সেনসর

।।সৌরভ মুখোপাধ্যায়।।

 

মেট্রোতে বেশ চাপাচাপি ভিড়। আজ সুপ্রতীক একটু আগে বেরিয়েছেন কলেজ থেকে, হঠাৎ করে শেষ-বিকেলের ক্লাসটা মূলতুবি হয়ে গেল। বেরনোর সময়েই দোনামনা ছিল। জানতেন যে, এই ভিড়ের চক্করটা এড়ানো যাবে না। বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাঙ্ক আর ফার্ম গজিয়েছে এ-চত্বরে, তাদের একটা শিফটের ছুটি হয় ঠিক এই সময়টাতে। একটু দূরেই পুরনো সিনেমা হল। এটা শো ভাঙারও সময়। পিলপিল করে মেট্রোর কামরা বোঝাই হয়ে যায়। খেয়াল করে দেখেছেন সুপ্রতীক, স্টেশনে মোটামুটি কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের মতো মেয়াদ ওই স্রোতটার। পরপর গোটা চারেক ট্রেনেই রাশ ক্লিয়ার, তারপর আবার হালকা।

এই সময়টুকুর জন্য মেট্রোটা অ্যাভয়েড করতেই চান সুপ্রতীক। হয় একটু আগেভাগে বেরিয়ে আসা, নয় কিছুটা দেরিতে, এইরকমই টার্গেট নিয়ে তিনি ফেরার মেট্রো ধরেন। অনেক সময় ইচ্ছে করেই বিশমিনিট কি আধঘণ্টা দেরি করেন স্টাফরুমে বসে-বসে। টুকটাক লেখালেখি থাকলে, ওইখানেই সারেন। নোটস তৈরি, খাতা দেখা, বইপত্র ঘাঁটা আজই দুপুরে স্টাফরুমে এই ধুতি-পাঞ্জাবি নিয়ে কথা হচ্ছিল। কলকাতা শহরে ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা মানুষ ঠিক কতজন দেখা যায় রোজ, এই নিয়ে শুরু হল সহকর্মীদের আলোচনা। সেখান থেকে, সুবিধে-অসুবিধে। ইকনমির প্রশ্ন। সুপ্রতীক বলছিলেন, প্যান্টের চেয়ে ধুতিই ইকনমিক্যাল। একটা স্ট্যান্ডার্ড ট্রাউজ়ারের পিস কিনে দরজিকে দিয়ে বানাতে যা খরচ, তাতে তিনটে স্ট্যান্ডার্ড ধুতি হয়। তা ছাড়া ধুতি রোজ কেচেধুয়ে পরা যায়, কথাটা তো এসেছেই ‘ধৌতি’ থেকে। প্যান্টের সে সুবিধে নেই, ধুলো-কাদা সমেতই পরে যেতে হয় একটানা তিন-চার দিন, কিংবা তারও বেশি। অতএব, ধুতি হাইজেনিকও বেশি। তখন পাশের চেয়ারের বিকাশ মল্লিক, যে ছোকরা সদ্য কলেজ সার্ভিস দিয়ে জয়েন করেছে, ফস করে বলে কিনা, শিয়ালদা লাইনে ধুতি পরে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করলে, লোক নেমে যাবে প্ল্যাটফর্মে, কিন্তু ধুতি থেকে যাবে কামরায়। সেই নিয়ে একটু চাপা হাসাহাসি। চাপা কারণ, বিষয়টা প্রোফেসর গুহকে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে। আর কে না জানে যে, গুহস্যার ভালগারিটি পছন্দ করেন না।

সুপ্রতীক গুহকে যাঁরা চেনে, তাঁরা তাঁর রুচির খবরও রাখে। তাঁর টকটকে ফরসা রং, ঋজু আড়া, কালো ফ্রেমের চশমা, বুকপকেটে কলম-গোঁজা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সরুপাড় ধুতি, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা আর পায়ে কালো স্ট্র্যাপ-আঁটা চপ্পল হ্যাঁ। অরুন্ধতীরও পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি এবং খোঁপায় জুঁইয়ের মালা ট্রেডমার্ক। তাঁদের বাড়ির নাম ‘দেহলি’, তাঁদের বসার ঘরে যামিনী রায়, বুকর‌্যাকে ক্লাসিক্স এবং মিউজ়িক সিস্টেমে লো-ভলিউম সেতার। কাঠের বেড়া দেওয়া সুচর্চিত ফুলবাগান থেকে শোওয়ার ঘরের জানালার পরদা পর্যন্ত, একই পরিশীলিত রুচির প্রবাহ আর তাদের একমাত্র কন্যা রুচিরা যেন সেই প্রবাহেরই আর এক নাম। বাপ-মায়ের গর্ব সে। না, পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া-হওয়ি গোছের কিছু নয়, এ গৌরবের কারণ ভিন্ন। ছোট্টবেলা থেকে ঠিক যেমনটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন মেয়েকে, তাতে একশো ভাগ সফল গুহ-দম্পতি। আচারে আচরণে মূল্যবোধে সে এই পরিবারের সার্থক উত্তরসূরি। বরাবর এই সঠিক আপব্রিংগিং-এর দিকটাতে আন্তরিক নজর দিয়ে এসেছেন সুপ্রতীক-অরুন্ধতী। সুস্থ রুচির বইপত্র-গান-নাটক-ফিল্ম এগিয়ে দিয়েছেন, নিয়ম করে বেড়াতে নিয়ে গেছেন জোড়াসাঁকো-শান্তিনিকেতন। যথোচিত সহবত শেখানো হয়েছে। মৃদু গলায় কথা, নতমুখে হাঁটা, মাড়ি না দেখিয়ে হাসি। ভোরে উঠে নাচ প্র্যাকটিস। কলেজ-টিউশন সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা। মেঘলা বিকেলে ছাদে উঠে গুনগুন, ‘আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল-সাঁঝে মাঝে-মাঝে আজকের প্রজন্মের মেয়েদের হালচাল দেখে বিতৃষ্ণা বোধ করেন সুপ্রতীক, আর একই সঙ্গে নিজের কন্যাটির কথা ভেবে ততোধিক ফুলে ওঠে তাঁর বুক। আজই, এই ভিড়-ঠাসা মেট্রোর কামরায় চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে যে কাণ্ডটা করছে, দেখতে-দেখতে গা-টা রি-রি করছিল তাঁর। বোধহয়, সিনেমা হল-ফেরত, কারণ ওই নিয়েই অনর্গল বকে চলেছে আর হেসে গড়িয়ে পড়েছে। মেয়ে দুটোর দিকে তো তাকাতেই পারছেন না প্রফেসর গুহ। জাস্ট হাফপ্যান্ট পরে রয়েছে একটা মেয়ে, উপরে একটা টাইট গেঞ্জি। ইয়া-ইয়া ফর্সা থাই নিয়েও সংকোচ নেই, উদ্ধত বুক নিয়েও না। অন্যটি পড়েছে অতি খাটো কুর্তা একখানা, তারও উধ্বর্দেশ ওড়নাবিহীন এবং উত্তাল, আর নিম্নাঙ্গে অবিকল চামড়ার রংয়ের সঙ্গে ম্যাচ-করানো এমন আঁটোসাঁটো লেগিংস যে, প্রথম দর্শনে উলঙ্গ মনে হয়! ওই অবস্থাতেই ছেলেবন্ধুদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আড়চোখে কয়েকবার দেখে ঘেন্নায় সরে গেলেন সুপ্রতীক। ছি ছি! এই পোশাকে বাড়ি থেকে বেরতে দেয় যাঁরা, সেই সব বাপ-মা’ই বা কেমন? প্রকৃত ভ্যালুজ় রক্তে ঢোকাতে পারেনি, তাই এই দশা। রুচিরা’র মুখটা ভেসে উঠল সুপ্রতীকের চোখের সামনে। একই প্রজন্মের মেয়ে, কিন্তু যেন অন্য মেরুর বাসিন্দা! ভদ্র শালীন ভঙ্গিতে শাড়ি, নয়তো পরিপাটি ওড়নাসহ সালোয়ার-কামিজ, এই তার বাইরে বেরনোর বাঁধা পোশাক। বিনুনি-চুল, শান্ত, পানপাতার মতো মুখ, দুই টানা-টানা ভ্রুয়ের মাঝখানে একটি টিপ ছাড়া আর কোনও প্রসাধনই লাগে না রুচিরার। তবু কী লক্ষ্মীশ্রী! এই আধা-উলঙ্গিনীদের পাশে তাকে দেবী মনে হবে!

ঠেসে গুঁজে সাতটা স্টেশন পার করে সুড়ঙ্গ থেকে বেরলেন সুপ্রতীক। সন্ধে হয়-হয়। রাস্তার আলোগুলো জ্বলছে সবে। এবার তাঁকে যেতে হবে অটোর লাইনে। এপাশ-ওপাশ দেখে নিয়ে রাস্তাটা পেরোতে যাবেন, কাঁধের ঝোলার মধ্যে ফোনটা ‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’ রিংটোনে বেজে উঠল।

সুপ্রতীকের মোবাইলে অরুন্ধতী আর রুচিরা, দু’জনেরই আলাদা আলাদা কলার-রিংটোন সেট করা আছে। যাতে ফোন বাজলেই বুঝতে পারা যায়, কার কল। এটা অরুন্ধতীর।

রাস্তা আর পেরোলেন না সুপ্রতীক। ফুটপাথে দাঁড়িয়েই কানে ঠেকালেন মোবাইল।

তারপর ওই ফোন-ধরা অবস্থাতেই তাঁর মুখের মাংসপেশিগুলো বেঁকেচুরে যেতে লাগল। ভুরু দুটো ধনুক। চোখে আহত অবিশ্বাস, ঠোঁট রক্তশূন্য। বিমূঢ় ভাবটা কাটছেই না।

‘‘ট্যা-ক্-সি-ই-ই-ই!!’’

বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠে ফুটপাথ থেকে লাফিয়ে নামলেন অধ্যাপক গুহ।

বিল উঠেছিল একশো সাতাত্তর টাকা। শহরের একদম উলটোপ্রান্তের গন্তব্য, ক্রসিং জ্যাম সব নিয়ে বিস্তর সময় লেগে গেল। দরজা খুলতে-খুলতেই বাঁ-হাতে ড্রাইভারের মুঠোয় খচমচ করে গুঁজে কোনওক্রমে বললেন, “রেখে দিন,” তারপর বিভ্রান্তের মতো টলমল করতে করতে থানার গেটের সামনে পৌঁছলেন সুপ্রতীক। সন্ধে ঘন হয়েছে, স্ট্রিট লাইটের নীচে দাঁড়ানো একটা অবয়ব চোখে পড়ল।

জলে-ডোবা মানুষ যেন, এমনই ফ্যাকাশে রক্তশূন্য মুখ অরুন্ধতীর। ভর সন্ধেবেলায় থানা থেকে তলব এলে ভদ্রসমাজের বাসিন্দাদের যা হওয়ার কথা। শরীরটা মূর্তির মতো স্থির। সুপ্রতীককে দেখেও রইলেন চুপচাপ। শুধু কণ্ঠমণির কাছটা দুলে উঠল দু’বার।

“গেছিলে? ভিতরে?”

উত্তরে খুব মৃদু ঘাড় নাড়লেন অরুন্ধতী। প্রায় শোনাই যায় না এমন স্বরে বললেন, “তোমার জন্য ওয়েট করছে।

“তুমি কিছু কথা-টথা বলোনি?”

“কী বলব। তুমি এসে পড়েছ, তুমিই বলো যা বলার। আমি চোখ তুলে তাকাতে পারিনি।”

“আমিই বা কী বলব। কী বলার আছে,” সুপ্রতীকের ঘাড়টা ক্রমশ যাচ্ছে নীচের দিকে।

“অন্তত শুনো সবটুকু। আমার সামনে তো বলছেও না পুরোটা।”

শুনলেন সুপ্রতীক।

ডিউটি অফিসার লোকটা মধ্যবয়সি, টাকমাথা। গলার আওয়াজখানা ভাঙা-ভাঙা, কর্কশ। সুপ্রতীক দেখেছেন, পুলিশের এই নিচুতলার লোকজন চেষ্টা করেও মোলায়েম গলায় কথা বলতে পারে না, বোধহয় অভ্যেসটাই নষ্ট হয়ে যায়।

তবু লোকটা শান্তভাবেই বলছিল। আর সুপ্রতীক গুহ শুনছিলেন। কানের পরদা পুড়ে যাচ্ছিল তাঁর, শুনতে-শুনতে।

“দেখুন স্যার

তিনজোড়া চোখের দৃষ্টি  ঘুরে গেল যার দিকে, সে তখন একটা কাঠের বেঞ্চে চুপ করে বসে রয়েছে। পরনে হালকা নীল কুর্তা-সালোয়ার, বিনুনির প্রান্তে ম্যাচিং গার্ডার, কপালে নীল টিপ, কাঁধে জুটের কল্কা-তোলা ব্যাগ। মাথা নিচু নয়। খুব নিঃস্পৃহ নিরাসক্ত, জগত-সংসার থেকে বিবিক্ত, যেন কিছুটা অবহেলার ছলেই তাকিয়ে রয়েছে উলটোদিকের দেওয়ালে। ক্যালেন্ডারের সিনারিতেই মগ্ন যেন বা। কয়েক ফুট দূরে তারই বাবা-মা, সন্মানিত অধ্যাপক সুপ্রতীক আর সঙ্গীত শিক্ষয়িত্রী অরুন্ধতী যে অপরাধীর ভঙ্গিতে বসে রয়েছেন, সে বিষয়ে তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

বরং তার থেকে দেড় হাত তফাত রেখে যে আর একজন বসে রয়েছে ওই বেঞ্চে, তার দৃষ্টিটা মেঝের দিকেই। সুপ্রতীক-অরুন্ধতী তাকে দেখেছেন ইতিপূর্বে। বারকয়েক এসেছে ছেলেটি তাদের বাড়ি, রুচিরার সঙ্গে দেখা করতে। বোধহয় জন্মদিনেও এসেছিল বন্ধুদের সঙ্গে, আর দু’একবার একলা। কী যেন নাম, সোমনাথ বা ওইরকম কিছু একটা। লম্বা-লম্বা ঝাঁকড়া চুল, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, ময়লা জিন্‌স আর টি-শার্ট। কেমন যেন নেশাখোর টাইপ। পছন্দ করেননি তাঁরা দু’জনেই। মেয়েকে বলেওছিলেন, “কী সব বন্ধু জোটাচ্ছিস বল তো! এ কী লেভেল!”

মেয়ে তর্ক করে না কোনওদিন। ফ্যাকাশে হেসেছিল শুধু, কিছু বলেনি।

“অডাসিটিটা শুনবেন একবার?” ডিউটি অফিসারের কথায় ঈষত্‌ চমকে সেদিকে ফিরলেন রুচিরার বাবা। মুখে-চোখে তেতো ভাব ফুটিয়ে লোকটা বলতে থাকে, “বাকি সব ক’টা কাপল থানায় আনার পর হাতে-পায়ে ধরেছে, এ-মেয়ে এক্কেবারে মাথা উঁচিয়ে রোয়াব নিয়ে বসে! কত ছেলেমেয়ে ভয়ে আসল নাম বলে না, ফল্‌স নাম-ঠিকানা লিখিয়ে একটা পেটি কেসের ফাইন দিয়ে পড়িমরি কেটে পড়ে, আর এ কী করল জানেন? স্ট্রেট গড়গড়িয়ে সব আসল-আসল ঠিকুজি-কুলুজি বলে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল, আপনার নামের আগে প্রোফেসরটা অবধি বাদ দিল না! তাতেই তো আপনাকে স্পষ্ট করতে পারলুম আমি! তার উপর সুপ্রতীকের স্বরতন্ত্রীতে কে যেন করাত চালাচ্ছে। বলতে-চাওয়া বাক্যগুলো মুখে উঠে আসার আগেই কেটেকুটে চাকলা উঠে যাচ্ছে। কী বলবেন! কী জানতে চাইবেন! বাংলা ভাষার অধ্যাপক আজ বাংলা শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। ওই লাফাঙ্গা ছোকরা “অফিসার,” অনেক চেষ্টায় বাংলার বদলে দ্বিধাগ্রস্ত ইংরেজিতেই অনুরোধটা করে ফেললেন অধ্যাপক, “উড ইউ প্লিজ টেব্‌লের কাচে পেপারওয়েট ঘোরাতে-ঘোরাতে টেকো পুলিশটি একটু হাসল। যেন রগড়ের হাসি, মনে হল সুপ্রতীকের। একবার বেঞ্চে বসা ছেলেমেয়ে দুটির দিকে, একবার বাবা-মায়ের দিকে পর্যায়ক্রমে চাহনিটাকে ঘুরিয়ে এনে সেই খসখসে গলায় বলল, “প্রিসাইজ আর কী বলব বলুন স্যার। আমাদের ঘরেও ছেলেমেয়ে আছে, বাপ-মায়ের জ্বালা বুঝি। এই যে সব আজকালকার এরা এত স্বাধীনতা পাচ্ছে, বুঝলেন অরুন্ধতী যেন আর থাকতে পারছেন না। একটু অধীর এবং তীব্র হয়েই ছিটকে বেরল তাঁর চেপে-রাখা উত্‌কণ্ঠা, “আহ, অফিসার! এরা ঠিক কী অফেন্সটা করেছে, সেটা বলুন প্লিজ়!”

গম্ভীর হল পুলিশের মুখ। দু’সেকেন্ড ঠান্ডা চোখে মেপে নিল অরুন্ধতীকে, তারপর সুপ্রতীকের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা মাঝে-মাঝে পার্কে রেড করি। ঝোপঝাড়ের আড়ালে ছেলেমেয়েদের নুইসেন্স বেড়ে গেছে খুব। আলো একটু কমে এলে তো কথাই নেই। আমাদের লোকেরা প্লেন ড্রেসে টহল মারতে-মারতে, খারাপ কেস দেখলেই তুলে নিয়ে গাড়িতে ওঠায়। আজও সেইভাবেই এসেছে একঝাঁক।”

বলে লোকটা চোখের ইশারায় বেঞ্চির দিকে দেখাল। সুপ্রতীক শ্বাস চেপে বসে আছেন, মাথাটা পাহাড়ের মতো ভারী, আর বুঝি ধরে রাখা যাচ্ছে না। অরুন্ধতীও নিষ্পলক। টাকমাথা একটা মুখভঙ্গি করল দু’জনের দিকে তাকিয়ে, তারপর খুব ক্যাজুয়ালি বলল, “জানতে চাইছিলেন বলে খুলে বলছি। শুনুন। আপনাদের মেয়ে এবং এই ছোকরা।

“প্লিজ় অফিসার।”

“কেন, আপনি অফেন্সটা জানতেই তো চান!” নিষ্ঠুর হাসি ঠিকরে বেরল হলদেটে দাঁতের ফাঁকে, “টু বি প্রিসাইজ়, আপনার মেয়ের সালোয়ারের দড়িটা বাঁধা ছিল না, হোয়েন আওয়ার মেন পিকড দেম আপ!”

ফেরার ট্যাক্সিতে একটাও কথা হয়নি। একটাও না। মেয়ে আর মা পিছনের সিটের দু’ জানালায় মুখ গুঁজে বাইরে তাকিয়ে ছিল। সামনে সিটের ধারে বাবা, মাথা নিচু।

প্রথম শব্দটা ফাটল বসার ঘরের সামনে চটি ছাড়ার সময়।

“স্কাউন্ড্রেল!”

মার্জিত ‘রাবীন্দ্রিক’ রুচি, সূক্ষ্ম সফিস্টিকেশন ভেসে গেল খড়কুটোর মতো। চটিটা ছুড়ে মারলেন অধ্যাপক। মেয়ের ডান কাঁধের কাছটা ছুঁয়ে সেটা গিয়ে পড়ল পিতলের ফুলদানির উপর, রজনীগন্ধার ডাঁটিসমেত মেঝেতে গড়াগড়ি খেল।

“কী করছ কী?” অরুন্ধতী দু’হাত দু’দিকে মেলে ধরে মাঝখানে দাঁড়ালেন। সুপ্রতীক উন্মাদের মতো চেঁচাচ্ছেন, “এই মেয়ের জন্ম দিয়েছ! এই মানুষ করলে এতদিন ধরে! এই দিন দেখতে হবে বলে!”

“চুপ করো, চুপ করো,” অরুন্ধতী স্বামীর মুখে চাপা দেন, “পাশের বাড়ি থেকে শুনবে সবাই… শান্ত হও।”

মুখটা টকটকে লাল সুপ্রতীকের। চোখে জল, নাকে সর্দি চলে এসেছে। কান্না আর গর্জন মিশে গিয়েছে গলায়।

“শুনুক না, সবাই শুনুক। জানালাগুলো খুলে দাও। জানুক সবাই, এ বাড়ির মেয়ে ঝোপের আড়ালে বসে…”

রুচিরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। যেন ভাবলেশহীন। অরুন্ধতী দাঁতে দাঁত চেপে তাকে বলেন, “তুই ঘরে যা।”

এই প্রথম কথা বলে রুচিরা। খুব ঠান্ডা গলায় বলে, “এখন তো ঘরে যাব না মা। যা বলার আছে তোমাদের শুনি। তারপর আমিও তো বলব আমার কথা।”

মুখ বিকৃত করে চেরা গলায় চিত্‌কার করে ওঠেন সুপ্রতীক, “তোর আবার কী কথা, অ্যাঁ! কী কথা? এখনও কথা বলার মুখ রাখিস তুই… বেশ্যা কোথাকার!”

মেয়ের ঠোঁটের কোনে অল্প একটু হাসির রং ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। শান্ত মুখেই বলল সে, “এই কথাটা যে শুনতে হবে জানাই ছিল। বলেই দিলে শেষ অবধি। ভাল। কিন্তু বাবা, মাকেও তুমি বলতে পারবে, ওই শব্দটা? বেশ্যা?”

“এতদূর আস্পর্দা! জিভ ছিঁড়ে…”

“কেন বাবা? তোমার তো সহজ সমীকরণ। যাকে ভালবাসি তাকে আদর করেছি, তার আদর নিয়েছি। এটা বেশ্যাবৃত্তি হলে আমার মাও তাই করেছে একসময়, তোমার মাও…”

“ফের জুতো মারব, শয়তান। তারা ঝোপে বসে তোর মতো কাজ করেছিল?” আত্মবিস্মৃত হয়ে ফের লাফিয়ে এগিয়ে আসতে চাইছেন সুপ্রতীক, অরুন্ধতী সামলাতে পারছেন না।

রুচিরা কিন্তু একটুও গলা চড়ায় না। সেই একইরকম অনুত্তেজিত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে, “ঝোপের আড়ালে অবশ্যই নয়, ঘরের দরজা এঁটে। কিন্তু মূল ব্যাপারটাতে কোনও পার্থক্য নেই। দুটো মানুষ ভালবেসে পরষ্পরকে আদর করছে। এটা বেশ্যাবৃত্তি হলে ওটাও তাই।”

“সেটা বিয়ের পর রাস্কেল।”

“মানে? তোমার জাজমেন্টের ইয়ার্ডস্টিক জাস্ট একটা সিঁদুরের টিপ বা কালির আঁচড়! সেটাই ঠিক করবে সব ভালবাসা, আদর, আনন্দ, বৈধ নাকি বেশ্যাবৃ্ত্তি? এটা এই একুশ শতকের লজিক?”

সুপ্রতীক থতমত খেয়ে যান কিছুটা। মেয়ের তীব্র প্রশ্নের ধাক্কায় কিছুটা টলে গেছে তাঁর আক্রমণ, একটু তোতলাতে হয়, “তো-তোকে এত যত্নে মানুষ করা, এত ভাল শিক্ষা দেওয়া, এই রুচি হল তোর?”

“যত্ন করেছ একশোবার। ভাল বই পড়িয়েছ, ফিল্ম, নাটক দেখিয়েছ। নাচ, গান, আবৃত্তি শিখিয়েছ, ভাল-ভাল জায়গায় সঙ্গে করে নিয়ে গেছ, নিয়ে এসেছ। মহত্‌ আদর্শে মুড়ে রেখেছ চারপাশ। তোমাদের সো কলড রিফাইনড কালচার দিয়ে প্রটেক্ট করে বড় করেছ, যেমন আদুরে বিলিতি গাছ টবে পোষে লোকে। কিন্তু বাবা,” রুচিরা একটু দম নেয়, তারপর আরও বিষণ্ণ হয়ে আসে তার গলা, “আমার তেইশ বছর বয়স। আমার এমন কিছু চাহিদা থাকতে পারে যা শুধু সেতার, জুঁই, রজনীগন্ধা আর রবীন্দ্র, নজরুলে মেটে না, আমার যে জৈবিক কারণেই শরীরের খিদে-তেষ্টা থাকা স্বাভাবিক, সেটা তোমরা দু’জনে ফিল করেছ কখনও?”

এবার অরুন্ধতী মুখ খোলেন, “ছি, ছি, এইসব নোংরা কথা বাপ মায়ের সামনে বলার কথা ভাবতেই পারতাম না আমরা।”

“নোংরা কেন হবে মা? এটা তো সুন্দর স্বাভাবিক ব্যাপার। দু’জন মানুষ ভালবেসে পরষ্পরকে আদর করছে, শরীরে-শরীরে কথা হচ্ছে, এটা নোংরা ভাবতে শেখানো হয় কেন ছোটবেলা থেকে? যদি নোংরাই হবে, তবে যাঁরা শেখান, তাঁরা নিজেরাই কেন করেন এমন নোংরা কাজ, যার ফলে আমাদের পৃথিবীতে আসতে হয়?”

বাকস্ফূর্তি হয় না অরুন্ধতীর। বিশ্বাস করা যাচ্ছে না যে, এ মেয়েই তাঁদের এতদিনের চেনা, নরম নতমুখী কন্যা।

সুপ্রতীক কিন্তু ফুঁসে উঠেছেন আবার। কঠিন স্বরে বলছেন, “বড় তার্কিক হয়েছিস দেখছি রে। তা অতই যদি তোর স্বাভাবিক সুন্দর কাজে প্রবৃত্তি, চোরের মতো ঝোপের আড়াল খুঁজতে হয় কেন, অ্যাঁ?”

“কী করব বলো, বাবা! বড় হয়ে ওঠা মেয়েকে তো সেই প্রাইভেসি তোমরা দাওনি। সোমনাথকে আমি ভালবাসি, আমার শরীর তার আদর চায়, কিন্তু তাঁকে দেখে তোমরা নাক সিঁটকাও। আমি তো দেখেছি, সোমনাথ বা অন্য যে কোনও ছেলেবন্ধু, আমার ঘরে এলে মা কী রকম কনস্ট্যান্ট ভিজ়িল্যান্স চালায়, পরদার ওধারে অনর্থক ঘোরাঘুরি করে। মা, তুমি কী ভাবো, ওই হঠাত্‌ করে পরদা সরিয়ে ধূপদানি খুঁজতে বসা কিংবা আচমকা ‘চা খাবে’ বলে মুখ বাড়ানো, এসবের মানে আমি বুঝিনি? সবসময় তোমরা আমাকে একটা অদৃশ্য সেনসরশিপের নীচে রেখে দিয়েছিলে। আমিও যে একটা জ্যান্ত সত্তা, আমারও যে একটা ব্যক্তিগত ডিজ়ায়ার থাকতে পারে শরীরে-মনে, সেটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছিলে তোমরা। তোমরা চেয়েছিলে, একটা কনফর্মিস্ট পুতুল। আজ তুমি জানতে চাইছ, ঝোপের আড়াল কেন খুঁজতে হল আমাকে! বাবা, আমি যদি সোমনাথকে নিয়ে ঘরের দরজা এঁটে দিতাম,” একটা শ্বাস ফেলল রুচিরা, “এই চটি তুমি সেদিনও ছুড়ে মারতে বাবা।”

সুপ্রতীক, অরুন্ধতী দু’জনেই পরষ্পরের মুখের দিকে তাকান। উত্তর হাতড়ান। রুচিরা কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকে। তারপর খুব ক্লান্ত কিন্তু অকম্পিত গলায় বলে, “আমি তোমাদের সম্ভাব্য আর্গুমেন্টগুলো জানি। বলবে এত অসংযমী কেন আমরা, কীসের তাড়া এত। পড়া শেষ কর, চাকরিবাকরি জুটিয়ে সেটল কর, বিয়ে থা করে তারপর। এই তো? আচ্ছা জীবনটা তো আমাদের তাই না? উই থিঙ্ক দিস ইজ় দ্য প্রাইম টাইম ফর ফুলফিলিং আওয়ার ডিজ়ায়ার্স। আমরা এই সুন্দর বয়সে রয়েছি, পৃথিবীকে এত সুন্দর লাগে এখন, পরষ্পরকে প্রাণ ভরে আদর করতে চাই, আনন্দ পেতে চাই, একে পাপ মনে করি না। এই সেরা সময়টা শুধু ওয়েট করে, শুধু সাপ্রেস করে কাটিয়ে দেব কেন? শুধু সমাজ আমাদের সেই অ্যাটমসফিয়ারটা দিতে রাজি নয় বলেই অবদমন করতে হবে? বুড়ো হয়ে যাব আমরা, আমাদের ইচ্ছের দোরগোড়ায় পৌঁছতে? মনটা মরে যাবে না ততদিনে? সরি বাবা, আমরা এই ভণ্ডামিতে রাজি নই।”

ধপ করে সোফায় বসে পড়েন সুপ্রতীক। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলেন। রুদ্ধ গলায় বলেন, “বেরিয়ে যা। দূর হ বাড়ি থেকে। যা, কোথায় গিয়ে তোর ইচ্ছে মেটাবি সেইখানে গিয়ে ওঠ।”

মেয়ের মুখের রেখায় কোনও ঢেউ ওঠে না। একটুও মাথা দোলায় না সে, কণ্ঠস্বরের কম্পাঙ্ক পালটায় না এতটুকু। বলে, “থানায় অতক্ষণ বসে-বসে আমি অনেক ভেবেছি বাবা। বুঝতেই পারছিলাম, এর পর তোমাদের এই সূক্ষ্ম মার্জিত সংস্কৃতির নন্দনকাননে আমার জায়গা হওয়া মুশকিল। আমি কাল ভোরেই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। লেডিজ হস্টেল জানা আছে, শুধু একটা পার্ট টাইম জব খুঁজে নিতে হবে।”

আর দাঁড়ায় না মেয়ে। বাবা-মায়ের থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যায়।

মধ্যরাতের চাঁদ যখন আস্তে-আস্তে একফালি মেঘের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, জানালার গ্রিল থেকে মুখ ঘুরিয়ে ঘরের মধ্যে দৃষ্টি ফেরালেন অরুন্ধতী।

ঘুম আসার কথাও নয়, সুপ্রতীক তবু সাদা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রয়েছেন। ঘর অন্ধকার, বাইরের জ্যোত্‌স্নার আভাটুকু এসে সামান্য আলোর রেশ তৈরি করেছে। জানালার পাশে অরুন্ধতী নিশ্চল বসে রয়েছেন ঠায়।

দু’জনেই চুপ। প্রহরেরা চলে যাচ্ছে নিজস্ব গতিতে, ঘড়ির টিকটিক শব্দ বড় হয়ে বাজছে চার দেওয়ালের মধ্যে।

“শোনো…”

একটু যেন চমকে উঠলেন সুপ্রতীক, তারপর স্ত্রীর দিকে তাকালেন। জানালার গ্রিলের সামনে কালো সিলুয়েটের মাথাটা ফেরানো তাঁর দিকেই।

“কী?” খুব ধীরে, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কথা বলছেন অরুন্ধতী। যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে তাঁর কণ্ঠ, “আমাদের বিয়ের পরের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তোমার?”

“কোন দিন?”

“সেই যখন আমরা দু’জনে দু’জনকে সবসময় কাছে পেতে চাইতাম। আর ওঠাবসা, গল্প করা, বেড়াতে যাওয়ার উপর কীরকম রিমোট কন্ট্রোল চালাতেন তোমার বাবা-মা? ঘরে বসে দু’জনে একসঙ্গে চা খাব, তাতেও তোমার মা মুখ ভার করতেন। সিনেমায় যাব দু’জনে মিলে, এই প্রস্তাবে কী পরিমাণ বিরক্তি আর রাগ দেখাতেন তোমার বাবা!”

সুপ্রতীক একটু সময় নেন। তারপর যেন একটু শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় বলেন, “তার সঙ্গে… আজকের…কী?”

“আছে,” মাঝপথে বলে ওঠেন অরুন্ধতী, “অনেকক্ষণ ধরে ভাবছি কথাটা। বিচার করে দেখছি। মেয়ে তো আজ ঝাঁকিয়ে দিল ভিত পর্যন্ত। তাই ভাবছি। আমরা বিয়ের আগে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পাইনি। বিয়ের পর ওই দিনরাতগুলোই তো ছিল আমাদের সবচেয়ে মধুর সময়। রোম্যান্স বলো, প্রেম বলো, সবটুকু জেগে ওঠার পিরিয়ড। প্রাইম টাইম। পৃথিবীটাকে সুন্দর লাগে যখন। তাই তো বলল মেয়ে। না?”

সুপ্রতীক আস্তে-আস্তে উঠে বলেন বিছানায়। কাশেন এক-দু’বার। উত্তর দেন না। তাকিয়ে থাকেন শুধু। অরুন্ধতীর কথাগুলো কেমন হাহাকারের মতো শোনাচ্ছে, “আমরাও তো প্রেমিক-প্রেমিকাই ছিলাম গো, ওই সুন্দর সময়টাতে? মনে হত না বলো, পরষ্পরকে শুষে নিই, শরীরে-শরীরে আঠার মতো সেঁটে থাকি? কিন্তু আমাদের গুরুজনরা পদে-পদে আমাদের ইচ্ছের পথে কাঁটা বিছিয়েছেন। মনে পড়ে না তোমার? ভুলে গেছ সেই সব ছটফটানির দিন?”

মাথাটা নিচু করেন সুপ্রতীক। না, ভোলেননি। ভোলা যায় না। এখনও মনে পড়ে, ছুটির দুপুরে শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করলে ঘোর অসন্তুষ্ট হতেন তাঁর মা। দুপুরে ‘স্বামীকে নিয়ে দোর দেওয়া’ নাকি নতুন বউয়ের পক্ষে চরম বেহায়াপনা। তাতে ইন্ধন দিতেন কাকিমা-জেঠিমারা। তাঁদের বয়সকালে নাকি দিনমানে দেখাই হত না কর্তাদের সঙ্গে। এই কাঁঁটা বিছানো পারিপার্শ্বিকের মধ্যে সুপ্রতীক-অরুন্ধতী কাটিয়েছেন মহার্ঘ দ্বিপ্রহরগুলো। ইচ্ছে হত, সারাদুপুর পরষ্পরের ওম গায়ে মাখব, কিন্তু লজ্জায়, গ্লানিতে মাঝখানে পাশবালিশ রেখে শুয়ে থাকতে হত চুপচাপ। দরজার পরদা উড়ত।

বিছানা থেকে নেমে জানালার ধারে এসে দাঁড়ালেন সুপ্রতীক। চাঁদটা মন্থর আভিজাত্যে একটু-একটু করে বেরিয়ে আসছে মেঘের কবল থেকে। সেদিকে তাকিয়ে তাঁর মনে পড়ল, এমনই এক জ্যোত্‌স্না ধোয়া রাতে তাঁরা দু’জনে ছাদে বসেছিলেন। অরুন্ধতী একটা গান গাইতে শুরু করেছিলেন, আর সুপ্রতীকের বাবা নীচের উঠোন থেকে হাঁক দিয়েছিলেন, “খোকা বউমাকে বল এটা বাইজিবাড়ি নয়।”

সুপ্রতীক অরুন্ধতীর কাঁধে হাত রাখলেন। অরুন্ধতী তাঁর হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে গভীর কিন্তু বিষণ্ণ স্বরে বললেন, “তাঁদেরও দোষ দিই না পুরোপুরি। তাঁরা চেয়েছিলেন আমরা যেন তাঁদের চেনা ছাঁচটাতেই নিজেদের ঢেলে দিই। আমাদের নিজস্ব ডিজ়ায়ারগুলোকে বলি দিয়ে, তাঁদের অর্জন করে আনা ভালমন্দের বোধটাই বিনা প্রশ্নে মেনে নিই। তাই তাঁরা অসংকোচে সেনসরশিপ চাপিয়ে দিতে পেরেছিলেন। হয়তো, হয়তো কেন, নিশ্চয়ই তাঁদের অভিভাবকদের কাছেও এই কাঁচির ঘা তাঁরা পেয়ে এসেছেন নিজেদের যৌবনকালে। এটা এজ ওল্ড ট্রাডিশন আমাদের। যা নিজেরা পাইনি, ওদেরও পেতে দেব না। আমাদের চশমাই ঠেসেগুঁজে ফিট করাব এদের চোখে। আসলে আমরা হিংসুটে, জানো? আমাদের সাবকনশাসে জ্বলন হয় কোথাও একটা, তাই আমরা সক্কলে সহবত শেখানোর নামে স্যাডিস্ট হয়ে উঠি। আমরা সবাই। তুমি, আমি ওই পুলিশ সব্বাই।”

অরুন্ধতী ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। সুপ্রতীক কয়েকটা ঢোক গেলেন পরপর। জিভটা ভারী লাগছে খুব। কথা বলতে চাইছেন, পারছেন না। মনে হচ্ছে, একটু কাঁদতে পারলে ভাল হত তাঁরও। কিন্তু পারা যাচ্ছে না।

বোবা জ্যোৎস্না ধারা শুধু ঝরে পড়তে থাকে চরাচর জুড়ে। উদার, অকৃপণ, আনসেনসর্ড।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত