নিয়নের ধূসর আলো

আজ ২২ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক, আলোকচিত্র শিল্পী ও পর্যটক শাকুর মজিদের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


খটখট করে দরোজায় শব্দ হয়। এক এক করে তিনবার। দুপুরে খেয়ে শুয়েছি। এই সময়টাতে সাধারণত কেউ আসে না। এলেও এমন বিশ্রী শব্দে কেউ দরোজায় আঘাত করে না। বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছা হলো না।
জিজ্ঞেস করলাম, কে?
জবাব নাই।
আবারো খটখট শব্দ।
বিরক্তি চেপে দরোজা খুলেই দেখি বাবা এসেছেন। বরকত আর জুয়েল পাশের বিছানায় ঘুমাচ্ছে। বাবা রুমের ভেতরে পা ঢুকিয়েই বললেন, তোর রুমে ফ্যান নাই? একটা ফ্যান কিনতে পারিস না?
বাবা গরমে ঘামছেন। বোধহয় কমলাপুর থেকে হেঁটেই চলে এসেছেন। বললাম, আপনি এখানে বসুন। আমি পাশের রুম থেকে নিয়ে আসছি।
কার ফ্যান আনবি?
আমার ফ্রেন্ড। কিচ্ছু হবে না, আপনি বসেন।
হঠাৎ বাবার ঢাকা আগমন এবং ঠিক আমার কাছে ব্যাপারটা আমাকে কিঞ্চিত চিন্তিত করে। আমি কারণটা জানার জন্য উঠেপড়ে লাগলাম। প্রসঙ্গ শুরু করার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ির সবাই ভালো?
বাবা এ কথার কোনো গুরুত্ব দিলেন না। মুখের জ্যামিতি এমন আকার ধারণ করলো যাতে বোঝায় এটি একটি গুরুত্বহীন প্রশ্ন, যার সঠিক জবাবের আদৌ কোনো প্রয়োজন নাই। বাবাকে আর বিরক্ত করার ইচ্ছা হলো না। আমি চুপ করে চেয়ারে বসে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিলাম। বাবা ব্যাগ খুলে একটা লুঙ্গি বের করলেন। প্যান্ট খুলে স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে বললেন, তোদের মেসে ভাত পাওয়া যায় না? আমি দুপুরে কিছু খাইনি।
ভাত হবে না, অন্য কিছু নিয়ে আসি? ভাত খেতে চাইলে চলেন, পলাশীর মোড়ে হোটেল আছে, খেয়ে আসবেন।
আমি যাবো না, তুই দুইটা কলা নিয়ে আয় সাথে বনরুটি হলে চলবে। তোর কাছে টাকা আছে তো?
আছে।
বাবা কলা খেতে খেতে বললেন, বাবর, আমি ঢাকা এসেছি একটা কাজে। তোর এখানে কিছুদিন থাকা যাবে?
খুব অসুবিধা হলে যাবে। কেন, কিছু হয়েছে?
বাবা খুব অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ। তাকে সাধারণত কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন হয় না কখনো। কখনো প্রশ্ন করে কেউ ভালো কোনো জবাব তার কাছ থেকে পাবেন না, এটা সবাই জানেন। জাগতিক কোনো কিছু সম্পর্কে তার আগ্রহ কোনোকালে ছিল না। জীবনে কোনোদিন দু’ টাকা রোজগার করেছেন বলেও শুনিনি। চাচা চাকরি করতেন এবং দুটো সংসার চালাতেন, আমাদের লেখাপড়া করাতেন। আমাদের দাদা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক জমিজমা রেখে গেছেন। দাদা মারা যাবার পর চাচাই বাবাকে চাকরিবাকরি ধরার জন্য বলতেন। মার প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে বাবা কখনো বাড়ি ছাড়তেন না। একদিন দু’ ভাই ঝগড়া করে জমিজমা সব ভাগাভাগি করে নিলেন। চাচা সব জমি বিক্রি করে ঢাকা শহরে বাড়ি বানালেন। গুলশানে। এখন বেশ বড় একটা ব্যবসা আছে তার, কিন্তু কীসের ব্যবসা আমি জানি না। চাচা আলাদা হয়ে ঢাকা চলে আসেন। বাবা তখন বছর বছর জমি বিক্রি করে আমাদের বড় বড় রুই কাতলা খাওয়াতে খাওয়াতে সব জমি শেষ করলেন।
আমরা সাত ভাইবোন। আমি চার নম্বর। আমার বড় দুই ভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকেন। বোন তিনটির বিয়ে হয়েছে, বিয়ের সিরিয়াল এখন আমার। বাবা বলে দিয়েছেন তিনি বিয়ে দিতে পারবেন না, আমি নিজেই যেন এ কাজটা শেষ করি। ছোট তিন ভাইকে নিয়ে মা থাকেন গ্রামের বাড়ি। বাবা যাযাবর জীবনযাপন পছন্দ করেন। কখনো বড় ভাই, কখনো মেঝ ভাই, কখনো বা বোনদের বাড়ি পালাক্রমে তার ঘুরে বেড়ানো। মেঝভাই ইঞ্জিনিয়ার। তার বৌ বাবাকে পছন্দ করে না। মেঝ ভাইয়ের ওখানে বাবা এখন একেবারেই যান না। কিছুদিন আগে আমাদের উপার্জনক্ষম দু ভাই চাকরি নিয়ে বিদেশ চলে গেলেন। মেঝভাই বউ নিয়ে আর বড় ভাই বৌ শ্বশুরবাড়ি রেখে। বাবা কি তাই আশ্রয় নিয়েছেন আমার হোস্টেলে?
ঢাকা শহরে অবশ্য বাবার আরেকটি জায়গা ছিল। ছোট চাচার বাসা। গুলশানে। বাবা যাননি। আমি জানি বাবা ওখানে যাবেন না। ছোট চাচী একদিন বাবাকে চাকরদের ঘরে শুতে বলায় বাবা সেই রাতে ঢাকা থেকে বাড়ি চলে যান। তারপর দশ বছর পর এই ঢাকায় আসা।
বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোর চাচার সাথে দেখা হয়রে?
না, মাঝে মাঝে ঝুনকা হলে ফোন করে।
ঝুনকা? ঝুনকা কে?
ছোট চাচার মেয়ে। এবার এসএসসি পাশ করেছে, থার্ড ডিভিশন। তুমি চেনো না?
বাবা কথা না বলে চুপ করে থাকেন। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না। আবার চাচার প্রসঙ্গ আওড়ান।
তোর চাচা তোকে টাকাপয়সা দেয় না?
প্রশ্নের ধরনটা এমন যে বাবা চাচার কাছে অনেক টাকা জমা রেখেছেন। যেখান থেকে প্রতি মাসে আমাকে হাজার দু হাজার দেয়ার কথা। বাবা এখন আমার অতিথি। সুতরাং আমি তাঁকে কথা শোনাতে পারবো না। স্বর যতটা নরম করা সম্ভব ততটা নরম সুরে বললাম, ঝুনকাকে পড়াতে বলেছিলেন। মাসে দেড় হাজার দেবেন।
পড়াসনি কেন?
ওর মাথায় কিছু নেই বাবা। সেনটেন্সের মাঝখানে ক্যাপিটাল লেটার বসিয়ে দেয়।
মাথায় কিছু না থাকলে মেট্রিক পাশ করে কী করে? মেট্রিক পাশ করা কি যেই সেই কথা?
বাবার কথা শুনে মনে হলো চাচার প্রতি তার বরফ গলে একেবারে পানি। তিনি বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চাচা, ঝুনকা, রুনকার কথা পাড়ছেন। খেয়াল করলাম, চাচীর কোনো প্রসঙ্গ তিনি তুলছেন না। আমি চাইলাম, বাবা যদি কোনোভাবে চাচার ওখানে চলে যান তবে আমি বাঁচি। সে পথে এগোতে গিয়ে হালকাস্বরে বাবাকে বললাম, চাচাকে কি ফোন করবো বাবা? আমার কাছে কয়েন আছে।
বাবা গর্জে ওঠেন। এ কাজটা তিনি খুব ভালো পারেন। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে রেগে যান। গোৎ গোৎ করে বলেন, কেন? তুই ফোন করবি কেন?
বুঝলাম, এ যাত্রা আর হবে না।
বললাম, আপনি এখন বিশ্রাম নিন। আমি পাশের রুমে ঘুমুচ্ছি।
পাশের রুমে মাহতাব থাকে। মাহতাবের কাছে যেতেই বললো, খোঁড়া-মন লোকটা কে রে!
খোঁড়া-মতন? খোঁড়া হতে যাবে কে আবার?
ঐ যে কিছুক্ষণ আগে একটা লোক তোমাদের রুমে ঢুকলো না? আগে আমাদের দরোজায় গুতোগুতি করেছিল তেমার কথা বলতে ঐ রুমে পাঠালাম। রুম নাম্বার ভুলে গেছেন, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। কে হয় তোমার?
মাহতাবের রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি বাবা নাক ডাকাচ্ছেন। আদৌ ঘুমিয়ে পড়েছেন কিনা জানার জন্য আস্তে করে ডাকলাম, বাবা।
বাবা চোখ খুললেন।
আপনার পায়ে কি অসুখ? আপনি নাকি খোঁড়াচ্ছিলেন?
বাবা উঠে বসেন। শোয়া থেকে ওঠার সময় তিনি শিরদাঁড়া সোজা রাখার চেষ্টা করলেন। তারপর সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় যা বললেন তার সারাংশ এই- তাঁর কোমরে প্রচÐ ব্যাথা, বসা কিংবা শোয়া থেকে উঠতে কষ্ট হয়, স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও সম্ভব হচ্ছে না। বাম পা বাঁকা করতেই ব্যথা লাগে, টেনে টেনে হাঁটতে হয়। অত:পর বাবার কথা, তিনি ঢাকা এসেছেন নিরুপায় হয়ে, চিকিৎসা করাবেন। খুলনার এক ডাক্তার বলেছে প্যারালাইসিস পর্যন্ত হতে পারে, এটা যদি লাম্বাগো সায়াটিকা হয় তবে তার চিকিৎসা ওখানে নেই। তিনি যে করেই হোক এই চিকিৎসা এখানে করাবেন এবং তার ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে, তার পকেটে কোনো টাকা নেই।
বাবাকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলা গেলাম ডাক্তারের কাছে। স্পাইনাল ইনজুরি থেকে এ ধরনের রোগ হতে পারে। বাংলাদেশের এক নম্বর নিউরোসার্জন, বাংলামটরে বসেন। দেড়শ টাকা ভিজিট। ঠিকানা বের করে তার চেম্বারে গিয়ে হাজির হলাম।
ছোট ছোট দুটো কামরা। ভেতরে ডাক্তার সাহেব বসেন। বাইরের ঘরটিতে মানুষে ঠাসা। দুটো বেঞ্চি আড়াআড়ি করে রাখা। তার কোথাও বসার জায়গা নেই। ঘরের এক কোনে একজন মহিলা দুই হাতে মাথা ধরে মৌমাছির মতো একটানা ভনভন শব্দ করে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তার একপাশে ছোট টেবিলের পাশে টুলের উপর বসে এক ছোক্রা কাগজের টুকরায় কী সব লিখছে। ভেতরের কামরা থেকে এক লোক বেরুতেই পর্দা ঠেলে যেই না ভেতরে যাবার জন্য পা দিয়েছি অমনি ছোকরাটি বাবার ডান হাত ঝাপটে বলে, কই যান?
ছেলেটির গালে একটা চড় বসাতে ইচ্ছা হলো। ক্রোধ চেপে বললাম, কেন? ডাক্তার সাহেব ভেতরে নাই?
আছেন। লিস্টে নাম আছে?
না।
আগের সিরিয়াল আগে। বসেন, সবাই শেষ করলে ডাক্তারের সময় হলে দেখবেন। না হলে নাম লেখাই যান, কাল বন্ধ পরশু আইসেন।
বাবা ফিসফিস করে বললেন, দশটা টাকা দে ওকে। ছেলেটা চা নাস্তা খাবে।
সেদিন ডাক্তার বাবার পায়ে, পিঠে, কোমরে সুঁচ টিপে টিপে কী সব পরীক্ষা করলে। একটা কাগজে কিছু লিখে আরেকটা ভিজিটিং কার্ড হাতে ধরিয়ে বললেন, এই ল্যাবরেটরি থেকে এই এক্সরে গুলো করিয়ে নিয়ে আসুন, আপনার কেসটা জটিল মনে হচ্ছে, অপারেশন করাতে হতে পারে। যান।
ডাক্তারের শেষ কথাগুলো আমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হলো। মনে হলো ‘অপারেশন’ কথাটা ডাক্তার শুধু শুধুই বলেছেন। আসলে অপারেশন-টপারেশন লাগবে না। আমি ব্যাপারটা খোলাসা করার জন্য কণ্ঠে যথেষ্ট নম্রতা রেখেই প্রশ্ন করলাম, স্যার, অপারেশন কি করাতেই হবে?
বড় বড় ডাক্তার বদমেজাজি হন। এটা আমার জানা ছিল। দেখি এই ডাক্তারও কটকটে চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। ডাক্তার বললেন, আমার কথাটা আপনি বুঝতে পারেননি? আমিতো বাংলায়ই বলেছি!
জ্বী, জ্বী, পেরেছি, পেরেছি। ¯øামালাইকুম।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাবা বললেন, একটা সিগারেট কিন।
সিগারেট কিনে, রিকশা নিয়ে গ্রিন রোডের এক ল্যাবরেটরিতে এক্সরে করালাম। হলে ফেরার পথে বাবা রিকশায় বললেন, ঢাকার ডাক্তাররা খালি পয়সা খরচায়। একবারে ওষুধ দিতে চায় না, এটা একটা টিরিক্স, বুঝলি? এই ডাক্তার বাদ দে আরেক ডাক্তার ধর, ট্যাবলেট দিতে বলিস।
পরদিন দেড়টায় ক্লাশ শেষ করে দেখি বাবা বাইরের বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসে পা দোলাচ্ছেন। আমাকে দেখে খুশি খুশি মনে বললেন, বিকালে তোর কোথাও যাওয়া আছেরে?
কেন? আছে।
কোথায়?
একটা টিউশনি করাই, ওখানে যাবো।
আমি ভাবছিলাম একটু পার্কে যাবো। রমনা পার্কে হাওয়া খাবো।
টিউশনিতে যাবার সময় তোমাকে ওখানে নামিয়ে যাবো।
নিয়ে আসবে কে? আমি কি পথ চিনে আসতে পারবো, হাইজ্যাক হয় না?
আপনাকে কেউ হাইজ্যাক করবে না বাবা। রিকশা নিয়ে সোজা হলে চলে আসবেন।
বাবাকে পার্কের গেটে নামিয়ে বিশ টাকা হাতে ধরিয়ে রিকশা নিয়ে চলে আসি শান্তিনগর। শান্তিনগরের মোড়েই চন্দ্রাদের বাসা। চন্দ্রা দেখতে সুন্দরী, আচরণে ভদ্র। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মেট্রিকে লেটার। আমি ওকে সপ্তাহয় ৩ দিন পড়াই এবং মাসের এক তারিখে দেড়টি হাজার টাকা পাই।
চন্দ্রার বাবা এদেশের নামকরা ব্যক্তিত্ব। একনামে সবাই চেনে। একাত্তরে তিনি বিশাল মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পঁচাত্তরের পর দল ছাড়লেন। জিয়া সরকারের সাথে তার অনেক দহরম মহরম ছিল। কিন্তু মন্ত্রী হতে পারেন নি। এরশাদ তাকে মন্ত্রী বানাবে এমন একটা আশা তিনি পেয়েছেন। আমাদের হলের সবাই তাকে এক নামে চেনে। কিছুদিন আগে তাকে মন্ত্রী করিয়ে আবার পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আমার সুবিধা এই যে আমি ঐ লোকের মেয়েটিকে পড়াই তা আমার হলের কেউ জানে না। লোকটিকে আমি অন্তর দিয়ে ঘৃণা করি। যেমন করে চন্দ্রাও, কিন্তু আমি তা প্রকাশ করতে চাই না। এ কারণে যে মাসের শেষে দেড় হাজার টাকার আমার খুব প্রয়োজন।
চন্দ্রা মেয়েটি চমৎকার। বয়স সতেরো কি আঠারো, মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। রাজনীতিতে বার বার দলবদল করার কারণে তার আত্মীয় স্বজনরাও খুব খুশী নয়। বন্ধুরাও নানা রকম কথা বলে। এ কারণেমেয়েটির ভাষায় অনাত্মীয় কারো মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে তার খুব আপন মনে হয়।
আজ ঘরে ঢুকতেই বললো, আজ পড়বো না।
কেন?
দুটো কারণে। প্রথমত আজ বাসায় কেউ নেই। পড়ছি কি গল্প করছি দেখার কেউ নেই। দ্বিতীয়ত আজ আপনার মন খারাপ, আপনি যে কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, আপনিও পড়াতে চাইছেন না। কী, সত্যি বলিনি?
চন্দ্রা, তুমি এতো সহজে আমার ভেতরটা দেখলে কী করে?
একদিনে তো বুঝিনি, অনেক সাধনা করে জেনেছি।
কী জেনেছো?
আপনি মানুষটা খুব ভালো।
কী করে বুঝলে?
আপনি মানুষকে খুব ভালোবাসেন।
তাই কি মনে হয়?
গতকাল সন্ধ্যায় আমরা ফার্মগেট যাচ্ছিলাম। বাংলামটরের কাছে দেখি একজন আধবুড়ো খোঁড়া লোককে আপনি হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছেন। এ কাজটা ক,জন পারে, বলুন?
চন্দ্রাকে তার জবাবে কী বলবো বুঝতে পারলাম না।
একবার ভাবলাম, সত্য কি লুকানোর জিনিস? পরে ভাবলাম, বলেই বা লাভ কী?
চন্দ্রা বললো, কী ভাবছেন?
তোমার কাছে কিছু টাকা হবে?
আমার কাছে তো টাকা থাকে না। তবে যোগাড় করতে পারি। কত?
আমার বেশকিছু টাকার দরকার হতে পারে।
আমি আপনাকে অনেক টাকাই দিতে পারি। কিন্তু টাকাটি আপনি নেবেন?
কেন নেবো না?
ওটাতো চুরির টাকা, ডাকাতির টাকা।
ও।
বাবর ভাই?
বলো?
মানুষ কেনো এতো বেশী ক্ষমতাবান হতে চায়? ক্ষমতা মানুষকে কি দেয়?
হঠাৎ এই কথা কেন?
এমনি বলছিলাম। ও, আমাদের একটা খবর আছে।
কী খবর?
আমরা আবার মিন্টো রোডে যাচ্ছি। বাবাকে কেবিনেটে ডাকা হয়েছে। একেবারে ফুল মিনিস্টার। বাবাকে না হলে বড় সাহেবের লাইন কাটা পড়ে যায় তো, তাই!

সেদিন চন্দ্রাকে আর কিছু পড়ানো হয়নি।
পরদিন এক্সরে রিপোর্টগুলো নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম। রিপোর্টে চোখ দিয়েই ডাক্তারের কপালে ভাঁজ দেখা দিলো। ডাক্তার গম্ভীরস্বরে বললেন, অপারেশন লাগবে, দেরী হলে প্যারালাইসিসও হয়ে যেতে পারে। যে কোনো ডাক্তারকে দিয়েই করাতে পারেন, আমার কাছে করালে ওর সাথে কথা বলুন।

আমরা আবার ছোকরার কাছে এসে হাজির হই। আজ তার অন্য রূপ। বাবা আগে থেকেই দশ টাকা দিয়ে রেখেছেন। ডাক্তারের কাগজটা হাতে নিয়েই হাসিমুখে বললো। অপারেশন? নো প্রবলেম, খুব ভালো ডাক্তার, মাত্র সাতদিন লাগবে তারপর ঘোড়ার মতো দৌড়াতে পারবেন। কালই ভর্তি হয়ে যান। হাজার পনেরো বিশেক হলে হয়ে যাবে চিন্তা কইরা দেখেন, পরে যোগাযোগ কইরেন। ¯øামালাইকুম। নাম্বার ফোরটিন, আব্দুর রহমান, আপনি যান।
চেম্বার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকি। কোথায় যাবো ঠিক করতে পারি না। একটা রিকশা ডেকে থামালাম। কই যাইবেন? রিকশাওয়ালা প্রশ্ন করে।
পলাশী।
আহেন।

রিকশায় উঠে ভাবলাম, চন্দ্রার বাসায়ই যাবো। রাত এখন ন’টা। চন্দ্রারা কি খেতে বসেছে? কিন্তু কাল চন্দ্রার বাসায় যাওয়া নেই। পরশু গেলে যে দেরী হয়ে যাবে?
এই যে ভাই, শান্তিনগরের দিকে যানতো।
রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়। একবার পলাশী, একবার শান্তিনগর। যাবেন কোথায় ঠিক করেন আগে।

রিকশা পলাশীর মোড় ঘুরিয়ে শান্তিনগরের পথ ধরলো। বাংলামটর থেকে ভিআইপি রোডটিতে এখন আর রিকশা চলে না। সন্ধ্যা হতেই রাস্তার দু পাশের ল্যাম্পপোস্টগুলো নিয়নের আলোয় সেজেছে। তারই স্বর্ণাভ আলো পড়ে রাস্তার উপর। রাস্তা ধরে চকচকে গাড়িগুলো শোঁ শোঁ শব্দ তুলে যায়। আমি বিস্ময়ের সাথে সে আলোর ধূসর আভার দিকে চেয়ে থাকি।

১৯৯০ সালে বুয়েটের ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় এ গল্পটি প্রথম পুরস্কার লাভ করে। তিতুমীর হলের বার্ষিকীতে প্রকাশিত হয়। এ গল্প নিয়ে ২০০৪ সালে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় এটিএন বাংলায় ‘জনক, বাবর ও চন্দ্রা’ নামে ঈদের নাটক হিসেবে প্রচারিত হয়।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত