“সূর্য দীঘল বাড়ি” : সমাজবাস্তবতার নিরীখে (পর্ব-২)

গতপর্বের পরে…

 

করিম বক্সকে হত্যার পরও গদু প্রধান সালাম পায়। শেষের দিককার ঐ টপশটে দেখি ব্যস্ত হাটের মধ্যে দিযে হেঁটে চলেছে গদু। গ্রামের লোক, মায় বয়োবৃদ্ধরাও, সালাম জানাছে তাকে। সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা ও দাপট নিয়ে গদু, থেকে যায় অক্ষত, নিরাপদ।

আর ভাবজগতের এই সামন্ততন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে ধর্ম, যে ধর্ম মানুষকে পোষ মানিয়ে রাখে, বশ করে রাখে, বিরত রাখে, ভুলিয়ে রাখে, প্রতিবাদে বিস্ফোরিত হতে দেয় না। মেয়ের বিয়ে হবে এই শর্তে যে ধর্ম ব্লাকমেইল করে মায়ের উপর চাপিয়ে দেয় শরীয়তী শাসন, রুদ্ধ করে তার উপার্জনের পথ।

আর ভাবজগতের এই শরীয়তী শাসন-বাঁধনকে টিঁকিয়ে রাখার জন্য মূল কাঠামোতে নোংরামির কতই না লীলাখেলা। কিছুটা বিবেকবান ইমাম সাহেব গ্রামীণ মজলিশে জোতদার গদু প্রধানের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে সাহস পান না, কারন গদুর অর্থের সূতোয় তিনি বাঁধা। মুসলমান সমাজের ভিতরে শরীয়ত-হাদিসের নামে প্রতি মুহূর্তে যে কত পাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে কবীরা ও সগীরা গোনাহর ভেল্কিবাজিতে প্রতি মুহূর্তে কী ভাবে কলুষিত হচ্ছে মানবতা, এসব তথ্য ও তত্ত্ব খুব বেশী আসেনি এ অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্যে, অন্তত চলচ্চিত্রে তো নয়ই। তবে “সুর্য দীঘল বাড়ি” -র চরিত্রদের যে ধর্ম তা সম্পুর্ণ অর্থে হয়তো ইসলাম নয়, বরং পূর্ব-বাংলার জলকাদায় সম্পৃক্ত কৃষিভিত্তিক এক জনগোষ্টির এ এমন এক লোকজ ধর্ম যেখানে ইসলাম ও প্রকৃতি ধর্ম  মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কলেমা-শরীয়ত-হাদীসের সাথে একই গুরুত্ব নিয়ে মন্ত্রপড়া, বানমারা, বশীকরণ, ঝাড়ফুঁকের এ এক জগাখিচুুড়ি। আর ভাবজগতের এই জগাখিচুড়িতে সেই কৌম যুগের ‘ম্যাজিকম্যান’-য়ের প্রভাবই রয়ে যায় নিয়ামক, কাসুর অসুখ হলে তাই ডাক্তারের আগে ডাক পড়ে ফকিরের। ইমাম সাহেবেকে ডাকা হয় না কখনো।

এক ধরণের প্রগতিশীল সমালোচনায় ধর্ম সম্পর্কে কোানোরকম ইতিবাচক মন্তব্য, মায় ধর্মকে উপস্থাপন করাটাকেই, প্রতিক্রিশীল মনে করা হয়ে থাকে। সৌভাগ্যবশত বর্তমান যুগের সমাজসচেতন সমালোচকেরা ধর্ম সম্পর্কে এই তিরিশ দশকীয় সরলীকরণ কাটিয়ে উঠেছেন। তবুও এখনও মাওবাদী, ট্রটস্কীপন্থী, ব্লাঙ্কুইপন্থী, ড্যুরিংপন্থী ও বিভিন্ন রূপ ও রঙের পাতিবুর্জোয়া বামপন্থীরা, পৌনঃপুনিক ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া ‘ধর্ম আফিম’ এই দু’টি কথার উপর অত্যাধিক জোর দিয়ে “অ্যান্টি-ড্যুরিং” ,“ব্রুনো বাউয়ের এবং গোড়ার খ্রীষ্টধর্ম, “ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ এবং চিরায়ত জার্মান দর্শনের অবসান”, “খ্রীষ্টধর্মের গোড়ার ইতিহাস প্রসঙ্গে”, “চার্চ-বিরোধী আন্দোলন—হাইড পার্কে বিক্ষোভ প্রদর্শন”, “জার্মানীতে কৃষকযুদ্ধ” অথবা মার্কসের ডষ্টরেটের থীসিস “প্রকৃতি সম্বন্ধে ডিমক্রিটাসীয় এবং এপিকিউরানীয় দর্শনের মধ্যে পার্থক্য” -মার্কস-এঙ্গেলসের এসব রচনাগুলিতে ধর্ম সম্পর্কে এঁদের বৈচিত্র্যময় ও গভীর মননশীল বিভিন্ন মন্তব্য বেমালুম চেপে যান, অথবা গোটা ব্যাপারটার অতি সরলীকরণ করে নিজেদের অজ্ঞতাই প্রমাণ করেন। “ধর্ম হচ্ছে জনগনের জন্য আফিম” মার্কস এ-কথা যেমন বলেছেন, সেই একই লেখায় তিনি বলেছেন যে; “ধর্মীয় ক্লেশ হল একই বাস্তব ক্লেশের অভিব্যক্তি এবং বাস্তব ক্লেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও। ধর্ম হল নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, ঠিক যেমন সেটা হোল আত্মাবিহীন পরিবেশের আত্মা।  ……………….. তাই ধর্মের সমালোচনা হোল ধর্ম যার জ্যোতির্মন্ডল সেই অশ্রু উপত্যকার সমালোচনার সূত্রপাত। বলেছেন, “এইভাবে স্বর্গের সমালোচনা পরিণত হয় মর্ত্যরে সমালোচনায়, ধর্মের সমালোচনা পরিণত হয় আইনের সমালোচনায় আর ব্র‏হ্মবিদ্যার সমালোচনা পরিণত হয় রাজনীতির সমালোচনায়।”

জীবনের “অশ্রু উপত্যাকায়” ধর্ম হচ্ছে “শোষিতের দীর্ঘনিঃশ্বস।” কত ব্যঞ্জনাময় ও কাব্যিক সৌন্দর্যেই না কথাগুলি বলেছেন মার্কস ! তাই “ধর্ম-আফিম-অতএব-বাতিল” এই অতি সরলীকরণীয়ভাবে নয়, ভাবজগতের এই বহু-পল্লবিত, জনগণের চেতনায় গভীর প্রভাবশীল বিষয়টিকে মার্কস-এঙ্গেলস যে বিশ্ববীক্ষায় জীবনকে দেখতে চেয়েছেন, সমাজসচেতন সমালোচকদের সেভাবেই দেখা কাম্য, আর তা হচ্ছে— দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিতে।

আর আনন্দের কথা যে “সুর্য দীঘল বাড়ি”- র পরিচালকদ্বয়ও ধর্মকে সেই দৃষ্টি দিয়েই দেখেছেন। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই তারা ধর্মকে উপস্থিত করতে পেরেছেন, দেখাতে পেরেছেন জনগণর ভাবজগতে ধর্মের গভীর ও বহু-পল্লবিত প্রভাবকে।

সেকারণেই কাসুর আরোগ্য কামনায় জয়গুন যে খোদার কাছে প্রার্থনা করে, তার সাথে বস্তুবাদের কোনো বিরোধ নেই, কারণ সে খোদা তো সাত আসমানের উপর অধিষ্ঠিত এক বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর প্রধান নয়, ববং সে যে নিপীড়িত, বিপন্ন, দুঃখ জাগানিয়া রাতের “দীর্ঘনিঃশ্বাস”। তাই জয়গুনের খোদা-প্রীতিতে কোনো ‘মার্কসবাদী’ যদি মনক্ষুণœ হন, তবে সান্তনা পাওয়ার মত যথেষ্ট যুক্তি তারা মার্কেসের রচনাতেই পাবেন।

অবশ্য এ থেকে কেউ যেন মনে না করে যে, জনগণের জীবনে ধর্মের অশুভ প্রভাবকে আমরা খাটো করে দেখছি। তা মোটেও নয় এবং ব্যাপারটি শুধুমাত্র ওটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শাকের-নিয়ামত সাধুবাদ নাও পেতে পারেতেন। তাদের কৃতিত্ব এখানেই যে তারা ধর্মকে দ্বান্দ্বিকভাবে উপস্থিত করেছেন। দেখিয়েছেন যে, উপরিকাঠামোয় ধর্মের এই প্রভাবের বিরুদ্ধে শূন্যে তলোয়ার ঘুরিয়ে লাভ নেই। এর পরিবর্তন আসতে পারে শুধুমাত্র সমাজের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ফলেই। ছবিটিতে সে পরিবর্তনের একাধিক ইঙ্গিতও রয়েছে। ভাউজ রওশন জামিলকে বলতে শুনি; “আকালের দিন আবার কিসের রোজা ?” পঞ্চাশ সনের আকালের সময় রোজা রাখার কথা মনেই হয়নি তার। আর যাদের ‘গোটা জীবনটাই রোজা’, তাদের কাছে পৃথক ‘একটা মাস রোজা রাখার ’ তাৎপর্যই বা কী ? হাসু, যে বরাবরই একটু প্রতিবাদী, তার মনেও দেখি ঈদের চাঁদ তেমন কোনো অভিঘাত সৃষ্টি করে না। ভ্রাতৃস্নেহে উদ্বুদ্ধ হয়ে যদিও সে কাসুর জন্য টুপি কেনে, তবুও রেলওয়ে ব্রীজের উপর দাঁড়ানো তার ওই মনোলগটি স্মর্তব্য; “ কালকে ঈদ অইব। ঈদের দিন বলে খুশির দিন। কিন্তু আমি ওসব খুশি-টুশী বুঝি না।….. একদিন ফুর্তি কইর‌্যা কি লাভ! আর কাজ-কাম থাকলে তো বেবাক দিনই খুশির দিন।”

আর জয়গুন, প্রতিবাদের ক্ষেত্রে যে বরাবরই অনুচ্চ, জুম্মাঘরের হুজুরের শরীয়তী রায়ের বিরুদ্ধে তাকেও হতে শুনি উচ্চকিত; “….কইতে তো বেবাকই পারে। কিন্তু এতগুলো মাইন্ষের পেট চলবে ক্যামনে? কাম করে খাই, কারোটা চুরিডাকাতি করি না, খয়রাতিও করি না।” মৌলিককাঠামো ও উপরিকাঠামোর সেই সনাতনী বিরোধ। আর দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে জয়গুনের ক্ষেত্রে গুমরে মরা ক্ষোভ কখনও কখনও নির্মমও হয়ে উঠে। ঈদের চাঁদের দিন বিকেলে বালিকা কন্যার নূতন একটা কাপড় চাওয়ার আবদারের বিপরীতে অনেক কষ্টেই, অনেক যন্ত্রণাতেই কোনো অক্ষম মাকে বলতে হয়; “কাপড় দিয়ে তোর কাফন দিমু।”

অথচ ধর্ম, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানাদির প্রতি জয়গুনের ভক্তির তো কোনো কমতি ছিল না। মায়মুনের হাঁস ডিম পাড়লে পুত্র-কন্যাদের বঞ্চিত করে প্রথম চারটে ডিমই জয়গুন জুম্মাঘরে পাঠিয়েছিল। তার সে শ্রদ্ধার অর্ঘ্য গৃহীত হয়নি বটে, কিন্তু তার ক্ষোভ সেজন্য নয়, জীবনের নির্মম কষাঘাতই তাকে শিখিয়েছে সত্য কোথায়।

আসলেই শাকের-নিয়ামত অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্তভাবেই ধর্মের ব্যাপারগুলো এনেছেন। সমস্যাটা দেখিয়েছেন, সমাধানের পথও ইঙ্গিত করেছেন, যদিও শিল্পী হিসাবে সেটা তাঁদের জন্যে বাধ্যতামূলক কিছু ছিল না। নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন আনছে, আনবে, ভাঙ্গছে পুরনো সমাজ-সম্পর্ক ও মূল্যবোধ। ইতিহাসের এ এক অনিবার্য ধারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাংলার নিভৃত পল্লীতেও এনে ফেলেছে ধনতন্ত্রের ছোঁয়া, এনেছে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সামন্ততন্ত্রের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। পরিবর্তনের হাওয়া তাই গাঁয়ে এসেও লাগছে। ইমাম সাহেবকে তাই গাঁয়ের নব্য তরুণের মুখে দাড়ি না দেখে বিচলিত হতে দেখি; “তোমার মুখে রসূলের সুন্নত কই…. কত পরহেজগার ছিলেন তোমার আব্বাজান।” যুগের হাওয়া পাল্টাচ্ছে। ‘রসূলের সুন্নত’ মুখে রাখতে তরুণরা আর তাদের পিতাদের মত তত উৎসাহী নয়।

“সূর্য দীঘল বাড়ি”-র যুগের প্রেক্ষিতটা আমাদের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ শুধুমাত্র এসব তাৎপর্য্যপূর্ণ কারণগুলির জন্যেই নয় যে তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, বা তখন দেশভাগ হয়েছিল, সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান কিম্বা তখন দেখা দিয়েছিল পঞ্চাশের নারকীয় মন্বন্তর। এসব দৃষ্টিগ্রাহ্য বড় বড় ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়েও আর একটি বড় ঘটনা ঘটে চলেছিল জনান্তিকে। আর তা হচ্ছে আমাদের অর্থনীতিতে সামন্তবাদের জায়গায় উৎপাদন-সম্পর্কে আসতে শুরু করল ধনতান্ত্রিক সম্পর্কের ধারণাগুলি। সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ— এ এক দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া এবং তা শুরু হয়েছিল বৃটিশ বণিকদের এদেশের মাটিতে পা রাখার পর থেকে এবং সে প্রক্রিয়া চলছে এখনও, তবে চল্লিশ দশকের মত ইতিহাসের আর কোনো দশকেই এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ছিল না এত দ্রুত ক্রিয়াশীল ও দৃষ্টিগ্রাহ্য। আর সামন্তবাদের জঠর থেকে পুঁজিবাদী শিশুর এই জন্মে এদেশে অজ্ঞাতেই ইতিহাসের ধাত্রীর কাজ করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

বাকী অংশ আগামী কাল…

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত