সায়ন্তনী বসু চৌধুরীর গল্প আগমনি


আজ ৪ জুন কবি,কথাসাহিত্যিক ও সমাজসেবক সায়ন্তনী বসু চৌধুরীর জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


ব্যালকনির কোণে ইজিচেয়ারটা পেতে আনমনে বসেছিল মহুয়া। ক’দিন ধরেই ওর মনটা ভালো নেই। কেমন একটা অস্বস্তি অস্বস্তি ভাব। থেকে থেকেই মনে হচ্ছে, সামথিং ইজ মিসিং। কী যেন নেই। একটা অভাব, একটা শূন্যতা ওকে গ্রাস করতে আসছে। এই তো সেদিনই ওরা ভাইজ্যাগ থেকে ফিরল। টানা কুড়ি দিনের ট্যুর ছিল নীহারের। অফিসের প্রায় প্রত্যেকটা ট্যুরেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যায় নীহার। মিটিংয়ের ফাঁকে মহুয়াকে নিয়ে এদিক ওদিক বেড়ানো, টুকটাক শপিং করা, দামি হোটেল রেস্তোরাঁয় এক্সপেরিমেন্টাল খাবার খাওয়া কোনও কিছুরই অভাব রাখে না নীহার। এবারেও এসবের ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাও যে মহুয়ার কী হল! বাড়ি ফিরে ইস্তক কোনও কাজেই ওর মন বসছে না।
আসলে বছরের এই সময়টায় মহুয়া বড্ড উদাস হয়ে থাকে। ওর ভাসা ভাসা দু’ চোখে যেন কোন অচিনপুরের স্বপ্ন উঁকি মারে। অবাঙালি পরিবেষ্টিত বিহারের এই শহরে পুজোর আমেজটা আলাদা করে উপভোগ করা যায় না। এখানে নবরাত্রির উৎসব পালিত হয়। গৃহের কল্যাণে যে যার ঘরে ব্রত পালনেই মগ্ন থাকে। আর শরৎ আকাশের আনাচে কানাচে, সোনা রঙের রোদ্দুরে মহুয়া পুজোর গন্ধ খুঁজে বেড়ায়। আজ প্রায় ছ’বছর হল পুজোর সময় মহুয়ারা দেশে যায়নি। নতুন জামাকাপড় পরে লাইনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখা, ভিড়ের মধ্যে তুমুল ঠেলাঠেলি করে ফুচকা খাওয়ার সেই আনন্দ থেকে ওরা দীর্ঘদিন বঞ্চিত।
নীহারের বদলির চাকরি। মাঝে মাঝে বিদেশেও যেতে হয়। আমেদাবাদ, দিল্লি হয়ে এখন ওর বিহারে পোস্টিং। স্টেট হেডের পদ, তাই সারা বছরটাই ব্যস্ততায় কাটে নীহারের। প্রাইভেট কোম্পানিতে যত উঁচু পোস্ট, ততই ঝক্কির কাজ। হাতে গোনা ছুটি। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অজুহাত এসব কোম্পানিতে ধোপে টেকে না। সাধে কি আর থোকা থোকা টাকা মাইনে পায় ইঞ্জিনিয়াররা! মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার। মহুয়া সব বোঝে। সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে মানুষটা যখন বাড়ি ফেরে মহুয়ার তখন ভীষণ মায়া হয়। মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সেই কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে নীহার। কপাল জুড়ে বলিরেখার আনাগোনা। চোখের তলায় গভীর কালি। দামি ব্লেজার, ব্র্যাণ্ডেড অফিস ইউনিফর্মের জৌলুস নীহারের ম্রিয়মাণ চেহারাটা লুকোতে পারে না। একার সংসারে মহুয়াকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু অসুবিধের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় গোটা দিনটাকে একটা যুগের মতো দীর্ঘ মনে হয়। শেষ হয়েও যেন শেষ হতে চায় না। তবু দিনের শেষে মনের মানুষটার সামনে অভিযোগের ঝুলি খুলে বসতে ওর ভালো লাগে না। চাকরির সমস্ত শর্ত জেনেই যখন মহুয়া বিয়েতে মত দিয়েছিল, তখন আজ আর খোঁচ তুলে লাভ কী?
.
অনেকক্ষণ থেকে মোবাইলটা বেজে চলেছে। একটানা ঘ্যানর ঘ্যানর শব্দ। বিরক্ত হয়ে মহুয়া ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এই এক জিনিস হয়েছে। দু’ দণ্ড একলা থাকতে দেয় না কাউকে। যখনই একটু নিভৃতে নিজের সঙ্গে আলাপ চলে ওমনি বেজে উঠে সব তালগোল পাকিয়ে দেয়। সাত ইঞ্চির চওড়া স্ক্রিনে মায়ের নম্বরটা ফুটে উঠছে। মহুয়ার মুখে এক আকাশ কালো মেঘ এসে জমা হল। দু’তিনবার ঢোঁক গিলে গলাটা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক করে ও কলটা রিসিভ করল,
—‘হ্যাঁ মা, বলো বলো।’
—‘কী রে মানা, শরীর খারাপ নাকি তোর? কখন থেকে ফোন করছি। ধরছিস না যে?’
—‘না না, আমি ভালোই আছি। আসলে সারা দুপুর ঘর পরিষ্কার করেছি তো, তাই একটু চোখ লেগে গিয়েছিলো।’
—‘আহা রে, কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দিলুম। না না তুই ঘুমো মা, পরে ফোন করব। আসলে পুজোর সময় সবার বাড়ি মেয়ে জামাই আত্মীয়দের হাসি, কোলাহল! স্বজনবন্ধুহীন বাড়িটায় আমরাই কেবল দুটো বুড়ো বুড়ি একলা পথ চেয়ে বসে থাকি। হ্যাঁ রে মা, বলছিলাম তোরা কি এবারেও….’
মাঝপথেই মা কে থামিয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলে উঠলো মহুয়া,
—‘সবকিছু জেনেও কেন না জানার ভান করো মা? তুমি তো জানোই গোটা স্টেটের দায়িত্ব ওর ওপরে। এসব পুজো, দীপাবলি, জামাইষষ্ঠীর তুচ্ছ ইমোশন দিয়ে তো পেট ভরবে না মা। চাকরিটা গেলে কি তোমরা আর একটা খুঁজে দেবে?’
মা যেন কী সব বলতে যাচ্ছিল। না শুনেই দুম করে ফোনটা কেটে দিল মহুয়া। আহারে না জানি কত কষ্ট হচ্ছে মায়ের। একটানা এতগুলো কড়া কথা শুনিয়ে দিল! কিন্তু মহুয়াই বা কী করবে? ওর হয়েছে শাঁখের করাত। এগলেও বিপদ আবার পিছলেও। ওড়নার কোণটা দিয়ে নীরবে চোখের জল মুছতে লাগল মহুয়া।
গত দু’ বছরই পুজোর সময় নীহার বলেছিল,
—টিকিট কেটে দিই, দিন পনেরো থেকে এসো। আমার সঙ্গে সবসময় নিজেকে বেঁধো না মহুয়া। আমি একটা মেশিন হয়ে গেছি।
কিন্তু মহুয়াই জেদ করে টিকিট কাটতে দেয় নি। বছরে দু’ বার ও একলা একলা বাপের বাড়ী যায়। তা বলে পুজোর সময়েও কি একাই যাবে নাকি? সেটা হয় না। লোকে যখন জিজ্ঞেস করে, কী রে মহুয়া তোর বর এল না? লজ্জায় ওর মাথা কাটা যায়।
.
মায়ের সঙ্গে দিনে প্রায় পাঁচ ছ’বার কথা হয় মহুয়ার। একান্ত অপছন্দের বিষয়গুলো নিয়ে মাঝে মাঝে তুমুল কথা কাটাকাটিও হয়। কখনও আবার হালকা হাসি ঠাট্টা, খুনসুটি। মায়ের হাসিতে আগের সেই সবুজ রংটা মহুয়া আর খুঁজে পায় না। বাবাও যেন কত দূরে সরে গেছে এখন। কথায় কথায় খুকু খুকু বলে আর তো খোঁজে না। বিয়ের আগে পর্যন্ত মহুয়াই মায়ের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল। একসঙ্গে পুজোর কেনাকাটা করা, খুড়তুতো, জেঠতুতো ভাইবোনেদের নাম লিখে লিখে গিফট প্যাক করা, পুজোর আলপনা আঁকা, নাড়ু পাকানো… সেসবই এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। এখন একলা দিন যাপনে মহুয়ার সঙ্গী তার প্রিয় ব্যালকনি। রাস্তার ধারের যুবক ছাতিম গাছটা পেরিয়ে যত দূরে নজর যায়, মহুয়া অপলক তাকিয়ে থাকে। একদম ভোর বেলায় যখন লাল টুকটুকে আলো ফোটে একঝাঁক বন টিয়ার ছানা ছাতিমের ডালে এসে ভিড় করে। ছানাগুলো বোধহয় সবেমাত্র উড়তে শিখেছে। মা পাখিটার পেছন পেছন ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলে ওরা। ছোটোবেলায় মহুয়াও মায়ের আঁচল ধরা ছিলো। মা যেখানে যেতো মহুয়া মায়ের পেছন পেছন ঘুরঘুর করতো। মা বলতো,
—ওরে ছাড় ছাড়, বিয়ে হলে কি তুই মা কে নিয়ে শ্বশুর বাড়ী যাবি?
ঝুঁটি দুলিয়ে মহুয়া বলতো, —হ্যাঁ তো।
হা হা হা করে হেসে উঠতো মা।— মা কে নিয়ে কেউ শ্বশুরবাড়ি যেতে পারে না রে বোকা মেয়ে।
গাল ফুলিয়ে ঝুল বারান্দায় বসে থাকতো অভিমানী মহুয়া। এখন ও স্পষ্ট বুঝতে পারে, মেয়েরা সাবলম্বী হলে, ডানা মেলে উড়তে শিখলে বাবা মা আর তাদের নিজের বাসায় রাখতে পারেন না। মেয়ে যে পরের ঘরের শোভা। তাকে তো অন্যের বাসা সাজিয়ে দিতে হবে। এ অঞ্চলের বিয়েবাড়িগুলোয় মেয়ের বিদাইয়ের সময় করুণ সুরে বাজে…
সোন চিরাইয়া আব তো উড়নেবালী হ্যায়
ইস্ আঙ্গন কো সুনা করনেবালী হ্যায়…… “ গানটা যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।
.
সন্ধে হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলের আলো গাঢ় হতে হতে এখন ধূসর। সামনের বস্তি থেকে সুগন্ধী ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। লাল ছাপা কাপড় পরে, মেটে সিঁদুরে সিঁথি রাঙিয়ে যুবতী বধূ তুলসীতলায় আরতি করছে। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে মহুয়ার ঘোর কেটে গেল। নস্টালজিয়ার ডানায় ভর করে এতক্ষণে না জানি মহুয়া কতবার তাদের ঠাকুর দালান, পুকুরপাড়, চিনে গোলাপের বাগানে ঘুরে এসেছে। হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টানে মহুয়া হুড়মুড় করে বাস্তবের মাটিতে এসে পড়ল।
—চারবার বেল বাজালাম। কোথায় ছিলে?
নীহারের চোখে মুখে অদ্ভুত উদ্বেগের ছাপ। মহুয়া নিপুণ কৌশলে নিজেকে লুকিয়ে নিতেই ব্যস্ত। তার অন্তরের গভীরতম টানাপোড়েনের ঢেউ যেন নীহারের কাছে না পৌঁছোয়।
—আমার বুঝি ক্লান্তি আসে না বলো? দিন রাত্তির কাজ করে করে কোমর খুলে যাওয়ার জোগাড়! সব কি আর তোমার কাজের মেয়ে করতে পারে? যেই একটু ঘুমিয়ে পড়েছি ওমনি বাবুর মুখ গোমড়া?
মুচকি হেসে নীহার বলল, —ভর সন্ধেবেলা ঘুমোলে লক্ষ্মী ছেড়ে যায়, ঠাকুরমা বলতো।
কপট রাগে মুখ বাঁকালো মহুয়া। —ভারী আমার শাস্ত্রজ্ঞ এলেন!
ড্রইংরুমে ঢুকে ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রেখে একটা বাদামী খাম মহুয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল নীহার।
—ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। পরশুই বেরোতে হবে আমাদের। আবার ট্যুর এসেছে।
—আবার!
আপন মনে গজগজ করতে করতে ট্রলি ব্যাগটা নামাল মহুয়া। তারপর মুহূর্তের কৌতূহলে এক ঝটকায় টান মেরে খামটা খুলে ফেলল। কলকাতা যাবার দু’দুটো টিকিট চকচক করছে। উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও মহুয়া থেমে গেল। সামনেই নীহার দাঁড়িয়ে হাসছে। অনাবিল উচ্ছ্বাসে আট দশ বছরের কিশোরীর মতো নীহারকে জড়িয়ে ধরল মহুয়া। নীহারের চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠলো। স্ত্রীকে বুকে চেপে সুখের সাগরে গা ভাসালো নীহার। আর ঠিক সেই সময় সকলের অলক্ষ্যে টুপটাপ ছন্দে রাশি রাশি টাটকা শিউলি ঝরে পড়তে লাগলো অনিন্দ্যসুন্দর যুগল মূর্তির ওপর।

 

 

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত