রবীন্দ্রনাথ নীরব কেন? (পর্ব-১)

দেশ-বিদেশের নানা ব্যাপার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মুখর । সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ছোট ইংরেজের অন্যায়-অবিচার, সাম্প্রদায়িকতা, পল্লির উন্নয়ন এসব নিয়ে আমরা তাঁর নানা ভাষণ, প্রবন্ধের সঙ্গে পরিচিত । কিন্তু কবি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারে নীরব । এই নীরবতা পীড়াদায়ক হয় যখন দেখতে পাই তাঁর পরিবারে অবিচার ঘটছে, ঘটছে বঞ্চনার ও উপেক্ষার ঘটনা । যিনি বিশ্বমানবতার সাধক, বঞ্চনা বা অবিচার বা উপেক্ষার ব্যাপারে আমরা তাঁর মুখরতা আশা করব, সেটাই সঙ্গত । তাবে সেই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ রক্ত-মাংসের মানুষ । দেবতা নন । মানবিক দুর্বলতা থাকাটাও তাই অসঙ্গত নয়এসব দুর্বলতা তাই তাঁর মহত্বকে ক্ষুণ্ণ করে না । তিনি নিজেই তো বলেছেন পাপে-পুণ্য-পতনে-উথ্থানে মানুষ হতে দেবার কথা ।

উপেক্ষিত পিতামহ

ঠাকুরবাড়ির বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ২ লক্ষ টাকার মতো । জমিদারি থেকে । এই নিশ্চিন্ত আয় ছিল বলেই ‘অপ্রয়োজনের আনন্দ’ অর্থাৎ সংস্কৃতিচর্চা  ও ধর্মচর্চায় কালাতিপাত করতে পেরেছেন উত্তরসূরীরা । দেবেন্দ্রনাথ ধর্মসাধনা করে যেতে পেরেছেন, ঠাকুরবাড়ির সন্তানরা মনোনিবেশ করতে পেরেছেন সংস্কৃতিচর্চায় । ক্ষুধার রাজ্য তাঁদের পৃথিবী গদ্যময় হলে এটা সম্ভব হত না কিছুতেই । মাঝে মাঝে আমি ভাবি, নিশ্চিন্ত আয় না থাকলে রবীন্দ্রনাথ কি রবীন্দ্রনাথ হতে পারতেন ? চাকরি-বাকরির জন্য অভিভাবকরা তাঁকে স্কুল পলাতক হতে দিতেন না । এমন কি কোন গণক যদি বলতেন, ভবিষ্যতে রবি মস্ত লোক হবেন, নোবেল প্রাইজ পাবেন, তাহলেও সে কথাকে শিরোধার্য করে রবিকে ‘অপ্রয়োজনের আনন্দ’ চর্চা করতে বাধা দিতেন ।

ঠাকুরবাড়ির এই নিশ্চিন্ত আয় অর্থাৎ নিশ্চিন্ত জীবন যিনি দিয়েছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর । অথচ সেই মানুষটি গোটা পরিবারের ধারাবাহিক উপেক্ষা লাভ করেছেন । এমন কি তাঁর ভুবনবিখ্যাত পৌত্রও আশ্চর্যভাবে নীরব তাঁর সম্বন্ধে । তাঁর বিশাল রচনাবলিতে ‘দ্বারকানাথ’ শব্দটা কতবার আছে ? আদৌ আছে কি ? তাঁর জীবনস্মৃতিতে এক-দুবার ‘পিতামহ’ শব্দ এসেছে, ‘দ্বারকানাথ’ আসে নিপিতামহের মৃত্যুর প্রায় কুড়ি বছর পরে রবির জন্ম । হয়তো পিতা বা পরিবারের অন্য কারোর কাছে তিনি পিতামহ সম্বন্ধে নিতান্ত বিরূপ কথা শুনেছেন । সেটাই বিশ্বাস করেছেন । বালক বা তরুণ বয়েসে সে বিশ্বাস অস্বাভাবিক নয় । কিন্তু পরিণত বয়সেও কি সেই বিশ্বাস বহাল ছিল ? পরিণত বয়েসেও তিনি ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ করে গেছেন ? কিন্তু কেন ? কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করা তো তাঁর স্বভাব নয় । তিনি যে বুদ্ধির দ্বার খুলে রাখতে বলেন, জড় যান্ত্রিকতার মতো তিনি যে অন্ধ বিশ্বাসকে বিসর্জন দিতে বলেন !

পিতামহকে কেন উপেক্ষা করেছিলেন, কেন নীরব ছিলেন তাঁর সম্বন্ধে, তা আজ স্পষ্ট করে জানার উপায় নেই । তাই আমরা অনুমান করতে পারি শুধু । সাজিয়ে নেওয়া যাক অনুমানগুলি :

১] ভোগবিলাসী আচরণ, বিশৃঙ্খল ফুর্তি, সাহেবদের সঙ্গে খানাপিনা,

২] বেলগাছিয়া বাগানবাড়িতে সুরাপান, নৃত্যগীত,

৩] শার্লটি হার্ভে, জেমিমা পাইন প্রমুখ বিদেশি নারীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা, লন্ডনে ডাচেসদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা,

৪] আফিম ব্যবসায়ের সঙ্গে সংযুক্তি ।

সে যুগে যাঁর এসব দোষ ছিল না সেই বিদ্যাসাগর অবশ্য  দ্বারকানাথের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগকে পরশ্রীকাতরদের রটনা বলেছিলেন । যদি স্বীকারও করে নেওয়া হয় এসব দোষ, তা্হলেও প্রশ্ন থেকে যায় । রবীন্দ্রনাথ কি তাঁর পিতামহের কোন গুণ দেখতে পান নি ? সেই সব বিরাট বিরাট গুণ কি এসব দোষকে চাপা দিতে পারে না ? কৃষ্ণ কৃপালনি, ব্লে্য়ার বি ক্লিং, অভিজিৎ রায় প্রমুখেরা তো দ্বারকানাথকে ‘pioneering  entrepreneur of India’ বলেছেন । বলেছেন তিনি এদেশের প্রথম সফল শিল্পপতিঅধ্যাত্মভাবুক তিনি ছিলেন না, ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামান নি । কিন্তু সমাজের কাঠামো যে অর্থনীতি সেটাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান ।

বেনিয়ান থেকে ব্যাংকার হয়েছিলেন তিনি । তার সঙ্গে শুরু করেন বীমা কোম্পানি । তৈরি হল ইংরেজের সঙ্গে যৌথ মালিকানার ব্যবসা- ‘কার, টেগোর আ্যন্ড কোম্পানি’ । ইংরেজের সঙ্গে ব্যবসা করেছেন কিন্তু বশংবদ ছিলেন না, বরং তাঁকে প্রতিপক্ষ ভাবত ইংরেজরা ; ‘রাজা’ উপাধি তাই লাভ করতে পারেন নি । পণ্য রপ্তানির জন্য গড়ে তুলেছিলেন জাহাজ কোম্পানি । বাগিচা শিল্প প্রযুক্তিকে স্বাগত জানান তিনি । কিনে নিয়েছিলেন রানিগঞ্জের কয়লা খনি ।

কিন্তু শুধু বাণিজ্য নয়, সামাজিক ক্রিয়াকর্মেও তাঁর বিরাট অবদান জনহিতকর কাজে তাঁর দান তো প্রবাদপ্রতিম । ১৮৩৮ সালে ‘সমাচার দর্পণ’ জানান যে দ্বারকানাথের মতো দাতা জন্মান নি এদেশে । মায়ের শ্রাদ্ধ ঘটা করে না করে তার থেকে টাকা বাঁচিয়ে তিনি সে টাকা দিয়েছেন ডিস্ট্রিক্ট চ্যারিটেবল সোসাইটিকে । হিন্দু কলেজ আর মেডিকেল কলেজ স্থাপনে বিরাট তাঁর ভূমিকা । তাঁরই উৎসাহে ১৮৩৬ সালের ২৮ অক্টোবর  মেডিকেল কলেজে প্রথম শব-ব্যবচ্ছেদ করেন মধুসূদন গুপ্ত ।

বাণিজ্যমনস্ক, বাস্তববাদী এই মানুষটি পেশাদার সংগীতশিল্পীদের পৃষ্টপোষকতা করেছেন, ভারতীয় রাগ সংগীতের চর্চা করেছেন, মঞ্চাভিনয়ে আর্থিক সাহায্য দান করেছেন, ‘চৌরঙ্গী থিয়েটার’কে বাঁচানোর জন্য কিনে নিয়েছেন ৩০ হাজার টাকায়, ইতালীয় অপেরার পৃষ্টপোষক হয়ে পাশ্চাত্য অপেরার তালিম নিয়েছেন । লন্ডনের টেমস নদীতে তাঁর যে নৌকো থাকত, সেখানে আসতেন চার্লস ডিকেন্স, মেকপিস থ্যাকারে । জর্জ টমসনের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা হত তাঁর ।

এক জীবনে অনেক কাজ করেছেন দ্বারকানাথ ।

অথচ ঠাকুরবাড়িতে ব্রাত্য হয়ে রইলেন তিনিতাঁর বিরুদ্ধে ভাটপাড়ার পণ্ডিতদের আনিয়ে যে বিদ্রোহ করেছিলেন তাঁর রক্ষণশীল স্ত্রী দিগম্বরী, সেটাই শুধু সত্য হয়ে রইল ? রবীন্দ্রনাথ কি একবারও ভেবেছেন যদি তাঁর পিতামহ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন ও স্বেচ্ছাচারী হতেন তাহলে কি স্ত্রীর বিধান মেনে বৈঠকখানা ঘরে পড়ে থাকতেন ?

সত্যেন্দ্রনাথ বিলেতে গিয়ে  দ্বারকানাথের সমাধি দর্শন করেছিলেন । তার জীর্ণ মলিন দশা তাঁকে ব্যথিত করেছিল । সমাধিটিকে নতুন করে তৈরি করার প্রস্তাব দেবেন্দ্রনাথকে দেওয়া হয়েছিল । মঞ্জুর হয় নি সে প্রস্তাব অথচ ব্রিস্টলের কাছে স্টেপলটনে রামমোহনের স্মৃতিতে দ্বারকানাথই সমাধিসৌধ করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, শ্রাবণী বসুর বিবরণ থেকে আমরা জানতে পেরেছি ১৮৪৩ সালে স্টেপলটন  সমাধি থেকে রামমোহনের দেহ তুলে এনে দ্বারকানাথ ব্রিস্টলের আর্নস ভেল সমাধিক্ষেত্রে পুনরায় সমাধিস্থ করেন । উইলিয়াম প্রিন্সেপের তৈরি করা সেই সমাধির সব খরচ দেন দ্বারকানাথ ।অথচ তাঁর নিজের জীর্ণ সমাধির সংস্কারের কোন মাথাব্যথা ছিল না তাঁর উত্তরাধিকারীদের ।উত্তর লন্ডনের কেনসাল গ্রিনের এই সমাধিতে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন কি না জানা যায় না । অথচ বহুবার লন্ডন গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ।

তারপরে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কাহিনি ।

১৯০৫ সালে কার-টেগোর কোম্পানির সমস্ত নথিপত্র অগ্নিদগ্ধ করা হল । ব্লেয়ার বি ক্লিংএর ভাষায় ‘‘Rabindranath’s    Bonfire’ . ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘ ইহার ( কার-টেগোর) সম্বন্ধীয় কাগজপত্র পূজ্যপাদ রবীন্দ্রনাথের কতৃত্বে এবং তাঁহার আদেশে দগ্ধীভূত হওয়ায় এই কারবার কত বিস্তৃত ছিল এবং কিরূপে পরিচালিত হইত তাহার বিবরণ উদ্ধার করিবার কোন আশা নাই ।’

পিতামহকে মুছে ফেলার চেষ্টায় ইতিহাসকে মুছে ফেললেন রবীন্দ্রনাথ ।

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে চরিত্রের দিক থাকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পিতা নয়, পিতামহের মিলই বেশি । একথা বলেছেন কৃষ্ণ কৃপালনী , ‘ Rabindranath  was not so orthodox a Brahmo as to despise all who, like Dwarakanath, believed in orthodox forms of Hindu worship ;  his novel GORA and many other writings bear ample testimony to his intellectual liberality ; he was not an ascetic and   did not disdain or look down upon worldly mindedness . In fact , he believed , despite his personal inhibitions, in a full-blooded   love of life….’ আক্ষেপ করে কৃষ্ণ কৃপালনী বলেছেন রবীন্দ্রনাথ যদি তাঁর পিতামহের জীবন ও কর্ম, তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজকর্ম সযত্নে পর্যালোচনা করতেন তাহলে তিনি তাঁকে বুঝতে পারতেন ও শ্রদ্ধা করতেন । ত্রিপুরার কর্নেল মহিমকে রবীন্দ্রনাথ ভুল বুঝেছিলেন , পরে সে ভুল স্বীকার করেছিলেনকিন্তু নিজের পিতামহ সম্বন্ধে তঁর বিচারের পথ নিজেই কেন রুদ্ধ করে দিলেন ?

[ লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক]

 

প্রচ্ছদ: বিধান সাহা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত