রবীন্দ্রনাথ নীরব কেন? (শেষ অংশ)

বঞ্চিতা ছোটকাকিমা

ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী রবীন্দ্রনাথের ছোটকাকিমা । নগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী । দ্বারকানাথের ছোটছেলে নগেন্দ্রনাথ। শেষবার বিলাতযাত্রায় পিতার সঙ্গী ছিলেন তিনি । ১৮৫৮ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়েসে মৃত্যু হয় তাঁর । নিঃসন্তান ছিলেন তিনি । নিঃসন্তান বিধবার শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির অধিকার নেই ।

তাহলে দয়া-দাক্ষিণ্যে কাটাতে হবে বাকি জীবন ?

ত্রিপুরাসুন্দরী মেজো জাকে বললেন সব । মেজো ভাসুর বেঁচে থাকলে তাঁকেই বলতেন । মেজো জা তাঁর ১১ বছরের ছেলে গুণেন্দ্রকে দিতে চাইলেন দত্তক হিসেবেসে খবর বাড়ির কর্তা দেবেন্দ্রনাথের কানে গেল । খবরটাতো ভালো নয় । ত্রিপুরাসুন্দরী গুণেন্দ্রকে দত্তক নিলে মেজো ভাইএর ভাগের সম্পত্তি যে তাঁর অধিকারে চলে যাবে !

সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঠুকলেন দেবেন্দ্রনাথ । ১৮৫৯ সালের ২৯ জানুয়ারিতে । দত্তক নেবার অধিকারের বিরুদ্ধে মামলা । ১৮৬০ সালের ১৫ মে রায় বেরুলো মামলার । ত্রিপরাসুন্দরীর দাবি খারিজ করে দিলেন আদালত ।

হাল ছেড়ে না দিয়ে ত্রিপুরাসুন্দরী এই রায়ের বিরুদ্ধে আবার মামলা করলেন । ১৮৭৬ সালের রায়ে আদালত স্বামীর তিন ভাগের এক ভাগ সম্পত্তিতে স্ত্রীর জীবনস্বত্ব স্বীকার করল । দেবেন্দ্রনাথ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেন । অবশেষে আপোষে ঠিক হল দেবেন্দ্রের অনুকূলে ত্রিপুরাসুন্দরী জীবনস্বত্ব ছেড়ে দিলে তাঁকে এককালীন ১০ হাজার টাকা ও বার্ষিক ১ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া হবে ।

নিরুপায় ত্রিপুরাসুন্দরী মেনে নিলেন সে ব্যবস্থা ।

সাদা কথায় বঞ্চিতা হলেন তিনি ।

জমিদারির বার্ষিক আয় ছিল ২,৩৪,৩১০ টাকা । ত্রিপুরাসুন্দরীর প্রাপ্য ছিল ২৬ হাজার টাকা । সে জায়গায় তিনি পেলেন এককালীন ১০ হাজার আর বার্ষিক ১ হাজার ।

এসব ঘটনা যখন ঘটেছে তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স কম । কিন্তু তিনি তো শুনে থাকবেন সব । এই অবিচারের বিরুদ্ধে এরপরেও কখনও কিছু বলেন নি বা লেখেন নি অথচ তিনিই তো লিখেছেন যে অন্যায় সহ্য করে সেও সমান অপরাধী ।

নির্বাসিতা বউঠান

রবীন্দ্রনাথের বউঠান কাদম্বরীদেবী । জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী । ১৮৬৮ সালে মাত্র ৯ বছর বয়েসে তাঁর বিয়ে হয় । মাত্র ২৫ বছর বয়েসে ১৮৮৪ সালে মৃত্যু হয় তাঁর । অস্বাভাবিক মৃত্যু । আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি আফিমের বড়ি খেয়ে ।

তাঁর চিকিৎসা হয় নি, সেকথা বলা যাবে না । চিকিৎসার জন্য ৪০০ টাকা খরচ করে ডাঃ ডি বি স্মিথকে আনানো হয়েছিল । তাঁর সঙ্গে ছিলেন  নীলমাধব হালদার ও সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় । ২৫ টাকার ওষুধও এসেছিল । কিন্তু তাঁকে রাখা হয়েছিল তেতলার নির্জন ঘরে । সে ঘরে আলোর জন্য খরচ হয় দেড় টাকা ।

১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল কাদম্বরী আফিম খান, দুদিন পরে ২১ এপ্রিল মৃত্যু হয় তাঁর । তখন তৎপরতা শুরু হয় ঠাকুরবাড়িতে । মর্গে পাঠানো হয় নি মৃতদেহ । করোনার কোর্ট বসেছিল ঠাকুরবাড়িতেই । সংবাদটা যাতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত না হয়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । কেউ কেউ বলেন সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার জন্য উৎকোচ দেওয়া হয় । সমস্ত রিপোর্ট, হয়তো বা সুইসাইড নোটও নষ্ট করে ফেলা হয় । 

কিন্তু আত্মহত্যা কেন করলেন এক পঁচিশ বছরের যুবতী ?

কেউ কেউ বলেন তিনি  সেন্টিমেন্টাল, ইনট্রিভার্ট, স্কিৎসোফ্রেনিক ছিলেন । একবার ছাদ থেকে পড়তে পড়তে বেঁচে যান । কিন্তু কাদম্বরীর আত্মহত্যার এটাই যথেষ্ট কারণ হতে পারে না

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে এ মৃত্যু ‘মহিলাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিণাম’ । কি নিয়ে দ্বন্দ্ব তার  কোন ব্যাখ্যা নেইআসলে ঠাকুরবাড়ির বাজার সরকার শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়ে বলে কাদম্বরীকে প্রথমাবধি অনেক লাঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে । সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনী সেসব মানসিক লাঞ্ছনার পুরোভাগে ছিলেন । এঁরা স্বামীসঙ্গ থেকেও তাঁকে বিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন । সেসব সহ্য করতে পেরেছিলেন কাদম্বরী, কারণ প্রথমাবধি তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন একটি ‘ওয়েসিস’ বা মরূদ্যান । সে মরুদ্যানের নাম রবীন্দ্রনাথনা, স্বামী তাঁর মরূদ্যান হতে পারেন নি । এক অভিনেত্রীর চিঠি দেখে কাদম্বরীর সন্দেহ হয়েছিল স্বামী অন্যত্র আবদ্ধ । সন্তান থাকলে ব্যাপারটা অন্য রকম হতে পারত । সেখানেও দুর্ভাগ্যের শিকার কাদম্বরী । সেকালে বন্ধ্যা নারীর বিড়ম্বনা তো প্রবাদপ্রতিম । ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়ে ঊর্মিলার মৃত্যুর জন্যও গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে । স্বর্ণকুমারীর মেয়ে ঊর্মিলার দেখভালের দায়িত্ব ছিল যে কাদম্বরীর উপর । হঠাৎ ঠিক হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের বিয়ে । ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর । তাঁর মরূদ্যান, তাঁর শেষ আশ্রয় চলে যাবার ভীতি হয়তো তাঁর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিল বিয়ে আর মৃত্যুর তারিখ সে দিকে নির্দেশ দেয় । রবীন্দ্রের বিয়ের তারিখ ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর । কাদম্বরীর মৃত্যুর তারিখ ১৮৮৪ সালের ১৯ এপ্রিল ।

কলকাতাতেই ছিলেন রবীন্দ্রনাথ । তিনি কি মৃত্যুযন্ত্রণাকাতর বউঠানকে দেখতে গিয়েছিলেন ? তাঁর যন্ত্রণার উপশমের চেষ্টা করেছিলেন ? এসবের কোন প্রমাণ নেই । কিন্তু অন্য আর একটা যে প্রমাণ আছে তা আমাদের চমকে দেয় ।

১৯ এপ্রিল মৃত্যু কাদম্বরীর । আর ৯ মে ‘সরোজিনী’ জাহাজে দল বেঁধে বেড়াতে গেলেন রবীন্দ্রনাধ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ । কেমন করে পারলেন ?

কিন্তু তার মানে এই নয় যে এই দুই ভাই বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলেন কাদম্বরীকেনয়ন সম্মুখে না থাকলেও তিনি যে ঠাঁই নিয়েছিলেন নয়নের মাঝখানে । আগে দেখি জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে । তিনি তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে স্ত্রীর মৃত্যুরহস্যের উপর আলোকপাত করেন নি । কিন্তু ধীরে ধীরে উদাসীন হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি । অনেক হয়েছে কোলাহল, আর নয় । আর বিয়ে করেন নি তিনি । চলে গিয়েছিলেন রাঁচিতে । হয়তো আত্মানুশোচনা বিঘ্নিত করেছিল তাঁর মানসিক ভারসাম্য ।

এবার রবীন্দ্রনাথের কথা ।

কাদম্বরীর ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ নীরব নন । ‘জীবনস্মৃতি’তে আছে তাঁর কথা । ‘প্রথম মৃত্যুশোক’ । সে শোক তাঁকে সারাজীবন দগ্ধ করেছে । বহু কবিতায়, গানে এসেছে সে কথা । সে বেদনাকে প্রকাশ করার ব্যাপারে কবি মুখর । কিন্তু সেই মুখর কবি নীরব বউঠানের মৃত্যুরহস্য ব্যাখ্যায় ।

কেন কাদম্বরী আত্মহত্যা করলেন,  কেন সে কথা চাপা দেবার চেষ্টা হল সে ব্যাপারে বড্ড নীরব কবি প্রতাপশালী পিতার ভয়ে ?  এই ভয়েই কি তিনি পিতামহের ব্যাপারেও নীরব ? কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও তো মুখ খোলেন নি রবীন্দ্রনাথ । ১৯০৫ সালে দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যু তার বেশ কয়েক বছর পরে তিনি লিখছেন ‘জীবনস্মৃতি’ । লিখছেন ‘প্রথম মৃত্যুশোক’ । সে লেখায় শোকের গভীরতা আছে, কিন্তু মৃত্যুর কারণ নেই, ‘আত্মহত্যা’ শব্দটিও নেই । বিশাল রবীন্দ্রসাহিত্যে, চিঠিপত্রের বিশাল সম্ভারে কোথাও নেই সে কথা ।

বরপণপীড়িতা নাবালিকা কন্যারা

বড্ড তাড়াহুড়ো করে নিজের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । যিনি ‘সবলা’ লিখেছিলেন তিনি মেয়েদের অবলা রেখেই বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়েছিলেন । ঠিকঠিক লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড় করান নি । তাই তাঁর তিনটি মেয়েই যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েছেন । সেইসঙ্গে যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ নিজেও । কি বাধ্যবাধকতা ছিল এরকম বিয়ের, এরকম বরপণ দিয়ে বিয়ে দেওয়ার, সে বিষয়ে পরিষ্কার করে তিনি বলেন নি কিছু । তাঁর এই নীরবতা আমাদের পীড়িত করে ।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম কন্যা মাধুরীলতা বা বেলাতাঁর যখন ১৪ বছর বয়েস তখন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে বিয়ে হল তাঁর । পাত্রপক্ষ ২০ হাজার টাকা বরপণ দাবি করলেন এবং বিয়ের আগেই তা পরিশোধের দাবি করেন । সেই সঙ্গে আরও কিছু অন্যায় দাবি ছিল । যেমন পাত্রপক্ষ বেলাকে দেখবেন অন্যের বাড়িতে । সাংসারিক জীবনে সুখী হন নি বেলা । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও জামাতা শরৎচন্দ্রের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি হয়েছিল । অথচ এই শরৎ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে লিখেছিলেন, ‘আমার জামাতাটি মনের মতো হয়েছে । সাধারণ বাঙালি ছেলের মতো নয়ঋজুস্বভাব, বিনয়ী অথচ দৃঢ় চরিত্র ।’

চোদ্দ বছরে বেলার বিয়ে হয়েছিল । ব্রাহ্ম বিবাহ আইন অনুযায়ী একে বাল্য বিবাহ বলা যাবে না । কিন্তু রেনুকা বা রানির ক্ষেত্রে সে কথা খাটে না । তাঁর বিয়ে হয় ১১ বছর বয়েসে । বেলার বিয়ের মাত্র দেড় মাস পরেই কেন রবীন্দ্রনাথ রানির বিয়ের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন ? কিসের তাড়া ? পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে আমরা জেনেছি রেনুকা এই বিয়ের আয়োজনে খুশি হন নি । ডাক্তার সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে রেনুকার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন রবীন্দ্রনাথ । বিয়ের যৌতুক ও শর্ত অনুযায়ী জামাতার বিলাতযাত্রার ও সেখানে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করতে হবে শ্বশুরমশাইকে, মাসোহারা পাঠাতে হবে সত্যেন্দ্রনাথের মাকে । বিলেত থেকে অকৃতকার্য হবে ফিরে আসেন সত্যেন্দ্রনাথ । মানসিক ও শারীরিক অশান্তিতে দগ্ধ হতে থাকেন রেনুকা । বিয়ের এক বছর পরেই মৃত্যু হল তাঁর । যক্ষ্মা রোগে । ঠাকুরবাড়ির অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন এ রোগে । অপুষ্টি যে রোগের মূল কারণ, সে রোগ এ বাড়িতে হানা দেয় কেন, তার সঙ্গত কারণ আমরা খুঁজে পাই নি ।

মীরা বা অতসী রবীন্দ্রনাথের ছোটমেয়ে । মীরার যখন ১১ বছর বয়েস তখন বামনদাস গাঙ্গুলীর ছেলে নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হল । জামাতাকে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা পাঠাবার প্রতিশ্রুতি দিলেন শ্বশুরমশায় । সে প্রতিশ্রুতি রক্ষাও করেছিলেন । কিন্তু জীবনে মীরাও সুখী হতে পারেন নি । পুত্র ও কন্যা সন্তান জন্ম দেবার পরে তিনি খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেন এবং স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

[লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক ]

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত