| 19 জুলাই 2024
Categories
জীবন যাপন

প্রেম, পরকীয়া ও যৌনতায় মগ্ন কেন নারী-পুরুষ

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট
‘পরকীয়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ প্রণয়নী; অন্যের পত্নী; পরপত্নী।’ ইংরেজিতে Adultery & paramours হলো বিবাহিত কোনো নারী বা পুরুষ নিজেদের স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য সঙ্গী-সঙ্গীনির সঙ্গে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌনসম্পর্ক বজায় রাখা (ইউকিপিডিয়া)’। বৈষ্ণব শাস্ত্রে পরকীয়াকে প্রেমবিষয়ক মতবাদ রূপে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু কী সেই প্রেম? কার সঙ্গে প্রেম? প্রকৃত অর্থে পরকীয়া হলো পরমেশ্বরের সঙ্গে প্রেম। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল কাব্য ও ধর্মনির্ভর। শাস্ত্র ও মতবাদের জন্ম মূলত আদি ও মধ্যযুগে। মধ্যযুগে রচিত সাহিত্যের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখাটি বৈষ্ণব পদাবলি। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে রচিত এই সাহিত্যের প্রধান বিষয় হলো প্রেম। শ্রী চৈতন্য দেবের (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি.) আবির্ভাবের পরে এই প্রেমধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রেমভক্তিধারার। এ দু’য়ে বৈষ্ণব সাহিত্যধারা রসলীলায় সিঞ্চিত হয়ে ভাবান্দোলনে আন্দোলিত করেছিল বাঙালির মন-প্রাণ। পদ বা পদাবলি হলো বৌদ্ধ বা বৈষ্ণব ধর্মের গূঢ়তত্ত্ব। বৈষ্ণব রসতত্ত্ব দুই প্রকার- ১. গৌরাঙ্গ বিষয়, ২. রাধা বিষয়।
নব্যভারতীয় আর্যভাষার প্রাচীনতম সাহিত্য নিদর্শন ‘চর্যাপদ’কে বাংলাভাষার আদি বা প্রাচীনতম কাব্য হিসেবে ধরা হয়। চর্যাপদ মাত্রাবৃত্তে রচিত। চর্যাপদের মূল বিষয় হলো ভাববাদ। ১৯২৬ খ্রি. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম চর্যাপদ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন; তাঁর Origin and Development of the Bengali Language বইটিতে। বৈষ্ণববাদের সাধক পুরুষ শ্রী রাধা রমনের বহু বিচ্ছেদ পর্বের একটি পদ আজ বাংলার মানুষের মুখে মুখে; যেমন- ‘ভ্রমর কইও গিয়া শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদ অনলে/ অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া…’ কীর্তনের এই সুরটিকে মূলত বিলাপের বা আর্তির চরম অবস্থার একটি রূপ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বিচ্ছেদের গানে বিজয় সরকারও সমধিক পরিচিত একটি নাম। যার জন্ম পূর্ব বাংলার যশোর জেলার নড়াইল মহুকুমায়। বিচ্ছেদ বা বিলাপের স্বরূপ আমরা বিজয় বিচ্ছেদেই মূল হাহাকারটা পাই। কৃষ্ণ, ভগবানের বিভিন্ন নামের একটি হলেও বৈষ্ণববাদে কোনো কোনো সাধক নিজেকেই কৃষ্ণরূপে কল্পনা করে ভগবানের অবতার হয়েছেন। কবিয়াল বিজয় সরকারের বিচ্ছেদ একটি পদ এরূপ—‘সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে/ এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনই ঠিক রবে…’ স্ত্রী বিয়োগের সময় তিনি তাঁর কাছে ছিলেন না। তাই স্ত্রীর মৃতদেহ দেখে এই পদটি তিনি রচনা করেছিলেন। কবিয়াল ও শায়ক মূলত ভরতচন্দ্র রায় গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)। তবে লালন সাঁইজী হলেন বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদের মিলিত মোহনা; যদিও বৈষ্ণববাদে বহু মুসলিম কবিদের পদ আছে।
ভারতবর্ষে সুফিবাদের প্রথম প্রচারক মনসুর আল-হাল্লাজ (জন্ম নবম শতকে- মৃত্যু ৯২৪ খ্রি.) তাঁর ভারতবর্ষে আগমন ও প্রস্থান কালপর্ব (৮৯৭-৯০২ খ্রি.) ‘দিওয়ান-ই মনসুর হাল্লাজ’। তবে, সুফিবাদের সাহিত্য কর্মের প্রথম রচনাটি গৌড়ীয় শাহী দরবারে যাকে সুলতানি যুগ বলা হয় (১৩৫১-১৫৭৫ খ্রি.)। এই সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রূপ লাভ করে। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ-এর আমলে ফারসি সাহিত্যে মরমি উপাখ্যান ‘ইউসুফ-জুলেখা’ অনুবাদ করেন যথাক্রমে কবি শাহ্ মুহম্মদ সগীর, কবি আব্দুল কাদির ও কবি ফকির গরীবুল্লাহ। দৌলত উজির বাহরাম খাঁ ও মুহম্মদ খাতের অনূদিত ‘লাইলী-মজনু’ বর্তমানে এই মিথ যেমন মুসলমানদের কাছে ধর্মের (ইসলামের) অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরূপে উপস্থাপিত হয়। তদরূপ শ্রী কৃষ্ণকীর্তন মধ্যযুগের অন্যতম সাহিত্যধারা। রামাই পণ্ডিত রচিত ধর্মপূজার শাস্ত্রগ্রন্থ ‘শূন্যপুরাণ’ বড়ু চণ্ডীদাস রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও রাধার প্রেম ও বিরহ’। পরকীয়া হলো নিরেশ্বরবাদ বা ভাববাদে অবগাহনের চরম পুলক। ‘স্থূল সুখ অপেক্ষা সূক্ষ্ম সুখের দিকে অগ্রসর হওয়া হবে মানব জীবনের ব্রত। ভোগ-বিলাস, বাসনা-কামনার মাঝে যে সুখ তা অবশ্যই স্থূল। মানুষ ওসবের আজ্ঞাধীন হবে না। কিন্তু ওসব কেনোক্রমে বর্জনীয় হতে পারে না। (গৌরচন্দ্রিকা, পৃ: ২৫ পার্থিব জগৎ)
আধুনিক সাহিত্যে কবিতায় যে রূপকের ব্যবহার, যেমন উপমেয়কে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে তার ওপর অভেদ আরোপ করে, একটি শব্দকে বহুগামী ও রহস্যময়ী করে তোলে, কবিতার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে; পরকীয়া শব্দটিও তদরূপ নর-নারীর অবসাদগ্রস্ত জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে উপভোগের বা জীবনকে সঞ্চারিত বা আন্দোলিত করার একটি উপকরণরূপে অধিষ্ঠিত করে। বৈষ্ণব শাস্ত্রে পরকীয়াকে প্রেমবিষয়ক মতবাদ বলা হয়েছে।
আমরা যারা লেখালেখি করছি, তাদের ক’জনই-বা ভাষাবিজ্ঞান জানি? প্রতিটি শব্দের পাঁচটি স্বরূপ। যেমন—তেঁতুল শব্দটি বললে জিহ্বায় জল আসে। কিন্তু কেন? প্রথমে শব্দ, চিত্র, রূপ,রস, রসাস্বাদনের কারণে নয় কি? এর আগে ধ্বনীতত্ত্ব, এরও আগে বর্ণতত্ত্ব জানলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। বাংলা বর্ণমালার তিনটি ভাগ। মনের তিনটি স্তর; জ্ঞানেরও তাই। সংখ্যা তত্ত্বের আরেকটি তত্ত্ব শাস্ত্রের আদিতে গেলে পাওয়া যায়। একজন রাম মোহন, বিদ্যাসাগর, ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ একদিনে তৈরি হননি। মনের তিটি স্তরের সঙ্গে জ্ঞানের তিনটি স্তরের সম্মিলন ঘটাতে ক’জন পেরেছেন।
যারা পেরেছেন তারা পণ্ডিত। সে সংখ্যা নেহাত কম। যিনি বাজান তিনি বাদক, যেটা বাজান, সেটা বাদ্য কিন্তু যিনি বাজেন তিনি কি পণ্ডিত নন! পণ্ডিতত রবি শঙ্কর বাজান’নি তিনি নিজেই বেজেছেন। সঙ্গীতের একটি গীতে তিনটি পর্ব যেমন—স্থায়ী, অন্তরা ও সঞ্চারী। ঠিক তেমন-ই এর সুরের তিনটি স্তর উদারা, মুদারা ও তারা। এই দুই-তিনের সমষ্টিতেই একটি গানের পূর্ণতা। এখানে লক্ষ করুন মনের ও জ্ঞানের সম্মিলন। ক’জন পারেন এই সম্মিলন ঘটাতে। সংখ্যাতত্ত্বে যার অবস্থান ছয়ে। এখানে আরেকটি বিষয় হলো ভাবের দুটি স্তর। তা হলো-১. অবরোহণ; ২. আরোহণ। চেতন থেকে অতিচেতনের স্তর এক একটি বাহিনীর পোশাক যেমন তাদের দৈনন্দিন কাজের এক একটি ক্রিয়া বা কার্যকলাপের এক একটি রং। এ তত্ত্বে বাংলাদেশ পুলিশের পোশোকের রং হওয়া উচিত সাদা। যেহেতু তাদের মূল স্লোগান—‘শান্তি শৃঙ্খলা ও প্রগতি’। তাই তত্ত্ব ধারণের সর্বোচ্চ রংটি কি সাদা হওয়া উচিত নয় ?
ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু যারা আজ অশান্তি সৃষ্টি করছে, তারা কি বিপথগামী নয়?
মধ্যযুগে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন ব্যবস্থার ফলে বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদের সহাবস্থানের ফলে অনেকাংশে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে কিন্তু মুক্ত হয়নি। অনেক সাধকই মুক্ত করতে চাননি স্বীয় ধর্মের সাধারণদের ভয়ে।
জীবদ্দশায় এক কলমও না লিখে যিনি পৃথিবী শ্রেষ্ঠ দার্শনিক তিনি হলেন—‘সক্রেটিস’। তাঁর একটি মাত্র উক্তির জন্য Know Thaiself । যা পৃথিবী জানতে পায় তাঁর শিস্য প্লেটোর কাছ থেকে। প্লেটো তাঁর গ্রন্থ ‘দ্য রিপাবলিক অব প্লেটো’তে সক্রেটিস সম্পর্কে তাঁর লেখনি দিয়ে পৃথিবীকে জানিয়ে যায় আত্মতত্ত্বের অজানা অধ্যায় সম্পর্কিত আরও বেশ কিছু তত্ত্ব। গৌতম বুদ্ধের ‘নির্বাণ’ আত্মতত্ত্বেরই একটি মতবাদ। ‘শঙ্করাচার্য বৌদ্ধদার্শনিকদের মতো জগতকে শূন্য বলে মনে করেননি। বেদান্ত দর্শনে জগতকে যে মায়া বলা হয়েছে, তার সঙ্গে বৌদ্ধ দর্শনের শূন্যতত্ত্বের পার্থক্য আছে। মায়া ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শঙ্কারাচার্য বৌদ্ধদের শূন্যতত্ত্ব খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন যে, শূন্যের ধারণা মানুষের অন্তঃকরণের আধারে—এই থেকে এটাই স্বতঃসিদ্ধ যে, শূন্য প্রকৃতপক্ষে শূন্য নয়। প্রতীচ্য দর্শনে হিউম ও বিষয়ীবাদীরা বৌদ্ধদের অনুরূপ মত পোষণ করতেন। শঙ্করের মতে, আত্মা অলীক নয়, দেহ নয়, এমনকি ন্যায়ের কোনো স্বতঃসিদ্ধও নয়। আত্মা অনির্বচনীয়, সমস্ত প্রমাণের অতীত এবং আত্মাকে অস্বীকার করা অসম্ভব, কারণ যিনি একে অস্বীকার করেন বা এর অস্তিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন তাঁর সত্তাসার এই Samkara vaya on vendanta sutras, Ibid, P. 43) । ‘বিশপ জর্জ বার্কলি (১৬৮৫-১৭৫৩) যিনি ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান ও বস্তুজগত সম্পর্কে মানসিক ধারণাকে কেন্দ্র করে বিষয়ভিত্তিক চৈতন্যবাদ গঠন করেন।’ বিভিন্ন ধর্ম তাদের নবী, রাসুল, অবতার, সিদ্ধপুরুষদের চরিত্রে অলৌকিকত্ত্ব আরোপ করে তাদেরকে দূরের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একেক ধর্মমতে একেক রূপে। যেমন—‘নোংরা ধরনের বস্তুবাদীরা মহাত্মা মুহাম্মদ (স.)-এর মিরাজকে স্থূল শারীরিক স্বর্গারোহণ বলে শিক্ষা দেয়, এতে মিরাজের আত্মিক মর্যাদা হয়েছে ধুলিসাৎ, আর তা মানুষকে করে তুলেছে মিরাজের প্রতি সন্দিহান, অবিশ্বাসী। অন্যধর্মাবলম্বীদের কাছে হজরতকে বানানো হয়েছে হাসির পাত্র। প্রাচীন ইরানি সংস্কার থেকে খ্রিস্টানেরা যিশুর স্বশরীরে স্বর্গারোহণের কাহিনী সৃষ্টি করেছেন। The Hymns of zarathustra, Jacques Duchesna-Guillemin. translated from french by Mrs. M Henning, Beacon press, Boston : 1963, p-2.)
কেননা, আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে স্থূল দেহ নিয়ে স্বর্গারোহণ কোরানের শিক্ষাবিরোধী।
মওলানা আল্লামা শিবলী নোমানী, রাইট্ অনারেবল্ জাস্টিস সৈয়দ আমীর আলী, পণ্ডিত মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, চিন্তাশীল মহাকর্মী স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রমুখ মনীষীরা মিরাজের স্থূল ব্যাখ্যার সমালোচনা করেন। (শিবলী নোমানীর ‘সিরাতুন্নবী’, মাওলানা আকরম খাঁর ‘মোস্তফা চরিত’, এবং তৎকর্তৃক বাংলায় অনূদিত কোরান শরীফ, এবং আমীর আলী ‘দ্য স্পিরিট অব ইসলাম’। কোরান ব্যতীত আর কোনো অলৌকিক ঘটনা, বস্তু বা বিষয়ের দাবি হজরত মুহাম্মদ (স.) করেননি। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ এবং তাঁর বক্তব্য যুক্তি ও ন্যায়সঙ্গত বলে প্রমাণিত হয়েছে। কেননা, কোরানের চেয়ে বড় আর কোনো অলৌকিকতা থাকতে পারে না। (মিরাত অল্-ইসলাম, ইসলাম-দর্পণ, দার অল্-মা’রিফ প্রেস, কায়রো:১৯৫৯, পৃ. ১২২)
তদরূপ কাম নিয়ে বিভ্রান্ত লোকেরা কামচর্চার যেসব কাহিনী রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক কাব্যে বর্ণনা করেছেন, সেসব বিকারগ্রস্ত আতিশয্য ছাড়া আর কী, নিতান্ত বালক শ্রীকৃষ্ণের যৌনস্বপ্ন, পরিমিতিহীন কামক্রীড়ার বৃন্দাবন-লীলা, কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর মায়ের সমতুল্য বয়সের মহিলাদের ক্রিয়াকাণ্ড বীভৎস বিকার ছাড়া আর কি, অতিরঞ্জিত ব্যাপার মানুষের মনকে ধাঁধিয়ে দেয়; এতে বড় জোর মুগ্ধ হওয়া চলে কিন্তু তাতে শ্রদ্ধা জাগায় না। অলৌকিকতা আরও বহু মনীষীকে আমরা পর করে দিয়েছি। শ্রেষ্ঠতম বিজ্ঞানী নোবেল বিজয়ী আইনস্টাইন বলেন, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অলৌকিকতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত সংগ্রাম করে আসছে। এটাই বিজ্ঞানের উন্নতি। (Rationalism, Humanism and Science’, E H Hutten, Question, Pemberton publishing Company Limited, London, No. 1, February 1968, P. 35)। ‘আত্মা-পরমাত্মার যে প্রেম-কাহিনী বুড়োরা প্রচার করেন, আজ বিজ্ঞানের কল্যাণে জানা যায় যে, তা এক ধরনের মানসিক বিকার, ভালোভাবে চিকিৎসা করলে সেরে যেতে পারে; এবং ওষুধ-প্রয়োগে স্নায়ুরোগ (medicine induced neurosis) হলে বা LSD ইত্যাদি খেলে মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে, এবং তখন আত্মা-পরমাত্মার ভালোবাসা বা ঈশ্বরে সান্নিধ্যলাভ, তাঁর দর্শনলাভ ও তাঁর বাণী শোনাও সম্ভব।’ (পার্থিব জগৎ, বড়দিনে যিশুবিদ্বেষ, পৃ.১৬২) ‘প্রাচ্য ও ও পাশ্চাত্যের মিলন প্রয়াসে রামমোহন ছিলেন ভারতীয়দের পথপ্রদর্শক। এক ভারতীয় জাতি নির্মাণের বিরাট ও মহান স্বপ্ন দেখতেন তিনি। হিন্দু ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম—এই তিন ধর্মের তুলনামূলক অধ্যয়ন ও তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা পৃথিবীতে প্রথম শুরু করেন রামমোহন।’ (কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল কাদির, বাংলা একাডেমি, ঢাকা: ১৯৭৬, পৃ.২২-২৩)। ‘ইসলাম রাজনীতি নয়, রাষ্ট্রবিদ্যা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার সংবিধানও নয়। কোরআন ধর্মগ্রন্থ, তা কোনোক্রমে আইনের গ্রন্থনয়। হজরত মোহাম্মদও কোনো আইন-রচয়িতা নন, রাষ্ট্রবিদ্যার জনকও নন। রাজনৈতিক উপদেশ-পরমার্শ কোরান ও হাদিসে নিশ্চয়ই রয়েছে, কিন্তু তা কেবল নৈতিক। সতর্ককারী সুসংবাদদাতা হিসেবেই হজরত পরিচিত, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নন।’ (সূরা গাশীয়াহ্, আয়াত-২১-২৬)। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন—‘ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেননি বরং মানুষ (পুরুষ) তার স্বীয় প্রয়োজনে ঈশ্বর রূপে বিভিন্ন দেশে/ সম্প্রদায়ের ক্ষমতার কেন্দ্র রূপে অধিষ্ঠিত করার জন্য তৈরি করেছে ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান’। নিরেশ্বরবাদী গৌতম আজ তার ভক্তদের কাছে ভগবান রূপে অধিষ্ঠিত। ঠিক তদরূপ লেঙ্গুনিজও ছিলেন নিরেশ্বরবাদী। তিনি আজ তার ভক্তদের কাছে চাইনিজ গড রূপে অধিষ্ঠিত।
শ্রী চৈতন্য দেবের ভাবরসে সিক্ত হয়েছিলে লালন সাঁইজী। তাঁ একটি পদে বলেন—তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে/ তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে… চৈতনিতে অদ্বৈত পাগল নাম ধরে সে। ঠিক তার বাউলধর্ম ও মানবতাবাদের সর্বোচ্চ ধর্মমত হতে পারে আগামী পৃথিবীর কাছে আরেকটি বিস্ময়। আত্মতত্ত্ব যৌনজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ বলে দর্শনের গুরু-গম্ভীর বিষয় চলে এসেছে। মূলত পরকীয়া ব্যক্তি জীবনের এক অসারতা তথা অতৃপ্তকর অধ্যায়ের নাম (আধুনিক সংজ্ঞায়)। যার দায় শুধু পুরুষ-নারীর নয় সমাজ ব্যবস্থার অসারতারও।
দুই.
ভারতীয় দণ্ডবিধি ৪৯৭ অনুসারে পরকীয়ায় মেয়েদের কোনো সাজা হয় না অথচ একই অপরাধে পুরুষদের ৩ বছর জেল হয়ে থাকে! রাষ্ট্র ভেদে পরকীয়ার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শাস্তি বিদ্যমান। বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জিতন রাম মাঝি। এবার পরকীয়া নিয়ে এক মন্তব্য করে নতুন করে ফের বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সোমবার ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জিতন রাম বলেন, ‘৯০ ভাগ পুরুষই অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে ডেটিং করে। ২০১৪ সালের আগস্টে বিবাহিত এক নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে হোটেলে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছিল জিতন রামের ছেলের বিরুদ্ধে। সাক্ষাৎকারে ওই প্রসঙ্গ আসার পর এমন মন্তব্য করেন তিনি। (ইন্ডিয়া টুডে)
ফ্রান্সে নারীদের পরকীয়া প্রেমে উৎসাহিত করার অভিযোগে একটি ডেটিং ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের কয়েকটি সংগঠন। তবে অভিযুক্ত গ্লিডেন্ড নামের সাইটটি বলছে, তারা কাউকে এ ব্যাপারে জবরদস্তি করছে না। এই সাইটের ৮০ শতাংশ গ্রাহকই বিবাহিত (বিবিসি)। আধুনিক ইউরোপ, আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যে যৌনতা কোনো গোপনীয় বিষয় না হলেও সেখানে পারিবারিক বন্ধন না থাকার ফলে শিশুকাল থেকেই সেখানকার বাচ্চারা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতায় ভোগে। যার মূল কারণ বাবামায়ের স্নেহবঞ্চিত হয়ে বড় হয়ে ওঠা।
আর্টের একটি ফর্ম—অ্যাবসট্রাক বা বিমূর্ততা। ‘অ্যাবস্ট্রাকশনের মূল ব্যাপারটা হলো ডিভিশন অব স্পেস, নানা রকম লাইন, ফর্ম, কালার দিয়ে স্পেসটা ব্যালেন্স করা।’ (কথা পরম্পরা-শাহাদুজ্জামান, সাক্ষাৎকার—এস এম সুলতান, পৃ. ২৫) মনজগতের একটি বিকৃতমনের সন্ধি বলা যায়। কেননা বিমূর্ততা ব্যক্তিজীবনের বিষণ্নতা থেকে নিসৃত। সেকারণে একজন ইউরোপের আর্টিস্টের ফর্মে বিমূর্ততা যত বেশি বৈচিত্র্যময় একজন ভারতীয় বিমূর্ততাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মূর্ত করে ফেলে। যার মূল কারণ তার পরিবারিক বলয়ে বেড়ে ওঠা। পারিবারিক দৃঢ় বন্ধন যেমন জীবনকে করতে পারে আলোকিত তদরূপ শিশুসদনে বড় হওয়া উন্নত বিশ্বের পরিবারহীন বা কুমারী মাতাদের সন্তানরা মানসিক বৈকল্য ধারণ করে। একারণেই উন্নত দেশে সন্তান জন্মদানের দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যার মূল কারণ জীবন উপভোগের চাইতে বিষাদে অবতীর্ণ হওয়া; বহুগামিতার সবচেয়ে বড় কুফলও বলা যেতে পারে। ‘পশ্চিমা দেশগুলো যৌনতাকে আবেগবর্জিত করে ফ্যান্টাসাইজড বিষয় হিসেবে চর্চা করে। তাই ফ্যান্টাসি বা কল্পনার মধ্যে যৌনসর্বস্ব হয়ে ওঠে। প্রাচ্যবাসীরা যৌনতার চর্চা করে অবদমনের মধ্য দিয়ে।’ (যৌনতা-পৃ-৩৯)। যৌনজীবনে অতৃপ্ততা থেকে মানবমনে নানাবিদ প্রতিক্রিয়ায় জীবনকে ধাবিত করে। মানসিক হীনমন্যতা, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্ততাসহ নানাবিদ সমস্যায় উপনীত হয়। পরকীয়াও তেমনি একটি বিষয়। যা মানসিক অতৃপ্তবোধ থেকে উৎসারিত। ভালোবাসা বা প্রেমের অতঃস্পর্শকারী নর-নারী বহুগামিতা তো দূরের কথা তারা স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন নারীর সঙ্গে যেতেই পারেন না। তবে এরূপ প্রেমের সংখ্যাও বিরল। একজীবনে এরূপ প্রেমের নাগাল খুব কম মানুষই পায়।
ভারতবর্ষে যৌনতা একটি অতিগোপনীয় কর্ম। অথচ ১৯৯১ সালে ভারতের একটি প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক গৌতম বুদ্ধ ও মহাত্মা গান্ধীর মতো দশজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের মধ্যে ভগবান শ্রী রজনীশ (১৯৩১-১৯৯০) -এর নাম উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর অবদান—‘ধর্মীয় গোঁড়ামি ও রক্ষণশীলতার শৃঙ্খল থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনকে মুক্ত করা।’ তাঁর বিশ্রুত অনুরাগীদের মধ্যে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বিখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিং উল্লেখযোগ্য। ভগবান শ্রী রজনীশ তাঁর গ্রন্থে ‘যৌনতা’র কামকে কলারূপে দেখিয়েছেন। যেমন—যৌনতা হওয়া উচিত খেলাচ্ছল এবং প্রার্থনাময়।’ তিনি যৌনতার গভীরে প্রবেশের উপায় দেখিয়ে তাকে অতিক্রম করারও পথ দেখিয়েছেন। ভারতে যৌনতা সম্পর্কিত প্রাচীনতম গ্রন্থ বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’। তিনিই পৃথিবীর প্রথম যৌনতত্ত্ববিদ যিনি যৌনতার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতাকে যুক্ত করেন; তিনিই প্রথম দার্শনিক যিনি যৌনতার গভীরতম কেন্দ্রগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছেন। (যৌনতা, পৃ-৪৩)
স্বামীকে পরকীয়া থেকে বাঁচানোর কৌশল নারীদের শিক্ষা দেওয়া নিয়ে অনেক লেখালেখি হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। কিন্তু স্ত্রীকেও যে পরকীয়া থেকে বাঁচানোর কৌশল পুরুষদের জানা দরকার সে বিষয়ে কেউ কথাই বলে না। যেন এই কৌশল সেখার কোনো দরকারই নেই পুরুষদের! স্ত্রী পরকীয়ায় আসক্ত; এমন খবর যেকোনো স্বামী জানতে পারলে প্রচণ্ড হতাশ ও রেগে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রেগে যাওয়া মারপিট করলেই কি এর কোনো সমাধান হবে? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রেম-ভলোবাসা ও বোঝাপড়ার সম্পর্ক। কাজেই বিয়ের মাধ্যমে বন্ধনে আটকে গেছে বলেই যে এটা কাঁঠালের আঠার মতো আটকে রাখবে ভালোবাসার বন্ধন—এমনটা ভাবা বোকামি। একবার বিয়ে করেই এই সম্পর্ককে শুধু ছেড়ে দিলেই হবে স্রোতের দিকে। বরং একে লালন করতে হবে উভয়কেই (অনামিকা চক্রবর্তী, ২৬.০৬.২০১৫ অনলাইন নিউজ ‘মহীয়সী’)।
‘পরকীয়া একটি সামাজিক ব্যধি। ঘুণপোকা যেমন কাঠের স্থায়িত্ব ভঙ্গুর করে দেয় ঠিক তেমনি পরকীয়া বিবাহিত সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে দেয়।’ (১১.০৫.২০১৪ হেলথ বার্তা)
মানবসমাজে এটি লঘু বা গুরুভাবে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য। পাশ্চাত্য আধুনিক সমাজে এর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বজায় থাকলেও এটি আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরকীয়াকারী ব্যক্তির বিবাহিত সঙ্গী তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য কোর্টে আবেদন করতে পারেন। তবে ইসলামি রাষ্ট্রগুলোয় এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা হলো পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড। মনোচিকিৎসায় একথা স্বীকৃত যে, বাবা-মায়ের পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষণ্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়। এছাড়া পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিতে পরকীয়া প্রভাব রাখে। পরকীয়ার অন্যতম কারণ যৌনজীবনে অতৃপ্তি ও বিবাহিত জীবনের একঘেঁয়েমি। আবার অনেক সময় ব্যক্তির শৈশবে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা কিংবা বাবা মায়ের অসফল দাম্পত্য জীবনও প্রভাব ফেলে। পরকীয়ার অনেকটাই নাকি মোহ, এক ধরনের অবসেশন। মোহ ভঙ্গ হতেও দেরি হয় না। তখন আবার অতৃপ্তির শুরু। যা পেয়েও হারিয়েছি তা আবার ফিরে পাওয়ার তৃষ্ণা। অনেক পরকীয়া প্রেমেরই পরিণতি তাই অনুতাপে। (শান্তা মারিয়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ২০১৫-০৬-১০ ১৬:১৭:২১)। যৌনতার উদ্ভব আবিষ্কার পৃথিবীতে যৌনক্রিয়ার উদ্ভব কবে হয়েছিল সে ব্যাপারে সুনিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলেও সম্প্রতি বিজ্ঞানিরা দাবি করেছেন—এক ধরনের মাছ প্রথম যৌনক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম দিয়েছিল। বিবিসি জানিয়েছে, মাইক্রোব্রাচিউস ডিক্কি নামের ছোট এক ধরনের মাছ প্রথম সন্তান উৎপাদনে যৌনক্রিয়া পদ্ধতির ব্যবহার করে। মাইক্রোব্রাচিউস ডিক্কি মাছেরা ৩৮ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে স্কটল্যান্ডে বসবাস করতো। মাছ জুটিরা কীভাবে পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে যৌনক্রিয়ায় মিলিত হতো তা অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে সম্প্রতি এই আবিষ্কারের বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে (সূত্র: বিডিনিউজ)।
মানবজীবনে মাত্র দু’টি জাতি; ১.নারী ২.পুরুষ। ভগবান শ্রী রজনীশ বলেছেন, ‘পুরুষ মোটেই চিন্তা করে না যে নারীর শরীর ভিন্ন প্রক্রিয়ায় সাড়া দেয়, যা পুরুষের ঠিক বিপরীত।… নারীর যৌনতা অনেক বেশি সম্পন্ন ও সম্প্রসারিত: তার সমস্ত শরীরকে এতে সম্পৃক্ত হতে হয়। শৃঙ্গারকলার মধ্য দিয়ে তাকে উষ্ণ করা উচিত, যতক্ষণ নারী তার গভীরে তরঙ্গে তরঙ্গায়িত না হয়।
তিন.
‘জন্মগতভাবেই নারীরা প্রেমে অত্যন্ত বিশ্বস্ত, একগামী। পুরুষদের প্রেম স্বেচ্ছাচারী বহু অভিজ্ঞতাপূর্ণ।’ একই প্রবন্ধের একই পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন—‘নারীরা ঝঞ্ঝাটহীন নির্মল প্রেমকে পূজা করে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা করে রোমাঞ্চপূর্ণ নিষিদ্ধ প্রেম। (নারীর প্রেম: নাসরিন জাহান, ‘নারীর প্রেম ও তার বিচিত্র অনুভব’ পৃষ্ঠা-৯)। পাঠক লক্ষ করুণ কি স্ববিরোধী যুক্তি। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার আগে আরও দুটি উদাহরণ দিই এই বইয়ের, যেমন—বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাবতীয় বিষয় মেয়েরা স্পর্শ করে অনুভূতি দিয়ে। এ জন্যই আর সব ছাপিয়ে তার মধ্যে প্রখর হয়ে ওঠে তার ইন্দ্রিয়। মন হলো তার বাঁচার প্রধান অস্ত্র, পুরুষদের মধ্যে শরীর এবং মন দুটো বিষয় আলাদাভাবে কাজ করতে পারে। এ জন্যই সে যত্রতত্র নিজের দেহকে স্থাপন করতে পারে। কিন্তু একজন নারী মনবহির্ভূতভাবে কোথাও নিজের দেহকে স্থাপন করতে পারে না।’ (নারীর প্রেম- পৃষ্ঠা-৮)।
উল্লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হতে পারলাম না। যে কারণে পারলাম না তা হলো, নারী ও পুরুষ কিছু শারীরিক পার্থক্য নিয়ে জন্ম নেওয়ার ফলে কিছু ব্যত্যয় পরিলক্ষিত; যেমন জন্মগতভাবে পুরুষের মেরুদণ্ড নারীর চেয়ে শক্ত। যার ফলে শারীরিক শক্তির দিক থেকে নারী অপেক্ষা পুরুষ বেশি পেশীশক্তির অধিকারী। এ কারণে সে সর্বদা নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে ধর্ম একটি বিশেষ ভূমিকা তৈরি করে দিয়েছে। যেমন—বিবাহিত হিন্দু নারীর সিঁদুর ও শাঁখা হিন্দু নারীকে একটি পুরুষতাত্ত্বিক চিহ্ন রূপে নারীকে বিশেষায়িত করার প্রচেষ্টা; যা পুরুরষের ক্ষেত্রে নেই।
পুরুষতান্ত্রিকতার কারণে তাই সব ধর্মেই মানুষের মানুষের মন খোদার পুত্র, অতিমানব, দেবতা, অবতার প্রভৃতির দ্বারা এতই আচ্ছন্ন হয়ে গেছে যে তারা মানুষ সেটাই তার মানুষ সতর্ককারীর বক্তব্য শুনতে অপারগ হয়ে পড়ে।’ নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদ। (পূর্বকথা-পৃ.-১১)।
প্রকৃত অর্থে পরকীয়ায় আসক্তির মূল যে বিষয়টি, সেটা হলো মনস্তাত্ত্বিক। যার বিস্তারিত তথ্য ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আমরা পাই ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণে। ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ চিকিৎসা বিজ্ঞান-ই শুধু নয়, পুরো চেতনার প্রতিটি স্তরকে অতিসূক্ষ্মভাবে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দ্বারা এত বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে যে, এর ফলে শুধু মানবমনের যেমন বৈপ্লবিক চেতনাকে ধরতে পেরেছে, তেমনি বিশ্বসাহিত্য এবং সমাজ ব্যবস্থার ( বিশেষ করে ইউরোপে) একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
ইংরেজ ঔপন্যাসিক লরেন্স (১৮৫০-১৯৩০) কামকে বুদ্ধির চেয়ে বেশি প্রধান্য দিয়েছেন। যা নির্ঘাত জ্ঞান ও বুদ্ধির অবমাননা। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তার ভারতীয় দর্শন-এ বলেছেন—‘নিজের মতবাদটি ব্যক্ত করার পূর্বে ভারতীয় দার্শনিক সাধারণত সুদীর্ঘভাবেই অন্যান্য মত বা বিরুদ্ধ মত ব্যাখ্যা করেন। তাঁর নাম পূর্বপক্ষ এবং এই পূর্বপক্ষটি খণ্ডন করার পরই তিনি নিজের মত ব্যক্ত করেন। তার নাম সিদ্ধান্ত’।
আত্মায় ও জড়ে যে বাস্তবিক জাতিগত প্রভেদ আছে, তাহা নয়। তা অবস্থাগত প্রভেদ মাত্র। আলোকে ও অন্ধকারে এতই প্রভেদ যে মনে হয়, উভয়ে বিরোধীপক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞান বলে আলোকের অপেক্ষাকৃত বিশ্রামই অন্ধকার এবং অন্ধকারের অপেক্ষাকৃত উদ্যমই আলোক। তেমনই আত্মার নিদ্রাই জড়ত্ব এবং জড়ের চৈতন্যই আত্মার ভাব।
ফ্রান্জ কাফকা তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণসমৃদ্ধ ‘মেটামরফোসিস’ বা রূপান্তর গল্পে মানুষের জীবন, কর্ম ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, দুঃস্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা ও অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ যেমন স্থাপনে ব্যর্থতা; নিজেকে অন্যের কাছে স্পর্শ করে তোলার অক্ষমতা নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভয়, ভাবনার কথা অন্যকে কিছুতেই বোঝাতে না পারা; মানুষের চরম ঔদাসীন্য ও নিস্পৃহতা ইত্যাদি ব্যক্ত করেছেন। (রূপান্তর ভূমিকা পৃ.৮ অনুবাদ: কবীর চৌধুরী)। কোলরিজের দুঃস্বপ্নের স্মৃতি-তাড়িত অদ্ভুত এককাহিনী বর্ণনা করা বৃদ্ধ নাবিকের কথা যেমন স্মরণ করিয়ে দেয় ঠিক তদরূপ মনে করিয়ে দেয়—‘বিবর্তনবাদের স্রষ্টা প্রিন্স ডারইউন-এর মতবাদ-ই খ্রিস্টান ধর্মকে দুই ধারায় বিভক্ত করে। তাই তো কাফকা, প্রিন্স ডারইউন এর পরে-ভগবান শ্রী রজনীশ (১৯৩১ জ.-১৯৯০ পৃ.) পৃথিবীতে তাঁর এই অবস্থান কালকে বলেছেন, ‘ভ্রমণ’। লেখা সম্পর্কিত আমার উপলব্ধি হলো, আমি যখন তাঁর হয়ে যাই, তখন লিখি। তার আগে পড়ি। এখানে পড়াটা মৈথুন আর লেখাটা চরম পুলক। লেখালেখি ধ্যানস্থ বোধের চূড়ায় যাপনের চূড়ান্ত মৈথুন। জেগে থাকা প্রতিটি মূহুর্তের একটি স্খলন।
ভগবান শ্রী রজনীকান্ত যেমন যৌনতার স্বরূপকে ত্যাগ করে অপরূপকে আত্মস্থ করে এক আমির মধ্যে আরেক স্ত্রী আমি সম্মিলন ঘটিয়ে আমার আমিকে স্থিতিস্থাপক রূপে স্থাপন করার কথা বলেছেন। প্রকৃত অর্থে যৌনতার ভেদ বৃত্তান্ত বোঝার পাঠকের বা নিগূঢ়তা ধারণ করার বাহক-ই বা কজন আছে।
একটি ছোট্ট পাদটিকার মাধ্যমে শেষ করছি। প্রতিটি বৈবাহিক সম্পর্কই বৈধ সম্পর্ক তা আমি স্বীকার করি না। কেননা, একটা মানুষের সঙ্গে আরেকটা মানুষের মনের সম্পর্ক-ই হলো প্রকৃত সম্পর্ক। শ্রী রজনীশ ‘শরীরের বিষয়ে বলেছেন—নারীর সম্পূর্ণ শরীরবৃত্ত, সম্পূর্ণ মনোবৃত্ত, চেতনার প্রতিটি স্তর পুরুষের চাইতে ভিন্ন। শুধু ভিন্ন-ই নয়, একেবারে বিপরীতে। চুম্বক বিপরীত মেরুতেই আকর্ষণ করে। এটা ভুলে গেলে চলবে না, সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন (উন্মুক্ত শব্দ তরঙ্গ থেকে ইথার) মিডিয়া থেকে প্রতিমিডিয়া মানুষের অতি নিকটে আসায় মনোস্তাত্ত্বিক একটা বিরাট পরিবর্তনও হয়েছে আমাদের সমাজে, তবে আধুনিক ইউরোপের মতো আগামীর ভারতবর্ষও যৌনতা থেকে মুক্তি পাবে না। বরং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ফলে সাধারণদের বহুগামী করে তুলবে। সেদিন বেশি দেরি নয়। তখন সামন্তবাদী চেতনা থেকে ভোগবাদী চেতনায় একজন নারীকে নারী হতে বাধ্য করতে পারবে, পুরুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রতিটি পুরুষের ভেতরে যেমন একজন নারী লুকায়িত আছে ঠিক তেমনই নারীর ভেতর আছে একজন পুরুষ। উদাহরণটা যদি এমন হয়—আমরা যাপিত জীবনে অনেক পুরুষের মেয়েলী স্বভাব আর নারীর পুরুষালী স্বভাব লক্ষ করি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত