আরো আলো

সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যায় সুজাতার। পাশের বাড়িতে বেশ জোরে চালিয়েছে রেডিওটা। একদমই পাশাপাশি জানলা বলে সুজাতার ঘর থেকে এত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এ বছর ইচ্ছে ছিল না মহালয়া শোনার। কিন্তু সুনীপাদের জ্বালায় ঘুমটা সেই ভেঙেই গেল। সুনীপার বিয়ে হয়েছে মাস ছয়েক। ওর বর মানে এ পাড়ার ছেলে বাপ্পা বরাবরই বেয়াড়া। এতদিন জ্বালাতো মাঝরাত অবধি গাঁক গাঁক করে গান বাজিয়ে, বিয়ের পরে রোজ মদ খেয়ে এসে বৌএর সাথে বাওয়াল। খিস্তির চোট দেখলে কেউ বলবে না ভালো চাকরি করে, ভদ্দরলোকের ছেলে। মেয়েটি বেশ মিষ্টি। জানোয়ারটা বেরিয়ে গেলে জানলা দিয়ে বেশ গল্প হয় সুজাতার সঙ্গে। ওর শাশুড়ি কাছাকাছি এলে অবশ্য জানলা বন্ধ হয়ে যায়। আজ কে শুনছে মহালয়া কে জানে! সুনীপা?

জুলাই মাসে সুগত হঠাৎ চলে গেল। বয়স মাত্র পঞ্চাশ। অফিসের পিকনিকের লোকেশন ঠিক করতে গিয়েছিল। বীভৎস একটা অ্যাক্সিডেন্ট। আশ্চর্য, কলিগরা নাকি কিছুই জানেনা। ও নাকি তখন একাই বাড়ি ফিরছিল। সুজাতার ও মনে হয়েছে এটা খুন। কিন্তু সুগতকে কেন কেউ খুন করবে ওর মাথায় আসেনি। অথচ একই রুটে ফিরবে জেনেও কেন অন্য কলিগদের ছেড়ে সুগত একা একা ফিরতে চাইল কেন এ কথার উত্তর কেউ দিতে পারেনি। সুজাতা কেস করেছে। শেষ অবধি লড়বে। রাত নটায় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হল, কোন উইটনেস নেই। কেউ নাকি দেখেনি। লোকাল পার্টি, বিধায়ক সবার সাথে যোগাযোগ করে লড়ার চেষ্টা করছে সুজাতা। কতদিন লাগবে কে জানে?

অন্ধকারে ছায়ার সাথে যুদ্ধ। একমাত্র মেয়ে ব্যাঙ্গালোরে। ওকেও পুজোর সময় আসতে বারণ করেছে সুজাতা। কলকাতা যেন কু ডাকছে সারাক্ষণ। হঠাৎই পরশু কে যেন ওদের ফুলের টবগুলো তছনছ করে দিয়ে গেছে। এটা কি ওকে ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা? কে জানে? নাকি বাচ্চারা বল পড়েছে বলে নিতে এসে ভেঙেছে সব? রিপোর্ট করে এসেছে থানায়। এস আই এর সেকি হাসি! সুজাতা একরকম জোর করেই ডায়েরিটা করেছে। মেয়ের বয়ফ্রেন্ড রাজীবকে ফোন করল চা বানানোর পর।

– বল আন্টি।

– কতদিন মেলামেশা করছ তোমরা?

– হঠাৎ? উত্তর দেবে নাকি প্রশ্ন করবে?

– রাগছ কেন? আড়াই বছর। যতদিন একসাথে চাকরিটা করছি। ইঞ্জিনিয়ারিং এর সময় জাস্ট বন্ধু ছিলাম।
– শোন, তোমাদের বয়স কম জানি। ফার্স্ট জব। তবুও এই ডিসেম্বরেই তোমাকে বিয়ে করতে হবে রাইকে।
– কেন আন্টি?
– That’s final রাজীব।
ফোনটা কেটে দেয় সুজাতা। উঠোনের শিউলি গাছের তলাটা ভরে গেছে ফুলে। মহালয়া শেষ হয়ে গেছে। আজকাল সুজাতার জীবন অফিস, উকিলের সঙ্গে দেখা করা, কোর্টে যাওয়ার মধ্যে আটকে গেছে।

গতবছর ও এ সময়ে জানলায় পা তুলে চেয়ারে বসে শিউলির গন্ধের সাথে চা খেয়েছে ওরা। বহু বছর ধরে সুজাতার জীবন ছিল গীতবিতানের, সবার মধ্যে থেকে নিভৃত এক বেঁচে থাকা। সুগত অফিস, ক্লাব নিয়ে ছিল। যদিও বছরে দুবার ফ্যামিলি ট্যুর, বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া, সবই ছিল, তবুও দুজনের মধ্যে ছিল অনন্ত স্পেস। রাই চাকরি পেয়ে চলে যাওয়ার পর সে দূরত্বে একটা দুটো শিউলি ঝরতে লাগলো। বয়সের কারণে কিনা জানেনা, দুজনের নির্ভরতা তৈরী হচ্ছিল। ধীরে ধীরে একটা সেকেন্ড ইনিংসের প্রেম শুরু হল। সুজাতার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইদানিং সুগত প্রচুর পাগলামি করতো, সেই প্রথম দিনগুলোর মতো। চুমুর রকমফের খুঁজতো। হঠাৎ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরত, অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত জেগে বসে থাকত। হঠাৎ এক লহমায় সব শেষ।

আচ্ছা, সুগতর শত্রু কে থাকতে পারে? ও কি কারো সিক্রেট কিছু জেনে গিয়েছিল? কিচ্ছু তো জানায়নি লোকটা কোনোদিন! নাহ্ ঘরের কাজগুলো সেরে নিতে হবে। জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে সুনীপা জিজ্ঞাসা করে,

– কি রান্না করবে আজ কাকিমা?
– রুইমাছের ঝোল আর ভাত।
– আমি চিংড়ি রান্না করছি। শাশুড়ি স্নানে গেলে আপনাকে চুপিচুপি দিয়ে আসব।
– থ্যাংকস। দরকার নেই।
– আমার আছে। বাই। জানলা বন্ধ হয়ে যায়।
মেয়েটি বেশ মিষ্টি। ওর সঙ্গে রোজই কথা হয়। একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল সুজাতা, কী কারণে ও সহ্য করে ওর বরের বাঁদরামি? সুনীপা বলেছিল আমার বাপের বাড়ির টাকার জোর নেই। মামা মামীর কাছে মানুষ। তারা বিয়ে দিয়ে কর্তব্য শেষ করেছে। বলে চুপচাপ চলে গিয়েছিল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল এখন। সুজাতার উঠতে ইচ্ছে করছেনা। চিংড়িটা ভালোই রান্না করেছিল সুনীপা। ও রুইমাছের ঝোল ফ্রিজে তুলে দিয়েছে। সন্ধেবেলা টুকটাক বাজার করে আনে সুজাতা। এসে কেসের ফাইলগুলো নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। তোমার জন্য কিছুই করতে পারলাম না সুগত।

হঠাৎই একটা ফোন। একটা বিশ্রী হাসি শুধু। কিচ্ছু বলছেনা। হেসেই চলেছে। প্রাইভেট নম্বর দেখাচ্ছে। কে কে বলে একসময় ফোনটা কেটে দেয় সুজাতা। ঘামতে থাকে। একা একজন বয়স্ক মহিলা ভয় পেয়ে যাবে বলে এসব করা। কিন্তু কিছুতেই কেসটা উঠাবেনা সুজাতা। রাইকে ফোন করল।
– বলো।
– শোন রাই, ডিসেম্বর মাসে তোমার বিয়ে। এখন রাজীব না অন্য কেউ তুমি ডিসাইড কর। আর হ্যাঁ, সিদ্ধান্ত বদলাবো না আমি। রাই রিয়্যাক্ট করার আগে কেটে দেয় সুজাতা। রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে বই নিয়ে বসে। গান চালায় ‘না বাঁচাবে আমায় যদি ‘।
হঠাৎ বাপ্পার চিৎকার শুনতে পায়। উফ্ আবার শুরু হল। ফোনে ছেনালি করা হয়। ফোন আমি তোর গুষ্টির গাঁড়ে ঢুকিয়ে দেব রে মাগি।
এরা আবার ভালো চাকরি করে। আরে, আরে মারছে নাকি? একটা গোঙানির শব্দ পাচ্ছি সুনীপার। নাহ্! মদ খেলে ও মানুষ থাকে না। মেরেও ফেলতে পারে মেয়েটাকে। তালা খুলে ওদের বাড়ি গিয়ে বেল দেয়। একবার, দুবার, তারপর পাগলা ঘন্টির মতো বাজাতে থাকে।

পুলিশকে ফোন করে। ৭১/৫ রাজডাঙা রোডে বাড়ির বৌকে খুন করার চেষ্টা চলছে। তাড়াতাড়ি আসুন। আমি প্রতিবেশি। আর কলটা রেকর্ড করছি।
উপরের বারান্দা থেকে মুখ বাড়ায় বাপ্পা।

– পাগল হয়ে গেছেন নাকি?
– সুনীপা কোথায়? ওকে বার কর।
– এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। একদম নাক গলাবেন না।
– গলাবো। কী করেছ ওকে?
– শালি নিজের বরকে খেয়েছে। কোন নাগরদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, দরদ উথলে পড়ছে আমার বউয়ের জন্য। আমার বউ। রাখি, মারি, আমার ইচ্ছে।
– তোমার বৌ। তোমার বাক্স পেঁটরা নয় ও। দরজা খোল।

– কারো চিন্তা নেই, কেউ এলো না, উনি বিপ্লব দেখাচ্ছেন।

সুজাতা হঠাৎ চারটে ইঁট কুড়িয়ে ছুঁড়ে মারে চারটে বাড়ির কাঁচে। আর চেঁচাতে থাকে ‘কেন ঢিল মারছো সবার বাড়িতে? তুমি কি আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না বাপ্পা? সামনের বাড়ির রণ বেরিয়ে আসে। কী ব্যাপার গো বৌদি।
‘আরে বলোনা, একেতো মদ খেয়ে এসে অকথ্য গালাগালি, আমি জানলা দিয়ে ডেকে বারণ করলাম। আমার জানলায় ঢিল ছুঁড়ল। বেরিয়ে এসে প্রতিবাদ করছি তো বলছে, আশেপাশে সব হিজড়ে থাকে, যা খুশি করব। কিচ্ছু বলবে না কেউ। বলে তোমাদের বাড়িতেও ঢিল ছুঁড়ল। ‘

বাপ্পা চেঁচাচ্ছে, মিথ্যে কথা বলছে এই মহিলা। উনিই ঢিল ছুঁড়েছেন।
এতক্ষণে সবাই বেরিয়ে এসেছে পাড়ার। পাশের বাড়ির আকাশ বলল, বৌদি আজ কুড়ি বছর এখানে আছেন। কারো সঙ্গে ঝামেলা নেই। উনি ছুঁড়বেন ঢিল? নাম শালা নীচে। দু’পক্ষের প্রবল গালাগালি বৃষ্টির মধ্যে পুলিশ এসে পড়ল। সামনের বাড়ির রণ এসে বলল, অফিসার আমি একজন সাংবাদিক। এই লোকটার জ্বালায় পাড়ায় থাকা যাচ্ছে না। ভদ্রলোকের পাড়াটাকে নরক করে তুলেছে ও। একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে আমি তো আর চুপ থাকতে পারিনা। বাকি সবাই ও অনেক কিছু বলল। বাপ্পা দরজা খুলতে বাধ্য হল এবার। ছুটল সুজাতা দোতলার দিকে। দেখে রক্তে ভেসে যাচ্ছে সুনীপা। দেয়াল ঘেঁষে পড়ে আছে। ওকে তুলে পুলিশের গাড়িতে করেই নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে।
দশটা স্টিচ পড়েছে মাথায়। এখন সুজাতার বিছানায় ঘুমোচ্ছে ও। পাড়ার সবাই ব্যাপারটা নিয়ে উত্তেজিত এবং কি হলে বাপ্পা র উচিত শাস্তি হয় সে ব্যাপারে আলোচনা করে চলেছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে।  ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। সুজাতা জানলায় পা তুলে বসে চায়ের কাপ নিয়ে। রাইকে ফোন করে

– এত ভোরবেলা ফোন করেছ? কিছু হয়েছে?
– নাহ্। তুমি যবে খুশি বিয়ে করতে পারো। আমার আর কোন ভয় নেই।
– কিসের ভয় পাচ্ছিলে মা?
– কিছুনা। দিওয়ালির ছুটিতে বাড়ি আয়। তোর এক দিদি ও থাকবে। তিনজনে মিলে প্রদীপ জ্বালাবো। বড্ড অন্ধকার জমে ছিল । তাড়াতে হবে।’

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত