কমরেড জয়ব্রত হাঁটছেন

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

সুধন্য আজকাল আর নেশা করে না। কিন্তু সন্ধে হলেই তার চোখটা যেন কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। পা-টা একটু টলমল করে। লোকে বলে, অভ্যেস। নেশার অভ্যেসে নাকি নেশা না করলেও নেশা-নেশা হয়। সুধন্য ভালো বুঝতে পারে না এসব। ঝাপসা দেখলে সে একবার চোখ কচলে নেয়- এই যা।

তো এই সুধন্যই বেশ ভালো করে চোখ কচলে দেখল, কমরেড জয়ব্রত হাঁটছেন। এই ভরসন্ধেবেলা এমন হনহন করে হাঁটছেন কেন জয়ব্রত?বহুকাল হল তাঁকে তেমন করে হাঁটতে দেখেনি সুধন্য। সে একটা সময় ছিল, যখন জয়ব্রতর সব চুল কালো, ব্যাকব্রাশ করা। তখন তাঁকে রাস্তায় দেখা যেত নিয়মিত। মিটিং করছেন, মিছিল করছেন। রাস্তায় বেরিয়ে এর ওর সঙ্গে কথা বলছেন। জয়ব্রত তো ছিল একরকম রাস্তার লোকই। তারপর সব কেমন বদলে যেতে থাকল। বহুদিন হল তাঁকে আর তেমন রাস্তায় দেখা যায় না। কতদিন দেখেনি, সে হিসেব করতে পারল না সুধন্য। তবে তার এটা মনে পড়ল যে, তখন সে নেশা করত না। আর এখন সময় গড়িয়ে নেশা করা ছেড়েই দিয়েছে। মাঝে কত পরিবর্তন যে হয়ে গেছে তার ঠিক নেই।

জয়ব্রতকে হন-হনিয়ে হাঁটতে দেখে তাই ভীষণ চমকাল সুধন্য। ভাবল, আজ কি সে তাহলে ভুল করে নেশা করে ফেলেছে! মাথা কি হালকা লাগছে? না তো! তার মানে নেশা করেনি। বারকয় চোখ কচলে সে দেখল, না অলৌকিক বা অস্বাভাবিক কিছু নয়, সত্যিই কমরেড জয়ব্রত হাঁটছেন। সুধন্যর মতো পুরনো কেউ কেউ অবশ্য এখনও তাঁকে মাস্টারই বলে। যেমন আগে বলত। যখন জয়ব্রত, তুখোড় পড়াশোনা করা জয়ব্রত, যে কোনও দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দিতেন একেবারে জলের মতো সহজ করে। বিশ্বের নানা ঘটনার নজির টেনে, কত জ্ঞানীমানী মানুষের কথা বলে বুঝিয়ে দিতেন, উদ্ভুত বা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঠিক কী করা উচিত এবং কী নয়। কতটা হলে যুক্তিযুক্ত, আর তার বাইরে গেলে প্রতিক্রিয়াশীল – নিমেষে বুঝিয়ে দিতেন মাস্টার।

সুধন্য আজ দেখল সেই পুরনো মাস্টার যেন ফিরে এসেছে। সেই ঢোলা পাজামা, বুক খোলা পাঞ্জাবি। কাঁধের ব্যাগটাও বোধহয় বহু পুরনোই। বুকপকেটে পেনের সোনালি খাপটা উঁকি দিচ্ছে। আর কমরেড জয়ব্রত হাঁটছেন।

সুধন্য এবার হাঁক পাড়ে, “মাস্টার, ও মাস্টার  সন্ধেবেলা চললে কোথায়?”

জয়ব্রত দাঁড়িয়ে পড়েন। সুধন্যর প্রশ্নের উত্তর দেন না। শুধু হাসেন। হঠাৎ কী মনে হল সুধন্যর, সেও হাসল। তারপর বলল, “ধম্ম-কুকুর হব নাকি?”

জয়ব্রত এবার শব্দ করে জোরে হেসে ফেলেন। বলেন, “আমি কি প্রথম পাণ্ডব নাকি রে?”

“কে জানে! হতেও তো পারো। যদি হও বড়জোর নরক দেখবে, এই তো! আমারও এখানে কাজ নেই। নেশাও করি না আজকাল। চলো, তোমার সঙ্গে ঝুলেই পড়ি।”

জয়ব্রত বাধা দেন না। তিনি আবার হাঁটতে শুরু করেন। আর পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকে সুধন্য। তারা কোথাও একটা যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সুধন্য জানে না। হয়তো জয়ব্রত জানেন। মানে, সুধন্য নিশ্চিত যে, জয়ব্রত জানেনই। সুতরাং সে আর বাড়তি ভাবনার পথ মাড়ায় না। শুধু আর একবার চোখ কচলে বুঝে নেয়, নাহ, সত্যিই সে আজ নেশা করেনি। সুতরাং যা হচ্ছে সব সত্যিই হচ্ছে।

কিন্তু এই বিশ্বাস তার বেশিক্ষণ থাকল না। একটা সময় সে ভারী ধন্দে পড়ে গেল। সত্যিই কি সে নেশা করেনি? যদি না করে তবে এমন অদ্ভুত কাণ্ড সব হচ্ছে কী করে!

সুধন্য দেখল, এমন একখানা চাঁদ উঠেছে আকাশে যেন কাস্তে। এমনধারা চাঁদে তো মৃদু জোছনা হওয়ার কথা। অথচ আলো ফুটেছে যেন ফ্যাটফেটে একখানা দিন। যেন রাত হয়নি। যেন দিন ফুরোয়নি। এরকম আবার হয় নাকি! তার গা-টা ছমছম করে। সে একটু কাঁপা গলায় বলে, “মাস্টার, ও মাস্টার…”

জয়ব্রত অন্যমনস্ক ছিলেন। সুধন্যর কথায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলেন, “উঁ…।”

“বলি, চলেছ কোথায় বলো দিকি?”

“ভিতরের দিকে।”

“ভিতরে! কার ভিতরে?”

“কেন, নিজের?”

সুধন্য এবার ধপ করে বসে পড়ে। জয়ব্রত একটু এগিয়ে গিয়েও ফিরে আসেন। বলেন, “কী হল তোর? আর যাবি না?”

“যেতে পারি। কিন্তু আগে তোমার উদ্দেশ্যখানা খোলসা করো দিকি।”

“উদ্দেশ্য তো একটাই রে। হাঁটতে হবে, এখন অনেক হাঁটতে হবে।”

“সে তো বুঝলাম। কিন্তু ভিতরের দিকে ব্যাপারটা কী?”

“জানিস তো, যে কোনও সত্যিকার হাঁটাই আসলে ভিতরের দিকে।”

“মানে?”

“মানে আমাদের ঝোঁকটা বাইরের দিকে। কিন্তু আমাদের তাকাতে হবে ভিতরের দিকেই।”

“ও মাস্টার, এত হেঁয়ালি আজকাল আর বুঝি না। আর আগে তো তুমি এমন জটিল কথা বলতে না। যা বলতে একেবারে মাথায় ঢুকে যেত, এখন এমন করছ কেন?”

“শোন, এখন বলারও কিছু নেই, বোঝারও কিছু নেই। শুধু হাঁটতে থাক। হাঁটতে হাঁটতেই বুঝবি কার ভিতরে, কত ভিতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছিস। বুঝবি, কেন হাঁটা এত জরুরি হয়ে পড়েছে।”

হাঁটার ভিতর যে এমন গূঢ় কিছু থাকতে পারে, তা জীবনে ভাবেনি সুধন্য। সে জানত হাঁটা দুরকম। এক, নেশায় টলমল করে হাঁটা। আর নয়তো সোজা হাঁটা। কিন্তু ভিতরের দিকে হাঁটার কেরামতি সে ঠিক বুঝতে পারল না। তবে তার মনে পড়ল, একবার এক সন্নিস্যির সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। দুজনে মিলে বেশ খানিকটা গঞ্জিকা সেবন করেছিল তারা। তারপর সেই সাধু বলেছিল, ভিতরের দিকে তাকাও মালিক, ভিতরের দিকে তাকাও। নিজেকে দ্যাখো। কথাটা সুধন্যর মনে থেকে গিয়েছে, কারণ কেউ তাকে কোনোদিন মালিক বলেনি।সন্ন্যিসির আগেও না, পরেও না। সে শুধু জেনেছে, মালিক মানেই শ্রেণিশত্রু, গরিবের রক্তচোষা জাত। কতবার মিটিং-ফিটিংয়ে জয়ব্রত মাস্টার নিজেও তো তাই-ই বুঝিয়েছে। সুধন্য আর সুধন্যর মতো অসংখ্য লোক বুঝেছে, জীবনে যদি একটাই কোনো কাজের কাজ থাকে, তবে তা ওই মালিক শ্রেণিকে উৎখাত করা। কত আন্দোলন হয়েছে এই নিয়ে। শ্রমিকরা একজোট হয়েছে। সেই জোরে জয়ব্রতরা প্রতিবার ভোটে জিতে ফিরে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সুধন্যদের আর বিশেষ কিছু হয়নি। দেখতে দেখতে অনেকগুলো কারখানাই উঠে গেল। বহু মানুষ ক্রমে বেকার, সত্যি সত্যি প্রায় সর্বহারা-ই হল। সুধন্যও সেই দলে ছিল। জয়ব্রতরা চাইলেও সুধন্যদের জন্য আর বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেনি সেদিন। শুধু একদিন সবাই মিলে দেখল, আস্ত মালিক-ই বদলে গেছে।

সে আলাদা কথা। কিন্তু নিজেই যে নিজের মালিক, বা নিজের ভিতরে একজন মালিক আছে, এই কথাটা দারুণ আশ্চর্য করেছিল সুধন্যকে। সন্ন্যাসিকে সে আর জীবনে দেখেনি। কিন্তু কথাখানা মনে গেঁথে আছে।

কতক্ষণ হাঁটছিল মনে নেই। হঠাৎ সুধন্যর খেয়াল হল, সে এক অদ্ভুত নগরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। মাঠ-ঘাট-রাস্তা দেখে এই বাংলা-ই মনে হয়। অথচ সব যেন ম্যাজিক স্লেটের গায়ে আঁকা। সেই যে বাচ্চাদের একরকমের স্লেট আছে। এই ঘর আঁকা হল। এই মুছে দিলেই যে-কে-সেই। অনেকটা সেরকম। এই কিছুক্ষণ আগেও সুধন্যর মনে হচ্ছিল, দূরে একটা ইলেকট্রিক পোস্ট আছে। মাথার উপর তার আছে। হঠাৎ কাছাকাছি এসে মনে হল, কে যেন সেসব মুছে দিয়েছে! একটু আগে সে সম্ভবতকেবিলের লাইনওদেখেছিল কোথাও কোথাও। একটা দুটো বাড়ির মাথায় অ্যান্টেনা, ডিস টিভি-ওদেখেছিল বোধহয়। তারপর কাছাকাছি যেতেই এরকমই সেগুলো-ও উধাও হয়েছিল। তখন অত চমকায়নি সে। ভেবেছিল, তার সেই নেশার অভ্যেসেই ভুল দেখছে। কিন্তু বারংবার একই ভুল দেখে কী করে! সে আবার ডাক দেয়, “মাস্টার, ও মাস্টার।”

উত্তর আসে না। সুধন্য তবু বলে, “ভয় ভয় করছে যে গো!”

“কেন?”

“সব কেমন উধাও হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারখানা কী বলো দিকি!”

“বলেছিলাম না, ভিতরের দিকে হাঁটছি। সময়ের ভিতর ঘরে সবই আছে। কিন্তু আমরা আর দেখতে পাচ্ছি না, এই যা।”

বিস্ময়ে সুধন্য দাঁড়িয়ে পড়ে। এমনটা আবার হয় নাকি!

জয়ব্রত এসে তার হাত ধরেন। বলেন, “দাঁড়াবার সময় নেই সুধন্য। আমাদের আরও ভিতরে ঢুকতে হবে। অনেকটা গোড়ায় পৌঁছতে হবে। পা চালা ভাই।”

মাস্টারের কথা আজ অবধি কোনোদিন অমান্য করেনি সুধন্য। এবারও করল না। খানিক মাথা চুলকে সে ফের হাঁটতে শুরু করল। ভিতরের দিকে, সময়ের ভিতরের দিকে, নিজেরও ভিতর দিকে। যেদিকে হাঁটছেন কমরেড জয়ব্রত।

অনেকটা পথ এসে একটা বিরাট জটলা দেখে দুজনেই দাঁড়াল। জয়ব্রত বললেন, “কিছু বুঝতে পারলি?”

সুধন্য দু-দিকে মাথা নাড়ে। পারেনি।

জয়ব্রত বলেন, “ওটা আন্দোলন চলছে। কৃষি না কারখানা? অধিগ্রহণ না ন্যায্য পাওনা? গুলি-বারুদ, গ্রামবাসীর মৃত্যু, চটি পায়ে পুলিশ, ধরনা, হাইওয়ে অবরোধ! কিচ্ছু মনে পড়ছে না?”

সুধন্য অবাক হয়ে বলে, “সে তো আবার অনেক বছর হয়ে গেল। তারপরই তো পালাবদল।”

জয়ব্রত বলেন, “আমরা এইসব পেরিয়ে যাচ্ছি সুধন্য। মানে, ওই যে রাস্তাটা, ওটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা যেখানে পৌঁছাব, সেখানে এসবের কোনও অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ, সেখানে এসব এখনও হয়নি।”

“মাস্টার, তার মানে ওখানে এখনও সেই পুরনো সরকার?”

“হ্যাঁ, পুরনো দিন। পুরনো স্বপ্ন, পুরনো মূল্যবোধ। দেখলে না, সব কেমন ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে যাচ্ছে। কোথাও ইলেকট্রিক যায়নি এখনও। কোথাও কেবিল পৌঁছায়নি। শপিং মল-টল গুলো এখনও মফস্বল-গঞ্জকে গিলে নেয়নি। আমরা যত ভিতরের দিকে এগোচ্ছি, আমাদের চোখের সামনে থেকে তাই সব উধাও হয়ে যাচ্ছে।”

সুধন্য আর কিছু বুঝুক আর নাই-ই বুঝুক, শুধু এটুকু বুঝল, একটা বিরাট হেঁয়ালির ভিতর ঢুকে পড়েছে সে। ভাগ্যিস, জয়ব্রত মাস্টার সঙ্গে নিল। নইলে এমনটা যে হতে পারে, কেইবা জানত! কিন্তু মাস্টার যাচ্ছেটাই বা কেন? সে প্রশ্ন করে, “ও মাস্টার, তুমি অত ভিতরে ঢুকে কী করবে? লোকে তো সামনে এগোয়।”

জয়ব্রত আনমনে উত্তর দেন, “অনেকগুলো চিঠি দেওয়ার আছে ভাই। আগেই দেওয়া উচিত ছিল। দেওয়া হয়নি। এখন দিতেই হবে। না দিয়ে যে আর উপায় নেই।”

জয়ব্রতর পথ ধরে সুধন্য এগোতে থাকে। এক জায়গায় গিয়ে জয়ব্রত থমকে গেলেন। সুধন্য মুখ তুলে তাকাল, এ জয়ব্রতদেরই দলের অফিস বটে। কিন্তু এখানে কি কেউ তাঁকে চিনবে? চিনবে না!

জয়ব্রত কিছু বললেন না। শুধু দাঁড়িয়ে দেখলেন, তাঁদেরই দলের দুই গোষ্ঠীতে দারুণ বিবাদ হচ্ছে। একটা খুনও বোধহয় হয়ে গেল। কেননা একজন রক্তাক্ত মানুষকে ফেলে অনেকে দৌড়ে পালাল। এক সময় এরকম ঘটনার কথা অনেক শুনেছে সুধন্য। কাগজে বেরোত। লোকে বলতও। আজও কাগজে বেরোয়। লোকেবলেও। সুধন্য আর এসবে গা করে না। কাগজও পড়ে না।

কিন্তু সে যাই হোক, এই খুন-খারাবি জয়ব্রত বা সে কেউ-ই ঠেকাতে পারল না। কারণ এসবই ঘটে গিয়েছে। এর কিছুই রোখার সাধ্য তাদের নেই। তারা শুধু রিপ্লে দেখছে মাত্র। 

আবার হাঁটতে শুরু করে দুজনে। এবং কিছুটা এগিয়ে ফের থমকেও যায়। এবার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন নির্বাচন হচ্ছে। কত সাল? বোঝা যাচ্ছে না। তবে সর্বত্র যে জয়ব্রতদেরই লোক ঘুরছে তা স্পষ্ট। জয়ব্রতর চোখমুখ দেখে সুধন্যর মনে হল, তিনি কিন্তু একদমই খুশি নন। আবার নিরূপায়ও। বোধহয় বুথের ভিতর কারচুপিও কিছু চলছে, যা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু রেকর্ডেড ঘটনা। মুছে দেওয়ার উপায় নেই। ফলত তারা হতাশা সম্বল করেই এগোতে থাকে।

এবার একটা স্পষ্টতই স্বচ্ছ প্রশ্ন মাথায় আসে সুধন্যর। যদি কিছু বদলানো নাই-ই যাবে তাহলে এই বিশ্বরূপ দর্শনের মতো এসব দেখে কী লাভ! সে প্রশ্ন করে, “মাস্টার, ও মাস্টার খামোখা এই সব দেখে কী হবে বলো দিকি? এত কষ্টই বা পাচ্ছ কেন? এবার দেখবে, সাজানো কারখানা সব বন্ধ হচ্ছে। তোমার চেনা কেউ ঘুষ খাচ্ছে। দেখবে, কেউ খেতে পাচ্ছে না, ভুখা মরছে। যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা। যা হয়ে গেছে, তাকে খুঁচিয়ে কী সুখ পাচ্ছ বলো দিকি?”

জয়ব্রত বলেন, “কী জানিস সুধন্য, মানুষ মানুষকে শ্রেষ্ঠ যে উপহার দিতে পারে, তা যন্ত্রণাই। এ আমি বলছি না, জ্ঞানী কেউই বলেছেন। যীশুকে বলো বা গান্ধীকে, মানুষ শেষমেশ যন্ত্রণাই তো উপহার দিয়েছে। যন্ত্রণা তাই পোহাতেই হবে। নরকদর্শনে তো আপত্তি ছিল না ভাই। তাহলে এখন এত পিছিয়ে যাচ্ছিস কেন?”

সুধন্য আর কথা বাড়ায় না। সে হাঁটতে থাকে। আর ভাবতে থাকে, জীবনটায় সত্যি এমন পিছোনো গেলে, নেশার ক-টা বছর সে মুছে ফেলত। কেন যে কিছুই বদলাল না! কেন যে অভিমানে সে অত নেশা করত!

আরও বেশ খানিকটা হাঁটার পর জয়ব্রত নিজেই দাঁড়ালেন। সময়ের কত ভিতর এটা? সুধন্য জানে না। তবে জয়ব্রত থমকেছেন যখন, তিনি নিশ্চিতই জানেন। সুধন্য দেখল, একটা জায়গায় বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য লোক বসে আছেন। সকলেই ভদ্রলোক। উঁচুতলার কোনও মিটিং! হবেও বা! সম্ভ্রান্তদের দেখে সুধন্য একটু তফাৎ হয়ে যায়।

জয়ব্রত সেদিকে এগিয়ে যান। সুধন্য দেখতে পায়। সকলের সঙ্গে কথা বলছেন জয়ব্রত। নমস্কার, প্রতি-নমস্কারের পালা চলছে। তারপরই জয়ব্রত কাঁধের ব্যাগ থেকে বের করে একটা করে চিঠি হাতে দেন সকলের। আরও বেশ কিছু চিঠি সামনে রাখেন। সকলে এক-এক করে চিঠি পড়েন। এ-ওর মুখের দিকে তাকায়। তারপর জয়ব্রতর হাত ধরে যেন কীসব বলে। সামনে রাখা চিঠির বান্ডিল থেকে কিছু কিছু করে কেউ কেউ হাতে তুলে নেন। তারপর জয়ব্রতকে আবার কিছু বলেন। দূর থেকে সুধন্যর দেখে মনে হয়, জয়ব্রতকে সকলেই কোনও একটা ব্যাপারে আশ্বস্ত করছেন।

বাস্তবিকই তাই।জয়ব্রত যখন ফিরলেন তখন তাঁর চোখেমুখে খুশির আলো। সুধন্য জানতে চায়, “মাস্টার চিঠিতে কী লেখা ছিল গো? সকলের চোখমুখ অমন বদলে গেল কেন?”

জয়ব্রত হাসেন। বলেন, “লেখা ছিল, রক্ত থেকে জমিদারি তাড়ানোর কথা।”

“জমিদারি!সে তো অনেক আগেই গিয়েছিল গো!”

“সবটা তো যায়নি রে। মাত্র এক কি দু-পুরুষ আগের স্মৃতি তো। রক্তে কর্তৃত্বের রেশটা ছিলই। তাই নিয়ে যখন মানুষের কাজে নামল, তখন সবাই আসলে কর্তা হতে চায়। সকলেই নিজেকে সবার আগে ভাবে। গোড়ায় গণ্ডগোলটা তো সেখানেই।সামন্ততন্ত্র ঘাপটি গেড়ে বসে আছে, অন্যকিছু সফল হবে কী করে? ঈর্ষা, দ্বেষ, অসহিষ্ণুতা কুরে কুরে খেল গোটা সময়টাকে, গোটা দলের অন্দরকে। এত ঝগড়া, বিভেদ, অহংকার নিয়ে কতদূর এগনো যায় বল দিকি? সামন্ততন্ত্রের কঙ্কাল কি আর মতাদর্শের শাকে ঢাকা পড়ে? না পড়েছে?”

সুধন্য প্রথমে মাথা চুলকায়। তারপর বলে, “মাস্টার এই কথাগুলো তুমি আগেও আমাকে বলেছিলে, না? আমার যেন কেমন মনে হচ্ছে আগে তোমার মুখে শুনেছি এসব।”

জয়ব্রত জবাব দেন, “বলে ছিলামই তো। অশোক মিত্র মশায় তো সেই কবে এসব লিখে রেখে গেছেন। সে কথাই সকলকে পই পই করে বলেছিলাম।”

“কিন্তু কেউ তো শোনেনি, মাস্টার। কিছুই তো শুধরোয়নি।”

“যদি এখন শুধরোয়! সকলেই তো বলল, নিজেদের পালটে ফেলবে! জিন থেকে জমিদারি ছুড়ে ফেলে দেবে। অন্তত অর্ধেক লোকও যদি কথা রাখে, তাহলেই ব্যাপক অংশে ভুলের হাত থেকে নিষ্কৃতী মিলবে কি না বল?”

“বলছ?”

“ভাবছি অন্তত সেরকম…”

“মাস্টার…”

“বল…”

“তোমার মাথাটা একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে।”

“কেন?”

“অতীত বদলে গেলে সামনেটাও তো বদলে যাবে গো। কিন্তু সামনের সমস্ত ঘটনাই তো ঘটে গিয়েছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ভিতরে ঢুকে পড়েছি বলে এসব গাঁজাখুরি জিনিস হচ্ছে। এখন, শিক্ষা নিয়েই বা কী লাভ হবে? কিছু কি বদলাবে নাকি? ফিরে গেলেই দেখবে সেই পরিবর্তন।”

জয়ব্রত চুপ করে গেলেন। বস্তুত, চুপ না করে তাঁর উপায়ও নেই। কারণ, তিনি জানেন, এ হল সেই গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স। অর্থাৎ অতীতে হেঁটে যদি তুমি নিজের পূর্বপুরুষকেই হত্যা করো তাহলে আদতে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছ।

অতীতের ভুল শুধরোতে গিয়েও সেই একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে কমরেড জয়ব্রত। ভুল শুধরোলে ইতিহাস বদলে যায়। ইতিহাস বদলে গেলে তাঁর অস্তিত্বই থাকে না। এই হাঁটার গল্প, এই সমস্ত কিছুই মিথ্যে হয়ে যায়!

তবে কি আসলে এসকেপ করতেই চাইছিলেন জয়ব্রত! নিজেকেই অস্বীকার করতে চাইছেন! নাকি ভুল ধরিয়ে দিয়ে নতুন করে আবার সব শুরু করতে চাইছেন। কিন্তু এত পিছন থেকে তা তো আর সম্ভব নয়। ফলে এর দায়, এই আধা সামন্ততান্ত্রিক-বুর্জোয়া দৃষ্টির দায় নিয়েই ক্রমাগত এগোতে থাকবে সবকিছু। এই নতুন সময়েও কর্তার ভূতের হাত থেকে নিশ্চয়ই পরিত্রাণ মিলবে না। বরং আরও বাড়বে ভার। আরও অস্বচ্ছ হবে কাস্তে-চাঁদের জোছনা। তাহলে কী করবেন জয়ব্রত? কেনই বা এত হাঁটলেন, কোনদিকেই বা হাঁটলেন?

নাহ, এই মুহূর্তে অন্তত কিছুই জানেন না তিনি। জানেন না বলেই ফের হাঁটতে শুরু করেন। এবার এলোমেলো। যেন দিশা হারিয়ে এবার পথ খোঁজার জন্যই পথে নেমেছেন। জয়ব্রত কল্পনা করেন, এবার আরও লম্বা হবে মিছিল। ফোস্কা পড়বে পায়ে। তেষ্টায় আলজিভ শুকিয়ে যাবে কারও। আর কেউ এসে জল-বিস্কুট এগিয়ে দেবে। ওহ, স্বপ্ন! সফল হও। সত্যি হও। বিড়বিড় করে ওঠেন জয়ব্রত।

সুধন্য অতশত বোঝে না। আবার তার চোখটা ঝাপসা হয়ে এসেছিল। কচলে নিতেই দেখল, মাস্টার ফের পথ ধরেছে। এবার ভিতর না বাইরের দিকে? জানে না সুধন্য, প্রশ্নও করে না। শুধু দ্যাখে, নতুন করে হাঁটা শুরু হয়েছে। কমরেড জয়ব্রত হাঁটছেন।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত