| 19 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

সঙ-সার

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
মেজাজ খারাপের সাথে মাইগ্রেণের কোন সম্পর্ক আছে কিনা এটা নিয়ে আগেও ভেবেছে মিলা। যখনই  কোনো কারণে গুরুতর মেজাজ খারাপ হয় তখনই মনের ভিতর কীসব চলতে থাকে আর সাথে যোগ হয় মাইগ্রেণের তীব্র ব্যথা ।মন,মেজাজ, মাইগ্রেণ- ত্রিপক্ষীয় আক্রমণে অবস্থা একেবারে ত্রাহি ত্রাহি।অনেকবারই চিন্তা করেছে বিষয়টা ডাক্তারের সাথে আলাপ করে বুঝে নেবে কিন্তু পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠলে সব ভুলে যায়। আজ চতুর্থরাত চলছে বাসায় একা,চাররাত মিলিয়ে আটঘন্টা ঘুমও হয়নি বোধহয়।বলগতোলা ভাতের মতো মাথার ব্রেণটা টগবগ করছে। টাফনিল খেয়ে সন্ধ্যা থেকে রুম অন্ধকার করে শুয়ে ছিল,রাত প্রায় এগারোটা বেজে এল,ফলাফল তথৈবচ ।সিগারেটের তীব্র গন্ধটা পেলে একটু আরাম লাগত হয়তো। রাতে কম্পিউটারে কাজ করতে করতে সাবের যখন সিগারেট খায় তখন গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধোঁয়াটা নাক দিয়ে টেনে নেওয়া অভ্যাস মিলার, এতে তার মস্তিস্কের কোষে আবহসঙ্গীতের মতো পরোক্ষ এক প্রশান্তি নামে।অবশ্য এখন তা কোথায় পাবে?সবকিছু মিলিয়ে এইমূহুর্তে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। শোবার ঘরে আয়নার পাশে বাঁধিয়ে রাখা বিয়ের দিনের ছবিটার দিকে তাকায় ,ওদের দুজনের হাত একত্রে ধরে মাঝখানে দাদাভাই, কন্যা সম্প্রদান করছেন।মনেপড়ে দাদাভাই দোয়া করে বলেছিলেন,’পরস্পরের জীবনসাথী হয়ে থেকো।’ পরে এই অদ্ভুত দোয়ার মানে জানতে চাপাচাপি করায় দাদাভাই বলেছিলেন, সহজ কথাটার মানে বুঝতে পারলা না?জীবনসাথী হইল জীবনব্যাপী সুখে-দুঃখে জড়াই থাকা।কোন অবস্থাতেই কেউ কাউকে পরিত্যাগ না করা।তোমরা যেন এমনই হয়ে উঠতে পারো আল্লাহ্পাকের দরবারে সেই প্রার্থনা জানাইলাম।’ ঠিক আছে ,কিন্তু এই দোয়া আপনাদের কালে মানানসই ছিল,আমাদের যুগে বড্ড ব্যাকডেটেড লাগছে দাদাভাই।আরেকটু স্মার্ট কিছু চাইলে ভালো হইতো না?সাবেরের ঠাট্টায় বিরক্ত হলেও দাদা তা প্রকাশ করেননি, মুখে বলেছিলেন, ‘ব্যাকডেটেড সবকিছুই পরিত্যাগ করতে নাই ভাই ,পুরানই তো নতুনের ভিত্তি।বয়স বাড়ুক,অভিজ্ঞতা হোক,বুঝতে পারবা।’ছবিটায় হাত রেখে মিলার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।চোখ মুছতে মুছতে টের পায় বেশ ক্ষুধা লেগেছে ,জ্বরের কারণে অরুচি হওয়ায় অনেকক্ষণ কিছু খায়নি।
স্বামী-স্ত্রী একই অফিসে কাজ করার সুবিধা যেমন আছে তেমনি কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে ।বিশেষ করে ব্যক্তিগত প্রাইভেসির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা বেশি যন্ত্রণার। কোন কলিগের সাথে কফি খেতে যাওয়া,আড্ডা দেওয়ার মতো মামুলি বিষয় নিয়েও অন্য কলিগরা স্বামী বা স্ত্রীকে খোঁচা দিয়ে মজা পায় ফলে সেসব কখনও কখনও সংসারে অনাবশ্যক অশান্তি ডেকে আনে।এতে স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত,অফিসিয়াল দুইখানেই স্বাভাবিক সম্পর্ক চর্চা ব্যহত হয়।মিলা তো সোজাসুজিই বলে যাতায়াত খরচ সাশ্রয় আর এক টিফিন ক্যারিয়ারে লাঞ্চ নিতে পারার সুবিধাটুকু বাদ দিলে বাকি সবকিছুই অসুবিধা।তিন বছর ধরে একই টিভি স্টেশনে একজন নিউজ রুম আরেকজন প্রোগ্রামে কাজ করার ফলে এরকম বেশকিছু অভিজ্ঞতা তাদেরও হয়েছে।তাইতো গতবছর কর্মক্ষেত্র পাল্টানোর উদ্যোগও নিয়েছিল ,অবশ্য   ইকটোপিক প্রেগনেন্সির জটিলতায় শেষমেশ আর হয়ে উঠে নাই।ভাগ্যিস সে যাত্রায় পাল্টায়নাই, নাহলে সাবেরের এই সূক্ষ্ম চাতুর্যের মর্মার্থ এতো সহজে ধরতে পারত না।অবশ্য ধরতে পেরেই বা এখন কী করবে ?সেই তো সুস্থ হয়ে আবারও সংসারে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা আর যদি মরে টরে যায় তাহলে সংবাদের শিরোনাম, ফেসবুকে পরিচিতদের শোকের মাতম ;এই ই ।জীবন-সংসার সত্যিই বড় বিচিত্র,সঙ- ই সার!
গতবছর নতুন স্টেশনে যোগদানের সবকিছু ঠিকঠাক হবার পর বর্তমান কর্মস্থলে রিজাইন দেওয়ার আগে আগে সব কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিল, যাতে যাওয়ার পর কারো কোন অসুবিধা না হয়।সেকারণে চাপটা একটু বেশিই যাচ্ছিলো।এরমাঝেই একরাতে তীব্র পেট ব্যথা সাথে ব্লিডিং ,বমি টমি করে কিছুক্ষণ যন্ত্রণা সহ্য করে আবার  ঘুমিয়ে পড়েছিল ।সকালে ব্যথা তেমন না থাকলেও ব্লিডিং ছিল ।ওসবে পাত্তা না দিয়ে দিব্যি অফিসে চলে গেল মিলা কিন্তু কয়েকদিন ধরেই যখন সমস্যাটা কাটছিল না তখন একদিন সন্ধ্যায় গাইনি ডাক্তারের সরনাপন্ন হয়।হিস্ট্রি শুনে ডাক্তার এমারজেন্সি একটা TVS টেস্ট করিয়ে আনতে বলেন।টেষ্টের রিপোর্ট নিয়ে দেখা করতে গেলে ডাক্তার সেটা হাতে নিয়ে মাথা নাড়েন,হুম… ঠিক যা ভেবেছিলাম।শুনুন,শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নিষিক্ত হবার পর কোন কারণে যদি ইউট্রাসে পৌঁছাতে দেরী হয় তাহলে সেটা টিউবেই থেকে যায় আর ওখানেই একটা কমপ্লিকেটেড প্রেগনেন্সি ফর্মেশন হয়,ডাক্তারি ভাষায় যাকে ইকটোপিক প্রেগনেন্সি বলে।এটা নারীর এক গোপন ঘাতক।কারণ এরকম পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই  মেয়েরা জানেনা যে তার ভিতরে কিছু একটা ঘটেছে,এই যেমন আপনিও টের পান নাই।হঠাৎ করেই একদিন দুর্ঘটনা ঘটে যায় ।তবে অবাক লাগছে যে,দশ দিন ধরে এই ব্যথা,ব্লিডিং সহ্য করলেন কীভাবে?যাইহোক অলরেডি অনেকটা দেরী হয়ে গেছে আজ রাতেই অপারেশন করে ফেলতে হবে,আপনার হাজবেন্ড কোথায়?আপাতত 5/7 ব্যাগ ব্লাড ম্যানেজ করে কাউন্টারের ফর্মালেটিজ সেরে প্রস্তুতি নিন ।রাত দশটায় ওটি টাইম দিয়ে ফাইল পাঠিয়ে দিলাম,ঠিকাছে?মিলা কেমন অবিশ্বাস নিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকায়,কিসের প্রেগনেন্সি?কিসের অপারেশন?আমার তো কয়দিন আগেই পিরিয়ড শেষ হল।
—–হ্যাঁ,হতে পারে ।ঐ যে বললাম গোপন ঘাতক।ইকটোপিক হলে প্রেগনেন্সির কোন লক্ষণই থাকে না ।এমনকি স্বল্পমাত্রায় পিরিয়ডও হতে পারে ।আপনার নিশ্চয়ই রেগুলার পিরিয়ডের মতো ব্লিডিং হয়নাই?
—–না,অল্প অল্প আর কালশিটে জমাট রক্ত ছিল।
—–ঠিকাছে,ওরকমটাই হবার কথা।আপনি যদি সময়মতো আসতেন তাহলে ল্যাপারস্কপি করা যেত কিন্তু দেরী করে ফেলায় পেট ওপেন করতে হচ্ছে। ভিতরে ব্লাড ক্লট হয়ে আছে ওগুলো বের করতে হবে আর টিউবের কন্ডিশনও দেখতে হবে ।চেষ্টা করবো রিপেয়ার করে রেখে দিতে, নাহলে অগত্যা কেটে বাদ দিতে হবে ।ভয়ের কিছু নেই একটা টিউব থাকলেও মানুষ কনসিভ করে ।আপনি নিশ্চয়ই পরবর্তীতে মা হতে পারবেন।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে সাবেরকে ফোন দিতেই পুরো কথা না শুনে হরবর করে বলেদিল প্রাইম নিউজের প্রস্তুতি চলছে।এ সময় কীভাবে আসবো?তোমার সাথে ভিসা কার্ড আছে না?যা লাগে খরচ কর।আমি কাজ শেষ করেই হাসপাতালে চলে আসবো।এরকম একটা বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার আর বুঝিয়ে বলার ইচ্ছা হয়নাই মিলার।ইউনিভার্সিটির বন্ধু আসাদের মাধ্যমে জরুরী ভিত্তিতে রক্তের জোগাড় করে নিজেই ফর্মে সই করে ওটিতে ঢুকেছিল ।চারদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাসায় আসার পর শারীরিকভাবে সেরে উঠতে সময় লাগেনি কিন্তু মনের ভিতর তৈরি হয়েছিল গভীর এক ক্ষত ।প্রায়শই মিলার কানে বাজত ওটির ভিতরের কথোপকথন, টিউব কেটে অপসারণের পর ডাক্তার নার্সকে বলছিলেন বাইরে পেশেন্ট পার্টিকে দেখিয়ে আনুন, নার্স জবাবে বলেছিল এই রোগীর কেউ নাই ম্যাডাম।কেউ নাই!কী নির্মম সত্য!যদি বেঁচে না ফিরতো? যদি অপারেশনের সময় কোন জটিলতা দেখা দিত তাহলে কীভাবে কি হতো?এসব প্রশ্নের উত্তরে সাবেরকে ক্ষমা করতে পারেনা সে।অথচ সব শুনে মা বুঝিয়েছিল,সংসার এমনই ।নিজে চাকরি করছো অফিসে কাজের গুরুত্ব বুঝবে না?এসব চিন্তা ঝেরে ফেলো,মানিয়ে গুছিয়ে চলো।
সময় এক মোক্ষম মলম,এর প্রলেপে গভীরতম ক্ষতও খানিকটা ঢাকা পড়ে ।যদিও পুরোপুরি সেরে ওঠে কিনা সেকথা নিশ্চিত বলা যায় না।এই যেমন মিলার সারেনি।ওদের টিভি স্টেশনের রেডজোন কাভার করা রিপোর্টার সাব্বিরের যেদিন করোনা পজিটিভ সনাক্ত হল সেদিন ফুটেজ দেখে ঐ রিপোর্টারের সংস্পর্শে আসা অনেককেই আইসোলেশনে পাঠানো হল।একসাথে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়ায় সাবের আর মিলাও সেই দলভুক্ত হয়ে গেল । তবে দুজনের কেউই সেদিন তেমন সিরিয়াসলি নেয় নাই বিষয়টা বরং চৌদ্দদিন ঘরে বসে কী কী করা যায় সেসব নিয়ে মজার পরিকল্পনা আর একগাদা বাজার করে ঘরে ফিরেছিল।কিন্তু দিন দশেক পর হঠাৎ করে মিলার অল্প অল্প গলাব্যথা আর জ্বর দেখা দেওয়ায় দুজনেই রিপোর্টারস ইউনিটিতে গিয়ে স্যাম্পল দিয়ে এসেছিল।দুদিন বাদে জরুরী একটা মেইল চেক করতে গিয়ে মিলা দেখে IEDCR থেকে রেজাল্ট পাঠিয়েছে, তার কোভিড পজিটিভ।সাবের বুকের উপর বই রেখে সোফায় ঘুমিয়েছিল ,ডেকে তুলে রেজাল্ট জানালে হাতের বইটা মুচড়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।তারপর চোখেমুখে পানি দিয়ে এসে পরিচিত ডাক্তারের সাথে ফোনে কথা বলে ওষুধ আনতে বেরিয়ে যায় ।ফিরে এসে ডাইনিং টেবিলের উপর ওষুধের প্যাকেট রাখতে রাখতে বলে ভয়ের কিছু নাই,এগুলো খেলেই ঠিক হয়ে যাবা,দেখতেছোনা আমাদের দেশে করোনা অতটা সুবিধা করতে পারতেছে না। তাছাড়া তুমি যে ভয়ংকর নারী, ও ব্যাটা এমনিতেই বাপ বাপ করে পালাবে ;একথা বলে একটুখানি হাসার চেষ্টা করে ।ও হ্যাঁ শোন,অফিস থেকে ফোন দিয়েছিল, আমার রিপোর্ট  নেগেটিভ শুনে রাতেই যেতে বলে দিল, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের খবর নিয়ে কাজের চাপ যাচ্ছে ,তাছাড়া অনেকেই আইসোলেশনে থাকায় খুব অসুবিধা হচ্ছে; বোঝই তো।আর একটা কথা,ভাবছি তোমার যেহেতু পজিটিভ তাই আর বাসায় ফিরে বাকিদের ঝুঁকিতে ফেলে লাভ কী?এই কটাদিন আমি বরং অন্য কোথাও থেকে অফিস করি,কি বল?পারবে না একা থাকতে?আমি ফোনে সারাক্ষণ খোঁজ রাখবো ।
অভিমানে, কষ্টে  মিলার কন্ঠরোধ হয়ে এল।মনে হল এসব কিছুই সত্যি নয়, সাবের আসলে নিজে নিরাপদ থাকতে চাইছে, ওর ভাল-মন্দ তোয়াক্কা না করে মিথ্যা বলে স্বার্থপরের মত পালাতে চাইছে।ও বেরিয়ে যাবার পর অফিসে ফোন দিতেই বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া গেল,মিলার ধারনাই সত্যি। মূহুর্তে পুরনো ক্ষতটা দগদগে হয়ে উঠল! বারবার এভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় যে দেয়,যার কাছে মিলার জীবন-মৃত্যু এতটা তুচ্ছ,মূল্যহীন তার সাথে কিসের সংসার তাহলে?কীভাবে আর তাল মিলিয়ে চলা?কেমন যেন গা গুলিয়ে ওঠে।ক্ষুধার কথা ভুলেই গিয়েছিলো।নাহ শরীর দুর্বল হতে দেওয়া যাবেনা,বেশি করে প্রোটিন আর ভিটামিন সি খেতে হবে ।লেবু চটকে মসুরডাল দিয়ে ভাত কচলে খেতে ইচ্ছা করছে ।ফ্রিজে কটা বাসী ভাত আছে একটু ডাল বসিয়ে দিলেই হবে ।রান্না ঘরে ঢুকে হঠাৎ কী হল ,মাথা ঘুরে পরে গেল ফ্লোরে। জ্ঞান হারানোর মূহুর্তে মনেহল সে যেন স্কুলের পিটি ক্লাসে দাঁড়িয়ে আর ক্রীড়া শিক্ষক আশরাফ স্যার বেত উঁচিয়ে হুংকার দিয়ে বলছেন,মিলা তাল মিলছে না,ঠিক করে পা ফ্যাল, ডান-বাম-ডান ,হ্যাঁ এভাবে তালে তালে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত