শরৎচন্দ্রের বাড়ি

এপার থেকে তাকালে ওপারে অস্পষ্ট কিছু গাছগাছালি চোখে পড়ে। নদীর বুকে কোথাও কোথাও চড়া পড়েছে, তবে জল একেবারে কম তা বলা চলে না। ওপার ঘেঁষে চলা নৌকাগুলোকে খেলনার মতো লাগছে, ডিসেম্বরের শেষ, রোদ মিঠে, হিমেল বাতাস।

– শরৎচন্দ্রের অভাগীর স্বর্গ গল্পটা তোমার মনে পড়ে? অভিষেকের প্রশ্নে স্নিগ্ধা কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে চুপ করে থাকে, গোলাপি রঙের শালটা মাথায় জড়িয়ে নেয়। পড়েছ গল্পটা?

– পড়েছি বোধহয়, মনে পড়ছে না ঠিক।

অভিষেক সামনের দিকে একটুও না ঝুঁকে হাঁটু ভাঁজ করে নীচু হয়ে বসে হাত বাড়ায়।

– কি কর? মাটির একটা ঢেলা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুঁড়ে মারে নদীর জলে।ছেলেমানুষ রয়ে গেলে! এই, ওরা কোথায় গেল? দেখা যাচ্ছে না! যাক না, ঘুরুক, কোমর ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, তা বলে ওরা!

– সে তো ঠিক। এই দেখি দেখি, কাছে এসো!

– কী হল ? হামি দেবে?

– চুপ পাগল! এদিকে এসো-দেখি, তোমার চোখের নীচ থেকে লাল গুঁড়ি গুঁড়ি।

– ও কিছু না অ্যালার্জী, কয়েকদিন ওষুধ খাওয়া হয়নি;  চল ওই গাছটার নীচে যাই, বসি।

– আমি বসলে আর উঠতে পারি না, চলো তুমি বসবে।

– না থাক, ওদিকে একটু হেঁটেই আসি। খুব ভালো লাগছে জায়গাটা।

– হ্যাঁ, আমারও, অনেকদিন পর আমরা বেরোলাম।

অভিষেক মাথা নিচু করে হাঁটে। নীল জিন্সের প্যান্ট, কালো উইন্ডচিটার, গলায় সাদা মাফলার। দাঁড়িয়ে পড়ে, নদীর দিকে ফিরে মোবাইল ক্যামেরায় কয়েকটা ছবি তোলে। ফের বলে, শরৎচন্দ্র যখন ওই বাড়িতে থাকতেন তখন ওর ঘর থেকেই নদী দেখতে পেতেন, নদীটা খানিক সরে এসেছে।

– হ্যাঁ, কেয়ারটেকার বাবু বলেছিলেন, শুনলাম। কী বিশাল নদী, বর্ষায় কী রূপ হয়, ভাবো। বন্যায় ঘরবাড়ি ভাসে নিশ্চয়!

অভিষেক একটু চুপ করে থাকে, ফের বলে ভাসাই স্বাভাবিক, গঙ্গার শাখানদী এটা, পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান নদী।

– এই নদী শুরু হয়েছে কোথা থেকে ?

– সম্ভবত ছোটনাগপুর মালভূমি। ওই পুরুলিয়ায়! নামটাও বেশ সুন্দর, রূপনারায়ণ! তোমার নাম কে রেখেছিল?

নাম শুনে বোঝা যায় নদী নয় নদ? স্নিগ্ধা বলতে বলতে দাঁড়িয়ে পড়ে, দ্যাখো দ্যাখো, কী সুন্দর সব বাঁধাকপি।

অভিষেক তাকায় পাড়ের কাছেই পরপর খেত, বাঁধাকপি, মুলো, ফুলকপি। কোথাও ধান কাটার পর শুখা খেত। নারকেল সুপুরি খেজুর গাছের সারি।

– বাঁধাকপি নেব একটা? স্নিগ্ধা যেন বালিকা।

– পাগল! মার খেতে চাও! স্নিগ্ধা হেসে ওঠে। অনেকদিন পর স্নিগ্ধার এমন হাসি দেখে অভিষেকের খুব খুশি লাগে। বাবুই চাকরি নিয়ে দিল্লী চলে যাবার পর থেকে স্নিগ্ধা তো মনমরা হয়েই থাকে, সে তো প্রায় পাঁচ বছর হল। ছুটি নিয়ে বাড়ি আসলে দিন কয়েক হইহই তারপর ফের বাড়িটা নিঝুমপুরী, প্রথম প্রথম তো ডিপ্রেসনের রুগী হয়ে পড়েছিল, ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়াতে হয়েছিল। মাস ছয় আগে বিয়ে করল বাবুই, তারপর এই দিন পনেরো ছুটি নিয়ে এল, সঙ্গে বউমা, বাড়িটা কদিন যেন গমগম করছে।

বাবুই চলে গেলে অভিষেকেরও মন খারাপ লাগে, কিন্তু অফিসের তুমুল ব্যস্ততায় দু-একদিনের মধ্যেই ফের সব স্বাভাবিক হয়ে আসে। আর মাস ছয় পরেই রিটায়ার করবে, তখন হয়তো স্নিগ্ধার মতোই মন খারাপ করবে।

নদীর পাড় ছেড়ে দুটি ক্ষেতের মাঝখানে সরু আলপথ ধরে অভিষেক।

– ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? এসো না তুমিও। এমন সবুজ গাছপালা, ক্ষেত কতদিন দেখি নি।

– অত সরু রাস্তায় আমি হাঁটতে পারি না।

অভিষেক থামে, ফিরে আসে, স্নিগ্ধার হাত ধরে এগিয়ে যায়, নারকেল সুপুরি গাছের ছায়া-ছায়া। কতদিন পর আমার হাত ধরলে এমন ভাবে? তাই! ঠিকই, অফিস বাড়ি-সংসার করতে করতে কবে যে বুড়িয়ে গেলাম!

– ধুস! ষাটে এখন কেউ বুড়ো হয় না কি!

বয়েসটা বড় কথা নয় স্নিগ্ধা। মনটা মরে গেছে! অভিষেকের স্বরে যেন নদীর গভীর থেকে উঠে আসা ভেজা বাতাস।আমাদের চারপাশটা, জীবন, ভাবনা সব কেমন বদলে গেছে। আগে টাকা কম ছিল, অথচ মনের ভিতর এমন খাঁ খাঁ করত না! সব থেকেও যেন কিছুই নেই।

শরৎবাবুর বাড়িটা ঘুরে দেখতে দেখতে আমার কলেজ জীবন, ছাত্রী জীবনের গোড়ার কথা মনে পড়ছিল, আমাদের পাড়ার ক্লাবে নাটক হত, অভাগীর স্বর্গ, মহেশ। শুধু আমাদের ক্লাবেই কেন? গণনাট্য সংঘ, অন্য নাটকের দল গুলোও শরৎ চন্দ্রের গল্প উপন্যাস নিয়ে নাটক করত। অনীকদার পরিচালনায়, সে বোধহয় আশি একাশি সাল, পথের দাবী নাটক করল শরৎ সংঘের ছেলেরা, খুব ভালো হয়েছিল সে নাটক। আমি অভিনয় না করলেও দেখতে যেতাম, নিজেদের ক্লাবের নাটক হলে নানা কাজে জড়িয়ে থাকতাম, কি আমাদের ছিল দিনগুলো আর এখন!

অভিষেকের স্বর আর নদীর বুকের জেগে থাকা চরটা যেন একাকার হয়ে যায়। স্নিগ্ধা অভিষেকের হাতটা জড়িয়ে নাবিয়ে বলে, ছ’মাস পরে তো অনেক সময় পাবে। আর সময় পেয়ে কি হবে! যে সময় ফেলে এসেছি তাকে আর পাব কি ভাবে?

– তুমি তো কবিতা লিখতে এক সময়। ও সব মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরের ছেলেমেয়েরা কমবয়সে একটু আধটু লিখে থাকে! তেমন কিছু নয়। স্নিগ্ধা অভিষেকের পিঠে আলতো চাটি মেরে বলে বেড়াতে বেড়িয়েছি কতদিন পর। মনটা খুশি লাগছিল, তুমি ফের বিষণ্ণ করে দিচ্ছ‌।

– সরি, ঠিকই তো। আসলে বহুদিন পর এমন খোলামেলা জায়গায় এসে, নদী, শরৎবাবুর বাড়ি সব মিলিয়ে তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব না।

– বুঝেছি, আর বোঝাতে হবে না! এবার চলো। ছেলেমেয়ে দুটো গেল কোথায়? জল তেষ্টা পাচ্ছে, নেহার ব্যাগে জলের বোতল আছে, দাঁড়াও বাবুইকে রিং করি।

দুপুর একটার রোদ চড়া হলেও নদীর বুক ছুঁয়ে হু হু ছুটে আসা বাতাস গরমের অনুভূতি আনতে দিচ্ছে না। ডিসেম্বরের শেষ, যে কোনো বেড়ানোর জায়গায় এখন ভিড়, গিজগিজ করে, সে তুলনায় এখানে ভিড় খুব সামান্য। একটি মাত্র পিকনিক পার্টি, তবে সাউন্ড বক্স বাড়িয়ে শব্দ দূষণ করছে না তারা। গত দু বছর ছুটি নিয়ে কোথাও যাওয়া মানেই দিল্লীতে বাবুই এর বাসা, একদিনের জন্যও অন্য কোথাও বেড়োনো হয় নি। ওদিকে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলে অভিষেক মাস দুই হল নতুন গাড়ি কিনেছে, ড্রাইভার রেখেছে, অফিস যাচ্ছে নতুন গাড়ি চেপে। কিন্তু লং ড্রাইভে কোথাও যাওয়া হয় নি। ঠিক করে রেখেছিল ডিসেম্বরের শেষে বাবুই নেহা আসলে চারজনে মিলে বেড়োবে। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ মাসে ছুটির আবহাওয়া যে কোনো টুরিস্ট স্পটেই পা ফেলার জায়গা থাকে না। বেড়াতে বেড়িয়েই দমবন্ধ করা ভিড় একেবারেই পছন্দ নয় অভিষেকের। কোথায় যাওয়া যায় তবে? মুশকিল আসান করল বন্ধু সহকর্মী অমিতাভ, বলল, হাওড়ার দেউলটিতে ঘুরে আসুন। রূপনারায়ণ নদী, শরৎ চন্দ্রের বাড়ি, ঘন্টা আড়াই লাগবে আপনাদের নকুর থেকে। ভেবেছিল সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়বে। কিন্তু বাবুই নেহা উঠতে দেরী করল।  দশটায় বেড়িয়ে বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে সাড়ে বারোটায় পৌঁছালো দেউলটি, প্রথমেই গাড়ি এসেছিল শরৎ চন্দ্রের বাড়ির সামনে। পুরোনো আমলের দোতলা বাড়ি, পাঁচিল ঘেরা, সামনে সুন্দর যত্নে সাজানো বাগান‌। গেটের মুখে পাঁচিলের গায়ে চোখ পড়ল অভিষেকের, “মহেশ” গল্পের শেষ কয়েকটি পংক্তি সুন্দর ভাবে লেখা রয়েছে দেওয়ালে, ” আল্লা আমাকে যত খুশি সাজা দিও কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেছে। তার চরে খাওয়ায় এতটুকু জমি কেউ রাখে নি, যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল, তাকে খেতে দেয় নি, তার কসুর তুমি যেন কখনো মাফ করো না।”

পংক্তিগুলি পড়তে পড়তেই বুকের গভীরে কেমন স্মৃতিমেদুর বিষণ্ণতা অনুভব করল, মনে পড়ে গেল, পাড়ার ক্লাবের নাটকে গফুরের ভূমিকায় একদম শেষ দৃশ্যে শ্যামলদার এই সংলাপ বলার অসামান্য অভিনয়ের কথা। নেহা মোবাইলে ঝটপট ছবি তুলতে তুলতে বাড়ির ভিতর ঢুকেও ফের বেড়িয়ে আসে, বাবা, চল, কি দেখছ?

– এই সংলাপটা কি চেনা চেনা লাগছে রে মা? নেহা পড়ল, ছবিও তুলল। ফের বলল

– সরি বাবা, আমার বাংলা সাহিত্য সে ভাবে পড়া নেই। শরৎচন্দ্রের নাম শুনেছি।

– দেবদাস মুভিটাও দেখেছি।

– হুমম! তোমার স্কুল বোধহয় ইংরাজী আর হিন্দি!

– হ্যাঁ। তবে বাংলা থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল। লিখতে পড়তে পারি। হিন্দিতেও শরৎচন্দ্র পঠিত হন, এমনও হিন্দিভাষী মানুষ দেখেছি তারা জানেন শরৎচন্দ্র হিন্দি ভাষারই লেখক। আসলে আমার পড়ার বইয়ের বাইরে সেভাবে স্টোরি বুক-টুক পড়ার ইচ্ছা ছিল না। বাংলা মুভি দেখেছি, দেখি, বাংলা গানও শুনি। কিন্তু লিটারেচার মানে! সেভাবে…।

– বুঝেছি, সবাই তো এক রকম নয়, হতেই পারে। গাড়ি পার্ক করে এসে বাবুই তার নতুন কেনা ডিজিটাল এস এল আর ক্যামেরায় বাড়ির আশেপাশে ছবি  তুলছিল। উল্টোদিকে পুকুর, পুকুরের ধার দিয়ে নারকেল-সুপুরি-কলা গাছের স্নিগ্ধ সবুজ, পুকুরের পাড়ে এ পাশে টিউবয়েল। একটি বাচ্চাকে সিমেন্টে বাঁধানো কলপাড়ের চাতালেই স্নান করাচ্ছে একজন মহিলা। বাবুই বাচ্চাটির দিকে ফোকাস করে পরপর কয়েকটি ছবি নেয়। গেটের মুখে মহেশ গল্পের দেওয়াল- লিখনটি বলে, ও মহেশ। নেহা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেও অভিষেক অপেক্ষা করছিল স্নিগ্ধার জন্যে, একটু দূরে পে অ্যান্ড ইউজ টয়লেটে গেছে।

অভিষেক বলে,

– যাক, মহেশ পড়েছিস তাহলে!

– ওটা সিলেবাসে ছিল যে-সবাই পড়েছে আমরা যারা বাংলা স্কুলে পড়তাম।

অভিষেক মৃদু হেসে বলে,

– আর কিছু পড়েছিস ?

– হ্যাঁ, শ্রীকান্ত উপন্যাসের মেজদার অংশটুকু, ওটাও তো সিলেবাসে ছিল।

বলতে বলতেই বাড়ির ভেতর ঢোকে তিনজনে। টালি ছাওয়া বারান্দা, লাল সিমেন্টের মেঝে, কাঠের খুঁটিগুলো সবুজ রঙের,  জুতো খুলে চার ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে ওঠা গেল বারান্দায়। সামনেই রাখা পুরোনো কালের হাতলওলা কাঠের চেয়ার। বয়স্ক এক ভদ্রলোক একতলার নদীর ধারের ঘরটি দেখিয়ে বলেন, এটিই ওর লেখার ঘর, এখানে বসেই উনি “মহেশ”, “অভাগীর স্বর্গ” উপন্যাস বিপ্রদাস লিখেছেন। অভিষেক বোঝে ইনি বাড়ির কেয়ারটেকার। ওরা চারজন ছাড়াও আরও আরও পনেরো কুড়ি নারী- পুরুষ বাড়ি জুড়ে ঘুরছেন। লেখার ঘরটির সামনে যায় অভিষেক স্নিগ্ধা, পুরোনো আমলের কাঠের চেয়ার-টেবিল, কাঠের বাঁকানো লাঠি, শরৎচন্দ্রের চির পরিচিত একটি ছবি। ঘরের ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই, দরজার বাইরে থেকেই দেখতে হচ্ছে। পেছনে আরও কয়েকজন ঠেলাঠেলি। কেয়ারটেকার মশাই বলেই চলেছেন, এখানে উনি ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩৮, এটি ওর পৈতৃক বাড়ি নয়, নিজের কেনা, এ বাড়ি একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল।

ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে অভিষেক,স্নিগ্ধা আর বাবুই, নেহা ছবি তুলে যায়। একটি ঘরে কাঠের হাতলওলা ইজি চেয়ার, সুন্দর সাজানো বিছানা, সাদা ওয়াড়ের বালিশ, পাশ বালিশ, সাদা চাদর। দোতলায় যায়, এ বাড়ির পিছন দিকে, টালি ও টিনে ছাওয়া আরও দুটি ঘর।

পুরো বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সাজানো গোছানো। একতলার দেওয়ালে লেখা সরকারি প্রজ্ঞাপন, বাড়িটি ২০০৭ সালে হেরিটেজ বিল্ডিং ঘোষণা করা হয়েছে।অভিষেকের কানে আসে হিন্দি কথোপকথন, তার মানে এই বাড়ি দেখতে আসছেন বাংলাভাষী নন এমন মানুষজনও। অভিষেক মৃদু স্বরে বলে,

– উনি চলে গেছেন। ১৯৩৮ সালে, আশি বছর হয়ে গেল, এখনো মানুষ তার বাড়ি দেখতে আসছে।

– স্নিগ্ধা বলে কেয়ারটেকার বলেছিলেন, শরৎচন্দ্রের জন্মদিন উপলক্ষে মেলা বসে এখানে, বহু মানুষ আসে। ঘুরতে ঘুরতে ফের একবার ইজিচেয়ার রাখা ঘরটির সামনে দাঁড়ায় অভিষেক, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে চেয়ারটির দিকে।

ওরা তিনজন বারান্দা থেকে নেমে পড়েছে, স্নিগ্ধা ডাক দেয়,

– এই শুনছ, চলো নদীর ধারে যাই এবার।

অভিষেকের সাড়া নেই। বাবুই ডাক দেয়, সাড়া নেই। স্নিগ্ধা ফের উঠে আসে বারান্দায়, কাছে গিয়ে পিঠে আলতো টোকা মারে, অভিষেক চমকে ওঠে।

– স্নিগ্ধা বলে, কী হয়েছে? ডাকছি শুনছ না, চমকে উঠলে কেন?

অভিষেক ঠোঁটে তর্জনি রেখে ইশারায় চুপ করতে বলে, ফিসফিস করে বলে

– দেখছ?

– কী? কিছু দেখছ না?

হ্যাঁ, ইজিচেয়ার।

– চলো, আমি দেখছিলাম শরৎবাবুকে, হাতদুটো পেছনে এলিয়ে বসে আছেন।

বুঝলাম

-চলো এবার।

দুপুরের খাওয়া সারতে সারতে তিনটে বেজে গেল। দেউলটি থেকে গাড়ি নিয়ে এন এইচ-সিক্সটিন ধরে কোলাঘাটের দিকে একটু এগিয়েই একটা ভালো রেস্টোর‍্যান্টে রুমালি রুটি আর চিকেন রেশমি কাবাব খেল স্নিগ্ধা, নেহা, অভিষেক। বাবুই খেল মাটন বিরিয়ানি।

নেহা গাড়িতে ও খাওয়ার সময় মোবাইলে মন ছিল। এবার চোখ তুলে বলল,

– দুটো গল্পই পড়ে ফেললাম বাবা।

অভিষেক গাড়ির বাইরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল, গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নেহা।

বাবুইও গেছে আড়াল দেখে সিগারেট ফুঁকতে।

– অভিষেক বলে, ও, নেটে পড়লে, কেমন লাগল? নেহা মোবাইল স্ক্রল করতে করতে বলে,

– বলছি, ফের ফোনটা জিন্সের প্যান্টের পকেটে চালান করে দিয়ে হাতদুটো ঘষে নিয়ে বলে,

– মহেশ বেশ ভালো লাগল পড়ে,।এখনকার ইন্ডিয়াতেও খুবই রেলিভ্যান্ট।গো বস্তা-টস্তা নিয়ে যা চলছে দেশজুড়ে, রুরাল ইন্ডিয়ার রিয়ালিটি খুব বেশি কিছু চেঞ্জ করেনি। পভার্টি, হাঙ্গার, কুসংস্কার-সব মিলিয়ে আজও গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হয় এই সময়ের কোনো লেখাই পড়েছি। একটু থামে নেহা। অভিষেক খুব মন দিয়ে শুনছিল নেহার কথা। তার একমাত্র ছেলের বউ। দিল্লীতেই জন্ম, বেড়ে ওঠা। ফিলোজাফিতে এম এ করে বাবুইদের কোম্পানিতে এইচ আর ডিতে আছে। ওখানেই দুজনের দেখা ও প্রণয়।

– তা ছাড়া গল্পটি খুব লুস্যি স্টাইলে বলা হয়েছে, পড়তে গিয়ে আটকায় না কোথাও।

– হ্যাঁ, শরৎচন্দ্রের লেখায় প্রসাদ গুণ অসামান্য, পড়তে শুরু করলে ছাড়া যায় না, বলতে বলতেই অভিষেক সিগারেট অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে দেয়।

স্নিগ্ধা গাড়ির জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে জোয়ানের শিশি দেখায়,

– তোমরা কেউ খাবে? নেহা জোয়ানের শিশিটা হাতে নিয়ে যোয়ান ঢেলে মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে বলে,

– বাট অভাগীর স্বর্গ, মানে আজও অবশ্যই রেলিভ্যান্ট হলেও মানে অভাগীর ওই ইচ্ছে। ওগুলো একটু মেলোড্রাম লাগল। আমি রিডার হিসেবে ঠিক নিতে পারিনি। অভিষেক আলতো ভাবে মাথা নেড়ে বলে,

– আচ্ছা।

বাবুই এসে ড্রাইভার সিটে বসার জন্য গাড়ির দরজা খুলতেই নেহা বলে,

– এই আমি ড্রাইভ করব। ইচ্ছে করছে।

অভিষেক মাথা ঝুঁকিয়ে কী যেন ভাবছিল। নেহা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হাঁক দেয়, ওঠো বাবা।

স্নিগ্ধা হঠাৎ বলে,

– আমায় গাড়ি চালানো শেখাবে মামনি?

বাবুই হাসে,

– তুমি? গাড়ি চালাবে?

নেহা বলে,

– তুমি চলো দিল্লি, টানা কয়েকমাস থাকো, নিশ্চয় শেখাব তোমায়।

– এই তুমি হাসবে না একদম! কী ভাবো মাকে? অভিষেক বলে ওঠে, যাই বলো,

– অভাগীরা তখনও ছিল, এখনও আছে।অভাগী কোনো অবাস্তব চরিত্র নয়। হয়তো আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে তারা নেই। মানে আমাদের এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শহরে। হয়তো আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে গফুর, আমিনারাও নেই। কিন্তু তাদের সঙ্গে কানেক্ট করতে রিডার হিসাবে আমার কোনো অসুবিধা হয় না।

– কিন্তু বাবা অভাগীর ওই ইচ্ছেটা জাস্ট আমার এত বোকা বোকা লাগে।অভিষেক চুপ। গাড়ি ফের চলেছে দেউলটির দিকে। বাবুই নেটে দেখে নিয়েছে আজ সূর্যাস্ত পাঁচটায়। রূপনারায়ণের বুকে সূর্যাস্ত দেখেই ফিরবে। শরৎচন্দ্রের বাড়ির পাশে পার্কিং প্লেসে গাড়ি থামতেই স্নিগ্ধা বলল,

– এই আমি গাড়িতেই একটু ঝিমিয়ে নি, পাঁচটার আগে বেরুব। বাবুই-নেহা নদীর দিকে হাঁটা লাগায়। হঠাৎ নেহা অভিষেকের দিকে ফিরে এসে বলে,

– বাবা, আই মাস্ট অ্যাডমিট, অভাগীর ছেলে ওই কাঙালি।

– হ্যাঁ, কাঙালির ওই যে মাকে পোড়াবার জন্যে কাঠ জোগাড়ে চেষ্টা আর সবার থেকে নিষ্ঠুর ব্যবহার, রিফিউজাল। ওটা মনে দাগ কেটে যায়। অভিষেক নেহার পিঠে আলতো চাপড় মেরে উপর নীচে মাথা দোলায়।

– তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাবে?

– না। আমি শরৎবাবুর বারান্দায় বসি। এখন বাড়িটা নিরিবিলি, দু-একজনের বেশি টুরিস্ট নেই। আরেকবার ঘুরে দেখি। নেহা, বাবুই হাঁটা লাগায়। অভিষেক প্রতিটা ঘরের সামনে দাঁড়ায়, চুপ করে দেখতে থাকে শরৎ বাবুর ব্যবহৃত খাট, আলমারি, চেয়ার, টেবিল, বালিশ, বিছানা। বাড়ি লাগোয়া বাগানে শরৎচন্দ্রের আবক্ষ মূর্তিটার সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়ায়। ফের বারান্দায় ফিরে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। বেলা পড়ে আসছে। সেলফোনে সময় সোয়া চারটে। একটু পরেই সূর্য ডুববে। জীবনের ষাট বছর কোথা দিয়ে কেটে গেল, চারপাশ কত বদলে গেল। আশির দশক পর্যন্ত শরৎবাবুকে নিয়ে বাঙালি জীবনে যে মাতামাতি, এখন তা আর নেই সে ভাবে! অবশ্য বাঙালির, বিশেষতঃ বাঙালি তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক জীবনটাই বদলে গেছে। অফিস রিক্রিয়েশন ক্লাবের লাইব্রেরিতে এখন কেউ আর বই নেয় না, নতুন বইও কেনা হয় না প্রতি বছর, আমি নিজেও কি বছরে একটাও বই পড়ি? পড়া বলতে তো খবরের কাগজ!

– কী ভাবছ একা একা? স্নিগ্ধা কখন গাড়ি থেকে নেমে এসে পাশে বসেছে, টের পায় নি অভিষেক।

– কী আর! ছাত্রজীবনে শরৎচন্দ্রের ভক্ত পাঠক ছিলাম। শ্রীকান্ত, গৃহদাহ, পথের দাবী, চরিত্রহীন মুগ্ধ হয়ে পড়েছি, সে সব সত্তর-আশি দশকের কথা। তারপর নব্বইয়ের পর থেকে সব কেমন হয়ে গেল, অফিসের ব্যস্ততা, ঘরে এসে টিভি কম্পিউটার!

– কয়েকমাস পর তো হাতে অনেক সময় পাবে, নতুন করে পড়ো আবার।

– কী জানি! সে মুগ্ধতা কি ফিরে পাব? সময় যে বদলে দিয়ে গেছে।

– কেন! নেহার যে মহেশ ভালো লেগেছে বলল‌। অভাগীও তো খারাপ লাগে নি ওর।

– সে ঠিক। তবে সেই সত্তর আশির আমি তো আর নেই, নেহার মতো নতুন প্রজন্ম না হলেও বদলে গেছি অনেক। হয়তো কিছু লেখা ভালো লাগবে, কিছু লেখা হয়তো আর সেভাবে কিন্তু একটা কথা

কী জানো? রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবন জুড়ে অনেকটাই তার গান, কবিতা, নাটক, ছোটগল্প, নৃত্যনাট্য-

তা ঠিক। তবে স্নিগ্ধা যা থাকার থাকবে, যা থাকার নয় তা থাকে না। মহাকালকে কে আর এড়াতে পারে।

– এই এবার চলো নদীর পাড়ে যাই।

উঠে দাঁড়ায় ওরা। শরৎচন্দ্রের বাড়ি দিকে ফিরে কপালে জোর হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে অভিষেক। আকাশে লাল আভা, গোল লাল সূর্য, নারকেল-সুপারি গাছের ফাঁকে ঝুলে আছে। ওরা পিচ রাস্তা ছেড়ে মেঠো পথে, পায়ে পায়ে রূপনারায়ণের পাড়ে। নেহা বাচ্চা মেয়ের মতো আদুরে গলায় চিৎকার করে, বাবা, মা কি সুন্দর দেখো। তাড়াতাড়ি এস।

সূর্য নেমে আসছে রূপনারায়ণের বুকে, একটা দিন ফুরিয়ে আসছে হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্তে।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত