রসিক ড. শহীদুল্লাহ

আজ ১০ জুলাই বহুভাষাবিদ, শিক্ষক ও দার্শনিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর জন্মজয়ন্তীতে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


‘পণ্ডিত’ লোকদের নিয়ে সাধারণের ধারণা হলো তাঁরা বদমেজাজি, কাঠখোট্টা, রাশভারী, খিটখিটে ও বেরসিক। কিন্তু বিশ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজের মহাপণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক্ষেত্রে ছিলেন অদ্ভুত ব্যতিক্রম। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন জ্ঞানী, ধার্মিক, অসাম্প্রদায়িক ও রসিক। রসালাপে ছিলেন বীরবলের মতোই উজ্জ্বল। তাঁর মতো জাত পণ্ডিত যে মানুষকে এমন হাসাতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর এই বিশেষ দিকটি নিয়ে লিখেছেন শারফিন শাহ


একবার বাংলা ভাষার শব্দ-সম্পদ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। আরও দু-একজন ভদ্রলোক ছিলেন সেখানে। একজন জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আচ্ছা স্যার, আপনার অভিমত কী? এই যে সম্প্রতি কথা উঠেছে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষাকে আরবি, ফারসি, উর্দু ঘেঁষা করতে হবে?’ ড. শহীদুল্লাহ জবাব দিলেন, ‘এর জবাব তো অনেকবার দিয়েছি। সভা-সমিতিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মিলাদ মাহফিলে। গোঁড়ামি সবসময়ই খারাপ। গোঁড়ামি গোঁড়ামির জন্ম দেয়। বাংলা ভাষাকে কেউ কেউ সংস্কৃতঘেষা করতে চান; আবার কেউ কেউ বলেন আরবি-ফারসি-প্রধান না করলে ‘পাকিস্তানি জবান’ বলে চেনা যাবে না। দুটোই গোঁড়ামি। যেমন কামারের খাঁড়া দিয়ে তেমনি কসাইয়ের ছোরা দিয়ে বাংলা ভাষাকে হত্যা করার চেষ্টা জাতির পক্ষে অকল্যাণকর।’ আবার প্রশ্ন হলো, ‘তাহলে ভাষা ও শব্দ তৈরির ব্যাপারে কিসের উপর নির্ভর করতে হবে?’ ‘শব্দ ও ভাষা-গঠনের জন্য নির্ভরশীল হতে হবে লেখকের উপর। শক্তিশালী লেখক জন্ম দেন ভাষার, সৃষ্টি করেন নতুন নতুন শব্দের। আসলে সুন্দর ভাষার জন্ম হয় লেখকের সাধনায়। উদাহরণ দিই—ধরো ঘষে মেজে রূপচর্চা করা যেমন, ধরে বেঁধে পিরিত করা যেমন, নিয়মের ছকে বেঁধে ভাষা তৈরিও তেমনি।’ বলে হাসতে লাগলেন তিনি।
কখনো কখনো নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করতেন; শ্রোতাদের পরিতৃপ্ত করতেন। একবার তিনি চুয়াডাঙ্গা গেছেন। সেখানে ভিক্টোরিয়া জুবিলি হাই স্কুলে ঈদে মিলাদুন্নবি। খাবার টেবিলে গল্প হচ্ছিল। তিনি কথাবার্তা বলছিলেন রসিয়ে রসিয়ে। তাঁর সঙ্গে খাবার টেবিলে ছিলেন কয়েকজন শিক্ষক। তাঁদের একজন ডক্টর শহীদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে জন্ম তারিখটা বলবেন?’ প্রসন্ন হাসিতে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘আমার জন্ম তারিখ ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই।’ জন্ম তারিখ দিয়েই বললেন, ‘জন্ম তারিখ দিলাম কিন্তু মৃত্যু তারিখ তো দিতে পারছি না। তবে আমার বিয়ের তারিখটি লিখে রাখ। সে তারিখটা হল, 103।’ শুনে সবার মাথা ভন ভন করে ঘুরতে লাগল। এর মানে কী? বললেন, ‘তবে শোনো। ‘টেন কিউব’ মানে হলো, দশ তিনবার অর্থাত্ ১৯১০ সালের ১০ই অক্টোবর। অক্টোবর হলো গিয়ে ইংরেজি মাসের দশম মাস। সব মিলিয়ে দাঁড়াল—বছরটা দশ (১৯১০), মাসটাও দশ এবং তারিখটাও দশ।’ এবার উক্তিটির তাত্পর্য সবাই বুঝতে পারল। হা হা করে হাসতে লাগলেন সবাই। আচার্য শহীদুল্লাহও। তিনি তার বাড়ির নাম ‘পেয়ারা ভবন’ রেখেছেন কেন? আরেক জনের একটি প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘এটা আমার জন্মস্থানের স্মৃতি এবং পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। এই কারণেই ‘পেয়ারা’ নামটি বেছে নিয়েছিলাম। এর চেয়ে প্রিয় নাম আর কী হতে পারে?’
বর্তমানে যেটা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সেটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার কলা ভবন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন বাংলা বিভাগের অতিরিক্ত অধ্যাপক। একদিন কি একটা কাজে তিনি অধ্যাপকদের বিশ্রামকক্ষে ঢুকলেন। দু-তিনজন তরুণ অধ্যাপক ছিলেন সেখানে। ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শামসুদ্দীন মিয়া ড. শহীদুল্লাহকে অনুরোধ করলেন চা পানের জন্য। তারাও চা খাচ্ছিলেন সে সময়। তিনি চা খাবেন না বলে জানালেন। এবং একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। অধ্যাপকদের অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘তার চেয়ে বরং আমি চানাচুর খাই। আমার কাছেই আছে।’ বলেই কালো শেরওয়ানির পকেটে হাত গলিয়ে দিলেন। বের করলেন চানাচুর এবং কুড়মুড় করে খেতে লাগলেন। খানিকক্ষণ পর তিনি তরুণ অধ্যাপকদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা নিশ্চয়ই চানাচুর খাওয়া দেখে আশ্চর্য হয়ে গেছ। কিন্তু অবাক হওয়ার যে কী আছে ভেবে পাই না। ইউরোপীয়রা সিগারেট খায়। তাদের দেখাদেখি আমরাও খাই। তাতে কিন্তু আমাদের লজ্জাশরম লাগে না। আর অন্য কিছু খেলেই লজ্জায় মরে যাই। এ মনোভাব প্রশংসনীয় নয়।’ বলে টেনে টেনে হাসতে লাগলেন তিনি।
সময়টা তখন ভাষা আন্দোলনের আগের বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ক্লাসে তিনি ছাত্রছাত্রীদের বলছিলেন, ‘জান তো মূর্খ তিন রকমের। গোমূর্খ, হস্তীমূর্খ, পণ্ডিতমূর্খ। দেশের কোটি কোটি লোক নিরক্ষর, জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। এরা হলো গোমূর্খ। তোমাদের মতো লোকেরা হস্তীমূর্খ। লেখাপড়া শিখেও যারা আসল ছেড়ে নকল, গিল্টি করা জিনিস নিয়ে পাগল। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানি ভাষা করতে গিয়ে অনাবশ্যক আরবি-ফারসি শব্দ জুড়ে দেওয়া অথবা তাকে ঐতিহ্যমণ্ডিত করার জন্য সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্যে পুনঃনির্মাণ করার চেষ্টা করা—উভয়ই হস্তীমূর্খের মতো কাজ। তৃতীয় শ্রেণির মূর্খ হলো তারাই যারা খ্যাতিমান হয়েও আল্লাহ-রসূলকে ভুলে গেছে, বিদেশি চাকচিক্যের মোহে পড়ে তারা প্রত্যক্ষ-বাদী চার্বাকের চেলা হয়েছে। আজকালকার দিনে পণ্ডিতমূর্খের সংখ্যা কম নয়।’ বলেই হাসতে লাগলেন তিনি। একেবারে শিশুর মতো পবিত্র ও সরল হাসি।
তিনি খুব জটিল বিষয়কেও তার রসিকতার সাথে মিশিয়ে উপভোগ্য করে তুলতে পারতেন। এই রসিকতা অনেক সময় মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু তিনি তার নিজস্ব ঢংয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। একবার কে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, ‘আঙ্গুর’ পত্রিকা বের করেছিলেন কেন, কিছু বলবেন এ ব্যাপারে?’ হাসতে হাসতে অত্যন্ত সহজ কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মুখে থোকা থোকা আঙ্গুরের মিষ্টি রস ঢেলে দিতে পারব এই আশায়। দেখেছ ‘আঙ্গুর’ পত্রিকার পুরোনো কপি। তার প্রচ্ছদটা ছিল খাসা। কতিপয় ছেলেমেয়ে আঙ্গুরের লতাগুচ্ছের ধারে মইয়ে চড়ে আছে অথবা আছে দাঁড়িয়ে। দেখলেই কিশোর-কিশোরীদের চমক লাগত। আমার দুঃখ, আঙ্গুরের টইটম্বুর রস তারা বেশিদিন পান করতে পারেনি। কেননা উনিশ শ একুশের দিকে আমি ঢাকা চলে আসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে। কিন্তু যদ্দিন বেঁচেছিল ‘আঙ্গুর’, তদ্দিন আমি তার মিষ্টি রস ঢেলে দিয়েছি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে।’
তত্কালীন পাকিস্তানের স্বার্থান্ধ ব্যক্তিরা ক্ষমতার লড়াইয়ে মত্ত হয়ে উঠেছিল। তারা ছিনিমিনি খেলছিল পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাঙালিদের ভাগ্য নিয়ে। এসব দেখে ড. শহীদুল্লাহ তার এক ছাত্রকে বলছিলেন, ‘ওই লোকগুলোর প্রকৃতি হলো বর্ষাকালের কোলা ব্যাঙের মতো। ওদের গলা দেখেছ? নববর্ষার আগমনে নতুন পানিতে খালখন্দগুলো ভরে উঠলে কোলা ব্যাঙগুলো ঘ্যাঁও ঘুঁ ঘ্যাঁও ঘুঁ শুরু করে দেয়। তেমনি ওই লোকগুলো দেশের আজাদির শুরু থেকে কোলা ব্যাঙের মতো বড় গলায় বলতে শুরু করেছে, আমি বড় তুমি ছোট, আমি বড় তুমি ছোট। কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে আমার নালিশ নেই, আমি শুধু ভাবি, এরাই যদি হয় রাষ্ট্রের ভাগ্যনিয়ন্তা তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ কি। খুঁটি শক্ত না হলে ঘর যে তাসের ঘরে পরিণত হবে।’
ড. শহীদুল্লাহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ক্লাস নিচ্ছিলেন। পড়াচ্ছিলেন তার প্রিয় বিষয় ভাষাতত্ত্ব, যা ছাত্রদের কাছে বরাবরই নিরস ও কঠিন। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিলেন এবং বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। বুঝাতে বুঝাতে ছাত্রদের দিকে তাকালেন একবার। হঠাত্ খেয়াল করলেন সামনের বেঞ্চের এক ছাত্র তার পাশের সহপাঠিনীর সন্নিকটে গিয়ে বসার চেষ্টা করছে। ড. শহীদুল্লাহ ব্ল্যাকবোর্ডের কাছ থেকে সরে এলেন। বসলেন চেয়ারটায়। ছড়িয়ে দিলেন হাসি। বললেন, ‘এ হলো গিয়ে তোমার বকাণ্ডা প্রত্যাশা।’ ছাত্ররা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। মেয়েটিরও অবাক হওয়ার পালা। সবার সবিস্ময়ের ঘোর না কাটতেই তিনি বললেন, ‘বুঝলে না? মানে—এই অমুক আমার বক্তৃতা না শুনে মিসেস অমুকের কাছে ঘেঁষে বসার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তুমি কি জান না যে, অমুক হলো গিয়ে একজনের বিবাহিতা স্ত্রী। তাহলে কোন আশায় তুমি তার প্রতি আকৃষ্ট হতে চাও?’ ছাত্ররা রহস্যের জট খুলতে পারছে না দেখে তিনি বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, ‘গগন-দাহন গ্রীষ্মের এক পড়ন্ত বেলা। দিগন্তজোড়া মাঠ। সবুজ শ্যামল ঘাসে ছাওয়া। গোচারণ-মাঠে গরু চরছে। কোনোটা গাভী, কোনোটা বলদ, কোনোটা এঁড়ে বাছুর। তাদের গায়ের রঙের বাহারও নানান কিসিমের। মাঠে কিছু কিছু সাদা বকও এসে পড়ে। ওরা পোকমাকড় খায়। অকস্মাত্ দেখা গেল একটা সাদা বক গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে সামনের ভয়ঙ্কর চেহারার এক দামড়া বলদের দিকে অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে। তার লক্ষ হলো গোলগাল দুটি বস্তু। বলদটি তৃণভক্ষণে মগ্ন। এই অবসরে বাবাজি বক এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। সুযোগ আর আসে না। শেষে বক বাবাজির প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়। তেমনি পড়াশোনার দিকে নজর না দিয়ে বিবাহিতা-বান্ধবীর দিকে ঘেঁষে বসাটা হলো বকাণ্ডা প্রত্যাশার মতো নিষ্ফল।’ পুরো ক্লাসে তখন হাসির জোয়ার উঠল। কিন্তু যাদের উদ্দেশে কথাগুলো বলা তারা লজ্জায় পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে বসে রইল।
তথ্যসূত্র:
অন্তরঙ্গ আলোকে ড. শহীদুল্লাহ, গোলাম সাকলায়েন, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্মারক গ্রন্থ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত