সেলিম আল দীন-এর নাটকে প্রান্তিক মানুষ ও সমাজ-জীবন

অনুপম হাসান

 

এক.
সেলিম আল দীন (১৯৪৯-২০০৮) বাংলাদেশের নাট্যধারায় অভিনব আঙ্গিক সংযোজন করে স্বীয় স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। গবেষণা (মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য) করতে গিয়ে সেলিম আল দীন মধ্যযুগের বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। এ সময় প্রাচীন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। উপরন্তু সেলিম আল দীনের শৈশব-কৈশোর উপকূল অঞ্চল ঘেঁষা মানুষের জীবন-সংস্কৃতির সাথে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত ছিল। ফলে তাঁর জীবনাভিজ্ঞতায় বাংলা জনপদের প্রান্তিক জনমানুষের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি তথা শেকড়ের টান ছিল। তিনি বাঙালি জাতির প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে নাড়ীর যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, নাটকে তিনি সেই ঐতিহ্যকেই প্রকাশ করেছেন। সেলিম আল দীন বিশ্বাস করতেন, বাংলা জনপদের মানুষের জীবনাচরণে আছে নাটকীয় উপাদান। প্রান্তিক মানুষের নিত্যকার যাপিত জীবনকথা সেলিম আল দীন তাঁর নাটকের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ অবিকল উপস্থাপন করে সেলিম আল দীন বাংলা নাটকে একাধারে স্বীয় স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় যেমন দিয়েছেন তেমনি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছেন। তিনি নিজে তাঁর রচনাদিকে বিশেষ কোনো সাহিত্য শাখার অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী নন। তাঁর পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন তাঁর রচনা সাহিত্যের কোন শাখার অন্তর্ভুক্ত হবে তা নির্ধারণ করার জন্য। সেলিম আল দীন বনপাংশুল-এর ভূমিকায় এটিকে উপাখ্যান, নাটক, গাথাকাব্য যেকোনো নামেই পাঠকের গ্রহণের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর চাকা নাটক সম্পর্কে এক মন্তব্যে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক উল্লেখ করেন- সেলিম আল দীন এই কথানাট্যের রচয়িতা, বাংলা নাটকের এক প্রধান পুরুষ; সেলিম অনবরত সন্ধান করে চলেন প্রকাশের নতুনতর মার্গ; নতুন,কিন্তু বাংলা ভাষার সৃষ্টি এবং হাজার বছরের ধারাবাহিকতার অন্তর্গত অবশ্যই।১

সুতরাং একটা বিষয় খুব স্পষ্ট যে, সেলিম আল দীন নাটক রচনা করতে গিয়ে যেমন বিশেষ রচনাকৌশল গ্রহণ করেছেন, তেমনি এর বিষয়বস্তুও তিনি গ্রহণ করেছেন বাংলা জনপদের প্রান্তিক জনমানুষের (গ্রাস রুট লেবেল) জীবন-যাপন, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি থেকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর নাট্যাঙ্গনে সেলিম আল দীন অসমান্য কৃতিত্বের দাবীদার। তাঁকে বাংলাদেশের নাটকের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অত্যুক্তি হয় না। সমকালীন সাহিত্যে, বিশেষত নাটকে তাঁর পাণ্ডিত্য, জীবনবোধের গভীরতায়, আঙ্গিক সচেতনতা সর্বোপরি নাট্য-নিরীক্ষা ঈর্ষণীয়। সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের শেকড় সন্ধান করেছেন, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ভেতর। তিনি খুঁজে পেয়েছেন বাঙালির স্বীয় নাট্যকৌশল। তাঁর নাট্য-প্রকরণ সম্পর্কে সমালোচকের কথা এরকম-

অধরা শিল্পের নিত্য পূজায় ধ্যানমগ্ন শিল্পীর চৈতন্যে অনুক্ষণ এক সুর খেলে।
অস্তিত্বের বীণা তারে- বাণীর দেবী ঝংকার তোলেন নবরূপে বিচিত্র ভঙ্গিমায়।

মূর্ত-বিমূর্তের জগতে তাঁর সার্বক্ষণিক বিচরণভূমি। শিল্পের সৃজন-কর্ম সে-জন্যেই সাধন সত্য। প্রকৃত শিল্পী তাঁর নন্দনবিশ্বে মগ্নচিত্ত সাধক। সেলিম আল দীন সাধক শিল্পী-শিল্পের ব্রতচারী। একনিষ্ঠ সাধকের প্রাত্যহিক কৃত্যের অপরিহার্যতার তুল্য তাঁর শিল্প সৃজন কৃত্য।২

নাট্যকার সেলিম আল দীন শুরু থেকেই পাশ্চাত্য নাট্য-প্রকরণ ত্যাগ করে বাঙালির নিজস্ব নাট্য-কৌশল অবলম্বনে প্রয়াসী হয়েছেন। তারপরও দেখা যায় তাঁর প্রথম দিকের কয়েকটি নাটকে পাশ্চাত্য নাটকের প্রভাব আছে। তবে অল্প-সময়ের মধ্যেই তিনি পাশ্চাত্য প্রভাব-বলয়ের বাইরে বেরিয়ে বাঙালি সমাজের নিজস্ব গল্প এবং যাপিত জীবনের নাটকীয় উপাদান সংগ্রহ করেন; যা তিনি কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, হরগজ, হাতহদাই, চাকা, যৈবতী কন্যার মন- প্রভৃতি নাটকে তুলে ধরেছেন। তাঁর নাট্য-কৌশল নির্মাণ প্রসঙ্গে সমালোচক বলেন-

এ যাবৎ কাল ধরে আমরা যে ইউরোপীয় একক নন্দন ভাবনার আওতায় ছিলাম, তিনি তার মধ্যে নিজেকে বিলীন করেন নি, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা ও যৌথ অবচেতনার জগৎকে বিনির্মাণ করে চলেছেন তাঁর কাজে, তাঁর পাঠকৃতিতে। এবং এই সূত্রে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শুধু পুনর্নির্মাণই করছেন না, তাকে উন্নীতও করছেন। তাঁর কাজে যে স্ট্রাকচারাল এপিকের লক্ষণ দৃষ্ট হয়, তা তাঁকে আজ ভিন্ন বাচনে তুলে ধরতে বাধ্য করে।৩

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেলিম আল দীনের নাটকে বঙ্গভূমি এবং বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির পুনর্বিন্যাস যেমন তিনি করেছেন, তেমনি তিনি এ জনপদের ভূমি-সংলগ্ন মানুষের জীবনবৃত্তান্ত নাট্যকাহিনীতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর রচিত নাটকের কাহিনী মহাকাব্যিক বিশালতা হোমারের ইলিয়াড-ওডেসির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বাঙালি জাতিকে তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন বাঙালির নিজস্ব জীবনের গাথাই নাটকের নবতর নির্মাণে সহায়ক হতে পারে। তিনি তাঁর বিশ্বাসকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। সেলিম আল দীন দেশীয় ঐতিহ্যের শেকড়ের সন্ধানে আগ্রহী ছিলেন। ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সাথে নাট্যকার সেলিম আল দীনের যে সেতু বন্ধন, সেখানে খুঁজে পাওয়া শেকড় সন্ধানী শিল্পচেতনা। ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর ‘মটো’ বা স্লোগান হচ্ছে-

বাংলাদেশ একটি সংগ্রাম ক্ষুব্ধ অকুতোভয় জনপদের নাম। যুদ্ধ ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে এই জনপদ সমুন্নত জীবনের আকাক্সক্ষাকে প্রজ্জ্বলিত করেছে তার সামুদ্রিক দুই চোখে। এই দেশ, তার ইতিহাস, সংগ্রাম, সংস্কৃতি, সবকিছুকে আমরা সম্মান করি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, আত্রাই, ধরলার কূলে কূলে নামহীন গোত্রহীন মানুষের সংগ্রামী জীবন আমাদের নাটকের  বিষয়বস্তু।৪

‘ঢাকা থিয়েটার’-এর প্রতিপাদ্য বক্তব্যের সাথে সেলিম আল দীন-এর সম্পর্ক গভীর। তিনি যেসব নাটক রচনা করেছেন, তা যেন ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর বক্তব্যেকে সামনে রেখে। অর্থাৎ ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর স্লোগান এবং সেলিমের নাটকের বিষয়-প্রেক্ষাপট সমার্থক-সমান্তরাল। যেমন- তিনি হরগজ-এ এঁকেছেন ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত এক গ্রাম্য জনপদের উৎক্ষিপ্ত চিত্র। কিত্তনখোলা-য় বহমান বেদে সমাজের এবং তাদের যাপিত জীবনের অসাধারণ এক অনন্য সাধারণ গল্পভাষ্য উপস্থাপন করেছেন। কেরামতমঙ্গল-এ দেখিয়েছেন গ্রাম-বাংলার সহজ-সরল মানুষের নানামুখী সংকট এবং উত্তরণের প্রয়াস চিত্র। অথবা চাকা নাটকের বেওয়ারিশ লাশের সাথে দুই গাড়োয়ানের আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন।

সেলিম আল দীন রচিত নাটকের সংখ্যা অনেক। তিনি যখন নাটক রচনায় হাত দিয়েছিলেন, তখন প্রথাগত ইউরোপীয় নাট্য-প্রভাব তাঁর ভেতর ছিল। তবে শুরু থেকেই তিনি বাংলা নাট্য-সাহিত্যকে ইউরোপীয় নাট্য-প্রভাব থেকে বের করে আনার জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন। তিনি  সমগ্র নাট্য-জীবনব্যাপী সচেষ্ট ছিলেন- বাংলা নাটকে বাঙালি উপাদান ব্যবহার করে বাঙালিয়ানার প্রকাশ করতে। প্রথম-পর্বের অল্প কয়েকটি নাটকে তিনি সম্পূর্ণ ইউরোপীয় নাট্য-প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না পারলেও দ্বিতীয় পর্বের নাটকে সাফল্য অর্জন করেছেন। একথা সত্য যে, সেলিম আল দীন-এর নাট্য-প্রতিভার প্রকৃত পরিচয় এই দ্বিতীয় পর্বের নাটক থেকেই শুরু হয়েছিল। এ পর্বেই সেলিম আল দীন নাটকে নিয়ে আসেন বাঙালির জীবন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি প্রভৃতির স্বাদ-গন্ধ; উপরন্তু এ সময় থেকে তাঁর নাট্য-পরিবেশনাতে ছিল ভিন্নতা; যে উপস্থাপন কৌশলে ছিল বাঙালিয়ানার ছাপ।

নাট্যকার সেলিম আল দীন-এর নাট্য-চেতনার ভুবন গড়ে উঠেছে আবহমান বাংলা জনপদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্পর্শে। সম্ভবত এ কারণেই কোনো না-কোনোভাবে তাঁর নাটকে বাংলার পশ্চাদপদ তথা অন্ত্যজ মানুষের জীবন-কথাই প্রাধান্য লাভ করেছে। প্রথম পর্বের নাটকে  সেলিম স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যা উপস্থাপনে প্রয়াসী ছিলেন। জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন-এ ফকিরের কান্না, বেকারের চিৎকার, ক্ষুধার্তের মিছিল প্রকৃতার্থে স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থিক বৈষম্যের চিত্র। সর্প বিষয়ক গল্প নাটকে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং অস্থিরতার যে চিত্র নাট্যকার তুলে ধরেছেন, সেই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিয়েও সংশয়-অনিশ্চয়তা জেগেছে। এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা-য় নাট্যকার সেলিম সমকালীন ব্যবসায়ী মহলের নৈতিক অধঃপতনের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে কালোবাজারী, খাদ্যে ভেজাল, সন্ত্রাসীদের বোমা তৈরির ঘটনা এনেছেন।

স্বংাদ কার্টুন-এ সেলিম আল দীন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও  অনিশ্চয়তার চিত্র তুলে ধরে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। মুনতাসীর-এ নাটকের শ্লেষ ও ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা সংবাদ কার্টুন-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। মুনতাসীর নাটকের নায়ক এক সর্বভূক চরিত্র। মুনতাসীরের অন্তহীন ক্ষুধা এবং তা নিবারণে তার নির্বিচারে খাদ্য গ্রহণের দৃশ্য নাট্যকার জাদু-বাস্তবতায় উপস্থাপন করেছেন। মুনতাসীরের নির্বিচারে খাদ্য গ্রহণে সে অসুস্থ হয়ে পড়লে, তাকে অপারেশন করা হয়। এ সময় নাট্যকার দেখান মুনতাসীর খেয়েছে দড়ি, বেলুন, ব্রেসিয়ার, কাগজ, শাড়ি, অয়েলপেইন্ট, ক্লিপ প্রভৃতি। নাট্যকার সেলিম আল দীন মুনতাসীরের এই নির্বিচার খাদ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতার্থে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত করেছেন। মূলত তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য যারা রাষ্ট্রক্ষমতা অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, তারা। ফলে অন্যভাবে বলা যায়, যাদের ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয়
অর্থ-সম্পদের অপচয় হয়েছে- এ নাটকে তাদের-ই ব্যঙ্গ-কার্টুন এঁকেছেন নাট্যকার।

দুই.
সেলিম আল দীন-এর করিম বাওয়ালির শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা নাটকে প্রথমবারের মতো প্রান্তিক জনসমাজ ও তাদের জীবনের গল্পচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। নাটকের করিম বাওয়ালি ও তার স্ত্রী পাবদা প্রান্তিক জনমানুষ। করিমের পেশা মৌমাছির চাক থেকে মধু সংগ্রহ করা; এ কারণে তার নামের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘বাওয়ালি’। করিম বাওয়ালির জীবিকা নির্বাহের উপায় ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। কারণ, একশ্রেণীর মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সুন্দর বনের বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে। ফলে বন না থাকলে প্রান্তিক মানুষ করিম বাওয়ালির জীবিকা নির্বাহের উপায় বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে পরিবেশও হুমকির সম্মুখীন হবে। এর ফলে ক্ষতিগস্ত হবে নিম্নবিত্তের মানুষ। বিশেষত করিম বাওয়ালির মতো নিম্নপেশা-বিত্তের মানুষ।

করিম বাওয়ালির জীবন-বাস্তবতায় সেলিম আল দীন একদিকে প্রাচীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত যেমন দিয়েছেন, তেমনি সেই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের হুমকি-চিত্রও অঙ্কন করেছেন। বনের গাছ যত কমতে থাকে করিম বাওয়ালির জীবিকা-উপার্জনের ক্ষেত্র তত কমে; এক সময় জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তখন করিম বাওয়ালির পক্ষে জীবিকা নির্বাহের জন্য মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। কিন্তু করিম মহাজনের ঋণ পরিশোধ করবে কীভাবে? বন থেকে যদি সে মধু আহরণ করতে না পারে, তাহলে ঋণ পরিশোধ করা দূরে থাক, প্রাত্যহিক জীবনের রুটিরুজিও তার বন্ধ হয়ে যাবে। করিম বাওয়ালির পক্ষে জীবন নির্বাহ করা সম্ভব হবে না। তার দৃষ্টান্ত স্বরূপ নাট্যকার দেখিয়েছেন, করিম বাওয়ালির স্ত্রী পাবদা অনাহারে থেকে অবশেষে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। এই সহায়-সম্বলহীন করিম বাওয়ালি এবং তার পরিবার বেঁচে ছিল, প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই নাট্যকার দেখান, যখন প্রকৃতি উজাড় হচ্ছে তখন করিম বাওয়ালির মতো প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক মানুষের জীবনও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। করিম বাওয়ালি তার স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকে-যন্ত্রণায় নিষ্ফল হুংকার দেয় মহাজনের বিরুদ্ধে।

করিম বাওয়ালির এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য দায়ী প্রকৃতার্থে মানুষের সামাজিক সভ্যতা এবং নগর-সভ্যতা। মানব-সভ্যতা ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর নির্বিচারে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার করছে। মানুষ অবলীলায় প্রকৃতির ঐশ্বর্য ধবংস করে ফেলছে। ভাবছে আগামী দিনের তথা ভবিষ্যৎ পরিণামের কথা। বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোনোভাবেই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা যাবে না। অন্যথায় পরিবেশ তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে; প্রকৃতি যদি তারা ভারসম্যা হারিয়ে ফেললে পরিণামে মানুষের জীবনে নেমে আসবে নানা বিপদ-বিপর্যয় ও সংকট-সমাস্যা। এক করিম বাওয়ালির স্ত্রীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্মান্তিক জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। ‘প্রচণ্ড বিশ্বাস ছিল সেলিমের নিজেদের সংস্কৃতির শক্তির ওপর। তাইতো গ্রামীণ জীবনের নানা লোকাচার ও উপাদান তাঁর রচনায় এতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। সেলিমের কাছে মানুষের মতো প্রকৃতিও একটা বড় চরিত্র। প্রকৃতিকে অস্বীকার করে মানুষের অস্তিত্বে সেলিম বিশ্বাস করতেন না।’৫

আতর-আলীদের নীলাভ পাট নাটকে সেলিম আল দীন বাংলা জনপদের কৃষক সমাজের জীবনচিত্র উপস্থাপন করেছেন। নাটকে তিনি পাট-চাষীদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-কষ্ট এবং চাষীদের বিশ্বাস-সংস্কারের কথার পাশাপাশি কৃষক সমাজের ওপর মহাজনদের শোষণের কথাও ব্যক্ত করেছেন। পাট বিক্রিকে কেন্দ্র করে আতর আলীর সঙ্গে মহাজনের কর্মচারীর দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে। সরকারি গোডাউনে বিক্রি করলে ন্যায্য দাম কৃষকরা পায়। নাট্যকার দেখিয়েছেন, মহাজনের নির্ধারিত মূল্যেই পাট বিক্রি করতে বাধ্য হয় চাষীরা। কারণ, মহাজনের কাছ থেকে পূর্বে চাষীরা ঋণ নিয়েছে জীবন-জীবিকার স্বার্থে। মহাজনের সুদের টাকা পরিশোধ করতে হয় তাদেরকে পাট দিয়ে। ফলে চাষীরা সরকারের কাছে ন্যায্যমূলে পাট বিক্রি করতে পারে না। প্রান্তিক কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়।

মহাজনের শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে আতর আলী। পাট কাটতে গিয়ে ডান হাতের আঙ্গুল কাটা পড়ে আতর আলীর, পচা আঙ্গুলের চিকিৎসা, পথ্য, খাদ্য প্রভৃতি সংকটে আতর আলীর নাভিশ্বাস উঠেছে, তথাপি সে মহাজনের আড়তে পাট বিক্রি করতে অস্বীকার করেছে। তার কণ্ঠের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে গ্রামের অন্য পাট-চাষীরা। সকল পাট-চাষী মিলে মহাজনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এভাবেই বাংলা জনপদের নিম্ন-শ্রেণীর মানুষ কৃষকরা মহাজন, ফড়িয়া, মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কাছে চিরকাল শোষণ শাসনের শিকার হয়েছে। এই শোষণের চালচিত্র আতর-আলীদের নীলাভ পাট রচনার মধ্য দিয়ে সেলিম আল দীন প্রান্তিক জনগণের যাপিত জীবনচিত্র দক্ষতার সাথে মঞ্চস্থ করেছেন। নাট্যকার প্রথম-পর্বের নাট্যকাহিনী ক্রমশ শহর থেকে গ্রাম জীবনের দিকে ধাবিত করেছেন এবং আগ্রহান্বিত হয়েছেন। তিনি নাটকে নিঃস্ব, দ্রারিদ্র্য-পীড়িত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জনমানুষের জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে রঙ্গমঞ্চের আলোয় ফুটিয়ে তুলেছেন। সমালোচকের মন্তব্য তাই  ‘শহুরে ছোট অভিজ্ঞতার বাইরে দেশের ব্যাপ্ত মানুষের সুখ দুঃখ, তাদের মুখের আঞ্চলিক ভাষা, তাদের জীবনের বাস্তব ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং এই সমস্তকে ঘিরে যে বড় পট আঁকার চেষ্টা তিনি অচিরেই শুরু করবেন।’৬

নাট্যকার সেলিম আলী দীন প্রথম-পর্বের নাট্যগণ্ডী পার হয়ে স্বভূমির দারিদ্র্য-পীড়িত গ্রাম-বাংলার নিম্নবিত্তের জীবনচিত্র নাট্যকাহিনীতে উপস্থাপনে সচেষ্ট হয়েছেন। দ্বিতীয়-পর্বের নাটকগুলোতেই সেলিম আল দীনের নাটকের মানুষজনদের নানামাত্রিক পরিচয় তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সাথে তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন। সেলিম আল দীনের নাট্য-পরিক্রমা মূলত স্ব-জাতির শেকড়ের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া। ক্রমাগত নাট্যকার এগিয়ে চলেছেন আকাক্সিক্ষত বিষয়চেতনার দিকে এবং তাঁর বিষয়-প্রেক্ষাপট নাটকের নব-আঙ্গিক নির্মাণের পথ দেখিয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হচ্ছে  শকুন্তলা, কেরামতমঙ্গল, চাকা। এ পর্বের নাটকে নিম্নবিত্তের মানুষের জীবন তথা বাঙালি জীবনের চিত্র নাট্যকার সেলিম আল দীন অসাধারণ দক্ষতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব আঙ্গিক-কৌশলে উপস্থাপন করেছেন। বলার অবকাশ রাখে না যে, বক্ষমান নিবন্ধের মূল লক্ষ্য সেলিম আল দীনের নাটকে চিত্রিত প্রান্তিক জন-মানুষের উপস্থাপন মূল্যায়ন করা। এই বিবেচনায় শকুন্তলা আমাদের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত নয়।

তিন.
কিত্তনখোলা রচনার মধ্য দিয়ে সেলিম আল দীন নাট্যকার হিসেবে প্রাচ্যচেতনায় তথা বাঙালির নিজস্ব প্রকরণশৈলী নির্মাণ করেন। করিম বাওয়ালির শত্র“ অথবা মূল মুখ দেখা দিয়ে সেলিম আল দীন প্রাচীন বাংলা জনপদ ও প্রান্তিক গ্রামীণ মানুষের প্রতি যাত্রা শুরু করেন। তুলে আনেন বাঙালি জীবনের নিজস্বতা এবং প্রথাগত সমাজের জীবন-যাপনের রীতি-পদ্ধতি, আচার-আচরণ সাংস্কৃতিক চিত্রের ইতিকথা। নাট্যকার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং তা জীবন-রঙ্গমঞ্চের বাস্তবতা থেকে থিয়েটার হলের দর্শকদের রঙ্গমঞ্চে নিয়ে এসেছেন। তিনি বাঙালি জীবন ও সমাজের যে চিত্র নাট্যানুষঙ্গে তুলে ধরেছেন, তা বাঙালি রীতি-পদ্ধতি ব্যবহার করে। তাঁর শিল্প-মানসের সহজাত প্রবণতা ছিল বাঙালি জীবনের শেকড়ের প্রতি গভীর আগ্রহ; তাই কিত্তনখোলা নাটকে বর্ণনাত্মক নাট্য-রীতির সূত্রপাত করেন। বলাবাহুল্য, নাটকে বর্ণনারীতি সেলিম আল দীনের আগে আধুনিক বাংলা নাটকে ব্যবহৃত হয় নি। এই বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যাদি নাটকীয় ভঙ্গিতে রচিত হয়েছিল। সেলিম আল দীন এ ধরনের নাটক রচনার ক্ষেত্রে শুধু বিষয়বস্তু নির্মাণে কৃতিত্বের পরিচয় দেন নি, একই সাথে নাট্যকাহিনী উপস্থাপনা-রীতিতেও নতুন মাত্রা সংযোগ করেছেন বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে। কিত্তনখোলা নাটকের কাহিনী তিনি নিরেট বাঙালি জীবন থেকেই শুধু গ্রহণ করেন নি; তিনি এ নাটকে সত্যিকার অর্থে নানান শ্রেণী-পেশার প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র উপস্থাপন করেছেন।

কিত্তনখোলা নাটকের কাহিনী একটি চলমান জীবনের চিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে কিত্তনখোলা গ্রামে মনাই বাবার মাজার গড়ে ওঠে একদিন। তখন থেকেই বাবার মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমায় ঐ গ্রামে তিন দিনের এক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর গ্রামের মেলা অর্থ  দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে নানা মানুষের আগমনে একটি মিলনের ঐক্যতান সৃষ্টি হয়। গ্রাম্য ঐ মেলার আয়োজন সম্বন্ধেও নাট্যকারের চোখ এড়িয়ে যায় না। কেউ মেলায় আসে টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে, কেউ আসে বায়োস্কপ দেখতে কেউবা যাত্রা৭ দেখতে। মেলায় টুইটাম গ্রাম থেকে এসেছে দিনমজুর সোনাই। সোনাই কিত্তনখোলা নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়; অন্যভাবে বলা যায়, এ নাটকে কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই। তবে নাট্যকাহিনীতে সোনাইয়ের উপস্থিতি বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে। নাট্যকারের নিকট জানা যায় সোনাইয়ের পরিচয়। সোনাইয়ের পিতা ছিলেন জোলা বা তাঁতী। সোনাইয়ের বাবার বসতি ছিল পাবনা জেলায়। এক সময় তাদের জমিজমা ছিল; অর্থাৎ তারা সম্পন্ন গেরস্ত ছিল। সোনাইয়ের দাম্পত্য জীবন ছিল, ঘরে বউ ছিল, সুখও ছিল। কিন্তু এখন তার সোনাইয়ের কিছুই নেই; অনেকটা বলতে গেলে হৃতসর্বস্ব। সোনাই আবার মৃগী রোগী। ইদল হক কন্টাক্টরের কাছ থেকে জমি বন্ধক রেখে সোনাই চার হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিল। পরিশোধ করতে পারে নি আজো ঋণের টাকা। এজন্য ইদু কন্টাক্টর কৌশলে সোনাইয়ের শেষ সম্বল ভিটেমাটির জমিটুকুও ঋণের দায়ে কেড়ে নিতে চায়। ফলে সোনাইয়ের যে পরিচয় আমাদের সামেনে ভেসে ওঠে তার প্রেক্ষিতে তাকে নিম্নশ্রেণীর শুধু নয়, নিম্নশ্রেণীর মধ্যেও আরো একধাপ নিচের না বলে উপায় থাকে না।

সোনাইয়ের ঋণের টাকা বেড়েছে; আর ইদু কন্টাক্টরের জমির লোভ। ফলে উভয় চরিত্রের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সোনাই খেটে খাওয়া মানুষ; কিন্তু ইদু শোষক শ্রেণীর প্রতিভূ। তবে ইদুর অতীত ইতিহাস বলে ইদুও এককালে নিম্নবিত্তেরই মানুষ ছিল। কারণ, পঞ্চাশের মন্বন্তরে ইদুর মা সাতদিন না খেয়ে অবশেষে মণ্ডল বাড়িতে খিঁচুড়ি খেয়ে মারা গেছে। ইদু দিনমজুরী করেছে হুরমত কাজীর বাড়িতে। শরীর খাটিয়ে পেটে-ভাতে বেঁচে থেকেছে। কিন্তু সেই বেঁচে থাকার আরেক নাম সংগ্রাম। কাজীর বাড়িতে কাজ করে সারাদিনে ইদুর জুটতো একবেলা ভাত আর দুইবেলা ফেন। তবে ইদু তার ভাগ্য বদলে নিয়েছে, নিজের বুদ্ধির জোরে; সে আজ কিত্তনখোলা মেলা কমিটির শক্তিধর পুরুষ।

কিত্তনখোলা নাটকের প্রায় সবগুলো চরিত্রের মধ্যেই যে নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও আর্থিক জীবন-চিত্র ফুটে উঠেছে- তা অন্যার্থে গ্রাম-বাংলা প্রান্তিক জনজীবন চিত্রই বটে। অন্যভাবে বলা যায়, সেলিম আল দীন-এর এ নাটকে রয়েছে যেন নিম্নবিত্তের অসংখ্য মানুষের মিছিল। নাট্য-কাহিনীতে সেলিম আল দীন যেভাবে চরিত্রগুলোকে বিন্যস্ত করেছেন, সেই বিবেচনায়, তাদেরকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়- ১. সোনাইয়ের মতো হত দরিদ্র সাধারণ মানুষ (বছির, ছমির, কাশেমালি), ২. নয়াযুগ অপেরার নট-নটী পরিবেষ্টিত সাধারণ মানুষ (ছায়ারঞ্জন, বনশ্রী, রবিদাশ), ৩. লাউয়া সম্প্রদায়ের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ  (ডালিমন, রুস্তম)।

গ্রাম্য মেলায় বিভিন্ন গ্রামের বিচিত্র সব মানুষের আগমন ঘটেছে। সোনাই দরিদ্র ও দিনমজুর তবু মেলায় এসেছে কিছু কেনাকাটার জন্য। মেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের বিনোদন উপলক্ষে যাত্রা-আসর বসে; গ্রামের মানুষ যাত্রা দেখে। যাত্রাদলের লোকেরা অভিনয়ের মাধ্যমে কিছু রোজগার করে, তাদের জীবিকাও এই যাত্রাভিনয়। লাউয়া সম্প্রদায় আসে দল বেঁধে মনোহারী জিনিসপত্র নিয়ে গ্রামের মেলায় বেচাকেনা করতে। মেলা প্রাঙ্গণ কিত্তনখোলা নাটকের মূল মঞ্চ; এই মঞ্চে প্রকৃতপক্ষে নাট্যকার সেলিম আল দীন গ্রাম-বাংলার মানুষ ও তাদের জীবনচিত্র তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন।

বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতির একটি প্রধান অঙ্গ গ্রাম্য-মেলা। গ্রামের মেলায় প্রচুর জন-সমাবেশ হয়। কারণ, মেলা গ্রামের মানুষের কাছে আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংসারের জিনিসপত্রের চাহিদাও মেটায়। ফলে গ্রামের মেলায় ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণীর মানুষের আগমন ঘটে। কিত্তনখোলা নাটকে মেলা আয়োজনের প্রতীক প্রাচীন বটবৃক্ষের তলায় মনাই বাবার মাজারটি। অবশ্য মেলায় আসা জনগণের অনেকে তাদের সংস্কার ও বিশ্বাস নিয়ে মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার মানত করে মনাই বাবার মাজারে। এই সংস্কার-বিশ্বাসও প্রান্তিক জনগণের একটি পরিচয়। মনাই বাবার মাজারকে কেন্দ্র করে নাট্যকাহিনীতে যে মেলা সদৃশ্য নাট্যমঞ্চ সেলিম আল দীন তৈরি করেছেন, সেখানে নাট্যকার বিভিন্ন চিত্ত-বিত্ত-শ্রেণী-পেশার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ফলে কিত্তনখোলার এই মেলাকে কেন্দ্র করেই বৃহদার্থে গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক জন-সমাজের নৃ-তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক শেকড় সন্ধানী নাট্য-শরীর নির্মাণ করেছেন নাট্যকার। নাট্যকারের এই আয়োজন প্রকরণের দিক থেকে মহাকাব্যিক।

কিত্তনখোলা-র সোনাই, বছির, ছায়ারঞ্জন, বনশ্রী, ডালিমন সকলেই নিরন্ন, অন্ত্যজ তথা প্রান্তিক মানুষ। সোনাই শোষিত-প্রতারিত এক মানুষ। ইদু কন্টাক্টর কৌশলে মেলায় তাকে তাড়ি পান করিয়ে জুয়ার আসরে বসায় এবং তার শেষ-সম্বলটুকু কেড়ে নেয়। বছির নাটকে সোনাইয়ের প্রতিরূপ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। বছির-সোনাই উভয়ে শ্রমজীবী; শ্রেণীগত কারণে তাদের ঘনিষ্ঠতার অনিবার্যতা চিত্রিত হয়েছে। কিত্তনখোলা নাটকে ছায়ারঞ্জন প্রতিবাদী চরিত্র। তার জীবনে আছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। ছায়ারঞ্জনের পিতা পাঞ্জাবীদের হাতে খুন হয়েছিল আর মা ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এই অতীত তাকে সারাক্ষণ যন্ত্রণা দেয়, সে ভুলতে পারে না। তাই সে যাত্রার আসরে নেচে-গেয়ে আর কখনো মদ পান করে অতীত দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকতে চায়। এই চরিত্রটির মাধ্যমে সেলিম আল দীন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করেছেন। কারণ, ব্যক্তিগত ইচ্ছায় ছায়ারঞ্জনের জীবন এমন ছন্নছাড়া হয় নি। ছন্নছাড়া ছায়ারঞ্জন জীবন-জীবিকার তাগিদে নাট্যদলে অভিনয় করে।

মেলায় আসা প্রান্তিক জনগণও সংসার রঙ্গমঞ্চে জীবননাট্যের নট-নটী। জীবিকা উপার্জন প্রধান কথা ছায়ারঞ্জনের কাছে, ধর্ম নয়। তাই জীবিকার প্রশ্নে ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই বলে, ‘আমি মুসলমান হব।’ ছায়ারঞ্জনের এ সংলাপে মূলত প্রান্তিক জনগণের জীবনচিত্র একটি অভিন্ন রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ এরা সকলেই জীবিকার প্রয়োজনে সম্প্রদায়-জাতি-গোষ্ঠীর উর্ধ্বে অসহায় মানব সম্প্রদায়। সমাজের নিম্নবিত্তের মানুষের নিকট জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা বড় কথা, ধর্ম নয়; বরং ধর্ম তাদের কাছে বাহ্যিক অলংকার। প্রান্তিক জনগণ একদিকে ধর্মীয় কুসংস্কারে যেমন বিশ্বাসী তেমনি জীবনের তাগিদে তারা যখন তখন ধর্মের বর্ম খুলেও ফেলতে পারে। অর্থাৎ জীবনের পরিচয় এখানে মারি ও মন্বন্তরে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের নিষ্ঠুরতায় মূর্ত।

কিত্তনখোলা-র বনশ্রী বালা ডোম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। এ চরিত্রটির মাধ্যমে নারী-জীবন ও নিচু বর্ণের সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন নাট্যকার। ডোম সম্প্রদায় আক্ষরিক অর্থেই বাংলা-জনপদের প্রান্তিক ও প্রাকৃতজন। এরা সমাজে অষ্পৃশ্য বা ‘হরিজন’ হিসেবে গণ্য।৮  অন্যদিকে তাদের জীবন-জীবিকার ন্যূনতম নিরাপত্তাও রাষ্ট্র ও সমাজ গ্রহণ করে না। সোজা কথায় ‘হরিজন’রা আধুনিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কোনো সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা প্রভৃতি অধিকারের কথা সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা হলেও ‘হরিজন’রা এর আওতাভুক্ত নয়। কারণ, সংবিধানে তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টিই স্বীকৃতি পায় নি। একই কথা এ নাটকের ডালিমনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ডালিমন লাউয়া সম্প্রদায়ের নারী; এরাও নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিকজন ডোম সম্প্রদায়ের মতো। ডোমদের স্থায়ী বসতি থাকলেও  লাউয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের তাও নেই। এদের পেশা বিভিন্ন ধরনের মনোহারী দ্রব্য-সামগ্রীর ঝাঁকা মাথায় করে গ্রামে গ্রামে ফেরী করে বিক্রি করা। লাউয়াদের স্থায়ী বসতি নেই, নদীর ঘাটে নৌকায় তাদের বসবাস। সুতরাং নাট্যকার অত্যন্ত সচেতনভাবে ডোম-লাউয়া প্রভৃতি সম্প্রদায়ের চরিত্রগুলো কিত্তনখোলা-য় উপস্থাপন করেছেন পরিকল্পিতভাবে। কারণ এসব প্রান্তিক মানুষের শুধু আর্থিক বিবেচনায় নয়, বরং ডালিমন, রুস্তম, বনশ্রী বালা-রা নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়েও নিম্নশ্রেণী পেশার মানুষ। এরা যুগ যুগ ধরেই এ জনপদের শোষিত-বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানব সম্প্রদায়।

কিত্তনখোলা-র পরিণতি দৃশ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের মানুষ জীবন-জীবিকার সন্ধানে দেশান্তরিত হচ্ছে। এখানে নাট্যকার বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখিয়েছেন তারা স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। কেউ কেউ পৈতৃক বৃত্তি, ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-সম্প্রদায় এমনকি স্বীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতিও ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। লাউয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ডালিমন দুঃখ-দৈন্য-দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করেছে কিন্তু সে স্বভূমি, স্ব-জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ত্যাগ করে নি। এখানে নাট্যকার ডালিমন চরিত্রটিকে অসামান্য দক্ষতায় তার গোষ্ঠীগত অহংকারের প্রতীক করে তুলেছেন। তাই ডালিমন সাম্প্রদায়িক অহং বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসা সত্বেও সোনাইয়ের সাথে নদী ছেড়ে ডাঙায় ঘর বাঁধতে রাজি হয় নি। উল্টো করে ডালিমন তার জাতিগত অহংকার প্রকাশ করেছে এভাবে ‘লাউয়ার মাইয়া ডাঙায় কুনদিন ঘর বান্ধে না। বানতে চাইলেও পারে না।৯  অথচ লাউয়া সম্প্রদায়ের রুস্তম নতুন জীবনের সন্ধানে সম্প্রদায়গত অহং ও ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে ‘দুখাইপুরে’ চলে যেতে দ্বিধা করে নি। রুস্তম শুধু জলের বসতি ত্যাগ করে নি; সে তাদের জাতিগত বৃত্তিও ত্যাগ করেছে এবং গ্রহণ করেছে সাপুড়ে পেশাবৃত্তি। আর সোনাই গেরস্তি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে; জমিজমা হারিয়ে রুস্তমের সাথে দুখাইপুরে সাপুড়ে সেজেছে।

কিত্তনখোলা নাটকে সেলিম আল দীন প্রাচীন গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক জনজীবন সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। গ্রাম-বাংলার মানুষ বিভিন্ন ধর্মে-বর্ণে-গোত্রে বিভাজিত হলেও তাদের সমাজ-সংস্কৃতি, সভ্যতা এক ও অভিন্ন। গ্রামীণ মেলার বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করলে তা স্পষ্ট হয়। কারণ, বঙ্গভূমির প্রাচীন ও আদি ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িকতা। মনাই বাবার মাজারও এই অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। হিন্দু-মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনতীর্থ মনাই বাবার মেলা। বর্তমানে পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতিতে মেলার নিয়ন্ত্রক তৈরি হয়েছে। যাত্রাদলের কর্ণধার বা দলপতি সৃষ্টি হয়েছে। এরাই মূলত অর্থনৈতিক দিক থেকে উচ্চবিত্তের মানুষ। যারা সামান্য স্বার্থে, বেঁচে থাকার স্বার্থে কিংবা রোগ নিয়াময়ের মানত করে মেলায় আসে অথচ তাদের অনেকেই এই নব্য উঁচু শ্রেণীর সুবিধাভোগী মানুষ দ্বারা নিগৃহীত হয়। সোনা কাঁপে ইদুর ভয়ে; বনশ্রী ইজ্জতের ভয়ে বিষ পান করে। তেমনি প্রত্যেকটি চরিত্রই নানাভাবে শোষিত হয় কিত্তনখোলা নাটকে।

শামছল বয়াতীর মুখ দিয়ে কৌশলে নাট্যকার সেলিম আল দীন এ নাটকে বাংলা-জনপদের মধ্যযুগের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কিস্সা শুনিয়েছেন। বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য সয়ফল মুলুক বদিউজ্জামান, মহুয়া পালা, রহিম-রূপবান পালা প্রভৃতি। শামছল বয়াতীর পুথির আসর প্রমাণ করে, বাংলার অতীত ঐতিহ্য অম্লান। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক, দর্শক-শ্রোতা মোনাই বাবার মেলায় আগত গ্রামীণ প্রান্তিক জনগণ। প্রান্তিক মানুষ বাঙালির লুপ্তপ্রায় এসব সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে একালেও বহন করে চলেছেন। প্রকৃতি বাঙালিয়ার ধারক-বাহক কবিওয়ালা-সাধু-দরবেশ-ফকির-বাউল সম্প্রদায়ের মানুষ। এরা তাদের ধর্মে-কর্মে-জীবনাচরণেও নিম্নবিত্তের প্রান্তিক জন-মানুষ।

কিত্তনখোলা-য় নাট্যকার অত্যাচারীর বিরুদ্ধে নির্যাতিত মানুষের প্রতিবাদ একটি সামষ্টিক চেতনার দ্যোতনাবাহী। নাটকের অন্যতম চরিত্র সোনাইয়ের বন্ধু পুঁজিহীন বছির ঘানির গরুর মৃত্যুতে বুকে তার স্বজন হারানো ব্যথা লাগে। এজন্য দায়ী ইদু, বছির ভাবে ‘ইদুরে আমি ত্যালের ঘানিতে ফালায়া চিপুম।’ অনুরূপ আক্রোশ ঝরে পড়ে সোনাইয়ের কণ্ঠেও ‘ধরতে ধরতে হাত বিষ করে তাও পাই না-খোদা একবার একবার যদি তারে আমি পাইতাম।’১০ ইদুকে কুপিয়ে হত্যা করে নিঃসংকোচে-অবলীলায় বেঁচে থাকার সাহস পেয়েছে। অথবা তার ভেতর হত্যার জন্য কোনো ধরনের অনুশোচনা হয় নি। এ নাটকের বছির-সোনাইয়ের প্রতিবাদী সংলাপে বুঝে নিতে কষ্ট হয় না- কিত্তনখোলা-র প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ভীষণ রকমের প্রতিবাদী। ইদুকে হত্যার পর সোনাইয়ের কোনো ভাবান্তর পর্যন্ত হয় না বরং ইদুকে মেরে শান্তি পায় সে। বনশ্রী বালা অবশ্য পারে নি সোনাইয়ের মতো প্রতিশোধ নিতে। ছায়ারঞ্জন বাবা-মা’র খুনের বদলা না নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে যেতে চায়। তিন দিনের মেলা সমাপ্ত হলে, নাট্যকারের মঞ্চের আলো নিভে যায়। সুতরাং রঙ্গমঞ্চের নট-নটী ফিরে যায় নিজস্ব গন্তব্যে। তবে সোনাই টুইটাম গ্রামে আর ফেরে না; লাউয়া সম্প্রদায়ের রুস্তমের সঙ্গে দুখাইপুরের দিকে যাত্রা করে। রুস্তম-সোনাইয়ের দুখাইপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা কাহিনীতে একটি প্রতীক নির্মাণ করেছে। সেলিম আল দীন দেখেন, এভাবে দিন বদলের পালায় কামার হয়েছে কুমোর, তাঁতী হয়েছে জেলে, চাষী হয়েছে সাপুড়ে। আমাদের পূর্ব-পুরুষের এই জাতিগত ও ধর্মীয় রূপান্তর যে ঘটেছিল, তা সোনাই-রুস্তমের পরিবর্তিত জীবনচিত্রে ফুটে উঠেছে। বঙ্গ-জনপদের মানুষের এই পরিবর্তনের চিত্রটি নাট্যকার সোনাই-রুস্তমের কথোপকথনে তুলে ধরেছেন এভাবে-

সোনাই    এক জনমে কত বদল কত টেক! কোনে যামু রুস্তম, ক্যান যামু? আইচ্ছা গেলাম  তারপর, তারপরে?
রুস্তম     যাইবেন কিনা কন। হাপ ধরা শিখবেন  লগে ঝাড়ফুঁক তন্তরমন্তর। হাপ বেচবেন, হাপের বিষ বেচবেন। এট্টা গোক্ষুর কম কইরা হইলেও পঞ্চাশ টেকা। …. ঠিক আছে। না গেলেন। (রুস্তম ঘুরে দাঁড়ায়)
সোনাই    রুস্তম!
রু“স্তম     ক্যান  যাইবা  যাইবা  দুখাইপুর?
সোনাই    চল।১১

সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্রম রূপান্তরে গ্রামীণ জনজীবনের পরিবর্তন ঘটে। ‘কৃষকরা এক সময় পরিণত হয় শ্রমজীবী দিনমজুরে, উপকূলীয় দুর্যোগে গৃহচ্যুত, আশ্রয়হীন মানুষের পেশার রূপান্তর ঘটে। কৃষক শ্রমিক দিনমজুরের প্রিয় নেতা মাওলানা ভাসানী পরিণত হয় রূপকথা উপকথা ও পুরাণের স্মৃতিকথায়।’১২ সোনাই চরিত্রটির প্রতীকে নাট্যকার মূলত গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক মানুষের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। এ চরিত্রটি দ্বারা সেলিম আল দীন বোঝাতে চান  জাগতিক নিয়মে পরিবর্তন অনিবার্য। তবে পট পরিবর্তনের ফলে নিরন্ন প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। তারা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পারে না; তারা নিরন্ন ক্ষুধার্তই থেকে যায়। উপরন্তু তাদের জীবনে আর্থিক সংকট আরো তীব্রতর হয় এবং বহুমাত্রিক সমস্যা-সংকট তাদের ঘিরে ধরে। কিত্তনখোলা-র ছিন্নমূল প্রান্তিক জনমানুষ বিভিন্ন বৃত্তে আবর্তিত হয়ে অবশেষে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। পরিবর্তিত-রূপান্তরিত বৃত্তে কখনো তারা ছিন্নমূল, কখনো উদ্বাস্তু আর কখনো ভাসমান মানুষ হিসেবে সমাজে বেঁচে থাকে। বলার অবকাশ রাখে না যে, এরাই বাংলা ও বাঙালির প্রান্তিক জন।

চার.
সেলিম আল দীনের কেরামতমঙ্গল মহাকাব্যিক আয়োজনের নাটক। মহাকাব্যের মতোই কেরামতমঙ্গল-এর বিস্তার স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ব্যাপী। নাট্যকাহিনীর নামকরণ সেলিম আল দীন সচেতনভাবে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য-ধারার রীতি অনুসারে করেছেন। কেরামতমঙ্গল-এর কাহিনীতে মহাকাব্যিক আবহে নাট্যকার অনেক চরিত্রের আমদানী করেছেন। এসব চরিত্রের ছোট-খাট সংলাপের মধ্য দিয়ে কাহিনীকে গতিশীল রেখেছেন এবং একটি বিশেষ ঐকতান সৃষ্টি করেছেন। কেরামতমঙ্গল নাটকে এগারটি খণ্ডে আলাদা আলাদা মূল কাহিনী ও উপকাহিনী আছে; তবে সকল কাহিনীর মধ্যে নাট্যকার একক ঐকতান সুকৌশলে সৃষ্টি করেছেন। তাছাড়াও এ নাটকের ঘটনা ও কালগত ঐক্য রক্ষিত হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন স্থান ও সময়ের কাহিনী-ঘটনার মধ্যেও যথেষ্ট দক্ষতার সাথে নাট্যকার ঐক্য সাধন করেছেন।

ভারতবর্ষের বিভাজনের অল্পকাল পূর্ব থেকে আরম্ভ করে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দিকভ্রান্ত সমাজচিত্র, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রথম পর্যায় পর্যন্ত সময় কেরামতমঙ্গল-এর কাহিনীর বিস্তৃৃত পটভূমি। বাংলা-জনপদের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়-গোষ্ঠী ও নানা জাতের মানুষের সুখ-দুঃখের ঘটনা কেরামতমঙ্গল-এর কাহিনীবৃত্তে স্থান লাভ করেছে। বিশাল কাহিনীতে সমগ্র বাংলাদেশই যেন উঠে এসেছে একটি অখণ্ড মূর্তিতে। কেরামতমঙ্গল-এর কাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান, আদিবাসী হাজং-গারো, জমিদার-প্রজা, মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার, রাজনীতিবিদ-কৃষক-মাঝি থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবীর চালচিত্র নাট্যঘটনায় উপস্থাপিত হয়েছে। কেরামত এই মহাকাব্যিক কাহিনীর কথক। কেরামত বাংলা-জনপদের অতীত ও বর্তমান মানচিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে চলা এক পথিক। নাট্যকাহিনীতে কেরামতের কখনো সক্রিয় অংশ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে চরিত্রটিকে নাট্যকার দর্শক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ নামক একটি রঙ্গমঞ্চের অতীত ও বর্তমানের অভিনীত কাহিনীর দর্শক কেরামত। পথের দু’ধারের দৃশ্য দেখে চলেছে অবিরাম কেরামত। তার দেখা এ জনপদের ইতিবৃত্ত সেলিম আল দীন মোট এগারোটি খণ্ডে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। নাটকের প্রতিটি খণ্ডে যে জীবনচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে তা প্রতীকী অর্থে দোজখ সদৃশ। এ নাটকের দোজখ সম্পর্কে সমালোচক বলেন-

পান্থজন কেরামতের চোখ দেখে কিষ্ট ক্রুর জীবন দোজখ একের পর এক। এ জীবনের শেষ কোথায়? কোথায় সত্য? মানুষের মঙ্গল নিহিত রয়েছে কোথায়? এগারো গণ্ডী, এগারোটি দোজখ অতিক্রম করে সে।১৩

কেরামত যেন এই দোজখ সদৃশ্য রঙ্গমঞ্চ অতিক্রম করে চলেছে স্বর্গের সন্ধানে। কেরামতমঙ্গল-এর দোজখগুলো হলো-

নখলা    সাম্প্রদায়িকতার দোজখ
চন্দ্রকোনা    ছিন্নমূল বা উন্মূল মানুষের দোজখ
ফইট্যামারি    সামন্তবাদের দোজখ
হিজড়া    সামাজিক-প্রাকৃতিক বঞ্চনার দোজখ
হাজোং    প্রতিবাদীর দোজখ
হাজত    জেল স্বরূপে জাগতিক দোজখ
চিগাস্তান    ধার্মিক মিশনারীদের সৃষ্ট দোজখ
রাজাকার    মৌলবাদের দোজখ
জলসুখা লঞ্চঘাট
ও বিবাহ    নিরাশার দোজখ
কুসুমপুর    অর্থহীন স্বাধীনতার দোজখ
চানতারা    আর্ত-হাহাকারের দোজখ

নখলা খণ্ড- সাম্প্রদায়িকতার দোজখ। এ পর্বেই নাট্যকার কথক কেরামতের অতীত বর্ণনা করেছেন। কেরামতের জীবনের সাথে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প জড়িয়ে আছে। হিন্দু-মুসলিম ‘রায়টে’ নখলার নিরন্ন প্রান্তিক মানুষের ঘর-বাড়ি, জমি-জমা বেদখল হয়ে যায়। দাঙ্গায় কেরামতের বাবা-মা মারা যায়। এরপর গ্রামের শক্তিশালী মুসলমান তালুকদার ও হিন্দু মহাজনের কূটচক্রান্তে কেরামত এবং সর্বহারা  অধরচন্দ্র স্ব-গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়। কেরামতের যাত্রা শুরু এই সাম্প্রদায়িকতার দোজখ থেকে। নাট্যকারের এই প্রতীক ১৯৪৭ সালের দেশ-বিভাজনকে ঘিরে। কারণ, ধর্মভিত্তিক ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির ফলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল। সেলিম আল দীন কেরামতমঙ্গল-এর কাহিনীবৃত্তের বাস্তবতার অন্তরালে রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহ এঁকেছেন।

চন্দ্রকোনাখণ্ড-  ছিন্নমূল অথবা উন্মুল মানুষের দোজখ। নিজ গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে কেরামত আশ্রয় নেয় তার খালার বাড়ি চন্দ্রকোনা গ্রামে। এখান থেকে শুরু হয় কেরামত দর্শকের ভূমিকা। সে দেখে  খালাতো বোন নওশাদ বন্ধ্যাত্বের অভিযোগে স্বামীহারা হয়েছে। কিন্তু পেটের দায়ে তালুকদার বাড়িতে নওশাদী কাজ করতে গিয়ে গর্ভবতী হয়। তার পেটের সন্তান নষ্ট করে দেয়া হয় গণেশ কবিরাজের ওষধ দিয়ে। অতঃপর নওশাদী কলঙ্কিনীর অভিযোগ নিয়ে গ্রাম ছাড়া হয়। করমচা গাছের তলায় পুঁতে রাখা অপুষ্ট ভ্রূণটিকে কলাপাতায় মুড়ে নিয়ে আসে কেরামত। ভ্রূণটিকে কেরামত ইসলামী প্রথানুযায়ী কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করলে তালুকদার তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকেও গ্রাম ছাড়া করে। নিঃস্ব কেরামতের সাথে মুচিপাড়ার সর্বহারা মানুষগুলোকেও উৎখাত করে জোতদার।

ফইট্যামারি খণ্ড- সামন্তবাদের দোজখ। এখানে সেলিম আল দীন তুলে ধরেছেন কলকাতা থেকে আসা জমিদার চুন্নু মিয়ার অত্যাচারের ইতিবৃত্ত। জমিদারের আগমন উপলক্ষে খোসাল খান মহল জুড়ে নানা রঙের সাজগোজ দেখতে যায় কেরামত। উৎসুক দৃষ্টিতে কেরামত জমিদার বাড়ির সাজসজ্জা দেখতে গেলে জমিদারের লাঠিয়ালদের সাথে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে জমিদারের নির্দেশে সে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। কেরামতের চোখে-মুখে জমিদারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন। কেরামতের অন্তরে রয়েছে জমিদারদের বিরুদ্ধে ‘দুইশো বছরের ঘৃণা।’ ঘৃণা নিয়ে কেরামত মাঝরাতে ফইট্যামারি গ্রাম ছাড়ে। এসময় ছামেদ জিজ্ঞেস করে  ‘কুনু যাবি তুই।’ ছামেদের প্রশ্নের উত্তরে কেরামত জানায়, ‘কুত্তার নগে থাকুম, গাছতলায় হুমু। জমিদারে দেহনের শখ আছাল, মিট্যাগেছে।’১৪ সামন্তবাদের নির্যাতনের অসামান্য চিত্র ফুটে ওঠে কেরামতের বক্তব্যে। এটি শুধু কেরামতের নিয়তি নয়, এটা মূলত প্রান্তিক জন-জীবনের চিত্র।

হিজড়া খণ্ড- সামাজিক-প্রাকৃতিক বঞ্চনার দোজখ। কেরামতের সঙ্গে অল্পবয়সী এক হিজড়ার সাথে দেখা হয় মাঘ মাসের শীত-রাতে। হিজড়া নিজেকে কেরামতের কাছে মদিনা সুন্দরী হিসিবে পরিচয় দেয়। হিজড়া মদিনার ছলাকলায় কেরামত ভাঙা দালানে দুই টাকার বিনিময়ে তার সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে চাইলে সে আবিষ্কার করে মদিনা প্রকৃতপক্ষে নারী বা পুরুষ নয়। সঙ্গম ব্যর্থ কেরামত হঠাৎ করেই আরেক প্রাকৃতিক অসহায়ের প্রতি গর্জে ওঠে এবং বলে, ‘দুইন্যার সব হুইয়ারের বাচ্চারা আমারে ঠক দিছে।’১৫ যৌন-উত্তেজনা প্রশমিত হলে কেরামতের হৃদয় সমব্যথী হয়ে ওঠে হিজড়ার প্রতি। আত্মগ্লানিতে নিজেকে ধিক্কার দেয় কেরামত এবং হিজড়ার সাথে বসবাসের ইচ্ছা পোষণ করে। কিন্তু এরপর প্রকৃতির বিরুদ্ধে রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে এবং আত্ম-যন্ত্রণায় নিরুদ্দেশ হয় হিজড়া। তখন সর্বহারা কেরামতের কণ্ঠে প্রাকৃতিক বৈরিতার শিকার মদিনার জন্য মমতাভরা কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে-

দুকখিত মদিনারে আদর দেও বাবা, আর না অয় দেও, তোমার তারার ফুলকি আগুনে জালায়া দেও ঠকগো ঘর বাড়ী। না অয় দেও আমার এই পাঁচ আঙ্গুলে পাঁচ সইলতা এত দুখ যে সংসারে হে সংসারে আমি আগুন নাগায়া দেই।১৬

প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেমন করবার কিছুই নেই মদিনার; তেমনি সামাজিভাবে বঞ্চিত মানুষ কেরামতের ব্যর্থ ক্ষোভ ও আত্মশ্লাঘা ছাড়া কিছুই করবার ক্ষমতা নেই। মদিনা প্রাকৃতিকভাবে অসহায়; তার এই অসহাযত্ব তাকে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে আত্ম-মর্যাদা নিয়ে নিঃস্ব মদিনা নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছে।

হাজোং খণ্ড- প্রতিবাদীর দোজখ। কেরামত যেন এক পর্যটকের মতো বঙ্গভূমিব্যাপী ঘুরে বেড়ায়। আর দেখে নানা ঘটনা ও দৃশ্যাদি। কেরামতের গমন-পথে দৃষ্টি-সীমায় আসে হাজংদের দেশ। এখানে তার আগমনের উদ্দেশ্যও অবশ্য সেলিম আল দীন ব্যক্ত করেছেন। কেরামত স্ব-ভূমি থেকে উৎক্ষিপ্ত এক বঞ্চিত মানুষ। সে চেয়েছিল হাজং সম্প্রদায়ের সাথে জঙ্গল পরিস্কার করে সেখানেই গেরস্তি করতে। কেরামতের এই সদিচ্ছা হাজং সম্প্রদায়ের জানার কথা নয়। তারা তাকে বাঙালি গুপ্তচর সন্দেহে আটক করে এবং বেদম প্রহার করে। হাজং সম্প্রদায় তখন সংগ্রাম করছিল জমিদারের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। হাজংরা জমিদারদের বিরুদ্ধে, খাজনার বিরুদ্ধে সর্বোপরি তাদের ওপর শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হয়েছে। অবশ্য হাজং সম্প্রদায়ের সাথে জমিদারের বিরোধের আরেক কারণ হচ্ছে বাঙালিদের প্রতি হাজং সম্প্রদায়ের অবিশ্বাস। কিন্তু এ সময় তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় আধিপত্য বজায় রাখতে পুলিশী নির্যাতন শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানী পুলিশের অত্যাচারের করুণ বিবরণ শুনে কেরামত অবশেষে নিজেও হাজংদের পক্ষাবলম্বন করে। ভিন্ন জাতি-সম্প্রদায় হলেও কেরামত ন্যায়ের পক্ষে সোচ্চার হয় এবং হাজংদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কেরামত পুলিশের হাতে বন্দি হয়।

হাজত খণ্ড- জাগতিক জেল-দোজখ। হাজং সম্প্রদায়ের সাথে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যোগ দিয়ে কেরামত পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং বিনা বিচারে জেল হাজতে প্রায় আট বছর কাটায়। হাজতে বসে কেরামত অতীতের স্মৃতিচারণ করে আর মুক্তির জন্য অপেক্ষা করে। হাজতে তার পরিচয় হয় আজমত ডাক্তারের সাথে। ঘুষ খাওয়ার অপরাধে পুলিশকে পিটিয়ে আজমত হাজত-বাস করছে। তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে কেরামতের। আজমত তাকে আশ্বাস দেয়, তারা মুক্তি পেলেই কেরামতকে সে লেখাপড়া শেখাবে, কম্পাউণ্ডার বানাবে এবং গারোদের দেশে গিয়ে দু’জন মিলে বসতি গড়ে তুলবে। তারপর একদিন কেরামত ‘হাজতের হাবিয়া দোজখ’ থেকে মুক্তিলাভ করে এবং মুক্তির স্বাদ উপভোগ করার লক্ষ্যে কেরামত রওনা দেয় ময়মনসিংহের দিকে।  হাজত খণ্ডের কাহিনী এভাবেই সমাপ্ত হয়েছে।

চিগাস্থান খণ্ড-  ধার্মিক মিশনারীদের সৃষ্টি করা দোজখ। কেরামত এবারে এসে পৌঁছায় ময়মনসিংহে, এখানে সে ডাক্তার আজমতের কম্পাউণ্ডার হিসেবে কাজ শুরু করে। যে অঞ্চলে গারোদের বসতি তার নাম চিগাস্থান। নাট্যকার সেলিম আল দীন এ খণ্ডের কাহিনীতে মূল দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখিয়েছেন প্রাকৃতজনের ধর্ম বিশ্বাসের সাথে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মের দ্বন্দ্বকে। এখানে গারোদের সনাতন ধর্ম-বিশ্বাসকে ধ্বংসের চক্রান্তে লিপ্ত খ্রিস্টান মিশনারীরা। তারা গারোদের দারিদ্র্যের সুযোগ গ্রহণ করে তাদেরকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার অপচেষ্টায় রত। কিন্তু একদিন এই নিরন্ন মানুষগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে নব্য খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত আদিবাসীদের ওপর। অন্যদিকে কেরামতকে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তাদের দলের লোক বলে প্রচার করে। সর্বহারা কেরামত শৈশব থেকে ধর্মের নিষ্ঠুরতা দেখেছে; ফলে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখে কেরামত ধর্মের প্রতি আরো বিরাগভাজন হয়ে ওঠে। তবে নিঃস্ব কেরামত এক পর্যায়ে প্রাকৃতজনের সাথে নিজের ঐক্য সাধন করে আদিবাসীদের পক্ষাবলম্বন করে। গারোদের চিগাস্থানে যখন ধর্ম নিয়ে দ্বন্দ্ব-কলহ চরম আকার ধারণ করেছে, তখন কেরামত একদিন বেতারে শোনে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ঝিনাই নদীর ওপারে অবস্থান নিয়েছে, বঙ্গভূমি জ্বলে উঠেছে মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। কেরামতও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় পাকিস্তানীদের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির আশা নিয়ে।

রাজাকার খণ্ড- মৌলবাদের দোজখ। মুক্তিযুদ্ধের সময় কেরামত রাজাকারদের হাতে বন্দি হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ সর্বহারা উজ্জীবিত করে; সে নিজের ভেতর শুনতে পায় কামানের গর্জন। সর্বহারা বাঙালির পক্ষে কেরামত; তাই সে পাকিস্তানী কমাণ্ডারের নির্দেশ মতো গুপ্ত সংবাদ দাতা হতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বন্দি করে রাজকাররা। তার ওপর শারীরিক অত্যাচার করে। আবারো কেরামতের বন্দি জীবন এবং মুক্তির প্রহর গুনে অপেক্ষা করা। প্রান্তিক বাঙালির ওপর পাকিস্তানী শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন দৃষ্টে কেরামতের মন যেন আপনা-আপনি গেয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’

জলসুখা লঞ্চঘাট ও বিবাহ খণ্ড-  নিরাশার দোজখ। দেশ স্বাধীন হলো একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীন দেশে কেরামতের জীবিকা চলে বই ফেরী করে। সদ্য স্বাধীন দেশের নানা সংকট নিয়ে কথা বলে কেরামত সাধারণ মানুষের সাথে। তাদের নিকট কেরামত শোনে  সোনা মিয়ার মাছের আড়তে মেয়েদের ওপর নির্যাতনের কথা। কেরামতের কানে আসে এক শারীরিক নির্যাতনের শিকার এক নারীর আর্তনাদ। নুরজাহানকে নিয়ে হাসপাতালে যায় কেরামত। নুরজাহানের পেটের বাচ্চাকে রক্ষা করতে না পারলে নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে বাঁচায় তাকে। নুরজাহানের ভ্রুণটি নদীর ধারে দাফন করে আর ভাবে কেরামত নওশাদীর যে ভ্রুণটি সে দাফন করতে পারে নি, সেই ভ্রুণের সাথে নুরজাহানের ভ্রুণটির মিলন ঘটে। স্বাধীন দেশে প্রান্তিকজনের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের দৃশ্য দেখে কেরামতের কাছে স্বাধীনতার অর্থই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পরে সে নুরজাহানকে বিয়ে করে। শেষ পর্যন্ত নুরজাহান রক্তক্ষরণজনিত কারণে মারা গেলে কেরামত অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ তথা প্রান্তিক মানুষের নৈরাশ্যই একমাত্র সত্য হয়ে উঠেছে।

কুসুমপুর খণ্ড- অর্থহীন স্বাধীনতার দোজখ। কেরামত রওনা দেয় নুরজাহানের লাশ নিয়ে কুসুমপুরের উদ্দেশ্যে। মৃত স্ত্রীর পাশে বসে কেরামত অনর্গল কথা বলতে থাকে। কেরামতের এই আহাজারিতে প্রাকৃতজনের জীবনসত্য প্রকাশ পেয়েছে এভাবে, ‘এইটা সুখের নাও না, গুদারা না, এইটা দুঃখের নাও, এ নাওতে বেরাঙ্গনার লাশ, এই লাশ কুসুমপুরে যায়।’১৭ ধর্ষিতা বীরাঙ্গনার কথা শুনে নদীর ধারের সাধারণ মানুষ সমবেদনা জানায়; আর কেরামত ভাবে চিরকাল সোনামিয়ারা টিকে থাকে তারা মরে না, ‘নইলে কি ভুরুণ খসে গবভপাত অয়  দুলদুলের শইল্যে একশ এট্টা তীর হান্দায়, থুক থুক সোনামিয়ারে থুক জয়বাংলারে থুক; দোজখের গণ্ডীর শ্যাষ নাই সংসারে।’১৮ কেরামতের এই আত্মদহনই প্রাকৃতজনের নিকট স্বাধীনতার স্বাদ।

চানতারা খণ্ড-  আর্ত-হাহাকারের দোজখ। কেরামত এরপর গমন করে চানতারা গ্রামে। এখানে এসে সে জানতে পারে আহত মুক্তিসেনার মুখে স্বাধীনতা বাংলাদেশ তাদের (প্রান্তিকজনের) জীবনে কোনো সুখ বয়ে আনে নি। কেরামত চানতারা গ্রামে আশ্রয় পায় নেতাই ফকিরের ঘরে। এখানে শোনে নেতাই ফকিরের মেয়ে শমলার করুণ জীবন-কাহিনী। গোসল করতে গিয়ে কানের দুল হারিয়ে ফেলার অপরাধে স্বামী ও শ্বশুরের হাতে নির্যাতনে শিকার হয়। এই সামান্য অপরাধে তাকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। একদিকে অপ্রকৃতস্থ মেয়ে শমলা সুস্থ হতে চায়। অন্যদিকে নেতাই ফকিরের ছেলে ছোভান ডাকাতি করতে গিয়ে নিহত হয়। এর মধ্যে একদিন জানাজানি হয় পাগলা বসিরের সন্তান শমলার গর্ভে। বাবা নেতাই ফকির মেয়েকে কলংকের হাত থেকে ভ্রুণ হত্যা করতে চাইলে কেরামত বাধা দেয়। কিন্তু নেতাই মেয়ের গলা টিপে ধরলে নিরুপায় কেরামত বাধ্য হয় শমলাকে গর্ভপাতের ওষধ খাওয়াতে। পরদিন কেরামতের ঘাড়ে চাপে বসিরের কৃতকর্মের দায়। এই অপরাধে ছেঁড়া জুতো গলায় পরিয়ে এবং দু’চোখ অন্ধ করে দেয়। কেরামত হয়ে ওঠে যেন গ্রীক ট্র্যাজেডির নায়ক ইডিপাস। চারপাশে জনতার ঢল; কেরামত তখনো চায় দোজখের গণ্ডী পার হতে, আরো শাস্তি চায় নিজের, তথাপি অন্যের জন্য তার কণ্ঠে আর্শীবাদ  ‘আদম সুরত বেবাক মায়ের গব্ভে শক্তি দিক আরাম দিক। শমলার পোলা য্যা ফিরা আহে নানার ভিটায়।’১৯ এভাবেই কেরামত একের পর এক দোজখ অতিক্রম করে; শেষ পর্যন্ত নিজেই সমগ্র কাহিনীর ট্র্যাজিক হিরো হয়ে ওঠে।

কেরামতমঙ্গল-এ সেলিম আল দীন মহাকাব্যিক দক্ষতায় সত্তরটি চরিত্রের সফল সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এ নাটকের নায়েব, চুন্ন মিয়া এবং উডওয়ার্ড ছাড়া বাকি ৬৭টি চরিত্রই নিচু শ্রেণীর, তথা প্রান্তিকজন। নাটকের অনেক চরিত্রের মিছিলে কেরামতের অবস্থান একাধারে কথক ও নায়কের। জনম দুঃখী কেরামত যেন সাত দোজখ প্রদক্ষিণরত এক মহান চরিত্র। কেরামত মহান মানুষের রূপান্তরিত চরিত্র স্বরূপ। তাই সবার জন্যই দরদ, সকলের জন্যই তার অন্তর কেঁদে ওঠে। কেরামতমঙ্গল-এ বিভিন্ন সময়-প্রেক্ষিতে ক্লান্তিহীন পর্যটক কেরামতের সর্বহারা জীবনাভিজ্ঞতায় সমাজ-জীবনের শোষণের চালচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেলিম আল দীন কেরামতমঙ্গল-এর দর্শন বিষয়ে লিখেছেন-

যে এই নাটক দেখে সে যেন শমলার অপরিপুষ্ট ভ্রুণের নিরাপত্তা বিধান করে। পৃথিবীর সমস্ত ভ্রুণের জন্য যেন সে মমতার হাত বাড়ায়। মানবজনমকে সামাজিকগণ যেন স্বাগত জানায়। এই নাটক দর্শনে বন্ধ্যা নারী যেন ফলবতী হয়।২০

কেরামত বঙ্গভূমির সকল বঞ্চিত-দুস্থ-নির্যাতিত মানুষের প্রতিনিধি। কেরামত তাই কখনো দাঙ্গা-বিধ্বস্ত কৃষক, কখনো ক্লীব হিজড়ার সঙ্গী, বিদ্রোহী হাজং সম্প্রদায়ের অধিকার আন্দোলনের মিছিলে, গারোদের বন্ধু, বারাঙ্গনার দয়িত, কিংবা ভ্রুণ-নষ্ট করা হতভাগিনীর পিতা। নাট্যকাহিনীতে এসব কেরামতকে ঘিরে উন্মোচিত হয়েছে দেশ-কালের চিরন্তন মনুষ্যত্ববোধ ও আদর্শ। এই আদর্শের তাড়নায় কেরামত বোন নওশাদীর, স্ত্রী নূরজাহানের ও কন্যাপ্রতিম শমলার ভ্রুণরক্ষার প্রচেষ্টা চালায়। নাট্যকার কেরামতের জীবনের অভিজ্ঞতাকে ভ্রুণ-হত্যার যন্ত্রণায় নরকবাসের সমতুল্য রূপে চিত্রিত করেছেন। অন্যদিকে ভ্রুণ-রক্ষার আদর্শিক প্রয়াসে নিহিত আছে নরক-যন্ত্রণা থেকে পান্থ কেরামতের বেরিয়ে আসার উপায়। তার মানবিক বোধ, মানসিক কারুণ্য, অপরের প্রতি সহানুভূতি কেরামতের সর্বস্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার সঙ্গিনী হিজড়া, সেই ক্লীবের জন্যও তার সমবেদনা; তার বউ ধর্ষিতা মুমূর্ষু নারী, স্ত্রীর মৃতদেহ নিয়ে নৌকা ভাসাতে হয় কুসুমপুরের উদ্দেশ্যে; কন্যাপ্রতিম মেয়ে শমলার ভ্রুণ-রক্ষার ব্যর্থতায় গর্ভপাতের দায় তাকেই বহন করতে হয়। কেরামতমঙ্গল-এর জনতার লাঞ্ছনা কেরামতকে করে তুলেছে একালের যীশু। স্ব-শ্রেণীর দুঃখ-কষ্ট আপন অঙ্গে ধারণ করে কেরামত যেন যীশুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তার যাত্রা পথে আকাশে জাগে পূর্ণিমার চাঁদ, দূরে চৈত্রসংক্রান্তির ঢোল- পবনে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। এ প্রতীকে মানব-জীবনের নব-উদ্যমে জেগে ওঠার আহ্বান ইঙ্গিতে আভাসিত হয়েছে। বলার অবকাশ রাখে না যে, মহান দ্রষ্টা কেরামত স্বয়ং প্রান্তিকজন এবং নিম্নবিত্তের মানুষের প্রতিনিধি। কেরামত সমাজ-জীবনের দোজখ স্বরূপ পাপ-পঙ্কিলতার ভিতর দিয়ে যে পথ অতিক্রম করেছে তা নব-জীবনের আশার দীপ জ্বালায়।

পাঁচ.
সেলিম আল দীন-এর হাত হদাই বাংলা নাট্যধারায় প্রবর্তিত কথানাট্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। রূপকথার সার আরব্য রজনীর কাহিনী, সিন্দবাদের দুরন্ত ভ্রমণগাথা, পাশ্চাত্যের ওডিসি ও ঈনিড ভাবরস পানে মুগ্ধ সেলিম আল দীন হাত হদাই নাটক রচনা করেছেন। বঙ্গভূমির সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মৌখিক শব্দ ‘হাত হদাই’; এর আক্ষরিক অর্থ- সাত সওদা বা সপ্ত বাণিজ্য। নাটক হাত হদাই কোনো বাণিজ্য কাহিনী নয়। নাটকে সেলিম আল দীন বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রান্তিক মানুষের জীবনসত্য ও জীবন সংগ্রামের বাস্তব আলেখ্য তুলে ধরেছেন।

দক্ষ নাবিক তরঙ্গের বিক্ষুব্ধতার মাঝে যেমন যুদ্ধ করে তেমনি বঙ্গভূমির উপকূলবর্তী প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ জীবনযুদ্ধ ও নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত। হাত হদাই-এর প্রেক্ষাপট নোয়াখালী অঞ্চল। নিত্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই যাদের জীবন, তারা সাহসী এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সমুদ্র-জাহাজে নোয়াখালির অনেকে চাকরি করে। হাত হদাই-এর মূল কাহিনী এ অঞ্চলের বৃদ্ধ নাবিক আনার ভাণ্ডারিকে ঘিরে। যৌবনে পৃথিবীর নানান বন্দরে ঘুরেছে ভাণ্ডারি। বয়সের অভিজ্ঞতায় আনার ভাণ্ডারি সব সময় সাধারণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উৎফুল্ল মেজাজে থাকতে চাইতেন; কিন্তু একদিন তাকেও মৃত্যু-যন্ত্রণা ঘিরে ধরে। আনার ভাণ্ডারির পরলোক-চিন্তা এখন প্রধান কাজ। এ সময় সহজিয়া কায়াপন্থী মছলন শা’ তার সুযোগ নেয়। জীবন-রসিক আনার বুঝতে পারে  দৈনন্দিন যে জীবনপ্রবাহ তাতে প্রকৃতির বা ঈশ্বরের কাছে তার কোনো অন্যায় নেই। আনার ভাণ্ডারি জীবনকে ভালোবাসে; যা যৌবনে সে উপভোগও করেছে জীবনের স্বাদ। কালের রাহুগ্রাসে ব্যক্তির যে বিপর্যয় তা থেকে রা পায় নি আনার ভাণ্ডারি। মুর্মূষু আনার ভাণ্ডারি শেষ পর্যন্তু মৃত্যুর কাছে আত্ম-সমর্পণ করে। নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে রাখতে চায় ভাণ্ডারি। গোর-খোদকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আবারো তার মধ্যে জেগে ওঠে জীবন-তৃষ্ণা। বার্ধক্যেও তাই আনার ভাণ্ডারি শ্যালিকা অঙ্কুরীকে নব-জীবনের অভিসারে আরেকবার ঘর বাঁধে চরটুবায়।

হাত হদাই অর্থ ‘সাত সওদা’ বা সপ্ত বাণিজ্য হলেও এ নাট্যকাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে মাত্র দুটি সমুদ্র ভ্রমণ-উপাখ্যান। নামকরণে দিক থেকে ভ্রমণের গল্পের সংখ্যাগত মিল নেই। ভাবগত দিক থেকে এবং বৃহৎ অর্থে আঙ্কুরীর সঙ্গে আনার ভাণ্ডারির প্রণয় যেমন একটি বাণিজ্য তেমনি নাটকের পাত্র-পাত্রীরা তো সকলেই জীবন-বাণিজ্যে লিপ্ত। এ বাণিজ্যের আরেক নাম জীবন-সংগ্রাম। হাত হদাই-এ আনার ভাণ্ডারি, হাস্না, চুক্কুনী, ইদ্রিস, লুত্তা, ছিদ্দা, মালু হাবজ প্রমুখ চরিত্রের অন্তর-চেতনা এক একটি সমুদ্রের প্রতীক। এজন্য হাত হদাই-এর প্রান্তিক জন-জীবনে জাগতিক বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য কোনো বিষয় নয়। হাত হদাই-এর কোনো বিশেষ চরিত্রের ক্ষেত্রে শুধু প্রযোজ্য নয়, বরং সমস্ত চরিত্রের সমুদ্র-ভূগোলের প্রতীকে দ্যোতিত হয়েছে।

হাত হদাই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র আনার ভাণ্ডারির অসীম ব্যাপকতা, দিগন্ত বিস্তৃৃত প্রাণোচ্ছ্বলতা ঘটনার প্রাণকেন্দ্র। তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কাহিনীর অন্যান্য চরিত্র। তাদের ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, প্রেম, দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রভৃতি ঘটনায় কাহিনী মুখর হয়ে উঠেছে। প্রতিটি চরিত্রের আগমন যেমন স্বাভাবিক তেমনি সহজে তারা নাটকের কেন্দ্রীয চরিত্রের সাথে একটি ঐকতান গড়ে তোলে। হাত হদাই-এর সব চরিত্রই আনার ভাণ্ডারির সাথে সরাসরি জড়িত। তার সাথে জড়িত চরিত্র সামাজিক সম্পর্কের সূত্রে নানাভাবে গ্রথিত। নাটকে আনার ভাণ্ডারির প্রথম পর্রে অকর্মণ্য পুত্র ছিদ্দা, স্নেহময়ী পুত্রবধূ বেগমী, দ্বিতীয় ঘরের ছন্নছাড়া পুত্র জামাল, পুত্রতুল্য মোদু, মোদুর প্রণয়ী হাস্না, বজলু এবং তার দুখিনী বোন চুক্কুনী। এ ছাড়াও ইদ্রিছ, লুত্তা, নাডু, লেদন, মালু হাবজের মতো আরো অনেকে। এসব মানুষ একাধারে নিম্নবিত্তের এবং শোষিত  শ্রেণীর। এদেরও রযেছে আলাদা একটি জীবন, নিতান্ত নিজস্ব কিছু স্বপ্ন-সাধ। উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রামা ঝ্ঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে বিপন্ন নাবিকের চেয়ে কোনো অংশে কম বলার অবকাশ নেই। তাই হাত হদাই বাংলাদেশের  অন্ত্যজ তথা প্রান্তিক মানুষের জীবন-সংগ্রামের সুন্দর চিত্র।

হাত হদাই-এ সেলিম আল দীন ছোট ছোট ঘটনার সমন্বয়ে চরবাসী উপকূলবর্তী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের একটি প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন। উপকূলবর্তী প্রান্তিক মানুষের জীবন-বাস্তবতা  নাডু কচ্ছপ শিকার করে পেট চালায়, অথচ মৃত বড় ভাইয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার পর সামাজিক বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করেই সীতা বৌদির গলায় মালা পরিয়েছে। একদা মালু হাবজ মরণাপন্নদের ধর্মের বাণী শুনিয়েছে, অথচ সে নিজে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুভয়ে কেঁপেছে। মছলন শা’ আনার ভাণ্ডারিকে কাফনের কাপড় কাছে রাখার পরামর্শ দিতে কুণ্ঠা করে নি, সেই মছলন শা’ নিজেও ছুটে যায়  নারী-সংস্পর্শের খোঁজে। দ্বিতীয় স্বামীর ঘর ভেঙে যাওয়ার পরও চুক্কুনীর হৃদয়ে ধর্মবোধ জাগে নি; বরং উল্টো করে মৃত্যুকালে অবলীলায় উচ্চারণ করে, ‘তৌবার কপালে আমি ছ্যাপ মারি।’ আনার ভাণ্ডারি অসাধারণ জীবন-তৃষ্ণা নিয়ে উচ্চারণ করেছে  ‘বাঁচনরে এত ভালা লাগে কা?’ হাত হদাই নাটকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-পিয়াসা যেমন আছে, তেমনি আছে মৃত্যুর বিভীষিকা, দুঃখের যন্ত্রণা। এখানে নাট্যকার সেলিম আল দীন দেখিয়েছেন জগত-সংসারে জীবনযুদ্ধে কেউবা জয়ী হয়েছে, আবার কারো গলায় পরাজয়ের মালা। কিন্তু সংগ্রাম অনিবার্য সবার জন্যই। এ জীবন-সংগ্রাম হাত হদাই-এর বঙ্গের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনসত্য।

হাত হদাই নাটকে সেলিম আল দীন বঙ্গ জনপদের উপকূলবর্তী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র উপস্থাপন করেছেন। এরা সকলেই দরিদ্র; দুঃখে-কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করে, তবু তারা জীবন ভালোবাসে। কেউ মরতে চায় না। এখানে জীবন দুঃসাহসী, নিত্য সংগ্রাম-মুখর। এক নিরাভরণ গল্পের মাধ্যমে নিম্নবিত্তের মানুষগুলো স্বরূপ উন্মোচন করে দেখিয়েছেন নাট্যকার। আনার ভাণ্ডারি স্বপ্নচারী দরিদ্র এই জনগোষ্ঠীর জীবন্ত প্রতিভূ। হাত হদাই নাটকে সেলিম আল দীন সমুদ্র উপকূলবর্তী ‘নোনা দেশের নোনা স্বাদের’ প্রান্তিক জন-জীবনের আখ্যান রচনা করেছেন।

ছয়.
চাকা সেলিম আল দীন-এর লোক-নাট্যরীতি অবলম্বনে রচিত একটি মর্মান্তিক নাটক। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ও গণতন্ত্রের বিজয় এ নাটকের প্রেক্ষাপট। এই গণ-অভ্যুত্থানে অনেক দ্রোহী যুবক শাহাদৎ বরণ করে; কিন্তু তাদের সকলের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায় নি, অনেকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন-কাফন পর্যন্ত পায় নি। কোনো কোনো ভাগ্যবানের মৃতদেহ আমাদের প্রান্তিকজনের সদিচ্ছায় কবরের মাটি পেয়েছে। নিম্নবিত্তের প্রান্তিক খেটে-খাওয়া মানুষের স্বাভাবিক মানবতাবোধের কারণে ঐসব ভাগ্যবানের মৃতদেহর সৎকার হয়েছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে নাম-পরিচয়হীন এরকম এক ভাগ্যবান যুবকের লাশ বাংলার এক গ্রামের উদ্দেশ্যে গরুর গাড়িতে তুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। গাড়ি রওনা হয়ে যায়, কাগজে অস্পষ্টভাবে লেখা ঠিকানার উদ্দেশ্যে। গাড়ির চাকা অবিরাম ঘুরে চলে কিন্তু গারোয়ান মৃত যুবকের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে পারে না। গারোয়ানের এই অবিরাম পথ চলা ও মৃত যুবকের বাড়ির সন্ধান করাই চাকা নাটকের বিষয়বস্তু।

সেলিম আল দীনের নাট্যোপাদান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তব ও সমকালীন জীবন থেকে আহরিত। সমকালীন সমাজ-জীবনের ভেতর দিয়ে নাট্যকার রওনা হন বাংলার প্রাচীন সমাজ-জীবন ও প্রান্তিক মানুষের জনপদে; যেসব মানুষের বসতি ওতোপ্রতোভাবে ভূমির সাথে সম্পৃক্ত, তারাই হয়ে ওঠে সেলিম আল দীনের নাটকের প্রাণ। তাঁর নাট্যকাহিনীতে জীবনের গভীর উপলব্ধি পাওয়া যায়। তাঁর চাকা নাটকে উঠে এসেছে প্রান্তিক সাঁওতাল সম্প্রদায়ের দুই গাড়োয়ানের চিরায়ত মানবতাবোধ। চাকা এমন এক সমাজের কাহিনী যে-সমাজে লাশের সৎকারের ঠিকানা মেলে না। সমালোচক চাকা-র সমাজ সম্পর্কে মন্তব্য করেন-

বেওয়ারিশ লাশের একটি আশ্রয় চাই, চাই সৎকারের মর্যাদা, মানবিক দায়বোধহীন শাসন ব্যবস্থায় সংসারের কেজো লোকেরা তার গুরুত্ব অনুধাবনে অক্ষম। সভ্য সমাজ মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্ববান হবে এটাই কাম্য। জীবিত মানুষের প্রতি কর্তব্য পালনে অভাবনীয় অনীহা যাদের তারা মৃতের জন্য কোনো দায়িত্ববোধ করে না। সেলিম আল দীন তাঁর নাটকে উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ ও সামাজিক মানুষকে দেখেছেন।২১

চাকা নাটকের কাহিনীবৃত্তে সেলিম আল দীন গ্রাম-বাংলার নিম্নশ্রেণীর ও নৃ-তাত্ত্বিক প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। গ্রামের মানুষ সন্তানকে শহরে উচ্চ-শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়ার জন্য পাঠিয়ে নিয়ত উৎকণ্ঠা-উদ্বিগ্ন থাকে; কারণ তারা জানে না কার সন্তান কখন লাশ হয়ে বাবা-মা’র ঠিকানায় আসবে! একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শেষে যেমন মানুষ অধীর উৎকণ্ঠায় প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষা করেছে, একই অপেক্ষার পালা স্বৈরশাসনামলেও ছিল; না-জানি কার সন্তান কখন লাশ হয়ে ঘরে ফেরে! স্বৈরতন্ত্রের দুঃসময় চাকা-র কাহিনীতে ব্যক্ত করেছেন নাট্যকার। নাট্যকাহিনীর গতি বাংলার গ্রামীণ জনপদের দিকে। অপরিচিত এক যুবকের লাশ গরুর গাড়িতে বয়ে চলেছে দুই গাড়োয়ান। লাশ গ্রাম থেকে গ্রামে বয়ে নিয়ে যেতে যেতে দুই গারোয়ানের সাথে ঐ অপরিচিত যুবকের মৃতদেহের অজানা এক টান অনুভূত হয়। গারোয়ানদ্বয়ের হৃদয়ে মানবিকতা জেগে ওঠে, তারা ঐ বেওয়ারিশ যুবকের লাশের সাথে একাত্মতা অনুভব করে। কারণ, শেষাবধি মানুষের ভালোবাসা-মায়া-মমতা-স্নেহের জয় হয। এ কথানাটকে প্রান্তিক মানুষের মানবিক-বোধের সাথে উচ্চবিত্তের মন-মানসিকতার পার্থক্য দেখিয়েছেন। বাঙালি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিত্য অভাব, দৈন্য, দুঃখ-কষ্ট; তারপরও তাদের আছে হৃদয়, মানবতাবোধ। তাই শেষ পর্যন্ত গারোয়ানদ্বয় বেওয়ারিশ যুবকের মৃতদেহটিকে শিয়াল-কুকুর খাদ্যে পরিণত করতে পারে নি। তারা ঠিকানা খুঁজে পায় নি, কিন্তু লাশটির সৎকার করে সত্যিকারের ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে। চাকা-র দুই গারোয়ান গ্রাম-বাংলার নিচুতলার মানুষ; অথচ জীবনবোধে শহুরে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ক ও সজাগ।

সেলিম আল দীন ১৯৯১ সালে চাকা শীর্ষক নাটক রচনা করে বাংলা নাট্য-ঘরানায় নতুন একটি ধারা সংযোজন করেন। কথানাট্য রচনার সেই ধারাবাহিকতার দ্বিতীয় ফসল যৈবতী কন্যার মন। এ নাটকে সেলিম আল দীন নবরীতির এই নাট্যধারা আরো দক্ষতায় গদ্য-পদ্যের অসাধারণ সংমিশ্রণে উপস্থাপন করেছেন। যৈবতী কন্যার মন-এ দুই পৃথক সময়ের বা যুগের দুই নারী-জীবনের সমান্তরাল পরিণতি এঁকেছেন। উভয় নারীর জীবন-ঘটনার ঐক্য নাট্যকারকে সম-পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। কালিন্দী স্বামীর ধর্মকেন্দ্রিক জীবনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে; আর পরী মায়ের অনৈতিক জীবনাচারণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। অর্থাৎ কালিন্দী ও পরী উভয়েই দ্রোহী  প্রচলিত জীবন-বাস্তবতায়। যৈবতী কন্যার মন-এ নারীর সামাজিক অবস্থান সুস্পষ্ট করা নাট্যকারের প্রধান উদ্দেশ্য। যৈবতী কন্যার মন নাটকটি সেলিম আল দীন ইরানের কবি নিযামীর রচনায় অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। নাট্য-কাহিনীতে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের দুই নারী কালিন্দী ও পরীর অসীম বেদনা ও জীবন-জিজ্ঞাসায় পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার লিঙ্গ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। নারীর সামাজিক শ্রেণীকরণ সম্বন্ধে অর্থনীতিবিদ অমর্র্ত্য সেন জানিয়েছেন-

সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টতে লিঙ্গবিভেদ নিশ্চয়ই একটি উপাদান, কিন্তু তা শ্রেণীনিরপেক্ষভাবে কাজ করে না। বস্তুত নিম্নশ্রেণীর নারীদের ক্ষেত্রে শ্রেণীবঞ্চনা ও লিঙ্গবঞ্চনা এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে তাঁদের জীবন দুঃসহ করতে পারে। একদিকে নিম্নশ্রেণীর অভিশাপ এবং তার সঙ্গে মেয়ে হয়ে জন্মানোর বঞ্চনা এই দুই দিক একত্রিত হবার ফলে নিম্নশ্রেণীর মেয়েরা নিদারুণ দৈন্য ও রিক্ততার মধ্যে পড়েন।২২

যৈবতী কন্যার মন-এ নাটকে দু’জন মৃত নারীর জীবন-কথা তুলে ধরেছেন নাট্যকার সেলিম আল দীন। এদের একজন কালিন্দী, অন্যজন পরী। কালিন্দী চরিত্রে মধ্যযুগে বাঙালি সমাজের নারীর জীবন-বাস্তবতা তুলে ধরেছেন; আর পরী প্রতিনিধিত্ব করেছে বাঙালির আধুনিক যুগের সমাজ-বাস্তবতায় নারীর অবস্থান। এদের আত্মকথনে বাঙালি সমাজে নারীর আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক অবস্থান যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমার্থক তা ব্যক্ত করেছেন নাট্যকার সেলিম আল দীন। নাট্যকার যৈবতী কন্যার মন-এর দু’জন নারীকে সমাজের অবহেলিত-নিগৃহীত-উপেক্ষিত মানুষ হিসেবে উপস্থান করেছেন। সংসারে কলুর বলদ সেজে এরা শ্রম দেয়, কিন্তু পায় না সেই শ্রমের মর্যাদা কিংবা ন্যূনতম স্বীকৃতি। পুরুষ শাসিত সমাজে নারী পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো সুযোগ পায় না, নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকারও তাদের নেই। বলাবাহুল্য, কালিন্দী-পরীর যে জীবন-কথা নাট্যকার যৈবতী কন্যার মন-এ এঁকেছেন, তারা পারিবারিক ও সামাজিক উদাসীনতার শিকার। বিশেষত প্রান্তিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও প্রচণ্ড জীবন-তৃষ্ণায় মান-মর্যাদা-সম্ভ্রম নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত দুই নারীই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তীব্র বৈষম্যের শিকার হযেছে। শেষ-পর্যন্ত তারা বেঁচে থাকতে পারে নি; আত্মহত্যার পথ তাদেরকে বেছে নিতে হয়েছে। মৃত দুই নারীকে নাট্যকার বিশেষ কৌশলে দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন, তাদের জীবনসত্য প্রকাশের লক্ষ্যে। আর থিয়েটার হলে দর্শক দেখেছে বাঙালি সমাজে নারীরাও এক অর্থে প্রান্তিক; কালিন্দী ও পরীর অস্তিত্ব-যন্ত্রণা এবং জীবন পরিণামের মধ্যে নাট্যকার তা ফুটিয়ে তুলেছেন।

কালিন্দী-আলাল দম্পতির সংসারে ভাঙনের সুর তীব্রতর হয়েছে। একদিন আলালের গানের আসর ভেঙে দিল ধর্ম-ব্যবসায়ীরা। এই দম্পতির জীবনে এরপর ক্রমাগত দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা ও অবজ্ঞা নেমে এলো। প্রান্তিক জন-মানুষ এখন নদী ভাঙন, শস্যের বর্ধিত উৎপাদন কামনায় কিংবা রোগ-বালাই থেকে বাঁচার লক্ষ্যে ঘরে-ঘরে গাজীর গান চালু হলো। আলালের গান শোনার মতো রসিকজন নেই। এর বড় কারণ, আলালের গানে ধর্ম-কথা নেই; তাই আলালের জীবনে ক্রমাগত আর্থিক দৈন্য বেড়ে চলে। জীবন ও জীবিকার দায়ে আলাল আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো এবং সেও গাজীর গান ধরলো। ধীরে ধীরে আলালের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হলো, সেও বিশ্বাস করতে শুরু করলো পীরের বাণী, পরকাল ও কবর ছাড়া সবকিছুই অর্থহীন মনে হতে শুরু করলো। এখান থেকেই আলাল-কালিন্দীর দাম্পত্য জীবনে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি। প্রতিবাদ করে কালিন্দী; শেষ-পর্যন্ত ধর্ম-দ্বন্দ্বে আলালের সাথে বিচ্ছেদ ও নিরাপত্তাহীন জীবনে প্রবেশ করে কালিন্দী। এরপর কালিন্দী ধর্ষণের শিকার হয়। তারপরও প্রচলিত ধর্মের কাছে পরাজয় মানে না কালিন্দী। সে আত্মহত্যা করে। আলালের ভাবনা ছিল  কালিন্দী নারী, অসহায়া অতএব একদিন তাকে ফিরে আসতে হবে এবং ধর্মও মেনে নেবে। কিন্তু ধর্মের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছে কালিন্দী। ধর্ম ত্যাগ করেই কালিন্দী একদিন মানবতার আলালের জয়গানে মুগ্ধ হয়ে তার গলায় প্রেমের ও মহত্বের মালা পরিয়েছিল। কিন্তু প্রান্তিক মানুষ আলাল জীবন-জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ধর্মের নতি শিকার করতে বাধ্য হয়। কালিন্দী পারে না ধর্মবিশ্বাসের চেয়ে বড় তার কাছে মনুষ্যত্ব ও প্রেম। কালিন্দীর প্রতিবাদ ব্যর্থ হয়, তবু প্রান্তিক নারী মান-মর্যাদাহীন জীবনের ঘানি টানতে চায় নি।

আধুনিক যুগের শিক্ষিত নারীর জীবন-কথা যৈবতী কন্যার মন নাটকের দ্বিতীয় অংশে উপস্থাপন করেছেন। এ অংশের নায়িকা পরী। তারা পারিবারিকভাবে যাত্রা দলের মানুষ। যাত্রা দলে পুতুল নাচ দেখিয়ে তাদের জীবিকা উপার্জন করে পরীর বাবা। একদিন পিতা মৃত্যুবরণ করলো  পরীর জীবনে নেমে এলো দুঃখ-দৈন্য-দুর্দশা। জীবিকার প্রয়োজনে পরীকে একদিন যাত্রা দলের কাছে বিক্রি করে দিল তার মা। এরপর থেকে যাত্রা দলের সাথে পরীর রাত-দিন ক্লেদাক্ত অভিজ্ঞতায় অতিবাহিত হয়। জীবনের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা থেকে অতিরিক্ত মদ্যপান করে উন্মত্ত ও বেপরোয়া জীবন-যাপনের মাধ্যমে তিলে তিলে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায় পরী। কিন্তু সহসাই একদিন সম্বিৎ ফিরে পায পরী; ফিরে চলে মাতৃ-ক্রোড়ে গ্রামের বাড়ি মৌরাবিতে। কিন্তু গ্রামে পৌঁছে পরী শোনে মা’য়ের বিয়ের খবর। মা’য়ের অসঙ্গত ও অবিনাশী এই পাপকর্ম সহ্য করতে পারে না পরী।  আত্মহত্যা করে; আর পরীর এই আত্মহননের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক নারীর জীবন-বাস্তবতার দুটো দিক উন্মোচিত হয়েছে। এক পরীর আত্ম-সম্মান ও মর্যাদাবোধ; দুই পরীর মায়ের নীতিনৈতিকতাহীন জীবন। উভয়ের সমন্বয়ে নাট্যকার মূলত সমাজে-সংসারে প্রান্তিক নারীর দুঃখ-দৈন্য-দুর্দশার চিত্রই উপস্থাপন করেছেন।

সেলিম আল দীন-এর নাটকে মূলত গ্রামীণ নিম্নবিত্তের মানুষ ও তাদের শোষিত-নির্যাতিত যাপিত জীবনের ইতিকথা উপস্থাপিত হয়েছে। করিম বাওয়ালির শত্রু বা মূল মুখ দেখা থেকে তাঁর নাটকে প্রান্তিক জনমানুষ জায়গা করে নিতে শুরু করে। তিনি বাংলা জনপদের শ্রমজীবী, সর্বহারা, নিরন্ন ক্ষুধার্ত প্রান্তিক জনগণের জীবনচিত্র দেশজ নাট্যরীতিতে অসমান্য দক্ষতায় উস্থাপন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। গ্রামীণ সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও প্রতিনিয়ত নিগৃহীত-নির্যাতিত-শোষিত হচ্ছে তিনি নারী-জীবনের সেই মর্মন্তুদ কথাচিত্র কিত্তনখোলা ও কেরামতমঙ্গল-এ এঁকেছেন। ষৈবতী কন্যার মন নাটকেও সমাজের পতিত নিম্নশ্রেণীর নারী-জীবনের জীবন-কথা রঙ্গমঞ্চের আলোক প্রক্ষেপণে থিয়েটার হলে সভ্য দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন।

সাত.
সেলিম আল দীন বাংলা জনপদের গ্রামীণ জীবন অবলোকন করেছেন পরম মমতায়। গ্রামের যে পথ ধরে হেঁটেছেন, সে-পথের দু’ধারের সহজ-সরল মানুষের ইতিবৃত্ত নাট্যকাহিনীতে উপস্থাপন করছেন, খুঁজেছেন পূর্ব-পুরুষের গৌরব অথবা দুঃখ-গাথা। হরগজ-এর বিষয়বস্তু ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত বিধ্বস্ত এক গ্রামের নির্মম দৃশ্য। নাট্যকার হরগজ-এর ভূমিকায় জানিয়েছেন ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের হরগজ গ্রামের গ্রীষ্মকালীন প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও তৎপরবর্তী একদল শহুরে ত্রাণকর্মীর উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে নাট্যকাহিনী নির্মাণ করেছেন। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী হরগজ গ্রাম এক বিভীষিকাময় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে যেন। গ্রামময় মানব-দেহ ছিন্ন-ভিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উদ্ধারকর্মী-প্রধান আবিদ নির্দেশ দিয়েছিল ত্রাণ বিতরণের; কিন্তু গ্রামের কাউকে জীবিত পায় নি ত্রাণকর্মীরা। শেষ-পর্যন্ত ত্রাণকর্মীরা প্রান্তিক মানুষগুলোর মৃত-দেহগুলো একত্রিত করতে চেয়েও পারে নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে হরগজ গ্রামের মর্মান্তিক বাস্তবতা দৃষ্টে আবিদের হৃদয়ে মানবতাবোধ জেগে ওঠে। আবিদ ভাবে এই ধবংসস্তুপ যেন এক অসামান্য নিপুণ শিল্পকর্ম। তাই আবিদ ‘এমন সাজানো অর্থময় ধ্বংসের কাছে নতজানু হয়ে’ প্রার্থনা করে। মানবিক বোধ ঘিরে হরগজ-এর কাহিনী চিত্রিত হয়েছে। নাট্যকার সেলিম আল দীন হরগজ-এর ঘটনা জীবনাভিজ্ঞানের গভীরতায় মূর্ত এবং বিমূর্ত ভাবনায় আবিষ্কার করেছেন। হরগজ গ্রামের ওপর দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় ভয়ানক যে ধ্বংসযজ্ঞ করেছে, তা রঙ্গমঞ্চে নিয়ে এসেছেন  দর্শককে প্রান্তিকজনের জীবন-বাস্তবতায় নিয়ে যাবার লক্ষ্যে। ধ্বংসের বিবরণ এমন-

টর্নেডোর ফলে তদঞ্চলে এক সমৃদ্ধ কৃষিজীবী জনপদের প্রায় সামগ্রিক বিনষ্টি ঘটে। উড়ন্ত ঘরের চাল টিন বৃক্ষ ছিন্নশাখা মৃত পাখি পশ্বাদি সহস্র হত আহত মানবের দেহ ও খণ্ডাংশের প্রভৃতি প্রাক্কালিত স্বাক্ষরে পরিপূর্ণ ছিল টর্নেডো-উত্তর সে স্থলের সমগ্র প্রান্তর।২৩

হরগজ-এর কাহিনী দর্শককে নিয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এক বিভীষিকাময় জগতে। কারণ, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী গ্রামে কোনো মানুষ-ই জীবিত ছিল না। ত্রাণকর্মীরা ত্রাণ দিতে না পেরে দলিত-মথিত মানব-দেহগুলো একত্রিত করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। হরগজ গ্রামের এই বিভীষিকা সম্বন্ধে নাট্যকার লিখছেন-

মনোয়ারা বেগম (২৫) নামে এক গৃহবধূর লাশ বাড়ী থেকে বহুদূরে গাছের ডালে মৃত ও ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। লোকমান মোল্লা (৬৫) বেল গাছের শাখায় মৃত ও লম্বমান ছিল। পাহালী (৫০) বাড়ী থেকে সিকি মাইল দুরে তার ছিন্নভিন্ন শরীর পাওয়া যায়। ছায়াদুর রহমান সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র  বিশালাকায় কাঠবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। কাদের মিয়া (৩৫) স্যালোমেশিন ঘরে কাজ করত, দূরে ধান ক্ষেতে তার শরীর ছেঁড়াখোঁড়া অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। ফিরোজা বেগম (৩৫) পেট বরাবর উড়ন্ত টিন এসে আঘাত করে ফলে সে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। রাবিয়া খাতুন (৪০) উড়ন্ত ঢেউটিনের আঘাতে মাথা থেকে ধড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।২৪

নাট্যকার সেলিম আল দীন হরগজ-এর কাহিনী নির্মাণ করেছেন গ্রাম-বাংলার জনজীবন নিয়ে; এসব মানুষের উপায় নেই প্রকৃতির রোষানল থেকে রক্ষার কোনো উপায়। হরগজ-এর কাহিনীতে যারা লাশ হয়ে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তারা প্রকৃতার্থে প্রান্তিক মানুষ। কারণ, তাদের এতটুকু সাধ্য নেই যে, জীবনকে প্রকৃতির রুদ্র-ভয়াল আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। এখানে প্রকৃতিকেই নাট্যকার প্রান্তিকজনের শোষকরূপী প্রতীক হিসেবে অঙ্কন করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত উভয়ের ঘরেই সমান আঘাত হানে; তারপরও উচুঁশ্রেণীর লোকেরা প্রকৃতির নানা ফন্দি-ফিকির করে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে আমাদের প্রান্তিক মানুষ একই প্রাকৃতিক দুর্যোগে যতটা ক্ষতির শিকার হয়, তার সিকিভাগও উচ্চবিত্তরা ভোগ করে না। হরগজ গ্রাম শুধু, বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার গ্রামের অবস্থা একই। এখানে মানুষের আর্থিক দৈন্য-দশার প্রতীকী রূপকল্প নির্মাণ করেছেন নাট্যকার। ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হরগজ গ্রামের এই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মনুষ্যদেহ একত্রে সংযোজন করলে যে আকার ধারণ করবে, সেই মর্মান্তিক করুণ চিত্র হরগজ নাটকে তুলে ধরেছেন। হরগজ গ্রামের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী জীবন-বাস্তবতা প্রকৃতপক্ষে বাংলা জনপদের সকল গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এ ধ্বংসযজ্ঞের উন্মত্ততায় নাট্যকার গ্রামীণ নিম্নবিত্তের আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক নিগূঢ় দৈন্য-দশাকে আলোক মঞ্চে উপস্থাপন করেছেন এবং এর প্রতিকার চেয়েছেন।

একটি মারমা রূপকথা মূলত সেলিম আল দীনের নিরীক্ষাধর্মী নাটক। এ নাটকে সেলিম আল দীন আরো একবার নবনাট্য নিরীক্ষা করেছেন। এ নাটকে নৃ-তাত্ত্বিক প্রান্তিক জন-সমাজের কথা তুলে ধরেছেন নাট্যকার। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৃ-তাত্ত্বিক প্রান্তিক মানুষ এবং তাদের সুখ-দুঃখের ইতিবৃত্ত একটি মারমা রূপকথা। এ নাট্যকাহিনীর মূল বিষয় হচ্ছে ‘জন্মান্তরবাদ এবং ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও বৌদ্ধতন্ত্রের দ্বন্দ্ব; সেই সঙ্গে আছে রূপান্তরবাদের প্রসঙ্গ। নাটকটি মারমা সমাজে প্রচলিত মনোহারী রূপকথা ‘মনরিমাংৎসুমুই’-এর আধুনিক রূপায়ণ।২৫ একটি মারমা রূপকথা নাটকে মারমা আদিবাসীদের জীবনচর্চার অবিচ্ছিন্ন চিত্র তাদের জাতিগত পৌরাণিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বাংলাদেশের আদিবাসীরা এখনো আদিম জীবনের খোলসমুক্ত হয়ে আধুনিক জীবনে যেমন অভ্যস্ত হতে পারে নি; তেমনি তাদের সুযোগও ঘটে নি। আজো তারা গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ ও আদিম নিয়মনীতি মেনে চলে। আদিবাসীদের জীবন-নির্ভর এ কাহিনীতে সেলিম আল দীন বাংলাদেশের নৃ-তত্ত্বগত প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন। একটি মারমা রূপকথা-য় সমাজ-বিচ্ছিন্ন অনেকাংশে অস্পৃশ্য জাতিগোষ্ঠীর জীবনভাষ্য নির্মাণ করেছেন নাট্যকার সেলিম আল দীন।

বনপাংশুল সেলিম আল দীনের একটি মারমা রূপকথা নাটকের ধারাবাহিক রচনা। এ নাটকেও  তিনি আদিবাসী সমাজ-জীবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন। টাঙ্গাইলের সখীপুর অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষয়িষ্ণু নৃ-গোষ্ঠী ‘মান্দাই’; এদের জীবন-সংগ্রাম, ধর্ম-বিশ্বাস, আচার-আচরণ-সংস্কৃতি ও ভৌগলিক পরিবেশ বনপাংশুল-এর উপাদান। এ নাট্যকাহিনীতে মর্মরিত হয়েছে অরণ্যের ভেতর রক্তাক্ত এক জনপদের প্রান্তিক আদিবাসী গোষ্ঠীর ইতিকথা। বনপাংশুল-এর লুৎফর মাষ্টার, ফরেস্টার, সুকি, গুণীন, অনিল কোচ, মঙ্গলি, রাজেন্দ্র, সোনামুখি সবাই যেন এক অখণ্ড
জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। আর নাট্যকার দেখেছে যে-অরণ্যে এদের বসতি, জীবনের শিকড় প্রোথিত সে-অরণ্যের পত্রাদি ক্রমশ ঝরে পড়ছে। পত্র-ঝরা প্রতীকে নৃ-গোষ্ঠীর ক্ষয়িষ্ণু জীবন প্রতিকল্পিত হয়েছে। তাই প্রাকৃতজন নৃপেণের মৃত্যুর মাঝে আদিবাসী মানুষগুলো শ্যামল প্রকৃতি এবং কর্তব্যকর্মের মধ্যে মানসিক সান্ত্বনা খোঁজে।

সুকি বাংলা-জনপদের মান্দাই সম্প্রদায়ের বাল্য বিধবা নারী। ধর্ম সুকির জগজ্জীবনে তমসাবৃত্ত সৃষ্টি করেছে। গোষ্ঠীগত সংস্কার ও রীতি অনুযায়ী সুকি শিব-সমর্পিতা। কিন্তু যুবতী সুকির অতৃপ্ত যৌবন চন্দ্রাহত রাতে তাকে মানবিক করে তোলে সে অনিলের সঙ্গিনী হয়ে রীতি ভাঙে। তারপরও ধর্ম-সংস্কার অতিক্রম করে সুকি ফিরতে পারে না স্বাভাবিক জীবনে। অতৃপ্ত নারী সুকির মানবিক আর্তনাদে বিদীর্ণ হয় মান্দাই অরণ্যের পত্রাদি। মান্দাই নৃ-গোষ্ঠীর শিব-সমর্পিতা নারী সুকি শেষ-পর্যন্ত তার অপমান-অবমাননা ও জীবন-বাস্তবতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলে, ‘আমি উমা না দুগগা না। পরান কিস্সার কুচুনী। শিবের বেশ্যা।২৬ সুকির বক্তব্যে মান্দাই নৃ-গোষ্ঠীর নারীহীন সামাজিক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

‘বনপাংশুল’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ- পাঁচালি; সুতরাং নাটকে লুপ্তপ্রায় মান্দাই বা কোচদের বাস্তব-জীবন নিয়ে রচিত পাঁচালি-ই বনপাংশুল। মান্দাই সম্প্রদায় সাধারণ বাঙালিদের দ্বারা শোষিত-নির্যাতিত। বনপাংশুল-এর প্রান্তিক মানুষগুলোর চারিত্রিক ঔজ্জ্বল্য প্রতিবাদে-প্রতিরোধে নবতর জীবনের কামনা করে। অগ্নিদগ্ধ হয়েও তারা পুনরায় জেগে ওঠার স্বপ্ন দেখ। নাট্যকাহিনীতে ধর্ষিতা নারী সুকির গর্ভে বেড়ে ওঠা ভ্রুণে মান্দাই সম্প্রদায়ের পুনরুজ্জীবনের আকাক্সক্ষা জেগে থাকে। মান্দার বা কোচদের জীবনযাপনের এক আলেখ্য বনপাংশুল-এর কাহিনী। নাট্যকার বিস্তৃৃত প্রেক্ষাপটে মান্দার সম্প্রদায়ের জীবনচিত্রের বিশাল এক ক্যানভাস রচনা করেছেন। আদিবাসীদের ধর্ম, ভাষা নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়, তাদের বিশ্বাস-সংস্কার পূজা-পার্বণ, তাদের পুরাণ ও অর্থনীতি, প্রাচীনত্ব ও আধুনিক জীবনের টানাপোড়েনে পড়েছে। অর্থলোভী বাঙালি মহাজনদের সাথে মান্দার সম্প্রদায়ের সংঘাত-সংঘর্ষ নাট্য-কাহিনীতে বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মহাজনদের আর্থিক শোষণ যেমন একটা দিক তেমনি বাঙালি স্কুল শিক্ষক অথবা ফরেস্টার অফিসার হাসানের মতো হৃদয়বান মানুষও তাদের পাশে আছে। কোচ সম্প্রদায়ের নিরুপায় অসহায়ত্ব এবং নিয়তি নির্দিষ্ট সর্বনাশের আমানবিক দৃশ্য বনপাংশুল-এ নাট্যকার সুনিপুণ দক্ষতায় নাট্যরূপ দিয়েছেন।

বনপাংশুল-এ বাঙালি জনগোষ্ঠীর আগ্রাসনের ইতিকথা বর্ণনা করেছেন নাট্যকার। মান্দাই সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। মান্দাইদের এই সংগ্রামও এক ধরনের শ্রেণী-সংগ্রাম। কারণ, তারা তো জাতিগত ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। নাটকের প্রথম থেকে মান্দাই সম্প্রদায় তাদের হারানো জায়গা (ভূমি) ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত। ভূমিকে কেন্দ্র করে সংঘাত-সংঘর্ষ প্রাচীন কাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। বনপাংশুল-এর নাটকের মূল দ্বন্দ্ব শুরু ভূমি-দখলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে; পরে তা বিস্তৃৃত হয়েছে সাংস্কৃতিক পৌরাণিক বিশ্বাসের জগৎ পর্যন্ত। বাঙালিরা আদিবাসী মান্দাইদের ভূমি দখলের মাধ্যমে তাদের জাতিগত ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। জাতিগত ঐতিহ্য সংরক্ষণের এ সংগ্রামচিত্র তুলে ধরে নাট্যকার নৃ-গোষ্ঠীগত প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট ও বিপন্নতা মূর্ত করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। সেলিম আল দীন প্রাচ্য নাটকে নব-আঙ্গিকে-ঐশ্বর্যে বেহুলা-লখিন্দরের প্রণয়গাথা নির্মাণ করেছেন। প্রাচ্য-এর কাহিনী বাঙালির পরিচিত মনসামঙ্গল থেকে গ্রহণ করেছেন নাট্যকার। তবে এখানে সেলিম আল দীন স্ব-কালের প্রেক্ষাপটে কাহিনীর পুনর্নির্মাণ করেছেন। ফলে নোলক-সয়ফরের বিয়োগাত্মক প্রণয়গাথা একালের কাহিনী হয়ে উঠেছে। লোক-কাহিনীর বেহুলার মতো প্রাচ্য-এর কাহিনীতে বাসরঘরে বাসর রাতে নোলক বিধবা হয় নি; বরং সদ্য-বিবাহিত সয়ফর নব-পরিণতা স্ত্রী নোলককে হারিয়েছে। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনীর মতো প্রাচ্য-তেও খল-চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে বিষাক্ত সাপ। মনসামঙ্গল-র কাহিনীর মতো এ সাপ মনসা দেবী নয়; এখানে সাপের প্রতীকে নাট্যকার অশুভ শক্তিকে প্রতিস্থাপন করেছেন।

প্রাচ্য-এর নাট্য-কাহিনী শুরু হয়েছে নোলক-সয়ফরের বিয়ের ঘটনা দিয়ে। প্রাকৃতিক পরিবেশ হিসেবে চিরপরিচিত বাংলা জনপদের মনোরম দৃশ্য। ফাল্গুনের এক শেষরাতে নোলক ‘নাক-চোখের মিলিত পানিতে’ স্বামী হিসেবে সয়ফরকে কবুল করে। এখানে নাট্যকার অসাধারণ কৌশলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিয়েকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উৎসব দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন। নাট্য-কাহিনী আঞ্চলিক ভাষায় বর্ণনার মাধ্যমে দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতে চেয়েছেন নাট্যকার; এসব ঘটনাদির প্রতি নাট্যকারের আকর্ষণের কারণ হচ্ছে এ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক মানুষের জীবন ও সমাজ মূর্ত হয়ে উঠে। এ প্রসঙ্গে সমালোচকের মন্তব্য স্মরণীয়-

এখনও গ্রামেগঞ্জে সূচিশিলা, পাটশিল্প, মৃৎশিল্প, গৃহশিল্প, বিশেষত নারীসৃজিত শিল্পসমূহ বেঁচে আছে। সঙ্গীত-নৃত্যের, পাঁচালি-কথকতার বিশেষ বিশেষ শাখা লোকায়ত, মানবিক আবেদনে অনন্য। সেগুলি যেমন, সাবঅলটার্নদের জীবনযাপন, জীবনঅভীপ্সা, আদর্শ, বিশ্বাসকে উদ্ঘাটন করছে, তেমনই আগামী দিনের বিকল্প সংস্কৃতির উপযোগ রক্ষা করছে।২৭

নোলক-সয়ফরের কাহিনী নাট্যকার শুধু দু’জন মানব-মানবীর ব্যক্তিগত প্রণয়ের মধ্যে আটকে রাখেন নি; বরং গোটা সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাই স্ত্রী-হন্তারকের অনুসন্ধান সংগ্রাম সয়ফরের ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে পুরো সমাজের প্রতীক। প্রাচ্য-এর বিয়ে বাড়ির ঘটনাদির মাধ্যমে দারিদ্র্য-পীড়িত প্রান্তিক জন-সমাজ ও তাদের জীবন-বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। আমাদের প্রান্তিক জনসমাজের প্রচলন অনুযায়ী মেয়ের বাবাকে বিয়ে বাড়ির ভোজনের আয়োজনে সারা বছরের শ্রমকে নিঙড়ে দিতে হয়। নাট্যকার প্রাচ্য-এর ভূমিকায় জানিয়েছেন-

প্রাচ্য-র গল্পটিকে ‘খুব সরল’ অথবা ‘খুব জটিল’ করে না দেখতে। জিতু মাতব্বর চরিত্রটি না আসা পর্যন্ত খুব সরলভাবেই দেখা যায় গল্পটিকে। কিন্তু এই একটি চরিত্রই পাল্টে দেয় কাহিনীকে। উঠে আসে একজন সংগ্রামী অথচ শোষিত মানুষ সয়ফরের সংগ্রাম। দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট সয়ফর নিরন্তর প্রচেষ্টার পরও কীভাবে আটকা পড়ে জিতু মাতব্বরদের বিছানো জালে প্রাচ্য-তে সে দৃশ্যও দেখে পাঠক। মরার সময় জিতু মাতব্বরের দেওয়া প্রতিশ্র“তিতে সয়ফর ফেরত পায় দশ ডিসিম জায়গা আর গাই গরুটা। কিন্তু জিতু মাতব্বরের মৃত্যুই শোষণের শেষ নয়, সয়ফরদের মুক্তি নয়।২৮

সয়ফরের সান্ত্ব¡না, জমি বন্ধকের টাকায় কেনা শাড়ির নিচে নোলকের উষ্ণ নারী শরীর জমির চেয়েও দামি। অথচ কাল-সাপের দংশনে যখন সেই শরীর যখন প্রাণহীন হলো তখন সর্প দংশনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না। প্রাচ্য-এর কাহিনীতে সাপ প্রতীকে আইজল মূর্ত হয়ে ওঠে। আর তাই সাপের অনুসন্ধানে পাগলের মতো সয়ফর খুঁড়ে চলে আপন ভিটা-মাটি। সয়ফরের এই ভিটে-মাটি খুঁড়ে সাপের খোঁজ করার সংগ্রাম আর ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে ওঠে সামষ্টিক চেতনাবাহী। সয়ফর শেষ-পর্যন্ত হন্তারক সাপের মুখোমুখি হয়ে সাপকে হত্যা করতে পারে না। সে ভুলে যায় এই সাপটিই তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। সয়ফরের তখন মনে পড়ে দাদির নিষেধÑ বাস্তুসাপ মারতে নেই। দাদির নিষেধ নিঃসন্দেহে সামাজিক সংস্কার; ফলে নাটকের পরিণতি দাঁড়ায় প্রান্তিক জনমানুষের এ ধরনের সংস্কারের কারণে আইজলের মতো সামাজিক শোষকেরা বেঁচে যায়। শোষকের প্রতিনিধি আইজল যেন সাপ হয়ে, ‘প্রকৃতির সৌন্দর্য, হিংস্রতা ও স্বাভাবিকতার অধিকারে আপন বিবরে চলে যায়।’২৯

সয়ফর তার স্ত্রীর হত্যাকারী সাপটিকে হাতের নাগালে পেয়েও নোলক প্রতিশোধ নিতে পারে না; এটিই প্রকৃত বাস্তবতা যে শোষণকারীর ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে শেষ-পর্যন্ত সয়ফরের মতো প্রান্তিক মানুষ কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারে না। প্রাচ্য-এর কাহিনীতে বঞ্চিত শ্রেণীর প্রতিনিধি সয়ফর, স্ত্রী নোলককে যেমন রা করতে পারে না তেমনি পারে না  তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। সয়ফর অথবা তার মতো নিম্নশ্রেণীর মানুষ জনম-জনম পরাজিত থেকে যায়। প্রান্তিক মানুষের এটাই প্রকৃত জীবন-বাস্তবতা।

সেলিম আল দীন বাংলার প্রাচীন জনপদ এবং বাঙালি সমাজের প্রান্তিক মানুষের নানামাত্রিক জীবনচিত্র পরম মমতায় মহাকাব্যিক নাট্যাঙ্গিকে ধারণ করতে চেয়েছেন। তিনি ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীর চেয়ে বড় করে দেখেছেন মানুষকে। ফলে কোনো গোত্রের বা গোষ্ঠীর উপস্থাপক নন নাট্যকার সেলিম আল দীন; বরং তিনি প্রান্তিক জনমানুষের স্বর্গভূমি প্রাচ্যের একক নাট্যকথক। তিনি নাটক রচনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র; নাট্যাঙ্গিক নির্মাণে কুশলী সেলিম আল দীন অতীত কালের লোককথা যেভাবে আধুনিক মানববেদে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি বাঙালির মহাজীবনকে মহানাটকে রূপ দিয়েছেন। এ মহানাটকের পাত্রপাত্রীরা প্রকৃতপক্ষে বাংলা-জনপদের নিচু শ্রেণীর মানুষ। সোজা কথায় সেলিম আল দীন গ্রাম-বাংলার জীবনচিত্র প্রান্তিক জনমানুষের মধ্য দিয়ে অবলোকন করেছেন। বাংলা জনপদের প্রান্তিক তথা ভূমিহীন নিম্নবিত্তের কৃষক-কামার-কুমোর-জেলে-তাঁতি ইত্যাদির শ্রেণীর মানুষজন-ই প্রকৃত প্রস্তাবে প্রাকৃতজন।

টীকা ও তথ্য-নির্দেশ :

১.    সেলিম আল দীন, চাকা, ১ম-প্র, (ঢাকা : গ্রন্থিক, ১৯৯১), পৃ. শেষ প্রচ্ছদ (গ্রন্থমুখ)
২.    লুৎফর রহমান , ‘ব্রতচারী শিল্পী’, সেলিম রেজা সেন্টু সম্পাদিত, দুই বাংলার থিয়েটার, ০২ বর্ষ : ০২ সংখ্যা, (বগুড়া : শকুন্তলা প্রকাশনী, ১৯৯৯), পৃ. ১৯৩-১৯৪
৩.    সাজেদুল আউয়াল, ‘কালের কথক : সেলিম আল দীন’, সেলিম আল দীন সম্পাদিত, থিয়েটার স্টাডিজ, ৮ম সংখ্যা, (ঢাকা : নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জুন-২০০১), পৃ. ১৩৭ (থিয়েটারওয়ালার বক্ষমান সংখ্যায় যা পুনর্মূদ্রিত)
৪.    ঢাকা থিয়েটার উৎসব স্যুভেনিরে দলের নাট্যাদর্শ, ‘শেকড়ের সন্ধানে’, মোসাদ্দেক মিল্লাত ও সাইমন জাকারিয়া সম্পাদিত, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, (ঢাকা : ১৬ মার্চ  ২০০২), পৃ. ৩
৫.    রামেন্দু মজুমদার, ‘সেলিম আল দীন: এক অসমাপ্ত মহাকাব্য’, দৈনিক ভোরের কাগজ, (ঢাকা : ২৫ জানুয়ারি ২০০৮), পৃ. সাহিত্য সাময়িকী
৬.    অরুণ সেন, সেলিম আল দীন নাট্যকারের স্বদেশ ও সমগ্র, ১ম-প্র, (বগুড়া : দুই বাংলার থিয়েটার প্রকাশন, ২০০০), পৃ. ২৫
৭.    যাত্রা আসলে এক ধরনের নাট্যধর্মী রচনা। যাত্রায় নাটকের মতো কাহিনী থাকে এবং তা কতিপয় চরিত্রের সহায়তায় একটি সম্যক পরিণতি লাভ করে। এটি সম্পূর্ণ উপমহাদেশীয় বিশেষত বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ। নাটকের মতোই যাত্রাও মঞ্চে কলাকুশলীদের সহায়তায় অভিনীত হয়। তবে যাত্রার মঞ্চ হ”েছ খোলা মঞ্চ। এটি দর্শকদের তিন পাশে রেখে চতুষ্কোণ একটি মঞ্চ। আকাশ-সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার-প্রসারের পূর্বে গ্রাম বাংলার প্রান্তিক জনসমাজের নিকট যাত্রা ছিল অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম। বর্তমানের অবশ্য যাত্রার সেই বাজার নেই। কারণ, বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নয়নের ফলে এখন গ্রামের মানুষের ঘরেও বিদেশী টিভি চ্যানেল চলে। সিটি, ভিসিডি, ডিভিডি প্রভৃতি এখন প্রান্তিক জনগণের হাতের নাগালেই। ফলে যাত্রার জায়গা দখল করে নিয়েছে  টেলিভিশন ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রাদি। বাঙালি সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যটি এখন প্রায় ডুবতে বসেছে। আর কিছুদিন পরে হয়তো যাত্রা একটি লুপ্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে শুধুই গবেষণাগারে বেঁচে থাকবে।
৮.    ‘সব মিলিয়ে হরিজন সমাজে আটটি গোত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। গোত্রগুলো হচ্ছে; হাড়ি, হেলা, লালবেগি, ডোম, বাঁশফোর, ডোমার, বাল্মিকী ও রাউত।’ গৌতম মণ্ডল, হরিজন মানবাধিকার বঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠী, ১ম-প্র, (ঢাকা : নিউজ নেটওয়ার্ক, ২০০৪), পৃ. ১২
৯.    সেলিম আল দীন, তিনটি মঞ্চনাটক (কিত্তনখোলা), ১ম-পুন.র্মু, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫), পৃ. ২০৯
১০.    তদেব, পৃ. ২১৬
১১.    তদেব, পৃ. ২১৮
১২.    মিল্টন বিশ্বাস, ‘কিত্তনখোলার শিল্পভাষ্য’, বাসুদেব ঘোষ সম্পাদিত, ধ্বন্যালোক, শারদ সংখ্যা, (ঢাকা : অক্টোবর ১৯৯৯ মার্চ ২০০০), পৃ. ০২
১৩.    আফসার আহমদ, মঞ্চের ট্রিলোজি ও অন্যান্য প্রবন্ধ, ১ম-প্র, (ঢাকা : গ্রন্থিক, ১৯৯২), পৃ. ৮৬
১৪.    রামেন্দু মজুমদার সম্পাদিত, বাংলাদেশের নির্বাচিত নাটক (সেলিম আল দীন, কেরামতমঙ্গল), ১ম-প্র, (ঢাকা : মুক্তধারা, ১৩৯৫), পৃ. ২১৭
১৫.    তদেব, পৃ. ২২০
১৬.    তদেব, পৃ. ২২১
১৭.    তদেব, পৃ. ২৭৬
১৮.    তদেব
১৯.    তদেব
২০.    তদেব, পৃ. ২৯৪-২৯৫ (পরিশিষ্ট খ)
২১.    লুৎফর রহমান, ‘ব্রতচারী শিল্পী’, সেলিম রেজা সেন্টু সম্পাদিত, দুই বাংলার থিয়েটার, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯৬
২২.    অমর্ত্য সেন, ‘ভারতে শ্রেণী বিভাগের তাৎপর্য’, অভীক সরকার সম্পাদিত, দেশ, ৭০ বর্ষ : ৬ সংখ্যা, (কলকাতা : ১৮ জানুয়ারি ২০০৩), পৃ. ৩৯-৪০
২৩.    সেলিম আল দীন, হরগজ, ১ম-প্র, (ঢাকা : গ্রন্থিক, ১৯৯২), পৃ. কথাপুচ্ছ
২৪.    তদেব
২৫.     লুৎফর রহমান, নাট্য বিষয়ক প্রবন্ধ, ১ম-প্র, (ঢাকা :বাংলা একাডেমী , ২০০১), পৃ. ৮৯  
২৬.     সেলিম আল দীন, বনপাংশুল, ১ম-প্র, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০১) পৃ. ২৪
২৭.     বৈরাগ্য বসু, ‘সাবঅলটার্ন সংস্কৃতি প্রসঙ্গ’, অনিল আচার্য সম্পাদিত, অনুষ্টুপ, ত্রিংশতি বর্ষ : ১ম সংখ্যা, (কলকাতা : ১৯৯৫), পৃ. ১৩৭
২৮.     সেলিম আল দীন, প্রাচ্য, ১ম-প্র, (ঢাকা : শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০০), পৃ. ৩
২৯.     তদেব,  পৃ. ৮৭

 

অনুপম হাসান : পিএইচ.ডি. গবেষক ও প্রাবন্ধিক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত