একজন রহিম মাঝি ও বানেছাপরীর গল্প 

আলখাল্লার ভেতর থেকে নেমে আসে জীনের বাদশা। আমাদের রহিম ভাইয়ের চোখ কেমন জ্বলজ্বল করে ওঠে। একে একে গল্পের খোলস ছেড়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায় গহর বাদশা, বানেছা পরী, গিলমাইট বন, বিশ্বিং দানবের হুংকার। আর তখনই কেঁপে ওঠে আমার হাত। চোখের পাতায় জমে হেমন্ত। শাদা শাদা কুয়াশা। ন্যাড়া মাঠে বউচির বোল থেমেছে মাত্র, নাড়ার শাণে পা কেটে  সন্ধ্যা মেখে ঘর ফেরা! আমাদের জীনের মতো পিতামহী তেড়ে আসে, তার রাক্ষসী জিহবা চলতে থাকে অনবরত। সন্ধ্যার পর পরই ঝুপ করে রাত নেমে আসে আমাদের পাহাড়-পাড়ায়। এশার আজানের শব্দে রান্নাঘর গমগম করে   থালা-বাসনের ঝন-ঝনানিতে। তারপর আমরা সারিবেঁধে বসি চটের মাদুরের উপর বাবু হয়ে; খেয়ে উঠি ঠিক ততটাই নিঃশব্দে, যতটা বাসন আর চুড়ির শব্দে ঝনঝন করে মায়ের হাত। জোছনা যখন আমাদের কাঁঠাল গাছের ফাঁক গলে উঠোনে আর জানালায় বেঁকেচুরে নেমে আসে, আমরা গোল হয়ে বসি। আমরা মানে- আমি আলতাফ, মাহবুব, ময়নাপু, গুরামিয়া, লালু। আমাদের সাথে বড়রাও। রহিম ভাইয়ের চোখে ঝিলিক দেয় রূপোলি মাছ, দরিয়ার জলে জোছনা কেমন ভেসে ভেসে যায়! তখন আমাদের উঠোন হয়ে ওঠে আরব্য রজনীর সেই বাদশার ঘর।  

রহিম ভাই সমুদ্রগামী জাহাজের গল্প বলে। পিরানহা  মাছ আর নুলোবুড়ো মশলা মাখা হাতে কীভাবে গুটিকয়েক জীবন ঝালেঝোলে মেখে নেয়। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ, মাছের রূপোলি ঝিলিক ও  হাঙ্গরের সাথে রহিম ভাই অপেক্ষা জমায়, একদিন নুনেপোড়া টাকা জমিয়ে কিনে নেবে বকুলগন্ধ।    

আমাদের ছেলেবেলা জুড়ে আছে মহেশখালী। সাপের মতো হেঁটে যাওয়া পানিরছড়া, তিরতিরে জল। মাছের আঁশে রোদ পড়লে যেমন ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তেমনি পিঠে ঝিলমিল নিয়ে এগিয়ে যায় সে জল বুনো সাপের মতো বাঁকখালি নদীর দিকে। আর আমাদের আব্দুর রহিম ভাই, এক অদ্ভুত  নির্লিপ্ততা আর বুকের গহীনে একটা চোরাটান নিয়ে মাসে-ছয়মাসে চলে আসত এই বনগাঁয়ে। তারপর এক দুই দিনের আহ্লাদ, গরম ভাতের সাথে মাছের তরকারি ; তিনবেলা চা সাথে পেস্টি বিস্কুট। তাতে অবশ্য রহিম ভাইয়ের কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। এত দিনের অবদমনের সঞ্চয় বুকপকেট থেকে আঙুলের কৌশলে টেনে তুলে দাদীর হাতে দিয়ে দেন। চোখ নাচিয়ে দাদী তুলে দেন বকুলের কিঞ্চিত সুগন্ধ। যে ক’দিন রহিম ভাই থাকে দাদীর হাতটান থাকে না, ভালো যায় সময় । রহিম ভাইয়ের  সমুদ্রচারী কালো শরীরের ক্ষত থেকে কিছুটা লবণের স্খলন হয় বকুল’দির চোখের তারায়। আবার উল্কার আলেয়ার মতো হঠাতই তা খসে পড়ে।  রহিম ভাই জানে অথবা রহিম ভাই জানে না! কতটুকু প্রেম তার বিক্রি হয়ে যায়, কতটুকু জমছে তার বানেছাপরীর এলানো আঁচলে। 

আমাদের অজানা নয় তার সে টান কিংবা সে জোড়া চোখের কথা। সমস্ত  পৃথিবী খুঁড়ে জমিয়ে রাখত ব্যর্থতার গল্প। স্তুতির বিনিময়ে রমনীর চোখে লিখেছিল উপেক্ষা। কুড়িয়ে পাওয়া হার জমতে জমতে জঙ ধরেছিল বুক পকেটে। রহিম ভাই মনেমনে আর মহেশখালী ফিরে যেতে চায় না। টাকাকড়ি যখন জেবের তলানিতে এসে ঠেকে অগত্যা তার যেতে হয়। সমুদ্র তাকে ডাকে। আর করুণ দৃষ্টি নিয়ে রহিম ভাই চলে যেতে থাকে সমুদ্রের দিকে। মাছের দিকে। নুনের দিকে। 

আমাদের বকুল’দির গল্পটা এবার বলি। রহিম ভাইয়ের গল্প তো আর বকুল’দি ছাড়া সম্পূর্ণ হবার নয়! বকুল’দি আমাদের পাড়ায় সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে, পাড়ার যুবকদের স্বপ্নকন্যা। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস থ্রি অব্দি পড়েছিল। না, কোন ক্লাসে ফেইল করেনি সে; সুন্দরী হওয়ায় দাদীর ধারণা ছিল একটা পাত্র জুটিয়ে নিতে বেগ পেতে হবে না; ফলত, বকুল’দির লেখাপড়ার পাট চুকল তিনক্লাস থেকেই। আর সেটা দাদী ভালোই জানে। জানবে কিন্তু সুবিধা নেবে না এমনটা আমাদের দাদীর ধাঁতে নেই। তাই দাদীর তিনবেলা চা’য়ের দুধ, পেস্টি, পান-জর্দা, ঈদে চাঁদে জংলি ছাপার শাড়ি এগুলো দাদী নিজের প্রাপ্য বলে মনে করত। তারওপর পাড়ার দোকানে যখন তখন বাকিতে সদাই পাওয়ার সুবিধা তো আছেই! প্রতিদিনই, হ্যাঁ প্রায় প্রতিদিনই দাদীর ঘরে সুযোগ সন্ধানী ছোকরারা আসত। খোশগল্পে মেতে উঠত আর দাদীর কপট  আন্তরিকতা ও বকুলদির ফ্রি হাসি তাদের আসা-যাওয়া কে আইনসিদ্ধ করে দেয় অলিখিতভাবে। অবশ্য দাদীর আন্তরিকতার চেয়ে বকুল’দির হাসি তাদেরকে টেনে আনত আমাদের মাটির ঘরের পইঠা অব্দি।  এই হল আমাদের বকুল’দি। যার উপরটা দেখে ভেতরটা পড়তে হলে স্বয়ং ঈশ্বরেরই ভিড়মি খেতে হয় সম্ভবত। 

সন্ধ্যা কিংবা বিজন দুপুরে কলতলার ভিড় কমে গেলে পাড়ার ছোকরারা দাঁড়িয়ে থাকত কাঁটাঝোপের পাশে, বকুল’দির করতলে গোঁজে দিত ভুল বানানের চিঠি। তার চিকন, গোলাপি ঠোঁটের রেখা বেঁকে যেত রহস্যময় হাসিতে। ত্রস্ত হাতে সে চিঠি ঠাঁই পেয়ে যেত বকুল’দির ফর্সা স্তনে লেপটে থাকা গোলাপি ব্রেসিয়ারের ভেতর।   

গল্পের     ঘোর যত বাড়তে থাকে; রাত গভীর হয়, চাঁদ-খাওয়া মেঘের শরীর ছুঁয়ে জোছনা নেমে আসে উঠোনময়। আলো-ছায়া অন্ধকার দলবেঁধে নাচে। আমদের চোখ থির হয়ে আটকে যায় গল্পের সেই গিলমাইট বনে নৃত্যরত বানেছাপরীর পায়ের ঘুঙুরে। সবার অলক্ষ্যে রহিম ভাইয়ের আঙুল নাচে নানা কৌশলে বকুল’দির জামার ভেতর যেখানে পাড়াতো চিঠিরা অসংখ্য কথা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। রহিম ভাই জানে না কলতলার কথা, অন্ধকার, গোলাপি ব্রেসিয়ার কিংবা চিঠির কথা, রহিম ভাইয়ের আঙুল শুধু বকুল গন্ধ জমায় আঁশটে হাতের রেখায়।  

সে চিঠি কেরোসিনের কাঁপা কাঁপা আলোয় আমি পড়ে শোনাতাম, ভুল বানানের তোড়ে শুদ্ধ  আবেগেরা আনাড়ি হাতে ছুঁয়ে দেয় এক টুকরো মনকে। বকুলদির ফর্সামুখে তখন অন্য এক পৃথিবীর রোদ এসে নামে, ছায়া, হাওয়া আর পাতারাও, কিংবা মেঘ আর বৃষ্টি। সে বকুল’দিকে আমি চিনি না, বুঝি না। যেন সত্যি সত্যিই রহিম ভাইয়ের গল্প থেকে বানেছাপরী এসে এমেছে আমাদের একচিলতে ঘরে, একটু পরেই ফের উড়ে যাবে দূরদেশে। 

আমার কথাটাও এই ফাঁকে বলি! আমি বকুল’দির জেঠাতো বোন, আমার আর কোন পরিচয়ই এখানে মুখ্য নয়। আমাকে বকুল’দির পরিচয়েই চেনে সকলে। কালো, লিকলিকে আর মুখ থেকে বোমা মেরেও কথা বের করা যায় না। কেবল দুটো চোখের কারণে আমি মনুষ্য প্রজাতিতে টিকে থাকি। খাই-দাই, ঘুমাই, স্কুলে যাই, বকুল’দির মতো পাড়ার আরও প্রেম করে বেড়ানো মেয়েদের চিঠি লিখি, কোন বিনিময় ছাড়াই! সাথে ফ্রি আশ্বাস! সমূহ গোপনীয়তা রক্ষার।  

তবে আমার একটা গোপন দুঃখ আছে। যা কেউ জানে না। দুঃখটা হলো, আমাকে কখনো বলেনি কেউ- “তুই এত সুন্দর কেন”? অনেকের চিঠি লিখি, পড়ে শোনাই, বকুল’দির কত কত চিঠি আসে! আমার লেখা চিঠি, আমার আবেগ অথচ আমার কিছুই নয়! একটা চিঠির জন্য আমিও বুক পেতে জমিয়েছি হাহাকার। আমার কালো রঙের আড়াল ছেড়ে রক্ত রঙের হৃদপিণ্ড কেউ ছুঁতে পারেনি কোনদিন। সে চেষ্টাও কেউ করেনি কোনকালে।  কলতলা থেকে  ঘর অব্দি আমার অপেক্ষার বিস্তৃতি রেখাপাত করেনি কোন যুবকের মনে। বকুল’দিকে করেছিল। সমস্ত ভালবাসা জড়ো করে তথাকথিত পাড়াতো প্রেমিকেরা কুয়াশার মতো ঘিরে থাকত বকুল’দিকে। আর সেসব মুহূর্তে বকুল’দির ফর্সা গাল অহংকারে জ্বলজ্বল করে উঠত। বকুল’দির চিঠি  পড়তে পড়তে আমি অভাববোধ করি একজন প্রেমিকের, শূন্য হয়ে যায় আমার ভেতরটা, ফাঁকা  মাঠে যেমন হাওয়া খেলে যায় এপার-ওপার তেমনটা। আর সেসব চিঠির জবাবে আমি লিখে দেই আমার হাহাকার, প্রেমাঞ্জলি। আমার নিবেদন তাদের চিঠিতে জবা হয়ে ফোটে। বকুল দি জানে না, আমি লিখছি নিজেকে, সেইসব চিঠি আমার প্রেমের সুগন্ধ যাদের কাছে পৌঁছে দেয়, জানে না তারাও।  

তারপর আরো অনেকদিন পেরিয়ে যায়। কে পেয়েছিল বকুল’দিকে; কাকেই বা ভালবেসেছিল বকুল’দি? এ কথাটা এবার বলি! অথবা আমাদের বকুল’দির রহস্যময় নারী হয়ে  ওঠার পেছেনের গল্প। 

বছর পাঁচেক আগে; একরাতে আমাদের ঘুম ভেঙে যায় চিৎকার চেঁচামেচিতে। আমার চাচা, মানে বকুলদি’র বাবার গলা শুনে, তার চিৎকারের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে আরেকটি গোঙানি আর  বিলাপরত কণ্ঠ। তিনি বকুল’দির মা রহিমা বিবি, আমাদের চাচী। সর্বংসহা বলে যাকে জানে সকলেই। চাচী সুন্দরী নয়। চোখ নাচিয়ে কথা বলতে পারে না। রান্নায় পটু নয়। সে অযোগ্যতার জন্য প্রতিরাতেই স্বামীর লাথি, কিলঘুষি পেতে হয়। সেদিন এমনই ভয়াবহ আক্রমণ করেছিল যে বেচারি সহ্য করতে না পেরে বেহুশ হয়ে গিয়েছিল। পরেরদিন সে-ই যে বকুল’দির বাবা ঘর থেকে বের হয়েছিল আর ফিরে আসেনি। কত খোঁজাখুঁজি, কত কী! তারপর একদিন জানা গেল কোন এক রূপবতীর সাথে শহরের বস্তিতে ঘর বেঁধেছে। সেই থেকে দাদীই সে সংসার টেনে গেছে। সংসারে আটটি মুখ। তারপর থেকে আমরা কেউ কোনদিন বকুল’দিকে চিনিতে পারিনি, বকুল’দি; আমাদের রহস্যময় বকুল’দি। একদিন সন্ধ্যায় আমার বাবার সাথে মোটা কালো এক ট্রাক ড্রাইভার আসে আমাদের বাড়িতে, সাথে আরো কয়েকজন লোক। দাদীর ঘরে বসতে দেয়া হয় তাদের। সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনি বকুলদির বিয়ে চূড়ান্ত। রাতে যে টাকাঅলা ড্রাইভার এসেছিল তার সাথে বকুল’দির বিয়ে হবে দুইদিন পরেই। সকালে বকুল’দির কাছে যাই। বলি, তোমার বিয়ে না বকুল’দি? বকুল’দি হাসে। সুখী মানুষের হাসি। সেই সন্ধ্যায় সে-ই বকুল’দিকেই দেখি চুলোর উনুনে লাকড়ি ঠেলতে ঠেলতে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। জানা হল না কবে থেকে বকুল’দি কাঁদতে শিখেছে! কোন দুঃখ বকুল’দিকে ছুঁয়ে গেছে সবার অলক্ষ্যে!   

দুইদিন পরেই বকুল’দির বিয়ে হয়ে যায় কালো মোটা ড্রাইভারের সাথে। বাড়িতে পাড়ার ছোকরাদের আনাগোনা কমে যায়, কমে যায় সন্ধ্যার কলতলার পাড়াতো প্রেমিকের ভিড়। চিঠি, ভুল-বানান, শুদ্ধ আবেগ! আমার আর বকুল’দির নাম করে কাউকে নিজের কথাগুলো লেখা হয় না।  

তখন রহিম ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। এবার সমুদ্র থেকে এসে রহিম ভাই যখন এই বনগাঁয়ে আসবে সে কি বলবে বানেছাপরীর গল্প? নাকি নিজেই হারিয়ে যাবে গিলমাইট বনে? আমার কান্না পায় রহিম ভাইয়ের জন্য, বকুল’দির জন্য এবং অবশেষে নিজের জন্য।

এরপর যেদিন রহিম ভাই এসেছিল-সেদিন বকুল’দি হেসেছিল অন্যদিনের চেয়ে বেশি। সোনার ঝুমকা আর নতুন নথ নেড়ে নেড়ে রহিম ভাইকে খেতে দেয়, রহিম ভাইকে দেখিয়ে কালো  ড্রাইভারের সাথে সুখি বউয়ের মতো গল্প করে। পরেরদিনই সব ইচ্ছে ফিকে হয়ে যায় রহিম ভাইয়ের। সমস্ত বকুলগন্ধ ঝেড়ে সমুদ্রে চলে যায় সে। বানেছাপরীর গল্প সেবার আমরা শুনিনি কেউ। ট্রলার, সমুদ্রের পাখি, মাছের চোখ আর নুলোবুড়োর মশলামাখা হাতে ছড়িয়ে দেয় তার সমস্ত ব্যর্থতার দাগ। ঝড় আসে-যায়। বানেছাপরীর গল্পের স্থলে জায়গা করে নেয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের গল্প।  

একদিন সেইসব বিকেলেরা মুছে যায়। ফুরিয়ে যায় বকুলের দিন। লণ্ঠনের আলোয় বকুল’দি বলিরেখায় অসংখ্য মাছি এসে থামে আর তার ত্রস্ত হাত ক্রমশ মাছি তাড়াতে তাড়াতে বলে যায়, গহর বাদশার কষ্টগাঁথা! গিলমাইট বন আর বানেছাপরীর গল্প। তখন জোছনায় ভিজে যেতে থাকে  গাছের মগডাল। ঘাস আর শিশির মাখামাখি হয়ে শুয়ে থাকে হাওয়ার বিরুদ্ধে। গালে হাত দিয়ে কৌতূহলী বালক-বালিকারা মগ্ন হয়ে শোনে যায় বানেছাপরীর গল্প। তারা শুনতে পায় না বকুল’দির চোখের ভেতর নুন জমানোর কথা!     

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত