একটি নোম্যানসল্যান্ডের স্বপ্ন


আজ ১৯ এপ্রিল। কবি শমীম কবীরের জন্মতিথি।ইরাবতী পরিবার এই শুভ লগনে কবিকে স্মরণ করছে বিনম্র শ্রদ্ধায়।


শামীম কবীরের কবিসত্তা এবং কবিতা 

নভেরা হোসেন

কিছু একমুখী ব্রিজ গাঁথা হয় আকাশের সানুদেশে, তাকে দেখবার জন্য, বুঝবার জন্য দরকার হয় আরও কিছু ব্রিজ, আরও কিছু নলাকার যন্ত্র। কবি শামীম কবীরকে পড়বার জন্য এই সাদামাটা চোখ এবং মনের অভিঘাতে সৃষ্টি হয় আরও কিছু প্রতিবিম্ব স্বচ্ছ কাচের টুকরো। শতরঙ্গে ঝালাপালা এক গোলকের কেন্দ্র ধেকে গোপনে বেরিয়ে আসা বিন্দু জোড়া দিয়ে দিয়ে তৈরি করে কবিতার সাম্পান। জলপথে পরিভ্রমণরত সাম্পানে যাত্রী হয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে কোথা থেকে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম আর কোথায় গিয়ে পৌঁছেছি বা আদৌ কোথাও পৌঁছায় নাকি সে সাম্পান—তা কবিতার জার্নিতে একটা ক্রিয়েটিভ প্রশ্ন।

২.
নব্বই-একানব্বই সাল। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট তৈরি হচ্ছে। পাঠক সমাবেশ, সন্দেশ কয়েকটি বইয়ের দোকান গড়ে উঠেছে। মার্কেটের দোতলা আর তিনতলায় উঠবার সিঁড়িতেই ছিল মূল আড্ডা। মাঝে মাঝে এমন হতো, সিঁড়ির শুরু থেকে মাথা পর্যন্ত ভর্তি হয়ে যেত। আসত বিষ্ণু বিশ্বাস, সাজ্জাদ শরীফ, ব্রাত্য রাইসু, মাসরুর আরেফিন, শাহেদ শাফায়েত, আয়শা ঝর্না, ফরিদ আহমেদ সহ আরও অনেকেই। আড্ডাগুলোতে শামীম সবসময় থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই ও আত্মমগ্ন হয়ে থাকত, পকেটে দু-একটা কবিতা। ভিড়ের মধ্যে সে লিখে যেত। শামীম কবিতা লিখে বন্ধুদের পড়ে শোনাতে পছন্দ করত। আজিজ মার্কেট তখন ছিল আমাদের বাড়ি-ঘর। পাবলিক লাইব্রেরিও। সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে আসতাম। বন্ধু তাজুলের বড় ভাই আর্টিস্ট সাইদুল হক জুইসের বাসা ছিল ধানমন্ডি পনের নম্বর। সেখানেও আড্ডা হতো। মাঝে মাঝে শাহবাগে মার্কেটের সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকত শামীম, তখন তাকে দেখাত একটা লম্বা নাকওয়ালা ধনেশ পাখির মতো। গরম শামীমের সহ্য হতো না, লাল হয়ে যেত, পানি খেত খুব। বুয়েটের তিতুমির হলের ২০৮ নম্বর রুমে বন্ধুদের সাথে অনেক সময় কাটিয়েছে শামীম। তিতুমির হলের গেস্ট রুমেও আড্ডা চলত। বুয়েটের মামুন ভাই, জয়ন্ত ভাই—এদেরকে মনে পড়ছে। শামীমের ক্যাডেটের এক বন্ধুও বুয়েটের হলে থাকত, সেখানেও মাঝে মাঝে থাকত শামীম। সোবাহানবাগের ডেন্টাল হোস্টেলে বগুড়ার ও ক্যাডেট বন্ধুদের সাথে বহু সময় কাটিয়েছে কবি। ৯১-৯৩ এর দিনগুলোতে শামীম এবং আমাদের বন্ধুরা—সকলেই চরম বোহেমিয়ান দিন কাটিয়েছি, যা এক দুর্লভ সময়খণ্ড হয়ে মিশে আছে রক্ত-মগজে।

সমসাময়িক কবিদের মধ্যে মাসুদ খান, বিষ্ণু বিশ্বাস, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মজনু শাহ সহ আরও অনেকের প্রতি এবং তাদের কবিতার প্রতি শামীম আকৃষ্ট ছিল; সে সময়ে একাডেমিক ডিগ্রি না নেওয়ার বিষয়ে শামীম মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল আর সকল ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকে বাইরে থাকতে চেষ্টা করত। সাহিত্যও সে করতে চাইত যেখানে খুব স্বাধীনভাবে লেখা যায়, শিল্পোত্তীর্ণ কাগজ, লিটল ম্যাগাজিনে। কবিতার ধ্যানে নিমজ্জিত হয়ে থাকত সে, ভাষার প্রেমে, শব্দের প্রেমে। নিবিড়ভাবে তা ঘটে চলত তাঁর ভেতরে এবং খুব স্বাভাবিকভাবে। কোনও আরোপণ নয়, এমনকি কবিতা লেখাকে সে বিশেষ কিছু ব্যাপার মনে করত না। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, কেউ কাঠ ছাঁচে, কেউ রান্না করে এরকমই বা কেউ পদ্য লেখে। মানুষের মৌলিক ঘটনাগুলোর একটি। শিল্প নিয়ে কচকচানি শামীম সহ্য করতে পারত না বলে লোক সমাগম থেকে দূরে থাকত। লেখালেখির পুরো বিষয়টাই খুব সাধারণ ও সহজাত এবং তা আবহমান গ্রন্থি থেকে গ্রন্থিতে ও বিষয থেকে বিষয়ান্তরে বিরাজমান—এই ছিল তার অভিপ্রায়। বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলোতে শামীমের মধ্যকার বোহেমিয়ান শিল্পীর সাথে দেখা হয়—যে ভেতরে ভেতরে নরম তুলোর মতো উড্ডীয়মান, নিমগ্ন নিজস্ব কল্পনার জগতে—যেখান থেকে উঠে আসত শব্দ, বিভাস, বিভাসিত ধ্বনি। ‘অতর্কিত একটি পিছল কাঁখ/ আমাকে বহন করে/ যুদ্ধের বাহিরে একা অনবদ্য কন্যাকায/ মিঠা সংগঠন/ একটি অচল মগজের মোম আজ আরও/ সত্যি সত্যি জ্ঞানী হ’য়ে ওঠে’—এইসব চিত্রকল্প তাঁর কবিতায় তৈরি হতে থাকে। যা শুধু শব্দ নয়, বাক্য নয় এর মধ্যে কবি সন্তরণরত, আকণ্ঠ নিমজ্জিত। করাত দিয়ে পা কাটবার দৃশ্য দেখবার মতো ঋজু কবি অনন্তের যাত্রা করেছিল অধরা কবিতার পৃথিবীতে, আর তাই বুঝি কবিতার সাথে ক্ষণিকের বিচ্ছেদ তাঁকে করে তোলে নৃশংস। হ্যাঁ। নিজের প্রতি। ‘কী ভীষণ অস্থিরতা যে নিজেকে এখনও স্থির কাঠির মতো দেখে নিয়ে মাপতে পারলাম না/ আর একটা বিশাল করুণ ঘণ্টার মতো একটা মহা কৌতুক লেগে আছে আমার চোয়ালে, কণ্ঠায় বুকের ওপর দুই পাঁজরে/ যাকে প্রাণপণে ভালোবাসি তাকে ভালোবাসতে না পারা’—এই ছিল কবির নিদারুণ যন্ত্রণার উৎস।

৩.
মালিনীকে জল তুলে দিতে হলে বাগানেই রাত্রপাত হবে। সহস্র বছর আর তারও অধিককাল নিদ্রা গেলেও রাত্রি জেগে থাকে, অনন্তকাল তার ডানা ঝাপটানো। মাথার ভেতর খেলা করে লক্ষ লক্ষ উঁইপোকা। তাদের অন্ধ হওয়ার গল্প সবার জানা। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে রাতের সকাল, সকালের রাত্রি। শামীম কবীর কবিতায় যে ভূ-খণ্ডে বাস করেছে তা খানিকটা লবণ দিয়ে পোড়া কিন্তু তিতকুটে নয় মুখে দিলে সাই করে একটা তরিৎ-প্রবাহ শিরা-উপশিরায় রক্ত-সঞ্চালন, এক ঝলক উষ্ণতা। তবে গ্লাসিয়ারের নির্মম শীতলতাও ভর করে তার কবিতায়। এটা অনেকটা যুদ্ধের দিনে ট্রেঞ্চের নিচে পথ খুঁজে বেড়ানোর মতো। হাঁটছো, হাঁটছো চারদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি, মরকলাগা ইঁদুর, পঁচা দুর্গন্ধময় গলিত মানুষ। এভাবেও চলতে থাকে কালের চাকা, সে কখনও নিজের ডানায় জুড়ে দেয় বিদ্যুতের আলো কখনও ভেঙে ফেলে কাচের তৈরি হাতদুটো, যে হাত তাকে লাঙলের ফলা ধরতে শেখায়। রং নং রং নয় রক্ত ঝরিতেছে। এই রং লাল, এই রং সবুজ, এই রং বর্ণহীন। হ্যাঁ শামীমের কবিতায় সে রঙের দেখা পাওয়া যায়। পাতার নিচে যে অন্তর্জাল সে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে শিল্পীর আঁচড়ে, কখনও কবিতার অক্ষরে। জন্ম এবং মৃত্যৃ। এ দুটোই অপরিহার্য মানে এটা একটা চক্র, চক্রায়ন, চক্রমন। ছোট শিশু একদিন পক্ককেশ তারপর তার এপিটাফে লেখা থাকে এমন সব ঠিকানা যা ওই মুহূর্তের তাকে চেনায় না। শামীম কবীরের কবিতায় এই ঘূর্ণন খুব নির্বিকারভাবে সন্তরণশীল। তাকে বলতে দেখি—
একটি পাতার একটি জীবন
গজায় বা ফোটে
তারপর বাতাস থেকে কয়লা বনের গ্যাস নেয় গ্যাস
উড়ন্ত ঝিরিঝিরি বল্লম ফলার মতো
প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী আড়াআড়ি দেখে
তারপর মূল পথে পানি টানে
আর স্ফীত হয়
(প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী)

অন্যত্র—
একদা সেখানে ছিল নীরবতা
(এবং) ছিল নিবিড়তা
একজন দুইজন আর কিংবা তিনজন
ক্রমে লোকালয় সরে গ্যাছে।
(আরো এক টুর্নামেন্ট)
এই হচ্ছে শামীমের কবিতার দ্যোতনা। একই সাথে সময়ের ভেতর সময়ের মন্ত্রণা। কুঁজো খেজুর গাছের স্মৃতি ভাসে তার মনে যেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে ঠনঠনিয়ার এপিটাফ। যেখানে লেখা আছে—
জ্ঞানী কবরের স্কন্ধে চরে ফিরে এখানে এলাম
ছোট ছোট অট্টহাস্য মাখা ধুলা ঘাস ও বাতাস
এখানের এই নাম অন্যপুর নিহিত রেখেছে
থাবন্ত আগুনে ছাওয়া এ যে সেই খাঁ খাঁ পারগেটরি।
(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)
শামীমের কবিতায় শব্দ নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে, ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের ভেতরের দুয়েন্দে শব্দ ফুঁড়ে অন্য এক অর্থের ডাইকোটমিতে পরিভ্রমণশীল।

তুমি কি জ্যান্ত? তোমাকে বলেছি চমকাও।
আলতার দাগে ভরে গেছে নীল মুখটা
চারদিকে ওড়ে উদ্বোধনের ঝিলমিল তাতে ছটা নেই
চারদিকে ভাসে নাকি বমোন
এমন সব কথার জালে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে কবির পৃথিবী যেখানে সে নিজেই তৈরি করে চক্রবূহ্য। এই চক্রে আবর্তিত হতে হতে কবি হয়ে ওঠেন ধারাল পৃথিবীর মতো সর্পিল। তার ভাষা আর কবিতা কেটে ফেলে গত শতকের লাল গালিচাকে যেখানে পশমের ভাঁজে লুকানো থাকে গোলাপ পাপড়ি, তারা খচিত বসরাই ঝালর। নিজের তৈরি চক্রবূহ্যকে ভেঙে কবিকে হাঁটতে দেখি খোলা প্রান্তরে যেখানে রেডিয়োতে গান বাজছে—
যে মতে ধুলার স্মৃতি হলো ছারখার
সে মতে ফিরিলা তুমি ফিরিলা আবার
অশরীরী পুড়ে খাক শরীরী অনলে
আর তার বায়ুঘের ধিকি ধিকি জ্বলে
(রেডিয়োতে গান)

৪.
শামীম কবীর সম্পাদনা করতে গিয়ে কবির মূল পাণ্ডুলিপি এবং দ্রষ্টব্য থেকে প্রকাশিত শামীম কবীর সমগ্র বহুবার পড়েছি। এছাড়া কবির সতের বছর বয়সে লেখা একটা বেগুনি রঙের ডায়েরি, বেগুনি মলাটের পাণ্ডুলিপি, বন্ধুদেরকে লেখা চিঠি এসব কবির মনস্তত্ত্ব বুঝতে অনেক ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। বেগুনি ডায়েরি আর পাণ্ডুলিপির খাতাটা কবি নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। মানসিক জগতে দুরন্ত ঘোড়ার তারুণ্য নিয়ে লেখা আর তা সংরক্ষণের বিষয়ে কবি অনেকটাই নিঁখুত। তার হাতের লেখায় যেমন শিল্পীর ছোঁয়া আছে, প্রতিটি কাজে এবং কথায়ও তাই। সে কথা অন্য কোথাও কোনওদিন লিখব হয়ত। একজন কবির কবিতাকে পড়তে গেলে যেমন সেই কবিকেও পড়তে হয়—কথাটা যেন এই কবির ক্ষেত্রে অনেক বেশি সত্য। মনে পড়ে যাচ্ছে মা’র সঙ্গে বাক্যালাপের কথোপকথন, যেখানে কবি মাতাকে সমোদরা জেনে তার যৌবন ছুঁয়ে যান।
মা আমার যেরকম লাগে
চক্রাকারে সে রকম মূর্ছা
সিড়ি হারিয়ে আর কে কোথায় পেয়েছিল কবে
(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)

এই সব বাক্যে কবিকে মা অর্থাৎ নারীর মনন ও দেহের নৈকট্য অনুভব করতে দেখা যায়। পুরুষতান্ত্রিক বাঙালি সমাজে কবির উচ্চারণ তার মনস্তাত্ত্বিক গঠনকে বুঝতে অনেকটা সহজ করে দেয়, এখানে মা অনেক সময় চিরায়ত বন্ধনী ছেড়ে অন্য অন্য সত্তাকে প্রকাশ করে। কবিতায় কবি নিজের আত্মকে প্রকাশ করেছেন। জানি না কথাটা কতোটা গ্রহণযোগ্য হবে কিন্তু শামীমের কবিতা পাঠে তার অন্তর্গত অশান্ত আত্মা বা সেই সত্তাকে পাওয়া যায়—যে ধূলি ঝড়ের শরীর থেকে খসে পড়ে যাচ্ছে ধুলায় ধুলায়। এই অনুভব একজন কবির নিজেকে যেকোন লিভিং বিয়িং অথবা অবজেক্টের সাথে একাকার হয়ে যাবার চিন্তন প্রক্রিয়ার সাথে দেখা করিয়ে দেয়।
তোমার বিপুল গড়নের মধ্যে
কোনওখানে
এক টুকরো জটিল উল্লাস আছে
তার স্পর্শে বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণ
আর আমি ভয়ে ভয়ে
মানুষ হয়ে
উঠে দাঁড়াই
কিন্তু পা কোথায়
হা হরতন হো ক্যুইট
(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)

যে সকল কবিরা বাংলা ভাষায় আধুনিকতার সূচনা করেছেন কবি সেখানে নতুন কিছু যোগ করেছে। সমসাময়িক বাংলা কবিতায় ভাষা নিয়ে যে এক্সপেরিমেন্ট চলছে শামীমের কবিতা সেখানে অগ্রবর্তী। ইনডিভিজ্যুয়্যালি অনেকেই সে কাজটি করে যাচ্ছেন। শামীম নব্বইয়ের সূচনাতেই ভাষা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে যার ধারাবাহিকতায় অনেক কবিই লিখে যাচ্ছেন। সময়ের সেলাই কলে এসব পোশাক তৈরি হচ্ছে, হবে। নতুন দিন ও মানুষ সে পোশাক পরছে, পরবে। এটা ঘটে অনেকটা এককালচারেশনের মতো করে। সংস্কৃতির প্রপঞ্চগুলো যেমন স্বতস্ফূর্ত এবং চাপানো দু-প্রক্রিয়াতেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাতায়াত করে তেমন লেখার ভাষা, মুখের ভাষা, কবিতার ভাষা, গদ্যের ভাষাকে তৈরি করে দেয় সংস্কৃতির সোসিওফ্যাক্ট, আর্টিফ্যাক্ট, ম্যান্টোফ্যাক্ট। সেখানে একজন শামীম কবীর একটা ভূমিকা রাখে যেমন রাখে চর্যাপদের কাহ্নুপা, রামায়ণের চন্দ্রাবতী, ধূসর পাণ্ডুলিপির জীবনানন্দ, পুলিপোলাওয়ের সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। তালিকাটা খুব ক্লিশে হয়ে গেল হয়ত। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। আর প্রত্যেক কবিই তার লেখার সময়কালে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট, অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান। আলোচিত কবির লেখার সময়কালটা যেহেতু আক্ষরিক অর্থেই সীমিত সেক্ষেত্রে তার কবিতা নিয়ে কথা বলতে গেলে সময়ের একটা মাপের মধ্যে থাকতে হয়। ত্রিশ বছর বয়সে কবি কী লিখতেন বা চল্লিশে বা পঞ্চাশে তা দেখার সুযোগ আমাদের হয়নি, হবে না। কিন্তু সাড়ে চব্বিশ বছর বয়সে তার লেখার যে ভলিউম তা অনেক সময় আমাদের বিস্মিত করে, বিশেষত তার অন্তর্নিহিত চিন্তা আর ভাষার ব্যঞ্জনা, সর্বোপরি সেই কাব্যিকতা, কাব্যময়তা।

আমরা কে কে যে
কজন বা কতো
ভুলে হয়ে গেছি আমাদের মতো
(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)

এই যে শামীমের কবিতার কিছু বাক্যাংশ—তা শুধু একটি ব্যক্তিগত দলিল নয়, নিরীহ কোনও উচ্চারণও নয়। একটা জলাজঙ্গলময় বেপথুগামী সময়ের মানুষের ক্রম আর্তনাদ। তরুণের যে স্বপ্ন এবং স্বপ্নের আলোড়ন তা থেকেই উৎসারিত এই আপ্ত বাক্য সকল।

সরু মাস্তুলের ছায়া পানিতে তরঙ্গ লেগে টলে ক্যানো
বহু অপেক্ষার পরে মুত্র এসে লবণের
প্রশমন গায় ক্যানো
বেঁচে থাকাটাকে আমি ফুলে উঠে ঘেমে যেতে দেখে
যে রকম লবণ লাগার কথা বলে থাকি
(স্নান ঘরে সোনার বোতাম)
দেখে দেখে বলে যাই অঙ্গলীনা জামা
তুমি মোর প্রাণের সম্রাট
তুমি নীল ডোরা শাদা মেজেন্টায় ঘনীভূত হবে
তুমি ও প্রোলোগ মিলে একত্রে উপমা ক’রো
উপমিত একটি টেবিল
যখন ছলনা ক’রে চিঠি শব্দ নিয়ে করে ধুলা ধুলা খেলা
তখন জানি না কিছু খালি দেখি ধুলাটাই মুখ্য আর ঘোলা
(সারাটা জীবন যদি উবে যায়) যে তখন
কড়া স্তবাধার
(নভেরা)

শামীমের কবিতায় বেঁচে থাকাটাকে আমরা এমন ফুলে উঠে ঘেমে যেতে দেখি তা রিয়েলিটির এবং একই সাথে সুররিয়্যালিটির কথা বলে। সুররিয়্যাল পৃথিবীতে জীবনের চিত্রটাই আঁকা হয়, তাকে দেখবার পারসপেকটিভ থাকে আলাদা। জলের ভেতর থেকে দেখা মাছ আর জলের বাইরে থেকে দেখা মাছ দুরকম নক্সাকে ফুঁটিয়ে তোলে; তাকে বুঝবার জন্য দুরকম, দশ রকম, দশ সহস্ররকম চশমার প্রয়োজন। সাহিত্য তথা কবিতায় এই যে ডায়মেনশন, জীবনকে, মৃত্যুকে কাঁটাছেঁড়া, বাক্য, শব্দ নিয়ে খেলা তা শামীম অনায়াসে করে গেছেন প্রায় প্রতিটি কবিতায়। শামীমের কবিতায় সাধারণ জীবনের প্রতিদিনকার চালচিত্র খুব যত্নের সাথে আঁকা হয়েছে যা একই সাথে সাধারণ আবার বিশিষ্ট।

এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাথা গালিচায় শুয়ে
কুয়াশার মতো—তার নিদ্রামগ্ন ভাসমান চোখে ধীর লয়ে
শীর্ণ এক নদীর প্রতিমা ফ্যালে সুরময় ছায়া, শতাব্দীর
শুদ্ধতম শিলাখণ্ড শিয়রে তার—ঠিক একগুঁয়ে
ধীবরের মতো : ছিন্নভিন্ন-ছেঁড়া জালে কৌশলে মরা নদীর
শ্রোণী থেকে অপরাহ্নে রূপালি ইলিশ ছেঁকে নেবে: পঁচা ঘায়ে
গোলাপের মধু ঢালা অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে য্যান। ভীষণ অস্থির
হাতে সে ক্যাবল বিষণ্ন খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির।
(এই ঘরে একজন কবি)

এই ঘরে একজন কবি’ কবিতায় কবিকে এত পরিণত আর বিচিত্র অনুষঙ্গের সাথে পরিভ্রমণ করতে দেখি যা প্রকৃত কবির আত্মার সাথে পরিচয় ঘটায়। গোলাপের পাপড়ি হতে শীর্ণ নদীর গহ্বরে কবির যে পরিভ্রমণ। ‘কোথায় দেব রাজস্ব’ পাণ্ডুলিপির অন্যান্য কবিতা—‘শামীম কবীর’, ‘সমুদ্র দণ্ড’, ‘পৃথক পালঙ্কে’—সব যেন এক একটা কাচের টুকরো। সয়ম্ভূ আবার বিচ্ছিন্ন। ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা যায় আর তা একজন ধীবরের, একজন দাবদপ্তরির, একজন চোর, ব্যাধ, গজারি গাছ সকলের। এরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে কাচের টুকরায় উদ্ভাসিত হয়। বিভিন্ন এবং ব্যাপ্ত। এই প্রবণতা কবির সতের বছর বয়সে প্রকাশিত কবিতাতেই দেখা গেছে। কবির প্রথমদিককার কবিতায় রোমান্টিকতার সাথে বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ, আনন্দ একাকার হয়ে আছে। তবে সে কবিতাগুলোতেও প্রচ্ছন্নভাবে দেখবার একটা বিমূর্ত চোখ আছে; যে মূলত দর্শক, ভ্রমণ-পিপাসী। জার্নি করছে শরীর হতে অশরীর, সেগুনের কাচা ঘ্রাণ থেকে নক্সি কাঁথার ভাঁজে, বসন্তের তরুণী জারুলে। তরুণীর চন্দ্রীল স্তনের স্তাবক, শঙ্খীল যোনী, ছুটন্ত স্টারলেট, নোম্যানসল্যন্ড, ঘামের সমুদ্র—এসবই কবির চলাচলের জায়গা। প্রথম দিককার কবিতায় শামীম কবিতায় অনেক সহজবোধ্যভাবে ভাষাকে ব্যবহার করেছে যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমান্তরাল ব্রিজ তৈরি করেছে, মৃত্যুর শিহরণ পেয়েছে সে প্রেমিকার স্পর্শে।

বিরানব্বই পরবর্তী কবিতায় কবির ভাষাকে আক্ষরিক অর্থেই বদলে যেতে দেখি। ক্রমশ শীতের পোশাক ছেড়ে সে গায়ে জড়িয়ে নেয় নানা রঙের উদগ্র আকৃতিআলা ফাটাফাটি গান। কবিকে বলতে দেখি—
আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়েছি আর
আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়ে ফেলেছি
শুধু আর তোমার আঙুল
হেঁটে বেড়ায় আমার থ্যাতলানো গরম চাঁদিতে
আর
আর
এই অদৃষ্টহীন কবি কি খোঁজেন নিজেই হয়ত জানেন না। কখনও টক্সিনের মৃদু মিষ্ট ক্রিয়ায় আক্রান্ত হন, কখনও ঘুমের শরবত খেয়ে বেঁচে থাকাটাকেই ফুলে ফেঁপে উঠতে দেখেন। শামীমের দেখবার চোখ অনেকগুলি, লাল কালো অনেকগুলো চোখ চেয়ে থাকে নলাকার কাঠ থেকে। এই যে দ্রষ্টা, এই যে দেখবার ইচ্ছে, ক্ষমতা, ভ্রমণ এটাই তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। ক্লাসিক ঘরানার সাথে রোমান্টিসিজমের সংমিশ্রণ ঘটেছে কবিতায়। আবার নাগরিক পৃথিবীর একক নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতাও দেখা যায় তার কবিতায়। এই বিষণ্নতা, বিচ্ছিন্নতা কখনও কখনও তার মধ্যে অনিচ্ছার তৈরি করেছে। বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে। কোনও তৃষ্ণাই যেন নেই কবির, কোনও ক্ষুধা। আবার অগাধ লবণের সাগরে তৃষ্ণার্ত কবি স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান সুমিষ্ট পানীয়র আকাঙ্ক্ষায় যা ততদিনে গ্লাসিয়ারে পরিণত হয়ে গেছে। বাস্তব পৃথিবীর অভিজ্ঞতা ছেড়ে তিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন সুররিয়্যাল পৃথিবীতে। যেখানে বাস্তব, অবাস্তব আর প্রতিবাস্তব পরস্পরকে বিদ্ধ করে আড়াআড়িভাবে, লম্বাভাবে। এই অতি বাস্তব পৃথিবী তাকে হয়ত নেশা, বন্ধুত্ব, মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। অধরা কবিতার পৃথিবীতে যাপন করতে করতে কখনও তাকে ছুঁড়ে ফেলতে দেখি সেই কবিতাকেই। একমাত্র কবিতার পৃথিবীতেই শামীম কবীরের সন্তরণ—যেখানে আছে ব্যাধ, হিজড়ে, সমকামী, রানীমা, আরও একটি চাঁদ, তার প্রেতাত্মা, পঙ্খীরাজ, রক্ত, বীর্য, যোনী। একজন দ্রষ্টা কবি সময়ের অতীতে, বর্তমানে, ভবিষত্যে ভ্রমণ করেন আর মর্গের বাহির থেকে শুনতে পান হাতুড়ি ছেনির বিচরণ, আমরা পাঠক এবং সকলেই শুনতে পাই তার নির্মাণ-ধ্বনি।
___________________________________

কবি শামীম কবীরের জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল, বগুড়ার কাহালু গ্রামে নানা বাড়িতে। রংপুর ক্যাডেট থেকে মাধ্যমিক এবং রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর প্রথাগত পদ্ধতির পড়ালেখার প্রতি তার অনীহা জন্মে। ছেড়ে দেন। নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন লেখালেখির সঙ্গে। ৯০ থেকে ৯৩ পর্যন্ত সময়ে লিটল ম্যাগাজিনকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঢাকার সাহিত্য জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। নদী, প্রান্ত, দ্রষ্টব্য, রূপম, একবিংশ’ ইত্যাদি লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতো।

কবি বন্ধুদের সাথে তাঁর বোহেমিয়ান জীবন-যাপন পরিবার ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য ছিল। শামীম আপাদমস্তক একজন কবি ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। শামীমের কবিতা ’৯০-এর দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট্যসূচক। আধুনিক মানুষের ভেতরের জটিল মনস্তত্ত্ব, নিঃসঙ্গতা, চারিত্রিক বহুত্বতা, মানসিক ব্যবচ্ছেদ—এসব ছিল তার লেখার প্রিয় বিষয়। লেখার পাশাপাশি শামীম কবীর ছবি আঁকতেন এবং গান গাইতেন। ’৯৫ সালের ২ অক্টোবর বগুড়ায় নিজ বাড়িতে শামীম কবীর আত্মহত্যা করেন।

শামীম কবীরের কবিতাঃ


মালিনীকে জল তুলে দিতে হলে বাগানেই রাত্রপাত হবে


কয়েকশো হাজার আর আরও একটি
করাতের মধ্যে শুয়ে
ঠ্যাং তুলে কে আবার গান গায়

তবে সোমবারে গায়
(তখন অনেক রাত যখন দুপুর)

সৌরালোকে—মধ্যে মধ্যে
ছিটকে আসা গোলার্ধগুলিই
সাথে সাথে মিলবার সময়
যখন তখন কেউ পা-হারার বন্ধনীতে
রং নয় রং নয় রক্ত ঝরিতেছে

নভেরা একদিন রাতে উপরোক্ত করাত দিয়ে
পা কাটবার দৃশ্য স্বপ্নে দেখলাম
তারপর জেগে উঠে জ্ঞান হাতড়ে পেলাম যে
I have been bitten
O the sickness of mine is a cosmic
event.
ফের বলি :
     অগ্রাহ্য করি না তবু তবে
     মালিনীকে জল তুলে দিতে হলে বাগানেই রাত্রপাত
                                                                                                         হবে
     যেহেতু পাদুকা আছে জেনে
     চলে যাই

 


দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান


অস্থায়ী
সারাক্ষণ হাতে চাই চাই গানের বাকশো

কতো রঙের ঢঙের আকৃতিঅলা ফাটাফাটি গান
আর সাবেক প্রভুত নামে শৌচপর্ব সেরে
দেহ খুলে ফেলে তারা বাদসঙ্গী
সদ্য হ’লো তাদের তা পরিচয় ভুল

মনে করি ভুল আমি তাই ভুল করে সকলেই
সহজে সহজ ভুলে ভ’রে যায় রাফ খাতা
মাথাটি গোবর ভরা যদি হয় আর
সোজা যেও মুনমুন ফার্মেসী
এবং সঠিক মাপে মাপে খাপে খাপে
চাঁদ ভরে দেবে তারা
তবে আমি যা কল্পনা করি
নষ্ট হলে পুনরায় সারাবার সহজাভ
পথ থাকা চাই

আকৃতি বিশেষ নয়
যখন তা মনে হয় তাই হয়
প্রথাভাঙা দেহ পেয়ে গাইবার জন্য যা যা গান
যে সবই সতেজ হবে
কাঁখে বাকশো ও আকণ্ঠ পান
সারাক্ষণ হাতে চাই গানের বাকশো খান

স্থায়ী
ফের ওঠে ভেসে ভেসে খড়ের ভেতর বুনোফল
বৈশ্যদের অধিকারে আরও দিন দিন
দিবাগত রাত্র বেলা বিকিরিত কাটা তান শুনে
পুড়ে যেতে যেতে সোনাভান
বলেছিলো ‘এই চাঁদ আঁটো হয় গলে
অন্য একটা ছোটো বদলে দেবে?’ বলে বলে
তবু আমি চাঁদে চাঁদে গান নিয়ে আরও যাবো চ’লে
Perfect ice, when they call, O Machine


কচ্ছপের খোলার নিচে


কচ্ছপেরখোলার নিচে কাটালাম, দুই হাজার বৎসর, তারপর আজ, মাথা বের করব। আমার মনে পড়ছে সেই বটগাছটির কথা, যার তলায় আমি, পড়ে আছি, তার, বিশাল প্রসন্ন ডালপালা ছড়ানো, চূড়াটি তো অনন্ত উঁচুতে উঠে গেছে, না, তা হয় না, কিন্তু ভেবে, আমার বুকে আনন্দ চমকাল। আমি এর বিশালত্ব দেখে আত্মহারা। যেবার প্রথম, এ অঞ্চলে আসলাম, চারদিকে কেবল কমলা রঙের কর্কশ, ধুলোটে মাটির, ছোটোবড় টিলা আর গড়ের বেষ্টনিঅলা, একরের পর একর, ধানক্ষেত, উঠান, আংড়া, তেতালামাটির ঘর, প্রতিটাঘরের পাশে একটা করে তেজপাতাগাছ, নদীনালা, খালআর মাঠশেষে, গাড়িয়ালেরসুলিখিত, স্বপ্নপ্রকোষ্ঠ, সূত্রশালীচাকার ঘর্ঘরস্পৃষ্ট বহরের নিচ থেকে, চাকচাক গোধূলি, আকাশ, অস্তরেখা ইত্যাদির সম্মিলিত, রহস্য ও লোভ ঠিকরে পড়া, সাতাশশো’টি গ্রাম, তার মধ্যে, মহাপ্রাণ এক বৃক্ষ। দেখে, আমি, কিছুকাল তন্ময় তার প্রেমে, তারপর আত্মহারা। আমি ঘুরেফিরে, এসে, এর নিচে রোদ পোহাতে লাগলাম, প্রতিদিন। প্রতি সন্ধ্যাবেলায়, তার আবছা, ছাতার শীর্ষের দিকে, আমার ছোট্ট, বিষণ্ণ দেহ, তুলে ধরে বলতাম, চমৎকার,আজ যাই। এদিক সেদিক, ঘরে বেড়াতাম, তারপর ধীরে ধীরে, চেনা হয়ে গেল,বাগানের আলো লাগা কাচে, দিন শেষের আনন্দিত মুখ, দেখতে দেখতে, শেষ চা, টাটকা পোস্টার, টিনেরহরিণ, সিফিলিসের জীবাণু, পুলিশের ভ্যান—সব, চেনা হয়ে গেল, সবাই।


আমার ঘর


এখন সময় হ’লো
আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে ফেরার
আমি দুপায়ের হাড় বাজিয়ে ফিরবো
আমার ঘরে
না কোনো ফুলের ঝাড়
কেবল মৃত্যু
আমার ঘরে কী সুন্দর সাজানো


কাঁপন


বৃত্তের সূত্র :
বৃত্তের পাশ ছুঁয়ে থাকা হাত
আলগোছে সরে এসে একটু একটু কাঁপলো

তাকে কী বলা যায়

আমি বাহান্নজন বালকের মুখ তৈরি করি
আদলে আদলে বিদ্যুৎ স্পৃহা চমকায়
আর হাত নিচু করে যখন সরে আসি
সন্ধ্যার সুবাস রেখে চলে যাওয়া রুমালের
অগোচরে জীয়ে থাকা অজস্র কাণ্ডের সাথে
গলাগলি আর খাড়া থাকবার উন্মাদনা
শেকড়ের গুপ্ত স্ফিতির চেয়েও
উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে

আমি এই পৃথিবীর নই

গোলকের সূত্র :
কব্জা খুলে ছুটে ছুটে যাওয়া প্লীহার গন্ধ
ভরাপেট উগরে গিয়ে বিকেলের হিম মাখানো রোদ
গায়ে মেখে ক্রমশ উদাস হয়ে যায়

যা ভাবায়
যা কাতর করবার জন্য আনাগোনা করে
কবিতাকে আঁকড়ে থাকতে হয় এক ছোটো
                              পীত রঙের হুকের সাথে
আর হাত ফসকে পড়ে যাওয়া কাঁধের গল্প
আজ মনে পড়ে যায়

যার কাছে গচ্ছিত রাখার বেদনা
এক বোতল উগ্র জেদ আর পাশবালিশের
কান ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের আঁকাবাঁকা রেখা
আজ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে
যার কাছে আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে
ফেরার সময় হয়
হয় হয় হয়

সেই গন্ধে আকুল চেতনার একপাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া
এখন এই বিলয়ের বিনির্মাণ কালে
বৃত্ত ও গোলকের সমন্বয় সূত্র :
ডাক পাড়ে ডাকে
খালি ডাকে
একটু একটু ঠুকরে বেড়ানো ঠোঁটের পিনবিন্দু
স্থায়ীভাবে একবার বসতে চায়
তোমার অন্দরের ভিতর

ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি
অথচ রাজ্যের বিস্ময় চিহ্ন মাখানো ছাতুর পিণ্ড
আকাশ জুড়ে করতাল বৃষ্টির সাথে ঝরে
ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি

ক্ষুধা আমি ভুলে গেছি
মেশিনের বরপুত্র আমি


একটি নোম্যানসল্যান্ডের স্বপ্ন


একটি নোম্যানসল্যান্ডের পথ বেয়ে বসে আছি
অন্য এক দোল খাওয়া মাঠে
মাঠের উত্তরে আছে উঁচু এক বিম্বনাশী টিলা
সে টিলার খাঁজে ভাঁজে ফুটে থাকে দোদুল ফুলেরা

দক্ষিণের বায়ু এসে পরগায়নের সাথে
পাখি ও প্রজাপতির দীর্ঘশ্বাস মেশায়
অন্য সকলও

পূর্বে আছে পিত্রালয়
পথের কিনারগুলো কেটে ছেঁটে কুরতি
সেই পথে বহু মৃদু শ্যাফ্ট-এর সুরে
ভেসে আসে মায়েদের ব্যথা

অমরার নিভু নিভু বিচ্ছুরণ কালে
সে আসবে পশ্চিমের প্রকাণ্ড পশ্চিমগুলি ভেঙে
আর আমি সেই নোম্যানসল্যান্ডেতে শুয়ে ব’সে

হস্তমৈথুনের জন্য ঝোপ ঝাড় তৈরি ক’রে নেবো
আর আজ আমি উষ্ণ উজ্জ্বল কাঠের জুতোয় ঢুকে
মজা লুটি সাত-রশ্মি দিবস রজনী

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত