তিরোধানে শ্রদ্ধাঞ্জলি: চর্যাগানের সাধকশিল্পী আরজ আলী বয়াতি

ঝিনাইদহ জেলার সাধকশিল্পী আরজ আলী বয়াতি জীবনের শেষপর্বে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণে আত্মনিবেদন করেছিলেন। সুর করেছিলেন চর্যাপদের ৬ এবং ৫০ সংখ্যক গানের বাণী, সেই সুরের ভেতর তিনি অসাধারণভাবে যুক্ত করেছিলেন ঝিনাইদহ অঞ্চলে প্রচলিত মেয়েলিগীত ও সাধকদের লোক সুর। আকুল হয়ে নানা স্থানে সমকালীন ভাষায় গেয়েছিলেন প্রাচীন বাংলার সাংগীতিক ভাবধারার সেই অমিয় সংগীত “র্কাবা ছেড়ে র্কাবা নিয়ে কেমন করে থাকি” (চর্যা ৬), “গগনে গগনে ওই তো গগনে তোমার তৃতীয় বাড়ি”। শেষোক্ত গানের বাণীর অনুসরণে সাধকশিল্পী আরজ আলী বয়াতি আজ তৃতীয় বাড়ির সন্ধান পেয়ে গেছেন, চলে গেছেন নিজের দেহগত আকৃতি ছেড়ে বহু দূরে। ঘটনাটি ঘটেছে ৫ জুলাই ২০১৯-এর দিবাগত রাত ১২টা ২৫ মিনিটে, স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মের মধ্যে ওইদিন আকষ্মিকভাবে তাঁর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর এই তিরোধানে আমাদের হৃদয়-মন ব্যথিত, মর্মাহত, আর অবিরাম আমাদের মন-কানে বেজে চলেছে তাঁর গীত চর্যাপদের গানগুলি। আহা! কি অপরূপভাবে সারিন্দা বাজিয়ে তিনি ব্যাখ্যাসহ চর্যাপদের গানগুলি গাইতেন! তাঁর গাওয়া শাহ আলম দেওয়ানের সুরে “আলিঙ্গন দাও যোগিনী গো তুমি চেপে ধরে তিন ধারা”, অন্তর সরকার ও পান্থ প্রসাদের সুরে “সদগুরু বোধে দাবা খেলে জিতি করুণা পিড়িতে বসে” অন্তর্জালে, ইউটিউবে স্থায়ীভাবে বেজে চলেছে, আমাদের আপ্লুত করছে তাঁর গাওয়া চর্যাগানগুলির অনির্বচনীয় উপস্থাপনা, মনে মনে আফসোস জাগছে সারিন্দা বাজিয়ে চর্যাপদের গান আর কে গায়বেন কবে!

চর্যাপদের গানের সূত্রে আরজ আলী বয়াতির সাথে শেষদিকে আমাদের আত্মিক ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। গত ঈদে তিনি নিজ বাড়িতে চর্যাপদের গানের আসর করতে চেয়েছিলেন, দেখাতে চেয়েছিলেন ঝিনাইদহ জেলাতে তাঁর উদ্যোগে চর্যাগানের পুনর্জাগরণের প্রকৃত রূপ! সর্বশেষ তিনি যোগ দিয়েছেন ভাবনগর সাধুসঙ্গের সপ্তমবর্ষে পদাপর্ণের আসরে, গেয়েছিলেন চর্যাপদের গান এবং পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের প্রত্যক্ষদর্শী সাধককবি ইউসুফ মিয়ার সঙ্গে। ব্যক্তিগতভাবে আমার জীবনের বিভিন্ন পর্বে আরজ আলী বয়াতি এমন অনেক সাধকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যাতে আমার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়েছে অনেক দূর, গবেষণায় এসেছে বহুমাত্রিকতা। সেই সূত্রে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

আরজ আলী বয়াতির সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১৯৯৮-৯৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে, তখন আমি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার একটি গ্রামে গাজীর গানের আসরে যোগ দিয়েছিলাম। একজন ক্ষেত্রসমীক্ষক হিসেবে আমার ছবি তোলা, গান রেকর্ড, খাতা-কলমে নোট রাখার মাঝখানে অনেকটা আগবাড়িয়ে আরজ আলী বয়াতি আমার সাথে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন যে সম্পর্ক পরবর্তীতে গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে রূপ লাভ করে। সবসময় তাঁর কাছ থেকে শিখেছি, জেনেছি। এমনকি নিজের অনেক কাজের সাথে তাঁকে সম্পৃক্ত করেছি।

তিনি ছিলেন জলের মতো সরল ও স্বাভাবিক মানুষ। আমার সকল আবদার তিনি রক্ষা করতেন। তাই তো প্রথম যখন সময় টেলিভিশনের “অন্তরে অচিন পাখি” নামের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করি, তখন প্রথম পর্বের প্রথম দৃশ্যেই তাঁকে যুক্ত করতে সক্ষম হই। “অন্তরে অচিন পাখি”র প্রথম পর্বটি ছিল কবিয়াল বিজয় সরকারকে নিয়ে, আরজ আলী বয়াতি সেই পর্বে নদীতে নৌকার উপর গেয়েছিলেন বিজয় সরকারের অমূল্য গান “মন বিল্লালের আজান শুনে দিল কাবাতে নামাজ পড়”, এই গানের পিঠে আমি তাৎক্ষণিকভাবে আমার  উপস্থাপনার ভাষ্য জুড়ে দিয়েছিলাম, সেই এক অসাধারণ সূচনা ছিল।

এরপর ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে আমি যখন একজন ভিজিটিং স্কলার হিসেবে আমেরিকার দি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস বিভাগ থেকে আমন্ত্রিত হই তখনও আশ্রয় গ্রহণ করি আরজ আলী বয়াতির। কেননা, শিকাগো বিশ^বিদ্যালয়ে আমার অবস্থানকালে “দুই বাংলা” নামে একটি সিম্পোজিয়াম ছিল, আমি চেয়েছিলাম সেই সিম্পোজিয়ামের শুরুতে বিশ্ববাসীকে বঙ্গভঙ্গের বেদনা নিয়ে বিজয় সরকারের লেখা “ওপার তুমি এপার আমি মাঝখানে এক সীমারেখা” গানটি শোনাতে, ডাক দিলাম আরজ আলী বয়াতিকে, তিনি সারিন্দা হাতে একজন মন্দিরা বাদককে সঙ্গে নিয়ে চলে এলেন। আরজ আলী বয়াতির গাওয়া সেই গানটি আমি বাংলা একাডেমির পুকুরের মধ্যে ভিডিও চিত্রে ধারন এবং ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে “দুই বাংলা” শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে প্রদর্শন করি। গানটি শুনে ও দেখে বিশ্ব বিখ্যাত গবেষকদের মধ্যে ক্লিন্টন বি সীলি, হানা রুথ থমসন, টনি কে স্টুয়ার্ট, থিবো দুবের, দীপেশ চক্রবর্তী প্রশংসা করেন।

আরজ আলী বয়াতি ভাবনগর সাধুসঙ্গের ভাবসাধকদের চর্যাগানের পুনর্জাগরণ কর্মকান্ডের সাথে একাত্ম হন ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে, এরপর থেকে তিনি ঝিনাইদহ অঞ্চলের সাধকশিল্পীদের মধ্যে চর্যাগানের পুনর্জাগরণে কাজ করে আসছিলেন এবং প্রায় নিয়মিতভাবে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকা এসে প্রতি বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ভাবনগর সাধুসঙ্গে যোগ দিয়ে চর্যাগান উপস্থাপন করতেন।

তিনি চর্যাপদের গানের মূল রচনাক্ষেত্র পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে লালন সমাধি প্রাঙ্গনে, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে চর্যাগান পরিবেশন করেছেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু চর্যাপদের গানের মধ্যে সীমায়িত নয়, তিনি তাঁর ৬৪ বছরের জীবনের অধিকাংশ সময় সুফিসাধনায় এবং বিচারগান পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরজ আলী বয়াতিতে জীবনীতে জানা যায়, তিনি ১৩৬২ বঙ্গাব্দে ঝিনাইদহ জেলার আড়মুখ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পঞ্চম শ্রেণির পর তিনি আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তাঁর পিতা ছিলেন জারিগানের দোহারি গায়ক। তিনি পিতার সম্মতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজলী গ্রামের হারান বিশ্বাসের কাছে এক বছর দোতারা বাজানো শেখেন, এরপর নিজের চেষ্টায় সারিন্দা বাজাতে শেখেন। এরমধ্যে তিনি একদিন সারিন্দা হাতে তাঁদের গ্রামের পাশে এক হিন্দু বাটুল শিকদারের বাড়ির সাধুসঙ্গ যান, সাধুরা তাঁকে আদর গান গায়তে বলেন। আরজ আলী বয়াতি সেই সাধুসঙ্গে কয়েকখানা গান করেন, সাধুসঙ্গের ভক্তরা গানের খুশি হয়ে তাঁর কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দেয়। এ ঘটনার কারণে গ্রামের গোঁড়া মৌলবাদীরা তাঁর বাবাকে মসজিদে ঢুকতে দেয় না এবং বলে, তোমার ছেলে হিন্দুদের সাধুসঙ্গে গেছে, তার কপালে হিন্দুরা চন্দনের ফোঁটা দিয়েছে, সে হিন্দু হয়ে গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আরজের পিতা তার দোতারা ভেঙে ফেলেন এবং বলেন, ‘গান বাদ দিতে হবে। না হয় বাড়ি ছাড়তে হবে’। পিতার কথায় ব্যথিত হয়ে আরজ আলী গানের মোহে সারিন্দা হাতে ঢাকা চলে আসেন এবং রিক্সা-সাইকেলের মেকারের কাজ নেন, পাশাপাশি বিচারগানের বিখ্যাত সাধকশিল্পী আবদুল হালিম বয়াতির কাছে গানের শিক্ষা নিতে শুরু করেন। সেই শিক্ষা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তিনি এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন আবদুল হালিম বয়াতি শুধু একজন গায়ক নন, একজন সাধকও বটে। এই উপলব্ধি থেকে তিনি আবদুল হালিম বয়াতির মুরিদ হন এবং তালিমে তাছাউফ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে আরজ আলী বয়াতি হয়ে ওঠেন একজন পরিপূর্ণ সাধকশিল্পী, অবতীর্ণ হন বিচারগানের আসরে। এমনকি তিনি ঐতিহ্যবাহী সংগীতরীতির প্রসারের নিজের ছোট ভাই নজরুল ইসলামসহ অনেককে গান ও সাধনার শিক্ষা দিতে থাকেন। পরবর্তীতে তাঁরাও বাংলাদেশের খ্যাতিমান সাধকশিল্পীতে পরিণত হয়েছেন।

আরজ আলী বয়াতির সংগীত জ্ঞানের প্রতি মুগ্ধ হয়ে ঝিনাইদহ জেলায় তাঁর নিজ বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে সংগীত-গবেষণার জন্য ক্ষেত্রসমীক্ষণ করেছেন আমেরিকার টেক্সাস ইউনিভার্সিটির সংগীতনৃবিদ্যার প্রাক্তন অধ্যাপক ড. বেঞ্জামিন ক্রাকাউর।

বাংলাদেশের সীমারেখাকে অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, উত্তরপ্রদেশে এবং দিল্লিতে আরজ আলী বয়াতি বাংলাদেশের সাধনসংগীত ও প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের গান প্রচারে একাধিক বার ভ্রমণ করেছেন এবং তাঁর সংগীত পরিবেশন সুধীজনের কাছে যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে।   

আমরা গভীরভাবে দেখেছি, সংগীত অন্তঃপ্রাণ আরজ আলী বয়াতি তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞানের সঙ্গে সংগীত ও সাধনপদ্ধতির বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে এমন গভীর জ্ঞান রাখতেন যা মাঝেমধ্যে তিনি সংগীত পরিবেশনের সময় প্রকাশ করে আমাদের বিষ্মিত ও বিমোহিত করে দিতেন। তাঁর অকাল প্রয়াণে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংগীতধারা অপরিসীম ক্ষতি হলো, যা কোনোদিন পূরণ হবার নয়।

আরজ আলী বয়াতির জীবনসাধনা, সংগীতমমতার প্রতি লক্ষ্য রেখে পরম শ্রদ্ধা জানাই। সেই সাথে তাঁর পবিত্র আত্মার অনন্ত শান্তি কামনা করি।

আরজ ভাই, অশেষ ভক্তি-চুম্বন আপনার যুগল চরণে। ভালো থাকবেন আপনার তৃতীয় বাড়িতে। মঙ্গল হোক।     

 

 

 

 

 

প্রচ্ছদ: সকাল রয়

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত