্কৃতিবাদের উণ্থান উপনিবেশ আর দাসত্বের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের নেটিভ আর কালো মানুষদের অন্তর্ভূক্তির সমসা দূর করার একটা পথ খুলে দেয় বহুসংস্কৃতিবাদ। ভিন্ন কিন্তু সমান এই স্লোগানে কালোদের জন্য, নেটিভদের জন্য আলাদা স্কুল, চার্চসহ আলাদা এলাকা তৈরি হয়ে যায়, যা কিনা প্রকারান্তরে তাদেরকে মূল ধারা থেকে একপাশে সরিয়ে রাখে। চলমান বর্নবাদী সামাজিক আচরনের পাশাপাশি চলে বহুসংস্কৃতিবাদের ভন্ডামি। বহুসংস্কৃতিবাদের বর্তমান ধারনা অসাড়, কেননা এটি পশ্চিমের উত্কৃষ্টতাকে ধারন করে রাখে। এই বহুসংস্কৃতিবাদ এমনভাবে প্রস্তাবিত হয়, যেন এটি শ্বেতাঙ্গ সমাজের তরফ থেকে অন্যদের জন্য একটি উপহার। বর্তমানের এই বহুসাংস্কৃতিক প্রপাগান্ডা ভিন্নতাকে, অন্য জাতিসত্তাকে পন্যে পরিনত করে । ভিন্নতা এখন বর্তমানের শিল্প-সাহিত্যে, যাদুঘরে এবং সর্বোপরি বাজারে গরম বিক্রয়যোগ্য পণ্য। বলাবাহুল্য বারবি এর সবচেয়ে যথার্থ উদাহরণ। ৬. শেষের কথা মেয়ের জন্মদিনে আত্মীয় বন্ধু বান্ধব কী উপহার দিবে জানতে চাইলে বলি, আর যাই হোক বারবি নয়। সবাই জিজ্ঞাসা করে কেন? কি ক্ষতি বারবিতে? ও তো একটা পুতুল মাত্র। কিন্তু না, আমি একলা নই। বিশালবক্ষা বারবির শরীর নিয়ে বাচ্চাকে খেলতে দেখাটা অনেক মা বাবার কাছেই স্বস্তিকর নয়। আর তাই পুজিবাদী ভোগবাদ আর শক্তিশালী লিঙ্গীয় মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় বারবির দক্ষতা সত্ত্বেও বারবি বারে বারেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ৩৮ যেমনভাবে ম্যাটেলের ভালো মেয়ের সীমানা ধরে রাখার শত চেস্টা করেও বারবির নানামুখী ব্যবহার ৩৯ এই সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বারবিকে নিয়ে জনপ্রিয় বিদ্রূপাত্মক গান গাওয়ার সুইস ব্যান্ড একেয়ার এর বিরুদ্ধে মামলা করেও ম্যাটেল হেরে যায়। ৪০ বারবির অতিরিক্ত মেয়েলিপনা শিশুদের কাছেও অসহনীয় হয়ে দাড়ালে শিশুরা একে বাথরুমের কমোডের ভিতরে ফেলে দেয়, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে পোড়ায় বা কুচি কুচি করে কাটে এমন নজিরও আছে। প্রশ্ন করি, এতসব প্রতিরোধ ব্যঙ্খ বিদ্রুপ, বর্জন দিয়ে যৌনবাদী ভোগের আইকন বারবির প্রভাব প্রতিপত্তি কি ঠেকানো যায়? ঠেকানো কি যায় বারবি সাম্রাজ্যের প্রসার? নিজে হয়তো না কিনলাম, আত্মীয় বন্ধুদেরও নিষেধ করলাম, কিন্তু একটু বড় হলে আমার মেয়ে কি বন্ধুদের এই গর্বের ধন দেখে ঈর্ষাতুর হবে না? বারবি স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম কি এভাবে ঠেকানো যায়? বারবি তো পুজিবাদী ভোগবাদ আর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের একটি প্রতীক মাত্র। বারবিকে বর্জন করলেই কি এসব আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা যায়? এতসব প্রশ্নের উত্তরে একবাক্যে শুধু বলতে পারি, পুতুল খেলার রাজনীতিতে বারবির স্বরুপ উন্মোচন ও এর প্রতিরোধ প্রকারান্তরে এক নিরন্তর লড়াই: এ লড়াই পুরুষতন্ত্র, ভোগবাদ, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে।

লেখক: নাসরিন খন্দকার, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে প্রবাসী

   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>