অভিসার । সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ ২৩ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


জুহু তারা রোডের একদম উপরেই এই কফি জয়েন্টটা। অটো থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে রাস্তা পার হয়ে ধীরে সুস্থে সেটার ভিতরে ঢুকল দিবাকর। সঙ্গে-সঙ্গে কফির গন্ধে আরও কতগুলো গন্ধ মিলেমিশে এসে ঝাপটা মারল তার নাকে। মিষ্টির গন্ধ। দিবাকর বাঙালি বলেই যে এত মিষ্টি খেতে ভালবাসে, ব্যাপারটা তা না-ও হতে পারে। সব বাঙালি ছেলের মিষ্টিপ্রীতি নেই। বাতাসে মাখনের সঙ্গে পরতে-পরতে ভ্যানিলা, ক্যারামেল, স্ট্রবেরি, রাসবেরি, কোকোর মতো পেলব সব ফ্লেভার মিলেমিশে গিয়েছে। একটা সুখাচ্ছন্ন মুহূর্তের ভিতর কী অনায়াসে ডুবে যাওয়া যায় এখানে প্রবেশ করলেই! দিবাকর চোখ বুজে নিঃশ্বাস টানল বড় করে। এখানে এত ভাল ডোনাট পাওয়া যায়, ভাবা যায় না। হোয়াইট চকলেটের মধ্যে ডোবানো ডোনাট, উপরে একটু দারুচিনির গুঁড়ো ছড়ানো। টপ ফেভারিট দিবাকরের। কে যেন বলছিল, আরাধ্যা বচ্চন রোজ এখানকার ডোনাট আর কেক স্কুলের টিফিনে নিয়ে যায়। হা, হা, হা! যে বলছিল সে আসলে নিজের উচ্চতম স্বপ্নকে বাজিয়ে দেখে নিচ্ছিল অন্যদের সামনে। যে বলছিল সে হয়তো স্কুলে ম্যাগি নিয়ে যাওয়ার জন্য রোজ বায়না করেছে মার কাছে, এখন আরও ভাল কিছু নিয়ে যেতে চায় টিফিনে। কিন্তু তার সমস্ত টিফিন পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে আজীবনের মতো। আর তার সেই স্বপ্নের জায়গায় এখন একটা বিরাট গর্ত। স্বপ্নটা বড় হবে হয়তো, কিন্তু স্বপ্নটার মৃত্যু হবে না।

দিবাকর একবার দেখে নিল ভিতরটা ভাল করে। যে আসছে তার নাম অবন্তী সান্যাল। বাঙালি মেয়ে। একটা সুইস ব্যাঙ্কের গোপন এমপ্লয়ি। স্পেশাল জব রেসপন্সিবিলিটি। থাকে হীরানন্দানির ওখানে একটা ফ্ল্যাটে, চারজনে শেয়ার করে। এখান থেকে অনেকটা দূর। দিবাকর দেখে এসেছে অ্যাপার্টমেন্টটা গোপনে। হ্যাঁ, মেয়েটা ওখানেই থাকে। মেয়েটার দেওয়া সব তথ্যই সে যাচাই করে নিয়েছে। এমনকী মেয়েটা যে বলেছিল রোজ অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার আগে সে ফুটপাথের দোকান থেকে ব্রেড, ডিম এসব কিনে নিয়ে সপ্তাহটা কোনওমতে চালায়, এটাও সত্যি। দিবাকর দেখেছে। নাহ! অবন্তী সান্যাল নামের মেয়েটা এখনও এন্ট্রি নেয়নি। দিবাকর একটা কর্নারের টেবিল বেছে নিয়ে বসল। সুন্দর মস গ্রিন কার্পেট পাতা পুরো ফ্লোরটায়। দেয়ালের রং ছাই বর্ণ। কাউচগুলো লাল। কুশনগুলোয় সোনালি প্রিন্ট। দেওয়াল ভর্তি ডেকোরেটিভ ওয়াল প্লেট, সারা পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করে এনে লাগানো। একটা ভিক্টোরিয়ান টাচ আছে জায়গাটার। পশ এরিয়া। পশ লোকজন। কফিশপের মালিক অনেক ভেবেচিন্তে ইন্টিরিয়র করেছেন।
মেয়েটা বলছিল শনিবারের আগে তেমন করে বাজার করার সময় থাকে না ওর। ভাত খেতেও অপেক্ষা করে শনিবার অবধি। কারণ অন্য তিনজনের একজন ইউ পি-র, একজন সিন্ধি আর একজন বিহারি। এরা প্রত্যেকেই ভীষণ কৃপণ। বাহার কা খানা এরা খায়। কিন্তু চেষ্টা করে নিজেরা বানিয়েই খেতে, যতটা পারে। ওই কিচেনে নিজের ভাত-মাছের ঝোল রান্না করাটা অবন্তী সান্যালের পক্ষে বেশ চাপের। তাই মেয়েটা শনিবার অবধি ওয়েট করে করে শেষ দুপুরে ভাত-মাছ রাঁধে আর গোগ্রাসে গিলে একটা ঘুম দেয়। এই দুটো ছুটির দিন ওর নতুন সপ্তাহের জন্য নিজেকে রেডি করতেই চলে যায়। জামা-কাপড় গোছানো, আয়রন করা, এটা একটা বড় কাজ। অবন্তী সান্যাল কোনও পার্টিতে যায় না। মেয়েটা একদমই মিশুকে নয়। ইয়ারবাজ নয়। চুপচাপ শান্ত। তা সত্ত্বেও আজ শনিবার মেয়েটা শেষ দুপুরে বেরিয়ে এখানে আসছে। না, দিবাকরের সঙ্গে প্রেম করতে নয়, নেহাতই পেশার খাতিরে। কে না জানে অবন্তীর পেশাটাই এমন যে যত চুপচাপ থাকতে পারবে ততই ভাল। যত কম মিশবে ততই মঙ্গল।
নিজের পছন্দের ডোনাট আর কফি অর্ডার দিল দিবাকর। অবন্তী সান্যালের থেকে সে খুব একটা বড় হবে না। বছর দু’য়েক হয়তো। দুজনেই বাঙালি আর কলকাতার। তবু এই ডিলটায় কে কাকে কত বেশি কব্জা করবে, কে কাকে কত বেশি চোট দেবে, তার একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা আছে আপাতত দু’জনের মধ্যে। অবন্তীকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই ২৪ বছরের মেয়েটাকে এত বড় একটা বিদেশি ব্যাঙ্ক এত গুরুদায়িত্ব দিয়ে রেখেছে।

যেমন দিবাকরকে দেখেও বোঝার উপায় নেই তার ক্লায়েন্ট তার সিদ্ধান্তে অনায়াসে কয়েক কোটি টাকার জিনিস কিনে নিতে বা বিক্রি করে দিতে পারে। যে বিদেশি ব্যাঙ্কের হয়ে কাজটা করে অবন্তী, সেটা একটা সুইস ব্যাঙ্ক। অবন্তীকে একজন নির্দিষ্ট ক্লায়েন্টকে হ্যান্ডেল করতে হয়। সেটাই তার কাজ। মিস্টার জলিল হলেন দিবাকরের ক্লায়েন্ট। যিনি অবন্তীর ক্লায়েন্ট মিস্টার চাড্ডাকে দুটো-তিনটে জিনিস বিক্রি করবেন। মিস্টার চাড্ডা হলেন একজন আন্তর্জাতিক কিউরিও কালেক্টর, আর্ট কালেক্টর। সুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট থেকে অবন্তীই টাকাটা রিলিজ় করবে। অন্যান্য যোগ্যতার সঙ্গে আর্ট হিস্ট্রি, ভিজ়ুয়াল আর্ট হিস্ট্রির উপর সিঙ্গাপুর থেকে লেখাপড়া করার ডিগ্রিও আছে অবন্তীর। অন্য দিকে মিস্টার জলিল একজন ছোটখাটো চাড্ডা। একই ব্যবসা। একই বিষয়। তবে জলিল অনেক বেশি অন্ধকার জগতের লোক। চাড্ডার থেকে অনেক আনফেয়ার তার বিজ়নেস আর বিজ়নেস পলিসি। জলিলের জিনিস অবন্তী অলরেডি দেখে নিয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে দুটো জিনিস যে আহামরি কিছু না, তা বলাই বাহুল্য। যে সংগ্রহ করে তার জন্য বিরাট মূল্যবান হতে পারে। নইলে এরকম জিনিস অনেকের কাছে থাকলেও থাকতে পারে আর সে হয়তো আদৌ ওয়াকিবহাল নয় সেটার মূল্য সম্পর্কে। জিনিস দুটো হল, এক, এয়ার ইন্ডিয়ার প্রথম ক্যালেন্ডার। দুই, এয়ার ইন্ডিয়া ব্র্যান্ডের স্ট্যাচু ম্যাসকট মহারাজার আসল পোর্সিলিনের ফিগারটা। পরের প্লাস্টার অফ প্যারিসের যে মূর্তিগুলো গিফট করা হত ওগুলোর সাইজ় ছিল সাড়ে তিন ইঞ্চি। এই পোর্সিলিনের ফিগারটা ১৯৪৬-এ আর্টিস্ট উমেশ রাও-এর নিজের হাতে বানানো। আঠারো ইঞ্চি লম্বা। পরে ১৯৭৫-এ এটা একটা ভল্ট থেকে চুরি যায়। সেই মূর্তি এখন জলিলের পজেশনে। এই দুটো জিনিস ছাড়া আরও একটা মহার্ঘ জিনিস কিনবে চাড্ডা, জলিলের থেকে। মির্জা গালিবের ব্যবহার করা একটা আতরদান। একটা সোনার ট্রের উপর বসানো কাটগ্লাসের আতরদান, সোনার জালে মোড়া। বাদশা জাফরের উপহার। জলিল এর দাম চেয়েছে দু’কোটি। চাড্ডা রাজি হয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে তিনটে জিনিসের দাম আড়াই কোটি। আজ অবন্তী আসবে। ফাইনাল কথা হবে।
কফি আর ডোনাট এসে গেল। কাচের দরজা খুলে এক যুগল ঢুকল তখন সমুদ্রের হাওয়া সঙ্গে নিয়ে। দিবাকর দেখেই চিনতে পারল মেয়েটাকে। বলিউডের নতুন ক্রেজ়। দিশা পটানি। সঙ্গের পুরুষটির নাম জানে না দিবাকর। তখন তার মনে পড়ল, জলিল তাকে আর একটা ডিল করতে দিয়েছে। সুরাইয়া ছিলেন সাদা কালো যুগের বম্বের টপ হিরোইন। তাঁর সঙ্গে প্রেম ছিল দেবানন্দের। কিন্তু দু’জনের বিয়েটা হয়নি। সুরাইয়া সারা জীবন নীরবে দেবানন্দকে ভালবেসে যান। এবং ডায়রিতে নিজের সমস্ত কথা লিখে রেখে যান। এরকম তিনটে ডায়রি আছে এক মরাঠি নাট্যকারের কাছে। নাম বিলুভাই তেগড়ে। একটাতে ভরা আছে শের-শায়েরি। যুবক বিলুভাই তেগড়ে সুরাইয়ার লেখা এই ডায়রিগুলো চেঁছে একটা নাটক লিখছে। জলিল চাইছে নাটকটা লেখা শেষ হোক। তারপরেই ডায়রিগুলো যে ভাবে হোক কিনতে হবে তেগড়ের থেকে। নাটকটা চারপাশে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে যখন, তখন জলিল কোনও ধনকুবেরকে ডায়রিটা বিক্রি করে দেবে। দিবাকর তেগড়ের পিছনে পড়ে আছে। বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। কিন্তু যতদূর বুঝেছে তেগড়ে সোজা পথে ডায়রি বিক্রি করবে না।

সে এসব ভাবছে, এমন সময় কাচের দরজা ঠেলে অবন্তী সান্যাল ঢুকল। একটা সাদা লিনেনের বাটন ডাউন লং ড্রেস পরা। গলায় একটা মাল্টিকালার স্কার্ফ। ঠোঁটের লাল লিপস্টিক এই দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে। অন্য দিনের থেকে যথেষ্ট বেশি মোহময়ী দেখাচ্ছে অবন্তীকে। অবন্তীর পিছন-পিছন ওদের অ্যাপার্টমেন্ট অবধি গিয়েছিল যখন দিবাকর, তখন দিনের শেষে ক্লান্ত অবন্তীর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খাওয়া দেখে মনে হয়েছিল এত সাধারণ একটা মেয়েকে কি দেখে সুইস ব্যাঙ্ক এরকম সিক্রেট সার্ভিস এমপ্লয়ি রেখেছে? এখন মনে হচ্ছে মেয়েরা প্রকৃতপক্ষে নিজেকে বদলে ফেলার অনেক ক্ষমতা ধরে।
অবন্তী এগিয়ে এল তাকে দেখে। এক ফোঁটা হাসল না। সে বসতে বলল অবন্তীকে। অবন্তী বলল, ‘‘কাল রাত একটার সময় কোলাবার বিটল্স নামের রেস্তরাঁর দোতলার কোণের টেবিলে আমি থাকব। ওখানেই আপনি জিনিস দেবেন আমাকে। আমি চেক করব। আমার আশপাশে আরও লোক থাকবে। তারপর ওখানে বসেই মিস্টার জলিলের বিদেশি ব্যাঙ্কে টাকা ট্রান্সফার করব আমি। আপনার একটা কাট মানি আছে এই ডিলটায়। আট লাখ টাকা। এটা তখনই ক্যাশে রিসিভ করবেন আপনি। মিস্টার চাড্ডা আপনাকে আরও কাজ দেবেন।’’

দিবাকর বলল, ‘‘সরি অবন্তী। এই প্রফেশনে এথিক্‌স থেকে এক চুল সরলে কিন্তু কোনওদিন কারওই ট্রাস্টের মানুষ হওয়া যায় না। ফলে ওই কাট মানি আমি নেব না। যতদিন জলিল আমাদের ক্লায়েন্ট, আমি চাড্ডার কাজ করতে পারব না। থ্যাঙ্ক ইউ।’’
‘‘ওহ! এটাও বেশ ভাল লাগল। মিস্টার চাড্ডাকে তাই জানিয়ে দেবো।’
‘‘আসলে এটা একটা প্যারালাল ইকোনমি। এখানে বেশিটাই অন্ধকার জগতের লেনদেন। তবু অদ্ভুতভাবে মেনস্ট্রিম ইকোনমির থেকে এখানে বিষয়টা অনেক সাদা-কালো। এখানে বেইমানের কোনও মাফি নেই।’’
ঠিক এরকম সময় দিবাকরের ব্যক্তিগত আইফোনটা বেজে উঠতে দিবাকর দেখল দিদি ফোন করছে। সে ধরে ফেলল ফোনটা। দিদি বলল, ‘‘কোথায় রে? কথা বলা যাবে?’’
‘‘না। পরে।’’
‘‘হি হি!’’ অকারণ হাসল দিদি বসুন্ধরা, ‘‘হোয়াটসঅ্যাপ দেখ। একটা মেয়ের সঙ্গে তোর সম্বন্ধ করেছে মা। তার ছবি পাঠালাম। বম্বেতেই ব্যাঙ্কার। দেখে নিয়ে জানাস।’’
দিবাকর বিরক্ত হল, ২৬-২৭ এর তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য কীসের তাগিদ রে ভাই লোকজনের? পাগল যত! জীবনে বিয়ে করবে কিনা, সেটাই ঠিক নেই। অন্তত মুম্বইতে যতদিন না একটা থ্রি বি এইচ কে কিনতে পারছে, সে এমনকী লিভ ইন-ও করবে না। আসলে মা-দিদিদের হল মজা, হুল্লোড়, ফান। ওরা আনন্দ করবে। সাজবে। গুজবে। তাই তাকে বিয়ে করতে হবে। ওদের কাছে বিষয়টা একটা ধামাকেদার ইভেন্ট। ফাজলামি যত।
রাগের মধ্যেই দিবাকর হোয়াটসঅ্যাপটা খুলে ফেলল। দিদির টেক্সট। দিবাকরের চোখের সামনে অবন্তীর দু’-তিনটে ছবি খুলে গেল। দিবাকর চোখ কপালে তুলে তাকাল জলজ্যান্ত অবন্তীর দিকে। অবন্তী সেই বিস্মিত চোখ খেয়াল করে বলল, ‘‘কী? ডিল নিয়ে কোনও মেসেজ?’’
দিবাকর বলল, ‘‘ইয়ে, হ্যাঁ।’’

খুব দ্রুত নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ফেলল দিবাকর। অবন্তীকে কিছুই বুঝতে দেওয়া যাবে না। হয়তো এখন, একটু পরে, বা কাল এরকম ভাবেই অবন্তীর কাছে তার ছবি যাবে। যা হবে দেখা যাবে। ছবিগুলোতে ‘ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না’ মুখ করে বসে আছে অবন্তী। কিন্তু অবন্তী যেমনই হোক, দিবাকরের কিছু যায় আসে না। তার আর অবন্তীর ডিলিং হয়ে গিয়েছে। তাদের অভিসার ক’দিন আগে শুরু হয়েছিল, কাল রাত একটায় কোলাবার বিটল্স-এ শেষ হয়ে যাবে। তারপর যে যার রাস্তায়। এসব পরিচয় কোনওদিন বাড়াতে নেই। প্যারালাল ইকোনমির এথিক্‌স ব্যাপারটা সাংঘাতিক। একচুল এদিক-ওদিক হলে খুন হয়ে যেতে হয়। তখনই দিবাকরের মনে হল মিস্টার চাড্ডার সুইস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সব ডিজিটগুলো অবন্তী জানে, তাই না? সে গুনগুন করে উঠল, ‘‘ম্যায়ঁ এক চোর তু মেরা রানি, চোরি চোরি চুপকে চুপকে, তুমকো তুমসে হি চুরালুঁ…’’
দিবাকর ঝুঁকে গেল অবন্তীর দিকে, ‘‘সাতটা বাজে। এখনো বিকেলের আলো আছে। আশ্চর্য লাল আকাশ। যাবেন অবন্তী, বিচে? লাল বিকেল, গোলাপি বালি আর চারদিকে নীল-নীল নিয়নের জায়ান্ট বিলবোর্ড। মুম্বই আমাকে রোজ আরও মোহগ্রস্ত করে তুলছে।’’
অবন্তী মাথা নাড়ল, ‘‘নাহ। যাব না। আমি মুম্বই ছেড়ে চলে যাব। এখানে আর পোষাচ্ছে না আমার।’’
দিবাকর বলল, ‘‘কিন্তু চাড্ডা কি আপনার পিছু ছাড়বে? আপনি অনেক বেশি জেনে গিয়েছেন।’’

অবন্তী বলল, ‘‘মেরে ফেললে মেরে ফেলুক। এমনিতেই প্রত্যেক সন্ধেবেলা আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে। সন্ধেবেলা ওই ফ্ল্যাটটায় কেউ থাকে না। আর তখন, ঠিক তখন আমার রুমের জানলা দিয়ে একটা প্লেন উড়ে যায়। তখনই আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে। না জেনে এই পেশায় ঢুকে গিয়েছি আমি। আই ওয়াজ় ট্র্যাপ্ড। এখন বেরতে চেয়েও উপায় নেই।’’
দিবাকর হঠাৎ বলল, ‘‘আমি বের করে আনতে পারি,’’ বলে কিছু আর না-ভেবেই দিবাকর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজটা খুলে ধরল অবন্তীর চোখের সামনে। অবন্তীর চোখ উত্তরোত্তর বিস্ময়ে বড় হতে লাগল, ‘‘আমার বাড়িতে যেন কেউ এসব কিছু…’’ অবন্তী চুপ করে গেল, ‘‘প্লিজ়?’’
‘‘আই প্রমিস। ইন ফ্যাক্ট এই শহরে যে আমরা কীভাবে ট্র্যাপ্ড, সেটা কারও জানার কোনও মানেই হয় না।’’
অবন্তী উঠে পড়ল, স্কার্ফটা কখন খুলে গিয়েছে গলা থেকে, লক্ষই করল না। অবন্তী হাঁটতে শুরু করে কাচের দরজা পার করে, রাস্তা পার হয়ে বিচের দিকে এগোতে লাগল। দিবাকর স্কার্ফটা তুলে নিয়ে পিছু নিল মেয়েটার। ব্যাপারটা সেফ নয়। তাও নিল। এক পর্যায়ে বালির উপর পাশাপাশি দাঁড়াল তারা। সামনে অবিরাম ঢেউ আছড়ে পড়ছে। দিবাকর বুঝল না কেন তার এত ভাল লাগছিল এই মুহূর্তটা। অবন্তী চাড্ডার সুইস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সব ডিজিটগুলো জানে, এটা একমাত্র কারণ নয় হয়তো। এই সন্ধে-সন্ধে আত্মহত্যার ইচ্ছে হওয়াটা তার একেবারেই ভাল লাগেনি। আত্মহত্যাই বা করবে কেন? চাড্ডা, জলিলই বা মারবে কেন?
দিবাকর জীবন নিয়ে হঠাৎ একটু অন্য ভাবে ভাবার চেষ্টা করতে লাগল।

 

 

কৃতজ্ঞতা: উনিশকুড়ি

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত