সমরেশ বসুর মৃত্যুদিনে ‘গোগোলের রায় রাজা উদ্ধার’

 

যাঁদের লেখা বাংলা গদ্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, বলা যেতে পারে পরিপক্ব করেছে সমরেশ বসু সেই শীর্ষ সারির প্রতিভাবান লেখকদের একজন। বিচিত্র স্বাদের বহু উপন্যাসের জনক তিনি। বাংলা কল্পকাহিনীরও প্রথম সারির লেখক তিনি। তার রচনায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং যৌনতাসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুনিপুণ বর্ণনা ফুটে ওঠে। কালকূট ও ভ্রমর তার ছদ্মনাম। কালকূট মানে তীব্র বিষ। ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, সাম্ব, ‘কোথায় পাব তারে’সহ অনেক উপন্যাস তিনি এ নামে লিখেছেন। ‘কালকূট’ ছদ্ম নামে লেখা “সাম্ব” উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮০সলের অকাদেমি পুরুস্কার পেয়েছিলেন | বিশিষ্ট এই ঔপন্যাসিক ১৯৮৮ সালের আজকের দিনে মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ৩১ তম মৃত্যুদিন। কথাসাহিত্যিক সমেরেশ বসুর মৃত্যুদিনে তাকে ইরাবতী স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। তার লেখা ‘গোগোলের রায় রাজা উদ্ধার’ গোয়েন্দা গল্পে।

গোগোলের রায় রাজা উদ্ধার

…………..

গোগোল কখনও গ্রামের পূজা দেখেনি। পূজা বলতে দূর্গাপূজাই বোঝায়। বাবা মায়ের মতো গোগোলেরও আজকাল কলকাতার পূজায় ভারি অরুচি। বাবা বলেন, “কলকাতার পুজোয় কেবল প্রতিমা সাজানোর জাঁকজমক, চোখ ধাঁধানো আলোর রোশনাই আর আজেবাজে গানে মাইকের কান ফাটানো চিৎকার। ভিড়ের চাপে রাস্তা চলাই দায়। পুজোয় কোথায় একটু আনন্দ হবে, তার বদলে দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, কলকাতা থেকে পালাতে পারলে বাঁচি।”

মা বলেন, “আমারও কলকাতা শহরের পুজো আর ভালো লাগে না। বাড়ি থেকে তো এক পা বেরোতেও ইচ্ছে করে না। অথচ পুজোর সময় বাংলাদেশ ছেড়ে পাহাড় সমুদ্রের ধারে বেড়াতে যেতেও ইচ্ছে করে না। শরৎকালের আকাশ দেখলেই আর কোথাও যেতে মন চায় না। শরৎকাল মানেই সোনার মতো রোদ, মাঝে মাঝে মেঘের খেলা। আর ঢাক বেজে উঠলেই মনে হয়, আমিও যেন আমার ছেলেবেলাটা ফিরে পাই। কিন্তু কলকাতা শহরে ঢাকের বাজনা কংক্রিটের দেয়ালে লেগে, যেন কান ঝালাপালা করে দেয়। তার ওপরে তো মাইকের তাণ্ডব আছেই।”

গোগোল বাবা-মায়ের এসব কথা শোনে আর ভাবে, কথাগুলো খুবই সত্যি। অবশ্য পুজো এসে গেলে, তখন এসব বিশেষ মনে থাকে না। মনটা আপনা থেকেই আনন্দে নেচে ওঠে। তবে শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে আর ভালো লাগে না। প্রত্যেক বছর দেখে দেখে এখন কেমন একঘেয়ে লাগে, আর বইয়ে পড়া দুর্গা পূজার বর্ণনা মনে পড়ে যায়। সে সব অবশ্য বাংলাদেশের গ্রামের পূজা। পড়তে পড়তে গোগোল যেন কল্পনায় সেখানে চলে যায়। সেখানে খোলা আকাশের নীচে গাছপালা, নদী। নদীর ধারে কাশবন। গোগোল তো কাশবনই দেখেনি। ছবিতে দেখেছে। গোগোলের তাই মনে মনে খুব ইচ্ছে, একবার গ্রামের পুজো দেখবে। কিন্তু দেখতে চাইলেই দেখা হয় না। গ্রামে আত্মীয়স্বজন আছেন। শীতের সময় দু’ একবার বাবা-মায়ের সঙ্গে গিয়েছে। পুজোর সময় কখনও যাওয়া হয় নি।

সেবারে হঠাৎ গোগোলের মনস্কামনা অদ্ভুতভাবে পূর্ণ হয়ে গেল। বাবার যে কত রকমের বন্ধু আছেন, তা বলে শেষ করা যায় না। মাঝে মাঝে বাবার মুখে তাঁদের গল্প শোনা গেলেও, সকলের সঙ্গে গোগোলের পরিচয় হয়নি। বাবার মুখে তাঁর এক লেখক বন্ধুর কথাও শুনেছে। তাঁর আসল নাম গোপাল ভট্টাচার্য। কিন্তু তিনি হংসকুমার ছদ্মনামে লেখেন। বেশী বই লেখেন নি। পাঁচ-ছ’খানা লিখেছেন। সে সব বই গল্প উপন্যাস নয়। সবই ধর্ম বিষয়ে। উনি নাকি বিয়ে-থা করেন নি। এক রকমের সন্ন্যাসী সাত্ত্বিক মানুষ। নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ান। সন্ন্যাসী বললে যে রকম গেরুয়া এবং জটাজুটধারী বোঝায়, উনি সেরকম নন। সাধারণ মানুষের মতোই ধুতি পাঞ্জাবি পরেন। বাবা বলেন, “গোপাল মনে প্রাণে সন্ন্যাসী মানুষ। অথচ ওদের গ্রামের বাড়ির অবস্থা বেশ ভালো। ওর দাদা ভাইয়েরা সবাই বিয়ে করেছে। গোপালকে বিয়ে করবার জন্য অনেক ধরাধরি করা হয়েছে। কিন্তু ও বিয়ে করে নি।”

বাবার এই বন্ধু গোপালবাবু মাঝে মাঝে কলকাতায় আসেন। বাবার সঙ্গে অফিসে দেখা করেন। বাবার সঙ্গে ওঁর পরিচয়, কলকাতায় কলেজে পড়ার সময় থেকে। সেই থেকে নাকি উনি অনেকবার বাবাকে তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। আজ অবধি বাবার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। পুজোর আগেই উনি কলকাতায় এসে বাবাকে নাকি বলেছেন, “তোমার স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে এবার পুজোয় আমাদের দেশে চলো। এতকাল ধরে বলছি, একবারও গেলে না। তোমরা খালি শহর নিয়েই মেতে আছ। ছেলেকে গ্রাম বাংলা দেখাও। শহর দেখে তো দেশটাকে চেনা যায় না। গ্রামই হচ্ছে আমাদের আসল জায়গা।”

বাবা বাড়ি এসে মাকে বলতেই মা রাজী হয়ে গেলেন। বললেন, “পুজোতে প্রত্যেকবারই কলকাতায় থাকি। এবার গ্রামেই যাব। সেই কোন্ ছেলেবেলায় গ্রামের পুজো দেখেছি। তার চেহারাই আলাদা। গোগোলেরও নতুন অভিজ্ঞতা হবে।”

গোগোল তো শুনেই এক পা তুলে আছে। বাবা বললেন, “আমিও অনেককাল গ্রামের পুজো দেখি নি। বিশেষ করে বাড়ির পুজো। গোপালকে তাহলে আগামীকাল বাড়িতেই নিয়ে আসব। তোমার আর গোগোলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাবে। অবশ্য আগে আমি অনেকবারই গোপালকে আমাদের ফ্ল্যাটে আসবার জন্য বলেছি। আসব আসব করে আসে নি। আমার মুখে যদি শোনে, তোমরা যেতে রাজী হয়েছ, তা হলে খুশি হয়েই চলে আসবে।”

মা বললেন, “তাই আসতে বলল। আমি একটু জেনে নিতে পারব, ওঁদের বাড়ি গেলে থাকবার ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা কেমন আছে না আছে। মুখে বলতে খুবই ভালো লাগে, গাঁয়ে যাব। কিন্তু পাড়াগাঁয়ে গিয়ে থাকবার অনেক অসুবিধেও আছে। শত হলেও, শহরে থেকে থেকে আমাদের অভ্যাস অন্য রকম হয়ে গেছে।”

গোগোল বলল, “কেন মা, এর আগেও তো আমরা কালীনারায়ণপুর গেছি। ইছামতীর ধারে ধলতিত্তা গ্রামে গেছি। আমাদের কোনো অসুবিধে তো হয় নি।”

মা বললেন, “সে সব গ্রাম তো কলকাতা থেকে বেশী দূরে নয়। গ্রাম ঠিকই, তবে শহরের সব রকম ব্যবস্থাই সেখানে আছে। ইলেকট্রিকের আলো, স্যানিটারি পায়খানা, সবই আছে। অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায়, তুই তা কখনো দেখিস নি। গোপালবাবুদের গ্রাম কেমন তা তো আমরা জানি নে। তোর বাবা কোনোদিন যান নি।”

বাবা বললেন, “আমি শুনেছি, গোপালদের দেশ হলো ব্যাণ্ডেল-কাটোয়া লাইনে। গোপাল কাল এলেই সব জানা যাবে।”

পরের দিনই বাবা অফিসের ছুটির পরে তাঁর বন্ধু গোপাল ভট্টাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে এলেন। মোটা ধূতির ওপরে মোটা গেরুয়া রঙের খাদির পাঞ্জাবি। কাঁধে একটা কাপড়ের সাইড ব্যাগ। রোগা আর লম্বা মানুষটির রঙ ফরসা। খাড়া নাক, চোখ বেশ বড়। মাথায় কাঁচাপাকা চুলের মতো তাঁর গোঁফ জোড়াও কাঁচাপাকা। হাসিটি বেশ মিষ্টি। তাঁকে দেখলেই গ্রামের মানুষ বলে মনে হয়। অথচ উনি ভারতবর্ষের অনেক জায়গা ঘুরেছেন। বিশেষ করে তীর্থক্ষেত্রগুলো। তার ওপরেই উনি ধর্মের বই কিছু লিখেছেন ‘হংসকুমার’ ছদ্মনামে।

বাবা মায়ের সঙ্গে আগে গোপালবাবুর পরিচয় করিয়ে দিলেন। তার পরে গোগোলের সঙ্গে। মা আগেই শিখিয়ে রেখেছিলেন। গোগোল গোপালবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। উনি ব্যস্ত হয়ে গোগোলের হাত ধরে, সাদরে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “আজকালকার ছেলেরা আবার প্রণাম করে নাকি? তাও আবার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়া ছেলে তুমি, আর বয়স তো এইটুকু। তোমরা তো ‘হ্যালো আঙ্কেল, হাউ ডু ইউ ডু’ বলবে!”

গোগোলের খুব লজ্জা হলো। বলল, “আমি ও রকম বলি নে। মা আমাকে যে রকম শিখিয়েছেন, আমি সেই রকমই শিখেছি।”

গোপালবাবু বললেন, “বাঃ, এ খুব ভালো কথা। মা তোমাকে ঠিকই শিখিয়েছেন। ইংরেজী পড়ো, তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বাংলাও পড়তে হবে, আর সত্যিকারের বাঙালীয়ানাও শিখতে হবে। তা তুমি আমাদের গ্রামে যাবে তো?”

গোগোল ঘাড় কাত করে বলল, “হ্যাঁ, যাব।”

গোপালবাবু বললেন, “তোমার বিষয়ে অনেক কথা শুনেছি। তুমি তো আবার এক খুদে গোয়েন্দা, খবরের কাগজেও নাম বেরিয়েছে। আমাদের গাঁয়ে সে রকম কিছু কিন্তু পাবে না। নেহাতই এক নিরীহ গ্রাম। তবে হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে ডাকাতি হয়।”

মা বললেন, “কিছু হয়ে আর দরকার নেই। এমনিতেই ওকে নিয়ে কোথাও যেতে আমার আজকাল ভয় হয়, কোথায় আবার কী ঘটিয়ে বসবে।”

গোপালবাবু বললেন, “না, আমাদের গাঁয়ে সে রকম কিছু ঘটবার সম্ভাবনা নেই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আর পাড়াগাঁয়ে ডাকাত পড়লে তার চেহারা অন্য রকম। আজকালকার ডাকাতরা অবশ্য বোমা বন্দুক নিয়ে আসে। আগেকার মতো দা’ সড়কি বর্শা নিয়ে আসে না, আর কুক পেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। অন্ধকার রাত্রে বোমা মেরে দরজা উড়িয়ে দেয়, আর বন্দুক উঁচিয়ে ভেতরে ঢোকে। তবে, বর্ষাকালেই গাঁয়ে ডাকাতি বেশী হয়। পুজো-পার্বণের সময় ওসব বিশেষ হয় না। ডাকাত পড়লে গোগোল ঘর থেকেই বেরোতে পারবে না। আর সে সব ডাকাতরা বড় নিষ্ঠুর, কোনোরকম বেগতিক দেখলেই গুলি চালিয়ে দেয়।”

বাবা বললেন, “গোপাল, তুমি যে আগে থাকতেই আমাদের ভয় দেখিয়ে দিচ্ছ। পুজোয় গিয়ে শেষটায় ডাকাতের হাতে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হবে না তো?”

গোপালবাবু হেসে বললেন, “ভয় দেখাচ্ছি নে। গোগোলকে বলছি। এ সময়ে ডাকাতি হয় না, বর্ষাকালেই হয় বেশী। আর ডাকাতরা তো এমনি আসে না, আগে থেকে খবর নিয়ে আসে, কার বাড়িতে গেলে নগদ টাকাপয়সা গহনা পাবে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের বাড়িতে ডাকাত পড়বে কেন?”

বাবা বললেন, “গরীবের বাড়িতে বুঝি দুর্গাপূজা হয়?”

গোপালবাবু বললেন, “আগের মতো ধূমধাম কি আর হয়? অনেক কালের পুজো, একশো বছর আগে থেকে হয়ে আসছে। তাই গরিবের মতো এখনো পুজোটা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার ভাইপোদের আমলে আর হবে কি না কে জানে? আগে নবমীর রাত্রে শেষ বলি হত। পাঁঠা বলি হত কয়েকশো। এখন কয়েকটি পাঁঠা বলি হয় মাত্র। আমি অবশ্য বলি পছন্দ করি নে। কিন্তু বংশের প্রথা মানতেই হয়।”

তারপর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উনি জানালেন, তাঁদের গ্রাম বর্ধমান জেলার মধ্যে। নবদ্বীপঘাট স্টেশনের আগে, সমুদ্রগড়ে নেমে, তাঁদের গ্রামে যেতে হয়। গ্রামটা জলঙ্গী নদীর ধারে। তাঁদের বাড়িটা বেশ বড় আর পাকা। অনেক ঘর আছে, থাকবার জায়গার কোনো অভাব হবে না। বাড়ির ভিতরে কুয়ো টিউবওয়েল স্যানিটারি প্রিভি সবই আছে। সম্প্রতি ইলেকট্রিক এসেছে। স্টেশন থেকে রিকশায় করে যাওয়া চলবে। তবে গ্রামের ভিতর পাকা রাস্তা একটিই মাত্র আছে। আর সবই কাঁচা রাস্তা।

মায়ের যা জানবার, তা জানা হয়ে গিয়েছিল। বললেন, “আর আমার জানার দরকার নেই। শুনে আমার খুব ভালোই লাগছে। এখন আমরা গেলে আপনাদের বাড়ির লোকদের অসুবিধে না হলেই হলো।”

গোপালবাবু হেসে বললেন, “সেটা গেলেই দেখতে পাবেন, অসুবিধেটা কাদের হবে। আমি তো সমীরেশকে কতদিন ধরে বলে আসছি আমাদের দেশে যাবার জন্য।”

সমীরেশ হলো গোগোলের বাবার নাম। কিন্তু গোগোল তখন একটা ধাঁধায় পড়ে গিয়েছে। ওত চুপ করে থাকতে পারল না। বলল, “গোপাল কাকা, নবদ্বীপ তো নদীয়া জেলার মধ্যে। কিন্তু আপনি বলছেন আপনাদের গ্রাম বর্ধমান জেলার মধ্যে?”

গোপাল কাকা বললেন, “বাঃ, তুমি ঠিক প্রশ্নই করেছ। আমাদের ওদিকে, একমাত্র নবদ্বীপই নদীয়া জেলার মধ্যে পড়েছে। আশেপাশের আর সবই বর্ধমান জেলার মধ্যে। আসলে নবদ্বীপ এক সময়ে গঙ্গার পূর্বপারে ছিল। প্রাকৃতিক কারণে, গঙ্গার ভাঙনে ভূগোলটাই বদলে গেছে। নবদ্বীপ চলে এসেছে গঙ্গার পশ্চিম পারে। কিন্তু নদীয়া জেলার কোনো অংশই গঙ্গার পশ্চিম পারে থাকবার কথা নয়। নবদ্বীপ যেহেতু আগে ছিল নদীয়ার মধ্যে, এখনো তাই শুধু নবদ্বীপ অঞ্চলটা নদীয়া জেলার মধ্যে ধরা হয়। নবদ্বীপকে ঘিরে বাকি সব জায়গায়ই বর্ধমান জেলার অংশ। তুমি যখন আমাদের ওখানে যাবে, তখন আমি তোমাকে সব দেখিয়ে দেব।”

তারপরেই যাবার দিনক্ষণ স্থির হয়ে গেল। গোগোলের পুজোর ছুটি পড়ে গিয়েছিল। বাবা বললেন, “আগামীকাল মহালয়া। আমরা তা হলে সপ্তমীর দিন যাব।”

গোপাল কাকা বললেন, “সপ্তমীর দিন যাবে কেন? যাবেই যখন, কয়েকদিন আগেই চলো। বাড়ির পুজো দেখতে হলে পঞ্চমীর দিন থেকেই থাকা উচিত। সব থেকে ভালো হয়, আগামীকালই যদি যাওয়া হয়।”

বাবা চোখ কপালে তুলে বললেন, “আগামীকাল? আমি তো এখনো অফিস থেকে ছুটিই নিই নি। তাছাড়া, আমাদের অফিসের পুজোর ছুটি মাত্র চার দিন।”

গোপাল কাকা বললেন, “তা বললে তো হবে না ভাই। তোমাকে কয়েক দিন বেশী ছুটি নিতেই হবে। একেবারে অফিসের গোনাগুনতি দিনে গেলে কি চলে? কী বলো তুমি গোগোলবাবু?”

গোগোলের মনের ইচ্ছেটা তাই। কিন্তু বাবার অসুবিধের কথা ভাবতেই হবে। ও হেসে বাবার দিকে তাকাল। মা বাবাকে বললেন, “তুমি ছুটি কয়েকদিন বাড়িয়েই নাও।”

গোপাল কাকা মায়ের কথায় উৎসাহিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ। আর আগামীকাল গেলে আমার সঙ্গেই যাওয়া হত। আমাকে আগামীকাল প্রথম ট্রেন ধরে চলে যেতে হবে। অবশ্য পরের দিনই আমি আবার কলকাতায় আসব। দু’দিন থেকে আবার যাব।”

বাবা বললেন, “আগামীকাল কোনো রকমেই যাওয়া হবে না। যেতে যেতে তুমি ধরে রাখো, চতুর্থী পঞ্চমী হবে।”

গোপাল কাকা দর কষাকষির মতো বললেন, “আর দু’একটা দিন এগিয়ে এসো। আমি তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই। কোনোদিন যাও নি, হঠাৎ গিয়ে অসুবিধেয় পড়তে হতে পারে।”

বাবা বললেন, “আরে এ তো ঘরের কাছে। আমি টাইম-টেবিল দেখে ঠিক গিয়ে হাজির হব।”

গোপাল কাকা মাথা নেড়ে বললেন, “ঘরের কাছে বলেই অসুবিধে, বুঝলে? এ হলো পাড়াগাঁ জায়গা। অবশ্য রিকশায় চেপে আমাদের গাঁয়ের নাম আর আমাদের বাড়ির কথা বললে পৌঁছে যাবে ঠিকই, কিন্তু তার কী দরকার? তুমি তিন দিন বেশি ছুটি নাও, আমার সঙ্গেই চলো। আমাদের লাইনে ট্রেনের গোলমাল বড় বেশী। যে সময়ে গিয়ে পৌঁছবে ভাবলে, তার থেকে হয় তো দু’ঘণ্টা দেরি হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে না গেলে, আমাকে তোমাদের জন্য স্টেশনে লোক রেখে দিতে হবে।”

বাবা কী বলবেন ভেবে না পেয়েই যেন মায়ের দিকে তাকালেন। মা বললেন, “গোপালবাবু যা বলছেন, তাই করো। নতুন জায়গা, ওঁর সঙ্গে যাওয়াই ভালো।”

গোপাল কাকা বললেন, “এই তো ঠিক কথা। বাস্তব দিকটাই সব সময় ভাবতে হবে।”

বাবা হেসে বললেন, “তা হলে তাই হবে। আমরা চতুর্থীর দিনই যাব।”

গোপাল কাকা বললেন, “এই তো সুবোধ বালকের মতো কথা। তা হলে আমরা সকালের গাড়িতেই যাব। আমি হাওড়া স্টেশনে টিকেট কেটে রিসেপশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। তোমরা সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যে পৌঁছে যাবে।”

কথাবার্তা স্থির হয়ে গেল। গোপাল কাকা চা খাওয়া পছন্দ করেন না। মা তাঁকে মিষ্টি আর শরবত খাওয়ালেন।

ট্রেনে বেশ ভিড় থাকলেও গোগোলরা সবাই বসবার জায়গা পেয়েছিল। গোপাল কাকা আগেই বলেছিলেন, তাঁদের কাটোয়া বারহাড়োয়া লুপ লাইনে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা এখনও সেই আদ্যিকালের আমলে পড়ে আছে। সেকেন্ড আর ফার্স্ট ক্লাস কেউ মানতে চায় না। ট্রেনও সময়মতো চলে না। যাত্রীর তুলনায় ট্রেন কম। আর ব্যাণ্ডেলের পর, ট্রেন চলে সিঙ্গল লাইনে। আপ ডাউন ট্রেন একসঙ্গে এসে পড়লে স্টেশনে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। আর সব থেকে আজব নিয়ম হলো, আপ বা ডাউনের যে ট্রেনটি আগে আসবে, তাকে ছাড়া হবে পরে। আর পরে যে আসবে, তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে আগে। ফার্স্ট কাম ফার্স্ট গো নয়, লাস্ট কাম ফার্স্ট গো। গোগোলের বেশ মজাই লাগল।

গোপাল কাকা ব্যাণ্ডেল স্টেশনের পর থেকে, সব স্টেশনের সঙ্গে সে-সব জায়গার অনেক পুরনো ইতিহাস শোনাতে শোনাতে চললেন। ব্যাণ্ডেল ছাড়বার পরেই গোগোলের মনে হলো, শহরের চেহারা আর কোথাও নেই। চারদিকেই গ্রাম।

সমুদ্রগড় স্টেশনে নেমে, আশেপাশে কিছু দোকানপাট ছাড়া, চারদিকেই গ্রামের চেহারা। দেখা গেল, গোপাল কাকার জন্য একজন লোক অপেক্ষা করছিল। সে ছুটে এলো কাছে। গোগোলদের একটাই মাত্র স্যুটকেস আনা হয়েছিল জামাকাপড় ভরে। আর একটা ব্যাগ, যার মধ্যে তোয়ালে সাবান দাঁত মাজার ব্রাস পেস্ট ইত্যাদি, আর বাবার দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম।

গোপাল কাকা লোকটিকে দেখে বললেন, “এই যে হরি ভাই, তুমি এসে গেছ? রিকশা কি পাওয়া গেছে?”

হরি ভাই লোকটির বয়স হবে পঞ্চাশের মতো। হাঁটুর ওপরে ধুতি, আর বুকের বোতাম খোলা সামান্য একটা জামা। গলায় তুলসীর মালা। বেঁটেখাটো শক্ত চেহারা। মাথার চুল কাঁচাপাকা। মুখটি নিরীহ। বলল, “পাওয়া গেছে। তুমি যাদের কথা বলেছিলে, সেই খাঁদু আর পচা রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। তোমরা রিকশায় এসো, আমি স্যুটকেস আর ব্যাগ নিয়ে হাঁটা দিই।”

বাবা ব্যস্ত হয়ে বললেন, “গোপাল, এসব বয়ে নিয়ে যাবার দরকার কী? আমাদের সঙ্গে রিকশাতেই তুলে নেওয়া যাবে।”

হরি ভাই নিজেই বলল, “আপনারা একটু ভালো করে বসে আসুন। এ এমন কিছু বোঝা নয়। আমরা এক কুইন্টাল ধানের বস্তা মাথায় করে মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারি। এ তো কিছুই নয়।”

গোপাল কাকা বাবাকে বললেন, “হরি ভাইকে ওর ইচ্ছে মতো যেতে দাও। আমরা রিকশা করে গেলেও দেখা যাবে, সে হয়তো আমাদের আগেই বাড়ি পৌঁছে গেছে।”

গোপাল কাকার সঙ্গে স্টেশনের পশ্চিম দিকে হেঁটে লাইন পার হতে হলো। চারদিকে গাছপালা বেশ নিবিড়। বুলবুলি আর দুর্গা টুনটুনির ডাক শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দোয়েলের শিস্। বেলা এখন এগারোটা হবে। রোদটা দেখতে সুন্দর। কিন্তু বেশ ঝাঁজ আছে। লেবেল ক্রসিংয়ের গেট পেরিয়ে, সরু একটা পীচের রাস্তা ডান দিকে মোড় নিয়ে চলে গিয়েছে। কাছেই দুটো রিকশা দাঁড়িয়েছিল। দুটোই, তার বেশী নয়। গোপাল কাকার সঙ্গে অনেকেই কথা বলছিল, আর গোগোলদের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। গোপাল কাকা সকলের সঙ্গেই কথা বলছিলেন। গোগোল বুঝতে পারল, গোপাল কাকাকে সবাই বেশ মান্য করে।

গোপাল কাকা মা আর বাবাকে একটা রিকশায় তুলে দিলেন। আর নিজে গোগোলকে নিয়ে একটা রিকশায় বসলেন। খানিকটা যেতেই নদী দেখা গেল। গোপাল কাকা বললেন, “এটা হচ্ছে জলঙ্গী নদী, পুব দিকে গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। এখন দেখছ নদী একটু ছোট। বর্ষাকালে জল যখন বাড়ে, তখন আরো চওড়া দেখায়। সময় পেলে তোমাকে জলঙ্গী আর গঙ্গা যেখানে মিশেছে, সেখানে নিয়ে যাব।”

গোগোল নদীর ধারের দু’পাশে নিবিড় গাছপালা দেখে খুশি হয়ে উঠল। এরকম গ্রামে ও আগে আর কখনও যায় নি। জলঙ্গী নদীতে মাঝিরা নৌকা করে বড় বড় জাল পাতছে। রাস্তাটা পীচের বটে, কিন্তু ভাঙাচোরা এবড়ো-থেবড়ো। এক সময়ে সেই রাস্তা ছেড়ে রিকশা বাঁ দিকে কাঁচা রাস্তায় ঢুকল। শুকনো শক্ত রাস্তায় অনেক ধুলো জমেছে। বৃষ্টি হলে নিশ্চয়ই কাদা হত। রিকশা চালাতে কষ্ট হত। নদী আড়ালে চলে গেল। প্রায় কুড়ি মিনিট চলার পরে, রিকশা রাস্তা থেকে সোজা একটা বিরাট দোতলা বাড়ির সামনে বিশাল চত্বরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সেই চত্বরে বিস্তর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে।

বাড়িটা দক্ষিণ মুখো। আর তার গায়ে লাগানো পশ্চিম দিকে, পুব মুখো বিরাট ঠাকুর-দালান। বেশ কয়েক ধাপ উঁচু সিড়ির ওপরে ঠাকুর-দালানে মোটা মোটা থাম। আজ চতুর্থীর দিনেও দেখা গেল, দালানের ভিতরে দুর্গা প্রতিমার গায়ে প্রতিমা শিল্পীরা রঙ লাগাচ্ছে। সেখানেও কয়েকটি ছেলেমেয়ে ভিড় করে আছে।

গোগোল কখনও প্রতিমা গড়া দেখে নি। কলকাতায় কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়া হয়। দেখতে যাবার ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হয় নি। গোপাল কাকা রিকশা থেকে নেমে গোগোলের হাত ধরে দাঁড়ালেন। বাবা-মাও নামলেন। পরে রিকশা চালকেরা কোনো কথা না বলে বা ভাড়া না নিয়েই চলে গেল।

বাবা বললেন, “রিকশার ভাড়া দেওয়া হলো না যে?”

গোপাল কাকা বললেন, “ভাড়া ওদের আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। চলো, ভেতরে চলো।”

গোগোল প্রতিমার গায়ে রঙ লাগানো দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল। বলল, “আমি একটু ওখানে যাব?”

গোপাল কাকা বললেন, “নিশ্চয়ই যাবে। আগে বাড়ির ভেতরে চলো। সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হোক, একটু কিছু খেয়ে নাও। তারপর যতক্ষণ খুশি প্রতিমা গড়া দেখবে।”

ইতিমধ্যে চত্বরে যে সব ছেলেমেয়েরা বেলছিল, সবাই খেলা থামিয়ে গোগোলদের দেখছিল। ঠাকুর-দালানে যারা ছিল, তারাও সিঁড়িতে নেমে এসে গোগোলদের দেখছিল। গোপাল কাকা গোগোলের হাত ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি নিতান্ত বিনয় করে বলেছিলেন একটা বাড়ির কথা। আসলে বাড়িটি একটি প্রাসাদের মতো। লোহার গজাল পোঁতা বড় দরজা দিয়ে ঢুকলেই ভেতরে দু’দিকে সিমেন্টের তৈরি লম্বা বসার জায়গা। ভিতরে শান বাঁধানো বিরাট উঠোন। আর চারদিকে একতলা দোতলায় থামওয়ালা বারান্দা। বারান্দার ভিতর দিকে সারি সারি ঘর। অনেক মহিলাকেই সে সব ঘরে যাতায়াত করতে দেখা যাচ্ছে।

গোগোলদের দেখেই দু’জন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। গোপাল কাকা বাবা-মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “এই আমার বড়দা আর মেজদা।”

গোগোল দেখল, গোপাল কাকার দুই দাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা, সাদাসিধে লোক। আগেই শুনেছে, এই দুই দাদা কাল্‌না কোর্টে ওকালতি করেন। দু’জনেই হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। বড়দা বললেন, “আসুন আসুন। আমাদের বিশেষ ভাগ্য, আপনারা এসেছেন।”

বাবা নমস্কার করে বললেন, “ছি-ছি, ভাগ্য কী বলছেন! আমরা আসতে পেরে খুশি। অনেক দিন ধরেই আসার ইচ্ছে, হয়ে উঠছিল না।”

মা মাথায় ঘোমটা টেনে গোপাল কাকার দুই দাদাকে প্রণাম করলেন। দু’জনেই ভারি অপ্রস্তুত হয়ে, ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, “আহা, করো কি, করো কি?”

মা বললেন, “ঠিকই করেছি, গুরুজনদের প্রণাম করব না?”

গোগোলও মায়ের দেখাদেখি তাড়াতাড়ি দু’জনকে প্রণাম করল। দু’জনেই গোগোলকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করলেন। তারপরেই এসে গেলেন গোপাল কাকার দুই বউদি। মা তাঁদেরও প্রণাম করলেন। তাঁরা বেশ খুশি হয়ে মাকে টেনে নিলেন। গোগোলকেও কাছে টেনে নিয়ে বাঁ দিকের বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে টেনে নিয়ে চললেন। বড় জ্যাঠাইমা বললেন, “আগে আপনাদের ঘরটা দেখিয়ে দিই, তারপর বসে কথা হবে।”

মা বললেন, “আমাকে আপনি করে বলবেন না। আর বসে কথা হবে কেন? আমিও আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে করতে কথা বলব।”

সবাই খুব খুশি হয়ে হেসে উঠলেন। বিরাট বাড়ির দোতলার কোন দিকে যে নিয়ে চললেন, কিছুই যেন বোঝা গেল না। একটি ঘরে এনে তুললেন সবাইকে। বেশ বড় ঘর, বিরাট মশারি চাঁদা করা খাটের ওপর বিছানা। বড় বড় জানালা দিয়ে আলো বাতাস আসছে। হাত বাড়ালেই একটা ঝাড়ালো লিচু গাছের পাতা ধরা যায়। গোগোল সব থেকে অবাক হলো, এ ঘরে কখন হরি ভাই পৌঁছে, স্যুটকেস আর ব্যাগ রেখে গিয়েছে। ইলেকট্রিকের আলো রয়েছে, পাখা নেই।

ঘরের মধ্যে গোপাল কাকার দুই দাদা, দুই বউদি আর তাঁর ছোট ভাই এবং তাঁর স্ত্রী, সবাই মিলে যেন একটা সভা বসে গেল। ওদিকে দরজার কাছে এসে ভিড় করেছে গোগোলের বয়সী বা দু’এক বছরের ছোট একদল ছেলেমেয়ে। গোপাল কাকা তাদের ডেকে গোগোলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আর ওদের সকলের নাম বলে দিলেন। এরা সকলেই তাঁর ভাইপো ভাইঝি। গোপাল কাকা তাদের বললেন, “গোগোল একটু কিছু খেয়ে নিক, তারপরে তোমাদের সঙ্গে যাবে। গোগোলের বিষয়ে তোমরা কেউ কিছু জানো?”

একসঙ্গে তিন-চার জন বলে উঠলো, “জানি।”

গোগোল একটু লজ্জা পেয়ে গেল। ওর তখনই সকলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো। কিন্তু উপায় ছিল না। গোপাল কাকার ছোট ভাইয়ের বউ অর্থাৎ কাকীমা গোগোলের জন্য খাবার আনতে চলে গেলেন। ওদিকে মা জ্যাঠাইমাদের আর বাবার সঙ্গে জ্যাঠামশাইদের আলাপ জমে উঠেছে। তারা সবাই যে বেশ খুশি হয়েছেন, তা বোঝা গেল। গোপাল লুচি তরকারি আর মিষ্টি খেয়ে পেট ভরিয়ে সকলের সঙ্গে বেরিয়ে গেল। যাবার আগে জুতো মোজা খুলে ফেলল। কাল সে দেখেছিল, সব ছেলেমেয়েরাই খালি পায়ে রয়েছে। দুপুরের স্নান খাওয়ার আগে পর্যন্ত গোগোল ঠাকুর দালানে বসে প্রতিমার রঙ করা দেখল। তিন জন শিল্পী রঙের কাজ করছিলেন। দু’জন দুদিকে লক্ষ্মী আর সরস্বতিকে রঙ করছিলেন। আর একজন দুর্গা প্রতিমাকে। গোগোল অবাক আর মুগ্ধ হয়ে দেখছিল, মাটির প্রতিমার গায়ে রঙ লেগে আস্তে আস্তে কেমন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। রঙ লাগানোর কাজ ওপর থেকে শুরু করে ক্রমে নীচে কার্তিক, গণেশ, অসুর, সিংহের ওপর নেমে আসছিল। পিছনের চালি তখনে খাটানো হয় নি, রঙও লাগানো হয় নি। গোগোল খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। আগামীকাল পঞ্চমী। পরও ষষ্ঠপূজা। এর মধ্যে কি করে সমস্ত ঠাকুর আর চালি রঙ করা হবে?

বড় জ্যাঠামশায়ের ছোট ছেলে রঞ্জিত গোগোলের বয়সী। সবাই ওকে রঞ্জু বলে ডাকে। ও বললো, “দেখবে কাল রাত্রের মধ্যে শুধু রঙের কাজ নয়, ডাকের সাজও হয়ে যাবে।”

গোপোল জানে না, ডাকের সাজ কাকে বলে? রঞ্জু আর অন্যান্যরা অবাক হলো। পরে বুঝিয়ে দিল, শোলার সাজকে ডাকের সাজ বলে। শোলা দিয়ে যেমন বিয়ের মুকুট তৈরি হয়, তেমনি প্রতিমার শাড়ি অলংকার সবই শোলা আর রাংতা দিয়ে হয়। তখন গোগোলের মনে পড়ে গেল, কলকাতায়ও এ রকম ডাকের সাজ কোথাও কোথাও হয়।

এক সময়ে গোপাল কাকা এসে সবাইকে তাড়া দিয়ে নিয়ে গেলেন দুপুরের স্নান খাওয়ার জন্য। রঞ্জুরা পুকুরে স্নান করতে গেল। কিন্তু গোগোলকে পুকুরে যেতে দেওয়া হলো না। অথচ গোগোল তখন এ্যাণ্ডারসন ক্লাবে মোটামুটি সাঁতার শিখেছে। গোপাল কাকা বললেন, “তুমি যেখানে সাঁতার শিখেছ, তার সঙ্গে এখানকার পুকুরের অনেক তফাত। জল গভীর, কোনো বাঁধানো ঘাট নেই। তুমি সেই পুকুরে নামতে পারবে না। আমার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসতে পার। রঞ্জুরা অনেক আগে থেকে এসব পুকুরে স্নান করে সাঁতার কাটা শিখেছে।”

গোগাল বাড়ি থেকে দুমিনিটের পথ হেঁটে পুকুর ধারে গেল। বিরাট পুকুর, জল যেন কালো রঙ। রঞ্জু আর দু’তিন জন ছোট ছাড়া, অধিকাংশই বড়রা স্নান করছিলেন। বাড়ি ফিরে গোগোলকে টিউবওয়েলের জলে স্নান করতে হলো। কিন্তু গোগোল একলা আলাদা খেতে কিছুতেই রাজী হলো না। মাও তাই বললেন,”বাড়ির সব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গোগোল খেতে বসবে।” বিরাট বাড়ি আর তার মধ্যে আবার নীচের একটা অংশকে বলা হয় রান্নাবাড়ি। দুটো ঘরে শুধু রান্না হয়। আর বাকি দুটো বড় ঘরে খাওয়ার ব্যবস্থা। রান্নাবাড়ির পিছনেও একটা পুকুর আছে। খোলা জানালা দিয়ে খেতে বসে সেই পুকুর দেখা যায়। আর খেতে খেতেই পুকুর ধারের বাগান থেকে নানা রকমের পাখির ডাক শোনা যায়। গোগোল কখনো গ্রামের বাড়ির এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে দিন কাটায় নি। সবাইকেই কলাপাতায় করে খেতে দেওয়া হলো। দুই জ্যাঠাইমার সঙ্গে মাও এসে সেখানে দাঁড়ালেন। গোগোলের মনে হলো, যেন নিমন্ত্রণ বাড়িতে খেতে বসেছে।

খাবার পরেই মা বললেন, “গোগোল, অনেক ভোরে উঠেছ, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। বেলা দুটো বাজে। চারটের সময় উঠে আবার সকলের সঙ্গে প্রতিমা দেখতে যাবে।”

গোগোল রঞ্জুদের দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর ওরা? ওরাও কি ঘুমোতে যাবে?”

গোপাল কাকা বললেন, “সবাইকেই এখন ঘুমোতে যেতে হবে। ভয় নেই, তোমাকে একলা ফেলে কেউ কোথাও যাবে না।” গোগোলকে অগত্যা দোতলায় শুতে যেতে হলো। কিন্তু ঘুম কোথায়? চোখে ঘুম নেই। শুয়ে শুয়ে পাখির ডাক শুনতে লাগল আর ভাবতে লাগল কখন চারটে বাজবে? তবে ঘুমটা এমনই জিনিস, গোগোল জানতেই পারল না, পাখির ডাক শুনতে শুনতে কখন ঘুম এসে ওর চোখে চেপে বসেছে। ঘুম যখন ভাঙল, গোগোল খাট থেকে নামল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, তখন বেশ রোদ রয়েছে। ও ঘরের বাইরে গেল। কাকীমা কোথা থেকে এসে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন, “ কোথায় যাচ্ছ গোগোল?”

গোগোল বলল, “রঞ্জুদের কাছে, প্রতিমা দেখতে।” কাকীমা বললেন, “মাকে বলে যাও। এস আমার সঙ্গে।” বলে গোগোলের হাত ধরে দোতলার বারান্দার একদিকে নিয়ে গেলেন। গোগোলের কাছে বিরাট বাড়িটা একটা ধাধার মতো। বড় বারান্দার ধারে ধারে ঘর। আবার এক এক জায়গায়, ভিতরে ফালি বারান্দা ঢুকে গিয়েছে। তার পাশেও ঘর। এত ঘর কেন? কত লোকই বা থাকে? এ যেন দুর্গের মতো মনে হয়। কাকীমা একটা ঘরের সামনে গোগোলকে নিয়ে এলেন। গোগোল দেখল, বড় একটা ঘরে মা , দুই জ্যাঠাইমা ছাড়াও আরও কয়েকজন মহিলার সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলছেন। গোগোলকে দেখে বললেন, “এর মধ্যেই উঠে পড়েছ? চারটেও বোধহয় বাজে নি। যাই হোক, ওই জামাপ্যান্ট বদলে নীচে যাও।”

গোগোল তাই গেল। নীচে নেমে ঠাকুর-দালানে গিয়ে দেখল, রঞ্জু নেই। কিন্তু মেজ জ্যাঠামশাইয়ের ছেলে নন্টু, নন্টুর বোন দীপা বসে আছে। আর গোগোল অবাক হয়ে দেখল, স্নান করতে যাবার আগে প্রতিমার যে রঙ দেখে গিয়েছিল, তার তুলনায় এখন যেন সব ঠাকুরের গায়েই রঙ লাগানো হয়ে গিয়েছে। আর চালচিত্রের গায়ে সাদা রঙ লাগানো শেষ। নন্টু গোগোলকে ডাকল।

গোগোল নন্টুর কাছে গিয়ে বসল। জিজ্ঞেস করল, “রঞ্জু কোথায়?”

নন্টু বলতে পারল না। দীপা বলল, “আমি জানি, রঞ্জুদা সেই পেয়ারা কাঠের গুলতিটা আনতে গেছে হরি ভাই দাদার ছেলের কাছে। হরি ভাই দাদার ছেলে কালনা থেকে গুলতির রবার আর চামড়া নিয়ে এসেছে।”

| গোগোল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ সেটা কী রকম জিনিস?” নন্টু বলল, “তুমি গুলতি দেখ নি কখনো?”

গোগোল বলল, “মনে হচ্ছে, গল্পের বইয়ে পড়েছি। চোখে দেখি নি কখনো।”

নন্টু আর দীপা খুব অবাক হয়ে গেল। এই সময়েই রঞ্জু এসে উপস্থিত। কিন্তু হাতে আর গুলতি নেই। গোগোল জিজ্ঞেস করল, “তুই গুলতি আনতে গেছলে?” রঞ্জু সন্দেহের চোখে নন্টু আর দীপার দিকে দেখল। বলল, “না তো। সেটা এখনো তৈরী হয়। নি।”

গোগোল বলল, “হলে আমাকে দেখিও। আমি কখনো গুলতি দেখি নি।”

গোগোলের কথা শুনে রঞ্জু খুব অবাক হলো। কিন্তু সে বিষয়ে কিছু না বলে জিজ্ঞেস করল,”বারোয়ারি তলার ঠাকুর দেখতে যাবে?”

গোগোল বলল, “যাব।”

“তা হলে চল , ঘুরে আসি।”

গোগোলের সঙ্গে নন্টু আর দীপাও উঠে দাঁড়াল। রঞ্জু বলল, “তোরা যাবি নে। আমি গোগোলকে নিয়ে এখুনি ঘুরে চলে আসব।”

নন্টুর রাগ হয়ে গেল। বলল, “আমি এখুনি গিয়ে ঠাকুর কাকাকে বলে দেব।”

গোগোল জানে, এরা সবাই গোপাল কাকাকে ঠাকুর কাকা বলে। রঞ্জু নন্টুর কথায় কান না দিয়ে গোগোলের হাত ধরে ঠাকুর-দালান থেকে নামতে নামতে বলল, “বলগে যা। আমরা তো কোথাও দুষ্টুমি করতে যাচ্ছি নে।”

বাড়ির চত্বরের বাইরে রাস্তায় এসে গোগোল জিজ্ঞেস করল, “নন্টুকে সঙ্গে নিলে না কেন?”

রঞ্জু বলল, “ও সব কথা বাড়িতে লাগিয়ে দেয়। বাবা কাকারা কেউ গুলতি চালানো পছন্দ করেন না। নন্টু দেখতে পেলে সবাইকে বলে দেবে।” বলে সে জামাটা তুলে কোমরে গোঁজা গুলতিটা বের করে গোগোলের হাতে দিল, “এই হচ্ছে গুলতি। তুমি কখনো দেখ নি?”

গোগোল সত্যি কখনও দেখে নি। ইংরেজী ওয়াই অক্ষরের মতো পেয়ারা কাঠ। ওর সঙ্গে আধ ইঞ্চি চওড়া দুটো লম্বা রবার দুদিকে বাঁধা, আর রবার দুটোর মাঝখানে গোল একটা চামড়া ফুটো করে বাঁধা। রঞ্জু প্যান্টের পকেট থেকে ছোট ইটের টুকরো বের করে গোগোলের হাত থেকে গুলতিটা নিল। চামড়ার মধ্যে টুকরোটা চেপে ধরে, কাঠের গুলতি তুলে, রবারে টান দিল। আর ইটের টুকরোটা গাছের দিকে ছুড়ে দিল। গোগোল এই সামান্য ব্যাপারেই অবাক আর মুগ্ধ হয়ে গেল। বলল, “বাঃ, এ দিয়ে তো পাখিও মারা যায়?”

রঞ্জু বলল, “যায় তো। তবে হাতের টিপ থাকা দরকার। তুমি একটা ছোড়।” বলে পকেট থেকে আর একটা ইটের টুকরো বের করে দিয়ে আবার বলল, “এঁটেল মাটি দিয়ে গুলি তৈরি করে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। সেটা

এখনও করতে পারি নি। পরে করে নেব। এখন এ দিয়েই গুলির কাজ চলবে। তুমি ছোড়।”

গোগোল গুলতিটা বাগিয়ে ধরল। চামড়ার মধ্যে ইটের টুকরো গুঁজে, চারপাশের গাছের দিকে দেখল, কোনো পাখি দেখা যায় কী না। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। রঞ্জু একটা গাছের গায়ে কাঠবেড়ালি দেখিয়ে বলল, “ওটাকে তাগ কর।” গোগোল কাঠবেড়ালিটাকে তাগ করে রবার টেনে ছোড়বার আগেই কাঠবেড়ালি নিমেষে কোথায় হারিয়ে গেল। আর ইটের গুলি মোটেই ছুটে গেল না।

রবারের ঝাপটায় জোর চোট লাগল বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে। ব্যথায় ওর মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। বুড়ো আঙুলটা লাল হয়ে উঠল। রঞ্জু বলল, “প্রথম প্রথম ও রকম হয়। চালাতে শিখে গেলে, আর লাগবে না। কিন্তু তোমার হাতে ঠাণ্ডা জল দিয়ে ডলে দেওয়া দরকার। চল, নদীর ধারেই বারোয়ারি তলা। সেখানে নদীর জল দিয়ে ধুয়ে ডলে দেব।”

দু’জনেই প্রায় ছুটতে ছুটতে, নদীর ধারে বারোয়ারি তলার মাঠে চলে এলো। রঞ্জু গোগোলের হাত ধরে নদীর ধারে জলের কাছে নেমে গেল। জলে বেশ স্রোত। গোগোল জানে, এ রকম চোট লাগলে বরফ লাগাতে পারলেই ভালো হয়। নদীর জলও ঠাণ্ডা। হাত ডুবিয়ে, বুড়ো আঙুলটা খানিকক্ষণ ঘষল। তারপরে দু’জনেই উঠে এলো বারোয়ারি তলার মণ্ডপে। সেখানেও তখন শিল্পীরা প্রতিমার গায়ে রঙ লাগাচ্ছে। বারোয়ারির প্রতিমা বেশ বড়, কিন্তু দেখতে কেমন বেটপ আর ঢ্যাঙা মতো লাগছে। মুখের শ্রীও তেমন সুন্দর নয়।

গোগোল জিজ্ঞেস করল, “কাল পঞ্চমী, এর মধ্যে এরা কাজ শেষ করবে কী করে?”

রঞ্জু বলল, “আজ আর কাল সারা রাত কাজ হবে। ষষ্ঠীর দিন সকালবেলা দেখবে সব কাজ আর রঙ হয়ে গেছে। পঞ্চমীর রাত্রে ঘাম তেল লাগাবে।”

“ঘাম তেল কী?” গোগোল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

রঞ্জু হেসে বলল, “ঘাম তেল হলো এক রকমের আঁঠা, অনেকটা গঁদের মতো, তবে আরো পাতলা। সেটা লাগালে প্রতিমার মুখ, অসুর, সিংহ সব চক্‌চক্‌ করে। সকলের শেষে হয় চক্ষুদান।”

গোগোল যত শোনে, ততই অবাক হয়। জিজ্ঞেস করল, “চক্ষুদানটা কী?”

রঞ্জু বলল, “চক্ষুদান হলো চোখের মণি আঁকা। ওটা খুব কঠিন কাজ। একটু এদিক-ওদিক হয়ে গেলে প্রতিমার গজ চোখ বা ট্যারা হয়ে যেতে পারে। আর চোখের মণি আঁকা হয়ে গেলেই প্রতিমাকে তখন জীবন্ত মনে হয়।”

গোগোল অবাক হয়ে রঞ্জুর কথা শুনল। কত বিষয় ও জানে না। ওর কলকাতার বন্ধুরাও এসব জানে না। ও বলল, “তোমরা কত কিছু জান, আমি এসব কিছুই জানতাম না।” “কিন্তু তুমি তো অনেক বড় বড় ডাকাত ধরেছ শুনেছি।” রঞ্জু বলল, “প্রতিমার বিষয় জানা এমন কিছু কঠিন নয়। তুমি কী করে ডাকাত ধর?”

গোগোল হেসে বলল, “আমি কখনো ডাকাত ধরি নি। আমার চোখের সামনে এমন এক একটা ঘটনা ঘটে, সেগুলো খুব অদ্ভুত। কী ঘটছে, আর কেনই বা ঘটছে, সেটা জানাবার খুব ইচ্ছে হয়। আর তাতেই আমি জড়িয়ে পড়ি। আমি তো আর সত্যি গোয়েন্দা নই যে ডাকাতের পিছু ধাওয়া করব। যেমন ধর, একবার দিল্লী থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে ফেরবার সময়, ফার্স্ট ক্লাসের করিডরে, আমার চোখের সামনেই একজন আর একজনকে পিস্তল দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলল। তারপরে লোকটা ভাবল, আমি যখন দেখে ফেলেছি, তখন আমাকেও মেরে ফেলা দরকার। তা নইলে আমি সবাইকে বলে দেব। তাই তারা আমাকেই চুরি করেছিল। গোয়েন্দা অশোক ঠাকুরের নাম শুনেছ?”

রঞ্জু অবাক হয়ে শুনছিল। বলল, “না তো।”

“সেবার অশোক ঠাকুরই আমাকে বাঁচিয়ে ছিলেন। উনি খুব নামকরা গোয়েন্দা।”

দু’জনে কথা বলতে বলতে, বারোয়ারি তলা ছেড়ে, জলঙ্গীর তীরে দিয়ে চলছিল। খানিকটা যাবার পরেই, বাঁ দিকে মোড় নিয়ে চোখে পড়ল বিরাট এক পুরনো দোতলা বাড়ি। বাড়ির গায়ে অনেকগুলো শিব মন্দির। বাড়িটা রঞ্জুদের বাড়ির থেকেও বড়। চারদিকে ঘিরে পুরনো পাঁচিল। আর বিরাট সিংহ দরজা। সিংহ দরজাটার একটা পাল্লা বন্ধ। আর একটা ভোলা পাল্লা দিয়ে ভিতরে যাবার দরজাটা খোলা, যেন সুড়ঙ্গের মতো দেখাচ্ছে। গোগোল জিজ্ঞেস করল, “এটা কি খালি বাড়ি?”

রঞ্জু বলল, “না। ভেতরে লোক আছে। এটা খুব বড়লোকের বাড়ি। এটাকে রাজবাড়ি বলা হয়। গত বছরও এ বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়েছে। কিন্তু বাড়ির যিনি কর্তা, তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। নাম রামরতন রায়। ওঁকে এখনো সবাই রায় রাজা বলে। উনি খুব ধার্মিক, গরিবদের অনেক দান ধ্যান করতেন। বুড়ো মানুষ, খুব ভালো লোক ছিলেন। আমাদের ডেকে খুব আদর করতেন। কী করে যে পাগল হয়ে গেলেন, কে জানে? ওঁকে এখন ওপরের চিলে কোঠায় আটকে রাখা হয়েছে। আর সেইজন্যই এ বছর থেকে পুজোও বন্ধ হয়ে গেছে।”

গোগোল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পাগল হয়ে যাবার পর ওঁকে দেখনি?”

রঞ্জু বলল, “সামনে থেকে দেখি নি। বাড়ির পেছন দিকে, পুকুর ধারের উঁচু ঢিবিতে দাঁড়িয়ে ওঁকে চিলে কোঠার জানালায় দেখতে পেয়েছি। উনিও আমাদের দেখতে পান, আর হাতছানি দিয়ে ডাকেন। আমরা দেখলেই পালিয়ে যাই।”

গোগোল বলল, “কেন পালিয়ে যাও? উনি হয় তো তোমাদের কিছু বলতে চান।”

রঞ্জু হেসে বলল, “পাগল আবার কী বলবে? দেখলে ভয় হয় না? আর ডাকলেই বা ওঁর কাছে যাব কেমন করে? তা হলে পাঁচিল ডিঙিয়ে চিলে কোঠার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু তা তো হয় না। আর বাড়ির ভেতরে ঢুকেও ওঁর কাছে যাওয়া যায় না। ওঁকে সব সময়েই পাহারা দিয়ে রাখা হয়, যাতে বাড়ি থেকে বেরোতে না পারেন।”

“বেরোলে কী হবে?”

“বাঃ, কোথাও হারিয়ে যেতে পারেন। পাগলকে কিছু বিশ্বাস আছে? হয় তো মারধোর করবেন।”

গোগোল জিজ্ঞেস করল, “ওঁর কে আছে?”

“এক ছেলে আছে, আমাদের ঠাকুর কাকার বয়সী। রামগোপাল রায় তাঁর নাম। তার বউ আর ছেলেমেয়ে আছে। এক ছেলে আমাদের সঙ্গে স্কুলে পড়ে, তার নাম রামকুমার। আমরা কুমার বলে ডাকি।”

“কুমারও কি বলে, ঠাকুর্দা পাগল?”

“হ্যাঁ, বলে ঠাকুর্দা এক এক সময় নাকি খুব চিৎকার করেন, দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা মারেন। কুমারদের কাছে যেতে দেওয়া হয় না।”

গোগোলের খুব কৌতূহল হলো। বলল, “চল তো পেছনের পুকুরের সেই টিবির ওপরে যাই। দেখি, ওঁকে দেখা যায় কি না?”

রঞ্জু রায়বাড়ির বিরাট চৌহদ্দি পাঁচিলের ধার দিয়ে ঘুরে পিছনের পুকুর ধারের ঢিবির ওপরে উঠল। গোগোলকে আঙুল দিয়ে চিলেকোঠার খোলা জানালাটা দেখাল। গোগোল দেখল, জানালায় কেউ দাড়িয়ে নেই। জানালাটার দু’পাশেই গাছ। ফাঁক দিয়ে পুরো জানালা দেখা যায়। গোগোল বলল,”ওঁকে তো দেখা যাচ্ছে না?”

“সব সময় দেখা যায় না। এক এক সময় দেখা যায়।” রঞ্জু বলল। তারপর কী ভেবে আবার বলল, “আচ্ছা দাঁড়াও, একটা কাজ করি। তা হলে উনি হয় তো জানালায় আসতে পারেন।” বলেই, খুব জোরে চিৎকার করে নন্টুর নাম ধরে ডাকতে লাগল।

এরকম কয়েকবার ডাকার পরেই দেখা গেল, জানালায় একটা মৃর্তি ভেসে উঠল। দূর থেকেও বাঝা গেল, তাঁর মুখে সাদা গোঁফ আর দাড়ি। মাথার সাদা চুলগুলোও বড় বড়। মুখ চোখ পরিষ্কার দেখা যায় না। উনি রঞ্জু আর গোগোলকে দেখে জানালার বাইরে হাত বের করে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। আর ঘাড়টাও ঝাঁকালেন। রঞ্জু বলল, “দেখেছ?”

গোগোল এত অবাক হয়ে গেল, যেন ওর গলায় কথা ফুটতে চায় না। কোনোরকমে বলল, “দেখেছি।”

“এবার চল, পালিয়ে যাই।”

“পালাব কেন?”

“তোমার ভয় করছে না?”

“ভয় করবে কেন? উনি তো কত দূরে, ওপরের চিলেকোঠায়। ওখান থেকে তো আর আমাদের ধরতে আসতে পারবেন না।”

“তবু আমার কেমন ভয় করে।”

“আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, উনি কিছু বলতে চান। ওখানে চিলে কোঠার নীচে যাওয়া যায় না?”

রঞ্জু খপ করে গোগোলের হাত চেপে ধরে বলল, “তোমার মাথা খারাপ হয়েছে! কুমারের বাবা ভীষণ রাগী লোক। টের পেলে আর আস্ত রাখবেন না। চল, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই।” বলে এক রকম জোর করেই গোগোলকে টেনে নিয়ে চলল।

গোগোল ঢিবি থেকে নামবার আগে আর একবার চিলেকোঠার জানালার দিকে দেখল, রায় রাজা তখনও জানালায় দাঁড়িয়ে হাতছানি দিচ্ছিলেন।

ইতিমধ্যে দু’দিন কেটে গেল। পূজা আর ঢাকের বাজনায় গোপাল কাকাদের বাড়ি জমজমাট। ওঁদের আরও আত্মীয়স্বজন এসেছেন। বাড়ি ভরতি লোক।

গোগোল সকলের সঙ্গে মিলে মিশে আনন্দ করে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে দল বেঁধে গ্রাম ঘুরতেও যায়। কখনও রঙুর সঙ্গে দু’জনে দুটো সাইকেল চেপে বেড়ায়। কিন্তু গোগোলের চোখের সামনে সেই চিলেকোঠার জানালা, আর সেই সাদা গোঁফদাড়িওয়ালা মুখটি থেকে থেকেই ভেসে ওঠে। হাতছানি দেখতে পায় আর ভাবে, পাগলে কি ও রকম হাতছানি দিতে পারে? ওর মনে সেই সন্দেহটাই থেকে গিয়েছে, উনি বোধহয় পাগল নন। কিছু বলতে চান। অথচ এসব কথা রঞ্জু বা কারোকে বলে কোনো লাভ নেই। নবমী পুজোর দিন পর্যন্ত গোগোল পুজো নিয়ে মেতে রইল। দশমীর দিন সকালবেলাও সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে, রঞ্জুর গুলতিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রঞ্জু কিছু মাটির গুলি তৈরি করেছিল। সেগুলো শুকিয়ে বেশ শক্ত হয়েছে। সেই গুলিও কিছু পকেটে পুরে নিল। তারপর পথ চিনে ঠিক সেই রায়বাড়ির পিছনে, পুকুর ধারের ঢিবির ওপরে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, জানালায় কেউ নেই। গোগোল ইতিমধ্যে গুলতি চালাতে শিখে গিয়েছিল। ও জানালা লক্ষ্য করে গুলতি দিয়ে একটা গুলি ছুঁড়ল। কিন্তু গুলিটা জানালা পর্যন্ত পৌঁছল না। ও আর একবার যতটা সম্ভব এবার জোরে টেনে, আর একটা গুলি ছুঁড়ল। সেটা জানালার কাছে, গাছে গিয়ে লাগল। কোনো কাজই হলো না। মনটা দমে গেল। বুঝতে পারল, গুলতির গুলি ছুঁড়ে ও জানালায় মারতে পারবে না। রঞ্জুর চিৎকারের কথা মনে পড়ল। কিন্তু চিৎকার করতে ওর ভয় হলো, পাছে কেউ শুনে এদিকে এসে পড়ে।

গোগোল কী করবে, সাত পাঁচ ভাবছে। এই সময়ে হঠাৎ দেখা গেল, জানালায় সেই সাদা গোঁফ-দাড়ি ভরতি মুখ। মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপরে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। গোগোল ঢিবির সামনের দিকে এগিয়ে এলো। রামরতন রায়, যাঁকে রায় রাজা বলা হয়, তিনি জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আঙুলের ইশারায় পাচিলের একদিকে বারে বারে দেখাতে লাগলেন।

গোগোল সেদিকে তাকিয়ে দেখল, উনি একটা গাছের দিকে দেখাচ্ছেন। গাছটা পাঁচিলের গায়ে। তার একটা মোটা ডাল পাচিলের ওপারে বাড়ির মধ্যে গিয়ে পড়েছে। গোগোল রায় রাজার ইশারাটা বুঝল। তিনি ওকে সেই গাছ বেয়ে পাঁচিল ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকতে বলছেন।

গোগোল হাত তুলে ইশারা করল, ও যাচ্ছে। তারপরে গুলতিটা প্যান্টের কোমরে গুজে ঢিবি থেকে নেমে এলো। তখন আর জানালাটা দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু গাছটা ঠিক চিনতে পারল। ওর পায়ে ছিল স্যাণ্ডেল। স্যাণ্ডেল জোড়া খুলে গাছের ওপর উঠল। পাঁচিলটা খুব উঁচু নয়। পাঁচিলের ওপর উঠতেই চিলেকোঠার জানালাটা আবার চোখে পড়ল। রায় রাজা সেখানে দাড়িয়ে। হাতের ইশারায় গাছের ডাল বেয়ে নেমে আসতে বললেন।

গোগোল এখন রায় রাজার মুখটা অনেক পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। ওঁকে মোটেই পাগল বলে মনে হচ্ছে না। বরং বেশ স্বাভাবিক, আর খুব সাবধানী। গোগোল বাড়িটার দিকে দেখল। পিছন দিকে দরজা-জানালা অধিকাংশই বন্ধ। গোটা দুয়েক জানালা খোলা রয়েছে। লোকজন কারোকে দেখা যাচ্ছে না।

গোগোল ভিতরে, নীচের দিকে হেলে পড়া ডাল ধরে ধরে নেমে এলো। মুখ তুলে রায় রাজার দিকে দেখল। তিনি ইশারায় জানালার নীচে আসতে বললেন। গোগোল ঘাসের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে জানালার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক সেকেণ্ড পরেই একটা মুখ বন্ধ খাম ওর পায়ের কাছে পড়ল। ও খামটা তুলে নিয়ে অবাক হয়ে দেখল, গোপাল কাকার বড়দা, শ্রীদুলাল ভট্টাচার্য নাম লেখা রয়েছে। ও ওপর দিকে তাকাল। দেখল, রায় রাজা ওকে তাড়াতাড়ি চিঠিটা পকেটে রাখতে ইশারা করছেন আর তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলছেন।

গোগোলের বুক পকেটে খামটা ধরল না। প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল পাচিলের সেই হেলে পড়া গাছের ডালের দিকে। সেটা ধরে উঠতে না উঠতেই পিছনে পুরুষের গলা শোনা গেল, “কেরে তুই? কে?”

গোগোলের বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। ও পিছন দিকে না তাকিয়ে কোনো রকমে পাঁচিলের ওপর উঠল। তখন বাড়ির ভিতর চেঁচামেচি শুরু হয়ে গিয়েছে, “কে একটা ছেলে বাড়ির পেছন দিকে ঢুকেছিল। শীগগির ওকে পাকড়াও কর। যেমন করে হোক, ধরা চাই।”

গোগোল পিছন ফিরে দেখল। একজন লাঠিধারী ওর দিকে ছুটে আসছে। ও বাইরের ডাল ধরে ঝুলে পড়ল। কিন্তু বেয়ে নামবার সময় পেল না। প্রায় সাত ফুট ওপর থেকে লাফ দিয়ে নেমে, দৌড় দিল। কোন্ দিকে দৌড়চ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কিছুই জানে না। কেবল প্রাণপণে ছুটছে। পায়ের স্যাণ্ডল জোড়া পড়েই রইল। কেবল শুনতে পেল, “ কোথায় গেল? কোন্ দিকে? তোরা সব বসে বসে গিলিস আর ঘুমোস। এদিকে আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।”

গোগোল হঠাৎ দেখল, ও নদীর ধারে এসে পড়েছে। কিন্তু দাঁড়াবার উপায় নেই। সামনে যে রাস্তা পেল, সেই রাস্তা ধরেই ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে এক সময়ে রেল লাইনের ধারে, লেবেল ক্রসিংয়ের সামনে এসে পড়ল। দেখল, ও স্টেশনের কাছে এসে পড়েছে। তার মানে, একেবারে উল্টো দিকে এসে পড়েছে। দরদর করে ঘামছে, আর বুকের মধ্যে ধধ করছে। কেবল একটাই সান্তুনা, এদিকে ওকে কেউ তাড়া করে আসে নি। তবু ও লেবেল ক্রসিং পেরিয়ে, স্টেশনের প্ল্যাটফরমে গিয়ে দাঁড়াল। পকেটে হাত দিয়ে দেখল, খামটা ঠিকই আছে।

গোগোলের আশেপাশে দু’চারজন লোক। কেউ ওকে তেমন লক্ষ্য করে দেখল না। আর ও তখন অবাক হয়ে ভাবছে, রায় রাজা খামটার ওপরে দুলাল ভট্টাচার্য নাম লিখেছেন। সেইজন্যই কি উনি রঞ্জুকে দেখলেই ডাকতেন? গোগোল খামটা বের করল। আবার দেখল, শুধু শ্রীদুলাল ভট্টাচার্য লেখা নেই, আরও লেখা আছে, “বি. এ. বি, এলো, কাল্‌না কোর্টের উকীল। তার মানে, রঞ্জুর বাবাকেই খামটা পাঠানো হয়েছে।

| গোগোল সামনেই পায়ের শব্দে চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি খামটা প্যান্টের পকেটে পুরে ফেলল। দেখল, একটি সাধারণ চাষী মানুষ মাথায় বোঝা নিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল। কিন্তু গোগোল এখন ফিরবে কেমন করে? এতক্ষণে গোপাল কাকার বাড়িতেও নিশ্চয় ওকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গিয়েছে। ও প্ল্যাটফরম থেকে রাস্তার দিকে দেখল। দু’চারজন লোক যাতায়াত করছে। লাঠি হাতে কারোকেই ছুটে আসতে দেখা যাচ্ছে না। তবু গোগোল আধ ঘন্টার মতো স্টেশনে কাটিয়ে দিল।

এক সময়ে রেলের ঘণ্টা বেজে উঠতেই ও আস্তে আস্তে প্ল্যাটফরম থেকে নেমে এলো। লেবেল ক্রসিংয়ের কাছে আসতেই দেখল, একটা রিকশা দাঁড়িয়ে

আছে। চালকটির মুখ চেনা। প্রথম দিন এর রিকশাতে চেপেই গোগোল গোপাল কাকাদের বাড়ি গিয়েছিল। রিকশাচালকও গোগোলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি সেদিন গোপালবাবুর সঙ্গে কলকাতা থেকে এসেছিলে না?”

গোগোল বলল, “হ্যা। আমি ভুল করে স্টেশনে এসে পড়েছি। আমাকে একটু বাড়ি পৌঁছে দেবেন?”

রিকশাচালক চিন্তিত হয়ে বলল, “কিন্তু এই ট্রেনে যে আমার প্যাসেঞ্জার আসছে। আগে থেকে কথা হয়ে রয়েছে।”

| গোগোল করুণ মুখ করে বলল, “বাড়িতে সবাই ভাবছে। আমি তো চিনে যেতে পারব না।”

রিকশাচালক একটু ভেবে নিয়ে বলল, “আচ্ছা চল। ট্রেনটা আসবার আগে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারি কী না দেখি।”

গোগোল লাফিয়ে রিকশায় উঠে বসল। রিকশাচালক জোর কদমে রিকশা চালাল। গোগোল কেবল সামনের দিকে দেখছে। রায় রাজার বাড়ির লোকেরা কেউ রাস্তা আগলে আছে কী না, কে জানে? বিশেষ করে একজন ওকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। সে নিশ্চয়ই ওকে চিনতে পারবে।

রিকশা এত জোরে ছুটছিল, গোগোলকে দুদিকে শক্ত করে ধরতে হলো। খারাপ রাস্তার ঝাঁকুনিতে পড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। রিকশা যখন বাঁ দিকে ছুটল, তখন দেখল দু’জন লাঠি হাতে লোক সোজা রাস্তা থেকে এদিকে ছুটে আসছে। গোগোলের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। শুনতে পেল, একজন বলছে, “এ ছেলেটা নাকি?”

আর একজন জবাব দিল, “তাই যেন মনে হচ্ছে।”

গোগোলের বুকের মধ্যে ধড়াস্ করে উঠল। শুনতে পেল, “এই রিকশা, দাঁড়া তো।”

গোগোল বলল, “একদম দাঁড়াবেন না, জোরে ছুটুন।”

রিকশাচালক ওর কথাই রাখল। লোক দুটো তখন পিছনে পিছনে ছুটে আসছে, আর চিৎকার করছে, “এই রিকশা, দাঁড়া বলছি-”

রিকশা যখন গোপাল কাকাদের বাড়ির চত্বরের সামনে, লোক দুটো তখন রিকশার পিছনটা টেনে ধরল। গোগোল এক লাফ দিয়ে নেমে একেবারে বাড়ির মধ্যে ছুটে গেল। আর অনেকে হই হই করে উঠল, “এই যে গোগোল এসেছে! গোগোল এসেছে!”

গোপোল ছুটতে ছুটতে একেবারে দোতলায়। গোপাল কাকা বাবা আরও কয়েকজন ছুটে ওপরে গেলেন। গোগোল ঘরের মধ্যে ঢুকে দেওয়ালে ঠেস্ দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। গোপাল কাকা জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে গোগোলে? তুমি কোথায় গেছলে? তোমার মুখ এত লাল কেন? ঘেমে জল হয়ে গেছ যে!”

রঞ্জু বলে উঠল, “গোগোল নিশ্চয়ই পাগল রায় রাজার কাছে গেছল।”

গোগোল তখনও হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতেই বলল, “হ্যাঁ। উনি চিলেকোঠার জানালা দিয়ে বড় জ্যাঠামশাইকে একটা চিঠি দিয়েছেন। আমি সেটা নিয়ে এসেছি।”

গোপাল কাকা বললেন, “আশ্চর্য, যেখানে তুমি, সেখানেই একটা ঘটনা?”

মা বললেন, “এটাই তো আমার অশান্তি।”

এই সময়ে বড় জ্যাঠামশাই এলেন। গোগোল প্যান্টের পকেট থেকে খামটা বের করে তাঁর হাতে দিল। তিনি অবাক হয়ে খামটা নিলেন। ঘরের মধ্যে তখন মা বাবা গোপাল কাকা দুই জ্যাঠাইমা কাকীমা, অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন। বড় জ্যাঠামশাই খামের ওপর চোখ বুলিয়ে বন্ধ মুখ ছিড়লেন। একটি কাগজ বের করে ভাঁজ খুলে সবাইকে শুনিয়ে পড়লেন, “শ্রীমান দুলাল ভট্রাচার্য, স্নেহভাজনেষু, বাবা দুলাল, আমি বিশেষ সুযোগের সন্ধানে আছি, কি প্রকারে এই চিঠিটি তোমাকে পাঠাইব? ঈশ্বর সুযোগ দিলে তবেই পাঠাইতে পারিব। তবু লিখিয়া রাখিলাম। আমি পাগল, এই রকম প্রচার করা হইয়াছে। ইহা আমার পুত্র রামগোপালের একটি ষড়যন্ত্র মাত্র। তাহার অতি হীন ও দুষ্ট প্রকৃতির কথা তোমরা গ্রামবাসিগণ কিঞ্চিৎ অবগত আছ। সম্পত্তির বিষয় লইয়া তাহার সঙ্গে আমার ঘোরতর মতভেদের কারণেই সে আমাকে পাগল বলিয়া সকলের নিকট প্রচার করিয়া এক রকম কারাবাসে বন্দী করিয়াছে। সব সময়েই আমাকে দিয়া যাবতীয় সম্পত্তি তাহার নামে লিখাইয়া লইবার জন্য নানাপ্রকার পীড়ন করিতেছে ও ভয় দেখাইতেছে। এমতাবস্থায় আমি তোমার মারফত কালনার মহকুমা শাসকের নিকট একটি আবেদনপত্র পাঠাইতেছি। তুমি পত্র পাইবা মাত্র মহকুমা শাসকের হাতে আমার আবেদনপত্রটি পৌছাইবার ব্যবস্থা করিবে। নচেৎ আমার সমূহ বিপদ। আশা করি, আমার কথা রাখিবে।-ইতি, আশীর্বাদান্তে, রামরতনকাকা।”

সকলের মুখ দিয়ে বিস্ময়সূচক শব্দ বেরোল। বড় জ্যাঠামশাই আর একটি কাগজ বের করলেন। সেটির ভাঁজ খুলেও পড়লেন, “মাননীয় মহকুমা শাসক মহাশয় সমীপেষু, কাল্‌না,বর্ধমান; মহাশয়, আমি গ্রামনিবাসী শ্রীরামরতন রায় আপনার শরণাপন্ন হইয়া জানাইতেছি, আমার একমাত্র পুত্র সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার দাবী করিয়া, আমার দ্বারা উইল লেখাইয়া লইতে চেষ্টা করিতেছে। সে আমাকে পাগল প্রচার করিয়া গৃহে বন্দী করিয়া রাখিয়াছে। সে অত্যন্ত হীনচেতা ও দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ। নিজের সন্তান সম্পর্কে বাধ্য হইয়া এইসব সত্য কথা আমাকে লিখিতে হইতেছে। সে আমাকে নানারকম পীড়ন করিতেছে এই জগৎ হইতে বিদায় লইতে হইবে। অতএব আমার বিশেষ আবেদন, আমাকে রক্ষার ব্যবস্থা করুন এবং আমার সম্পত্তি বিষয়ে আপনার সমক্ষেই আমি আমার দানপত্র লিখিতে ইচ্ছা করি। জানিবেন, আমি অতি বিপদগ্রস্থ, বিলম্ব করিবেন না।-ইতি নমষ্কারান্তে ভবদীয়, শ্রীরামরতন রায়।”

বড় জ্যাঠামশাইয়ের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি গোগোলকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “তুমি সাহসের সঙ্গে একটা বড় কাজ করেছ। আমাকে এখনই কালনায় যেতে হবে। যদিও আজ ছুটির দিন, তবু আমাকে যেতে হবে। হয় তো এস. ডি. ও. কাল্‌নাতেই আছেন। ব্যাপার অত্যন্ত গুরুতর।”

গোপাল কাকা বললেন, “আজ কেন যাবেন? আজ বিজয়া দশমী, বাড়িতে আজ বিসর্জন, আপনি গেলে কি চলে?” বড় জ্যাঠামশাই বললেন, “আমি না গেলে রামরতন কাকার হয় তো জীবন বিসর্জন হয়ে যাবে, এটা মনে রেখো। এখনই ট্রেন আছে, আমি চলি।”

বড় জ্যাঠাইমা বললেন, “কিছু খেয়ে যাও, আর সঙ্গে কারোকে নিয়ে যাও।”

বড় জ্যাঠামশাই বললেন, “তা যাব। তোমরা বাড়িতে বিজয়া দশমীর যা কিছু অনুষ্ঠান সবই করো। আমি কোথায় গেছি, এসব কথা যেন প্রচার না হয়, খুব সাবধান। আর গোগোলকে একেবারে ঘরের বাইরে যেতে দেবে না। কোথা থেকে কী বিপদ ঘটবে, কিছুই বলা যায় না।”

সকলেই গোগোলের দিকে তাকালেন। মেজ জ্যাঠাইমা গোগোলকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “আমাদের প্রাণ থাকতে গোগোলকে কেউ কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না।”

বিজয়া দশমীর দিন বাড়িতে কেমন একটা বিপদের ছায়া ও বিষণ্ণতা নেমে এলো। বড় জ্যাঠামশাই হরি ভাই এবং আরও দুইজন লোকসহ চলে গিয়েছেন। এদিকে বিকালেই বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠল। গোগোলকে নীচে নামতে দেওয়া হয় নি। ও দোতলার জানালা থেকেই সব দেখছে। বাড়ির এবং পাড়ার মহিলারা সবাই দুর্গাকে বরণ করলেন। তাতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। তারপরে প্রতিমাকে ঠাকুর-দালানের বাইরে নিয়ে আসা হলো। অন্ধকারে আলো জ্বলে উঠল। গোপাল কাকা আর তার দাদা, ছোট ভাই, আরও অনেকে প্রতিমাকে বিরাট বাঁশের চালিতে করে কাঁধে তুলল। এক সঙ্গে তখন অনেক ঢাক বাজছে। রঞ্জুরা সবাই বিসর্জনে গেল। গোগোলের মন খারাপ হয়ে গেল। শুনল, প্রতিমা নিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হবে। ও কখনও বিসর্জন দেখে নি। কিন্তু ওর যাবার কোনো উপায় নেই।

প্রতিমা নিয়ে চলে যাবার পরে, বাড়িটা যেন শূন্য হয়ে গেল। ঠাকুর-দালানে একটি প্রদীপ জ্বলছে। চারদিকে যেন একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এই সময়ে তিনটি গুণ্ডামতো লোক মুখে কালো কাপড় বেঁধে, লাঠি হাতে বাড়ির দরজায় এলো। তারা বাড়ির ভিতরে ঢুকে চিৎকার করে বলল, “কলকাতা থেকে কে একটা ছেলে এসেছে, তাকে আমরা চাই।”

বাড়িতে তখন একজন পুরুষও নেই। বড় জ্যাঠাইমা দোতলার সিঁড়ির দরজা বন্ধ করে দিলেন। ঝিয়েরা কান্না জুড়ে দিল। মেজ জ্যাঠাইমা ওপর থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কে?”

তিন জনের একজন বলল, “আমরা যেই হই, কলকাতা থেকে আপনাদের বাড়িতে যে ছেলেটি এসেছে, তার নাম গোগোল। তাকে আমরা চাই।”

মেজ জ্যাঠাইমা বললেন, “কেন চাও?” লোকটা কর্কশ স্বরে বলল, “সে কথা পরে হবে। আগে তাকে বের করে দিন।”

মেজ জ্যাঠাইমা বললেন, “দিচ্ছি, তোমরা ওপরে উঠ না, নীচেই অপেক্ষা কর।”

বলে তিনি ছুটে একটা ঘরের মধ্যে গেলেন। সেখান থেকে বন্দুক বের করে তার মধ্যে গুলি ভরে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। রাশভারী গলায় বললেন, “তোমরা যদি এখুনি না চলে যাও, তা হলে আমি গুলি চালাব, তোমাদের মাথা উড়িয়ে দেব।”

লোক তিনটি নীচের উঠোনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গোগোলকে তখন একা ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে রেখে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ও সবই শুনতে পাচ্ছে।

| একটি লোক বলল, “আপনার বন্দুকে ক”টা গুলি আছে? আপনি কি বন্দুক চালাতে পারবেন? আমরা জানি, আমাদের মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছেন। আমরা দোতলায় উঠছি।”

| লোকটার কথা শেষ না হতেই মেজ জ্যাঠাইমা উঠোনের এক পাশে গুলি ছুঁড়লেন। লোক তিনটে লাফিয়ে দরজার কাছে সরে গেল। মেজ জ্যাঠাইমা বললেন,”এখনো ভালো চাও তো সরে পড়, নইলে এবার তোমাদের মাথা তাগ করে গুলি করব।” বলেই আবার দরজার চৌকাঠে একটা গুলি করলেন।

“ওরে বাবা, এ যে রায়বাঘিনী।” একটা লোক বলে উঠল। আর তিন জনেই ছুট দিল।

এদিকে বন্দুকের শব্দ শুনে কিছু লোক বাড়ির দিকে ছুটে এলো। লোক তিনটে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে পালাল। মেজ জ্যাঠাইমা উপর থেকে চিৎকার

করে ঘটনা সব বললেন। অমনি সবাই হইহই রইরই করে ছুটল। গোপাল কাকাও বিসর্জন শেষ করে বাড়ি ফিরলেন। একটু পরেই হরি ভাই এসে খবর দিল, এস. ডি. ও. পুলিশ বাহিনী নিয়ে রায়বাড়ি ঘিরে ফেলেছেন।

তখন গোগোলকে ঘরের থেকে বের করা হলো। আর বাড়িতে বিজয়া দশমীর আনন্দ শুরু হলো।

ঘণ্টাখানেক পরে এস. ডি. ও. বড় জ্যাঠামশাই এবং স্বয়ং রায় রাজা এলেন। তিনি গোগোলকে দেখতে চাইলেন। গোগোল কাছে আসা মাত্র তিনি তাঁকে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে তার জল। ধরা গলায় বললেন, “দাদু, তুমি আমাকে মুক্ত করেছ, প্রাণে বাঁচিয়েছ। মা দুর্গা তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তোমার মতো সাহসী ছেলে না হলে আমি আর বাইরের জগতে আসতে পারতাম না।”

সে দৃশ্য দেখে সকলের মুখেই হাসি ফুটল। অথচ চোখে সকলের জল।

এস. ডি. ও. কাছে এসে গোগোলের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “তোমার মতো সাহসী ছেলে আজ দেশে দরকার। তুমি একটি অমূল্য প্রাণ বাঁচিয়েছ।”

গোপাল কাকা বললেন, “আজ আমরা দুর্গামায়ী কি জয় বলব, তার সঙ্গে গোগোলর জয় বলব। বল বল, গোগোলের জয়।”

সব ছেলেমেয়ে একসঙ্গে ধ্বনি দিল, “জয় গোগোলের জয়।” বলেই সবাই গোগোলের সঙ্গে কোলাকুলি করার জন্য নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি আরম্ভ করে দিল। গোগোল তখন গুরুজনদের প্রণাম করতে ব্যস্ত। যদিও সবাই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই চাইছেন।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত