রাখাল ডাঙা

একটানা পথ হাঁটতে হাঁটতে অতি ক্লান্ত হয়ে পড়ল রথিনাথ। উপায়-অন্ত না পেয়ে ধপ করে বসে পড়ল একটি গাছের নিচে। বসন্তের আদুল বাতাস তার অনুভূতির বাইরে। ফাল্গুনের লু-হাওয়া তাকে ঘর্মাক্ত করে দিচ্ছে।
বহুদিন আগে একবার রথিনাথ এ-পথে এসেছিল। তখন ছিল রাস্তাবিহীন মেঠো পথ। মাঠের পারের সামনের গ্রামটি ছিল তার গন্তব্য। তবে মাঠের আকার ছিল খুব বড়। মেঠো পথটির দু’প্রান্তের দুরত্ব ছিল মাইল দুই-এর মতো। পাছের গ্রামটি ছেড়ে মেঠো পথে বের হওয়ার সময় মসজিদের আযান ভেসে ভেসে মুখর করছিল সন্ধ্যার আকাশ। গ্রামের বউ-ঝিরা সন্ধ্যা প্রদীপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠাকুর ঘরের সামনে। ওদের সুকণ্ঠি জোড়ের সাথে সুর মিলিয়ে পাখিরা কলরব করছিল সারা দিনের ক্লান্তি শেষে।
ঠিক এখানে এসে রথিনাথ চোখ বাঁধা অবস্থায় সেই ছোট্ট মেয়ে পুঁটিকে পেয়েছিল। কানামাছি খেলতে খেলতে অন্য ছেলেমেয়েরা দুষ্টুমি করে পালিয়েছে। পুঁটি বসে কাঁদছে। চেষ্টা করে চোখের বাঁধন খুলতে পারেনি। তার গরুগুলো ওদিক থেকে এসে ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সদ্য জন্মা বাছুরটি হাঁম্বা হাঁম্বা ডেকে ডেকে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। আবার পিছিয়ে পুঁটির কাছে যাচ্ছে। রথিনাথকে দেখে বাছুরটি তার কাছে এল। সে তার গায়ে হাত বুলায়ে বলেছিল যা সোনা, তুই যার ঘরের মানিক তার ঘরে ফিরে যা। সে তো মানুষ নয় যে তার কথা শুনবে। গায়ে মাথায় হাত বুলালে আদরে সব ভুলে গিয়ে সে দাঁড়িয়েই রইল। ফল সুবিধের নয় ভেবে রথিনাথ হাত গুটিয়ে নিয়ে যা বলে তাড়া করল। অবলা প্রাণীটির তখন মনিব বালিকা পুঁটি আর তার মা গাভীর কথা মনে হলো। পিছনে ফিরে চলল সেই উদ্দেশ্যে। অগত্যা রথিনাথও তার পিছে পিছে যায়। বড় সমস্যাও বটে। রাতের বেলা বাছুরটি আবার মাঠের দিকে কেন? কিছুটা এগোলেই একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পেল রথিনাথ। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। বাছুরটিও সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। রথিনাথ তার চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে সব শুনল। পুঁটি কানতে কানতে সব বলল। রথিনাথকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমারে বাড়ি দিয়াসো।
পুঁটির দুরবস্থার কথা ভেবে রথিনাথ আবার পেছনে ফিরল। পুঁটির হাত ধরে গরুগুলোকে তাড়া করে চলল গ্রামের দিকে। একটু এগোতেই রথিনাথ শুনতে পেল পুঁটি বলে কে যেন ডাকছে। একটি গরু ‘হাম্বা’ স্বরে ডাক দিল। পুঁটিও সাড়া দিল ‘এই যে বাবা’। পুঁটির বাবা কিছুটা দৌড়ে এসে দেখলেন ওর হাত ধরে রথিনাথ। সব শুনে তিনি রথিনাথকে ছাড়তে নারাজ। কিন্তু যেতে তাকে হবেই। পাছে অন্ধকারে একাকী, পথের কথা ভেবে তার কাছ থেকে কিছু পাঠখড়ি নিয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে সেই আলোয় মাঠ পাড়ি দিয়েছিল রথিনাথ।
এই রাস্তা, দুই পাশের গাছপালা, ঘর-বাড়ি কিছুই ছিল না সেদিন। ছিল না সারা মাঠে ফসলের বাড়াবাড়ি। কোথাও কোথাও খেসারী, কলাই, মটরশুটি, কোথাও বা অনাবাদী পতিত জমি। রথিনাথ যেখানে বসেছে, এখানে ছিল একটি হিজল গাছ। আর এর আশ পাশ দিয়ে সারা দিন গরু চরে বেড়াতো। গরুগুলো ছেড়ে দিয়ে রাখাল ছেলেরা এখানে আড্ডা জমাতো। লাঠি খেলা, ডাঙ্গুলি, বউ-চি ইত্যাদি খেলার আয়োজন হত। রাখালের আড্ডা হত বলে জায়গাটার নাম হয়েছিল রাখাল ডাঙা।
রথিনাথের আর কিছু করার নেই। ব্যস্ততার দরুণ দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। ক্ষিদে পিয়াস ভুলে এখন সে শুধু দেখছে জনবৃদ্ধির বর্তমান পরিণতি। ভাবছে ভবিষ্যতের কথা। গ্রাম ছেড়ে মেঠো পথে নেমে পথটাকে অচেনা লাগছে। মাঠ আর মাঠ নেই। এখানে গড়ে উঠেছে জনবসতি। তাও আবার এই জায়গাটার নামে গ্রামের নাম হয়েছে রাখাল ডাঙা। রাস্তার পাশে নিঃশেষ প্রায় হিজল গাছটির গোড়া এখানকার পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষী মাত্র। রাখাল ডাঙার পাশে সেই প্রসস্ত মাঠ আর নেই। আজ মাঠে নেই কোনো রাখাল। ওরা ঘর ধরেছে, কেউ বা হাল, আবার কেউ বা হয়েছে মুটে-কুলি। কারণ আজ তাদের লাঠি খেলার ময়দান রাখাল ডাঙা নেই। শস্য প্রান্তরের কোথাও গরু চরানোর জায়গা জমি নেই। অন্ন বস্ত্রের চাহিদা মেটাতে আজ কৈশোর, বালক কাল পায় না কোনো জীবন। শৈশব থেকে এক লাফেই ভাসতে হয় যুবক জোয়ারে।
সেদিনের পথটা ছিল আঁকা বাঁকা। কোথাও কোথাও বেনা ঝোঁপ আর কাঁশবনে ঢাকা। মাঝে মাঝে তার আড়াল দিয়ে চতুর শিয়ালগুলো উঁকি দিয়ে দেখছিল রথিনাথের মশাল জ্বালিয়ে মাঠ পাড়ি দেয়ার সুন্দর দৃশ্যটা। আজ মাঠে সেই পাতি শিয়ালগুলো বসত করার মতো কোনো জায়গা নেই। অবশ্যই তারা বাড়ির আনাচে-কানাচে গর্ত খুড়ে বসত করছে। তবু তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। কারণ এই বিশ্ব চরাচরে একবার যা সৃষ্টি হয়েছে তার ধ্বংস নেই। পৃথিবী যতদিন আছে, তার অস্তিত্ব অবিকল।
আজকের পথ হয়েছে সোজা রাস্তা। বেনা ঝোঁপ, কাঁশবন কিছুই নেই। সারা মাঠে রোঁয়ার চাষ। বেনা ঝোঁপের মাঠ তো দূরের কথা রোঁয়া ধানের আলগুলো এত সরু যে, পা ফেলে যাওয়া যায় না। কাঁশ বনের মাঝের আবাদী জমিগুলো স্ফীত হয়ে কাঁশ বনকে উৎখাত করে দিয়েছিল। আবার দিন দিন ছোট হচ্ছে তাই তাদের সীমান্তের আলগুলোও….।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত