রহস্যময় ইমামবাড়া


আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্থান গুলির বেশিরভাগই কোন না কোন রহস্যে আবৃত। যার ব্যাখ্যা হয়তো বিজ্ঞানের সাহায্যে মেলে না। যুক্তিবাদী মানুষ অনেক যুক্তি দিয়েও এর হিসেব মেলাতে পারেনা। অথবা বলা যেতে পারে ইতিহাসের সঙ্গে কোথাও যেন রহস্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আমরা আজকে এমনই একটি গল্প শুনবো যেখানে ইতিহাস আর রহস্য একসূত্রে বাঁধা পড়েছে।এ গল্প হুগলির ইমামবাড়ার। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার অন্যতম প্রসিদ্ধ একটি স্থান হল ইমামবাড়া। হাজী মহাম্মদ মহসিন এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৮৬১ সালে ইমামবাড়াকে নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল প্রায় কুড়ি বছর এবং খরচ হয়েছিল পৌনে তিন লক্ষ টাকা।


কেরামত উল্লাহ খান ছিলেন এর স্থপতি। ইমামবাড়া কথার অর্থ ইমামদের থাকার জায়গা। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে শব্দটিকে বিস্তৃত অর্থ এ হল ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইমামবাড়া কে অনেকে ইমামবাড়ী ও বলে থাকেন। মূলত শিয়াপন্থী মুসলিমরা মহরম উৎসব পালনের জন্য এটি নির্মাণ করেছিল। বিখ্যাত দানবীর হাজী মহাম্মদ মহসিন এর স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করা হয়।গোটা বাড়িটা দোতলা। এখানে একটি ত্রিভুজাকৃতি অঙ্গন রয়েছে। তবে ইমামবাড়ার সবথেকে আকর্ষনীয় স্থান হল 85 মিটার উঁচু দুটি স্তম্ভ। এর একটি পুরুষ ও একটি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। দুটি স্তম্ভ 152 টি করে সিঁড়ি আছে, এবং সবচেয়ে উপরে একটি ঘড়ি আছে। ঘড়ির যন্ত্রপাতিও ঘন্টা আছে নিচের তলায়। ইমামবাড়ার অঙ্গনে একটি সূর্য ঘড়ি আছে। এছাড়া এখানে অনেকগুলি ঝর্না এবং কৃত্রিম জলাশয় রয়েছে। তবে বর্তমানে ঝর্ণা গুলি থেকে জল পড়ে না এবং জলাশয় এর জল ও সবুজ হয়ে গেছে।


এত গেল ইমামবাড়ার বর্ণনা। কিন্তু আজ আমরা ইমামবাড়ার বর্ণনা করার জন্য আলোচনায় বসিনি।আমাদের আজকের মূল আলোচ্য বিষয় হল ইমামবাড়ার একটি রহস্য কাহিনী। ইমামবাড়া স্তম্ভে নারী পুরুষ উভয়ের প্রবেশাধিকার ছিল। মিনারে ওঠার জন্য প্রবেশমূল্য হিসেবে দিতে হতো দু টাকা। কিন্তু আশির দশকে এমন এক ঘটনা ঘটে যে কারণে স্তম্ভ গুলিতে মহিলাদের প্রবেশ সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি। সে সময় ইমামবাড়ার মূল প্রবেশপথের কোন টিকিট ধার্য করা হতো না। শুধুমাত্র মিনারে ওঠার জন্যই টিকিট কাটতে হত। প্রত্যেকদিন বহু মানুষ এসে মিনারে উঠতেন। হুগলী-চুঁচুড়া নিবাসী একটি মেয়ে আশির দশকের প্রথম দিকে একবার টিকিট কেটে মিনারে ওঠে। এতদুর পর্যন্ত ঘটনাটি কারুর কাছে কোন অস্বাভাবিক লাগেনি ।কিন্তু মেয়েটির মিনারে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট চিৎকার শোনা যায় এবং সকলে ছুটে যায় মিনারে নিচে রাস্তার কাছে ,যেখানে মেয়েটি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল। শোনা যায় মেয়েটি মিনারের ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল।


এই ঘটনার পর মিনারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য সমস্ত পর্যটকদের বঞ্চিত করা কি বেশি দিন চলে ?আর ইমামবাড়ার প্রধান আয়ের উৎস ছিল মিনারে ওঠার টিকিটের পয়সা। তাই বেশ কিছু সময় কাটার পর আবার মিনার টিকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে, কিন্তু আবারও ঘটে যায় আরেকটি ঘটনা। এবারও ঘটনার কেন্দ্রে ছিল একটি মেয়ে। সেই মেয়েটিও আগের মেয়েটির মতন মিনারের ওপর থেকে ঝাঁপ দেয়। পরপর দুটি মেয়ে এমন ভাবে মিনার থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে মারা যাবার ঘটনার ফলে বেশ শোরগোল পড়ে যায়। ইমামবাড়ার অনেক পুরনো সদস্যের মতে সেই সময় তারা অনেক কিছু দেখতে পেতেন যা বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে ঠিক মেলে না। রাতের অন্ধকারে সিঁড়িতে কারুর পায়ের আনাগোনার আওয়াজ পাওয়া যেত। মিনারের উপর থেকে নাকি মেয়েদের কান্নার সুর শোনা যেত। যাইহোক এই ঘটনার পর মিনারের দরজা সকলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ইমামবাড়ার মূল ফটকে টিকিট ধার্য করা হয়। এমনি ভাবে বেশ কিছু বছর চলার পর অবশেষে নব্বইয়ের দশকে অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আবার মিনার এর দরজা জনসাধারণের জন্য খোলা হয় কিন্তু এবারে মিনারে মহিলাদের আর প্রবেশাধিকার থাকলো না। নব্বইয়ের দশক থেকে আজ অব্দি ইমামবাড়ার মিনারে মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কাকতালীয় না সম্পর্কযুক্ত সেই নিয়ে তর্ক বিতর্কে গিয়ে কোন লাভ নেই তবে আদৌ ইমামবাড়ার মিনারের দরজা কোনদিনও মহিলাদের জন্য খুলবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।


ইমামবাড়া আসতে হলে হাওড়া স্টেশন থেকে হুগলি স্টেশনে আসতে হবে। সেখান থেকে রিক্সাযোগে ইমামবাড়া আসা যায় ।অথবা শিয়ালদা স্টেশন থেকে নৈহাটি স্টেশনে এসে গঙ্গা পার হয়ে হুগলি ঘাটে এসে সেখান থেকেও হাঁটাপথে পৌঁছানো যায় ইমামবাড়া। আজ বহু পর্যটক কে আকর্ষণ করে এই ইমামবাড়া। একটা সময় ইমামবাড়ার মিনারের ঘন্টা গোটা ব্যান্ডেল শহরকে মাতিয়ে রাখতো। বর্তমানে ইমামবাড়ায় আগের সেই জৌলুস না থাকলেও পর্যটকদের ভিড় কিন্তু কমেনি। এখনো এখানে প্রতিবছর মহরম এর সময় বিশাল উৎসব পালিত হয় বর্ণাঢ্য মিছিল বের হয় এবং প্রচুর ভক্তের সমাগম ঘটে। তবে মিনারের অমীমাংসিত রহস্য আজও সকলের কাছে রহস্যই রয়ে গেছে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত