ত্রয়ী বাউলের অকুস্থলিক অভিপ্রায় ও অনুক্তপাঠ

।। ড. রকিবুল হাসান ।।

 

বক্ষ্যমান রচনায় ত্রয়ী, গগন-লালন-রবীন্দ্রনাথ। ওই তিনজনই বস্তুত ভাবুক বাউল। তাঁদের অকুস্থল কুষ্টিয়া অঞ্চল, শিলাইদহ-আড়পাড়া ও ছেঁউরিয়া। রবীন্দ্রনাথ তাই হারামণিতে লেখেন, ‘আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্ব্বদাই দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ রাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর বা বাণী কোন সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে।’ বাউলের মর্মসাধনাটি এবং এর অন্তর্ভূত অভীক্ষা এ বক্তব্যের ভেতরে মেলে। রবীন্দ্রনাথের গুরু লালন সাঁই। সাঁইজী এ বাংলার ধ্রুবপদ। তাঁকে বুঝতে ও চিনতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। লালনের খ্যাতি সম্রাট রূপে। তাঁর সাধনার স্থান কুষ্টিয়া। ছেঁউড়িয়া অঞ্চলে। একসময় এ অঞ্চলই ছিল বাউল সাধনার সবচেয়ে সম্প্রসারিত ও উল্লেখযোগ্য এলাকা। এ সম্প্রদায় কী? তার সাধনাইবা কী? মাটি ও গন্ধের সুর তাল অভীক্ষা। প্রতিজ্ঞাও। লালনের ভাবশিষ্য গগন হরকরা এ অঞ্চলেরই আড়পাড়ার মানুষ। শিলাইদহ ডাকঘরের ডাকহরকরা ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এ এলাকার জমিদার। তাঁর সাহিত্য সাধনার বিশেষ সময় অতিবাহিত হয়েছে এইখানেই। এ অঞ্চলের বাউল সম্প্রদায়ের সান্নিধ্যে এসে তাঁর চিন্তা-চেতনা ও মানসদৃষ্টির বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। যা তাঁর সাহিত্যে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে যখন শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের জমিদারীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তখন তিনি তা সানন্দে গ্রহণ করেন নি। অনেকটা অখুশিচিত্তেই তিনি জমিদারীর দায়িত্ব নিয়ে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। এ অঞ্চলে আসার পর এখানকার প্রকৃতি-নদীনালা-মানুষের সাধারণ ও সহজ জীবনযাপন তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর সাহিত্যসাধনার যা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল এ অঞ্চলের বাউল সম্প্রদায়ের গান। বিশেষ করে লালন সাঁই এবং তাঁর ভাবশিষ্য গগন হরকরা। এঁদের দর্শন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ অঞ্চলে এসে যত সহজেই বাউল সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশতে পেরেছিলেন, ক্ষমতা ও পরিবেশগত কারণে, লালনের ব্যাপারটি অতোটা সুগম ছিল না। বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে লালনকে সাধনা চালাতে হয়েছে, নিজের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে, একই সঙ্গে সামাজিক শক্তিও সৃষ্টি করতে হয়েছিল। পুরো প্রতিকুল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাধনা-পথ চলতে হয়েছে। সে-পথ ধরেই বিশাল বাউল সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। লালন-তৈরী এই বাউল-আবহের প্রাণশীতল সুবাতাসে মুগ্ধ হন রবীন্দও্রনাথ। বাইল গান তাঁকে কী গভীরভাবে চিন্তা-চেতনাতেও আকৃষ্ট করেছিল, তার পরিচয় রয়েছে তাঁর কথাতেই  বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা ইস্কুল-কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কি রকম কাজ করে এসেচে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেচে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ-কবিতা-গানে বাউলের প্রসঙ্গ-ভাব-সুর বহুভাবে ব্যবহার করেছেন। এক গভীর মুগ্ধতায় তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বাউলগানের প্রতি। এ প্রসঙ্গে লালন-গবেষক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর বক্তব্য স্মরণযোগ্য:
বাউলের দর্শন ও সঙ্গীত বাংলার অনেক কৃতী পুরুষকেই আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বাউলদর্শন ও সঙ্গীতের বা’র বাড়িতে বিচরণ করেন নি শুধু, আপনজনের মতো তার অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছেন, আত্মীয়তা স্থাপন করে একাত্ম হয়েছেন অবশেষে। তাঁর প্রাণধর্মের প্রেরণা আর বাউলের প্রেরণার উৎস্য ছিল অভিন্ন। তাই বউলের ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র একটি ঐক্য ও সাযুজ্যবোধ সহজেই আবিষ্কার করা সম্ভব। বাউলগানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানববাদী জীবনচেতনার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। বাউলের গান আর সহজ-সাধনার ভাব একসময়ে রবীন্দ্রমানসে নিবিড়ভাবে মিশে গিয়েছিল।…এইভাবে ক্রমশ তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন ‘রবীন্দ্রবাউলে’। বাউলের গানের সুর, বাণী ও তত্ত্বকথা যেমন তাঁকে আকৃষ্ট করেছে, তেমনি বাউলের বেশভ’ষায়ও তিনি প্রভাবিত হয়েছেন বাউলের আলখাল্লা তাঁর পোশাকের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

শিলাইদহ পোস্টঅফিসের ডাকপিয়ন গগন হরকরা ছিলেন বাউল সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁর গানও রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। গগন হরকরা নিজের বাঁধাগান নিজেই গাইতেন চিঠিবিলি করার সময় তিনি পথে পথে আপনমনে নিজের সুরে গান গেয়ে বেড়াতেন। রবীন্দ্রনাথ একদিন গভীর মনোযোগে শোনেন গগন হরকরার গান

আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে॥
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে, আমি দেশ
বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী,
পেলে মন হত খুশী, দিবা নিশি দেখিতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে,
মরি হায়, হায় রে-
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে,
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে, বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
দেখ না তোরা হৃদয়ে সে, দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগত্ সুখী,
হেরিলে জুড়ায় আঁখি, সামান্যে কি দেখিতে পারে তারে।
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে,
মরি হায়, হায় রে-
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে,
ও সে না জানি কি কুহক জানে, না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষে মন চুরি করে, কটাক্ষে মন চুরি করে।
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে-
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায়, হায় রে-
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে।
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানিস, মানুষের উদ্দিশ যদি
জানিস
কৃপা করি বলে দে রে, আমার সুহৃদ হয়ে বলে দে রে,
ব্যথার ব্যথিত হয়ে বলে দে রে,
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে, আমি দেশ
বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।
আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে।

রবীন্দ্রনাথ ‘মনের মানুষে’র খোঁজে যেন এক নতুনের সন্ধান পেলেন। তিনি গগন হরকরারর গানটিতে এতোটাই মুগ্ধ হন, তিনি লিখলেন, ‘অপ-িতের মুখে এই কথাটিই শুনলুম, তার গেঁয়ো সুরে, সহজ ভাষায়-যাঁকে সকলের চেয়ে জানবার তাকেই সকলের চেয়ে না জানবার বেদনা অন্ধকারে মাকে দেখতে পাচ্ছে না যে শিশু-তারই কান্নার সুর-তার কণ্ঠে বেজে উঠেছে।’ তিনি গগনের গানের কথা ও সুরে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে লেখেন ‘আমার শোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালেঅবাসি।’ যে গানটি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। এমন মধুর সঙ্গীত ও সুর পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। এ কারণেই গগন হরকরা যেমন বিখ্যাত হয়ে ওঠেন, তেমনি তাঁর এ গানটিও বিশেষ মর্যাদা লাভ করেÑ কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্মরূপে বাংলা ও বাঙালির মরমে চিরকালীন স্থান করে নেয়।
‘বাউলের গানগুলি তার উপর সোনার ফসলের বীজ ছড়িয়ে দিল।’ রবীন্দ্র-সাহিত্যকমে সে-সত্যতা পরতে পরতে ছড়ানো।
আমি কে তাই আমি জানলেম না,
আমি আমি করি, কিন্তু আমি আমার ঠিক হইল না।
কড়ায় কড়ায় কড়ি গণি,
চার কড়ায় এক গ-া গণি
কোথা হইতে এলাম আমি, তারে কই গণি-

রবীন্দ্রচিন্তার বিশ্বমুখী অভিযানে এ গানটি গভীরভাবে ভূমিকা রেখেছে। বস্তুত বাউল গানের মধ্য দিয়েই তিনি ‘আপনারে’ খুঁজে বেড়িয়েছেন। আপনমুক্তির পথের সন্ধানে ব্যাপৃত থেকেছেন। আজন্ম সাহিত্য সাধনায় বাউলপ্রভাব থেকে নিজেকে কখনোই আর দূরে সরিয়ে নিতে পারেন নি। বরং বাউলগানে-সুরে একাত্ম হয়ে নিজেকেই ‘রবীন্দ্রবাউলে’ পরিণত করেছেন।
‘লোক মানসের প্রতিমূর্তি’ বাউলের আবির্ভার ঘটেছে তাঁর কাব্য-সঙ্গীত, গল্প-উপন্যাস ও দার্শনিক প্রবন্ধের ‘বিচিত্র ভাবরসের তরঙ্গশীর্ষে’। বাউলকবি তাঁর ধর্ম-দর্শন চিন্তার দিগদর্শনীতে অনেকটাই যেন পথ নির্দেশকের কাজ করেছে। তার সহজ ব্যাখ্যা বাউল কবির ‘মনের মানুষে’র অনুধ্যানে চমৎকার ফুটে ওঠেছে।
তাইতো বাউল তাঁর আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিল। ‘গোরা’ উপন্যাসে তিনি লালনের গানের ব্যবহার করে সে-সত্যকেই যেন ধারণ করেছেন। আলখাল্লা পরা বাউল দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তার কণ্ঠে অন্তর ব্যাকুল করা গান গাইলেন:
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।

রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ উপন্যাসে প্রথম লালনের গান ব্যবহার করেন। ‘গোরা’ তখন ধারাবাহিকভাবে প্রবাসী প্রত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল। সময়কাল ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাস। রবীন্দ্রনাথ এ গানটির আবার উল্লেখ করেছেন ‘গান সম্বন্ধে’ প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত। সেখানে বলেছেন তিনি ‘এই অচিন পাখির যাওয়া-আসার খবর গানের সুর ছাড়া নআর কে দিতে পারে।’ এই একই গানের কথার উল্লেখ করেন তিনি ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনে `The Philosophy of our People’   প্রবন্ধে। অধিবেশনটি হয়েছিল ১৯২৫ সালে। এ কবিতাটির সঙ্গে তিনি ইংরেজ কবি শেলীর কবিতার তুলনাও করেছিলেন। তিনি বলেছেন:

That this unknown is the profoundest reality, though dificult of comprehension.is equally admitted by the english poet as by the nameless village singer of Bengali. inwhose  music vibrate the wing-beats of the unknown bird. only shelley’s utterance is for the cultural few.  While the Baul song is for the tillers of the soil. for the  simple folk of our village households. who are never bored by its  mystic transcendentalism.

রবীন্দ্রনাথ লালনের গানে এতোটাই মুগ্ধ ছিলেন যে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত ‘ছন্দ’ গ্রন্থে লালনের গান অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, “লালনের ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ রবীন্দ্রনাথের ভাবজগতের পরিচালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই গানটি তাঁর জীবনচেতনার প্রেরণা হিসেবে গৃহীত হয়েছে।”
প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকের ধনঞ্জয় বৈরাগী এবং ‘ফা-ুনী’র অন্ধ বাউলও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। রবীন্দ্রনাথ ধনঞ্জয় বৈরাগী ও অন্ধ বাউলের নৃত্যের ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়ে তাদের জীবনের আনন্দের স্বাদ পেতে চেয়েছিলেন। এই বাউলের স্মৃতিই মন্থন করে তিনি অন্যত্র বলেছেন ‘আমার মনে আছে তখন আমার নবীন বয়স-শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল,
আমি কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে…

আবার শিলাইদহের পদ্মার তীরে বাউল সাধকদের একতারা হাতে চলার দৃশ্য অমর হয়ে আছে কবির কবিতায়-
কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মা নদীর ধারে।
পয নদীর নেই কোন দ্বিধা পাকা দেউলের পুরাতন ভিত ভেঙ্গে ফেলতে।
দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে
মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে।

বাউল দর্শনের যে জিনিসটা কবিকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল তা হলো তাদের ‘সমস্ত সামাজিক সংস্কার, বিধিনিষেধ, প্রথা, রীতিনীতির বাইরে একান্ত সহজভাবে রূপের মধ্যে অরূপের, সীমার মধ্যে অসীমের জন্য ব্যাকুলতা।’ রবীন্দ্র দর্শনের মূল কথাও তাই। রবীন্দ্রনাথ পুলকিত হয়েছিলেন বাউল চিন্তার সঙ্গে নিজস্ব দর্শনের ঘনিষ্ঠ মিল দেখে। তিনি আরও পুলকিত বোধ করেছিলেন এই ভেবে জ্ঞানের কঠোর তপস্যার ‘ক্ষুরাস্য ধারা’ ‘নিশিত্যয়া’ পথে চলে উপনিষদের কবি যে সত্যে পৌঁছেছেন-বাউল কবিরা হৃদয়ের পথে অনায়াসে সেখানে গিয়ে পৌঁছেন। বাংলাদেশের লোকায়ত ধর্মদর্শন এই বাউল দর্শন। লোক জীবনসমুত্থিত বলেই রবীন্দ্রনাথ একে ‘জনগণের দর্শন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই লোকায়ত দর্শনের কাছে তাঁর ঋণ তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। বাউলের ‘মনের মানুষ’ই যে পরবর্তীকালে কবির কাব্যে রূপান্তরিত হয়ে জীবন দেবতারূপে দেখা দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ধর্ম-দর্শন ব্যাখ্যায় অন্যত্রও বাউল গানের কাছে তাঁর ঋণের কথা স্বীকার করেছেন। বাংলা লোকসাহিত্যের সম্পদের মধ্যে এই বাউলগানই রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-ভাবনায় যেমন বেশী প্রভাব বিস্তার করেছে, তেমনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মেও বাউলগানের প্রভাবই বেশী কার্যকরী হয়েছে। রবীন্দ্র সাহিত্যের মধ্যে তাঁর রচিত সঙ্গীতেই এ প্রভাব বেশি। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন:
আমার অনেক গানে আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রূপরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে।
রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা ও গানে বাউল সঙ্গীত বিশেষ করে লালন সাঁইয়ের গান, ভাব ও সুর স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। কোথাও আবার তিনি বাউল সুর ভিন্ন সুরের মিশ্রণে অনেকটাই পরিবর্তিন করেছেন। প্রভাবটি সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কয়েকটি উদ্ধৃতি দিলেই ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট হয়:

ক. আমার ঘরের চাবি পরের হাতে।
কেমনে খুলিয়ে সে ধন দেখব চক্ষেতে।। (লালন)

ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে
ও বন্ধু আমার!
না পেয়ে তোমার দেখা, একা একা দিন যে আমার কাটে না রে।।
( রবীন্দ্রনাথ)

খ. আমার এ ঘরখানায় কে বিরাজ করে।
আমি জনম-ভর একদিন দেখলাম না রে।।
নড়ে চড়ে ঈশান কোণে
দেখতে পাইনে এই নয়নে
হাতের কাছে যার ভবের হাটবাজার
আমি ধরতে গেলে হাতে পাই নে তারে।। ( লালন)

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে দেখতে আমি পাই নি
তোমায় দেখতে আমি পাই নি।
বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি।। (রবীন্দ্রনাথ)

গ. যার আপন খবর আপনার হয় না।
আপনারে আপনি চিনতে পারলে
যাবে সেই অচিনারে চেনা।। (লালন)

আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।
এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।। (রবীন্দ্রনাথ)

ঘ. আমার মনের মানুষেরি সনে মিলন হবে কতদিনে। (লালন)
আমি তারেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে আমার মনে । (রবীন্দ্রনাথ)

ঙ. মরি হায়, হায় রে-
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে, (গগন হরকরা)

মরি হায়, হায় রে
ও মা অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি। (রবীন্দ্রনাথ)

বাউল সুরে রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান হচ্ছে ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’, ‘আমার সোনার বাংলা-আমি তোমায় ভালবাসি’, ‘মেঘের কোলে কোলে’, ‘মালা হাতে খসে পড়া’, ‘আমি যখন ছিলাম অন্ধ’, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’, ‘ডাকব না ডাকব না’, ‘হে আকাশ-বিহারী নীরদ-বাহন জল’, ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’, ‘আমি তখন ছিলেন মগণ’, ‘আমার প্রাণের সুধা আছে’, ‘আমার নাই বা হল পারে যাওয়া’ ইত্যাদি।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে আধ্যাত্মিক আত্মজিজ্ঞাসায় যে গভীর জীবনরহস্য উপস্থিত, তার মূলে বাউলগান-ভাবনা-সুর। তাঁর জীবন-দর্শনেও বাউল-প্রভাব ব্যাপক। লালন সে-ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিরাজ করেছে অবধারিতভাবেই। কিন্তু সামগ্রিক বাউলভাবনা-দর্শনই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। কুষ্টিয়া অঞ্চলে যে বিস্তৃত বাউল সম্প্রদায় ছিল, তাঁরা তার অন্তরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। লালন, গগন ছাড়াও গোঁসাই রামপাল, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী সহ লালনের শিষ্য-সম্প্রদায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা-সাক্ষাৎ, আলাপচারিতা ছিল। তাঁদের কাছে তিনি গানও শুনতেন।
বাউলের ভাব-দর্শন ও জীবনদর্শনকে লালন একটি পূর্ণতর রূপ দিয়েছিলেন, সে-পথেই গগন হরকরাদের পথ-হাঁটা, আর রবীন্দ্রনাথ সেটিকে জীবনবোধে গ্রহষ করে তাঁর সাহিত্যকর্মে স্বতঃস্ফ’র্তভাবে অভিনব এক ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অসামান্য শক্তিমান এক শিল্পী-পুরুষ। যে কারণে তিনি বাউলগানের সুর ও ভাবকে ভেঙে নিজের মতো করে অসাধারণ শিল্পকর্ম তৈরি করতে পেরেছিলেন। যে শিল্পকর্মের গভীরে প্রোথিত লালন-গগনেরা।

 

(ড. রকিবুল হাসান, চেয়ারম্যান, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।)

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত