সেই সব মানুষ (পর্ব-২)

   কংগ্রেসের দলাদলি মেটালেন এক কবি 

১৮৮৬ সালের শেষ দিক। বেশ শীত পড়েছে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবীনচন্দ্র সেন এসেছেন কলকাতায়। চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার নবীন কলকাতায় তখন নামকরা লোক। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ এ ও জেনারেল আ্যসেম্ব্লিজ ইন্সটিটুশন থেকে বি এ পাশ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে নবীন লাভ করেছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ। কিন্তু নবীনচন্দ্রের খ্যাতি অন্য কারণে। তিনি কবি। এর মধ্যেই বেরিয়ে গেছে তাঁর কয়েকটা বই – ‘অবকাশরঞ্জিনী’, ‘ক্লিওপেট্রা’, ‘পলাশীর যুদ্ধ’- এসব বই। ‘পলাশীর যুদ্ধে’র পঙক্তি তো লোকের মুখে মুখে ফেরে । দেশপ্রেমের বীজ আছে এই কাব্যে ।

কলকাতায় এসে নবীন দেখলেন কংগ্রেসের নেতারা প্রবল আত্মাভিমানে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। অথচ ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন হবার কথা। কিন্তু নেতারা যদি খেয়োখেয়ি করতে থাকেন, তাহলে কি করে সফল হবে সম্মেলন? যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, শিশিরকুমার ঘোষ, মতিলাল ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী- তখনকার কংগ্রেসের নেতা। এাঁদের সকলের সঙ্গে ভালোই আলাপ-পরিচয় আছে নবীনের। এঁদের প্রবল আত্মাভিমানের সঙ্গেও নবীন পরিচিত।

যে চারজন নেতার কথা বলা হল তাঁরা ক্ষমতাবান। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত জমিদার বংশের সন্তান। পিতৃব্য প্রসন্নকুমার ঠাকুরের বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তিনি। সাহিত্য ও সংগীতের অনুরাগী ছিলেন তিনি। পাথুরিয়াঘাটায় ‘বঙ্গনাট্যালয়’ স্থাপন করেন তিনি। মধুসূদনের ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ তিনি মুদ্রিত করেছিলেন নিজ ব্যয়ে । শিশিরকুমার ঘোষ বিখ্যাত সাংবাদিক। নীলকরদের শোষণ ও অত্যাচারের সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তিনিই ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকার জনক। প্রথমে এটি সাপ্তাহিক ছিল, এক বছর পরে এটি ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষিক হয়। ভার্নাকুলার প্রেস আ্যাক্ট চালু হলে এই  পত্রিকা ইংরেজি সাপ্তাহিকে পরিণত হয়। মতিলাল ঘোষ শিশিরকুমারের ভাই । তিনিও ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিক। ‘বেঙ্গলি’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় প্রথমে অধ্যাপনা করেছিলেন, পরে যুক্ত হন সাংবাদিকতার সঙ্গে। বাংলার নিয়মতান্ত্রিক ও আবেদনমূলক রাজনীতির পুরোধা তিনি।

নবীনচন্দ্র প্রধমে দেখা করলেন যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে। যতীন্দ্রমোহন তাঁকে বললেন তাঁর কয়েকজন কর্মচারীকে এক ডেপুটি ম্যাজিস্ত্রেট কিভাবে অকারণে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে তাঁর উপরওয়ালা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে, সেই কাহিনি। এ কথায় নবীন তাঁর বক্তব্য পেশ করার সুযোগ পেলেন। নবীন বললেন, ‘ দোষ কার? ওই ডেপুটির না আপনার মতো দেশের নেতাদের? আগে ম্যাজিস্ট্রেটের  কুদৃষ্টি থেকে দেশের নেতারা মানুষকে রক্ষা করতেন। সেরকম নেতা ছিলেন বিদ্যাসাগর, কৃষ্ণদাস পাল আর আপনি। বিদ্যাসাগর আর কৃষ্ণদাসের মৃত্যু হয়েছে। আপনি আছেন বটে কিন্তু ব্রিটিশপ্রদত্ত উপাধিশৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আপনি নিশ্চুপ রয়েছেন। এরকম অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট তো যা খুশি তাই করবে।’

নবীন কি বলতে চাইছেন, তা বুঝতে পারলেন যতীন্দ্রমোহন। তিনি দুঃখ করে বললেন, ‘ নবীনবাবু, কি করব আমি! আমি এখন বৃদ্ধ, আমার কর্মক্ষমতাও নেই। এখন কে মানে আমাকে?’

উত্তরে নবীনচন্দ্র বলেন, ‘ আপনি তো ইচ্ছে করেই নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ আর মানবে কেন আপনাকে! দোষ মানুষের নয়, আপনার। আপনি যদি আবার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, দেখবেন সবাই আপনার চারপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মতিবাবুও তো এই কথা বলেছেন আমাকে।’

যতীন্দ্রমোহন অবাক হয়ে বললেন, ‘ কে বলেছেন বললেন ?’

-‘ কেন, শিশিরকুমার ঘোযের ভাই মতিলাল ঘোষ।’

যতীন্দ্রমোহন একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, ‘তাহলে তো ভেবে দেখতে হবে।’

নবীন বুঝলেন তির ঠিক জায়গায় বিঁধেছে। এ কাহিনি শুনে মতিলাল ঘোষ আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন নবীনকে। বললেন, ‘ নবীন, তুমি আজ অসামান্য কাজ করলে। এভাবে তুমি যদি যতীন্দ্রমোহনবাবুকে আবার সামনে এনে দাঁড় করাতে পার তাহলে আমরা থাকব তাঁর পাশে।’

নবীন বললেন,’ যতীন্দ্রমোহনবাবু এগিয়ে আসবেন আমি জানি। কিন্তু অমৃতবাজার আর বেঙ্গলির বিবাদ কি মিটবে ?’

মতিলাল নবীনের দিকে তাকিয়ে কি ভাবলেন, তারপরে বেশ আবেগের সঙ্গে বললেন, ‘ তুমি এক কাজ করো নবীন। তুমি সুরেন বাঁড়ুজ্জের কাছে যাও। তার কাছে গিয়ে আমার খুব নিন্দা করো। তাহলে সে খুশি হবে। সেই সুযোগে তুমি তাকে কংগ্রেসের কাজের ব্যাপারে সক্রিয় করে তোলো।’

নবীনচন্দ্র গেলেন সুরেন বন্দোপাধ্যায়ের কাছে। নিন্দে করলেন মতি ঘোষের । সুরেনবাবু তাঁকে দুঃখ করে বললেন, ‘নবীনবাবু, মতি ঘোষ কেবল আমাকে হিংসা করে এবার কংগ্রেস হতে দেবে না। আমি টাকার জন্য কোন চিন্তা করি না। যেভাবে হোক টাকা জোগাড় করব। কেবল দলাদলির ভয় করি। সেজন্য চুপচাপ আছি।’

নবীন বললেন, ‘চুপচাপ থাকলে তো চলবে না।’

-‘ কিন্তু..’

-‘আপনি মতিবাবুর জন্য পিছিয়ে যাবেন? মতিবাবুর চেয়ে দেশ আপনার কাছে বড় নয়?’

-‘ ঠিক বলেছেন । দেশের জন্য কাজ করব।’

নবীন বুঝলেন এখানেও তির ঠিক জায়গায় বিঁধেছে। কিন্তু এখনই হাল ছাড়লে চলবে না। প্রত্যেকের আত্মাভিমানের শক্ত বরফকে গলাতে হবে। নবীনচন্দ্র ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকায় লিখলেন এক প্রবন্ধ।‘ The politics  of  future : a rising  shadow’ .   এই প্রবন্ধে তিনি তিনি দেখিয়েছিলেন আত্মাভিমানের ঘাত-প্রতিঘাতে দেশের সর্বনাশের চেহেরা। সমালোচনা ছিল নেতাদেরও। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে প্রবীণ ও নবীনের সম্মিলন প্রয়োজন সে দিকেও তিনি অঙ্গুলিনির্দেশ করেছিলেন। অবশ্য প্রবন্ধটিতে তিনি কোন লেখকের নাম দেন নি।

প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পরে নবীনচন্দ্র ‘বেঙ্গলি’র অফিসে গিয়ে সুরেন ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁর কি প্রতিক্রিয়া সেটা জানতে চান নবীন। তাঁকে দেখে ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ হাতে নিয়ে প্রবন্ধটির উপর আঙুল তুলে সুরেনবাবু তাঁর সহকারী সম্পাদকে বললেন, ‘বল দেখি প্রবন্ধটি কার লেখা?’ সহকারী নিরুত্তর দেখে তিনি নিজেই হাসতে হাসতে বলেন, ‘ এ প্রবন্ধের ভাষা দেখে আমি বুঝেছিলাম এটা নবীনবাবুরই লেখা।’ তারপরে নবীনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ প্রবন্ধে আপনি আমাকে গালি দিয়েছেন। বেশ করেছেন। আমি গালি খেয়ে এমন সুখী আর কখনও হই নি। আপনি আমাকে আরও গালি দিয়ে মতি ঘোষ আর তার অমৃতবাজারকে হাতে রাখার চেষ্টা করুন।’

সেদিন সন্ধেবেলায় মতিলাল ঘোষ উপস্থিত হলেন নবীনচন্দ্রের বাসায়। তাঁর বগলে ‘ইন্ডিয়ান মিরর’। ছদ্মক্রোধে মতিবাবু বললেন, ‘নবীন, তুমি আমার বন্ধু হয়েও আমাকে গালি দিলে! সুরেনবাবুকে তো ততটা গালি দাও নি । তার মানে তুমি তাকেই বেশি পচ্ছন্দ করো।’

নবীন বললেন, ‘আমাকে দোষ দিচ্ছ কেন ? এ প্রবন্ধে লেখকের কোন নাম নেই।’

-‘ এটা যে তোমার লেখা তা আমার বুঝতে দেরি হয় নি। নবীন তুমি বন্ধু হয়ে বন্ধুর বুকে ছুরি মারতে পারলে?’

তাঁর কথা শুনে নবীন একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, ‘ সুরেনবাবু বলেন আমি তাঁকে গালি দিয়েছি, আবার তুমি বলো আমি তোমাকে গালি দিয়েছি। কেন দাদা, যে কাজটা করছ তাতে দুঃখ অনুভব করো না, কেবল সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেই পিঠে চাবুক লাগে!’

নবীনের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন মতি ঘোষ । তাঁর ছদ্মক্রোধের আবরণ খুলে গেল।

নবীন অবাক হয়ে গেলেন।

তখন মতিলাল তাঁর পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ ঘাবড়িও না নবীন। প্রবন্ধটি লিখে খুব ভালো কাজ করেছ তুমি। আমাদের চোখ খুলে দিয়েছ। তুমি আমাকে আরও গালি দাও। কিন্তু সুরেনবাবুকে হাতে রাখতে চেষ্টা করো । আমার সহযোগিতা পাবে।’

আশ্বস্ত হলেন নবীনচন্দ্র সেন। মনে হচ্ছে আত্মাভিমানের মেঘ কাটতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনও যতীন্দ্রমোহনের প্রতিক্রিয়া জানতে পারেন নি তিনি।

পরের দিন তাঁর হাতে এল যতীন্দ্রমোহনের প্রাইভেট সেক্রেটারির চিঠি : “ The  correspondence I  shrewdly  guess   have  come  from  your able  pen.  The  Maharaja Bahadur  thought  that  it  was  evidently  written  by  one   who knows  what  is  what’ .  অর্থাৎ  মহারাজা বাহাদুর যতীন্দ্রমোহন  বুঝতে পেরেছেন যে এই প্রবন্ধ নবীনেরই লেখা, কারণ সমস্ত পরিস্থিতিটা তিনি জানেন । এ প্রবন্ধের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছেন তিনি, ‘ It  is  certainly  a  very  fair  and  able  exposition  of  the  state  of  political  horizon .  ‘

রাজা প্যারীমোহন সরকার এবং বিনয়কৃষ্ণ দেবও প্রশংসা করলেন নবীনচন্দ্রের প্রচেষ্টার।

এবার ‘বেঙ্গলি’র সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আর ‘অমৃতবাজারে’র মতিলাল ঘোষকে মুখোমুখি বসানোর চেষ্টা করতে হবে। একদিন নবীন তাঁদের দুজনকেই তাঁর বাড়িতে সান্ধ্য আহারের আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু অন্য নিমন্ত্রিতের কথা তাঁরা জানলেন না।

প্রথমে এলেন মতিবাবু । তাঁকে বৈঠকখানায় বসিয়ে নবীন বললেন, ‘এখন যদি সুরেনবাবু এসে পড়েন আপনি কি করবেন ?’

মতিবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘সুরেন্দ্রকেও নেমতন্ন করেছ নাকি ?’

মতিবাবুর মুখে রাগের চিহ্ন। তখন নবীন বেশ কড়া গলায় বললেন, ‘তোমাদের ব্যাপারটা কি! তোমরা দুজনেই দেশের কাজ করছ, অথচ দুজনের অহি-নকুল সম্পর্ক! এ ওর মুখ দেখবে না! কেন ? এতে কি দেশের কাজ ব্যাহত হবে না !’

নবীনের কথা শুনে মতি গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘সুরেন্দ্র এলে আমার কোন আপত্তি নেই।’

বৈঠকখানার বাইরে এলেন নবীন। সুরেনবাবুও একটু পরে এসে পৌঁছালেন । মতিবাবুকেও তিনি যে নিমন্ত্রণ করেছেন এবং তিনি যে বৈঠকখানায় বসে আছেন সে কথা জানালেন সুরেনবাবুকে।

সুরেন্দ্র বললেন, ‘আমার কোন আপত্তি নেই। আমিই না হয় আগে তাঁর মান ভাঙাব ।’

ঘরে ঢুকে সুরেনবাবু মতিবাবুকে দেখে বললেন, ‘মতিবাবু যে!’

মতিবাবুও সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আসুন সুরেনবাবু, আসুন ।’

নবীনচন্দ্র তাঁংদের কোলাকুলিও করালেন। তারপরে একটা কাগজ এনে দুজনকে বললেন, ‘সই করুন এতে।’

দুজনে অবাক হয়ে প্রস্ন করেন, ‘কি এটা?’

নবীন তখন জানালেন এটা একটা সন্ধিপত্র। আগে থেকেই লিখে রেখেছেন তিনি। সেই সন্ধিপত্রের মর্মার্থ :  নিজেদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ হলে কটূক্তি না করে পরস্পর মিলিত হয়ে আলোচনা করবেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

মতিবাবু ও সুরেনবাবুর মিলনের খবর ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। মতিলাল ঘোষ নিজে গিয়ে জানিয়ে এলেন যতীন্ডমোহনকে। যতীন্দ্রমোহন ধন্যবাদ দিলেন নবীনচন্দ্রকে। ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকা লিখল :

              “দুই প্রতিযোগী যোদ্ধা বঙ্গের খ্যাতনামা কবির গৃহে সম্মিলিত হইয়া সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিয়াছেন। আমরা ‘পলাশীর যুদ্ধে’র অন্য এক সংস্করণের প্রত্যাশায় রহিলাম।”

কংগ্রেসের এই অধিবেশনে তরুণ রবীন্দ্রনাথ ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’ সংগীতটি পরিবেশন করেন।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত