প্রতিবিম্বের দিনগুলি

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com(এক)

“সমতল দর্পণে প্রতিফলনের দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্যগুলি লিখ।”

নব্বই সালে পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভৌত বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে খ বিভাগের আট দাগের প্রশ্ন ছিল এটি।সেই বছর ত্রিপুরা মাধ্যমিক পরীক্ষার ভৌত বিজ্ঞান প্রশ্নপত্রে সাত দাগের প্রশ্নে এই প্রশ্নটিই ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বহু পরীক্ষার্থী যেমন ঘাড় গুঁজে কমন আসা এই প্রশ্নটির উত্তর লিখেছিল ঠিক তেমনই ত্রিপুরার বহু পরীক্ষার্থী সাফল্যের সঙ্গে শুধু লিখে নয় তার সাথে চিত্র এঁকে দেখিয়েছিল সমতল দর্পণে কিভাবে প্রতিবিম্ব গঠিত হয়।দুই রাজ্যের হাজার হাজার পরীক্ষার্থী লিখেছিল সমতল দর্পণে সৃষ্ট প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ —

(ক) প্রতিবিম্বটি অসদ্‌ প্রতিবিম্ব হবে।

(খ) প্রতিবিম্বটি বস্তুর সমশীর্ষ হবে।

(গ) প্রতিবিম্বের আকার বস্তুর আকারের সমান হবে।

(ঘ) দর্পণ থেকে বস্তুর দূরত্ব = দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব হবে।

(ঙ) প্রতিবিম্বের পার্শ্বীয় পরিবর্তন হবে।

        আমরা যারা কমলনগর স্কুল থেকে পরীক্ষায় বসেছিলাম তারা সবাই পাঁচ নম্বর পয়েন্ট লিখতে লিখতে ভেবেছি অজিতের কথা। ‘অজিত বরণ চন্দ্র দেববর্মা’— আমরা যাকে ডাকতাম ‘এবিসিডি’ বলে।সে নিজেও লিখেছিল পাঁচ নম্বর পয়েন্টটি — প্রতিবিম্বের পার্শ্বীয় পরিবর্তন হবে। অর্থাৎ আমরা যদি আয়নার সামনে ডান হাত তুলি, আয়নায় আমদের প্রতিবিম্ব তার বাম হাত তুলবে।

        আমরা সবাই সেদিন এবিসিডি-র কথা ভাবতে ভাবতে উত্তর লিখেছিলাম। কারণ এবিসিডি আয়নায় পার্শ্বীয় পরিবর্তন দেখতে পেতো না। ব্যাপারটা পদার্থবিদ্যা আর জীববিদ্যার নিয়ম অনুসারে একেবারে অসম্ভব এক ঘটনা। অথচ আমরা বিশ্বাস করতাম এবিসিডি সত্যিই আয়নায় পার্শ্বীয় পরিবর্তন দেখতে পায় না। যেদিন ক্লাসে আমাদের ব্যাচ প্রথম এই বিষয়ে পাঠ নিচ্ছিল সেদিন হঠাৎ এবিসিডি উঠে দাঁড়িয়ে স্যারকে বলেছিল সে ডান হাত তুললে আয়নায় তার প্রতিবিম্ব ডান হাতই তোলে। স্বাভাবিকভাবেই স্যার পাত্তা দেননি কথাটাকে। ক্লাস শেষে আমরা কিন্তু ঘিরে ধরেছিলাম এবিসিডি-কে। ছেলেটা সাতে পাঁচে থাকত না, একটু চুপ স্বভাবের ছিল। মোটামুটি একটা রেজাল্ট করত। ক্লাসেও খুব একটা সাড়া শব্দ করত না। সে হঠাৎ এইরকম একটা প্রসঙ্গ তোলায় আমরা কথাটাকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে পারিনি।  মুশকিল হল এই ব্যাপারটার সত্যি মিথ্যা পরীক্ষা করার কোনো পদ্ধতি আমরা বার করতে পারিনি। একটা পরীক্ষাই আমাদের মাথা থেকে বেরিয়েছিল, আয়না দেখে তাকে কিছু পড়তে বলা। সে গড় গড় করে পড়ে ফেলেছিল। কিন্তু অভ্যেস করলে অনেকেই আয়না দেখে পড়তে পারে।

আসলে পুরো ঘটনাটাই এবিসিডি-র কথার ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিল। কোনো কোনো উৎসাহী ব্যাপারটা জগতের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে আগ্রহভরে আবার স্যারের কাছে গিয়েছিল দল বেঁধে। বিজ্ঞান স্যার এমনিতেই রাগী মানুষ ছিলেন। সেদিন সেই দলটিকে বেজায় ঠেঙিয়ে ছিলেন আর তার পর এবিসিডিকে ডেকে উত্তম-মধ্যম দিয়েছিলেন। ফলে ব্যাপারটা আর আমাদের প্রচার করার সাহস হয়নি। আর সেই সময় এইসব নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়েও চারপাশের চাপা টেনশন অনেক বেশি ছিল। উপজাতি আর বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ আর দাঙ্গা। আমরা মাধ্যমিক দিলাম আর সেই বছরই হাওয়ায় ভাসতে থাকা এন এল এফ টি, ত্রিপুরা ন্যাশন্যাল ভলিন্টিয়ার্স, রঞ্জিত দেববর্মা আর আরো অনেক নামের মধ্যে একটা নাম যোগ হল ‘অল ত্রিপুরা ট্রাইবাল ফোর্স’।

(দুই)

‘দারিদ্র’ এই শব্দটা অনেকের কাছেই একটা শব্দ আর বই-কাগজে দেখা কিছু ছবি বা টিভিতে দেখা কিছু ভিডিও ক্লিপিংস। আমাদের কাছে সেটা ছিল ভয়াবহ বাস্তব। সত্যি বলতে, আজকে যে এই গল্প আপনাদের শোনাতে বসেছি তাতে আমারই অবাক লাগছে যে কীভাবে এই অবধি জীবনটা পাড়ি দিতে পারলাম! আমরা যারা স্কুলে পড়তাম তাদের পরিবারগুলো তবু মোটামুটি একটা খেয়েপড়ার জায়গায় ছিল। কাছেপিঠে পাহাড় জঙ্গলের মাঝে মাঝে বহু ‘দারিদ্রের উপত্যকা’ ছিল। সেখানে যুবকেরা অনেকেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে হাতে বন্দুক তুলে নিত যা ছিল রোজগারের পথ।

অনেকেই হারিয়ে যেত পড়াশুনার রাস্তা থেকে। আমাদের এবিসিডি-ও হারিয়ে গেল। আমরা যখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বসছি তখন অল ত্রিপুরা ট্রাইবাল ফোর্সের শক্তি অনেকটা বেড়ে গেছে। তার নতুননাম ‘অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স’। পরীক্ষার পরে কীভাবে একটা কথা ছড়িয়ে পড়ল আমাদের মধ্যে—আমাদের ব্যাচের আরো কয়েকটি ছেলের সঙ্গে এবিসিডি-ও নাকি সেই ফোর্সে যোগ দিয়েছে। আমরা ভাবতে পারছিলাম না বন্দুক হাতে তাদের কেমন দেখতে হবে। এবিসিডিকে কেমন দেখতে হবে! ও কি সত্যিই গুলি চালাবে! কাউকে মারবে!এই সময় থেকেই আমদের প্রজন্মেও একটা বাঙালি-উপজাতি ভাবনা খেলা করতে শুরু করে। স্কুলের ছাত্র এই পরিচয় ছাপিয়ে চারপাশের রক্তাক্ত হিংসা আর প্রতিহিংসা আমদের উপজাতি বা বাঙালি পরিচয়ের দিকে ক্রমশ ঠেলে দিচ্ছিল। ক্রমশ ছোট ছোট গুলতানিতে ভেঙে যাচ্ছিল আমাদের ক্লাস। চাপা গাল দিতে শুরু করল অনেকেই। উচ্চমাধ্যমিকের পর আমি আগরতলা চলে এসেছিলাম কলেজে পড়ার জন্য। কলেজে পড়ার সময় শুনলাম আমাদের এবিসিডি নাকি বর্ডার পারে শ্রীমঙ্গলেএ টি টি এফের ক্যাম্পে ট্রেনিং নিচ্ছে।

কলেজ শেষ করেই টাকা রোজগারে লেগে পড়লাম। বছর দু’য়েকের মধ্যে বাবা-মা ভাইকে নিয়ে চলে আসলাম আগরতলা। জীবন-জীবিকার জমিতে প্রতি ইঞ্চি লড়াই করে এগোতে এগোতে অনেক কিছুই ফিকে হতে থাকে। সবার আগে ফিকে হতে থাকে স্মৃতি। সেই ফিকে স্মৃতিতে অনেকের মতোই এবিসিডি-র হারিয়ে যেতে বাধা ছিল না কিন্তু সে হারিয়ে গেল না। আয়নার সামনা সামনি হলেই ওর মুখটা মনে পড়ত। জীবনে কতকিছুই তো আমরা বিশ্বাস করে থাকি। আমিও মনে মনে বিশ্বাস করতাম এবিসিডি সত্যিই আয়নায় আমাদের থেকে একেবারে অন্যরকম দেখতে পেত। মাঝে মাঝে ভাবতাম ডান কাঁধে বন্দুক নিয়ে যদি ও আয়নার সামনে দাঁড়ায় তাহলে প্রতিবিম্বের কোন কাঁধে বন্দুক দেখবে? ডান কাঁধেই দেখবে নিশ্চয়ই। ওর মনে কি টাইগার ফোর্সের যুক্তিগুলো সোজা আর সঠিক মনে হয়েছিল? নাকি ও পেটের জন্য ঢুকে গেছিল ওদের দলে? অথবা অনুপ্রবেশকারী আর দখলদারী হিসাবেই ও আমাদের দেখতে শিখেছিল, মানে বাঙালিদের?কিন্তু যাদের দিকে ও গুলি চালাচ্ছে প্রত্যন্ত উপত্যকায় তারা হতদরিদ্র। প্রতিদিন তাদের বেঁচে থাকার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয় ঠিক উপজাতিদেরই মতো। উপজাতি বা বাঙালি পরিচয়টুকু সরিয়ে দিলে প্রতি দিনের লড়াইয়ে তাদের আলাদা করা যাবে না। এক বঞ্চিত আরেক বঞ্চিতকে ঘৃণা করছে, হত্যা করছে। পুরো দুনিয়াতেই এই অবস্থায় বন্দুকেরা আসরে নেমে পড়ে। এখানেও তাই হয়েছে। আমরা আর কী করতে পারি নেতাদের গাল দেওয়া ছাড়া আর নেতারাও বা কী করতে পারে এই জটিল পরিস্থিতিতে নিজের আর দলের ফায়দা তোলা ছাড়া। আমার মনে হতে থাকল প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঘৃণার, অভিশাপের উত্তরাধীকার বয়ে নিয়ে চলবে। কে যে কখন বন্দুক তুলে নেবে সেটা শুধু সময়ের ব্যাপার।

(তিন)

২০০৩ সালটা আমার মনে আছে।আমার বিয়ের কথা চলছিল আর সেই সময়েই কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে রিইউনিয়নের দিনদেখেছিলাম ঋত্বিক রোশনের ‘কোয়ি মিল গেয়া’। গোটা ভারতের সঙ্গে আমরাও, মানে ঘোষ, বোস, সরকার, ব্যানার্জী, মুখার্জী, দেববর্মা, চাকমা, ডার্লং, ত্রিপুরা, জামাতিয়া, কুকি, লুসাই, নোয়াতিয়া, ওরাং, লেপচাযখন হলে‘হাইলা হাইলা’ গানে খিচুড়ি হয়ে গিয়ে নাচছি, সিটি বাজাচ্ছি তখন আমদের সেই কমলনগরে অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছিল। সিনেমা দেখে ফেরার পরেই বাবা ডেকে বলেছিল কমলনগরে আভাষকাকু বড় বিপদে পরে কিছু টাকা চেয়ে পাঠিয়েছে। ঘটনাচক্রে তেরো তারিখ আমি রওনা দিলাম। বাবা বারবার বলে দিয়েছিল টাকা দিয়ে পরের দিনই ফিরে আসতে। কারণ পনেরোই অগাস্ট কোথায় কী হয় ঠিক নেই। স্বাধীনতার দিনটায় আমরা সিঁটিয়ে থাকি কোথায় যে কী বোমা ফাটবে বা গুলি চলবে। কিন্তু চোদ্দ তারিখ আমি ফিরতে পারিনি।

আগরতলা-খোয়াই রাস্তাটা যেখানে ভীষণভাবে বেঁকে গেছে সেই বাঁকে নেমে রওনা দিয়েছিলাম। পাহাড়ের মাঝে, জঙ্গলের মাঝে একটা জনপদ। অধিকাংশ বাড়িই মাটির। ইলেকট্রিসিটির কোনো গল্প নেই। এক বছর আগেই এসেছিলাম তখন এতটা ফাঁকা দেখিনি। আভাষকাকু বলেছিলেন হামলার আতঙ্কে অনেক পরিবারই কল্যাণপুরে চলে গেছে। তিনিও চলে যাবেন। তাই টাকার দরকার। থমথমে আবহাওয়া। অবস্থা এখানে এত ভয়ংকর তা না আসলে বুঝতে পারতাম না। আমি কাকুকে বললাম পরেরদিনই কল্যাণপুরে চলুন কোথাও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমারও অনেক চেনা আছে। বৌ-বাচ্চাদের নিয়ে কাকুর বুক ভয়ে শুকিয়ে গেছিল। আভাষকাকুর দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলেটা ছোট। আমার কথায় মনে বল পেলেন। কিন্তু গোছ-গাছ করতে একদিন সময় চাইলেন। তাই ঠিক হল পনেরো-র ভোরেই সবাই মিলে কল্যাণপুর চলে যাবো। চোদ্দ তারিখ সারাদিন গোছগাছ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম আমরা। বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকার চারিদিক।

সেদিন প্রথমেই আমি ঘড়ি দেখেছিলাম — ন’টা চল্লিশ। চারিদিক থেকে প্রচন্ড জোরে দরজার ওপর আঘাতের পর আঘাতের শব্দ ভেসে আসছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে অন্ধকার কেটে গেল। গ্রামের বাইরের দিকের ঘরগুলো জ্বলছে দাউদাউ করে আর গুলির শব্দ, চিৎকার। কী যে হয়েছিল সেদিন তা আমার কাছেও একটা ঘোর লাগা ছবির মতো। আগুনের আলো আর অন্ধকারের কানামাছি চলছিল। গা ঢাকা দিয়ে চোখের সামনে দেখলাম হারাধনজ্যেঠুর দুই ছেলেকে আর জামাইকে কেটে ফেলল ওরা। হারাধনজ্যেঠুর পাঁচ-পাঁচটা নাতিকেও মেরে দিল। রক্ত আর রক্ত। আতঙ্কে আমরা ছুটে পালাবার চেষ্টা করছিলাম জঙ্গলের দিকে। ব্যর্থ চেষ্টা, গ্রামটাকে ওরা পুরো ঘিরে ফেলেছে। সেটা যখন বুঝলাম তখন আভাষকাকু গুলি খেয়ে পড়ে গেছেন। জঙ্গলের সামনেই একজন এদিকে পাহারা দিচ্ছিল।

পরের গুলির ঝাঁকটা একসাথে আভাষকাকুর ছোটো মেয়ে আর ছোটো ছেলেটাকে ফুঁড়ে বেরিরে গেল। ছেলেটা দিদিকে জড়িয়ে ধরেছিল ভয়ে। আমি বড় মেয়ের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিলাম সে আমার বুকে এসে পড়ল তাকে জাপটে আমি অবশ তাকিয়ে ছিলাম উদ্যত বন্দুকটার দিকে আর তখনি সেই আগুন-আলোয় আমি নির্ভুল চিনলাম এবিসিডি-কে। সেও আমায় চিনেছিল তাই পরের গুলির ঝাঁকটা আসল না। শোভা, আভাষকাকুর বড় মেয়ে গুলির শব্দ বা মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল আমার বুক আঁকড়ে সেও অবাক হয়ে ফিরে তাকালো। আমি মাথার ওপর দু’হাত তুললাম, শোভাকেও তাই করতে বললাম। না বললেই পারতাম। শোভা আমার পাশ থেকে সরতেই বন্দুকের নলটা ঝলসে উঠল। শোভা দু’হাত তোলা অবস্থাতেই ছিটকে পড়েছিল মাটির ওপর। আমি ছিটকে যাওয়া শোভার দিকে তাকিয়েই ছিলাম। সম্বিৎ ফিরল পেটে লাথি খেয়ে। আমিও ছিটকে পড়লাম শোভার পাশে। এবিসিডি এগিয়ে এসে বন্দুকের গরম নলটা আমার গালে চেপে ধরতে চামড়া পোড়ার যন্ত্রণায় আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। এবিসিডি একঝটকায় আমাকে তুলে পেছনে একটা লাথি মারল। আমি জঙ্গলের দিকে ছিটকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে শুনলাম সে বলছে, ‘মাখরা, ভাগিজা বেঙ্গলি। গুলামের বাচ্চা ভাগ এখান থেইকা’। এখনো মনে পড়ে কী তীব্র ঘৃণা ছিল তার উচ্চারণে।

(চার)

বছর বারো আগে একবার গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম ওখানে একটা শহিদবেদি হয়েছে। ওই দিনটাতে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের পরিবারের লোকেরা দিনটি পালন করেন। উপস্থিত থাকে গোটা গ্রাম। সেদিন জঙ্গলে আম আর কাঁঠালের গাছগুলোয় ধাক্কা খেতে খেতে ছুটেছিলাম জ্বলতে থাকা গ্রাম থেকে দূরে আরো দূরে। রাতে জঙ্গল থেকে বেরোনোর সাহস ছিল না। সকালে আমাদের স্কুলে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। ওটাকেই আবার আশ্রয় হিসাবে পেতে চেয়েছিলাম। গিয়ে দেখেছিলাম আতঙ্কিত লোকজনে ভরে গেছে স্কুল। স্কুলে জাতীয় পতাকা তোলার সাহস কারো ছিল না সেদিন।

২০০৯ সালে খোয়াইয়ের কোর্টে এই ঘটনার ট্রায়াল শুরু হয়। অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছিল ঘটনাটার। না আমি যাইনি, সাক্ষ্য দিইনি। আমার মতো অনেকেই যায়নি যার ফলে বিচারে তিনজন মাত্র অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পেয়েছিল আর প্রমাণের অভাবে ধরপাকড় করা বাকি চোদ্দজন ছাড় পেয়ে গেছিল। এই চোদ্দজনের মধ্যে এবিসিডি যে থাকবেনা তাআমি নিশ্চিত জানতাম।

ট্রায়ালের বহু আগে, ২০০৬ সালের মার্চে আমি তাকে দেখি আমবাসা গন্ডাছড়া রোডের বাসে হেল্পার সেজে কাজ করতে। সে আমায় দেখেনি সেদিন। অন্য বাসে আমি ছিলাম।যত আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়েই দুনিয়ায় আন্দোলন হোক, টাকা সবসময় সর্বত্র নিজের জায়গা করে নেয়। আমি টাকা জোগাড় আর সোর্স জোগাড়ের কাজে লেগে গেলাম।

এপ্রিল মাসের এক দিন পাহাড়ের জঙ্গল থেকে ওই রাস্তায় গুলি চলে। একটা বাসের ড্রাইভার মারা যায়। আরো কয়েকজন আহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশকে একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল।বাসের হেল্পারের গায়ে গুলি লাগলেও সে জঙ্গলে গা ঢাকা দেয় আর বাসের একজন যাত্রীও তার পেছনে ছোটে। পুলিশ খোঁজ করে তাদের পায় নি। পরে তারা ধরে নেয় এরা হয় মরে কোনো খাদে পড়ে আছে। আর সেই সন্ত্রাসের আবহাওয়ায় এই ঘটনা ছিল ‘ইনসিগনিফিকেন্ট’।

এখন আমি পুরোদস্তুর সংসারী। এইসব দিনগুলোর কথা মাঝে মাঝে ভাবি। আমি ভাবি, এবিসিডি যদি আমাদের মতোই আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখতে পেতো তাহলে কী হতো? সেকি অন্য রকম হতো?নিজের প্রতিবিম্বকে আমরা কী রকম দেখব তার ওপর কি আমাদের জীবন সত্যিই নির্ভর করে?

সেদিন বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে অনেক্ষন থেকেই এবিসিডি বাসের ভেতরে বসানো একটা আয়নায় আমার প্রতিচ্ছবি দেখছিলো। ছদ্মবেশ থাকা সত্ত্বেও একসময় সে আমায় চিনতে পারে। আয়নায় আমার চোখ নির্ভুল পড়ে নিতে তার ভুল হয়নি। সে জরিপ করে চলেছিল আমি কী করতে চলেছি কিন্তু সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি জঙ্গল থেকে গুলি আসবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ড্রাইভারটা যে মারা যাবে আর গুলি খেয়েও খালাসি যে বেঁচে যাবে এবংবাস থেকে লাফ মারবে তা আমি ভাবিনি।  আমি বেকুবের মতন তাকে তাড়া করেছিলাম কিন্তু কোনো প্রয়োজন ছিল না। আন্দোলন সফল না হলেও হতে পারে কিন্তু টাকা সবসময়ই সফল হয়।খিদের মতোই টাকা এবং অস্ত্র বাঙালি বা উপজাতি বিচার করে না।

পরের বছর আমার বিয়ে হয়।বিয়ের পর বৌকে কমলনগরে আমাদের থাকার জায়গা দেখাতে নিয়ে যাই।আমার দাদু সব খুইয়ে বর্ডার পার করে প্রাণের চিহ্ন খিদেটুকু শুধু নিয়ে বসত পেতে ছিল এখানে। এই সময়ে ওই শহিদ বেদিটা দেখি।আর সবার মতো আমি, আমার বৌ ফুল দিই শহিদ বেদিতে। আমার বৌয়ের নাম ইন্দু।ইন্দু জানেনা আগে আমার একটা বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল। বাবা-মা-আমি ওকে জানতে দিইনি।আর যারা জানত তাদের ইন্দু নিজের হাতে ফুল দিয়ে এসেছিল সেইদিন।

আমার সংসার সুখের সংসার। শুধু আমি আর আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারিনা। অসুবিধা বিশেষ হয়না।আন্দাজে চুল আঁচড়াতে পারি। আর দাঁড়িটা সেলুনে কামিয়ে নিই, চোখ বন্ধ করে রাখি।কোনো গাড়ি চালাতে পারিনা কারণ গাড়ির সাইড ভিউ মিররের দিকে আমি তাকাতে পারিনা। আয়নার ওপার থেকে কেউ আমার দিকে সবসময় চেয়ে থাকে। আয়নায় ভুল করে চোখ পড়লেই আমি তাকে দেখতে পাই আর আমার গুলিয়ে যায় আয়নার মধ্যে থেকে আমি তাকে দেখছি না আয়নার বাইরে থেকে তাকে দেখছি। আমার গুলিয়ে যায় রক্ত কার হাতে লেগে আছে। কখনো কখনো আমি আমার অভিযোগের তর্জনী তুলে দেখার চেষ্টা করি একই হাতের তর্জনী আমার দিকে উঁচিয়ে আছে কিনা।

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত