একগুচ্ছ কবিতা

আজ ২৯ জুন ডাক্তার ও কবি সাজ্জাদ সাঈফের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।

এই শুভদিনে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রইলো কবির একগুচ্ছ কবিতা।


পোশাক

তোমারও ছিল নাকি জ্বর, পুড়েছি যে একাই আমি!
টিনশেডে বৃষ্টির হাট ভুলিয়ে গিয়েছে বেদনার চোরাবালি।
রাজপথে পায়রা উড়িয়ে হরতাল করে শিশু উদ্যান, আমি
ঘুম ভাঙা চোখে দেখি ব্যালকনিতে তোমার চুমুকে
উষ্ণ কফির হাওয়ায় হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে বিকেলের
নদী, আমি সাঁতারের নামে অনুদান নিই তোমার চোখের
ঈশারা সকল!

কিছু অধিকারে কিছু নিঃশর্ত সমর্পনে আমি তোমাকেই
ফুল ভেবে বাগানের গেটে আছি মালীর পোশাকে!

 

 

বেকার জীবন

জমা খরচের পয়সা ফুরিয়ে রাত করে ঘরে ফেরা যুবকের ফুসফুসে অযত্নে বেড়ে ওঠা ডুমুরের কথা
বলছি, কাছে গেলেই কুয়াশায় চুল ভিজে যায়, বহুযুগ তার কথা ওঠে নাই লোকালয়ে।

তোমরা শুধু অপদার্থের তকমা লাগিয়ে তার চোখে আঁধার ঘনাও, মালটা ফলের চা খেতে খেতে সেও
কি ভাবে না তবে উড্ডয়ণের কথা! দিনকে দিন ঝিনুক খুলে মুক্তোর মত সূর্যের হাসিমুখ বাসনা করি,
টবের মাটিতে আলোর চাষবাস হাতায় গুটিয়ে কলার উচু করি ঢাকা নগরীর মুখোমুখি উচ্চতায়।

গোধূলির কাঁচা মাটি গায়ে মাখামাখি করে আরেকটি সন্ধ্যা এভাবেই লোমহীন ডুবে যায় নগরায়নের
স্কেচে!

 

 

জলোচ্ছ্বাস

শোক থেকে নেমে শস্যের কাছে যাই
ইরি ধানে সমূলে বাঁচি অধীর পাঁজর-

যে কোনও জলোচ্ছ্বাস প্রাণঘাতী নয়;
ফটকে বৈধব্যের হাওয়া কান পেতে
শোনে নামাবলি,শোনে নেইল কাটারের
দম্ভের মত উলুধ্বনি-

আমি তড়িঘড়ি নামি ফসলের জলে
হারানো ঘুমের তলে মেঘডুবুরি মনের
প্রিজম খুলে দেয় ক্ষতের সেলাই
ফিরে পাই ফসলে ডোবানো পথের
খসড়া,স্বপ্ন হতে চেয়ে যে নাবিক
আড়াল হল শত বর্ষের ক্রন্দনে
আমি তাঁর জল ভীতিকে ড্রিল
মেশিনে লটকে রাখি দেয়ালিকাময়

যে কোনও জলোচ্ছ্বাস চিলের পাখায়
করে উড়ে উড়ে ভেসে আমাদের
ত্বকের গভীরে এসে তুলে নিক
দেয়াল নামক বিভেদের গ্রন্থিমালা

হেসে খেলে জুতোর কাদায় সাফ
করছি সম্প্রদায়ের ভূত!

 

 

স্নেহের অধিক বৃষ্টি

ভ্রমণের শেষে পেগ উজাড় সূর্যাস্তের বনিবনা করি জলনুপূরের ঝংকারে, দূরে সমূদ্র তার আঁচল
বিছিয়ে আরো দূরে জলধির শেষে পাঠাল কি যে গূঢ় সংকেত, ঘোড়ার খুরের শব্দ ছড়িয়ে যেখানে
বেদুঈন আসে রৌদ্রদগ্ধ মরুগান বিলি করে মগজে মগজে-

নগরে রটে যায় হাওয়াভর্তি আফিমের দৌরাত্ব্য, দরজা খুলে বেরিয়ে আসে খাঁচার হরিণ, ঘুম ভেঙে
বাগানে বাগানে ঘুরঘুর করে সমস্ত বিশ্বাসী মেঘ। কিছুকাল কোলছাড়া থাক শাবক জীবন, কিছুকাল
শস্যের দানা তারকাতরুর তলে আদ্রতা পেলে বিষাদের জানালায় শিখানীল পাখি এসে তরজমা হবে
চন্দ্রকথায়।

দূর থেকে পাহাড়ে পাহাড়ে সূর্যোদয়ের দেবীসম্ভব আলো ওঠা দেখি, দেখি ওলানের শুন্য হবার
সূচনাবাদ্য মাথাচাড়া দেয়, এখানে সঙ্গমস্মৃতির বিষে ফুলে ফুলে মচমচ ধ্বনি ঘাড় কাত করে শুনি।
কারা তার নির্মাণ শ্রমে সুড়সুড়ি তোলে, সন্ন্যাসী হয় অরণ্যমাস্তুলে!

দহনে রেখেছি হেমন্তনিঃশ্বাস, তুমি ছইঢাকা দেয়া দাহকাল হও আর আমি রোজ দীঘিমুখো নারকেল
গাছে হেলান দিয়ে হাওয়ার চুল ভেঁজানো বৃষ্টির কথা লিখি সারা অঙ্গে।

 

 

রাজপুত্র

কিছুটা ন্যুব্জ,চরাচরহীন অক্ষরে পড়ে আছি ধূলিঝড়, এ বেলা শিমুলেরডালে অনধিকার উড়ালের
পাখি, ধীর, অবনত, কাস্তে মতন ঠোঁটের ডগায় রক্তাক্ত মেঘ,অশ্রুর নুন-দিকে দিকে বিভাজনে শায়িত
সড়ক,আল ভাঙা ভোরের শামুক ততোধিকধীর,ইতিহাসে চড়ে প্রজনন ঋতু ধারে চেয়ে নেয়!

আমি ক্যারামের লাল উন্মাদ এক,পতনের খাঁড়ি ফুঁড়ে ওঠা নির্বাণ সুর,একে ছায়া দাও,পাতার প্রণয়ে
দীঘি পেতে দাও।

যেদিন নদী কল্লোল নেবে না আর স্রোতের ধারায় স্থির বিদ্যুৎ
যেদিন ভেজা ঘাস চাইবে না আর সবুজের নৃত্য
পাহাড়ে পাথরে হবে ঝর্ণার অপঘাত-

আটপৌরে দাবার সেপাই হাতা গুটিয়ে রাশ ধরে
টানবে ঘোড়ায় সেলাইয়ের ভুল,ছুড়ে ফেলে দেবে
ভুলের স্তুপ!

এক অলীক বাহুতে বিশ্বাসী দেশ আমার সৈকত
হ্যাঁচকা টানে তার জিপার খুলে দিলে মাঝরাতে স্নানে
আসে রূপকথার রাজপুত্র;

আমি মলাটের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা ময়ূর পেখম,তাঁর
মুকুটের শিখরে থাকি-

কিছুটা ন্যুব্জ, চরাচরহীন, ক্লান্ত রাষ্ট্রের তকমা নিয়ে!

 

 

বিপ্লব

কিছু রাত আসে
শুধু নিজের ভেতর জড়ো করি বারুদ ভেজানো বৃষ্টি বাদল
নগ্ন মেঘের দোলনা চেপে কাছ ছাড়া হয় দীর্ঘশ্বাস,চলে এসো তুমিও
তবে কপালের টিপে পাতা ঝিরি ঝিরি সম্মতি পত্রে-

জোয়ারে ছেড়েছি জন্ম জরুল,কেউ এলো না এদিকে আজো,কারো
উপদ্রবে মিললো না তো কাঁচ ভেঙে পড়া খুচরো টিউন

এগিয়ে দেখছি মন্বন্তর,ভূতুরে শোকের প্রদাহ সকল আধ খসা
ডালিমের মত রক্তিম স্বাদে বিনা শর্তের অনুদান ঝুড়ি!

হেঁটে ফিরি বুকের ফসলে,কচ্ছপে ভর করা চলতি হাওয়ার কাছে
এজলাসে খুলে দিই মৃতের বাসনা অধিগ্রহণের পানপাত্রে

এইভাবে,অকাতর,কিছু রাত শুধু মদে ও মনিবে সামাজিক জামা অদল বদল
গ্লাসে বুদবুদে শাওয়ার নিচ্ছে কল্পিত বিপ্লব!

 

 

দু দিকে করাত

হাজারটা অজুহাতে পার পেয়ে যাই হত্যা বীজের নিষেক
হতে,কে বা কাহারা হাততালি দিয়ে মঞ্চ মাতিয়ে রাখে,এদিকে
আলো নেই খুব একটা,চিনতে পারিনি বন্ধুর কাঁধ-

রেলসেতুর শেষ কোলাহল আদতে আমায় টানেনি অত
লেবু নিংড়ানো জলের আবহাওয়া দস্তখত করি গ্রীস্ম জুড়েই!

তোমাদের সভা সমিতির উস্কানি তারায় তারায় ছায়াপথে বেঁধেছে
যত আর্ম ব্যান্ড,আমায় সত্যি টানেনি অত,কুলকুচি করি
নিত্য বিবাদ!

অতিথি হরিণ ফেলে গেছে তার জোড়া চোখ ঘাসে,হাজার
জামিনে ছাড়িয়ে এনেছি পঞ্চাত থেকে;বলতে ছাড়িনি ক্যাপশনে
লাশ,রুদ্র বকুল,তোদের রসনাপ্লাবন-

এইটুকু শুধু মনে রাখা
আহত সাপের মত পলায়নে থাকে দুই দিকে ভয়
সাপের ভীত পথ সামনে
পেছনে থাকে আততায়ীরও ভয় প্রতিহিংসার

আমি গ্রীস্ম জুড়েই লেবু জলে ডুবি নির্বোধ
রেলসেতু ডোবে ঘুটঘুটে অন্ধকারে
ক্যাপশনে লাশ দু দিকে করাত!

 

 

মাস্তুল

বুড়ো শহরের পথে এলোমেলো হেঁটে কল্কব্জার ঘড়ি শুন্যে তুলি,মেঘবারণের বৃষ্টিতে
শুধু ভেজা থাক ছনের কুটির-

পোষাবে না জানি রেল ঘন্টার পিঠে জোছনার খোলা চাঁদ,দুঃস্বপ্নের আম কাটা ছুরি
এলবো ছাড়িয়ে প্রেমময় চোখে,ইশারা বুঝিনি চশমার ফ্রেমে আটকানো স্রোত
মিশমিশে কালো ধোঁয়ায় গুলিয়ে নেমে যায় হাটুর অন্ধকারে,বেত বনে ইজারা
আঙুল উলুখড়ে সোদা গন্ধ,মাঝে তো পথিকের তালু ঘুম খুঁটে নিলো সর্বাঙ্গে!

হাওয়া জোড়েসোড়ে কাঁপছে মাদুলি,রক্ষে করো বিমাতা শামুক,মাথা উচু করে
বসেছে আমন,ডান পায়ে ঘূর্ণি বাতাসে পেঁচানো আঘাত,বরফে ঢেকেছি
ফিজিওথেরাপি-

উবু হয়ে বসা কফের দলা বুক জুড়ে বিষন্ন ঘা,হাত খুলে দেখো করপুটে
সোজা মাস্তুল অবধি যাত্রা নিয়েছে প্রস্তুতি সব;চৌকাঠে পড়ে থাক বাসি
আয়োজন,আঙুরে চাপা পড়া চরৈবতি;

আমরা ভ্রমণে যাবো,পাহাড় প্রবাল
গাঙ শালিখে অন্ধ হব

বের হও ঘাসফুল বের হও নিরোধ আমার!

 

 

অগ্নিবলয়

আরো চাই নীরব আঁধার,এই জনারণ্য পাপেট প্রণয় দিগ্বলয়ের খোঁজে
আরো কাছাকাছি নিবিড় সুরায় দ্রষ্টব্য-

ঘামছে দেয়াল,হুল ফুটলেই ত্বকে চিড় ধরে,অনধিক সুরে কেঁপে
ওঠে অধর তোমার, বেদনার বশে অগ্নিবলয়ে আঁকি সময়ের ভাঙা
ডাল;তুমি অন্যত্র মূলধন ডাকো বর্ষাকে;ডালে ডালে হলুদ শখেরা
পাখি রূপে বসে,গল্প ছড়ায় মেঘে,পাতার প্রান্তরে;গল্পের চুমুটুকু কেড়ে
নিয়ে যেই পাথর পুরুষ সারা মাঠময় অন্ধ সবুজে বিলি কেটে কেটে
অট্টহাস্যে গড়ায় তার পড়নের জ্বরভর্তি পাজামা পোশাকে অনিদ্রার
কালো দাগ,চোখে তার লেঠেল মেজাজ,সারগামে তাল গোল পাকানো
বাঁকা চড়া কণ্ঠস্বরে মশালের ধ্বনি;বেতবনে ঢেউ ছুঁয়ে গেলে সে কেমন
আমতা আমতা করে নদীতে নামে,সবুজ চোখের মাছেদের খোঁজে,লাল
টকটকে চোখের তারা;অমাবস্যার রাতে পলি পড়া জলে নেমে রীতিমত
অশরীরি হয়ে যায়;মুষ্ঠিতে শতাব্দী প্রাচীণ শপথের তাড়া,আরো কিছু আঁধার
জমাও স্রোতে,হুলে কাটা রাষ্ট্র ও পতাকায় নাব্য পলির উর্বরতা নেবো চেয়ে!

 

 

সরীসৃপ

কি যে কলা কৌশলে এই অধঃপাতে ডুবে আছি ত্রাতা,ঢের ভালো
ছিলো অরন্যকাল,হীন,স্নানরহিত,আধ খাওয়া আপেলের ছল।

কে বলবে এই নদীতে উজান ছিলো,ছিলো ভাটিয়ালি,সৈন্ধব লবন?
কাত করি কলসের গলা,ফাঁকা পৃষ্ঠার মত ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকে
শুন্যতা,ঘুমের বিলাপ;আমাদের ঘুড়ি-পাবণের একাডেমি সে’ও উড়ে
গেছে বিলের ওপাড়ে-

ওইখানটায় কত হিমলীলা কত শত সংস্কার আমাদের নির্বাপিত
জ্ঞানের সাহসে বেঁচে টিকে গেলো,শ্মশাণের ধূলো,মড়কে লুটানো
হাসি,বেশ আছে ওরা বিলোপের প্রহরায়!

শহুরে চারপেয়ে সূর্যাস্তের হ্যা-বোধক পালের বিষাদে আমরা সকলে
মৌন কুলুপ-

এ যেন সাত খুনে পাওয়া রক্ত রসের ঔদার্য,কেঁদে কেটে
নাও,সমীহ চাবুকে ঝোলানো;বাঁশিতে বেজেছে প্রাচীন পাথর-

আমাকে তুলে নাও স্বাতী,আর জনমে সরীসৃপ হই চলো!

 

 

সিঁড়ি

কাধে আগুনের মাঝ রাত্রি,ফেরি করি তাই আগুনেই করি বাস
কেউ তাকালো না কেউ তাকায় না এই ভেবে অপঘাতের সেলাই খুলি
মন ঝরে যায় মুকুলরোদে,পাড়ায় গেলে সন্দেহ চোখে দিদি’রা তাকায়
খুলে ফেলে রাখি শীতের সরোদ;সহমত সহি করে আসে বসন্ত,উলুধ্বনি শাঁখে
বিমর্ষতা;রাবার যোনিতে মুখাগ্নি কাম সেচ কার্যে ফল দেয় ভালো,অবেলার
ঘামে শরীরি পারদ নেমে যায় ঢল-

বন্ধ মুখে ঘাই মারছে জিইয়ে রাখা মাছ,কসম,ফুলের আতর সঙ্গে রাখি
শিউলি নামে আপাত ভুল প্রেরিকার ঠোঁটে ফুঁৎকার সহ জ্বলছে উনুন
চিঠির খামে;পুজি কিছু নাই শিকারে জানি হীরে চেনা চোখ চাই আর
এক গ্রাস শুন্যতা শুধু,পাখির পালকে অবশেষ থাকে বিগত শীতের
কুয়াশার ঘ্রাণ,এ’ও জানা চাই;ন্যাকা,সময় বোঝো না,ওইটুকু সিঁড়িপথ,অত
অস্থির হলে চলে?

 

 

 

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত