সম্পূর্ণ কিংবা আধেক মানুষ

 

 

পিঙ্গলকেশী খালি পায়ে বেরিয়ে গেছে। জামার ফিতা খুলে বরফকুচি বিঁধছে গায়ে। তুষারঝড় ঠেলে হাঁটছে বেহুঁশের মতো। পায়ের আঙুলের ডগা নীলচে অবশ। হাতে রুটম্যাপ নেই। নেই কাঁধ থেকে পিঠের ওপর ঝুলিয়ে নেয়া রুকস্যাক। শাদা আর শাদায় ছেয়ে আছে বিরান পাথার। ওদিকে কিচ্ছু নেই। বাকিটা অন্ধকারের। বিশাল থাবার শ্বেত ভালুকের।মরবে। সে মরবে। ঘরের ভেতর দোলচেয়ারে বসে অ্যাবসোলুট ভোদকায় চুমুক দেই আমি। চুপচাপ দেখছি সব। বলছি না কিছু।আসলে কিছুতেই বলে উঠতে পারিনি।কাউকে তাড়িয়ে দিয়ে কী করে বলা যায়- ওখানে যেয়ো না!

চোখের ভারী দুটো পাতা খুলে গেল। রু চলে যাবার অনেকদিন পর স্বপ্নটা দেখলাম। ভোদকার ব্যাপারটা শুধু যোগ হয়েছে। ছেড়ে যাওয়া স্বপ্নটা চোখ বুজে আবার আনার চেষ্টা করি।আসে না। বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের খুব ভেতরে টনটন করে। ঠিক কোথায় বুঝিনা।হাত দিয়ে দেখতেও ইচ্ছে করে না। সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে না। টয়লেটে যেতে ইচ্ছে করে না।অভ্যাস মতো বালিশের নিচে হাতড়ে সেল ফোন খুঁজি। আজ সাপ্তাহিক ছুটি। সময় না দেখলেও চলত। তবু দেখলাম সাতটা উনিশ। বালিশ উল্টেপাল্টে শুয়েই থাকি।

রুদাবা চৌধুরী শেষ ইমেইল পাঠিয়েছিল তিন বছর আগে। ২৯ ফেব্রুয়ারী।এরপর স্বপ্নটা এসেছে তিনবার। অনেকটা ধারাবাহিক ভাবে। প্রথমবার দেখলাম চুনিরঙা চুলের এক মেয়ে।দরজাঠেলে ঘরের বাইরে চলে গেল। কেবলে স্বপ্নে মানুষ রঙ দেখে না? দ্বিতীয় বার, ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়ে হাঁটছে।হেঁটেই চলছে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। বরফ মোড়া চারদিক ধবধবে। প্রচণ্ড তুষার ঝড়ের মধ্যে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। তৃতীয় বারের স্বপ্নে এসবের সাথে যোগ হলো আমার দর্শক চরিত্র, ভোদকা সহযোগে। 

রু, রু… ডাকলেই তামাটে মেয়ে ৪৫ডিগ্রী ডানে একটু ফিরে তাকাতো। তখনও বোঝা যায়নি, জীবনে ওকে আর পাওয়া যাবে না। রু এর সবই অভিনব। লিপইয়ারের দিনটিতেই গায়েব হয়ে গেল। তবুকুয়োর গায়ে লেগে থাকা দড়ির মতোই আমার অনুভবে রু লেগে আছে। কুয়ো শুকিয়ে গেছে। অথচ বুজিয়ে দিতে কেমন মায়া লাগে।দড়িটাও থেকে গেল।

সকালে কিশমিশ দেয়া হোলগ্রেন কর্নফ্লেক্সে লো ফ্যাট দুধ ঢেলে খেত রু। কলা কেটে দিত টুকরো করে। খেত সবজী সেদ্ধ, স্প্রাউটস আর মাছ। এসব নাকি হাড় ভালো রাখার ডায়েট। বাজার থেকে ফিরেই বলতো- জিনিসের কী দামরে বাবা! অথচ পুরো বাড়ি অ্যান্টিক জিনিস আর ট্রাইবাল মুখোশে সাজিয়েছিল। কী অপূর্ব সব ইনডোর প্ল্যান্টস ঘর জুড়ে। ফুলগাছের সারি বারান্দায়। অগুনতি বই বুকশেলফ আলো করে হাসছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কেমিস্ট্রি পড়াত রুদাবা। বেতন ভালোই। হাতে দুটো ক্রেডিট কার্ডের লিমিট বাড়িয়ে নিয়েছিল। খরচপাতির আর সমস্যা ছিল না।

খোলা জানলা দিয়ে এই সকালবেলাতেই ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে আসে। সুদীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফুসফুস থেকে বেরিয়ে সেই শুকনো পাতা পোড়ান ধোঁয়ায় মিশে যায়। ঝকঝকে উজ্জ্বল রোদে ঘরভরা।এতো আলোয় চোখ বুজে থাকাও বিরক্তিকর। ফুলস্পীডে ঘুরতে থাকা ফ্যানটা কমিয়ে দিলে হয়তো আরাম লাগত।সেটাও আমার করতে ইচ্ছে করে না। হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিই। কাল রাতে পড়তে গিয়েও পড়া হয়নি। চোখ বুলাই ডেইলি স্টারের বিজনেস আর স্পোর্টস এর পাতায়। ধূসর আর লালচে রঙের ওপর কালো কালো অক্ষরে লেখা সব খবর। সেও তো পেছন ফিরে দেখাই,যদি খবরের কাগজটা হয় গতকালের। ভাবছি, আজ পুরনো বইয়ের পাতা উল্টিয়ে, পুরনো মুভী দেখে নিজের সাথে সময় কাটাবো। একেক দিন এমনই হয়। যেদিন ইচ্ছেয় বাঁচতে মন চায়।

বেশ ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।গায়ে রোদ জড়িয়ে হেমন্তের আকাশ শুয়ে আছে মেঘবালিশে।সময় গড়ালে মৃদুঝাঁঝ ছড়াবে। বিছানাটা ছেড়ে এবার উঠতে হলো। মুখে পানির ঝাপটা দিতেই শীত শীত আমেজ।আয়নায় তাকিয়ে দেখলাম নিজেকে।চুলে কিছু পাক ধরেছে।আনমনা হয়ে দু দিনের না-কামানো দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে দেখলাম। সেখানেও কয়েকটা রূপালী ঝিলিক।যাহ্‌ শালা! বুড়ো হয়ে গেলাম! ঘোর কাটল মোবাইল ফোন বেজে ওঠার পর।

খাটের ওপর ফোন কাঁপছে সুরে সুরে। স্ক্রীনে সামিউল নামটা দেখেই আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। ভুলে গিয়েছিলাম আজ এরিক ম্যুলার আসবে।সাউথইস্ট জোনের হেড। জাতে জার্মান। ফোনের ওপাশ থেকে সামিউল জানালো- ফ্লাইট ল্যান্ড করবে দুপুর তিনটায়। মি. ম্যুলারকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যেতে হবে।

সময় মতোই না হয় এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাব। কিন্তু ফ্লাইট দেরী হলেই মুশকিল। অবধারিত বসে থাকতে হবে। ছুটির দিনে অন্য কোনো সহকর্মীকে এয়ারপোর্টে যাবার অনুরোধ করা অন্যায্য হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই জেলি মাখালাম ব্রেডে। এক কামড় দিয়েই মেইলে ঢুকলাম। সেখানেও সামিউল। ইমেইল পাঠিয়ে রেখেছে।কালকের মধ্যে সেলস রিপোর্ট ফাইনাল করতে হবে।পরশু রিপোর্ট প্রেজেন্টেশান ম্যুলারের সৌজন্যে।ফোন ফেলে রাখলাম পাশে। পরশু এখনও দেরি আছে। ইলেক্ট্রিক হিটারে গটগট করছে কফির পানি।

আলোগোছে আলস্যে পুরনো ইমেইল খুলে পড়ি। আমি লিখেছিলাম- রু, তুমি বিশ্বাসী। তুমি কি বোঝো ঈশ্বর এক বোধের নাম? তুমি কি জানো আকাশে অল্প কিছু নক্ষত্র এলে কোথাও আলো জ্বলে থাকে? রাত গভীর হলে অচেনাপথে যেহেঁটেযায়,তুমি তাকে চেনো?

সকালে রু উত্তরে লিখেছিল- রাতে কী সব অদ্ভুত ভালো কথা ইমেইলে লিখে গেছো। ছিন্নমূলের নিঃস্ববাটি পরমান্নে এভাবেই ভরে ওঠে। যতই পড়ছি আকাশ থেকে যেন মিষ্টি রোদ নামছে গুঁড়িগুঁড়ি। মনে হলো হুহু শীতে কে যেন পেছন থেকে অনুভবের চাদর পরিয়ে দিল! পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলে যে জেগে থাকে, তাকে আমি চিনি।

আচমকা স্মৃতির ধুলো ওড়ে। সেধুলোচোখে পড়লে, একটু ভিজে উঠতেই পারেচোখ। তাই হয়তো স্ক্রীন ঝাপসা দেখি। অক্ষরগুলো জলে পড়া ফোঁটা ফোঁটা কালির মতো ধীরে ছড়িয়ে যায়। রু ছিল তাল গাছের উঁচু ডালে বসে থাকা একটা বাবুই পাখির মতো। নিচে তাকালে যার মনে হতো, যেন পুকুরে পড়ে গেছে। গাছের ডালে বসেও কী ভীষণ ডুবে যাবার ভয়! এমনই তো ছিল রুদাবা।অথচ কী ডুবটাই না দিল। সরে গেলো হাজার মাইল দূরে।

যৌথতার চার বছর ফুরিয়ে গেল কত দ্রুত। আমার একশ চব্বিশটা ইমেইলের উত্তরে দুটো রিপ্লাই দিয়েছিল রু। একটা উত্তর দিয়েছিল কোনো একট্যুরিস্ট স্পট থেকে। তেমনটাই মনে হয়েছে ইমেইল পড়ে। সাগর ঘেঁষা পাহাড়ের ওপর সেই এক টেম্পল। লিখেছিল, এক সূর্যাস্তের কথা। সন্ধ্যায় আকাশের নিচে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইছে শত শত বৌদ্ধ শ্রমণ। অপার্থিব সুরের বিস্তার শান্তসাগরে। হাজার হাজার পর্যটক নিশ্চুপ। আচ্ছন্ন হয়ে আছে লালচে সোনালী মৃদুআভায়। পড়ে মনে হয়েছিল বালি’র উলুওয়াতু টেম্পল। ইন্দোনেশিয়া থেকে রু লিখেছিল-খুঁজোনা। ভুলে যেও।

সেই চার বছর আগে একদিন আম্মা ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিল- রু কই? কোথায় গেছে সে?

-তোমার কী দরকার? জানি না। এই বলে ফোন কেটে দিয়েছিলাম।

কানে হেডফোন গুঁজে খুব নাচত রু। ইচ্ছে মতো। একা ঘরে, একমনে। বারগেন্ডি রঙা চুল তখন উড়ছে ফুলস্পীড ফ্যানের হাওয়ায়। ওর কীর্তিকলাপে আমি থ! আমাকে দেখেই একগাল হাসি। হেডফোন ছুঁড়ে ফেলে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়া। মৃদুসুগন্ধীর মোহনীয়তা। কোনোদিন ইচ্ছে হলো তো গোলাপি টপ খুলে শাড়ি। হয়তো কচি কলাপাতা জমিতে হলুদ পাড়। একদিন আঁচলের প্রান্তে ঝালরের মতো সুতোর গুচ্ছ দেখিয়ে বলেছিল- এগুলো কী জানো?

– না তো!

– পমপম।

– সে তো আমার কাজিনের নাম! অনিকেত মামার ছোট মেয়ে।

– পমকে তুমি ভালোবাসতে?

দূরত্ব উপহার দিয়ে রু চলেগেছে।অথচ একটা চুল পেঁচিয়ে রইল ব্রাশে। খুব পরিষ্কারের বাতিক।কেমন করে চুলটা থেকে গিয়েছিল, কে জানে? বারগেন্ডি মসৃণ চুল।শুকনো অব্যবহৃত নেইল পলিশ আর কিছু তেলরঙও পড়েছিল।সেগুলোও কোনোদিন টিউব থেকে বেরিয়ে আসে নি।এর আগের ইমেইলে লিখেছিল কোনো এক মিউজিয়ামে পার্টটাইম চাকরী নিয়েছে। হাতে বানানো সোনা-রূপার আর্টিফ্যাক্টস গুলো খুব টানতো ওকে।আর দেয়ালে ঝোলানো পেইন্টিংস।বিশেষ করে ওকে সঙ্গ দিয়েছিল মনের ‘ওয়াটারলিলি’।তার মানে রু তখন টোকিওতে। কালচারাল ম্যানেজমেন্টের ওপর একটা ডিপ্লোমা করেছিল।সেটাই কাজে লেগেছে।

আজ রু’র জন্মদিন। রু থাকলে এই ছোট ফ্ল্যাটেই পার্টি জমে উঠত। কলিগ আর নতুন-পুরনো বন্ধুরা মাতিয়ে রাখত সন্ধ্যা থেকে রাত। টেবিলে উপচে পড়ত গিফটের প্যাকেট। বাচ্চারা একঘরে ব্যস্ত কার্টুন চ্যানেল আর কম্পিউটার গেমসে। বন্ধুর বউরা অবিরাম গল্পের ফোয়ারা ছুটিয়ে দিত। আরেক ঘরে চলত ড্রিঙ্ক-মিউজিক-হাসাহাসি। বিশেষ দিনে রু বারান্দায় পিতলের প্রদীপ কিংবা মোম জ্বালিয়ে দিত। মোমের আগুন রিল্যাক্সিং আর সেন্স্যুয়াল সুগন্ধী তেলের সুবাস ছড়িয়ে দিত চারপাশে।

সেদিন দিনভর রান্নায় ব্যস্ত রু। নিজ হাতে অতিথিদের রান্না করে খাওয়ানো ওর শখ। অদ্ভুত অদ্ভুত নামের সেসব রকমারী খাবার। ওর সর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশ আর লেমন পিপার চিকেন আমার ভালো লাগত। চৌত্রিশে পা দিয়ে রু নিশ্চয়ই এখন আরো আকর্ষনীয়, আরো পরিণত ব্যক্তিত্বময় হয়েছে। অন্তত এ রকম ভাবতেই ভালো লাগে।

বারান্দায় অন্ধকারে রূপম সেদিন তীব্র অভিমানী হয়ে উঠেছিল। মোমবাতি মৃদু সুগন্ধ আর আলো ছড়িয়েছে চার কোণে। মায়াবী গলায় সে বলছিল, আমি তোমাকে যা দিতে পারি, রু কি তা পারবে?প্রবল চাপা কষ্টে রূপম জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে। যাকে ও ভালোবাসে সে অন্যের, এটা কখনোই মেনে নিতে পারে নি। ম্লান আলোয় অন্ধকার যেন আরো সুবিপুল। নইলে ওর চোখে হয়তো স্পষ্ট একটা ব্যথাহত ঈর্ষাময় চাহনীর ঝিলিক দেখা যেত।

যখন ছোট ছিল তখন থেকেই সুন্দরী মেয়েদের দেখলে রূপমের মনে হতো- মেয়েরা কত সুন্দর! ওরকম একটা শরীর কেন তার হলো না? ব্যাকরণ বইয়ে শব্দের পুংলিং-স্ত্রীলিঙ্গ শেখার আগেই ওর সাজতে ভালো লাগত, গান গাইতে ভালো লাগত। বোঝা আর না-বোঝার মিহি কুয়াশার আবরণে ষোল বছর পেরিয়ে সত্যটা জেনে গেল রূপম। সত্য এটাই নারীর নরম কোমলতা ওকে আকর্ষণ করে না। পুরুষের শক্ত পাথরকোঁদা শরীরেই ওর নির্ভরতা। নুনঘামের গন্ধে জীবনের আশ্বাস।

রূপমের এই কষ্টের কথাগুলো শোনার মতো আর কেউ ছিল না। পাড়ার ক্লাবের ক্রিকেট টীমের ক্যাপ্টেন ছিলাম আমি। প্র্যাকটিসের সময় বল কুড়িয়ে আনত রূপম। বয়সে চার পাঁচ বছরের ছোট তো হবেই। কখনও হয়তো মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম। সেটুকু আশ্রয় পেয়েই আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল। শুকনো পাতায় জল পড়লে কেমন সজীবতা ছড়ায় সেই গল্প বলত রূপম। আক্ষেপ করত হেমন্তের বিকেল কেন এতো ছোট? ওকে নিয়ে ওর মা-বাবার দুঃখের কথা বলত। গান শোনাত। কাঁদত। রূপমের সব কষ্টের সঙ্গী আমি। রূপমের আড়াল কষ্টও আমি।

নীরব অভিব্যক্তি দিয়ে রূপম আমাকে কিছু বোঝাতে চাইছিল কিংবা বাস্তবতাটা নিজেই বুঝতে চেষ্টা করছিল। হয়তো একটা দীর্ঘ চুমু, আগের মতোই তীব্র আদর পেতে চেয়েছিল। রূপম সত্য। সত্য আমার অন্যরকম ভালোবাসাও। নিজেকে ছাড়িয়ে না নিয়ে শান্তভাবে ওর পিঠে হাত রেখেছিলাম।

আমার খোঁজেই বারান্দায় এসেছিল রুদাবা।একঝলক ওর শাড়ি দেখলাম আমি। অফহোয়াইট জামদানী রাতের অন্ধকারে খুব ভালো ফোটে।

রাত দুটো হবে। অতিথিরা ফিরে গেছে জন্মদিনের উৎসব শেষ করে। সুনসান হাটভাঙা হয়ে আছে ঘর। খোঁপা থেকে বেলীর মালা খুলে ছুঁড়ে ফেলল রু। তীব্র আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রু’কে বোঝাতে পারিনি, কিছুই হয়নি। রূপমের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আঁচড়ে, খামচে রুদাবা চিরে দিল হাতের চামড়া। সপাটে চড় দিয়ে বলেছিলাম- দেয়ার’স দ্যা ডোর। গেট লস্ট।

ডাগর চোখে পৃথিবীর সমস্ত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল রু। দুবার হেঁচকি উঠল ওর গলা বেয়ে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গীতে ফ্রিজ খুলে ঢক ঢক করে পানি খেলো। ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে নিস্তব্ধ চলে গেল। তাহলে হয়তো সম্পূর্ণ গড়ে ওঠে না কিছুই। যতটুকু হয়ে ওঠে, অনিবার্য হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। উত্থান-পতন আছে সব কিছুরই। সেটা সম্পর্কই হোক কিংবা সভ্যতা। রূপম আর ফিরে আসেনি। ছেড়ে যেতে না-চাইলেও, ছেড়ে যেতে হবে বলেই হয়তো সেই সন্ধ্যায় অমন আঁকড়ে ধরেছিল।

সকাল এগারটা দশ। তেতাল্লিশ ইঞ্চি প্লাজমা টিভিতে খবর চলছে। জাতিসংঘের ধারণা, সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে…তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার নিশ্চিতে আইন জরুরি… রুদাবার ওপর খুব রাগ হয় আমার। কোথায় খুঁজব রুকে? ইমেইল ধরে ধরে কি আর নাগাল পাওয়া সম্ভব? নির্মাণাধীন ভবনের রিজার্ভ ট্যাংকে পড়ে শিশুর মৃত্যু…রু কোথায় যে হারিয়ে গেলে! কত কথা লিখতে চেয়েছি…মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্যা ডে… তুমি কি এখন জাপানের কোথাও আছো? নাকি ইন্দোনেশিয়ায়?নাকি আরো পুবে সরে গেছো? অস্ট্রেলিয়ায়? লিখেছি ব্যাস এটুকুই।

একঘেয়ে গলায় খবর পাঠ চলছে। ভূমিকম্পের পর জাপানে সুনামির আঘাত… কোথায় তুমি, রু?রেডিয়েশান ছড়িয়ে পড়ছে ফুকুশিমার পারমাণবিক চুল্লি থেকে… টিভি অফ করে নৈঃশব্দ্যে ডুবে যাই।রু’কে লেখা হয় না কিছু। অবসাদ ঘিরে ধরে। আসলে কিছুতেই লিখে উঠতে পারি না, যা কিছু লিখতে চাই। তাড়িয়ে দিয়ে ওকে কী করে লেখা যায়- ওখানে যেওনা! যৌথতার জীবন অতিক্রম করে সে চলে গেছে। কোথাও যেন আমিও পৌঁছতে চাই প্রাণপন। পারি না। আপাতত এয়ারপোর্টে যেতে হবে। ফ্লাইট অন টাইম দেখাচ্ছে। কষ্টগুলোর রঙ এক রকম না হলেও আদতে কাছাকাছি। আমাকে নিয়ে রূপম, রুদাবার কষ্টও হয়তো কয়েক শেডের হেরফের।

দেয়ালে ঝুলছে রুদাবার প্রিয় টিবেটান মুখোশ।যক্ষের ধুলো ধূসরিত নিষ্প্রাণ চোখ, নির্লিপ্ত তাকিয়ে দূরে কোথাও…

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত