শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু চেতনা

যেতে পারি,
যেকোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?
__________________________
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রয়াণ দিবসে ইরাবতীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। পাঠকদের জন্য রইল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুচেতনা বিষয়ক একটি প্রবন্ধ।

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৩-‘৯৫) ইহলোকে আমাদের মাঝে আজ আর নেই একথা নিশ্চিতভাবে আমরা বলতে পারি। কিন্তু তিনি কোথায় আছেন? একথা আমরা কেউ জানি না। শক্তির মতো অন্য যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের ঠিকানাও আমরা জানি না। অতএব একইভাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঠিকানাও আমরা জানি না। হয়তো মৃত মানুষের ঠিকানা জানা যায় না। তবে একথাও সত্য যে শক্তির মতো অনেকেই দৈহিকভাবে মৃত্যুবরণ করেও আমাদের আত্মার খুব কাছাকাছি বসবাস করেন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রাণের ক্ষয় অনিবার্য হলেও প্রতিভা এবং সেই প্রতিভা-বিচ্ছুতির আলোকরশ্মির কোনো ক্ষয় নেই। শক্তি ইহলোক ছেড়ে চলে যাওয়া আগেই স্বীয় সৃজন-প্রতিভার যে আলো ছড়িয়েছেন তা কোনো দিনি ম্লান হবে না। প্রতিভার এই আলো আমাদের ছেড়ে চলেও যাবে না কোনো দিন। যেমন যায় নি– রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ; তেমনি শক্তিও থেকে যাবে স্বীয় রচনার বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিতে।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় পঞ্চাশের দশকে কাব্যযাত্রা শুরু করলেও প্রথম গ্রন্থিত হয়েছিলেন ষাটের ধমকে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৯৬২) প্রকাশের মধ্য দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এক রহস্যময়তার অবভাস সৃষ্টি করলেন তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো। তবে তিনি তিরিশের সম্প্রসারিত মানসিকতার পরিবর্তে নিজস্বতায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ধীরে ধীরে। এক সময় এসে দেখা গেল তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব এক কাব্যভাষা নির্মাণ করলেন, যা আপাত-অর্থে সহজ-সরল কিন্তু সেই সারল্যের মোড়কে তিনি চিন্তাসূত্রের রহস্য লুকিয়ে ফেললেন। ভাববাদ প্রভাবিত দার্শনিক চেতনা শক্তি চট্টোপাধ্যায় পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। সেই ভাববাদকে তিনি আনবিক যুগের বস্তুবাদের সংমিশ্রণে প্রকাশ করেছেন কবিতায়। ফলে তাঁর কাব্যভাষা সহজ-সরল, কিন্তু অর্থ বা কাব্যচেতনা ভাবের অপার রহস্যময়তায় আবৃত। একথা ঠিক প্রথম গ্রন্থের কবি শক্তি ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছেন আশির দশকে। আশির দশকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কাব্য ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ (১৯৮২) প্রকাশিত হয়; তিনি এই কাব্যগ্রন্থটির জন্য ১৯৮৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারও লাভ করেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাংলা কবিতাঙ্গনে রবীন্দ্র-জীবনানন্দ উত্তরকালে সত্যিকার অর্থে শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতার বিষয়-বিন্যাস, প্রকরণ বৈচিত্র্য এবং কাব্য-বুননে দক্ষতা অসাধারণ।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৮২ সালে রচনা করলেন ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’; এ কাব্যগ্রন্থটির নামকরণ এখানে বিশেষ তাৎপর্য ও দ্যোতনাবাহী। তিনি ঐ সময় খুব বেশি এলিয়েনেটেড হয়ে পড়েছিলেন যে কারেণে হয়তো আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের এই প্রকল্পটি যদি সত্যি হয় সেক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রধান হয়ে দেখা দেয়, তা হচ্ছে– তিনি যদি আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও থাকেন, সেই এলিয়েনেশনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন এবং সদম্ভে ঘোষণা দিয়েছিলেন– ‘কিন্তু কেন যাব’। আমাদে কল্পিত ধারণার অনেক কারণ তাঁর ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা সম্ভব। যেমন তিনি ‘এখন আমার কোনো অভিমান নেই’ কবিতায় অক্ষরবৃত্তের অসাধারণ গাঁথুনিতে তুলে ধরেছেন সেই অভিমানহীনতার কথা :

মাটির কলস কেন অভিমান করে?

গা-ভরা জলের ফোঁটা নামে এঁকেবেঁকে–

নীচে যেন নদী পাবে, প্রিয় মুখ পাবে,

বুকের দীঘিটি নোনা জলেই ভাসাবে

আজ। কেন? সুযোগ মিলেছে? (এখন আমার কোনো অভিমান নেই, পৃ.২৮)

এখানে ‘মাটির কলস’-তো প্রকান্তরে মাটির তৈরি মানব শরীরকেই বুঝিয়েছেন কবি। যে দেহ থেকে নানা কারণে অশ্রুবিন্দু ঝরে, যন্ত্রণায় কাতর হয় এবং সর্বোপরি অভিমান তাকে পেয়ে বসে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য; মানব মননের এই অভিমানাহত বৃত্তায়িত খাঁচা থেকে বেরুতে না পারলে, তখন সেই বন্দী মানুষের পক্ষে আত্মঘাতী হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কবির অভিমান সংসারের আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো নয়। তাঁদের থাকে এক নিজস্ব ভুবন; যে ভুবনের অধিশ্বর তিনি নিজেই। কবির নির্মিত সেই কাব্য-ভুবনে মাত্র দশ বছরে কতটা বদল ঘটেছে তা কবি বর্ণনা করে লিখেছেন : ‘মানুষের মুখচোখ মাত্র দশবছরে বদলে গেছে।’ (দশবছর আগে-পরে, পৃ. ৫৮) কিন্তু এ পরিবর্তন? এই রূপান্তর কিংবা পরিবর্তন কী কবি শক্তির কাম্য ছিল না? তাই তিনি যন্ত্রণাবিদ্ধ হন; কিন্তু নিজেকে তাৎক্ষণিক সামলে নিতেও পারেন। যেমন :

তবে হবে পরে হবে, সবকিছুর যখন ছাড়ের

আওতায় এসেছে, একে সবিশেষ ছাড় দিতে হবে।

(সবিশেষ ছাড়, পৃ. ৫৯)

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় উত্তর আধুনিক সাহিত্য-তত্ত্বের বিতর্কে বসে কবিতা লিখেছেন। সাহিত্য-সমালোচকদের মধ্যে যখন তর্ক-বিতর্ক ওরিয়ান্টালিজম, পোস্ট-কলোনিয়াল বিষযক তত্ত্ব নিয়ে তখন শক্তির কবিতায় ভারতীয় ভাববাদী দর্শন অবলীলায় জায়গা করে নিয়েছে। তিনি মৃত্যুচিন্তায় ডুবে যেতে যেতে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে মানুষ বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে মৃত্যুর সামনে বাঁধ দেয়ার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। বিজ্ঞান মেনে নিয়েছে মৃত্যু অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী সত্য। মৃত্যুকে প্রতিরোধের কোন উপায় নেই। এরপর শক্তি চট্টোপাধ্যায় এতটা শক্তি (বল) কোথায় পান যে, তিনি যাবেন না বলে দৃপ্ত ঘোষণা করেন? কিন্তু যেতে তো হবেই। রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করেছেন : ‘যেতে নাহি দিব হায়!/ তবু যেতে দিতে হয়।’ রবীন্দ্রনাথও এক সময় দম্ভোক্তি করে লিখেছিলেন : ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।’ কিন্তু চরম ভাববাদী রবীন্দ্রনাথকেও মৃত্যুর হেমলক পান করতে হয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই আপ্ত বাক্যে উর্ধ্বে নন; যখন তিনি রক্তেমাংসে গড়া একজন মানুষ। যতোই দম্ভ করুন শক্তি, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর অনিবার্যতা স্বীকার করে নিয়েই লিখেছেন ‘এপিটাফ’ শীর্ষক কবিতা। বলাবাহুল্য এই এপিটাফ আর কারো জন্য নয়, একান্তভাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নিজের জন্যই রচনা করেছেন তিনি। আট পংক্তির ‘এপিটাফ’ কবিতায় তিনি নিজের যাপিত জীবনকথা লিখে রাখতে চেয়েছেন :

কিছুকাল সুখ ভোগ করে হলো মানুষের মতো

মৃত্যু ওর, কবি ছিল, লোকটা কাঙালও ছির খুব।

মারা গেলে মহোৎসব করেছিল প্রকাশকগণ,

কেননা, লোকটা গেছে, বাঁচা গেছে, বিরক্ত করবে না।

(এপিটাফ, পৃ.৬৪)

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো কাব্যগ্রন্থে মৃত্যুবোধ প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। মৃত্যু-ভাবনায় কবির অন্তর্জগত ভেঙে তছনছ হয়ে না গেলে তিনি কী বলতে পারতেন :

পুড়তে আমি ভালোবাসি, ভালোই বাসি।

পুড়তে আমি চাচ্ছি কোনো নদীর ধারে।

কারণ একটা সময় আসে, আসতে পারে

যখন আগুন অসহ্য হয় নদীর নদীর ধরে।

(মৃত্যু, পৃ.১২)

অথচ এ কাব্যগ্রন্থের নামকরণে কবি বড্ড অহংকার করেছিলেন তিনি যাবেন না। তিনি তো জানতেন রবীন্দ্রনাথের কথা– ‘তবু যেতে দিতে হয়।’ অবশ্য ‘বিড়াল’ কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর অহংকারের বেলুন ফুটো করে দিয়ে লিখেছেন : ‘পশমের অন্তর্গত হয়ে আছে অসুস্থ বিড়াল/ খুব কাছে বসে আছে হিতব্রতী অসুস্থ বিড়াল/ কাছে বসে আছে কিছু পাবে বলে, অমরতা পাবে।’ (বিড়াল, পৃ.১৪) জেনেও না জানা কিংবা দেখেও না দেখার ভাব করা অনেক মানুষের ব্যক্তিগত স্বভাব। শক্তি জানতেন : ‘সুখের অত্যন্ত কাছে বসে আছে অসুখী বিড়াল।’ (বিড়াল, পৃ.১৮) আসলে প্রাণপণে এই ‘অসুস্থ’ এবং ‘অসুখী’ বিড়ালটাকে তাড়াতে চেয়েছিলেন; কিন্তু কী বৃথা প্রয়াস! সমস্ত জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে যখন নিজের কাছে নিকেকে উপস্থাপন করেছেন, তখন ঠিকই তাঁকে লিখতে হয়েছে ‘এপিটাপ’-এর মতো কবিতা। কিন্তু শক্তি লড়াই করেছেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনকে টিকিয়ে রাখতে। দু’হাতে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন মৃত্যু-ভয়কে। অর্থাৎ একটা জেদ ঠিকই ছিল শক্তির অন্তর্জগতে। তাই তো কবি লিখেছেন :

সমুদ্র জীবিত আছে, মৌনের উপরে আছে মেঘ,

মেঘের মতন এলোমেলো ঢেউ আছড়ে পড়ে তীরে,

আবার গুটিয়ে যায়, কেন্নোর মতন, ছোঁয়া লেগে।

ফুঁসে ফিরে আসে ফের, ঘা-খাওয়া জন্তুর মতো, তীরে।

(নিচ থেকে আমি ঐ রূপবান, পৃ. ১৭)

‘সমুদ্র’ প্রতীকে মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের লড়াই এবং অহংকার চিত্রিত করেছেন অনুরূপ চিত্রে। এখানে কবি সরাসরি নিজের কথা বলেছেন : ‘[…] পরিত্রাণ/ চাই, বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকতে চাই/ শুধু বাঁচা, অহরহ মৃত্যুর ওলোটপালোটের/ মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই, শুধু বাঁচতে চাই।’ (শুধু বাঁচতে চাই, পৃ.১৯) শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় এই যে এলোমেলো পংক্তি– যার অর্থ খুঁজে খুঁজে হন্যে হয় পাঠক, তার পেছনে ক্রিয়াশীল কবির অন্তর্জগতের অপার রহস্যময়তা। পঞ্চাশের দশকে শক্তি যে যাত্রা শুরু করেছিলেন বাংলা কবিতাঙ্গনে ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৯৬২) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে, তারপর আর পিছে ফিরে তাকান নি তিনি। তিনি ক্রমাগত নিজেকে ভেঙে গড়ে বাংলা কবিতার চূড়াদেশে পৌঁছে গেলেন আশির দশকে। আর্চিবল্ড ম্যাকলিন-এর ভাষায় ‘কবিতা শুধু হয়ে উঠতে থাকবে।’ শক্তির কবিতাও এই সূত্রানুসারে হয়ে উঠেছে আর প্রতিনিয়ত জড়িয়ে পড়েছে এক অপার রহস্যময়তার আড়ালে, অতল গহ্ববরে। শক্তির কবিতার এই রহস্যময়তা এবং দৃশ্যমান অবচেতনার জগতে প্রবেশ করা সম্বন্ধে সমালোচক মন্তব্য করেছেন :

‘জীবনানন্দের কিছুকিছু কবিতা যেমন ‘ঘোড়া’ ‘বিড়াল’ ইত্যাদিতে যে-রহস্যময় অবচেতনার ইশারা স্ফূরিত হয়ে উঠেছিল, শক্তি সেই রহস্যময়তাকেই ষাটের সময়পর্বে আবার গভীরভাবে ফিরিয়ে আনলেন কবিতায়।’ (মাসুদুজ্জামান, বাংলাদেশে ও পশ্চিমবাংলার কবিতা : তুলনামূলক ধারা, ১ম-প্র, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩; পৃ. ১৪৪)

কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় সবটুকু অর্থ উন্মোচন করেন দেন নি; টুকরো টুকরো অথবা বিচ্ছিন্নভাবে এক প্রতীকী প্রতিকল্প নির্মাণ করেন, যেখানে পাঠক কখনো কখনো রহস্যের অতল তলে ডুবে যায়। এ কাব্যগ্রন্থটিতেও ঠিক অনুরূপ অবভাস রয়েছে কবির মৃত্যু ভাবনা নিয়ে। একদিকে তিনি অহংকার করেন, অন্যদিকে তিনি ‘এপিটাফ’ রচনা করেন। জীবনানন্দীয় রহস্য তাঁর সহজ-সরল কাব্যভাষÍ আড়ালে গভীর অর্থের দ্যোতনাবাহী। যেতে পারি কিন্তু কেন যাব কাব্যগ্রন্থে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই রহস্যের মায়াজাল। শক্তির সেই রহস্যের অতলে ডুব দিয়ে খুঁজে নিতে হয়– তিনি কতটা মৃত্যু ভয়ে ভীত কিংবা মৃত্যু বিলাসী ছিলেন। এ গ্রন্থের কোন কোন কবিতায় মৃত্যু-বিলাস থাকলেও সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় কবির অন্তর জুড়ে ক্রিয়াশীল ছিল বিভীষিকাময় মৃত্যু-ভীতি।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের নাম-শীর্ষক কবিতায়-ই মৃত্যুর কথা এবং মৃত্যুর বিরুদ্ধে শানিত উচ্চারণ শোনা যায়। কবিকে মৃত্যু আহ্বান জানায় : ‘চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয়/ কবিকে মৃত্যু তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে/ চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়।’ (যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?, পৃ.৯) মৃত্যু নামক অমোঘ নিয়তিকে চ্যালেঞ্জ করেন এক অবিশ্বাস্য আন্তর শক্তিতে : ‘যাবো/ কিন্তু এখনি যাবো না/ তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব/ একাকী যাবো না অসময়ে।’ (যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?, পৃ.৯)

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হৃদয়ের কোমলতা জুড়ে প্রেম-প্রকৃতির প্রতি অবিশ্বাস্য রকমের আকর্ষণ ও ভালোবাসা। বয়সের ভারে ন্যূব্জ হয়েছেন, কিন্তু মনের ভেহরে তিনি আজো চির তরুন, চির সবুজ। তিনি এখনো চির কাঙাল ভালোবাসা আর প্রেমের : ‘কোলের কাঙাল আমি, পিপাসার্ত আমি,/ কেবলি চন্দন-চিতা আমন্ত্রণ করে :’ (তুমি একা থেকো, পৃ.১৮) মৃত্যুর এই আমন্ত্রণকে কবি সব-সময়ই উপেক্ষা করেন, মৃত্যুর পরোয়ানা উপেক্ষা করে কবি বলেন : ‘জল দাও শিকড়ে আমার/ জল দাও হৃদয় ভাসায়ে/ শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভাসাও/ আমার শিকড় দেহখানি।’ (ফিরে আসে, পৃ.২৪) অক্টোপাসের মতো মৃত্যু কবিকে টেনে ধরে, তারপর তিনি ‘শিকড়ে’ জল ঢালতে বলেন, শুধু বেঁচে থাকবেন বলে। কিন্তু কবি কী দেখেন নি– মৃত্যুর অনিবার্য ও চিরন্তন সত্যতা? সম্ভবত এ কারণেই কবির মনে হয়েছে– ‘জলে ভেজা, ভাঙা চোরা গুঁড়ো–/ জঙ্গলও কিছুটা উড়ো পুড়ো/ কী যেন কী হবে মনে হয়।’ (কী যেন কী হবে, পৃ.৩৫)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান’। অথচ শেষ জীবনে তিনিই লিখলেন : ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।’ তারপরও পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয়, অস্বীকার করা উপায় নেই মৃত্যু নামক অনিবার্য সত্যকে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছিল না, তা নয়; ছিল। তিনিও জানতেন মৃত্যু অনিবার্য, অনস্বীকার্য সত্য। ‘আগুন লেগেছে’ কবির চারিধারে এবং ‘লেগেছে অসহ্য টান বুকে ও পাথরে।/ পুড়েছে কমল, যার প্রান্ত নেই, শুধু ওড়ে ছাই …।’ (আগুন লেগেছে, পৃ.৩৯) এজন্যই সম্ভবত শক্তি চিন্তাভাবনা করে তাঁর মৃত্যুর আয়োজন করে লিখেছিলেন ‘এপিটাফ’। আর প্রিয়-মানুষ এবং বিরহ-দুঃখে যে প্রিয়তমা তাঁকে বারবার ক্লান্ত করেছে, তার জন্য বিদায়ী প্রার্থনায় কবি লিখেছেন :

যা হয় তা হোক

কিন্তু, তুমি ভালো থেকো

তুমি ভালো থেকো।

(ভালো থেকো, পৃ. ৫৪)

সুতরাং এ কাব্যগ্রন্থের শেষের দিকের কবিতাগুলোতে কবির মানস-প্রবণতা মৃত্যুকে অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যে শক্তি বা অহংকার দেখিয়ে বলেছিলেন : তিনি কেন যাবেন? সেই অহংকারের জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে নীরবে কবি নিজের ‘এপিটাফ’ রচনা করেছেন। বিজ্ঞান-মনস্ক শক্তি জানেন কোন বস্তুই অবিনশ্বর নয়, তা একদিকে যেমন নশ্চর তেমনি পরিবর্তন ও রূপান্তরশীল। তাই শক্তির কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘আগুনে পুড়ে গেল লোকটা– কবি ও কাঙাল।’ সুতরাং গ্রন্থের শেষ চরণে মৃত্যু ভয়ে ভীত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছেন। তিনি মৃত্যুকে যেন আর ভয় পান না, তবে বস্তু জাগতিক নিয়মকে অস্বীকার করেন না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর এই ভয়কে জয় করতে পেরেছেন বলেই দৈহিকভাবে মৃত্যুর পরও যথার্থ মর্যাদায় পৃথিবীতে তাঁর পাঠকবৃন্দের হৃদয়ের পদ্মাসনে অধিষ্ঠিত আছেন এবং থাকবেন চিরকাল।

………………………………………………………………………………………….

দ্রষ্টব্য : শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার উদ্ধৃতিসমূহ গ্রহণ করা হয়েছে তাঁর ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কাব্যগ্রন্থ থেকে।

………………………………………………………………………………………….

সূত্রঃ সংবাদ

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত