গীতরঙ্গ: রাজকাহিনী – রাজস্থানের লোকগান । সংগ্রামী লাহিড়ী
সেই যে মেঘের মত তিনটি চুড়ো নিয়ে ত্রিকূট পাহাড়, যার একদিকে ঘন অরণ্য, আর একদিকে শোলাঙ্কি রাজপুত রাজার বাড়ি, সেখানেই বেড়ে উঠেছিল বাবা–মা–হারা, নির্বাসিত রাজপুত রাজকুমার বাপ্পাদিত্য। সেদিন ঝুলন উৎসব, রাজপুতানার মানুষের বড় আনন্দের দিন। সবাই গেল রাজবাড়িতে আনন্দ করতে, শুধু বাপ্পা গেল না। উদাস মনে আকাশে জমা মেঘের ঘনঘটার দিকে চেয়ে বাঁশিতে সুর তুলল। শোলাঙ্কি রাজকুমারীর কানে গেল সে সুর। চাঁপাগাছে বাঁধা হল দোলনা। রাখালরাজা বাপ্পা আর রাজকুমারী বসলেন সে ঝুলনায়। সখিরা তাদের ঘিরে গান গাইতে লাগল – ‘আজ কী আনন্দ, আজ কী আনন্দ, ঝুলত ঝুলনে শ্যামর চন্দ!’ সহজিয়া সুরে, ঘুরে ঘুরে গান আর নাচ। প্রাণের সে কোন গভীর থেকে উঠে আসা আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে পড়ল ঝুলনের পূর্ণ চাঁদের আলোয়।
এই দৃশ্যকল্প আর গান বাঙালির বুকের ভেতরে সোনার কৌটোয় তোলা আছে। সৌজন্যে অবন ঠাকুর, যিনি ‘ছবি লিখতেন‘। ‘লিখে’ গেলেন রাজপুতানার লোকসংগীতের এক অপূর্ব মায়াজড়ানো ছবি।
ভারতের পশ্চিমে লোকসংস্কৃতির একটি সুনির্দিষ্ট আকার আছে। তার মধ্যেও রাজপুতানা, অর্থাৎ আজকের রাজস্থান অনন্য। হিমালয়ের প্রশ্রয়পুষ্ট মৌসুমী বৃষ্টির শ্যামলিমা থেকে সে বঞ্চিত। সোনার রঙের বালিতে ঢাকা তার মাটি। ধু ধু মরুপ্রান্তরে একটুকু জলের জন্যে, জীবনের জন্যে সংগ্রাম। লড়তে গেলে হাতিয়ার তো চাই? প্রকৃতির সঙ্গে যখন মানুষকে যুদ্ধে নামতে হয়, তখন গানের থেকে বড় অস্ত্র আর কীই বা হতে পারে? রাজস্থানের লোকসংগীতের ধারাটি অতি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বিভিন্ন রূপে তা ফুটে উঠেছে।
মরুভূমিতে তিন শহর – উদয়পুর, যোধপুর আর জয়পুর। পাশেই পাকিস্তানের সীমানায় লাগোয়া সিন্ধ প্রদেশ। এ অঞ্চলে মূলত শাস্ত্রীয় সংগীতের সার–জল পেয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে লোকগানের লতাটি। তার প্রমাণ পাই অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পীর তুলিতে। তম্বুরা কোলে রাজস্থানী নারীর স্বর্গীয় সুষমায়। রাজস্থানের জয়পুর–আত্রাউলি ঘরানা অতি প্রাচীন। কিংবদন্তী মীরাবাই এই ঘরানারই প্রতীক। হাতের তম্বুরাটি নিয়ে পথে পথে ঘুরে গান বাঁধতেন রাজার রানি, কৃষ্ণপ্রেমে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে দীনহীন হয়ে নেমে এসেছিলেন মরুভূমির পথে। লোকে পাগল হত তাঁর গানে। প্রাণের দেবতার জন্যে সব ছেড়েছিলেন, প্রিয়জন, সংসার – সব। স্বামী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিষের পেয়ালা। মীরা কিন্তু তাঁর জীবনের সাধনাকে ছাড়েননি, লেগেই থেকেছেন। গানই ছিল তাঁর পূজার নৈবেদ্য, সুরেই তাঁর প্রিয় দেবতার পায়ে অঞ্জলি। “মীরা দাসী, তৃণসম পালত, চরণকমল রস মাতি।“
মীরার ভজনও রাজস্থানের লোকসংগীতের একটি অতি সমৃদ্ধ ধারা, যে ধারা মূলত রাগভিত্তিক, বহু শতক পেরিয়েও যার চর্চা অব্যাহত।
রাজরানি মীরার থেকে এবার একটু চোখ ফেলা যাক সাধারণ মেয়েদের দিকে। পরনে রংবেরঙের ঘাগরা, মাথায় কলসি, একের পর এক থাক দিয়ে সাজানো। হেঁটে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে তবে মিলবে একটু জলের দেখা। সেই জল কলসিতে ভরে অদ্ভুত কৌশলে মাথায় বয়ে বাড়ি ফেরা। সারা রাস্তা সঙ্গী হবে গান। মুখে মুখে বাঁধা গান, দৈনন্দিন সাধারণ কথা সহজিয়া সুরে হবে অনন্য।
রাজস্থানের লোকসংগীতের এই ধারাটির নাম পানিহারী। কুয়োর জলের সঙ্গে তার অচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তাছাড়াও আছে ঘরসংসারের কথা – পুদিনা পাতা দিয়ে রান্না করলে কত সুস্বাদু হয় বা শুখা মাটিতে জিরে মশলাটির চাষ করা কত কঠিন। আর আছে নির্ভীক রাজপুতের বীরগাথা। গানের অন্যতম বিষয়।
রাজপুত বাঁচে তার ঐতিহ্যে, তার জাতি ও দেশের গৌরবে। রাজকীয় প্রাসাদ আর কেল্লার বাইরে সোনালি বালিয়াড়ি যেখানে দিগন্তে গিয়ে মিশেছে, সেখানে যেন আবছা দেখা যায় একটুকরো সবুজ! বিভ্রম না সত্যি বোঝা যায় না। হয়তো মরীচিকা। তবু সেই সুদূরের পানে চলতে চলতে রাজপুতানার মানুষ তার প্রিয়তমকে ডাক দিয়ে গেয়ে ওঠে, ‘কেসরিয়া বলমা, আও পধার হমারে দেস‘। প্রিয়, এস আমার দেশে। ‘মান্ড‘ রাগে বাঁধা এ গানটি যেন শাশ্বত এক প্রেমিকের চিরকালীন আহ্বান। মরুভূমির বালিতে ছড়ানো কত মধুর প্রেমের উপাখ্যান। ঢোলা আর মারু এমনই এক প্রেমিক জুটি। ঢোলা তার কেসরিয়া অর্থাৎ গেরুয়া বসনধারী প্রেমিককে বড় ভালোবেসে ডাকে তার নিজের দেশে। গেরুয়া রং রাজপুতের ঐতিহ্যের প্রতীক। এ গানও রাজস্থানের ঐতিহ্যের সমার্থক, এমনই তার অভিঘাত। কিংবদন্তী গানটি একটু গেয়ে শোনালাম।
সত্যজিৎ রায়ের কিংবদন্তী ছবি ‘সোনার কেল্লা‘র কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? বলে দিতে হবে না যে এ ছবির মুখ্য চরিত্র রাজস্থান। ছবির ফাঁকে ফাঁকে এসেছে রাজস্থানের লোকগান। মরু অঞ্চলের সুরটি বাঁধা হয়েছে লোকশিল্পীদের গানে, দোতারার মত তারের যন্ত্রের ব্যবহারে। গানগুলি গেয়েছিলেন মাঙ্গানিয়ার ও লাঙ্গা সম্প্রদায়ের গায়করা। রাজস্থানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসেন এই সম্প্রদায়। বংশপরম্পরায় গান বাঁধেন। সোনার কেল্লা ছবিতে গাইবার সময় গায়করা বোঝেনইনি, কতদূর ছড়িয়ে পড়তে চলেছে তাঁদের নিজস্ব গান। এখন অবশ্য পৃথিবীর বহু জায়গায় সমাদৃত এঁদের গানের ধারা। ব্রিটেনের রয়াল অ্যালবার্ট হলে বেশ কয়েকবার গান শুনিয়েছেন এঁরা।
আশির দশকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয় হয় আরেকটি রাজস্থানী লোকগান। সঙ্গে সঙ্গে তার গায়িকাও খ্যাতির চূড়ায় ওঠেন। পরিচালক সুভাষ ঘাই তাঁর ‘হিরো‘ ছবিতে ব্যবহার করেন রেশমার গলায় ‘লম্বি জুদাই‘। বিচ্ছেদের গান। দয়িতের থেকে দূরে থাকার যন্ত্রনায় আকুল প্রশ্ন – আর কতদিন এই বিরহ? বিচ্ছিন্ন জীবন? বর্ষা এল, প্রিয় এল না। প্রেম ছিল মাত্র কয়েকদিনের। বিচ্ছেদ যেন চিরকালীন।
খুব কৌশলে এ গানে ব্যবহার করা হয়েছে দুই গান্ধার। কোমল গান্ধারের আলতো ছোঁয়া যেন বিরহিনীর দীর্ঘশ্বাস হয়ে হাহাকার করে ফেরে।
গায়িকা রেশমা লোকগানের পরিচিত কন্ঠ। জন্মেছিলেন রাজস্থানের এক ভবঘুরে বানজারা পরিবারে। স্বাধীনতার পর সে পরিবার পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে বসবাস করতে থাকেন। ছোট্ট রেশমা গান গেয়ে বেড়াতেন দরগায় দরগায়। সেখানেই তিনি এক সংগীতরসিকের চোখে পড়েন। রেডিও ও নানা আসরের নিয়মিত শিল্পী রেশমার গলায় একাধিক বিখ্যাত লোকগান আছে।
‘লম্বি জুদাই‘ গানটি চলচ্চিত্রে প্রকাশ পায় উনিশশো তিরাশি সালে। বাকিটা ইতিহাস। বড় প্রিয় এই গানটি গাইলাম নিজের গলায়।
চলচ্চিত্রের কথাই যখন হচ্ছে, আরেকটি ছবির কথা উল্লেখ করতেই হবে, যা রাজস্থানের লোকাচারকে আশ্রয় করেই দর্শকের মনন ছুঁয়েছে।
মরুভূমির ভিতরে একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। গ্রামের জমিদার মৃত্যুর মুখে। কোনো স্বজন নেই তার, মরলে কাঁদবে না কেউ। সে কি হতে দেওয়া যায়? ডাক পড়ল গ্রামের নামকরা ‘রুদালি‘র। যার কাজই হল কান্না, শোকের কান্না। তফাৎ শুধু এই যে এ কান্না টাকায় বিকোয়। ভিখনি নামের নিচুজাতের মেয়েটির এটাই জীবিকা। মূল্যের বিনিময়ে শোকের গান গেয়ে কাঁদে সে। গ্রামের অনাথ মেয়ে শনিচরীর সঙ্গে থাকতে শুরু করল ভিখনি। শনিচরীর বাবা নেই, মা তাকে ছেড়ে গেছে। শতকষ্টেও তার চোখে জল আসে না, ধু ধু মরুভূমির মতোই শুকনো তার ভেতরটা। চলচ্চিত্রের শেষে সত্যিকারের শোকে সে বড় কান্না কাঁদে। রুদালি ভিখনি মারা গেছে। বলে গেছে সে–ই শনিচরীর মা।
রাজস্থানের রুদালি সম্প্রদায়কে নিয়ে লেখা মহাশ্বেতা দেবীর অসামান্য গল্পটি বড় যত্নে চলচ্চিত্রের পর্দায় ধরলেন কল্পনা লাজমি।
গুলজারের কথায়, ভূপেন হাজারিকার সুরে একগুচ্ছ গান এ ছবির প্রাণ। রাজস্থানের লোকগান নিয়ে সুরকারের বহুদিনের গবেষণার ফসল। সংগীতের সুরেই যেন দৃশ্যকল্প নির্মাণ হয়ে যায়। মরুভূমিতে বহু বছর পর বৃষ্টি নামে। সে উল্লাস ধরা থাকে রাজস্থানী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে। চার তার–ওলা তারযন্ত্র, উটের গলায় ঝোলা ছোট ছোট ঘন্টা, ভারতীয় ম্যান্ডোলিন, তম্বুরার আওয়াজ মিলেমিশে যায়। রুখুশুখু মাটি বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে, তৃষ্ণার্তের মত শুষে নেয় প্রতিটি জলকণা। দর্শকের শ্রবণও ভিজতে থাকে সংগীতের সুধায়, পর্দার ছবির সঙ্গে মিশে গিয়ে তা হয়ে ওঠে সার্থক চলচ্চিত্র।

ইঞ্জিনিয়ার, পেশায় কনসালট্যান্ট। শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুদিনের চর্চা। অল ইন্ডিয়া রেডিওর ‘এ’ গ্রেড শিল্পী। লেখালেখির অভ্যাসও ছোট্টবেলা থেকে, বাবা-মা’র উৎসাহে। বর্তমানে কর্মসূত্রে নিউ জার্সির পারসিপেনি শহরে বসবাস। তবে বিদেশে বসেও সাহিত্যচর্চা চলে জোর কদমে। নিউ জার্সি থেকে প্রকাশিত ‘অভিব্যক্তি’ ও ‘অবসর’ পত্রিকার সম্পাদক।
‘ও কলকাতা’ ই-ম্যাগাজিনে ধারাবাহিক ‘সুরের গুরু’ প্রকাশিত হচ্ছে রাগসংগীতের শিল্পীদের নিয়ে। এছাড়া ‘বাংলালাইভ ডট কম’, ‘বাতায়ন’, ‘পরবাস’, ‘উদ্ভাস’, ‘প্রবাসবন্ধু’, টেকটাচটক’, ‘গুরুচণ্ডা৯’, ‘ইত্যাদি ই-ম্যাগাজিনের নিয়মিত লেখিকা।